দাহশয্যা পর্ব ৯০ (৩)
Raiha Zubair Ripti
মাহির ঘুম ভাঙলো খুব ভোরে। চোখ মেলে তাকাতেই আবিষ্কার করলো নিজেকে এজওয়ানের শক্ত বাহুদ্বয়ের মধ্যে। মাহির কপাল ঠেকে আছে এজওয়ানের উন্মুক্ত বুকে। রাতে তাদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে। ফ্লোরে পড়ে আছে এজওয়ানের শার্ট, জ্যাকেট। মাহি গায়ের উপর থাকা চাদর টা আরো এঁটে সেটে শরীরে টেনে এজওয়ানের বুকে মুখ গুঁজে দিলো। সেই সময় হাল্কা করে ঠোঁটের স্পর্শটাও বুঝি গিয়ে লাগলো বুকে। সেজন্য এজওয়ান নড়েচড়ে উঠলো। হাতের বাঁধন আরো শক্ত হলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো-
“ আরেকটা দাও। ”
মাহি প্রশ্নাতীত চাহনি নিয়ে তাকালো।
“ আরেকটা দাও মানে?”
এজওয়ান ফট করে চোখ মেলে তাকালো।
“ আরেকটা চুমু দাও। ”
“ কিজন্য চুমু দিব?”
“ আমি দেই বলে। ”
মাহি মৃদু ধাক্কা দিলো এজওয়ানের বুকে। অসভ্য লম্পট লোকটা মাহির বুকের কিছুটা উপরে মাঝখানে থাকা লাল তিলে রাত হলে কম করে হলেও বোধহয় একশোটা চুমু খায়। ছেলেরা যদি লিপস্টিক ইউজ করতো তাহলে প্রতি সকালে হয়তো মাহির শরীর জুড়ে শুধু লিপস্টিকের দাগ পাওয়া যেত। মাহি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। পেছন থেকে জামার ফিতাটা লাগিয়ে বলল-
“ বাসায় চলুন,ফ্রেশ হতে হবে আমায়। আর আজকে আমার ফ্লাইট আছে। ”
এজওয়ান ফ্লোর থেকে শার্ট টা পড়ে মাহির কাছে এগিয়ে এসে কোমর টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে হিসহিসিয়ে বলে-
“ আজই চলে যাবে? রাত হলে মিস করবো কিন্তু। ”
মাহি বাঁকা চোখে তাকালো। লম্পট রাত হলেই শুধু মাহি কে মিস করবে! এজওয়ান মাহির তাকানো দেখে ঠোঁটের উপর সফট করে একটা শুঁকনো চুমু বসিয়ে বলে-
“ এভ্রি সিঙ্গেল টাইম,আই অলসো মিস ইউ সুইটহার্ট। শুধু রাত নয় কিন্তু দিনেও.. ”
মাহি এজওয়ান কে ধাক্কা দিয়ে সরি দিয়ে বলল-
“ শুধু রাত হলেই মাহি কে মিস করেন। ”
এজওয়ান চোখ টিপে মুচকি হেঁসে বলল-
“ না জান,দিনেও তো মিস করি। ”
মাহি হাঁটা দিলো। পেছন পেছন এজওয়ান ও আসলো। ল্যাব থেকে বেরিয়ে নিজেদের বাড়িতে আসলো। বাড়িতে ঢুকে এজওয়ান নিজের ফোনটা পকেট থেকে বের করে দেখে ফোন বন্ধ হয়ে পড়ে আছে। এজওয়ান চার্জে দিলো। গোসল করে ফ্রেশ হয়ে তারা মেলবোর্ন এয়ারপোর্টের উদ্দেশ্যে বের হলো। মাহি জিন্স প্যান্ট,সাদা আকাশি কালার চেকের শার্ট টাইপের টপস পড়েছে। চোখে সানগ্লাস,আর কোমরে একটা ছোট ব্যাগ বাঁধা। আর হাতে ছোট ল্যাগেজ। এজওয়ান আর বাকি দিন গুলোর মতোই কালো শার্ট প্যান্ট লেদ্যার জ্যাকেট পড়েছে। এয়ারপোর্টে ঢুকে মাহি ভেতরে চলে যাওয়ার সময় এজওয়ান পেছন থেকে ডেকে বলে উঠলো-
“ যোগাযোগ থাকবে তো আমাদের মাঝে?
