Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫০

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫০
রাত্রি মনি

“আআআআআআহ্…..!”
শব্দটা কেবল গলার রগ চেরা আর্তনাদ ছিল না, সেটা ছিল মানব আত্মার অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার শেষ, ফাটল ধরা স্বর।
হেল চেম্বারের ভেতরটা যেন কোনো ধূসর নরকের ফোঁটা, যেখানে সময় থেমেও আবার দৌড়ায়।
হাত-বাঁধা, ঝুলন্ত লোকটির শরীর এখন শুধু মাংসের ডেলা। চামড়া নেই, কেবল জমাট বাঁধা কালচে রক্ত আর থেঁতলানো টিস্যুর গাঢ় স্তর। শরীর থেকে চুইয়ে পড়া ঘন, আঠালো রক্ত মেঝের টাইলসে জমে একটি ছোট, কালো হ্রদ তৈরি করেছে, যা ঘরের বাতাসকে ধাতব, উষ্ণ গন্ধে ভারি করে তুলেছে। লোকটা মুখ হাঁ করে বাতাস টানছে, যেন প্রতিটি নিঃশ্বাসই কাঁচের গুঁড়ো। তার মুখের লালা আর রক্ত মেশানো মিশ্রণ, পচে যাওয়া ফলের রসের মতো, মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছে। সেই জমে থাকা রক্তের গন্ধটা যেন দেয়ালের ভেতর ঢুকে গর্জন করতে থাকা এক অজানা অন্ধকারকে ডেকে আনছে।

তার ঠিক সামনে, দাঁড়িয়ে আছে যুবক। মাথা হেলে রয়েছে সামান্য। নিঃশ্বাস এতটাই দ্রুত, সেই ফোঁস ফোঁস শব্দে যেন তার ভেতরের পশুটা খাঁচা ভাঙতে চাইছে। তার কাঁধের ওঠানামা যেন গর্জে ওঠা কোনো বিষাক্ত জন্তুর শ্বাস।চোখে অস্থিরতা—মুখে তীব্র নিস্তব্ধতা।দু’হাতে লেগে থাকা রক্ত শুকাতে শুরু করেছে, কিন্তু তার ভেতরের আগুনটা—না।ওটা বরং আরো ভয়ংকর, আরো ক্ষুধার্ত হয়ে উঠছে।তার দুই হাতে চকচকে দুটো জম্মু ধারালো মিট ক্লিভার (Meat Cleavers)— ফলক রক্তে এতোটাই সিক্ত যে আলো পড়ে না, যেন দুটো কালো আয়না। তার চোখে-মুখে এক অসুস্থ, নিদারুণ ক্ষুধা। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে প্রচন্ড অসন্তুষ্ট। বহু পরিশ্রম করেছে কিন্তু ফলটা যেন মিষ্টি নয়, কেবল টক।

একটা চাপাতি সে হিংস্র পশুর গজগজানির সাথে ছুঁড়ে মারলো। ক্ল্যাং!— মেঝের মার্বেল টাইলস যেন বোমার আঘাতে ফেটে গেল। ছিন্নভিন্ন টাইলসের মাঝখানে ক্লিভারটি গেঁথে দাঁড়িয়ে রইল, তার ফলক থেকে রক্ত চুঁইয়ে পড়ল সাদা ভাঙা টুকরোগুলোর উপর। যুবক হিংস্রতায় উন্মত্ত, তার নিঃশ্বাস ঘন থেকে ঘনতর। মাথা ঝটকা দিয়ে উঠল। সে যেন নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। নেশাগ্রস্তের মতো এক হাতে কপাল, চোখ, নাক ঘষতে লাগলো। শান্তি নেই, তার ভেতরে নরক জ্বলছে।
হঠাৎ, বিদ্যুৎ বেগে সে ঝুঁকে এলো ঝুলে থাকা লোকটির সামনে। লোকটির চোখ তখন আধ-খোলা, দৃষ্টি নেই, কেবলই শকের সাদাটে ভাব। যুবক বিকৃতভাবে তাকালো, যেন সে কেবলই এক মানসিক বিকারগ্রস্ত নয়, সে শয়তানের প্রতিনিধি। সে ভ্রু কুঁচকে, চোয়ালে হাত রেখে সামান্য চুলকে নিল, ভঙ্গিটা ছিল ভয়ানক শান্ত। তারপরেই যেন তার ভেতরের পশুটা বেরিয়ে এলো। এক ভয়ংকর হিংস্র চিৎকার,
“এই, এই জানোয়ার বাচ্চা! চিৎকার কর আরো জোরে চিৎকার কর ! আমাকে শোনা, তোর ভেতরের যন্ত্রণাটা, তোর আত্মার আর্তনাদ! এভাবে মজা পাচ্ছি না তো! আরো জোরে। তোর ভেতরের প্রতিটা স্নায়ু ছিঁড়ে যাওয়ার শব্দ শুনতে চাই! শুনতে পাচ্ছিস না? আরো জোরে…..!!!!!”
তার গর্জন হেল চেম্বারের লোহার দেওয়াল কাঁপিয়ে দিল। লোকটা মুখ খুলল, শুধু একটা ভেজা, শ্বাসরুদ্ধকর ঘড়ঘড় শব্দ বের হলো। জেইন উন্মত্তের মতো ছটফট করতে লাগলো। সে যেন রক্ত আর চিৎকার নামক ড্রাগের জন্য ছটফট করছে।

“Scream, scream! I need to feel the vibrations of your failing life! The more you scream, the more peace I will find! Tear your lungs out for me, you filthy animal!”
লোকটা কাঁপতে কাঁপতে, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে শেষ শক্তিটুকু দিয়ে উচ্চারণ করল,
“আম… আমাকে… শেষ করে দিন। একেবারে শেষ করে দিন। আমি… আর… পারছি না… এই নরক যন্ত্রহ্….”
জেইন তার ক্লিভারের ডগা দিয়ে লোকটার থুতনি তুলে ধরল। তার ঠোঁটে যে হাসিটা ফুটে উঠল, শত সহস্র বছরের জমে থাকা পৈশাচিক উল্লাস।
“মারবো তো সোনা। একটু একটু করে, ধীরে ধীরে, যতটা যন্ত্রণা দিয়ে মারলে, নরকের কথা মনে হবে, ঠিক ততটাই যন্ত্রণা দিয়ে মারবো তোদের।”

