Home প্রফেসর জিয়ান কায়সার প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৫

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৫
জান্নাতুল ফেরদ্দোস ময়না

​ভার্সিটি থেকে ফিরে ঘরে ঢুকেই রিত্তিকা দেখলো জিয়ান সোফায় হেলান দিয়ে বসে গভীর মনোযোগে ফোনে স্ক্রল করছে। আজ ভার্সিটিতে জিয়ানের কোনো ক্লাস ছিল না, তাই সে অফিসেই গিয়েছিল। রিত্তিকা ক্লান্ত শরীরে কাঁধের ব্যাগটা পড়ার টেবিলে রাখলো। সারাটা দিন প্রচণ্ড ধকল গেছে, তার ওপর হাতের পোড়া জায়গা টা আজ সারাটা দিন বেশ ভুগিয়েছে। আর দেরি না করে সে ফ্রেশ হতে ওয়াশরুমে চলে গেলো।
​মিনিট পাঁচেক পর ফ্রেশ হয়ে, পরনের কাপড় বদলে যখন সে ঘর থেকে বের হলো, জিয়ান ফোন থেকে চোখ না তুলেই গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করলো,

_”হাতের ব্যথা এখন কেমন?”
_ “কমেছে অনেকটা।”
_”মলমটা লাগিয়েছো?” জিয়ানের চোখ এবার সরাসরি রিত্তিকার মুখের ওপর।
​আমতা আমতা করে রিত্তিকা অপরাধীর মতো মুখ করে বললো,
_”ইয়ে মানে… আসলে… না, লাগানো হয়নি।”
​জিয়ান ফোনটা সোফায় ছুড়ে ফেলে দাঁড়িয়ে পড়লো। তার চোখে স্পষ্ট রাগ।
_”তোমার কি কোনো আক্কেল-জ্ঞান নেই রিত্তিকা? হাতটা অতখানি পুড়িয়ে বসে আছো, তারপরও ঠিকমতো ঔষধ লাগাচ্ছো না! নিজের শরীরের প্রতি এই অবহেলা কেন?”
​জিয়ানের কড়া সুরে রিত্তিকা কিছুটা দমে গেল, তবে নিজের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলল,
_ “ভার্সিটিতে ছিলাম তো এতক্ষণ, ক্লাসের চাপে সময় পাইনি। তাই লাগানো হয়নি।”
_”বাহ! চমৎকার অজুহাত!”
জিয়ান হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
_”তোমার ভার্সিটি শেষ হয়েছে অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে। আর তুমি দেড় ঘণ্টা পর বাড়ি ফিরছো। নিশ্চয়ই এতক্ষণ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় নষ্ট করছিলে?
​জিয়ানের এই ধমক শুনে রিত্তিকা একদম চুপ মেরে গেল। মনে মনে ভাবলো, আসলেই তো, জিয়ান তো ভুল কিছু বলেনি। সে তো তার ভালোর জন্যই বকছে।
​রিত্তিকাকে চুপ করে থাকতে দেখে জিয়ান আবার গমগমে গলায় বলল,
_”এখানে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে না থেকে এদিকে এসো।”
​রিত্তিকা জিয়ানের রাগী মুখ দেখে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেলো না। সে গুটি গুটি পায়ে, এগিয়ে আসলো সোফার দিকে।
জিয়ান সোফায় নিজে বসে ইশারায় বলল,