মাহি চলতি পথে পেছন ফিরে মুচকি হেঁসে বলল-
“ রাখবো। ”
এজওয়ান ও বিপরীতে হাসলো। হাত উঁচু করে বিদায় জানালো। মাহি শেষ বার এজওয়ান কে দেখে ভেতরে চলে গেলো। প্লেনে উঠার আগে প্যান্টের পেছন পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করলো। ফোন থেকে সিমটা বের করে ফেলে দিলো অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে। তারপর গ্যালারিতে ঢুকে এজওয়ান আর তার অ্যাওয়ার্ড ফাংশনের ছবি টা বের করলো। কে তুলেছিল মাহি জানে না। ছবিটা এমন যে এজওয়ান স্টেজে মাইক হাতে দাঁড়িয়ে আছে আর মাহি দর্শকদের সামনের সারিতে বসে হাত তালি দিয়ে এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো কোনো নিউজ পোর্টাল থেকে মাহি সেভ করেছিল। ক্যাপশনে লেখাছিলো ইংরেজি তে-“ Behind every successful man, there is a woman.” সব পুরুষের ক্ষেত্রে এই কথাটা প্রযোজ্য হলেও মাহি মনে করে এই কথাটা এজওয়ানের সাথে মিলে না। এজওয়ান যা হয়েছে তা কেবল তার নিজের পরিশ্রমে। মাহি তপ্ত একটা শ্বাস ফেললো শেষবার অস্ট্রেলিয়ার বুকে। এজওয়ানের সাথে তার যোগাযোগ রাখা সম্ভব নয়। মাহি ফোন থেকে ছবি টা ডিলিট করে দিয়ে আকাশের দিকে শেষবার তাকিয়ে বলল-
“ জানি না আপনার সাথে আমার ভবিষ্যৎ কি। তবে.. Issi Baat Ka Darr Hai Mujhko
Ke Ho Naa Jaaye Pyaar Tumse Mujhe
Kar Dega Barbaad Ishq Mujhe…. ”
মাহি ফোন টা কোমরে থাকা ব্যাগটায় রেখে প্লেনে উঠতে নিবে এমন সময় পেছন থেকে একজন মাহি কে ডেকে বলে উঠলো-
“ নূর জাহান? ”
মাহি পেছন ফিরে তাকালো। কালো স্যুট ব্যুট পরিহিত একটা লোক এগিয়ে আসছে মাহির দিকে। মাহি চিনে সেই লোকটিকে। মাহি লোকটির দিকে প্রফেশনাল ভাবে হাত এগিয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করে বলল-
“ Yes, I’m your Field Commander and Team Leader, Mr Jelex. On this mission, you’ll operate under my direction. Follow my lead, and everything will go according to plan.”
লোকটা হ্যান্ডশেক করে মুচকি হাসলো। হাত ইশারায় জানালো- যাওয়া যাক তাহলে? মাহি প্লেনের ভেতরে গিয়ে বসলো জেলেক্সের সাথে। তাদের পেছন পেছন আরো কয়েকজন লোক এসে উঠে বসলো প্লেনে। তার কিছুক্ষণ পরই প্লেনটা উড়াল দিয়ে চলে যেতে লাগলো তার নিজ গন্তব্যের দিকে।
এজওয়ান এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠে পকেট থেকে সময় দেখার জন্য ফোন টা বের করলে দেখে ফোন টা বন্ধ হয়েই আছে। চার্জে দিয়ে আর অন করতে মনে নেই। এজওয়ান গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ফোন টা অন করতেই পরপর শুধু নোটিফিকেশন আসতেই লাগলো। এজওয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। বাড়ি থেকে ফোন এসেছে কম করে হলেও ১০০ টার বেশি হবে। এত ফোন কেনো দিয়েছে বাপ,ভাই,চাচারা? এজওয়ান বাশার সুলতান কে ফোন করলো।
বাশার সুলতান শেষ রাতের দিকে নওগাঁয় এসেছে। প্রতিটি বিভাগ,প্রতিটি জেলা উপজেলার আইন সংস্থা কে লাগিয়ে দিয়েছে বাশার সুলতান তাদের একমাত্র কলিজার টুকরা রুমাইসা কে খুঁজে বের করার জন্য। সোলেমান তেহরান পাগলের মতো খুঁজে যাচ্ছে গাড়ি নিয়ে,তো কখনও পায়ে হেঁটে রুমাইসার ছবি দেখিয়ে। সানজিদা বেগম, তানজিলা বেগম সুলতান ভিলায় চলে এসেছে। এই অবস্থায় তো মেহরিন একা সবটা সামলাতে পারবে না। তার নিজেকে সামলাতেই তো অন্যজনের সাহায্য লাগবে। পোয়াতি মানুষ,তার উপর প্রেগন্যান্সিটা ভীষণই কম্পলিকেটেড। আফিয়া সুলতান বিধ্বস্ত হয়ে বাড়ির সদর দরজায় বসে আছে রুমাইসার ফেরার অপেক্ষায় সেই রাত থেকে। ভোর হয়ে সকাল হলো অথচ তার মেয়েটা এখনও ফিরলো না। বাশার সুলতান ছেলের ফোন পেয়ে তড়িঘড়ি করে রিসিভ করে কানে নিয়ে নওগাঁ বাস স্ট্যান্ডের দিকে যেতে যেতে অস্থির গলায় বলল-
“ সারা রাত কি মরে পড়ে আছিলি নাকি? কতগুলো কল দিয়েছি হিসেব আছে? ফোন বন্ধ ছিলো কেনো?”
এজওয়ান বিরক্ত হলো। গাড়ি চালাতে চালাতে বলল-
“ হ্যাঁ ম’রে পড়েছিলাম। কিজন্য এত ফোন দিয়েছিলে সেটা বলো। ”
“ রুমু কে গতকাল রাত থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। সোলেমান পাগল হয়ে যাচ্ছে রুমু কে না পেয়ে। পুরো ফোর্স খুঁজছে কিন্তু রুমুকে পাচ্ছে না। ”
এজওয়ানের হাত থেমে গেলো। কপালে পরলো দুটো ভাজ। বিস্মিত হয়ে বলল-
“ রুমু কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না মানে! খুঁজে কেনো পাওয়া যাবে না? ও বাড়ি থেকে বের হয়েছিল? হয়ে থাকলে গিয়েছিল কোথায়?”