সে কিটকিটিয়ে উচ্চ শব্দে হেসে উঠল। সেই হাসিটা ছিল রক্ত শীতল করা, তীক্ষ্ণ মেটাল স্ক্র্যাপের শব্দের মতো। যেন নরকের অন্ধকার গহ্বর থেকে উঠে আসা কোনো ভয়ংকর, হাড় কাঁপানো উল্লাস। তার হাসির শব্দে ‘হেল চেম্বারের’ গার্ডদের স্নায়ুতন্ত্র ছিন্নভিন্ন করে দিল।শরীরে কম্পন শুরু হলো। তাদের মধ্যে একজন আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে দাঁড়িয়েই প্যান্ট ভিজিয়ে ফেলল। গড়গড় ঝর্ণার মতো গরম জলের শব্দে তার প্যান্ট ভিজে একসা। অন্য আরেকজন এতক্ষণের টর্চার আর বীভৎসতা দেখতে দেখতে মাথা ঘুরে চিৎপটাং হয়ে পড়ে আছে মেঝেতে। একজন গার্ড সেই হাসি শুনে ভয়ে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলল। তারা এখন যমদূতের সামনে দাঁড়িয়ে আছে—যেখানে মৃত্যু নিশ্চিত, বাঁচার শেষ আশাটুকুও নেই।
গার্ডরা ভয়ে একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছিল, তাদের কপাল থেকে যেন ঘাম নয়, জীবনরস গড়িয়ে পড়ছে।
যুবকটি ক্লান্তির ভান করে ঘাড় ফুটালো, যেন এক দীর্ঘ নাটকের পর সামান্য বিরতি। সে বসে পড়ল মেঝের রক্তের স্রোতে। তার গাঢ়, নগ্ন বুক ঘন ঘন ওঠানামা করছে। হাত পা টান টান করে ফুটে উঠল এক কর্কশ শব্দে। এক পা ভাঁজ করে, অন্য পা ছড়িয়ে, সে ধীরে ধীরে ঘাড় হেলিয়ে তাকালো লোকটার দিকে। তার চোখ ছিল শিকারি বাজপাখির মতো, শিকারের শেষ মুহূর্ত উপভোগের তৃষ্ণা। মাথা নিচু করে অদ্ভুত শান্ত গলায় অত্যন্ত ধীরে থেমে থেমে বললো,

“আমার অনুপস্থিতিতে… আমার সাম্রাজ্যে… আমার বিছানায়… আমার শত্রুকে প্রবেশাধিকার দিয়েছিস তুই!”
সে হাসল। সামান্য তাচ্ছিল্য মাখা হাসি। সেই হাসি আবার মিলিয়ে গেল। বিদ্যুতের ঝলকের মতো উঠে দাঁড়িয়ে সে চেপে ধরল লোকটার চোয়াল, শক্তি এতটাই বেশি যে চোয়ালের হাড় মটমট করে উঠল।
“এই, তোর কি জানের মায়া নেই? জানের মায়া নেই তোর হ্যাঁ! এই তোর কলিজাটা কত বড় রে। দেখা দেখা, দেখা আমাকে। আমি দেখতে চাই। কত বড় কলিজা তোর, যে আমার খেয়ে আমার সাথেই বিশ্বাসঘাতকতা করার দুঃসাহস দেখালি। দেখা না। দেখা, তোর কলিজা টা! দেখা! আআ্আ্আ্”
একটা হিংস্র, চূড়ান্ত কোপ। দু’হাতের মঠোয় ধরা ক্লিভার। যুবকের প্রশস্ত, ঘর্মাক্ত বুক ফুলে উঠছে। ক্লিভারটা গেঁথে রইল ঝুলন্ত লোকটার বুকের ঠিক মাঝখানে। লোকটা নিষ্প্রাণ। চিৎকার করার শেষ সুযোগটুকুও পায়নি। যুবক ভ্রু কুঁচকে ঘাড় বাঁকা করে তাকালো। তার হিংস্রতা শেষ হয়নি। সে বিকৃত; ভ্রু কুঁচকে ক্লিভারটা দিয়ে পাঁজর এবং স্টার্নাম হাড়গুলোকে চিড়ে ফেললো চড়ড়… মটমট শব্দে। উন্মুক্ত বুকের খাঁচার মধ্যে সে হাত ঢুকিয়ে দিল। তার মুখটা যেন এক ক্ষুধার্ত শয়তানের।

সে টেনে বের করল কাঙ্ক্ষিত জিনিস— টকটকে খয়েরী বর্ণের রক্তাক্ত কলিজা। এখনো কাঁপছে, যেন ভেতরে তাজা প্রাণ লাফাচ্ছে। সে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল কলিজাটার দিকে। তার মুখ বিকৃত,
“এটাতো খুব ছোট! এতো ছোট কলিজায় এতো বড় স্পর্ধা এলো কোথা থেকে!”
শিশুদের মতো বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে, সে আচমকা চেম্বারে বেঁধে রাখা বাকি গার্ডদের মুখের কাছে ঝুঁকে এলো। তাদের আত্মার অস্তিত্ব উড়ে গেল।
“এই, বল না! এতো ছোট কলিজায় এতো সাহস কোথায় পেল? তোদের কলিজাও কি এর মতোই? হ্যাঁ? দেখা! তোদের কলিজাও দেখব আমি! এক্ষুনি!”
“আমাদের ক্ষমা করে দিন বস। আমাদের ভুল হয়ে গেছে। টাকার জন্য আমরা…”
“টাকা! টাকা! টাকা! হাহ্! এই টাকা মানুষের ভেতরের শয়তানকে জাগিয়ে তোলে। বাপ ছেলেকে, ছেলে বাপকে টুকরো টুকরো করে কাটতে পারে। আর তোরা? তোরা তো আমার কেউ না, পোশা কুকুর!যে পাত্রে খায় সেখানেই ছিদ্র করে!”

গভীর, বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে, সে মেঝেতে বসলো। হাত রাখলো একজন গার্ডের ঘাড়ে। তার কণ্ঠস্বর হঠাৎ ঠান্ডা, ভয়ানক শান্ত,
“কত টাকার দরকার ছিল তোদের? কত? আমি দিতে পারতাম না? তোদের কোনো সমস্যা থাকলে আমাকে বলতি… আমি কি না করতাম? কোনো দিন ফিরিয়ে দিয়েছি তোদের? তাহলে কেন? কেন করলি এই বেইমানি…? বল!!!”
একজন কাঁদতে কাঁদতে শ্বাসরুদ্ধ গলায় ফিসফিস করে বললো,
“বস আমরা প্রথমে রাজী ছিলাম না। পরে ও আমার ছোট্ট ছেলেকে, আমাদের পরিবারের লোকজনকে আটক করে, আমাদের হুমকি দেয়।”
যুবক বিতৃষ্ণায় মুখ কুঁচকে ফেললো,
“পরিবার হ্যাঁ? আমাকে বলতি, আমি কি বাঁচাতে পারতাম না! আমার ওপর তোদের বিশ্বাস নেই? ছ্যাহ্! এই তোরা না অনাথ!”
সে হেসে উঠলো,

“বাচ্চা এলো কোথা থেকে?”
তারপর একটু থেমে,
“এটা অন্ধকার জগত! এখানে কোনো পিছুটান থাকতে নেই। রাখতে নেই কোনো দূর্বলতা।”
তার মুখে হালকা তাচ্ছিল্যের বাঁক,
“তোদেরকে আর কি বলবো, আমি নিজেই এখন সেই পথে হাঁটছি। আজ যদি… যদি সত্যিই আমার ফায়ারফ্লাইয়ের….”
তার কণ্ঠস্বর আবার চিৎকার হয়ে ফেটে পড়ল,
“যদি আমার ফায়ার ফ্লাইয়ের কিছু হয়ে যেত? সামান্য কিছু… আমার ফায়ার ফ্লাইয়ের…”
সে চোখ খিঁচে বন্ধ করল। হাত মুষ্টিবদ্ধ। এক মুহূর্ত শান্ত থাকার পর আবার ষাঁড়ের মতো ফোঁস ফোঁস করতে লাগলো।

