Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী শেষ পর্ব

প্রাণসঞ্জীবনী শেষ পর্ব

প্রাণসঞ্জীবনী শেষ পর্ব
রাত্রি মনি

“যদি কখনো তোমাকেও হারিয়ে ফেলি… তাহলে আমি আর বাঁচব না। মরে যাবো।সত্যিই মরে যাবো!……..”
‘মরে যাবো’— শব্দটা জেইনের মস্তিষ্কের কোনো এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তপ্ত শিসার মতো বিঁধল। মুহূর্তেই তার শান্ত চেহারায় এক পৈশাচিক হিংস্রতা ভর করল। চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। দুচোখে ফুটে উঠল দাবানলের মতো রক্তাক্ত আভা।রিমের শ্বাস নেওয়ার পথ মুহূর্তেই অবরুদ্ধ হয়ে এল। কাঁশতে কাঁশতে দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সে এক বিন্দু বাতাসের জন্য হাহাকার করে উঠল। তার চোখ দুটো যন্ত্রণায় বড় বড় হয়ে যাচ্ছে, মুখটা অক্সিজেনের অভাবে মুহূর্তেই কালচে-বেগুনি বর্ণ ধারণ করল।
জেইন কোনো বিচার-বুদ্ধি ছাড়াই এক ক্ষুধার্ত নেকড়ের মতো গর্জে উঠে রিমের নমনীয় গলাটা নিজের লোহার মতো শক্ত এক হাতের মুঠোয় পিষে ধরেছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে, বন্য পশুর মতো ভারী নিঃশ্বাস ছেড়ে ফোঁস ফোঁস শব্দ করে হিসহিসিয়ে বললো,

“বারবার মরার কথা কেন বলিস, হ্যাঁ? কতবার বলেছি এই শব্দটা ওই মুখে আর কখনো উচ্চারণ করবি না! বলিনি তোকে!!!?”
হাতের চাপ আরো বাড়ল।রিমের গলায় লালচে ছাপ ফুটে উঠছে, চোখ-মুখ টকটকে লাল। সে কথা বলতে চাইছে—কিন্তু শব্দ বেরোচ্ছে না। শুধু নিঃশব্দ আর্তনাদ।
“আমার কথা কানে যায় না তোরররর???”
জেইনের চোখ দুটো সরু হয়ে এলো।
“আমি কি বলেছি ছেড়ে দেবো তোকে? তাহলে কিসের এতো ভয় তোর? কি মনে হয়, তুই মরে গেলে আমি বাঁচবো?
সে ঝুঁকে রিমের মুখের আরো কাছে এলো।

“মরার খুব শখ না?”
তার মুখে ভয়ংকর উন্মাদনা, ঠিক যেন বিকারগ্রস্ত পশু! হাতের শিরা ফুলে উঠেছে।
“ঠিক আছে। নিজের হাতেই মারবো তোকে!! তারপর তোর কবরের উপর নিজের সমাধি বানাবো।”
তার কন্ঠ নিচু ভয়ংকর ঠান্ডা,
“তখন’ই শান্তি পাবি তুই।”
চোখের জলে রিমের গাল ভিজে একাকার। তার গোঙানি জেইনের কানে পৌঁছাচ্ছে না, সে তখন এক অন্ধ উন্মাদনায় আচ্ছন্ন। রিমের চোখের জল তাকে আরও বেশি হিংস্র করে তুললো। সে রিমের একদম চোখের সামনে মুখ নিয়ে ক্ষুধার্ত জন্তুর মতো গর্জন করে উঠলো,
“এই তুই কাঁদছিস কেন হ্যাঁ?!!তোকে কাঁদতে মানা করেছি না আমি!”
হাতের চাপ আরো দৃঢ়।

“কাঁদবি না। একদম কাঁদবি না।”
চোখে আগুন।
“এই অধিকার আমি দিইনি তোকে! চুপ! একদম চুপ! আর একবারও তোর কান্নার শব্দ শুনতে চাই না আমি। সত্যিই জানে মেরে দেবো কিন্তু!”
রিমের চোখে অন্ধকার নামছে।
“মেরে দেই তোকে? মেরে দেই? দেব জানে মেরে, হ্যাঁ?”
সে একটু থামল।তারপর হিংস্র চিৎকার,
“কথা বললল!!!!! কথা বল— বান্দির বাচ্চাআ!!!!!”

রিমের শরীরটা ধীরে ধীরে অবশ হয়ে এল। তার দুহাত জেইনের কবজি থেকে খসে পড়ল। তার চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, জেইনের হিংস্র চেহারাটা তার কাছে এখন ঝাপসা অবয়ব।সে কিছু বলতে চাইছে কিন্তু পারছে না। মুখ দিয়ে বারবার গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে।তার প্রাণপাখিটা খাঁচা ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ছটফট করছে।শ্বাসরুদ্ধ গলায় ফিসফিসে শব্দগুলো ভেঙে ভেঙে বেরিয়ে এলো,
“আ–রাত–ত্র… আ–মা–র… আ-আমাকেহ্… আমার কষ্টহ্ হচ্ছে.. আরাত্র..। হ্আমি.. আমি নিঃশ্বাসস্…”
বাকিটুকু আর বেরোল না। চোখ ধীরে ধীরে বুজে আসছে। চারপাশ কালো হয়ে যাচ্ছে।ঠিক সেই মুহূর্তে—জেইনের ভেতরটা কেঁপে উঠল।সে যেন এক অন্ধকার জগত থেকে বাস্তবে ফিরে এলো। তৎক্ষণাৎ ঢিলে হয়ে এলো হাতের বাঁধন।রিমের নিস্তেজ শরীরটা মুহূর্তেই লুটিয়ে পড়ল জেইনের ভেজা বুকের ওপর।
“ফায়ারফ্লাই…!”

জেইন শক্ত করে দু’হাতে আগলে নিল তাকে। বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করছে আতঙ্কে। চোখ পড়ল রিমের গলায়—নিজের আঙুলের ছাপ! লালচে দাগের ভেতর রক্ত জমাট বেঁধে আছে। জেইনের ভেতরটা শিউরে উঠলো। এইটা… সে করেছে? জেইনের হাত কাঁপতে লাগল। আলতো করে রিমের গালে হাত রাখল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উন্মাদনা—ভয়ে যেন পাগলের মতো চিৎকার করছে। সে এতক্ষণ কী করছিল?—নিজেও জানে না!
“সোনা……”
কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে। অদ্ভুত মোলায়েম।
“এই সোওনা… জাআনন… কথা বলো সোনা… ফায়ারফ্লাই, বার্বিডল, হেই ওয়াইল্ড ক্যাট, আমার লিটেল রেবিট, আমার ছোট্ট পেঙ্গুইন….”
রিম নিঃশব্দ।
“চোখ খোলো সোনা…..। কলিজা একবার চোখ খুলে তাকাও আমার দিকে। প্লিজ সোওনা।”
তার গলা আটকে এলো।
“আমার কষ্ট হচ্ছে তো।”
সে রিমের কপালে কপাল ঠেকিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“আমি আমার কক্ষনো আঘাত করবো না তোমায়। কষ্টও পেতে দেবো না। একটুও না। তবুও… শুধু একবার…”
রিমের কোনো সাড়া শব্দ নেই। জেইনের মাথার ভেতর হঠাৎ শূন্যতা নেমে এলো।রিমের নাসিকার কাছে আঙুল নিতেই দেখল নিঃশ্বাস অতি ক্ষীণ।
তার ভয় এবার পাগলামিতে রূপ নিল। সে মরিয়া হয়ে রিমের ঠোঁটের ওপর নিজের ঠোঁট চেপে ধরল।নিজের ফুসফুসের সমস্ত বাতাস রিমের ভেতরে ঢেলে দিতে লাগল। একবার, দুবার, তিনবার…। প্রতিবার বুকের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু দম আসছে না। সে আরো বেশি উন্মাদ হয়ে উঠলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে বড়বড় করে নিঃশ্বাস দিতে লাগল।

একসময় হঠাৎ রিমের শরীরটা এক ঝটকায় কেঁপে উঠল। জেইনের মুখের ভেতর এক রাশ তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে দিয়ে চোখ মেলল রিম। বড় বড় করে হাপাতে হাপাতে বাতাস টানছে। প্রাণ ফিরে পাওয়ার তীব্র লড়াইয়ে রিম হাঁসফাঁস করতে লাগল।জেইন সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁট ছাড়িয়ে নিল। শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল—যেন বহু সাধনার পর নিজের তপস্যার ফল ফিরে পেয়েছে।
রিম ফুঁপিয়ে কাঁদছে।জেইনের বুক ভিজে যাচ্ছে তার অশ্রুতে।হেঁচকি উঠছে একটু পর পর।জেইন তার চোখের জল মুছিয়ে কপালে একটা গাঢ়, কাঁপা চুমু বসাল। আবার শক্ত করে আগলে ধরল।
“আমি সরি, সরি সোনা। আমি জেনে বুঝে কষ্ট দিতে চাইনি তোমায়।”
সে চোখ বন্ধ করে ফিসফিস করে বলল,