বাশার সুলতান সবটা খুলে বলল। সবটা শুনে এজওয়ান স্তব্ধ। কার সাথে চলে গেছে তার বোন টা? এজওয়ান কোনো রকমে ফোন কাটার আগে বলল-
“ আমি আসছি এখুনি। ”
এজওয়ান গাড়ি ঘুরিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে গেলো কাউকে ফোন করতে করতে। ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ হতেই এজওয়ান গম্ভীর গলায় বলল- তাড়াতাড়ি এসো,ইমার্জেন্সি আমাকে বাংলাদেশে যেতে হবে রাইট নাও।
কল কেটে দিলো এজওয়ান। এয়ারপোর্টে আসতেই একটা কালো পোশাক পরিধান করা লোক এগিয়ে এসে বলল-
“ স্যার আপনার প্রাইভেট জেট টা বা দিকে। সব ব্যবস্থা করা আছে। ”
এজওয়ান বা দিকের রাস্তা ধরে চলে গেলো অস্থির পায়ে।
মেহরিনের তিন বেলা খাবারের পরে ঔষধ খেতে হয়। সুলতান ভিলায় বর্তমান যেই পরিস্থিতি সেই পরিস্থিতিতে মেহরিন কেনো কারোর পক্ষেই সম্ভব নয় খাবার খাওয়া,ঘুমানো,গোসল করা। মেহরিন শাশুড়ির পাশে বসে শাশুড়ি কে সামলাচ্ছে। সোলেমান এক ফাঁকে শুধু একবার শাশুড়ি কে ফোন করে বলেছিল মেহরিন কে দেখে রাখতে। বোন কে না নিয়ে তার পক্ষে বাড়ি ফেরা সম্ভব না। এতে যতদিন লাগে লাগুক। সানজিদা বেগম তানজিলা বেগম কে আফিয়া সুলতানের পাশে বসিয়ে মেহরিব কে টেনে নিয়ে গেলো। খাবার খাইয়ে দিতে চাইলে মেহরিন ফিরিয়ে দিয়ে বলল-
“ আমার গলা দিয়ে এই খাবার নামবে না আম্মু। কাঁটার মতো বিঁধবে বরং। তাই অযথা জোরাজোরি করো না আমাকে। ”
“ সোলেমান বলেছে খেতে মেহরিন। বাচ্চাটাও অভুক্ত আছে তোমার সাথে। ঔষধ ও খেতে হবে। বাচ্চার কথাটা তো ভাবো মা। ”
মেহরিন এক মুঠো সাদা ভাত মুখে নিয়ে এক গ্লাস পানির সাথে ঔষধ টা খেয়ে বলল-
“ হয়েছে এখন? ”
মেহরিন নিচে চলে আসলো। ইব্রাহিম ঊর্মি কে ঊর্মির মায়ের কাছে রেখে এসেছে। ভিলায় এসে সদর দরজার কাছে সবাই কে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে আসলো। আফিয়া সুলতান ইব্রাহিম কে দেখে বসা থেকে উঠে দুরন্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে বলল-
“ ও ইব্রাহিম, বাবা, আমার মেয়েটার কি খোঁজ পেয়েছো তোমরা? সোলেমান আমার ফোন ধরছে না। তোমার চাচারাও ফোন ধরছে না। আমার মেয়েটাকে কি তোমরা এখনও পাও নি? আমি কতক্ষণ হলো আমার মেয়েটাকে দেখছি না,আমার মেয়েটার গলার স্বর শুনছি না। কিছু তো বলো বাবা। পাও নি তোমরা?”