“তোদের জন্য! শুধুমাত্র তোদের জন্য, আমার সন্তান তুল্য ভাই, আমার আত্মার অংশ, মাত্তেও… এখন আইসিইউতে! মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। আমার দেওয়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে। ওর কিছু হলে কি করব আমি? কোথায় খুঁজে পাবো ওকে? হ্যাঁ? কোথায় বল? সেই, সেই ছোট্ট বেলায় কুড়িয়ে এনেছিলাম রাস্তা থেকে। তারপর নিজের হাতে, আমার এই নিজের হাতে মানুষ করেছি। নিজের সন্তানের মতো।তুই জানিস ও আমার কত প্রিয়? হ্যাঁ, জানিস? আমার জীবনের একটা মূল্যবান অংশ! চব্বিশ ঘণ্টা হয়ে গেছে, চব্বিশ ঘন্টা! এখনো জ্ঞান ফেরেনি! ও কি ফিরবে? ও কি সুস্থ হবে? বল না, পাবো ফিরে? হ্যাঁ?”
এক উন্মত্ত, তীক্ষ্ণ, পৈশাচিক চিৎকার,
“এই বল!!! ও কি ফিরে আসবে!!!!! বল!!!!”
‘ঠাস!’– জেইনের এক কোপে প্রথম গার্ডের কাটা মাথা গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। চোখ দুটো যেন এখনো প্রশ্ন করছে। ‘ধড়াম!’– শরীরটা স্থির হয়ে মেঝেতে পড়ল।

“চিন্তা নেই। তোদের মৃত্যুর পর তোদের বাচ্চার ভরণপোষণের সমস্ত দায়িত্ব পালন করবো আমি।”
জেইন আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। সে এবার হাতে তুলে নিল বিশাল আকৃতির, চকচকে লোহার সার্প কুঠার (Executioner’s Axe)। এটা কেবল কাটে না, ছিঁড়ে ফেলে। দু’হাতে কুঠার তুলে বসিয়ে দিল অন্য একজন গার্ডের ঘাড়ের উপর। একের পর এক উন্মত্ত কোপ। সেই গার্ডের চিৎকার তার কাছে সংগীতের মতো, যা তার ঠোঁটে এক পৈশাচিক হাসি এনে দিল।

সে সবকটা গার্ডকে লাথি মেরে মেঝেতে ফেলে কুঠার দিয়ে একে একে আঘাত করতে লাগলো। আঘাতগুলো এলোমেলো নয়, ছিল ঠান্ডা মাথার, চরম বিদ্বেষপূর্ণ। কুঠারের আঘাতে তাজা রক্ত ছিটকে এসে ভিজিয়ে দিচ্ছিল তার মুখ মন্ডল। মাংস, চামড়া, হাড় সব থোকা থোকা উঠে আসছিল, যেন কোনো নোংরা স্তূপ থেকে ময়লা টেনে তোলা হচ্ছে। রক্তের বন্যা বইছে, আর সেই রক্তে গার্ডদের দেহাংশ, নাড়িভুঁড়ি, গলিত মগজের টুকরো, দ্বিখণ্ডিত কলিজা ভাসছে। চেম্বারটা এখন মাংস আর রক্তের এক বিকৃত কসাইখানা।
অবশেষে ক্লান্ত হয়ে, সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল রক্তের হ্রদে। তার সম্পূর্ণ শরীর সদ্য রক্তে স্নান করেছে। সে চোখ বুজে গভীরভাবে টেনে নিল তাজা রক্তের তীব্র, ধাতব গন্ধ। এক হাত দিয়ে মুখটা মুছে নিল—কিন্তু তৃপ্তি নেই। এত সহজে বেইমানগুলো মরে গেল?

না। এত সহজ মৃত্যু ওদের হতে পারে না!
সে হাতে তুলে নিল একটি ধারালো ইলেকট্রিক করাত (High-Powered Industrial Chainsaw)। তারপর আরাম করে, যেন কোনো শিল্পকর্ম করতে বসেছে, অত্যন্ত ধীর গতিতে, যত্ন সহকারে, প্রত্যেকটা লাশের থেকে হাত, পা, মাথা, ধড় আলাদা করতে লাগলো। এরপর সেই টুকরোগুলো থেকে আবার টুকরো করল—কলিজা, ফুসফুস, মগজ। প্রতিটা টুকরো করার সময় তার মুখে ফুটে উঠছিল এক ভয়ংকর, তীক্ষ্ণ, রহস্যময়ী হাসি। চোখে উন্মাদনার ঝিলিক। তার কাছে এই বীভৎস কাজটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় বিনোদন!

“এতো গুলো ড্রাগস্! For God’s sake! Are you out of your mind? একসাথে এতগুলো poison কেন নিচ্ছিস? It’s lethal for your brain!”
ইয়াশের কণ্ঠস্বরে এক ধরনের অস্থিরতা। জবাবে জেইন সামান্য ঠোঁট বাঁকালো—এক শীতল, যন্ত্রণাদায়ক বিকৃতি।
“Don’t preach, Yash. My brain is already twisted. And this poison? It’s my fuel. It burns the rot and wakes up the beast. You know I’m used to this shit.”
“বাট…”

ইয়াশ বলতে গিয়েও থেমে গেল। সে জানে একে কিছু বলেও কোনো লাভ হবে না। শেষ ইনজেকশনটা তার শিরায় প্রবেশ করানোর সাথে সাথেই জেইনের শরীরটা তীব্র খিঁচুনিতে ধনুকের মতো বেঁকে গেল। তার চোখ উল্টে গিয়ে শুধু সাদা অংশটুকু দেখা গেল। সিরিঞ্জটা মেঝের রক্ত আর কাঁচের টুকরোর স্তূপে পড়ে রইল।চোখ বন্ধ করে কয়েক মুহূর্ত ঘন শ্বাস টেনে নিল যেন নিজের ভেতরের পশুটাকে বশে আনল। চোখ খুলতেই ইয়াশ দেখল, সেই চোখ আর মানুষের নয়—সেখানে কেবল শীতল, নির্লিপ্ত মৃত্যু খেলা করছে।সারা শরীর জুড়ে জমাট বাঁধা রক্তের প্রলেপ। বরফের চেয়েও ঠাণ্ডা, শান্ত কণ্ঠে সে বলল ,

“শোন, সেফকে বলবি লাশের টুকরোগুলো সুন্দর করে ফুটন্ত গরম তেলে deep fry করতে। একদম crispy হবে। তারপর সেগুলো ট্রে তে ভরে ট্রেজান’কে দিয়ে আসবি।He loves fresh human flesh.
জেইন ফ্রিজ থেকে বরফ-ঠান্ডা জলের বোতলটা তুলে নিজের মাথার ওপর ঢালতে শান্তিতে চোখ বুজে নিল। তীব্র ঠান্ডা জল তার মাথা থেকে চওড়া প্রশস্ত বুকে গড়িয়ে পড়ল, রক্তের সঙ্গে মিশে গাঢ় লাল স্রোত হয়ে মেঝের কালচে টাইলসগুলিকে যেন রক্তের নদীতে পরিণত করল।শেষে সে তার কালো শার্টটি টেনে জড়িয়ে নিল শরীরে।দরজার দিকে পা বাড়াতেই ইয়াশের কণ্ঠস্বর প্রায় ফিসফিস করে উঠল,
“কোথায় যাচ্ছিস?”
জেইন এক সেকেন্ডের জন্য স্থির হলো। তার মুখটা দরজার উল্টো দিকে থাকায় ইয়াশ তার অভিব্যক্তি দেখতে পেল না, কেবল তার কণ্ঠস্বরের ভয়ালতা শুনতে পেল।
“Cryo Chamber……..”