“আমি যে, তোমার মুখে মৃত্যুর কথা সহ্য করতে পারি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। তুমি মরে গেলে আমি কিভাবে বাঁচবো বলোতো! আর কক্ষনো মরার কথা বলবে তুমি। তোমার মৃত্যুর ভার সইবার ক্ষমতা আমার নেই। প্রয়োজনে নিজের সবটুকু আয়ু দিয়ে দেবো তোমায়। নিজের শরীরের শেষ রক্ত বিন্দু দিয়ে হলেও রক্ষা করব, তবুও মরে যাওয়া কথা বলবে না কখনো।”
কান্নার দমকে রিমের শরীরটা একটু একটু করে কেঁপে কেঁপে উঠছে। সে বুঝতে পারছে জেইনের ভালোবাসা সাধারণ নয়। এটা যতটাই গভীর ততটাই বিষাক্ত। এমন এক মায়াজাল যেখান থেকে আজীবন মুক্তি নেই তার। রিম হেঁচকি তুলছে। নাক টেনে ঠোঁট ফুলিয়ে বাচ্চামো গলায় বলে,
“তুমি বলেছিলে… আর কখওনো, মারবে না আমায়।”
তার কথা গুলো যেন গলাতেই আটকে যাচ্ছে।
“তাহলে মারলে কেন? খুব পঁচা তুমি। খুব,খুব,খুউউব।”

“কিন্তু এই পঁচা লোকটা যে শুধুই তোমার। যার ওপর মহাবিশ্বের আর কারোর কোনো অধিকার নেই।কারোর না!”
কথাটা শেষ হতেই রিম আচমকাই ঝুঁকে এসে বাঘিনীর মতো হিংস্র কামড় বসিয়ে দিল জেইনের ঘাড়ে।জেইনের শরীর এক ঝটকায় শক্ত হয়ে গেল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বন্ধ করে রাখল। কিন্তু মুখে ব্যথার বিন্দুমাত্র ছাপ নেই।রিম তাকে ছাড়ছেই না। যেন ভ্যাম্পায়ারের মতো রক্ত চু’ষে খাবে। একসময় তার ভেতরের আগ্নেয়গিরিটা ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে এলো।নিজের ছোট, ধারালো দাঁতগুলো সে আস্তে করে সরিয়ে নিল জেইনের ঘাড় থেকে। তারপর ক্লান্তভাবে মাথা এলিয়ে দিল সেখানেই।জেইন তাকে আলতো করে নিজের দিকে টেনে নিল। রিমের ছোট্ট গোল গাল, লাল হয়ে আসা মুখশ্রীটা দু’হাতের তালুর মাঝে ধরে রাখল। আঙুলের ডগা দিয়ে রিমের গলার লালচে দাগ ছুঁয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“খুব ব্যথা করছে, সোনা? দাঁড়াও আমি এক্ষুনি কমিয়ে দিচ্ছি তোমার সব ব্যথা।”
জেইন উন্মাদের মতো রিমের গলার লাল দাগে ঠোঁট বসিয়ে শব্দ করে চুমু খেতে শুরু করে। চুমুতে চুমুতে ভরিয়ে দেয় রিমের গলা।লালায় ভিজে লিকলিকে হয়ে যায়।রিমের নিঃশ্বাস ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে। বুকটা ওঠানামা করতে থাকে। সে অনিচ্ছায় জেইনের চুলে আঙুল জড়িয়ে ধরে, শক্ত করে মুঠোয় আঁকড়ে।জেইন একটু থেমে মুখ তুলে তাকায় তার দিকে।রিমের চোখ বন্ধ। পাতাগুলো কাঁপছে। কিছুক্ষণ জেইনের স্পর্শ অনুভব করতে না পেরে সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায়—আর ঠিক তখনই দুজনের দৃষ্টি মিলে যায় এক বিন্দুতে। এক মুহূর্তের নীরবতা।………….

রিম শুষ্ক ঢোক গিলে ফেলে। নিজের অবস্থানটা তখন তার মনে পড়ে যায়।সে ভুলেই গিয়েছিল তার বর্তমান অনাবৃত অবস্থার কথা। রিমের ফর্সা গাল দুটো মুহূর্তেই রক্তিম আভায় ছেয়ে গেল। সে লজ্জা আর আড়ষ্টতায় নিজের দৃষ্টি নামিয়ে নিতে চাইল। জেইন বুঝতে পারছে রিমের লজ্জার কারণ। সে ঠোঁট কামড়ে ক্রুর হাসলো।যে মেয়ে কাল স্বেচ্ছায় তার সামনে নিজেকে মেলে ধরেছিল, আজ সে-ই আবার লজ্জায় গুটিয়ে যাচ্ছে।জেইন আলতো করে রিমকে ঘুরিয়ে নিজের কোলের ওপর বসিয়ে দেয়। তার পিঠ এসে ঠেকে জেইনের বলিষ্ঠ বুকে। বুকের উষ্ণতা, হৃদস্পন্দনের শব্দ—সব মিলিয়ে রিমের নিঃশ্বাস অজান্তেই ভারী হয়ে আসে।
জেইন পকেট থেকে ধীরে একটি ব্রেসলেট বের করে। সরাসরি পরিয়ে দেয় রিমের হাতে‌।ফর্সা কবজিতে সোনালি সরু ব্রেসলেটটা ঝলমল করে ওঠে।রিম চমকে উঠল—এটা তো তার সেই পুরনো ব্রেসলেট! কিন্তু এখন তা নতুনের মতো উজ্জ্বল। সে উচ্ছ্বাসিত কন্ঠে বলে ওঠে,

“এটাতো…”
বাক্য শেষ হয় না।তার চোখ আটকে যায় জেইনের হাতে। একই রকম আরো একটি জেন্টস ব্রেসলেট! জেইন সেটা কাছে আনতেই দুটো ব্রেসলেট চুম্বকের মতো মিশে যায় একেঅপরের সাথে—তৈরি হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ‘লাভ শেপ’।রিমের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই মৃদু হাসি ফুটে ওঠে।জেইন রিমের সাজানো হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে শব্দ করে একটি ভেজা চুমু এঁকে দেয়।রিমের শরীরটা শিরশির করে ওঠে। এক অদ্ভুত উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে ভেতরে।জেইনের চোখে তখন দহনকারী নেশা, যেন এক তৃষ্ণার্ত মরুভূমি এক বিন্দু জলের প্রতীক্ষায়। রিম বুঝতে পারছে এই মুহূর্তে জেইনের কি চাই। সে শুষ্ক ঢোক গিলে ফিসফিস করে বললো,
“আ-আরাত্র…. আমি তোমাকে…. কিছু বলতে চাই।”
জেইন তীব্র নেশাগ্ৰস্থ পুরুষের মতো। রিমের কাঁপা ঠোঁটে আঙুল ছুঁয়ে আঠালো গলায় ফিসফিস করে বললো,
“শুহহহ্…. কোনো কথা নয়।জাস্ট ফিল দিস মোমেন্ট।”
জেইনের ছোঁয়া, তার মাদকের মতো কন্ঠস্বর! রিমের নিঃশ্বাস ক্রমেই ভারী হয়ে উঠছে। সে ফিসফিস করে থেমে থেমে বললো,

“বাট…. আই হ্যাভ আ সারপ্রাইজ ফর ইউ। আ স্পেশাল গিফ্ট…..”
জেইন রিমের চোখে চোখ রেখে মৃদু স্বরে বলল,
“আর কোনো গিফ্ট চাই না আমার। আমার জীবনে সৃষ্টিকর্তার দেয়া একমাত্র শ্রেষ্ঠ উপহার তুমি।”
জেইনের প্রতিটি শব্দ রিমের হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানিকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। রিম আবার কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট জোড়া ফাঁক করতেই জেইন আর কোনো সুযোগ দিল না। তার পাতলা ফিনফিনে সিক্ত ঠোঁটজোড়া দিয়ে আঁকড়ে ধরলো রিমের তুলতুলে অধর। বিস্ময়ে রিমের চোখ বড়বড় হয়ে গেল। কিন্তু পরক্ষণেই জেইনের ঠোঁটের গভীর স্পর্শে ধীরে ধীরে আবেশেই বুজে এলো চোখের পাতা। এক হাত চেপে বসলো জেইনের সিল্কি চুলে। রিম দিশেহারা।চারপাশের জগত যেন এক নিমেষে ফিকে হয়ে এল, তাঁবুর বাইরের বাতাসও যেন থমকে দাঁড়াল তাদের এই মিলন দেখতে।

জেইন পরম তৃপ্তির সাথে রিমের ঠোঁটের সুধা পান করতে লাগল। অত্যন্ত ধীরগতিতে, কখনো ওপরের ঠোঁট, কখনো নিচের ঠোঁট—কখনো টেনে নিচ্ছে নিজের মুখের গভীরে। জেইনের জিভের প্রতিটি মন্থর ছোঁয়ায় রিম শিরশির করে কেঁপে উঠছিল। পায়ের পাতা কুঁচকে যাচ্ছে এক অজানা স্বর্গীয় সুখে। জেইনের অবাধ্য হাতের চাপ জোড়ালো হচ্ছে। রিমের মুখ থেকে বেরিয়ে আসছে গোঙানির মৃদু শব্দ। চোখে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয়। হঠাৎ মুখে নোনতা স্বাদ অনুভব হতেই ঘোর কাটে জেইনের। ধীরে ধীরে মুক্ত করে দেয় রিমের নেশালো ঠোঁট।কপালে কপাল ঠেকিয়ে রাখে।দু’জনেই হাঁপাচ্ছে—লম্বা লম্বা নিঃশ্বাসে।তপ্ত শ্বাস আছড়ে পড়ছে একে অপরের মুখে। রিমের গোলাপি ঠোঁটজোড়া আঙুরের মতো ফুলে আছে ।টকটকে জবার মতো লাল।সে আধো-বোজা চোখে জেইনের দিকে তাকাল।ঠোঁটের কোণে তার কামড়ে দেওয়া রক্তের লাল দাগ জ্বলজ্বল করছে। জেইন রিমের টালমাটাল অবস্থা দেখে মৃদু হাসলো। হালকা নিঃশ্বাস ছেড়ে মাদকের চেয়েও গাঢ় কন্ঠে ফিসফিস করে বললো,