ইব্রাহিম কি বলবে বুঝতে পারছে না। কোনো জায়গা থেকেই রুমাইসার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
“ চাচি পাই নি এখনও খোঁজ। ”
আফিয়া সুলতান ছেড়ে দিলো ইব্রাহিম কে।
“ পাও নি? পাও নি কেনো? আমার এই টুকু একটা মেয়ে,কোথায় চলে যাবে? তোমরা ভালো মতো খুঁজছো না ইব্রাহিম। ও সোলেমান আমার মেয়েটাকে নিয়ে আয় না। সেই এক বছর থেকে রুমাইসাকে আমি কোলেপিঠে করে মানুষ করেছি। আমার বুকটা খা খা করছে রে। কোথায় পাবো আমার মেয়েটাকে। ও মেহরিন সোলেমান কে একটু ফোন করো না মা। আমার যে দম বন্ধ হয়ে আসছে। আমার মেয়েটা কেমন আছে? ”
মেহরিন এগিয়ে এসে শাশুড়ি কে জড়িয়ে শান্ত করার চেষ্টা করলো। ইব্রাহিম বেরিয়ে গেলো ভিলা থেকে। গাড়িতে উঠে ইয়াসিন কে ফোন করলো। ইয়াসিন ফোন ধরতেই ইব্রাহিম জিজ্ঞেস করলো-
“ কোনো আপডেট পাওয়া গেছে ইয়াসিন? ”
“ না ভাই, আমি পুলিশ টিমের সাথে আছি। প্রতিটা এলাকায় সব মুভমেন্ট তারা ট্র্যাক করছে। রুমাইসা কে আলতা দিঘি থেকে যেই গাড়িতে উঠেছল, সেটা শহরের পুরাতন হাইওয়ে ধরে উত্তর দিকে গেছে। প্রথমে রেলস্টেশন রোড ধরে এগিয়েছে, তারপর কাচারিপাড়ার মেইন রোড ধরে। কিছুক্ষণ পরেই গাড়িটা সোজা জঙ্গলপথে প্রবেশ করেছে, আর ওই পথ থেকে হঠাৎ শেষ হয়ে গেছে ট্র্যাক। সোলেমান ভাই, ডক্টর অয়ন আর তেহরান ওদিকে গেছে। সোলেমান ভাইয়ের গার্ড দের জঙ্গলে গাছের সাথে বেঁধে পু’ড়িয়ে মারছে। ”
“ কোন জঙ্গল? লোকেশন পাঠা কুইক। ”
ইয়াসিন লোকেশন পাঠালো। ইব্রাহিম সেদিক পানে ছুটে গেলো। আনোয়ার সুলতান বড় বড় লোকদের একটু পর পর ফোন করে জিজ্ঞেস করছে তার নাতনির খোঁজ পেলো কি না। সবাই না করছে। আমিরুল সুলতান নাসির উদ্দীনের বাড়ি গেছে। কানে খবর এসেছে তার ছেলেটা দেশে এসেছে। এজওয়ানের মা’র খেয়েই দেশ থেকে পালিয়েছিল। নাসির উদ্দীন অস্বীকার করলো। তার ছেলে নাকি দেশে আসে নি। একচোট তর্কাতর্কি মারামারিও হলো। বাশার সুলতান ভাইকে সরিয়ে নিয়ে এসেছে।
সোলেমান পুরো জঙ্গল তন্ন তন্ন করে খুঁজলো কালবৈশাখী ঝড় মাথায় করে। পুরো দিন গিয়ে রাত হয়ে গেলো এই জঙ্গল সম্পূর্ণ টা খুঁজে দেখতে। না, রুমাইসার কোনো চিহ্ন নেই এই জঙ্গলে। তেহরান তো থেকে থেকে ভয়ে ডুকরে কেঁদে উঠছে। সোলেমানের কি যে অসহায় লাগছে নিজেকে। এমন অসহায় লাস্ট লেগেছিল মায়ের মৃ’ত নিজ চোখে দেখার দিন।
কারোরই খাওয়াদাওয়া হয় নি গতকাল থেকে। একটু পর পর প্রতিটি বিভাগে ফোন করে খোঁজ নিচ্ছে সোলেমান, যদি একটু খোঁজ পায় বোনটার। কিন্তু পাচ্ছে না। সবার শুধু একই কথা। চেষ্টা করছি আমরা খোঁজার। সোলেমান জঙ্গল থেকে বেরিয়ে এবার নওগাঁর বাহিরে গেলো। পুরো নওগাঁ খুঁজেছে তারা। রুমাইসা নেই। সোলেমান এবার রাজশাহীর ভেতরে ঢুকলো। পুরো বাংলাদেশে রুমাইসার নিখোঁজ হওয়ার বিজ্ঞপ্তি, সাইনবোর্ড টানানো হলো। রাস্তা দিয়ে যেই যাচ্ছে তারই নজরে আসছে। এবার পরের দিন এজওয়ান এসেও যুক্ত হলো। গোয়েন্দা বিভাগ থেকে পুরো তথ্য জেনে নিজের মতো করে খোঁজ শুরু করলো। তার চেনাজানা পুরো টিম লোক লেলিয়ে দিলো। তার বোন কে তাদের চাই।
পুরো বাংলাদেশ জুড়ে দুটো দিন তন্নতন্ন করে খোঁজার পর খবর আসে আত্রাই নদীতে একটা হাত পা বাঁধা রমণীর অর্ধ পঁচা লা’শ পাওয়া গেছে। সেই লা’শ হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ধারণা করা যাচ্ছে ওটাই রুমাইসার মৃ’ত দেহ। কথাটা কানে আসা মাত্রই সোলেমান তেড়ে মারতে গিয়েছিল যেই অফিসার টা জানিয়েছিল তাকে। এজওয়ান ভাইকে শান্ত করলো। সে নিজেও যে ভীষণ অশান্ত হয়ে আছে। আমিরুল সুলতান বুকের পাথর চেপে ছেলেদের সাথে করে গেলেন হসপিটালের দিকে। যাওয়ার পথটা আমিরুল সুলতান আল্লাহকে স্মরণ করতে করতে গেলেন। লা’শ টা যেন তার আদরের মেয়ে রুমাইসার না হয়। তাহলে যে ঝড় নেমে আসবে এই সুলতান বংশের উপর। কিন্তু তার দোয়া হয়তো আল্লাহ ফিরিয়ে দিলো। সেজন্য বুঝি লাশ টা রুমাইসার হলো!