“What happened? Why do you look so worried?”
ইয়াশ অস্থিরভাবে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে জমাট বাঁধা আতঙ্ক। বুক ভরে একটা দীর্ঘ, ভারী শ্বাস নিল সে।কিন্তু তাতে শ্বাসরোধই বাড়ল।
“AJ… আবার ফিরে এসেছে। আগের সেই দানব রূপে।”
গলা শুকিয়ে এলো ইয়াশের।
“দু’দিন ধরে একটা মেডিসিনও নেয়নি। One day without meds is already dangerous… but two?”
সে মাথা ঝাঁকাল।
“ওর ব্রেইনে কী ধরনের ব্ল্যাকআউট তৈরি হয়, You know that very well.”
এলেনা ঠান্ডাভাবে তাকিয়ে রইল। তার গলা বরফের মতো নিস্তরঙ্গ।
“মেডিসিন নিবে কি করে, সেগুলো দেয়ার দায়িত্ব যার ছিল সে তো…..।”
সে একটু থেমে আবার বলল,
“রিলেক্স কিচ্ছু হবে না। হি উইল বি ফাইন।”
ইয়াশের অস্থিরতা বাড়লো—হয়তো তার চোখে এখনো লাশের দৃশ্য ভাসছে।
“আই নো হি উইল বি ফাইন। আমার চিন্তা ওর জন্য নয়।আমি ভয় পাচ্ছি বাকিদের জন্য! একটা গার্ড ও বেঁচে নেই। নো ওয়ান survived. এমন বীভৎস লাশ! I swear… ওদের মুখ পর্যন্ত চেনার উপায় নেই। আমি নিজেই বমি চেপে রেখেছি। যদি রিম… যদি একটুও টের পায়—তাহলে কি হবে বুঝতে পারছো?”
“Rim will know nothing. আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। আর এ’জে যেটা করেছে ঠিক করেছে। ওরা বেইমান ছিল, বেইমানরা বাঁচার যোগ্য না। Death is the only justice for betrayal. Those guards got exactly what they deserved. এখন বাকি শুধু আসল মাস্টারমাইন্ড। ওদের জন্য মাত্তেও এখনো…..”

সেই রাতে মিশন শেষে গাড়িতে,
“ফার্স্ট তোদের ম্যামের লোকেশন ট্রেস কর, এক্ষুনি!”
​জেইনের হাড় কাঁপানো কণ্ঠের নির্দেশ কানে আসার পরই লুকা পাগলের মতো লোকেশন ট্রেস করতে শুরু করল। কিন্তু মার্কো হাউজের প্রতিটি সিসিটিভি ফুটেজ চেক করতে গিয়ে দেখলো—সবই নিষ্ক্রিয়, জিরো সিগন্যালে! কেউ যেন জেনেশুনেই এই কাজ করেছে, যেন পুরো খেলাটাই সাজানো। জেইনের বুকের মধ্যে সন্দেহের কাঁটা যেন আরও গভীর হলো। সে যা আঁচ করেছিল, তাই ঘটছে। হাউজে কার প্রবেশাধিকার আছে, তা তার অজানা নয়। রিমের নিরাপত্তার কথা মনে হতেই তার বুকে অস্থির কম্পন শুরু হলো। তারা পৌঁছানোর আগেই যদি কোনো অঘটন… না, সে আর ভাবতে পারল না।

​”Turn on the secret camera….. ফার্স্ট!!”
​গাড়ির ভেতরে পিনপতন নীরবতা, যা আতঙ্কের শীতল ঢেউয়ে ভেঙে যাচ্ছে। উত্তেজনায় সবার বুক কাঁপছে।
মার্কো, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলল, “ই-ইয়েস বস!!”
​সিক্রেট ক্যামেরা, এমন এক আধুনিক ডিজাইন করা বস্তু যা শার্টের বাটনে কিংবা মাছির মতো অতি সূক্ষ্ম কোনো বস্তুতে লুকানো থাকে, তা-ই এখন তাদের শেষ ভরসা।
​”Oo no…”
​হঠাৎ মার্কোর গলা চিরে তীক্ষ্ণ এক আর্তনাদ বেরিয়ে আসতেই গাড়ির সবাই স্থির হয়ে তার দিকে তাকাল। ইয়াশ রুদ্ধশ্বাসে বলল,
“ওয়াট হ্যাপেন্ড মার্কো?”
​মার্কো মুখে কিছু বলতে পারল না, শুধু কাঁপতে কাঁপতে ছোট্ট ল্যাপটপটা এগিয়ে দিল জেইনের হাতে। স্ক্রিনের দিকে চোখ পড়তেই জেইনের পেশিগুলো শক্ত হয়ে গেল। তার গলা থেকে তীক্ষ্ণ এক চিৎকার বেরিয়ে এল,
​”ফার্স্ট, ড্রাইভ দা কার ফার্স্ট ইটস টু লেট। মাত্তেওকে বাঁচাতে হবে যেকোনো ভাবেই।”
“পেয়ে গেছি!”

​ঠিক তখনই লুকার কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা একইসাথে স্বস্তি ও নতুন বিপদের পূর্বাভাস নিয়ে এলো।
​”ভাবির লোকেশন পেয়ে গেছি। ভাবি ক্যালাব্রিয়া জঙ্গলের মধ্যেই আছে! কিন্তু… ভাবিকে কতগুলো গার্ড তাড়া করছে!”
জেইন এক মুহূর্তের জন্য স্থির, যেন তার নিঃশ্বাস আটকে গেছে। কাকে বাঁচাবে সে; তার সন্তানের মতো ভাই, নাকি প্রাণভোমরা স্ত্রী? একদিকে মাত্তেও, অন্যদিকে রিম। তার বুকের মধ্যে চরম দ্বিধায় দুটি পথ।
​ইয়াশ জেইনের মুখের অস্থিরতা বুঝতে পারল। সে জেইনকে বুকভরা আস্থা দিয়ে বলল,
​”চিন্তা করিস না। কারো কিচ্ছু হবে না। তুই এক কাজ কর, লিটেল সিস্টারের কাছে যা। তোর ফায়ারফ্লাইকে এই মুহূর্তে একমাত্র তুইই পারবি বাঁচাতে। ওর এই মুহূর্তে তোকে খুব প্রয়োজন। এলেনা আন্টিকে নিয়ে হাউজে চলে যাবে। আর ঐ বা*স্টার্ড’টাকেও আটকাতে পারবে। ও পালানোর আগেই।”
​জেইনের চোখে তখনও মাত্তেওর করুণ মুখচ্ছবি।
“কিন্তু আগে মাত্তেও, ওর যেন কিছু না হয়। ওকে হসপিটালে নিয়ে যেতে হবে। এজ সুন এজ পসিবল।”
​”রিলেক্স। মাত্তেয়োর জন্য আমরা আছি। ওর কিচ্ছু হবে না। তুই শুধু রিমকে বাঁচা।”
জেইন গাড়ি থেকে অন্য গাড়িতে উঠে পড়লো। ​বুকের ভেতরে ভয়ংকর এক চাপ নিয়ে স্টিয়ারিং ধরে সর্বশক্তি দিয়ে অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল। রিমের দিকে, ক্যালাব্রিয়ার সেই অন্ধকার, বিপদসংকুল জঙ্গলের দিকে ধেয়ে চলল তাদের গাড়ি। সময় ফুরিয়ে আসছে…