“উমমম্ মজা… তুমি খুব মিষ্টি। ইচ্ছে করে সারাদিন শুধু চে*টে খা….”
তাৎক্ষণিক লজ্জায় আর অস্বস্তিতে রিমের কাঁপা হাত চেপে ধরল জেইনের মুখ। জেইন নিজের হাতের মুঠোয় রিমের নরম আঙুলগুলো বন্দি করে নিল।রিমের মাঝের আঙুলে থাকা ছোট্ট কালো তিলটায় নিজের উষ্ণ ওষ্ঠের মখমলি ছোঁয়া দিল। তারপর ধীরে ধীরে, তার নাক দিয়ে রিমের হাতের মসৃণ ত্বকের ওপর স্লাইড করে সাপের মতো বেয়ে উঠে আসতে লাগল ওপরে।
কুনুইয়ের ভাঁজে থাকা সেই ছোট্ট তিলটায় ঠোঁট ছোঁয়াতেই রিমের সারা শরীরে এক রেশমি শিহরণ বয়ে গেল। জেইন ধীরে ধীরে আরও ওপরে উঠে এলো।ঘাড়ের পেছনে থাকা তিলে ঠোঁট ভুবিয়ে গাঢ় তপ্ত চুমু এঁকে দিল। রিমের দীর্ঘ উন্মুক্ত পিঠের প্রতিটি ভাঁজে নিজের ঠোঁটের আল্পনা আঁকতে আঁকতে সে নিচের দিকে নেমে এলো। বাম পাশে থাকা তিলটায় এসে থমকে দাঁড়াল। পরম তৃপ্তির সাথে নিজের ঠোঁট চেপে ধরল সেখানে। রিম এক নিমেষে চোখ বুজে নিজের নিঃশ্বাস আটকে ফেলল—সে যেন এক ঘোরের জগতে তলিয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ এক হেঁচকায় জেইন রিমকে ঘুরিয়ে নিজের মুখোমুখি করে নিল।তার তৃষ্ণার্ত নজর গিয়ে স্থির হলো রিমের কলার বোনের ওপর থাকা সেই কুচকুচে কালো তিলটায়।এই তিলটাই তার সবচেয়ে প্রিয় , তবে তার নিষিদ্ধ আকর্ষণ হলো রিমের ঠোঁটের নিচের সেই মায়াবী তিল। জেইন আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না; সে তৃষ্ণার্তের মতো মুখ ডুবিয়ে দিলো রিমের কলার বোনের ওপর।রিম শিউরে উঠলো ।জেইনকে আরও নিবিড়ভাবে পিষে ধরলো নিজের সাথে। জেইনের সোহাগ মাখা স্পর্শে রিম এক গভীর ঘোরের অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তীব্র নেশায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে জেইন। হঠাৎই নিজের ধারালো দাঁতে এক তীক্ষ্ণ কামড় বসিয়ে দিল সেখানে। রিম শিউরে উঠলো। যন্ত্রণায় আর এক অজানা সুখে কুঁচকে গেল। তার নিঃশ্বাস ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে, হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি কান ফাটানো শব্দে বাজছে। মুখ ফুটে কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু শব্দ গুলো যেন গলাতেই আটকে যাচ্ছে। সে কোনোমতে কাঁপা ঠোঁটে ফিসফিস করল,

“এ-এসব কি করছো?….”
জেইন সেই সুতীব্র ঘোরের মাঝেই রিমের উষ্ণ ত্বকে নিজের ঠোঁট ঘষতে ঘষতে ফিসফিসিয়ে বলে,
“মালিকানা এঁকে দিচ্ছি। এখন থেকে তোমার শরীরের প্রত্যেকটা তিল শুধু আমার নামে লেখা থাকবে।”
তাঁবুর ভেতরের মায়াবী পরিবেশটা তখন এক অনন্য মাদকতায় আচ্ছন্ন।রিমের শুভ্র, নমনীয় শরীরটা তাঁবুর সেই তুলতুলে নরম বিছানায় এলিয়ে আছে। জেইন কথার মাঝেই তাকে শুইয়ে দিয়েছে সেখানে। নিজে রিমের ঠিক ওপরে বসে,দুই উরুর মাঝে তাকে বন্দি করে এক নেশাতুর তৃষ্ণা নিয়ে তাকিয়ে আছে। তার হাতের আঙুল গুলো অনেক আগেই চলে গেছে নিজের ভেজা শার্টের বোতাম গুলোর ওপর‌। ধীরে ধীরে একটা একটা করে খুলতে শুরু করেছে সবগুলো বোতাম।তার আঙুলের প্রতিটি চলনে রিমের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে। জেইনের নেশাক্ত দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে রিমের স্ফটিক স্বচ্ছ শরীরের ওপর। রিমের ন*গ্ন ব*ক্ষ দ্রুত ওঠানামা করছে, লজ্জায় আর এক অজানা আকাঙ্ক্ষায়। সে বুঝতে পারছে সামনে তার সাথে ঠিক কি হতে চলেছে। জেইন শার্টটা খুলে ছুড়ে ফেললো দুরে। তার পেশিবহুল, তপ্ত শরীরটা এখন রিমের খুব কাছে।সে চোখের পলকে ঝুঁকে এলো রিমের ছোট্ট শরীরের ওপর। নিজের বিশালাকৃতির শরীরের সম্পূর্ণ ভর ছেড়ে দিল রিমের ওপর। যেন এক বিশাল ছায়া তাকে আগলে নিয়েছে। রিম হাঁসফাঁস করতে লাগলো। নিঃশ্বাস আটকে যাচ্ছে বুকের ভেতর।তার কণ্ঠনালীতে যেন শব্দগুলো আটকে যাচ্ছে। সে জেইনের প্রশস্ত কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করলো,

“আরাত্র… আ-আগে আমার কথাটা একবার শো-শোন্….”
জেইন আর কোনো বাক্য শোনার ধৈর্য হারিয়েছে। সে রিমের লাল হয়ে থাকা ফোলা ঠোঁটজোড়ায় শব্দ করে একটা গাঢ় চুমু খেয়ে নিল। তার সেই স্পর্শে রিমের সারা শরীর মুহূর্তেই অবশ হয়ে এল, কথা বলার শক্তিটুকু যেন বিলীন হয়ে গেল কোনো এক মায়াবী কুয়াশায়।জেইন তার বুড়ো আঙুল দিয়ে রিমের কাঁপতে থাকা ঠোঁটে আলতো করে স্লাইড করতে লাগল। নেশার ঘোরে রিমের চোখ বুজে এলো। জেইন গাঢ় নেশাতুর কন্ঠে ফিসফিস করে বলল,
“শুহ্হ্হ্…. এখন না সোনা… তোমার সব কথা শুনব। কিন্তু পরে। এখন সব ভুলে শুধু আমার দিকে ফোকাস করো। জাস্ট কো-অপারেট উইথ মি ওকেই।”

রিম আর চোখ মেলে তাকাতে পারল না। তার বুকটা তখন খুব দ্রুত ওঠানামা করছে। জেইনের তপ্ত নিঃশ্বাস আগুনের হলকার মতো আছড়ে পড়ছে তার মুখে। জেইনের সেই মাদকের মতো কণ্ঠস্বর রিমকে এক অলীক ঘোরের জগতে নিয়ে গেল। রিম নিজের অজান্তেই নিজেকে সম্পূর্ণ সঁপে দিল সেই পুরুষটির কাছে, যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। চোখের কোণ বেয়ে গড়িয়ে পড়লো একফোঁটা সুখের নোনা জল।
তার মনের গহীন থেকে তখন হাওয়ায় ভেসে এলো এক আবেশী সুর,
~”তুমি যদি আমাকে, কাছে এসে ভালোবাসো….
কি জানি হয় হৃদয়ে… কি করে বোঝাবো?…..🎶

তাঁবুর ভেতরে মোমবাতির শিখাগুলো তখনো থরথর করে কাঁপছিল, যেন তারাও এই প্রেমের তীব্রতায় লজ্জিত। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক যেন এক মোহময়ী সুর সৃষ্টি করেছে—দুই হৃদয়ের এই নিঃশব্দ মিলনের অপেক্ষায়।
জেইন ধীরে ধীরে রিমের শরীরজুড়ে নিজের ওষ্ঠের স্পর্শ রেখে যায়। এক গভীর ছাপ।প্রতিটি তিল, প্রতিটি নমনীয় ভাঁজ।রিম যেন এক অতীন্দ্রিয় সুখের সাগরে ভেসে যাচ্ছে; জেইনের ঠোঁটের তপ্ত ছোঁয়া আর হাতের অবাধ্য স্পর্শে সে সম্পূর্ণ দিশেহারা। জেইন রিমকে নিজের সাথে সম্পূর্ণ মিশিয়ে নিল। নিজের বলিষ্ঠ চওড়া বুকের সাথে পিষে নিলো তাকে। রিমের এক হাত পেঁচিয়ে গেল জেইনের সিল্কি চুলে। আরেক হাতে নখের আঁচর কেটে চলেছে পিঠে।রিমের মনে হচ্ছে সে যেন এক বিশাল নিরাপদ আশ্রয়ে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।রাত যত গভীর হচ্ছে, তাঁবুর ভেতরের নিস্তব্ধতা তত বেশি প্রখর হচ্ছে। শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। আর মাঝে মাঝে অজান্তেই রিমের ঠোঁটের ফাঁক থেকে বেরিয়ে আসে মৃদু গোঙানির আওয়াজ।যাতে মিশে আছে কিছুটা মধুমাখা যন্ত্রণা আর এক অবর্ণনীয় সুখের আবেশ।
জেইনের দহনকারী পৌরুষ আর রিমের নারীত্বের পূর্ণ সমর্পণ মিলে একাকার হয়ে গেল তাঁবুর সেই নিভৃত অন্ধকারে। বাইরের জগতের সব শব্দ স্তব্ধ হয়ে গেল, কেবল রয়ে গেল তাদের দুই হৃদয়ের উন্মাতাল ধুকপুকানি আর এক রুদ্ধশ্বাস মিলনের শব্দ।