হসপিটালের মর্গে রাখা হয়েছিল রুমাইসার দেহ টা। সোলেমানরা যেতেই ডক্টরা রুমাইসার সাথে পাওয়া শাড়ি জুয়েলারি সব দিলো। কারোরই চিনতে এক সেকেন্ড ও লাগলো না যে ওগুলো রুমাইসার। তবে সোলেমান বিশ্বাস করছে না লাশ টা রুমাইসার হবে। ডক্টর এসে সোলেমান দের মর্গের দিকে নিয়ে গেলো। মর্গের এগারো নম্বর বক্সটা খুলতেই অর্ধ পঁচা একটা রমনীর দেহ দেখা গেলো। মুখের দিকে তাকাতেই সোলেমানের যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে যেতে লাগলো। ভারসাম্য হারিয়ে পড়ে যেতে নিলে আমিরুল সুলতান ধরে ফেললো। ওটা যে রুমাইসারই মৃ’ত দেহ! চাঁদের মতো দেখতে বোনটার মুখ কেমন কাল সেঁটে হয়ে গেছে। তারপরও সোলেমান অস্বীকার করলো। এটা রুমাইসা না। কিন্তু ডক্টর রা এসে জানালো এটাই রুমাইসা। রুমাইসার সাথে সব কিছু ম্যাচ করেছে এই মৃত দেহের।
সোলেমান বসে পড়লো ফ্লোরে। লা’শ টা বক্স থেকে বের করে নিচে নামানো হলো। সোলেমান এবার পাগলের মতো বোন কে জড়িয়ে ধরে ডেকে উঠলো। যেই বোন কে কখনো সোলেমানের একবারের চেয়ে দুবার ডাকতে হয় নি। এক ডাকেই সবসময় সাড়া নিয়েছে। সেই বোনকে আজ সোলেমান হাজার বার করে ডাকলো কিন্তু উঠলো না। সন্তানের মতো আগলে রেখেছে সর্বদা রুমাইসাকে সোলেমান। একমাত্র বোন কি না? মা’কে কথা দিয়েছিল বোনের খেয়াল রাখবে। সেই কথা যে সোলেমান রাখতে পারলো না। মরিয়ম সুলতান নিশ্চয়ই উপর থেকে সোলেমান কে ভৎসনা দিচ্ছে? বোনকে আগলে রাখতে পারলে না সোলেমান তুমি! কেমন ভাই তাহলে তুমি? ভাই নামের তো কলঙ্ক। লোকে তোমাকে দেখে হাসবে।
এজওয়ান নির্নিমেষ চোখে চেয়ে দেখলো বোনের সেই নিথর দেহটা। রুমাইসা কে সে প্রথম দেখেছিল রুমাইসার বয়স যখন ৫-৬ হবে। বাশার সুলতান রুমাইসা কে কোলে নিয়ে এজওয়ানের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলেছিল- এটা তোমার বোন,রুমাইসা। তোমার ভাইজানের একমাত্র বোন।
সেদিন এজওয়ান পুতুল স্বরূপ বোনটাকে কত আদর করলো। সেদিন থেকে রুমাইসা এজওয়ানের কাছে যা চেয়েছে এজওয়ান সেটাই এনে দিয়েছে। যা বলেছে চুপচাপ তাই শুনেছে। সেই বোন আর পৃথিবীতে নেই! ঠাস করে হাঁটু গেঁড়ে বসলো বোনের পায়ের কাছে। হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে মেরেছে তাদের এই আদরের কলিজার বোনটাকে! ওরে পাষণ্ড কুলাঙ্গার তোরা এখন বাঁচবি কি করে? তোদের মনে কি একবারও এই চিন্তা আসে নি,যেখানে সোলেমান এজওয়ান বোনের গায়ে একটা আঁচড় আসলে তারা উন্মাদ পাগল হয়ে যায় । সেই বোন কে তোরা চিরতরে মেরে দিয়ে যে পারমানেন্ট পাগল উন্মাদ বানিয়ে দিলি। এবার যে তোরা পাতালে গিয়ে লুকালেও সেই পাতাল থেকে টেনে এনে নির্দয়ভাবে মারবে এরা তোদের। নিজেদের মৃত্যুর খাতায় নাম লিখিয়েই কি তবে এ কাজটা করেছিলি তোরা?