_”বসো।”
​রিত্তিকা জিয়ানের ঠিক সামনে গিয়ে বসতেই জিয়ান সোফার পাশ থেকে মলমটা হাতে নিলো। জিয়ান ভালো করেই জানতো এই ঘাড়ত্যাড়া মেয়ে নিজে থেকে কোনোদিনও মলম লাগাবে না, তাই সে আগে থেকেই মলমটা পাশে নিয়ে অপেক্ষা করছিল। জিয়ান আলতো করে রিত্তিকার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিলো এবং খুব সাবধানে পোড়া জায়গায় মলমটা লাগাতে লাগলো।
​ঠাণ্ডা মলমটা ক্ষতস্থানে লাগতেই রিত্তিকা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল,
_”আহ! জ্বলছে তো!”
জিয়ান তার দিকে না তাকিয়েই বলল,
_ “তো আমি কী করবো?”
রিত্তিকা একটু আদুরে গলায় বলল,
_ “একটু আস্তে-ধীরে, পরম যত্নে লাগিয়ে দিবেন। এত জোরে চাপ দিচ্ছেন কেন?”
জিয়ান এক পলক রিত্তিকার মুখের দিকে তাকিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
_”হ্যাঁ, আমি তো তোমার কেনা গোলাম! বসে বসে তোমার সব হুকুম শুনবো, আর রাজকন্যার মতো সেবা করবো!”

​রিত্তিকা আর কোনো কথা না বলে জিয়ানের দিকে একটা ভেংচি কেটে হাতটা টেনে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলো।
​রাতের খাবারের পর রিত্তিকার নিজের ঘরে না গিয়ে জিয়া ঘরেই চলে গেল। দুজনে মিলে অনেকক্ষণ ধরে টুকটাক গল্প করতে করতে রিত্তিকা কখন যে জিয়ার বিছানাতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, সে নিজেও টের পায়নি।
​রাত তখন প্রায় আড়াইটা। হুট করেই রিত্তিকার ঘুমটা ভেঙে গেলো। চোখ মেলেই সে দেখলো সে জিয়ার ঘরেই আছে। বিছানা থেকে নেমে সোজা নিজের ঘরে চলে আসলো।ঘরে ঢুকতেই তার নজর গেল জিয়ানের দিকে। জিয়ান কেমন যেন কুঁকড়ে শুয়ে আছে, শরীরটা কাঁপছে আর ঠোঁট দুটো কাঁপিয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছে।
​রিত্তিকা কিছুটা ভয় পেয়ে জিয়ানের কপালে হাত ঠেকালো। হাত দেওয়া মাত্রই রিত্তিকার চোখ কপালে উঠলো—জিয়ানের গা যেন একদম পুড়ে যাচ্ছে! প্রচণ্ড জ্বর এসেছে তার।
​রিত্তিকা মনে মনে ভীষণ প্যানিক করতে লাগলো,

_ “এত রাতে এখন আমি কী করবো? কাকে ডাকবো এই অসময়ে? শরীরের তাপমাত্রা তো বেড়েই চলেছে!”
​জিয়ানের এমন অবস্থা দেখে রিত্তিকার মাথা কাজ করছিল না। তবুও সে নিজেকে শক্ত করলো। দ্রুত বাথরুমে গিয়ে একটা তোয়ালে ভিজিয়ে আনলো। জিয়ানের গায়ের টি-শার্টটা সাবধানে খুলে দিয়ে পুরো শরীর ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দিতে লাগলো। এরপর ড্রয়ার ঘেঁটে একটা নাপা ট্যাবলেট বের করে জিয়ানকে কোনোমতে খাইয়ে দিলো।
রিত্তিকা যখনই বিছানা থেকে উঠে যেতে নিলো, ঠিক তখনই ঘটলো সেই অভাবনীয় ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা!
​জিয়ান হুট করে রিত্তিকার হাতটা শক্ত করে ধরে এক হেঁচকা টান দিল। আচমকা এই টানে ভারসাম্য রাখতে না পেরে রিত্তিকা সটান জিয়ানের চওড়া বুকের ওপর গিয়ে পড়লো। জিয়ানের তপ্ত নিঃশ্বাস রিত্তিকার গলায় এসে আছড়ে পড়ছে। জিয়ান আচ্ছন্ন চোখে, এক অদ্ভুত ঘোর লাগা কণ্ঠে বিড়বিড় করে বলে উঠলো, “প্লিজ ডোন্ট গো, এঞ্জেল… স্টে হেয়ার।”
​রিত্তিকার পুরো শরীরে যেন এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেলো! বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন লাফাচ্ছে। এত সুন্দর, এত মায়াবী নামে তাকে এই রাশভারী প্রফেসর সাহেব ডাকছে? গতকাল তাকে ‘হার্ট’ বলে ডেকেছিল, আর আজ রাতে ডাকছে ‘এঞ্জেল’!
​রিত্তিকার নিজের কানকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। তবে একটু পরেই তার মনে সংশয় জাগলো। সে মনে মনে ভাবলো,