বাইরে তখন অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকার। ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাপিয়ে ল্যাবের ভেতর থেকে ভেসে আসছিল এক অদ্ভুত রাসায়নিকের কটু গন্ধ। বিশাল সেই ল্যাবে মোমবাতির টিমটিমে আলোয় একা বসে আসে আলেসান্দ্রো! তাঁর ঠিক সামনেই একটি কাঁচের আধারে শুইয়ে রাখা এক তরুণীর দেহ।দীর্ঘ সাত বছর কেটে গেছে। আজও একই ভাবে শুয়ে আছে তরুণীটি। মনে হয়, এই বুঝি মেয়েটি গভীর ঘুম থেকে জেগে উঠবে।
‘ক্রায়ো-জেনিক ফরমালিন’ (Cryo-genic Formalin)। আলেসান্দ্রোর নিজের আবিষ্কৃত এক বিস্ময়।এটি সাধারণ কোনো সংরক্ষক নয়; এটি মূলত ফরমালডিহাইড এবং এক বিশেষ ধরণের অ্যান্টি-ফ্রিজ প্রোটিনের জটিল মিশ্রণ, যা কোষের ভেতরের জলীয় অংশকে বরফ হতে দেয় না, বরং এক ধরণের স্বচ্ছ কাঁচে পরিণত করে। এই অদ্ভুত রাসায়নিক মিশ্রণের কল্যাণে মৃতদেহের চামড়ায় কখনো পচন ধরে না, হারায় না শরীরের স্বাভাবিক নমনীয়তাও।
এই ক্যামিক্যালের মাধ্যমেই আলেসান্দ্রো সংরক্ষণ করে রেখেছে মেয়েটিকে। আলেসান্দ্রো মেয়েটির সামনে ঝুঁকে এসে ফিসফিস করলো,

“আর মাত্র কয়েকটা দিন। তারপর আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে তুমি। আগের মতো হাসবে, খেলবে… আমার হাত ধরে হাঁটবে। আমরা আবার আগের মতই একসাথে থাকবো, এক হয়ে।”
ঠিক তখুনি! পিঠের ওপর কারো হিমশীতল হাতের স্পর্শ পেয়ে আতঙ্কে চিৎকার করতে গিয়েও থেমে গেল সুজি। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই দেখতে পেল সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তার সহকারী লিয়ারা।লিয়ারা চোখ বড় বড় করে সুজির মুখ চেপে ধরল।

এতক্ষণ যাবত দরজার ফুটো দিয়ে সম্পূর্ণ দৃশ্যটি দেখছিল সুজি। সে পাথরের মতো জমে গিয়েছিল। আর সেই মুহূর্তেই তার পেছনে ছায়ার মতো এসে দাঁড়ায় লিয়ারা। তারা বহু বছর যাবত এখানে কাজ করছে। কিন্তু কখনো এইদিটায় কাউকে আসতে দেয়া হয়নি।লিয়ারা ফিসফিস করে বলল,
“তুমি এখানে কী করছো? জানো না এই রুমে আসা নিষেধ? একবার যদি স্যার জানতে পারেন, তবে আমাদের কাউকেই আস্ত রাখবেন না! স্যার দেখে ফেলার আগে তাড়াতাড়ি চলো এখান থেকে।”
সুজি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে টলতে টলতে লিয়ারার সাথে অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে স্টোর রুমে এসে দাঁড়াল। হাঁপাচ্ছে সুজি,

“কিন্তু… ঐ রুমে কে যেন আছে! স্যার কার সাথে যেন বিড়বিড় করে কথা বলছিলেন। একটা মেয়ে… মনে হচ্ছিল দেহে কোনো প্রাণ নেই। একদম নির্জীব, পাংশুটে সাদা! এটা কি স্যারের নতুন কোনো এক্সপেরিমেন্টের অংশ?”
লিয়ারা সুজির কাঁধ শক্ত করে ধরে ঝাঁকুনি দিল। তার চোখেমুখে তখন রাজ্যের আতঙ্ক। সে হিসহিস করে বলল,
“চুপ করো! আজকে এই কথা ভুল করে মুখে এনেছো ঠিক আছে, কিন্তু এরপর আর ভুলেও কখনো এসব কথা উচ্চারণ করবে না। কারোর সামনে না!”
সুজি কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল,
“কিন্তু কেন?”
লিয়ারা অন্ধকার করিডোরের দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় জবাব দিল,
“প্রাণে বাঁচার জন্য।”

বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে আলতো করে রিমের চোখে-মুখে ছুঁয়ে যেতেই তন্দ্রা ছুটে গেল তার। ধীরে চোখ মেলে নিজেকে আবিষ্কার করল নরম মখমলে ঢাকা বিছানায়। শরীরজুড়ে অদ্ভুত এক শান্ত, মিষ্টি আবেশ—যেন ঘুমের ভেতরেও সেই নেশালো স্পর্শ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে।তার গায়ে লেগে আছে সেই চিরচেনা পুরুষালী সুবাস।এক মুহূর্তেই লজ্জায় ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
ঘুমঘুম চোখে উঠে বসতেই খেয়াল হলো—এ তো তার পুরনো ঘর! সেই ঘর, যেখানে সে প্রথম থেকেই থাকত। সামান্য অবাক হলো সে। এখানে এল কীভাবে? ভোরের আগ মুহূর্তে ক্লান্ত শরীর নিয়ে চোখ বুজে এসেছিল তাঁবুতে…‌। তারপর আর বাকিটা মনে পড়ছে না। হয়তো জেইনই তাকে এখানে কোলে করে নিয়ে এসেছে।

ঘড়ির কাঁটার দিকে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ! বিকেল সাড়ে পাঁচটা! তার মানে এতক্ষণ ধরে সে অকাতরে ঘুমিয়েছে? লজ্জায় গাল দুটো হালকা লাল হয়ে উঠল। এখন কি ভাববে সবাই?… ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন করে উঠল।
ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওয়াশ রুমের দিকে। ফ্রেশ হয়ে জেইনের কালো শার্ট টা খুলে নিজের একটা সফেদ কুর্তি পরে নিল।আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অগোছালো চুলগুলো ঠিক করতে করতে তার চোখ গেল টেবিলের ওপরে থাকা প্রেগন্যান্সি কিটটার দিকে। সেখানে ফুটে থাকা দুটি লাল দাগের দিকে তাকিয়ে সে আবারও লজ্জায় নিজের মুখ লুকাল। এক অদ্ভুত অনুভূতিতে কেঁপে উঠল ভেতরটা। এটা কি সত্যি নাকি কোনো রঙিন স্বপ্ন? তার ভেতরেও এক ছোট্ট প্রাণ ধুকপুক করছে! বেড়ে উঠছে এক নতুন অস্তিত্ব। সত্যিই কি এতো সুখ লেখা ছিল তার কপালে?
বুকটা কেমন রেলগাড়ির মতো দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সে নিজেকে শক্ত করল—আর কোনো লুকোচুরি নয়, আজই, এই মুহূর্তেই জেইনকে এই শ্রেষ্ঠ উপহারের সংবাদটা দিবে সে।

সেই দিন জেইন যখন অফিসে গিয়েছিল……..
ড্রয়িংরুমের সোফায় গুটিসুটি মেরে বসে ছিল রিম। তার সামনে রাখা একটি বাটিতে তেলের ঝাল আর মশলায় জারানো ফ্রোজেন আমের আচার। সে একমনে সেই আচারের দিকে তাকিয়ে আছে আর পরম তৃপ্তিতে তার টক-ঝাল স্বাদ নিচ্ছে। এলেনা কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে এক ধ্যানে রিমের দিকে তাকিয়ে আছে। রিম এখানে আসার পর থেকেই তার প্রতি এক অদ্ভুত, অলৌকিক মায়া জমেছে এলেনার মনে। রিম যেন এক বিষণ্ণ অথচ উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার প্রতিটি পদক্ষেপে এক অদৃশ্য মায়ার টান কাজ করে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন ছুড়ে দিল এলেনা, যা ড্রয়িংরুমের শান্ত বাতাসকে স্থির করে দিল।
“রিইম… তোমার পিরিয়ড লাস্ট কবে হয়েছিল?”

