Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২০

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২০

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২০
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

​জিয়ান ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শীতল হাসি ফুটিয়ে তুলে বলল, “এই বদজাতের ডেরাতেই নিজ ইচ্ছায় পা রেখেছেন মিস পুকি পাই, তাই সহজে আপনার নিস্তার নেই। আমাকে যেভাবে পোড়াচ্ছেন, ঠিক সেভাবেই পোড়াবো আপনাকে। গট ইট?”
​বলেই জিয়ান দ্রুত পা চালিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে তার বন্ধু আরিফকে কল দিল। প্রথমবারেই আরিফ ফোনটা রিসিভ করতেই জিয়ান বলল, “আজকের রাতটা তোর বাড়িতে থাকা যাবে আরিফ?”
​জিয়ানের কথা শুনে আরিফ তো আকাশ থেকে পড়ল! যে ছেলের আজ বাসর রাত, সে কিনা বন্ধুর বাড়ি থাকতে চাইছে! অবাক হয়ে আরিফ বলল,

“না ভাই, তুই তোর বউয়ের সাথে হাডুডু খেল, আমায় মাফ কর ভাই। আমি আমার ভবিষ্যৎ বউকে ধোঁকা দিতে পারবো না।”
​”শাট আপ, আরিফ!” জিয়ান ধমকে উঠল।
​”কী শাট আপ রে? এটা তো তোকে বলা উচিত আমার, আর তুই আমাকে বলছিস!”
​বিরক্ত হয়ে জিয়ান কলটা কেটে দিল। মনে মনে বলল, ‘এই স্টুপিডটাকে ফোনই দেওয়া উচিত হয়নি আমার।’
​ফোনটা পকেটে রেখে নিচে নামার জন্য এগোতেই সে দেখল নিচে তার বাবা নওশাদ কায়সার ও দাদা সুফিয়ান কায়সার বসে কোনো বিষয়ে কথা বলছেন। জিয়ান মনে মনে ভাবল, ‘বাবা ও দাদা তো এখানেই বসে আছে, বাইরে যাবো কী করে? ধুর, কপালটাই খারাপ আমার! ফের ঘরেই যেতে হবে।’

​জিয়ান নিজের ঘরে ফিরে এসে দেখল রিত্তিকা ফ্রেশ হয়ে বাথরুম থেকে বের হচ্ছে। জিয়ানকে ঢুকতে দেখে রিত্তিকা ভ্রু কুঁচকে বলল, “কী ব্যাপার স্যার, ফিরে এলেন যে? চলে গিয়েছিলেন না?”
​জিয়ান স্বাভাবিক সাজার চেষ্টা করে বলল, “যেতে ইচ্ছা করলো না, তাই ফিরে এলাম।”
​”ওও আচ্ছা, তাই নাকি?” রিত্তিকা একটু উপহাসের সুরে বলল।
​”হ্যাঁ তাই। আর বেশি কথা না বলে পড়তে বসো।”
​রিত্তিকার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল, “কীহ…!”
​”কীহ না, হ্যাঁ। পড়তে বসো।”
​বাসর রাতে পড়ার কথা শুনে রিত্তিকার মুখটা একদম ছোট হয়ে গেল। সে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, “বাসর রাতে কে পড়ে?”
​”কে আবার? তুমি পড়ো। বেশি কথা না বলে টেবিলে বসো।”
​রিত্তিকা দুই হাত জোড় করে মিনতি করল, “স্যার, আজকের দিনটা ছুটি দিন। পাক্কা প্রমিস, কাল থেকে পড়বো।”

​”তা বললে তো হচ্ছে না, মিস পুকি পাই। পড়তে তো আপনাকে হবেই, পরীক্ষার তো বেশি দেরি নেই।” জিয়ান আর কোনো অজুহাত না শুনে জোর করে রিত্তিকাকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে দিল।
​টেবিলে বসে রিত্তিকা মনে মনে কপাল চাপড়াতে লাগল, ‘আল্লাহ মাবুদ! এই কাকে বিয়ে করলাম আমি? এই জন্য টিচারকে বিয়ে করতে হয় না কখনো।’
​তার ঠোঁট নাড়া দেখে জিয়ান জিজ্ঞেস করল, “কী বিড়বিড় করছো তুমি?”
​রিত্তিকা চট করে সামলে নিয়ে বলল, “কই, কিছু না তো!”
​”না হলেই ভালো। চুপচাপ করে পড়ো।”
​রিত্তিকা বইয়ের দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছে, কিন্তু তার পড়ার প্রতি কোনো মন নেই। সে কেবল কিছুক্ষণ পর পর অলসভাবে পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছে। জিয়ানের চোখ এড়ালো না সেটা। সে বলল, “তুমি কি পড়ছো নাকি খালি পৃষ্ঠাই উল্টাচ্ছো?”
​”পড়ছি তো,” রিত্তিকা হাই তুলে ঘড়ির দিকে তাকাল। “স্যার, আমার না খুব ঘুম পাচ্ছে, ঘুমাতে যাই? দেখুন আড়াইটা বাজে।”