বিশাল আকৃতির কাঁচের দরজাটি যেন এক অদৃশ্য বিভেদ রেখা টেনে দিয়েছে—ভেতরে জীবন-মৃত্যুর সংগ্রাম, আর বাইরে প্রতীক্ষার হিমশীতল শূন্যতা। সেই কাঁচের সামনে স্থির, সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেইন, পকেটে দু’হাত গুঁজে।তার দেহভঙ্গিমা দৃঢ়তার প্রতীক হলেও, ভেতরের মানুষটি তখন কেবলই এক নৈঃশব্দ্যের কারুকাজ।বাইরের আবরণের নিচে ভেতরের উত্তাল অনুভূতি বোঝার উপায় নেই। চোয়ালের টানটান রেখাটি তার ভেতরের দুর্দমনীয় যন্ত্রণা চেপে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা।প্রতিটি মুহূর্ত যেন এক একটি যুগ।
কিছুক্ষণ পর ডাক্তার বেরিয়ে এলেন কেবিন থেকে। তাঁর গম্ভীর কণ্ঠস্বর নৈঃশব্দ্য ভেঙে দিল,
“মিস্টার চৌধুরী…… একচুয়ালি পেশেন্টের অবস্থা খুবই শোচনীয়। মাথায় গুরুতর আঘাত লেগেছে। আইসিইউতে শিফ্ট করতে হবে। বাঁচা-না-বাঁচা আপাতত কিছু বলা যাচ্ছে না। ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে; জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত। আপনি চাইলে একবার ভেতরে যেতে পারেন।”

“Thanks, Doctor….”
ভদ্রতার খাতিরে মৃদু শব্দে উচ্চারণ করলো জেইন।
মুখে ওয়ান টাইম মাস্ক লাগিয়ে, প্রতিটি পদক্ষেপ মেপে মেপে, ধীর পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো জেইন। বাইরে থেকে তার উপস্থিতি যতটাই কঠোর প্রস্তরখণ্ড মনে হোক না কেন, ভেতরে তখন এক অস্থির, কাঁপন তোলা কম্পন। সে জানে না এ কেমন অনুভূতি! একদিকে মায়ের অসুস্থতা। অন্যদিকে পাশের কেবিনে আহত রিম। আর এখানে, জীবন-মৃত্যুর দোদুল্যমানতা নিয়ে শুয়ে আছে মাত্তেও—তার রক্তের সম্পর্কের বাইরেও এক আত্মিক বন্ধন। জীবনের এই জটিল আবর্তে সে আগে কখনো পড়েনি। এখন মনে হচ্ছে, এর চাইতে তার সেই নিঃসঙ্গ জীবনটাই ভালো ছিল—যেখানে ছিল না কোনো পিছুটান, ছিল না এমন নিদারুণ দুর্বলতা।

সে খুব ধীরে বেডের পাশে রাখা চেয়ারটায় বসে পড়লো। ঘরের নিস্তব্ধতা এত গভীর যে, কেবল অক্সিজেন মেশিনের একটানা ফোঁস-ফোঁস শব্দ এবং মনিটরের টিক-টিক ছন্দ শোনা যাচ্ছে—যেন সময় নিজের গতিতে দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে।
জেইন তার হাতটা বাড়িয়ে দিলো। আলতোভাবে, যত্নের সাথে, মাত্তেওর হাতের ওপর রাখলো তার হাত। মাত্তেওর মুখটা ঢাকা অক্সিজেন মাস্কে, হাতে সাদা ক্যানোলা। জেইন তার ফ্যাকাসে, রক্তশূন্য মুখের দিকে তাকালো। এই মুখেই তো হাসি লেগে থাকত সবসময়।
“মাত্তেও….”
তার কণ্ঠস্বর আজ অবাক করে দেওয়ার মতো কোমল, অথচ গভীর এক শীতলতা মাখানো। মাত্তেও জেগে থাকলে হয়তো বলতো: ‘ভাই, আপনি আমার সাথে এমনভাবে, এতো কোমল স্বরে! আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না!’ কথাটা মনে হতেই জেইনের ওষ্ঠে এক ক্ষীণ, বিষাদমাখা হাসি ফুটে উঠলো। পরক্ষণেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল ঠোঁটের আর্দ্র কোণে।

“Thanks brother. আমি জানতাম তুই নিজের জীবন দিয়ে হলেও নিজের দায়িত্ব পালন করবি। তোর জন্যই আজ তোর ভাবী সুরক্ষিত আছে। কিন্তু তুই আমার একটা কথা রাখিস নি। আমি তোকে বলেছিলাম নিজের খেয়াল রাখবি। তুই রাখতে পারিস নি।”
একটু শাসনের সুরে,
“একবার শুধু সুস্থ হয়ে ফিরে আয়, আমার কথা রাখতে না পারার জন্য তোকে বিশাল পানিশমেন্ট পেতে হবে। সারারাত জঙ্গলে দাঁড় করিয়ে রাখবো তোকে।”
সে এক মুহূর্ত থামলো। গলার স্বর ক্ষীণ,
“তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যা। তুই সুস্থ না হলে কাকে পানিশমেন্ট দেবো বলতো?”
হঠাৎই যেন নীরবতার পর্দা ছিঁড়ে গেল। আচমকা হালকা কেঁপে উঠলো মাত্তেওর হাতের একটি আঙুল। আর সাথে সাথেই টিক টিক টিক… করে দ্রুত ও তীব্র গতিতে বাড়তে লাগলো স্ক্রিনের হার্টবিট লাইন! জেইন চমকে উঠলো, তার ভেতরের পাথরখণ্ড যেন মুহূর্তে গলে গেল।