সরাসরি এলেনার এমন সংবেদনশীল প্রশ্নে যেন নিজের ভেতরেই কুঁকড়ে গেল রিম। আচারের বাটিটা হঠাৎ খুব ভারী মনে হতে লাগল তার কাছে। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় তার গাল দুটো রক্তবর্ণ ধারণ করল। সে মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় ফিসফিস করে বলল,
“সঠিক তারিখটা… ম-মনে নেই।”
এলেনার ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল। দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে ধীরপায়ে এগিয়ে এসে বসলো রিমের পাশে। তার কণ্ঠে বড় বোনের মতো এক শাসন মেশানো মমতা।
“এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কেউ ভুলে যায়?নিজের শরীরের যত্ন নিতে কবে শিখবে তুমি?”
কথা শেষ করেই এলেনা রিমের হাতের মুঠোয় একটি ছোট্ট সাদা প্যাকেট গুঁজে দিল। প্যাকেটটার দিকে তাকাতেই রিমের চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। লজ্জায় কানের লতি পর্যন্ত টকটকে লাল হয়ে উঠল। সে অস্ফুটে ঠোঁট কামড়ে ধরল, তার বুক ধুকপুক করছে তীব্র গতিতে।

“এমন কিছুই না।”
রিম প্যাকেটটা লুকানোর চেষ্টা করে বিড়বিড় করল,
“পিরিয়ড গতবার একদম ঠিক সময়েই হয়েছিল। এমনিই হয়তো শরীরটা একটু দুর্বল লাগছে, বেশি কিছু না।”
এলেনা রিমের চোখে নিজের দৃষ্টি স্থির করলো।
“একবার নিশ্চিত হতে সমস্যা কী? মনে রেখো, শরীরের ভেতর বয়ে চলা পরিবর্তনগুলো মাঝেমধ্যে একদম নিঃশব্দে আসে।”
রিম আর কথা বাড়াল না। প্যাকেটটা অতি সাবধানে লুকিয়ে রাখল নিজের কাছে। হৃদয়ের গভীর কোনো কোণে এক অজানা আশঙ্কার চারাগাছ যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠল।

নিজের আর জেইনের রুমের সামনে এসে থমকে দাঁড়াল রিম। পুরো হাউজেই কেউ নেই এখন। শুধুমাত্র সার্ভেন্ট। তাদের কাছ থেকেই জানতে পেরেছে জেইন কোনো এক গোপন মিশনে পাঠিয়েছে সবাইকে। এখন পুরো হাউজ আর রুমে একমাত্র সে আর জেইন’ই আছে একা। রিমের হৃদপিণ্ডটা উত্তেজনায় ঢিপঢিপ করছে। কাঁপা হাতে দরজার স্ক্যানারে আঙুল রাখল সে। মৃদু শব্দে লক খুলে যেতেই ভেতরে পা রাখল, কিন্তু পরক্ষণেই! তার পুরো পৃথিবীটা যেন এক প্রচণ্ড ভূমিকম্পে ওলটপালট হয়ে গেল।
রিমের পা দুটো বরফের মতো শীতল হয়ে মেঝের সাথে জমে গেল। শ্বাস নিতেও ভুলে গেল। চোখের সামনের দৃশ্যটা ঝাপসা হয়ে আসছে, মাথার ভেতরটা ভোঁ ভোঁ করছে। সে যা দেখছে, তা কি কোনো বিভ্রম? নাকি কোনো স্বপ্ন? নাকি বাস্তব?
সে ধীরপায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। প্রতিটি পদক্ষেপ যেন এক একটি পাহাড় ডিঙানোর মতো কষ্টসাধ্য।বুকের ভেতরটা যেন ধপধপ করে ফেটে যেতে চাইছে।তার ঠিক সামনে—
একই বিছানায় একই চাদরের নিচে, অতীব ঘনিষ্ঠ ভঙ্গিতে, এক অপরূপ সুন্দরী নারীকে বুকে জড়িয়ে শুয়ে আছে জেইন।দুজনের শরীর একই কমফোর্টারের নিচে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। রিমের বুকের ভেতরটা যেন কেউ ধারালো ছুরি দিয়ে ফালাফালা করে দিচ্ছে।

কম্ফোর্টারের নিচে সম্পূর্ণ অনাবৃত দুটো শরীর—এটা বুঝতে এক সেকেন্ডও লাগল না।চোখ সরাতে পারছে না সে।দেখতে চায় না—তবুও তাকিয়ে আছে।নিজের ভালোবাসার মানুষকে এভাবে অন্য কারও সঙ্গে দেখে তার বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে।মাথার ভেতর একটাই কথা ঘুরছে—এটা সত্যি না। সত্যি হতেই পারে না।
সে বারবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল—না, এটা বাস্তব নয়! এটা নির্ঘাত কোনো দুঃস্বপ্ন! কিন্তু বিছানার পাশের টেবিলে জেইনের ফেলে রাখা ঘড়ি আর চশমাটাও তখন চিৎকার করে বলছে, এটা নির্মম বাস্তব।
কিন্তু বাস্তবে তো দূরে থাক, রিম তার স্বপ্নেও জেইনের পাশে অন্য কাউকে কল্পনা করতে পারে না। দুচোখের কোণ বেয়ে অজান্তেই গড়িয়ে পড়লো এক ফোঁটা নোনা জল। তারপর আরেক ফোঁটা।আরেকটা।এই দৃশ্য সহ্য করার মতো শক্তি বিধাতা দেননি তাকে। একটুও না।তার বুকটা ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে, শরীরের ভেতরে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে তীব্র যন্ত্রণায়।শ্বাস ফুলে উঠছে। বুক কাঁপছে। ঠোঁট কেঁপে উঠছে ফুপরে কান্না চাপতে গিয়ে। চোখের জল ভিজিয়ে দিচ্ছে গাল, ঠোঁট, চিবুক।

ঠিক সেই সময়—
জেইনের বুকে লেপ্টে থাকা মেয়েটি নড়েচড়ে উঠল। সামনে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার ঘুমন্ত চোখ দুটো বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। পরক্ষণেই দৃষ্টি পরিষ্কার হতে রিমকে দেখতে পেয়ে দ্রুত করে কমফোর্টারের নিচে আরও ভালো করে আড়াল করল নিজেকে। তার চোখেমুখে তখন ক্রোধ আর বিরক্তির মিশ্রণ। সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল,
“Hey! Who the hell are you?!!!”
রিম যেন কেঁপে উঠল।মেয়েটির কণ্ঠ আরও কঠিন হয়ে উঠল,
“সাহস কী করে হলো সামান্য একটা সার্ভেন্ট হয়ে আমাদের পার্সোনাল রুমে এভাবে ঢুকে পড়ার? গেট আউট অফ হিয়ার রাইট নাউ! আর ইউ ক্রিপি অর সামথিং?”

মেয়েটির উদ্ধত কথাগুলো রিমের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার মস্তিষ্কে যেন সহস্র স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল।এক মুহূর্তে শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগল।সার্ভেন্ট?এই রুম নাকি ওর? এই রুম, এই সবকিছু, এমনকি জেইন পুরোটাই তার।স্বপ্ন হোক কিংবা বাস্তব—জেইনের ভাগ সে পৃথিবীর কাউকেই দিতে পারবে না। প্রাণ চাইলে দিয়ে দেবে, কিন্তু জেইনকে নয়। কখনোই নয়।রিম যেন এক মুহূর্তেই শান্ত মায়াবী রূপ ছেড়ে এক রণচণ্ডী মূর্তি ধারণ করল। নিজের ক্রোধ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে সে হিংস্র বাঘিনীর মতো ফোঁস করে গর্জে উঠল,
“শাকচুন্নীর বাচ্চা! তোর সাহস কী করে হলো আমার আরাত্রর বুকে মাথা রাখার?”
রিমের চোখ দুটো আগুনের মতো জ্বলছে।
“আজ তোকে মেরেই ফেলব আমি! আমার ঘর, আমার বিছানা, আমার স্বামীর বুকে মাথা রেখে আমাকেই প্রশ্ন করা হচ্ছে আমি কে? আবার আমায় সার্ভেন্ট বলছিস!”
রিমের বুক উঠানামা করছে দ্রুত।

“আমার নিজের রুমে ঢুকতে আমাকে এখন বাইরের মেয়ের পারমিশন নিতে হবে?”
রিম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ক্ষিপ্ত হয়ে মেয়েটির দিকে তেড়ে গেল। তার এই প্রলয়ংকরী রূপ দেখে মেয়েটি ভয়ে একদম কুঁকড়ে গিয়ে জেইনের বুকে আরও শক্ত করে লেপ্টে ধরল নিজেকে।কাঁদো গলায় আর্তনাদ করে উঠল,
“Baby, please! Save me from this girl! Wake up, baby… she’s crazy. She’ll kill me!”
রিম থমকে গেল। মেয়েটির আর্তনাদে নড়ে চড়ে উঠলো জেইন। আধা-ঘুমন্ত অবস্থায় বিরক্তির এক চরম সীমায় পৌঁছে গেল। সে চোখ না মেলেই মেয়েটির গলার খাঁজে মুখ আরও গভীরভাবে গুঁজে দিল। ঘুম জড়ানো, কর্কশ আর নিস্পৃহ কণ্ঠে বলে উঠল,
“উফ্ বেইবি… প্লিজ ডোন্ট ডিস্টার্ব মি। এমনিতেই রাত থেকে এই পর্যন্ত এক ফোঁটা ঘুম হয়নি আমার। ওকে চিৎকার করতে দাও, জাস্ট ইগনোর হার…”

জেইনের এই নির্লিপ্ততা, অন্য মেয়েকে ‘বেইবি’ বলে সম্বোধন! রিমের কানে গরম সিসার মতো বিঁধল। তার পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে।বুকের ভেতরটা তখন তীব্র এক আশঙ্কায় ধুকধুক করছে। তার সারা শরীর কাঁপছে, দুই হাতে নিজের কুর্তিটা খামচে ধরল সে। এটা কি আসলেই কোনো দুঃস্বপ্ন? কিন্তু স্বপ্ন তো এত জীবন্ত হয় না! স্বপ্নের আঘাত তো হৃদয়ে এত রক্তক্ষরণ ঘটায় না।
বিছানায় থাকা মেয়েটির ন্যাকা কান্নায় ঘুমে ব্যাঘাত ঘটালো জেইনের। সে শেষমেশ বিরক্তি নিয়ে ঘুম থেকে করে উঠে বসল। বাঁ হাতের তালু দিয়ে নিজের মুখ আর চোখ ঘষে এক চরম বিরক্তির শব্দ করল সে। সামনে রিমকে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। নিজের ভেতরে পুষে রাখা ক্রোধটাকে কোনোমতে সামলে নিয়ে সে দাঁতে দাঁত চেপে, চিবিয়ে চিবিয়ে চাপা গর্জনে বলে উঠল,
“হোয়াট… আর… ইয়্যু ডুয়িং হেয়ার?! এখানে কী করছো তুমি, রিম? আমি কি তোমাকে তোমার রুমে রেখে আসিনি? তাহলে আবার এখানে কেন ফিরে এলে?”