এজওয়ান রুমাইসার শরীর ঝাঁকিয়ে রুদ্ধ গলায় বলছে-
“ রুমু বোন আমার। উঠবি না? আমাদের বুকে আয় বোন। আমাদের কষ্ট হচ্ছে রে। চাচি বাঁচবে না রে তোকে ছাড়া। তার তো তুই ছাড়া কেউ নেই। এই দেখ ভাইজান কে। ভাইজানেরও তো তুই ছাড়া কেউ নেই। আমার তো একটাই বোন ছিলো রুমু। আর সেটা তো তুই। ওঠ লক্ষীটি। বাবা রুমু ওঠে না যে। আমি কিন্তু মারবো বলে রাখছি রুমু কে। বাচ্চা মেয়ের সাহস কত। আমাদের কষ্ট দিচ্ছে এভাবে! ”
আর তেহরান? সে যে নড়াচড়া করতে ভুলে গেছে।কাঁপা কাঁপা হাতে রুমাইসার মুখে হাত রাখলো। কেমন মাংস ছিলে ছিলে গেছে। তেহরান যখন পুরোপুরি বুঝতে পারলো হ্যাঁ এটাই রুমাইসা। রুমাইসা আর নেই। তাকে ছেড়ে চলে গেছে তখন আর ঠিক থাকতে পারলো না তেহরান। রুমাইসার অর্ধ পঁচা মুখে ক্রমাগত পাগলের মতো চুমু খেয়ে বলল-
“ এই রুমু জান আমার। তুমি বলেছিলে আজীবন আমার হয়ে থাকবে। এই দেখো আমিই তোমার তূর্ণ,যাকে তুমি ভালোবেসেছিলে। দেখো আমি বলে দিয়েছি সবটা। উঠো দেখো আমাকে। তুমি বলেছিলে আমাকে ছেড়ে যাবে না। তাহলে? তাহলে এটা কেনো হলো? আঙ্কেল রুমাইসা উঠছে না কেনো? উঠতে বলুন না। আমাদের না কদিন পর বিয়ে হবে। ”
আমিরুল সুলতান এই তিন ছেলেকে কিভাবে সামলাবে? সে নিজেই তো পাগল হয়ে যাচ্ছে। বাশার সুলতানের সাহস হচ্ছে না মেয়টাকে ধরার। তাদের সুলতান বংশের একমাত্র মেয়ে ছিলো। কত আদরেই না পেলেছে তাকে তারা। কখনো কোনো অভিযোগ করার সুযোগ দেয় নি। যা বলেছে মুখ ফুটে তাই করেছে তারা। সেই মেয়েটা আর নেই। সুলতান বংশে আসা সর্বশেষ অংশটা এভাবে সবার আগে তাদের ছেড়ে চলে গেল! ওর কি মরার বয়স হয়েছে? তাহলে? বাশার সুলতান ভাইকে জড়িয়ে কেঁদে ফেললো। বড় ভাইকে কথা দিয়েছিল তার সন্তান দের সর্বদা আগলে রাখবে। খেয়াল রাখবে। এবার কিভাবে ভাইয়ের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে? ভাইয়ের কথাটা রাখতে পারলো না বাশার সুলতান। ডক্টর এসে জানালো রুমাইসা কে মারার আগে দলবদ্ধ ভাবে ধর্ষণ করা হয়েছিল। কথাটা শুনে সোলেমান এজওয়ান দুজনের রক্ত মাথায় উঠে গেলো। কে করেছে এমন টা? কে?
ফরেনসিক বিভাগের ডাক্তাররা ময়নাতদন্ত করেছে। যার কারনে রুমাইসার দেহটা কাটাছেঁড়াও করতে হয়েছে। রুমাইসার হাত পায়ের বাঁধনে দুজনের হাতের ছাপ পাওয়া গেছে। এরপর তারা পরীক্ষা করেছে রুমাইসার শরীরের বিভিন্ন জায়গা। ফরেনসিক ডাক্তাররা খুঁটিয়ে দেখেছেন,তারা চেপে ধরার দাগ পেয়েছে, নখের আঁচড় ও পেয়েছে। তারা রুমাইসার শরীর থেকে বিভিন্ন নমুনা সংগ্রহ করে। বিশেষ সোয়াবের মাধ্যমে শরীরের ভেতর থেকে নমুনা নেওয়া হয়েছে। এসব নমুনা পাঠানো হয়েছিল ল্যাবরেটরিতে, সেখানে ডিএনএ পরীক্ষা করা হয়েছে। আর একাধিক ভিন্ন ডিএনএ পাওয়া গেছে। পরিশেষে জানা গেছে তিনজন মিলে রুমাইসা কে ধর্ষণ করে তারপর হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে মেরেছে।
রুমাইসা মৃত্যুর আগে কষ্ট পেলো তো পেলোই আবার মৃত্যুর পরও তার দেহটা কাটাছেঁড়া করা হলো!
রুমাইসার মৃ’ত দেহটা সুলতান ভিলায় নিয়ে আসা হয়। আফিয়া সুলতান মেয়ের অর্ধ পঁচা মৃত দেহটা দেখে বারবার সেন্সলেস হয়ে গেছে। আর মেহরিন বাতাসি তো মানতেই পারছে না রুমু আর পৃথিবীতে নেই। রুমাইসা বলেছিল তার ভাই মানুষ হারানোর শোক সহ্য করতে পারে না। এবার তাহলে তার ভাই বোন হারানোর শোক কিভাবে সহ্য করবে? রুমাইসা বাতাসি লাগাতার ডাকতে লাগলো দুরন্ত ছুটন্ত মেয়ে রুমাইসা কে। অথচ রুমাইসা নিথর হয়ে পড়ে আছে। বৃষ্টির পানির সাথে ভিজছে দেহটা। এই মেয়েটার না খুব বৃষ্টি পছন্দ? তাহলে উঠছে না কেনো বৃষ্টি দেখেও?