“Doctor!! Doctor please come! His heartbeat is going very fast!”
ডাক্তার ও নার্সরা ছুটে এলেন। চেকআপের পর ডাক্তারের চোখ-মুখ বিস্ময়ে উজ্জ্বল।
“ওহ্ মাই গড! ইটস আ মিরাক্কেল। আমার লাইফের হিস্টোরিতে যত কেস ছিল, তাদের মধ্যে এই প্রথম কোনো কেস দেখলাম যেখানে এতো সিরিয়াস হওয়া সত্ত্বেও পেশেন্ট এতো তাড়াতাড়ি রেসপন্স করছে। ইটস রিয়েলি আনবিলিভেবল!”
হঠাৎ মাত্তেওর মুখ থেকে ভেসে এলো অস্পষ্ট ফিসফিসানি স্বর। নার্স চমকে উঠলো,
“স্যার, পেশেন্ট কিছু বলতে চাইছে।”
ডাক্তার ঝুঁকে ঝুঁকে কথা শোনার চেষ্টা করলো। সেই দুর্বল, কিন্তু পরিচিত স্বর,
“ভাআ্… ভা.. ভাই… ”
জেইন তার পাশে বসে হাতটা দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। সেই অদ্ভুত কোমল, আশ্বাসের কন্ঠে বলল,

“হ্যাঁ, বল…”
“ভাআ্ ভা-বী… ভাবীকে……”
জেইন গভীর নিঃশ্বাস নিলো।
“তোর ভাবী একদম ঠিক আছে। তুই তোর দায়িত্ব পালন করেছিস। বাঁচিয়েছিস তোর ভাবীকে। তার ক্ষতি হতে দিস নি। এন্ড আই’ম প্রাউড অফ ইউ। এখন, তোকে বাঁচতে হবে। মনে রাখিস তুই কিন্তু আমাকে কথা দিয়েছিস! আই নো ইউ আর ব্রেভ বয়। পারবি না? বল…”
মাত্তেও মৃদু হাসার এক কষ্টকর প্রচেষ্টা করলো। জোরে নিঃশ্বাস ছেড়ে দিলো, যেন সমস্ত শক্তি জড়ো করে বললো,
“জি…. ভাই…..”

“কি ম্যাডাম!! শুনলাম আপনি নাকি কিছু খেতে চাইছেন না।”
রিমের কেবিনে ঢুকতে ঢুকতে কন্ঠে মৃদু, কৃত্রিম কঠোরতা মিশিয়ে বললো জেইন। রিম বিছানায় হেলান দিয়ে বসেছিল। কপালে আর পায়ে ব্যান্ডেজ। তার মুখ তখন পূর্ণিমার চাঁদের মতো ফোলা। চোখ কুঁচকে মুখ ফুলিয়ে সে অভিমান নিয়ে বললো,
“কথা বলবে না তুমি আমার সাথে। আমি রেগে আছি তোমার ওপর।”
“তাই বুঝি… হঠাৎ এতো রাগ।”
জেইন ধীরে ধীরে রিমের পাশে বিছানায় বসলো। তার কণ্ঠস্বরে কঠোরতার বদলে তখন একটু আহ্লাদ। আচমকা, কোনো পূর্বাভাস ছাড়াই, রিম তীব্র আবেগে জেইনকে জড়িয়ে ধরলো, যেন এতক্ষণ সে এই স্পর্শটির জন্যই অপেক্ষা করছিল। জেইন প্রথমে সামান্য অবাক হলেও, পরক্ষণেই আলতো হাতে, পরম যত্নে তাকে নিজের বাহুডোরে আবদ্ধ করে নিল।

“কোথায় গিয়েছিলে তুমি? আমি বলেছি না, আর কখনো আমার থেকে দূরে যাবে না। আমার ভয় হয়, যদি আবার তোমাকে হারিয়ে ফেলি….”
“শুশহহহ্…”
জেইন আলতো করে রিমকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নিল এবং তার ঠোঁটে নিজের তর্জনী স্পর্শ করলো। সেই আঙুলের স্পর্শে রিমের শরীর দিয়ে এক তীব্র বিদ্যুৎ প্রবাহ বয়ে গেল। তার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠলো।জেইন তার চোখে স্থির দৃষ্টি রেখে গভীর, কামুক স্বরে ফিসফিস করলো,
“আমি হারাতে দেব না তোমায়। কক্ষনো না। তুমি যেখানেই থাকো না কেন, পাতাল থেকে হলেও খুঁজে আনব।”
রিমের কোমল, নরম গোলাপি ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে জেইনের চোখ দুটি যেন নেশায় বুঁদ হয়ে গেল। চোখের সেই ঘোর লাগা দৃষ্টি ছিল নেশার চেয়েও বেশি—তীব্র মাদকতা পূর্ণ। এই মাদকের নাম রিম। সে ধীরে ধীরে রিমের ঠোঁটের খুব কাছে নেমে এলো। রিমের ঠোঁট তখন গোলাপের পাপড়ির মতো কাঁপছে, প্রতিটি লোমকূপ যেন জেইনের কাছাকাছি আসার উত্তেজনা অনুভব করছে। জেইনের শরীরের উষ্ণতা তার নিঃশ্বাসকে ভারী করে তুললো।
সে জেইনের পরবর্তী পদক্ষেপ বুঝতে পেরে, দ্রুত চোখ বন্ধ করে, ঝটপট বলে উঠলো,

“মাত্তেও…. ও কোথায়? কেমন আছে? ওকে…”
জেইন সামান্য চমকে সোজা হয়ে বসলো।
“বাহ্ ভালোই তো দেবর ভাবীর মধ্যে কত মিল। দেবর করছে ভাবীর খোঁজ ভাবী নিচ্ছে দেবরের খোঁজ। আমাকে তো ভুলেই গেছে সবাই।”
রিম চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
“উফ্ ব্যঙ! বলো না ও কেমন আছে?”
“ও একদম ঠিক আছে। ফিট এন্ড ফাইন। আফটার অল হি ইজ আ স্ট্রং ম্যান। এখন তুমি তাড়াতাড়ি খেয়ে নেও। লক্ষ্মী সোওওনা..”
জেইনের হাতে স্যুপের বাটি দেখে রিমের মুখ কুঁচকে গেল।
“আমি এসব খাবো না।”
“এখন এটা খাওয়া ছাড়া আর কোনো অপশন নেই। মেডিসিনও তো খেতে হবে। বায়না করে না, সোনা। এখন এটা চুপচাপ লক্ষ্মী বাচ্চার মতো খেয়ে নেও বাড়ি গিয়ে যা খেতে চাইবে তাই খাওয়াবো।”
“আমি অনেক গুলো আইসক্রিম খাবো।”
“কিন্তু… এখন তো ঠান্ডা। আইসক্রিম খেলে তোমার Clod হবে। তুমি চাইলে আমি তোমায় অন্য কিছু খাওয়াতে পারি। এন্ড ইটস অলসো গুড ফর ইয়োর হেল্থ।”
রিম ভ্রু কুঁচকে গভীর কৌতূহলে তাকালো,

“কি?”
জেইন ক্রূর হেসে, আস্তে করে নিজের ঠোঁট কামড়ে ধরে, নিচের দিকে ইশারা করলো।
“ছিঃ তুমি এমন কেন? যাহ্! পঁচা লোক।”
জেইন এবার তার আরও কাছে ঘেঁষে আসলো, তাদের শরীরের উষ্ণতা প্রায় মিশে গেল। মাদকতা মিশ্রিত গাঢ়, ফিসফিস কন্ঠে সে রিমের কানের কাছে বলল,
“যেমনই হই না কেন, পুরোটা শুধু তোমারই। আমার এই পঁচা স্বভাবের একমাত্র অধিকারিণী তুমি।”
“ইশশ্!”
রিম লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। তার হৃদস্পন্দন তখন দুর্দান্ত গতিতে নিঃশ্বাসের সাথে তাল মেলাচ্ছিল।