একটু থেমে, পাশের মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আবার রিমের দিকে চোখ ফেরায়।
“লুক, আমাদের এখন প্রাইভেসি দরকার। তুমি তোমার রুমে যাও। আর হ্যাঁ, ভুলেও এই রুমে আবার ঢুকে আমাদের ডিস্টার্ব করার চেষ্টা করবে না।আন্ডারস্ট্যান্ড?”
প্রতিটা শব্দ যেন ছুরি হয়ে রিমের বুকের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।সে নড়ল না।শুধু তাকিয়ে রইল—অবিশ্বাসে, ভাঙা চোখে।
“এগুলো কী বলছো তুমি?”
তার কণ্ঠ হঠাৎই কেঁপে উঠল।
“কেন বলছো এসব? আমি… আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে।
“আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, আরাত্র। দম আটকে যাচ্ছে।”
তার কাঁপা গলায় অনুনয়,
“প্লিজ… এই নাটকটা বন্ধ করো।”
চোখে জল জমে ওঠে।
“এটা প্র্যাঙ্ক, তাই না? কাল আমরা সবাই মিলে তোমার সাথে প্র্যাঙ্ক করেছিলাম—তাই আজ তুমিও আমার সাথে এমনটা করছো, তাই তো?”

একটু আশার আলো জ্বলে ওঠে তার চোখে।
“প্লিজ বলো যে, এটা মজা। কারণ আমার এসব একদম ভালো লাগছে না। কিন্তু বিশ্বাস করো, এসব মজা আমার একদম সহ্য হচ্ছে না।”
গলা শক্ত হয়ে এলো হঠাৎ,
“তুমি… এই মেয়েটাকে এক্ষুনি এই রুম থেকে চলে যেতে বলো। নাহলে আমি নিজেকে সামলাতে পারব না… মেরে ফেলব তোমাদের দুজনকে! চলে যেতে বলো।”
শেষ কথাটি রিম প্রায় আর্তনাদ করে চিৎকার দিয়ে বলল,
“ওকে চলে যেতে বলো বলছি!!!!!!…”
“এই মেয়ে, আমি কেন যাবো এখান থেকে?যেতে হলে তুমি যাবে।”
মেয়েটি জেইনের দিকে ঝুঁকে পড়ে,ন্যাকামো সুরে বলল,
“বেইবি, তুমি এই স্লা*টটাকে কিছু বলছো না কেন?”
আবার রিমের দিকে তাকিয়ে বিষ ঢেলে দেয়,

“মানছি, আমি দু’বছর দেশের বাইরে ছিলাম। তাই তুমি নিজের শরীরের চাহিদা মেটাতে ওকে তুলে এনেছিলে।কিন্তু এখন তো আমি ফিরে এসেছি। এখন আর এই রাস্তার মেয়ের দরকার নেই।”
শেষ বাক্যটা যেন ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিল রিমের মাথায়।
“তুমি একে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বের করে দাও এক্ষুনি!”
মেয়েটির উদ্ধত এবং বিষাক্ত কথাগুলো রিমের ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও ভেঙে দিল। ক্রোধে তার হিতাহিত জ্ঞান লুপ্ত হলো। সে এক হিংস্র বাঘিনীর মতো ফোঁস ফোঁস করতে করতে ড্রেসিং টেবিলের ওপর থেকে একটি ভারী কাঁচের ফ্লাওয়ার ভেস তুলে নিল। মুহূর্তের ব্যবধানে সজোরে আঘাত করল সোজা মেয়েটির মাথায়।
ঠাস্।

আঘাতের শব্দে কেঁপে উঠল ঘর। মেয়েটা চিৎকারও করতে পারল না—চোখের সামনে সবকিছু ঘুরে গেল। মাথা চক্কর দিতে দিতে সে জেইনের বুকে ঢলে পড়ল। কপালের এক কোণে রক্ত জমাট বেঁধে গেল।দৃষ্টি কুয়াশাচ্ছন্ন হয়ে এল। রিমের ভেতরের আগ্নেয়গিরি তখনো শান্ত হয়নি। সে পুনরায় আঘাত করার জন্য হাত তুলতেই জেইন এক ঝটকায় বাঘের মতো থাবা দিয়ে রিমের হাতটা চেপে ধরল। জেইনের চোখ দুটো তখন রক্তবর্ণ, চোয়াল শক্ত। সে দাঁতে দাঁত চেপে পশুর মতো গর্জে উঠে বলল,

“Have you gone mad?!”
চোখে আগুন নিয়ে বললো,
“Do you have any idea what you’re doing?!”
তার কণ্ঠ আরও কঠিন হলো,
“তোমার সাহস হলো কীভাবে আমার জানের গায়ে হাত তুলতে?!”
জান! শব্দটা শুনেই রিমের ভেতরটা ভেঙে পড়ল।তার চোখ দুটো মুহূর্তেই জলে ভরে উঠল। হাত থেকে ভাজটা পড়ে গেল মেঝেতে। সে স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল জেইনের মুখের দিকে—চেনার চেষ্টা করছে।এটা কি সেই মানুষ? যাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে? অন্য একটা মেয়েকে… জান? অন্য একটা মেয়ের জন্য তার সাথে এই ব্যবহার! এই অমানুষিক যন্ত্রণা সহ্য করার চেয়ে মৃত্যুও যেন অনেক বেশি কাঙ্ক্ষিত। রিম যন্ত্রণায় বিদীর্ণ এক রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল,

“প্লিজ আরাত্র… অনেক হয়েছে। এবার এই নাটকটা বন্ধ করো। আমি আর নিতে পারছি না… বিশ্বাস করো, আমার দম আটকে আসছে। বুকটা ফেটে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। এর চেয়ে বরং তুমি আমাকে নিজের হাতে শ্বাসরোধ করে মেরে ফেলো, তবুও এই জঘন্য খেলাটা আর আমার সাথে খেলো না। বন্ধ করো এইসব প্রাঙ্ক। বন্ধ করো… প্লিজ!”
জেইন রিমের চোখে চোখ রেখে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকাল।ঠান্ডা, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল,
“কোনো প্রাঙ্ক হচ্ছে না এখানে।”
রিমের বুকটা ধক করে উঠল।
“তুমি যা দেখছো, সেটাই সত্যি।আমি অলিভাকে ভালোবাসি।”
রিমের শরীরটা কেঁপে উঠল।
“আর তোমাকে? তোমাকে কেবল নিজের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছি এতদিন। এখন ‘ও’ আমার কাছে ফিরে এসেছে। নাউ আই ডোন্ট নিড ইউ এনিমোর! তাই ভালোয় ভালোয় বলছি, এখান থেকে বেরিয়ে যাও।”
রিম পাগলের মতো মাথা নাড়াতে লাগল, যেন এই নিষ্ঠুর সত্যটাকে সে কোনোভাবেই অস্তিত্বে স্থান দেবে না। সে আর্তনাদ করে উঠল,

“না!!! না… না… আমি বিশ্বাস করি না।”
তার চোখে আতঙ্ক আর আকুতি।
“তুমি মিথ্যে বলছো। তুমি শুধু আমাকেই ভালোবাসো। আমি জানি…. তুমি আমাকেই….।”
জেইনের মুখ আরো কঠোর হয়ে উঠল। সে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো
“এই!!! আমার কথা বুঝিস না তুই?আমি কি কোনোদিন মুখ ফুটে বলেছি যে তোকে ভালোবাসি? না! তাহলে তুই ভাবলি কী করে যে ‘আরাত্রিক জেইন চৌধুরী’ তোর মতো একটা রাস্তার মেয়েকে ভালোবাসবে? তুই ছিলি স্রেফ আমার সময় কাটানোর একটা মাধ্যম, তার বেশি কিছু না!”
জেইনের মুখ থেকে নির্গত প্রতিটি শব্দ যেন বিষাক্ত তীরের মতো রিমের হৃদপিণ্ড ছিঁড়ে তছনছ করে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেউ যেন হাজারো ধারালো কাঁচের টুকরো ছিটিয়ে দিয়েছে তার বুকের ভেতর। অশ্রুসিক্ত চোখে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, বুক ফেটে যাচ্ছে আর্তনাদে। সে অস্ফুট স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“সত্যিই কি ভালোবাসোনি তুমি আমায়?”
তার চোখে অবিশ্বাস।

“তাহলে এতদিন যা কিছু হলো… তোমার সেই উন্মাতাল পাগলামি, সেই আগলে রাখা… এসব কি স্রেফ অভিনয় ছিল? সব, মিথ্যে?”
জেইন এক মুহূর্ত দেরি না করে, পাথরের মতো শীতল কণ্ঠে জবাব দিল,
“হ্যাঁ, মিথ্যে। সবকিছুই একটা সাজানো নাটক ছিল। এখন বুঝতে পেরেছো?”
রিম বিড়বিড় করে উঠল, নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারছে না সে। কোনো মানুষ কীভাবে এত জীবন্তভাবে মিথ্যে অভিনয় করতে পারে? তার ভেতরের পাগলামিটা এবার বাঁধ ভাঙল। সে মাথা নাড়াতে নাড়াতে চিৎকার করে উঠল,
“আমি বিশ্বাস করি না! আ-আমি আমি বিশ্বাস করি না। ত-তুমি মিথ্যে বলছো।
তার চিৎকার আরো জোড়ালো হলো,
“মিথ্যে বলছো তুমিই!!!!!”