​জিয়ান গম্ভীর মুখে বলল, “মাত্র আড়াইটা বাজে! তোমার তো উচিত না ঘুমিয়ে শুধু পড়া।”
​রিত্তিকা এবার রেগে গিয়ে বই বন্ধ করে দিল, “আপনি পড়েন, আমি ঘুমাতে যাচ্ছি। ছাতা পড়বো! বিয়ে না, আপদ করেছি একটা!”
​বলেই রিত্তিকা টেবিল থেকে উঠে গেল। বিছানায় ছড়ানো ফুলগুলো একপাশে সরিয়ে দিয়ে সে ধপ করে শুয়ে পড়লো। জিয়ানের নিজেরও তখন চোখের পাতা লেগে আসছিল। সে আর কথা না বাড়িয়ে বিছানার মাঝে একটা বড় কোলবালিশ দেয়াল হিসেবে রেখে নিজের পাশে শুয়ে পড়ল।
​সকালে আযানের আওয়াজে রিত্তিকার ঘুম ভাঙল। আড়মোড়া ভেঙে সে বিছানা ছাড়ল। ওযু করে এসে ফজরের নামাজটা পড়ে নিল সে। নামাজ শেষে জিয়ানের দিকে তাকাতেই তার মনটা একটু নরম হলো। ঘুমে জিয়ানের মুখটা একদম শান্ত দেখাচ্ছে। রিত্তিকা তার কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কী নিষ্পাপ লাগছে এখন! কিন্তু ঘুম থেকে উঠলেই আস্ত একটা বদমাশ লোক হয়ে যাবে। কত খারাপ হলে মানুষ বাসর রাতেও পড়তে বসায়!”
​ঘরে কিছুক্ষণ পায়চারি করার পর রিত্তিকার একঘেয়ে লাগল, তাই সে নিচে নেমে গেল। রান্নাঘরে গিয়ে দেখল রিহানা কায়সার ও রেনিয়া কায়সার সকালের নাস্তা তৈরিতে ব্যস্ত। রিত্তিকা মৃদু হেসে এগিয়ে গেল,

“আসসালামু আলাইকুম, আন্টি।”
​রিহানা কায়সার ঘুরে তাকিয়ে হাসলেন,
“ওয়ালাইকুম আসসালাম, রিত্তিকা। তুমি এত সকালে উঠে পড়েছো?”
​”জী আন্টি, ঘুম ভেঙে গেল। তাই নিচে আসলাম।”
​”আচ্ছা।”
​রিত্তিকা একটু ইতস্তত করে বলল,
“আন্টি, আমিও আপনাদের একটু হেল্প করতে পারি?”
​রিহানা কায়সার আদর মাখানো গলায় বললেন,
“না মা, তুমি গিয়ে বসে থাকো। আমি আর রেনিয়া করছি সব।”
​”আন্টি, শুধু শুধু বসে থাকতে কি আর ভালো লাগে?”
​”না, তা বললে হবে না। তুমি বরং ঘরে যাও, বিশ্রাম নাও।”
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে রিত্তিকা বাধ্য মেয়ের মতো নিজের ঘরে চলে এলো।
​ঘরে এসে দেখল জিয়ান এখনও ঘুমাচ্ছে। রিত্তিকা ধীর পায়ে ঘরের সাথে থাকা বেলকনিটাতে গিয়ে দাঁড়াল। বেলকনিতে সারিবদ্ধভাবে কিছু ফুল গাছ লাগানো আছে, সেখান থেকে ভোরের মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে। রিত্তিকা চোখ বন্ধ করে সেই হাওয়া উপভোগ করছিল।
​হঠাৎই রিত্তিকার মনে হলো তার ঠিক পেছনে কেউ এসে দাঁড়িয়েছে। একটা শরীরের উষ্ণতা টের পেয়ে সে ঝট করে ঘুরতেই দেখল জিয়ান একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে!
​রিত্তিকা বলল, “এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন ভূতের মতো পেছনে?”
​জিয়ান চোখ সরু করে বলল, “কীহ? আমি ভূত?”