“Cryo Chamber”
এক ধরনের বিশেষায়িত কৃত্রিমভাবে শীতলীকৃত ঘর বা পড (Pod), যা সাধারণত ক্রীড়াবিদদের পেশি পুনরুদ্ধার, প্রদাহ কমানো এবং স্বাস্থ্যগত উন্নতির জন্য ব্যবহার করা হয়। যেখানে তাপমাত্রা সাধারণত -১১০°C থেকে -১৪০°C বা কিছু ক্ষেত্রে -১৮০°C পর্যন্তও হতে পারে। এই চরম ঠান্ডা তৈরি করতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তরল নাইট্রোজেন ব্যবহার করা হয়।১ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে এই তাপমাত্রায় কোনো মানুষ থাকলে হাইপোথার্মিয়া বা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জমে গিয়ে (Frostbite) কোষের মারাত্মক ক্ষতির কারণে তার মৃত্যু নিশ্চিত।এই কক্ষ ব্যবহারকারীকে শুকনো মোজা, গ্লাভস এবং কান ও মুখ ঢাকার প্রতিরক্ষামূলক পোশাক পরতে হয়।
তাপমাত্রা এখন -140°c এর কাঁটা ছুঁয়েছে; বাতাসে জমে থাকা আর্দ্রতা ঘন কুয়াশার মতো চারপাশকে গ্রাস করেছে। প্রতিটা নিঃশ্বাস যেন ফুসফুসের শিরা-উপশিরাকে জমিয়ে দিতে চাইছে। ঘরের মেঝেতে পুরু তুষারের আস্তরণ, যেন এক হিমশীতল নরক।
এর ঠিক মাঝখানে, প্রতিরক্ষামূলক পোশাকে মোড়া, নীলাভ চোখ দু’টি স্থির। ঘন কুয়াশা ভেদ করেও তাঁর তীক্ষ্ণ স্পষ্ট। থুতনিতে হাত রেখে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে আছে জেইন।

তার ঠিক সামনে একটা বিশাল কাঁচের বক্সে বরফ-ঠান্ডা জলে মোটা দড়ি দিয়ে বেঁধে উল্টো চুবিয়ে রাখা হয়েছে এক যুবককে; সেই আগন্তুক। গত চব্বিশ ঘণ্টা ধরে জেইন তাকে কুকুরের মতো নির্যাতন করেছে—কখনো নরকের আগুনের তাপ, কখনো এই মেরু-ঠান্ডা জল। প্রতিবার মৃত্যু যখন নিঃশ্বাস ফুরিয়ে আনার দ্বারপ্রান্তে, ঠিক এক সেকেন্ড আগে তাকে আবার মুক্ত করা হয়েছে।
ফস্!—হঠাৎ ঠান্ডা জলের তীব্র ঝাপটা। গলাকাটা পশুর মতো ছটফট করে উঠলো আগন্তুক। ফুসফুসের শেষ বায়ুটাও যেন বেরিয়ে যাবে। জেইন হাতের ইশারায় একজন গার্ডকে নির্দেশ দিতেই, দড়ি টেনে তাকে টেনে বের করা হলো। তারপর বসানো হলো জেইনের সামনে রাখা একটি কাঠের চেয়ারে।
আগন্তুক মাথা তুলতে পারলো না। দৃষ্টি ঝাপসা, নিঃশ্বাস ক্ষীণ। সে বাঁকা, রক্তমাখা চোখে জেইনের দিকে তাকালো। এরপর এক বীভৎস, ক্রুর হাসি ফুটিয়ে তুললো—যেন তীব্র যন্ত্রণাকে উপহাস করছে।
“যত ইচ্ছে যন্ত্রণা দে। কিন্তু এই বুক সেই মুখের ছবি মুছে ফেলতে পারবি না। সেই এঞ্জেল!! ওহহ্….”
জেইন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে মাথা ঝাঁকাতে লাগলো। তার হাসি চওড়া হতে হতে হঠাৎ তা মিলিয়ে গেল এক হিংস্র গর্জনে। ধড়ম!!

“এঞ্জেল হ্যাঁ…. এঞ্জেল? ইউ বা*স্টার্ড!”
আগন্তুকের মাথা তীব্র একটা ঘূর্ণি খেয়ে উঠলো। মাথাটা একটা তীব্র ঝাঁকুনি খেল। জেইনের হাতে একটা লোহার শেকল। সেটার’ই আঘাত লেগেছে আগন্তুকের মাথায়।
“এই আরেকবার বল কি বললি! কোথায় আছে , হ্যাঁ? কোথায় বুকে? বুকে বললি না তুই? এই বল! কথা বল শুয়ো*রের বাচ্চা!!!!!”
আগন্তুকের গলায় শ্বাস আটকে আছে। তবুও সেই ক্রুর হাসি ধরে রেখে, মুখ হা করে নিঃশ্বাস নিতে নিতে সে বললো,
“হ্যাঁ বুকে। ঠিক এইখানে।”
আঙুল দিয়ে নিজের বুকের বাঁ পাশে ইশারা করতেই—সিপ!—ছুরির তীক্ষ্ণ ফলক গেঁথে গেল সেখানে। তাজা টকটকে লাল রক্ত গড়গড়িয়ে পড়লো। জেইন ছুরিটি ধরে তীক্ষ্ণ চাপ দিতেই যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে গেল আগন্তুকের মুখ।
“এখানে না? এখানে আছে! এই জায়গা টাই আর অক্ষত থাকবে না।”
জেইন হঠাৎ ভারসাম্যহীন বিকারগ্ৰস্থ মানুষের মতো ছটফট করে উঠলো,
“এই, তুই ছুঁয়েছিলি না! ও’কে ছুঁয়েছিলি? কোথায় কোথায় টাচ করেছিস বল না! হ্যাঁ?”
সে বিকৃত প্রায় পাগলের মতো মাথায় চুলে হাত বুলাতে লাগলো। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক ঘষে ফোঁস করে নিঃশ্বাস টেনে বললো,

“এই, এই তুই ত-তুই….”
তার নিঃশ্বাসের ফোঁস ফোঁস শব্দ বাড়লো।
“আ-আ-আ-আ-আ-আ-আ-হ্!!!!”
তাঁর সেই আর্তচিৎকার ঘরের নিস্তব্ধতা চুরমার করে দিলো। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াশ গভীর, নির্বিকার দৃষ্টিতে শুধু তাকে পর্যবেক্ষণ করছে।
আচমকা, কোনো আগাম বার্তা ছাড়াই জেইন বসিয়ে দিল এক কোপ। জম্মু ধারালো মিট ক্লিভার-এর আঘাতে আগন্তুকের ডান হাতের সবগুলো আঙুল ছিটকে পড়লো মেঝেতে! বীভৎস চিৎকার; বেরিয়ে এলো গলার রগ চিরে। জেইন দুপাশে ক্যাড়ক্যাড় করে ঘাড় ফুটিয়ে নিল। তার চোখে জ্বলজ্বলে উন্মাদনা। মুখে রহস্যময়ী শয়তানি হাসি। যেন এই চিৎকারের শব্দটা তাকে বিনোদন দিচ্ছে। তার হাতে একটা ধারালো, জম্মু ধারালো মিট ক্লিভার (Meat Cleavers)