বাতাসি সে যে কদিন ধরে রুমাইসার প্রতি নির্ভর হয়ে গিয়েছিল। কতটা সময় তারা এক সাথে কাটিয়েছিল। কেনো যে তেহরান এভাবে মজা করতে গেলো! এক মজাই চিরতরে নিয়ে গেলো রুমাইসা কে। সুলতান বাড়ির আঙিনা টা আজ কান্না আর আহাজারি তে তলিয়ে আছে।
রুমাইসা একদিন বলেছিল,তার বিয়েতে পুরো সুলতানপুরের মানুষ কে দাওয়াত দিবে সুলতান ভিলায়। অথচ রুমাইসা জানলোই না তার মৃত্যুতে,তাকে দেখতে, তার জানাজা পড়তে, পুরো সুলতানপুরের মানুষজন এসেছে আজ সুলতান ভিলার আঙিনায়।
ডক্টর অয়ন অদ্ভুত এক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে। রুমাইসা কে চিনতে তার যে কি কষ্ট হচ্ছে। মেয়েটার সব মতামত কে সর্বদা অয়ন সম্মান করেছে। রুমাইসা যদি তাকে বিয়ে করার জন্য রাজি হতো। তাহলে রুমাইসা হয়তো বেঁচে থাকতো! সে না যেত আলতা দিঘি আর না এমন কিছু হতো।
গ্রামের সবাই জানে রুমাইসা ছিলো এই সুলতান বংশের চোখের মনি। সবসময় ভাইদের নজরদারির উপরে থাকতো এই মেয়ে। সেই মেয়েটাকে আজ থেকে আর সুলতানপুরে দেখতে পাওয়া যাবে না। রুমাইসার মৃত্যুতে সুলতানপুরের প্রতিটি মানুষের চোখে জল এসে গেলো। তারা শুনেছিল রুমাইসার সামনে বিয়ে। ঐ তো লাশের পাশে রুমাইসার যার সাথে বিয়ে হবার কথা সেই তেহরান রুমাইসার দেহের পাশে বসে বারবার আবোল তাবোল বকছে । মা’কে দেখিয়ে বলছে-
“ ও মা, মা,রুমাইসা আমার ডাকে সাড়া কেনো দেয় না। ওরে কেউ বলো আমার কষ্ট হচ্ছে। বুকে ব্যথায় হচ্ছে। ও কিভাবে চুপ থাকতে পারছে আমাদের কাঁদিয়ে। ও না অন্যের কষ্ট সহ্য করতে পারে না? তাহলে আজ কি করে সহ্য করছে? পাষাণ হয়ে গেছে? পাষাণ মেয়ে উঠো। দেখো না আমাকে।”
নাহ্ রুমাইসা দেখলো না। রুমাইসার জানাজা সুলতানপুরে পড়ে ঢাকায় এনে সুলতান নিবাসে মায়ের পাশে কবর দেওয়া হলো। বৃষ্টির বোধহয় সুলতান বংশের সাথে কোনো একটা বিশেষ মিল আছে। তা না হলে সুলতান বংশের মানুষ যখনই মরেছে তখনই এই ঝড় বৃষ্টি এসে হাজির হয়েছে।
রুমাইসার খাটিয়া কাঁধে নিয়েছিল সোলেমান, এজওয়ান, বাশার সুলতান আর ইয়াসিন। আমিরুল সুলতানের পক্ষে সম্ভব হয় নি মেয়ের লা’শ কাঁধে নেওয়ার। আর তেহরান তো তখন ভারসাম্যহীন হয়ে ছিলো। তাকে তার মা বাবা সামলাচ্ছিলো। সোলেমান গাড়ি অব্দি নিয়ে যাওয়ার পথে দশ বারের মতো থেমেছে। জোরে জোরে শ্বাস নিয়েছে। যেই বোন কে তারা কোলেপিঠে মানুষ করলো সেই বোনকেই তারা নিজ হাতে দাফন করলো এই তীব্র বৃষ্টির মধ্যে। শেষবার সোলেমান বোনের মুখটা দেখেছিল কবরে নামানোর পূর্বে। এই মুখটা আর সোলেমানের দেখা হবে না এই পৃথিবীতে। সুলতান ভিলায় গেলে আর কেউ দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে বলবে না- ভাইজান এসেছো তুমি! রুমাইসার নম্বর থেকে আর একটিও কল আসবে না সোলেমানের ফোনে। সোলেমান বোনের কবর জড়িয়ে ধরে পড়ে রইলো কবরের পাশে। মা বাবার রেখে যাওয়া শেষ অংশ টা সোলেমান সারাজীবন আগলে রাখলো। একটা ফুলের টোকাও আসতে দেয় নি। সেই বোন এত যন্ত্রণা নিয়ে তাকে ছেড়ে চলে গেলো মা বাবার কাছে! একটা হাসিখুশি মেয়ে এভাবে সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেল!
❝ শোকের দাহে সুখেরা আজ শোকাহত…. হলো সুলতান বংশের ❞
রুমাইসা কে কবর দেওয়ার শেষে কবরের পাশে বসে ছিল এজওয়ান বাশার সুলতান, আমিরুল সুলতান । তেহরান তখন ছুটে এসে উন্মাদের মতো রুমাইসার কবর খুঁড়তে খুঁড়তে বলল-
“ এই মেয়ে ওঠো। রুমাইসা ওঠো না। ফিরে এসো আমার কাছে। আমার কাছে আসো লক্ষীটি। আমরা তো বিয়ে করবো বলেছিলাম। দেখো জান আমার কষ্ট হচ্ছে। তোমার কষ্ট হচ্ছে না বলো ঐ কবরে একা থাকতে? তুমি তো অন্ধকার ভয় পাও রুমু। তোমার শ্বাস আঁটকে আসছে তো। ”
তেহরানের বাবা মা এসে টেনে নিয়ে যায় তেহরান কে। রুমাইসা কে কবর দেওয়ার ঠিক তিনঘণ্টা পর পুরো নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে যায় রুমাইসার ধর্ষণ হওয়ার ভিডিও। সেখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে নাসিরুদ্দিনের ছেলে নাজিম কে। তার সাথে আরো দুজন লোক আছে। যেই দুজনের মুখ দেখা যাচ্ছে না। তারা রুমাইসার হাত মুখ বেঁধে তার সাথে….
সোলেমানের বুকের ভেতরটায় ঝড় উঠে গেলো। বেচারি, বোকা নিষ্পাপ রুমাইসা মরেও শান্তি পেলো না!
সোলেমান এজওয়ানের দিকে জাস্ট বাঁকা চোখে একটু তাকায়। এজওয়ান রুমাইসার ধর্ষণের ভিডিও পুরো অনলাইন সাইড থেকে ব্লক করে দেয়। যারা যারা সেই ভিডিও ডাউনলোড করেছে ইতিমধ্যে সেই ভিডিও যেন আর ফোনে অন না হয় সেই ব্যবস্থাও করে দিয়েছে।
বেশ কয়েকঘন্টা সোলেমান বোনের কবরের পাশে বসে থেকে তারপর উঠে দাঁড়ালো শক্ত হয়ে। কোথাও যেতে নিলে বাশার সুলতান জিজ্ঞেস করলো-
“ কোথায় যাচ্ছিস?”
সোলেমান কোনো দিকে না তাকিয়ে, কোনো উত্তর না দিয়ে সোজা নিবাসের ভেতরে হাঁটা ধরলো। রুমে এসে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে শক্ত গলায় বলল-
“ এই পৃথিবী,এই পৃথিবীর মানুষগুলো তোকে কোনোদিন ভালো হতে দিবে না। তোকে তোর আগের জীবনে ফিরতেই হবে, যেই জীবন তুই ত্যাগ করেছিলি বহু বছর আগে…এই পৃথিবী ভালো মানুষদের জন্য না বুঝেছিস? ভালো তো হয়েছিলি,তার বিনিময়ে কি পেলি বল? তোর একমাত্র কলিজা আদরের বোনের লা’শ পেয়েছিস তুই! এবার এই পৃথিবী কে তুই জাহান্নাম বানিয়ে ছাড়বি। ”
তারপর পরনের সুশীল পোশাকগুলো খুলে ফেলল সোলেমান। ধীরে ধীরে গায়ে চড়াল কালো পোশাক। অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যাওয়ার মতো এক ভয়ংকর রূপ। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সেই হিংস্র অবয়বটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সোলেমান। তারপর নিজেকে নিজেই অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল-
“ ওয়েলকাম ব্যাক… দ্য মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ইন দ্যা আন্ডারওয়ার্ল্ড সোলেমান সুলতান, ওরফে মাফিয়া কিং এসএস। ”
এজওয়ান রুমাইসার ভিডিও থেকে নাজিমের মুখ বাদ দিয়ে বাকি দুজনের ছবি আলাদা করে নিয়েছিল। এখন এজওয়ান তার ল্যাপটপ খুলে ভিডিওর প্রতিটি ফ্রেম মনোযোগ দিয়ে বিশ্লেষণ করতে শুরু করল। চোখ, মুখের ভঙ্গিমা, চুলের রেখা, এমনকি কাপড়ের আড়ালে ঢেকে থাকা অংশ সবকিছুকে সে স্ক্যান করল।
তারপর সে এআই ইমেজ জেনারেশন টুল ব্যবহার করে সেই ধাঁধার মতো অংশগুলোর উপর ভিত্তি করে নিজেই ছবি বানাতে শুরু করল। কয়েক ঘণ্টা ধরে সে বিভিন্ন ভার্সন তৈরি করলো চোখের ছোট ছোট আলাদা লুক, মাস্কের নিচের অংশের কল্পিত রূপ, চুলের আকার সব কিছু মিলিয়ে।
দাহশয্যা পর্ব ৯০ (২)
শেষমেশ সে হাতে পেল কয়েকটি সম্ভাব্য ছবি, যা ভিডিওর স্ট্রাকচারের সঙ্গে প্রায় নিখুঁতভাবে মেলাচ্ছে। এরপর এজওয়ান এক এক করে ক্রিমিনালদের পরিচয় খুঁজতে শুরু করল। সে অনলাইন ডাটাবেস, পাবলিক রেকর্ড, এবং পুলিশের রিপোর্ট চেক করল। প্রোফাইলগুলো মিলিয়ে, আগের অপরাধের ছবি, আর্কাইভ ক্যামেরা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট মিলিয়ে একটা ছবি বিশেষভাবে হুবহু মিলে গেলো। সেই ব্যক্তিটা আর কেউ না,সেই ব্যক্তিটি হলো শেখরের ভাই সুবহান… ডেনমার্কের কুখ্যাত ক্রিমিনাল……

কবে আসবে পরের পার্ট গুলো তাড়াতাড়ি দিয়েন আপু প্লিজ প্লিজ