​”তো কী? ভয় পেয়ে গেছিলাম না!”
​জিয়ান একটু দুষ্টুমিভরা হাসল, “বেশি কথা বললে টুক করে নিচে ফেলে দেবো।”
​রিত্তিকাও কম যায় না, সে মুখ বাঁকিয়ে বলল, “আহ, শখ কত! টুক করে নিচে ফেলে দেবে! মামার বাড়ির আবদার!”
​”মামার বাড়ির না হলেও আমার আবদার। দেখবে ফেলে দেবো?”
​”হুম, দেখবো।” রিত্তিকা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিল।
​জিয়ানও ছাড়ার পাত্র নয়, সে সত্যি সত্যি রিত্তিকাকে একটু ভয় দেখানোর জন্য বেলকনির রেলিংয়ের দিকে চেপে ধরল। রিত্তিকা ভয়ে আঁতকে উঠে জিয়ানের টি-শার্ট শক্ত করে খামচে ধরল এবং চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল,
“আল্লাহ! ফেলে দিল গো! ওই খচ্চর প্রফেসর…!”
​জিয়ান রিত্তিকার কোমরে হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে ধরে হেসে ফেলল,
“চুপ, স্টুপিড মহিলা! ফেলে দিয়েছি নাকি এখনও?”
​রিত্তিকা কাঁপা কাঁপা ভাবে আস্তে করে এক চোখ খুলে দেখল—সে নিচে পড়ে যায়নি, বরং জিয়ানের শক্ত বাঁধনে তার বুকের মাঝেই জড়িয়ে আছে। জিয়ানের মুখে তখন বিজয়ের এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি।

~~~~​আজ জিয়ান আর রিত্তিকার রিসেপশন। আলো ঝলমলে অনুষ্ঠান বাড়িতে অতিথিদের আনাগোনা। এরই মধ্যে রিত্তিকাদের বাড়ির সবাই এসে পৌঁছাল। চেনা মুখগুলোকে দেখামাত্রই রিত্তিকার মনটা খুশিতে নেচে উঠল। বিশেষ করে তার ভাই ইফাতকে দেখার সাথে সাথেই সে সব সামলে ছুটে গেল তার দিকে।
​”ভাইয়া! কেমন আছিস?” রিত্তিকার কণ্ঠে উপচে পড়া আবেগ।
​ইফাত বোনের দিকে তাকিয়ে একটা ম্লান হেসে বলল, “তুই না থাকলে যেটুকু ভালো থাকা যায়, সেইটুকুই। তোর খবর বল। নতুন বাড়িতে আবার আগের মতো দুষ্টুমি করিসনি তো?”
​রিত্তিকা একটুখানি মুখ বাঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ করেছি তো! তোদের ছাড়া একদম ভালো লাগছে না রে এখানে। আব্বু কোথায় রে ভাইয়া?”
​ইফাত হাত উঁচিয়ে একদিকের সোফার সারি দেখিয়ে বলল, “আব্বু ওদিকে তোর শ্বশুরের সাথে কথা বলছে।”
​”আচ্ছা, আমি আব্বুর কাছে গেলাম,” বলেই রিত্তিকা শাড়ির কুঁচিটা আলতো করে ধরে আরিশান ইসলামের দিকে এগিয়ে গেল।

​নওশাদ কায়সারের সাথে কথা বলতে বলতে হঠাৎই মেয়ের উপস্থিতিতে আরিশান ইসলাম ঘুরে তাকালেন। রিত্তিকা এসে তার খুব কাছে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল গলায় ডাকল, “আব্বু…”
​আহমেদ সাহেব মেয়ের মাথায় হাত রেখে পরম স্নেহে বললেন, “কেমন আছো তুমি, মা?”
​বাবার হাতের চেনা স্পর্শটা পেতেই রিত্তিকার চোখের কোণটা ভিজে উঠল। সে আর নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারল না। বাবার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, “আমার তোমাকে ছাড়া একটুও ভালো লাগছে না আব্বু। আমি আজই তোমার সাথে বাড়ি ফিরে যাবো।” কথাগুলো বলার সময় কান্না তার গলায় আটকে যাচ্ছিল, চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসার উপক্রম।
​মেয়ের এমন কাণ্ড দেখে আরিশান ইসলাম নিজের বুকেও এক ফোঁটা কান্না মোচড় দিয়ে উঠল। কিন্তু মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকজনের সামনে নিজেকে সামলে নিয়ে, পরম মায়া মাখানো কণ্ঠে বললেন,

“এমন করে না মা। এটাই তো এখন তোর আসল বাড়ি। এখানে জিয়ান আছে, ওর মা-বাবা আছে। আজ থেকে এখানেই এখন তোর সব।”
“যখনই তোর আমাদের কথা খুব বেশি মনে পড়বে, তখনই একটা ফোন করিস মা। আমরা তো কোথাও হারিয়ে যাচ্ছি না, তাই না?”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ১৯

​দূর থেকে দাঁড়িয়ে জিয়ান দেখছিল রিত্তিকার এই চঞ্চল থেকে হঠাৎ এক নিমেষে অবুঝ শিশু হয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা। তার পাথুরে হৃদয়ের কোথাও যেন একটা মৃদু আলোড়ন তৈরি হলো।

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২১

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here