সে এক পা এগিয়ে এল, কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।
“কেন করছো এমন? সত্যিটা একবার বলো আমাকে। একদিন তুমিই বলেছিলে আমি তোমার জীবনের একমাত্র নারী? তুমিই বলেছিলে আমি ছাড়া তোমার জীবনে দ্বিতীয় কেউ নেই? তুমিই তো বলেছিলে—আমিই একমাত্র নারী যাকে তুমি গভীর থেকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছ! তুমিই তো বলেছিলে আমি তোমার জীবনের সৃষ্টিকর্তার দেওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার!”
সে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“তাহলে আজ কেন… কেন এমন করছো? আমার কষ্ট হচ্ছে তো! খুব কষ্ট হচ্ছে! তুমি কি অনুভব করতে পারছো না? প্লিজ, আর এভাবে আমাকে দগ্ধ করো না।”
জেইন তাচ্ছিল্য করে বললো,
“আমি চাইই তুমি কষ্ট পাও। এতদিন ঠিক যেভাবে আমাকে জ্বালিয়েছো ঠিক সেভাবেই এখন তুমিও জ্বলবে!”
রিমের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে।তার কণ্ঠে মিনতি।
“না না, এ-এই শোনো না, এখন থেকে আমি তোমার সব কথা শুনব, একটুও অবাধ্য হব না। তুমি যা বলবে আমি তাই করব…”

শেষ কথাটা প্রায় ফিসফিসে,
“শুধু… শুধু এই মেয়েটাকে চলে যেতে বলো এক্ষুনি!”
রিম হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বিছানার দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হাত টেনে ধরল মেয়েটির। টানা বিরবির করতে লাগলো,
“এ-এই…. এই মেয়ে এক্ষুনি বেরিয়ে যাও এখান থেকে! আর কক্ষনো আমার আরাত্রর ত্রিসীমানায় আসবে না!বে-বেরিয়ে যাও”
সে উন্মাদিনীর মতো চিৎকার করে বলল,
“বেরিয়ে যাও বলছি!!!!”
রিমের পাগলামি দেখে জেইন এক ঝটকায় তার হাত চেপে ধরল। রিমের কবজি যেন মচকে যাবে জেইনের সেই কঠিন হাতের চাপে। জেইন রিমকে এক ধাক্কায় সরিয়ে দিয়ে বজ্রকণ্ঠে বললো,
“ও কোত্থাও যাবে না! এই ঘরে, আমার বুকে, এখানেই থাকবে। আর যদি এই মুহূর্তেই কাউকে এখান থেকে বেরিয়ে যেতে হয়—তাহলে সেটা তুমি!”
রিমের চোখের জল আজ বাঁধভাঙা প্লাবনের মতো গড়িয়ে পড়ছে। সে এক বুক হাহাকার নিয়ে ভাঙা গলায় বলে উঠল,

“না আমি যাবো না। কিছুতেই না। তুমি বেরিয়ে যাও ওকে নিয়ে। আসতে হবে না তোমাকে আমার কাছে। আজ আমার সাথে যে নাটকটা করছো না তুমি….. তার শাস্তি আগামী একমাস পর্যন্ত ভোগ করবে। একদম কাছে আসতে দেবে না মনে রেখো।”
“আসতে চাই ও না, তোমার মতো নষ্টা মেয়ের কাছে! আমার প্রয়োজন মিটে গেছে অনেক আগেই! এখনো এতো কিছু চোখের সামনে দেখার পরেও এসব কিছু নাটক মনে হচ্ছে তোমার? তোমার মতো স্টুপিড মেয়ে আমি আমার লাইফে আর একটাও দেখিনি!”
জেইন একটু থেমে বুক ফুলিয়ে একটু শ্বাস টেনে নিলো। তারপর আবার বললো,
“নাটক মনে হচ্ছে তো? ওকে ফাইন, এখনই প্রমাণ করে দিচ্ছি। তাহলে হয়তো তুমি বুঝতে পারবে এটা কোনো নাটক নয়। এটাই বাস্তব।”

পরের মুহূর্তেই—
সবকিছু ভেঙে পড়ল।রিমের চোখের সামনে জেইন হিংস্রভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ল অলিভার সিক্ত ঠোঁটে! রিম স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন এক লহমায় ধূলিসাৎ হয়ে গেল।ঘরের আলো, শব্দ, বাতাস—সবকিছু যেন এক ঝটকায় নিভে গেল।
চোখের সামনে শুধু ওই দৃশ্যটা।দু’জন মানুষ—উন্মাদের মতো একে অপরকে আঁকড়ে ধরে গিলে নিচ্ছে ঠোঁট। চুমুর সেই আদিম উত্তেজনার মাঝেই জেইন আড়চোখে রিমের দিকে তাকাল—তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল রহস্যময়ী, শয়তানি হাসি।রিমের বুক চিরে এক আকাশ সমান আর্তনাদ বেরিয়ে এল,
“নাআআ…. নাহ্ বন্ধ করোওও… বন্ধ করো এসব।”
তার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছে।

“আমি সহ্য করতে পারছি না। আমি মরে যাচ্ছি। আমার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ও’কে ছাড়ো… প্লিজ থামো। থামো তোমরা!!!!… আআআআ…… আহাআ আআ……”
তার আর্তনাদ ঘরে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে এলো।
কিন্তু কেউ থামল না।রিমের পা দুটো টলমল করে উঠল। পায়ের নিচ থেকে সরে গেছে মাটি। সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে ড্রেসিং টেবিলটা শক্ত করে খামচে ধরল। তার দুচোখ দিয়ে অবিরত জল গড়িয়ে পড়ছে। সে বিড়বিড় করে কেবল একটি কথাই বলতে পারল,
“প্লিজ থামো… দোহাই লাগে তোমাদের, থামো…”
এবার জেইনের ঠোঁট থেকে নিজেকে আলগা করে রিমের দিকে অবজ্ঞাভরা দৃষ্টি নিক্ষেপ করল মেয়েটি। কপালে এখনো রক্ত জমাট বাঁধা।
“বেইবি দেখছো না মেয়েটা কিভাবে আমাদের ডিস্টার্ব করছে!”
জেইনের দিকে আরো ঝুঁকে গেল,
“ও’কে এক্ষুনি বের করে দাও। কতদিন পর তোমাকে একটু কাছে পেয়েছি। এই মেয়েটার এসব সিনক্রিয়েট আমার আর সহ্য হচ্ছে না।”

রিমের দিকে তাকিয়ে কন্ঠে বিষ ঢেলে বললো,
“এই মেয়ে! এখনও এখানে খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেন? তোমার মতো নির্লজ্জ, বেহায়া মেয়ে আমি আর একটাও দেখিনি। লজ্জা-শরম কি সব খেয়ে ফেলেছো? নাকি আরও কিছু দেখতে চাও? আমরা কীভাবে এক হই, কীভাবে শরীর ভাগাভাগি করি—সেসবের লাইভ টেলিকাস্ট দেখতে চাও বুঝি?”
ঠিক তখনই—
“OUTTT!!!!!”
জেইনের গর্জনে ঘর কেঁপে উঠল।
“Just get out!”
প্রায় চিৎকার।
“I said—get out. Right. Now!!!!!!!”
রিমের শরীর কেঁপে উঠল—মনের গভীর পর্যন্ত।জেইনের হিংস্র গর্জনে তার আত্মাটাও যেন থরথর করে উঠল।অপমানে, লজ্জায়, নিজেকে তুচ্ছ আর নোংরা আবর্জনা মনে হচ্ছে তার।রিম আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তি পেল না। চোখের জল মুছে, পাজর ভাঙা এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে সে কক্ষ থেকে ছুটে বেরিয়ে এল।
দরজার কাছে পৌঁছাতেই জেইনের শেষ পাথরচাপা কণ্ঠস্বরটি তার কানে আছড়ে পড়ল,
“লিসেন এই পেন্টহাউজের ত্রিসীমানায় আর কখনো দেখতে চাই তোমায়! জাস্ট কিপ ইট ইন ইয়োর মাইন্ড। নাও গো হেলল!!!…..”

সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার তখন অরণ্যের বুক চিরে নেমে এসেছে। চারপাশ নিস্তব্ধ, কেবল দূরে কোনো এক হিংস্র পশুর ক্ষুধার্ত গর্জন সেই নিস্তব্ধতাকে আরও ভয়ানক করে তুলছে। কিন্তু রিমের কানে সেই ভয়াল শব্দ পৌঁছাচ্ছে না। তার অন্তরে যে প্রলয় বয়ে গেছে, তার কাছে বনের এই হিংস্রতা অতি তুচ্ছ। জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির দেওয়া আঘাতের নীল বিষে তার পুরো অস্তিত্ব এখন নীল হয়ে গেছে।
আকাশের বুক চিরে নামছে ঘন কালো মেঘ—প্রকৃতিও যেন আজ রিমের এই অসীম যন্ত্রণার সাক্ষী হতে চাইছে।
রিমের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরা প্রেগন্যান্সি কিটটা। একবার তাকায়, তারপর ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের, ভাঙা একটা হাসি ফুটে ওঠে।কী নিষ্ঠুর রসিকতা!যে জীবনে সুখের অস্তিত্বই নেই, সেখানে নতুন প্রাণের আগমন! সবই মিথ্যে।

মনে পড়ে যায় দুদিন আগের হসপিটালে ঘটে যাওয়া ঘটনা। ডাক্তার যখন জেইনকে রিপোর্ট দেখাতে চেয়েছিল, তখন রিম তাকে বাধা দিয়েছিল। সে চেয়েছিল জন্মদিনে জেইনকে নিজে এই খুশির সংবাদটা দিবে। ভেবেছিল এটাই হবে জেইনের জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহার। তাই ডাক্তারকে অনেক অনুরোধ করে মিথ্যে বলতে বলেছিল। কিন্তু আজ সেই দিনটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।রিম আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না। হাঁটু ভেঙ্গে আঁছড়ে পড়ে কাদা-মাটির ওপর। তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক পাজর-ভাঙা আর্তনাদ,
“আ…আ..আ..আহাহাহাআ…..”
সেই আর্তনাদের সাথে পাল্লা দিয়েই যেন আকাশটাও ভেঙে পড়ল। ঝুম বৃষ্টি! রিমের গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া নোনা জল বৃষ্টির শীতল ধারায় মিশে একাকার হয়ে গেল। সে আকাশের দিকে মাথা তুলে, দুহাত প্রসারিত করে ভাঙা গলায় চিৎকার করে বলতে লাগল,

“কেন? কেন, কেনওও? আমার সাথেই কেন? যখনই আমি এক ফোঁটা সুখের প্রত্যাশা করি, তখনই তুমি আমার থেকে সব কেড়ে নাও! কী অপরাধ করেছিলাম আমি? আমি কি তোমার এতই অপ্রিয় বান্দা?আমি আর পারছি না… সহ্য করার ক্ষমতা যে আমার ফুরিয়ে গেছে। আমাকে শেষ করে দাও… যদি সব কেড়েই নেয়ার ছিল, তাহলে কেন এই ছোট্ট প্রাণটা দিলে আমার ভেতরে? কী পরিচয় দেব আমি ওর? কী জবাব দেব যখন ও তার বাবার কথা জানতে চাইবে?”
রিম একটু থামল। দীর্ঘ এক নিঃশ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার বৃথা চেষ্টা করল। তার শরীরের প্রতিটি অংশ ঠাণ্ডায় আর কষ্টে থরথর করে কাঁপছে। সে ফুঁপিয়ে উঠে বলল,
“এবার বুঝেছি আমি, কেন তুমি আমাকে এই শাস্তি দিচ্ছো! আমি যে এখনো… এত অপমানের পরেও ওই মানুষটাকে ঘৃণা করতে পারছি না!”
সে একটু থেমে ফিসফিস করে বলল,
“কিন্তু কেন?কেন পারছি না আমি? কেন? আ-আমার… আমার যে নিজের ওপরই চরম ঘৃণা হচ্ছে এখন! আমি, আমি তোমাকে ঘৃণা করতে পারছি না আরাত্র… এখনো তোমাকে ঘৃণা করতে পারছি না। পারছি না আমি। খুব, খুব ভালোবাসি তোমাকে। খুব বেশি ভালোবাসি!”
সে আর্তনাদ করে উঠল

“শুনছো তুমি আমি ভালোবাসি তোমাকে। ভীষণ ভালোবাসি। চাইলেও ঘৃণা করতে পারছি না।”
রিম অরণ্যের নিস্তব্ধতা চিরে উন্মাদের মতো চিৎকার করে উঠল,
“কেনহ্ ….. কেন আমার এতো বেশি কষ্ট হচ্ছে? তুমি চেয়েছিলে না আমি কষ্ট পাই? দেখো আমি কষ্ট পাচ্ছি, সত্যিই কষ্ট পাচ্ছি। আমায় ভালোবাসলে না কেন বলতো? আমাকে কি একটুও ভালোবাসা যেত না? আমি কি এতোই অযোগ্য? শুধু তো একটু ভালোবাসাই চেয়েছিলাম তোমার কাছে! আর তো কিছু চাই নি। তাহলে কেন ঠকালে আমাকে? কেন একসাথে বাঁচার স্বপ্ন দেখালে? কেন দিলে এই মিথ্যে প্রতিশ্রুতি?”
বৃষ্টির জল আর কাদায় রিমের পুরো শরীরে মাখামাখি হয়ে আছে। হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডায় তার ঠোঁট দুটো জমে গেছে। কিন্তু হঠাৎই রিমের ভেতরে এক নতুন শক্তির সঞ্চার হলো। সে ধীরে ধীরে টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়াল। না, ভেঙে পড়লে চলবে না। তাকে বাঁচতে হবে। নিজের জন্য না হলেও, তার ভেতরে বেড়ে ওঠা এই নিষ্পাপ প্রাণটির জন্য তাকে টিকে থাকতে হবে। এই অন্ধকার পৃথিবীতে এই ছোট্ট অস্তিত্বই এখন তার একমাত্র আপনজন।
রিম অত্যন্ত মমতায় নিজের পেটের ওপর এক হাত রাখল। তার কণ্ঠস্বর তখন কান্নায় ভিজে গেছে, কিন্তু সেখানে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। সে ফিসফিস করে বলতে লাগল

“বেবি… তুমি ঠিক আছো তো সোনা? ভয় পেও না বেবি…”
তার চোখের জল হাতের ওপর পড়ে।
“এই পৃথিবীতে মাম্মাকে ভালোবাসার মতো কেউ নেই। সবাই মাম্মাকে ফেলে চলে গেছে। তুমি ভালোবাসবে তো মাম্মাকে? বলো না। মাম্মা তোমাকে প্রটেক্ট করবে সবসময়। সকল বিপদ থেকে আগলে রাখবে। শুধু মাম্মাকে ছেড়ে যেও না কখনো… ঠিক আছে সোনা? মাম্মার বেঁচে থাকার একমাত্র আশার আলো যে তুমি।”
ঠিক সেই মুহূর্তেই—ধরাম!!!!!
একটি বিকট, কানফাটানো শব্দ অরণ্যের নিস্তব্ধতা আর বৃষ্টির ঝমঝমানিকে ছাপিয়ে গেল। এক পলকের জন্য যেন মহাকালের চাকা থমকে দাঁড়াল। রিম বুঝতে পারল না ঠিক কী ঘটেছে; শুধু অনুভব করল তার শরীরটা এক তীব্র ঝটকায় মাটি ছেড়ে শূন্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। এক অদ্ভুত ভারহীনতা, যেন সে কোনো অদৃশ্য ডানায় ভর করে মেঘের দিকে উড়ে যাচ্ছে। তার স্থির দৃষ্টি তখনো আকাশের কালো মেঘের দিকে, যেখানে শেষবারের মতো বিদ্যুতের ঝিলিক খেলে গেল।

ঠাস!
পানিতে আছড়ে পড়ার শব্দ! এক বিশাল জলরাশি রিমের শরীরটাকে সজোরে গ্রাস করে নিল। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে অতলান্ত সমুদ্র, যার ক্ষুধার্ত ঢেউগুলো যেন আগে থেকেই ওৎ পেতে ছিল।
পাহাড়ের চূড়ায়, ঠিক খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো গাড়ি। ভেতর এক নারী। এই দৃশ্য দেখছিল। তার কপালে ব্যান্ডেজ। চোখেমুখে এক পৈশাচিক ও ভয়ংকর উন্মাদনা। সে ঘাড় বাঁকিয়ে, বিকৃত এক হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
“ফাইনালি আমার এতদিনের সব প্ল্যান সাক্সেসফুল। এখন থেকে জেইন শুধুই আমার। ওর আশেপাশে যেই আসবে তাকে ঠিক এভাবেই শেষ করে দেবো আমি।”
সমুদ্রের লবণাক্ত পানি রিমের নাকে-মুখে ঢুকে পড়ছে। সে টের পাচ্ছে, এক অতল অন্ধকার তাকে নিচের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। শরীর অবস।

হঠাৎ! তার অবশ মস্তিষ্কে জেগে উঠল নিজের ভেতরে বেড়ে ওঠা সেই ছোট্ট প্রাণের কথা। রিম মরণপণ লড়াই শুরু করল। অন্ধকারের গভীরে আলোর কোনো এক কণা খুঁজে পেতে সে হাতড়ে বেড়াতে লাগল জলের নিচে। কিন্তু হিমশীতল স্রোতের কাছে তার নমনীয় শরীরটা বড্ডো বেশি অসহায়। ধীরে ধীরে তার ফুসফুস অক্সিজেনের অভাবে হাহাকার করে উঠল, হাত-পা’গুলো পাথরের মতো ভারী হয়ে এল।
রিম টের পাচ্ছে, হিমশীতল পানি তার শরীরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে, যেন তাকে চিরস্থায়ী এক ঘুমের দেশে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।তলিয়ে যাওয়ার ঠিক শেষ মুহূর্তে, যখন চেতনার প্রদীপটি নিভু নিভু, রিম তার শেষটুকু শক্তি সঞ্চয় করে নিজের অবশ হাত দুটো আলতো করে পেটের ওপর রাখল। তার ঠোঁট দুটো শেষবারের মতো নড়ে উঠল। তার সেই আর্তনাদ জলের বুদবুদ হয়ে ওপরে উঠে মিলিয়ে যাচ্ছিল।যা সাগরের গর্জনে হারিয়ে গেলেও মহাকাশে হয়তো প্রতিধ্বনিত হলো।

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৬

“সরি বেবি… মাম্মা কুডেন্ট সেভ ইউ। এই সুন্দর পৃথিবীটা তোমার দেখা হলো না সোনা, তার আগেই মাম্মা তোমাকে নিয়ে হারালো এই অন্ধকারে। মাম্মা তোমাকে কথা দিয়েও রাখতে পারলাম না। মাম্মা খুউব বাজে। বাট মাম্মা লাভস ইউ সোওও মাচ… মোর দ্যান হার ওউন লাইফ। মাম্মাকে ক্ষমা করে দিও সোনা………

সমাপ্ত