_ “নাহ, এই লোককে বিশ্বাস নেই। এখন জ্বরের ঘোরে এসব বলছে, কাল সকাল হতেই জ্বর ঠিক হয়ে গেলে আবার সেই দূর-ছাই করে তাড়িয়ে দেবে। এই খিটখিটে লোককে আমি মোটেও বিশ্বাস করি না।”
​রিত্তিকা জিয়ানের বুক থেকে ওঠার চেষ্টা করে ফিসফিসিয়ে বলল,
_”এই বদজাত লোক, ছাড়ুন আমায়! কী মতলবে আমায় এভাবে ধরেছেন, হুম? ছাড়ুন বলছি! এখন তো খুব চিপকাচ্ছেন হুশে নেই বলে, হুশে আসলে তো আবার সেই মুখ গোমড়া করে তাড়িয়েই দিবেন!”
​কিন্তু জিয়ান যেন শুনতেই পেল না। সে রিত্তিকার কোমর আরও শক্ত করে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরে আবার আকুল সুরে বললো, “প্লিজ যেও না… এখানেই থাকো…” বলেই সে যেন আরও গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
​রিত্তিকা কী করবে বুঝতে না পেরে জিয়ানের বুকের ওপরই কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইলো। তার নিজের বুকের ধকধকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর অনেক কসরত করে নিজের কোমর থেকে জিয়ানের শক্ত হাতের বাঁধন আলগা করে সে উঠে বসলো। জিয়ানের ছটফটানি কমাতে সে আবার এক বাটি পানি নিয়ে এসে জিয়ানের কপালে জলপট্টি দিতে লাগলো। জলপট্টি দিতে দিতেই কখন যে সে জিয়ানের পাশেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো, তা সে নিজেও টের পেল না।

সকাল হতেই রিত্তিকার ঘুম ভেঙে গেল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সে চমকে উঠল। আজ ভার্সিটিতে তার একটা ভীষণ ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে, কোনোভাবেই লেট করা যাবে না। সে দ্রুত বিছানা ছেড়ে নিজের ঘরে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাতের পোড়া জায়গাটার দিকে তাকিয়ে কাল রাতের কথা মনে পড়তেই তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। জলদি ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়ে সে জিয়ানের ঘুম ভাঙার আগেই ভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেল।
​রিত্তিকা চলে যাওয়ার বেশ কিছুক্ষণ পর জিয়ানের ঘুম ভাঙলো। ঘুম থেকে উঠেই মাথাটা কেমন যেন জ্যাম ধরে আছে তার, কাল রাতের জ্বরের তীব্রতা এখনো শরীরে মাখানো। ফ্রেশ হয়ে এসে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে যখন সে শার্টের বোতাম আটকাচ্ছিল, ঠিক তখনই ঘরের দরজা ঠেলে রিহানা কায়সার ভেতরে ঢুকলেন। তাঁর হাতে খাবারের প্লেট।
​মায়ের মুখটা বেশ চিন্তিত। তিনি জিয়ানের কাছে এসে বললেন,

_”এখন তোর শরীর কেমন রে জিয়ান? আর সকাল সকাল শার্ট পরে কোথায় যাচ্ছিস শুনি? রিত্তিকা যাওয়ার সময় বলে গেল রাতে নাকি তোর খুব জ্বর এসেছিল?”
​জিয়ান মায়ের দিকে তাকিয়ে হালকা একটু হেসে বলল,
_”এখন অনেক বেটার ফিল করছি, আম্মু। আর আজ ভার্সিটিতে একটা ইম্পর্ট্যান্ট ক্লাস আছে আমার, তাই যাওয়াটা খুবই জরুরি। না গেলে চলবে না।”
রিহানা কায়সার কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা পরীক্ষা করে বললেন, _
“আজকের দিনটা রেস্ট নিলে হতো না? শরীরটা তো এখনো দুর্বল।”
জিয়ান মায়ের হাতটা ধরে বলল
_ “না আম্মু, ম্যানেজ হয়ে যাবে। যাই হোক, তুমি বরং তাড়াতাড়ি খাইয়ে দাও তো, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
​মায়ের সামনে এলে জিয়ানের ভেতরের সেই গম্ভীর, কড়া রূপটা এক মুহূর্তেই উধাও হয়ে যায়। পৃথিবীর অন্য সবার সামনে সে সবসময় মুখ গম্ভীর করে রাখলেও, নিজের মায়ের সামনে সে এক অন্য জিয়ান—একদম সাধারণ, হাসিখুশি আর মায়ের বাধ্য ছেলে।

_​”কী রে রিত্তি! এত দেরি করে এলি যে?” নিহারিকা ক্লাসের করিডোরে রিত্তিকাকে দেখতেই প্রায় ছুটে এসে জিজ্ঞেস করলো। তার চোখে-মুখে বেশ তাড়া।
​রিত্তিকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাঁধের ব্যাগটা ঠিক করতে করতে বলল
_, “আরে বলিস না! রাস্তায় আজ যা জ্যাম ছিল, জ্যাম ঠেলে আসতেই অর্ধেক জান শেষ হয়ে গেছে। তাই দেরি হয়ে গেল।”
নিহারিকা ফের বলল,
_”আচ্ছা, আর কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি চল ক্লাসে, নাহলে জিয়ান স্যার ঢোকার পর আর ঢুকতেই দেবে না। আজ কিন্তু স্যারের ক্লাস!”
_”হ্যাঁ, চল।’
​সবাই মিলে তাড়াহুড়ো করে ক্লাসরুমে ঢুকে পড়লো এবং ঠিক সময়েই জিয়ান ক্লাসে প্রবেশ করলো। জিয়ানকে দেখেই ক্লাসের সব মেয়েরা একটু সোজা হয়ে বসলো। অফ-হোয়াইট রঙের একটা শার্টে। জিয়ানকে বরাবরের মতোই অসম্ভব সুদর্শন আর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন দেখাচ্ছে।
​জিয়ান ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলো,

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৪

_, “আজকে আমি যে টপিকটার ওপর লেকচার দেবো, খুব মন দিয়ে শুনবে সবাই। কারণ, আগামীকাল এই টপিকের ওপরই একটা টেস্ট নেওয়া হবে।”
​ জিয়ান দাঁড়িয়ে খড়খড়ে গলায় লেকচার দেওয়া শুরু করতেই রিত্তিকার চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এলো।
​সে বেঞ্চে কনুই ভর দিয়ে গালে হাত রাখলো। জিয়ান বোর্ডে কী লিখছে, কী বোঝাচ্ছে—সবকিছু রিত্তিকার চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে আসতে লাগলো। সে ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে বিড়বিড় করতে লাগলো,
_”উফ! কাল রাতে অত জ্বর এলো, শরীরটা পুড়ে যাচ্ছিল, তাও দেখো কী ড্যাশিং ভাবে সেজেগুজে ক্লাস নিতে চলে এসেছে খচ্চরটা! হুহ্! ”

প্রফেসর জিয়ান কায়সার পর্ব ২৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here