“তুই জানিস ওর… ওর শরীরে যখন একটা মশার কামড়ের দাগ বসে তখন হিংসেয় জ্বলে যায় আমার বুক। সেখানে তুই তো একটা আস্ত মানুষ হয়ে ও’কে ছুঁয়েছিস। তাহলে বোঝ কত যন্ত্রণা হচ্ছে এই বুকে! হ্যাঁ? আমি… আমি সহ্য করতে পারছি না রে…!ও আমার। ও’কে ছুঁয়ে দেয়ার অধিকার একমাত্র আমার, আছে। আর কারোর না।”
ক্লিভারটা একবার আগন্তুকের কানের পাশ দিয়ে সাঁই করে গেল।
“আমি ছাড়া কেউ ওর গায়ে হাত দিবে ভাবলেই শরীর শিউরে ওঠে। কিন্তু তুই তো হাত দিয়েছিস! তাহলে তোর কি হবে ভাবতে পারছিস।”
“এই কি হবে ভাবতে পারছিস!”
সে গর্জে উঠে এক ঝটকায় আগন্তুকের টুটি চেপে, মাথা চুবিয়ে দিল ঠান্ডা বরফ মেশানো জলে। পানিতে বুদবুদের গলগল শব্দ শুরু হতেই, জেইন উন্মত্তের মতো পানির নিচে চাপ দিতে লাগলো। আগন্তক ছটফট করতে শুরু করল।জেইন অপেক্ষা করলো যতক্ষণ আগন্তুকের শরীর নিস্তেজ হতে শুরু করেছে। যখন আগন্তুকের শরীরে মৃদু ঝাঁকুনি ছাড়া আর কিছু বাকি নেই, জেইন বের করলো তার মুখটা। আগন্তুক মুখ হা করে নিঃশ্বাস নিতে লাগলো।
“কিরে রে, কেমন লাগছে বল? কষ্ট হচ্ছে না? শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে? আমারও হয়েছিল, যখন জানতে পেরেছিলাম আমার ফায়ারফ্লাই বিপদে আছে, অথচ আমি তার পাশে নেই! কষ্ট হয়েছিল যখন জানতে পেরেছিলাম আমি ছাড়া অন্য কেউ ও’কে স্পর্শ করেছে। এখনো হচ্ছে জানিস? প্রচুর কষ্ট হচ্ছে। কিভাবে কমাবো এই কষ্ট বল তো? কিভাবে?”

একটা হিংস্র জন্তুর মতো গর্জন,
“এই বল কিভাবে?”
বzzzzজ!—তীব্র বৈদ্যুতিক ঝাঁকুনি সরাসরি মস্তিষ্ককে আঘাত করলো। আগন্তুকের শরীর চেয়ারের সাথে বেঁধেও ধনুকের মতো বেঁকে উঠলো। মুখ দিয়ে ফেনা বেরিয়ে এলো। জেইনের হাতে একটা ইলেকট্রিক ডিভাইস; যা সে সরাসরি ক্ষতস্থানে চেপে ধরেছে। পুড়ে যাওয়া চামড়ার উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে।
জেইন তাচ্ছিল্যে ঠোঁট বাঁকিয়ে সামান্য হাসলো। পরক্ষণেই এক তীক্ষ্ণ চিৎকারে ফেটে পড়লো সেই হাসি,
“এই জানোয়ারের বাচ্চা!! এই!! চিৎকার করছিস না কেন? কেন বল? আমি কি তোকে খুব কম টর্চার করে ফেললাম? এই তুই চিৎকার কর তোর চিৎকারের শব্দ শুনতে চাই আমি। চিৎকার কর!!! চিৎকার কর কুত্তার বাচ্চা!!!”

আগন্তুকের এক চোখ বন্ধ। সে আহত অবস্থায় রক্তাক্ত দাঁত বের করে কিটকিটিয়ে বিশ্রী ভাবে হেসে উঠলো—যেন এই চূড়ান্ত যন্ত্রণাতেও সে জেইনকে উপহাস করছে।
সেই হাসিতে জেইনের শরীর যেন আগুনের ফুলকির মতো জ্বলে উঠলো। সে হাতে তুলে নিল একটি সার্জিক্যাল ব্লেড।‌ তারপর কোনো ইঙ্গিত ছাড়াই আগন্তুকের কাঁটা হাতটা টেনে ধরে ‘সিপপ’—এক টানে কব্জি থেকে কনুই পর্যন্ত চামড়া গভীর ভাবে চিরে দিলো।
আগন্তুক দাঁত খিঁচে রইলো। যন্ত্রণায় মুখ নীল হয়ে যাচ্ছে। জেইন সামান্য মুখ বাঁকিয়ে শয়তানি হাসলো। ভেতরের স্নায়ু এবং রগ ছিঁড়ে যাওয়ার বীভৎস শব্দ!
আগন্তুকের কণ্ঠনালী ফেটে গেল এক অমানুষিক, শেষ চিৎকারে! তার শরীর ঢলে পড়ল। জেইন কসাইয়ের মতো কাঁটা জায়গায় চামড়া টেনে তুলে নিল। তারপর সেখানে লাগিয়ে দিল হাইড্রোক্লোরিক এসিড। চামড়ার নিচের মাংসপেশিগুলো অ্যাসিডের সংস্পর্শে আসতেই গলে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করলো।
জেইন সেই বিকৃত আর্তনাদের মধ্যে চোখ বুজে প্রশান্তিতে ডুব দিলো।আগন্তুকের সেই বীভৎস চিৎকার যেন তাকে পরম শান্তি দিচ্ছে।

“এ’জে অনেক হয়েছে এবার ছাড়!”
পাশ থেকে ইয়াশের বিরক্ত কন্ঠস্বর। জেইনের মুখের চারপাশে রক্তের ছিটা।সে ক্ষিপ্র গতিতে এক হাতে ইয়াশের ছুঁড়ে দিল, ধারালো কুঠারটা। ইয়াশ ভড়কে গিয়ে কোনোমতে ক্যাঁচ করে থামালো সেটা। আচমকা এমনটা হওয়ায় বুক কাঁপছে অস্বাভাবিকভাবে। ইয়াশ কিছু বলতে নিলেই জেইন গর্জে উঠে বললো,
“কিল দ্যাট বা*স্টার্ড।”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৪৯

ইয়াশ কিছু বুঝতে না পেরে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। সে এতবছর জেইনের সাথে থেকেছে, কাজ করেছে ঠিক কিন্তু কখনো কাউকে খুন করে হাত রক্তাক্ত করে নি। তার বিস্ময় ভাবকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়ে জেইন আগন্তুকের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকালো, তারপর সেই হিমশীতল, মারাত্মক সত্যি কথাগুলো বলল,
“This Leonardo….. He is your sister’s rapist and murderer……..”

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫১