দাহশয্যা পর্ব ৯১
Raiha Zubair Ripti
সেদিন সন্ধ্যার দিকে খুব বাতাস বইলো নওগাঁ জেলার বুকে। রুমাইসার কাছে এই দিনটা কি যে সুখকর লাগলো, তা বলে বোঝানো দায়। তার ভালোবাসার মানুষটা তার সামনে,তার পাশে হাতে হাত রেখে কি মুগ্ধ নয়নে তাকে দেখে চলছে। লজ্জায় মরি মরি অবস্থা। যৌবনের এই প্রথম কোনো পুরুষকে রুমাইসার ভালোবাসা, সেই মানুষটির সাথে সম্পর্ক করার এক বছরের মাথায় আজ সামনা-সামনি দেখা। এটা কি কম আনন্দের হতে পারে? মোটেই না। রুমাইসার খুশিতে উড়াউড়ি করতে ইচ্ছে করছে। তার মাথায় আসছে না তার ভাইজান তূর্ণর মাঝে কি দেখে ওভাবে রিজেক্ট করলো? এত সুন্দর অমায়িক এক সুদর্শন পুরুষ,কারোর পক্ষেই তো রিজেক্ট করা সম্ভব নয়। রুমাইশা খুব ভাবলো। কিন্তু পেলো না খুঁজে সেই কারণ। গাড়িটা যখন কাচারিপাড়ার দিকে যেতে নেয় তখন রুমাইসার কপালে দুটো ভাজ পড়ে। তূর্ণ কে জিজ্ঞেস করে –
“ আমরা এদিকে যাচ্ছি কেনো তূর্ণ? সন্ধ্যা তো হয়েই আসলো। বাড়ি ফেরা দরকার। আপনি তো ভাইয়া কে বললেন। ”
তূর্ণ বা হাত দিয়ে রুমাইসা কে জড়িয়ে ধরলো। তারপর আয়েশ ভঙ্গিতে বলল-
“ হু তোমার বাড়ি ফেরা দরকার। চিন্তা করো না। খুব সেইফলি আমি তোমাকে তোমার দোরগোড়ায় রেখে আসবো। তার আগে তোমার জন্য ছোট্ট একটা সারপ্রাইজ আছে। ”
রুমাইসা একটু আগ্রহী হলো। “ কি সারপ্রাইজ? ”
“ বলে দিলে তো আর থাকলো না। ”
গাড়িটা যখন জঙ্গলের দিকে যেতে নিবে তখন রুমাইসার শরীর টা যেন কেমন করে উঠলো। তূর্ণ কে ফের জিজ্ঞেস করলো-
“ আমরা কোথায় যাচ্ছি তূর্ণ? এই জঙ্গল টা ভালো না। আমরা এখানে এসেছি কেনো?”
“ ঐ যে বললাম সারপ্রাইজ। ”
“ তাই বলে জঙ্গলে? রাত ও হয়ে আসছে। ভাইয়া বকবে আমাকে। ”
“ বকবে না। ”
গাড়িটা থেমে গেলো মাঝ জঙ্গলে এসে। তূর্ণ নেমে হাত বাড়িয়ে দিয়ে রুমাইসাকে নামতে বললো। রুমাইসার ভীষণ ভয় করছে। ইতস্তত লাগছে। ভালো লাগছে না।
“ ভয় পেও না রুমু। নেমে এসো। আমি সাথে থাকতে এতো ভয় কিসের তোমার?”
রুমাইসার মনে হাল্কা সাহস সঞ্চয় হলো। এক আকাশ সমান অগাধ বিশ্বাস যে আছে তার তূর্ণর উপর। লোকটা পাশে থাকতে তার ভয় কিসের?
রুমাইসা নামলো গাড়ি থেকে। তূর্ণ তার হাত ধরে আরো গভীরে যেতে লাগলো জঙ্গলের। তূর্ণর এক হাতে ফোনের টর্চ জ্বালানো। আর অন্য হাতে রুমাইসার হাত শক্ত করে ধরা। মনে হচ্ছে হাল্কা ঢিলে করে ধরলেই রুমাইসা হারিয়ে যাবে।
কিছু দূর হাঁটার পর তূর্ণ তার হাঁটার গতি থামিয়ে দেয়। রুমাইসা আশেপাশে তাকায়। সবই তো অন্ধকার। সারপ্রাইজ কোথায়?
“ এখানে থামলাম যে আমরা?”
“ এখানেই আছে তোমার সারপ্রাইজ। ”
“ দেখতে পাচ্ছি না যে?”
তূর্ণ রুমাইসার হাত ছেড়ে দিয়ে দু’বার হাত তালি দিলো। মুহূর্তে পাশের কোনো এক ঝোপ থেকে হুড়মুড়িয়ে কিছু বের হয়ে আসার শব্দ পাওয়া গেলো। রুমাইসা তখনও বোঝার চেষ্টা করছে,আসলে ওগুলো কিসের শব্দ। মুহূর্তে দুটো আলো জ্বলে উঠলো ডান পাশ থেকে। রুমাইসা ঘাড় বেঁকিয়ে কিঞ্চিৎ তাকায় সেদিকে। একজন পুরুষ কে দেখতে পাচ্ছে সে। চিনে নাকি রুমাইসা তাকে? হয়তো না,হয়তো হ্যাঁ। চেহারাটা অস্পষ্ট এখনও। কাছে আসতেই রুমাইসার চোখ কপালে। এটা তো সৈকত। তেহরানের বন্ধু। সুন্দরবনে ঘুরতে গিয়ে দেখেছিলো রুমাইসা। তাকে এখানে দেখে বেশ চমকাচ্ছে রুমাইসা।
“ চিনো তাকে?”
তূর্ণর কন্ঠ শুনে রুমাইসা উপর নিচ মাথা দুলিয়ে বলে- “ হু। উনি তো তেহরানের বন্ধু সৈকত ভাইয়া। আপনি চিনেন কিভাবে?”
তূর্ণ কেবল একটা রহস্যময় হাসি দেয়। কিছু বলে না আর। কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলে-
“ তোমাকে পাওয়ার জন্য তেহরানের বন্ধু সৈকতের অনেক অবদান আছে। ”
“ কিভাবে? তারমানে আপনি তেহরান কেও চিনেন? আর তেহরান আপনাকেও? অথচ উনি যে বললো আপনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন না। ”
“ সে অনেক কথা। সৈকত এদিকে এসো। ”
সৈকত এগিয়ে আসলো। দু’জন কোলাকুলি করলো। তারপর দু’জনই এগিয়ে আসলো রুমাইসার দিকে। রুমাইসার চোখ মুখে তখনও তূর্ণ কে নিয়ে পৃথিবীর সব চেয়ে স্নিগ্ধ অনুভূতি বিরাজমান। তাদের এগিয়ে আসা দেখে তার মনের মধ্যে একটুও সন্দেহের দানা বাঁধলো না। সে ভাবছে হয়তো তূর্ণ তাকে সত্যি সত্যি কোনো সারপ্রাইজ দিবে। হ্যাঁ দিলো তো সারপ্রাইজ। পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্টতম একটা সারপ্রাইজ উপহার দিলো রুমাইসা কে।
তারা দু’জন এগিয়ে এসেই রুমাইসার দুটো হাত ধরলো। রুমাইসা অবাক হয়ে তাকালো। তূর্ণ ধরবে কিন্তু সৈকত কেনো ধরলো? রুমাইসা কিছু বলে ওঠার আগেই তারা দু’জনে রুমাইসাকে টেনে ফেলে দিলো মাটিতে।
রুমাইসা যেন হতবাক হয়ে গেলো। ফেলে দিলো কেনো? এ কেমন ব্যবহার? রুমাইসা সামনে ফিরে তাকালো। তূর্ণর মুখে পৈশাচিক হাসির রেখা দেখা যাচ্ছে। তূর্ণ ওমন করে হাসছে কেনো? বুকটা ধক করে উঠলো রুমাইসার। মাটি থেকে উঠতে গেলে আচমকা সৈকত রুমাইসার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নরপশুর মতো। রুমাইসা চিৎকার দিয়ে উঠে। তূর্ণ কে ডাকে। তূর্ণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে। সৈকত রুমাইসার সাদা শাড়ির আঁচল ধরে টান দিতে নিলে রুমাইসা অজানা এক আতঙ্কে তূর্ণর দিকে তাকিয়ে বলে-
“ আমার শাড়ির আঁচল ছাড়ুন সৈকত। তূর্ণ আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছেন! কিছু বলছেন না যে! দেখুন কেমন অসভ্যতামি করছে। আপনি থামান না তাকে। সৈকত ভাইয়া ছাড়ুন আমাকে। দোহাই লাগে ছাড়ুন। তূর্ণ.. তূর্ণ ছাড়তে বলুন আমাকে। ”
না সৈকত ছাড়ছে না। তার খুব লোভ জাগছে এই নরম তুলোর মতো শরীর টার প্রতি। তেহরান যেদিন প্রথম রুমাইসার কথা জানিয়েছিল সেদিন থেকেই তার রুমাইসার প্রতি একটা লালসা লোভ কাজ করছিলো। এই শরীরটা ছুঁয়ে দেখার খুব ইচ্ছে জেগেছিল। এমপির বোন বলে কথা। সেই ইচ্ছে আজ পূরন হতে যাচ্ছে। সৈকত কি আর থামবে?
রুমাইসার তূর্ণ কে নিয়ে এতক্ষণ অব্দি ভাবা সব ভালো লাগা,শ্রদ্ধা ভালোবাসা, ভরসা যেন এক নিমিষে কর্পূরের মতো উবে গেলো। ক’মিনিট আগেও সে এই তূর্ণ কে ভরসা করছিলো,কত কি ভাবছিলো। কিন্তু এই তূর্ণ এটা কি করছে? মিনিটের ব্যবধানে এতটা তফাৎ! রুমাইসা তো কল্পনাতেও ভাবতে পারে নি তূর্ণ এমনটা করবে! এটাই কি তাহলে তার সারপ্রাইজ ছিলো! এক বছরের ভালোবাসা, সবটাই কি তাহলে রুমাইসার ভুল ছিলো! তূর্ণ তাকে ঠকালো!
রুমাইসা বুঝে গেলো সৈকত তার ইজ্জতে হাত দেওয়ার চেষ্টা করছে। আর তূর্ণ বাঁধা দিবে না। রুমাইসা আকুতি মিনতি করলো এবার। নিজেকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করলো। দৌড়ে গিয়ে তূর্ণর হাত ধরলো। তূর্ণ ছাড়িয়ে নিলো হাত। রুমাইসা পা ধরলো। রুমাইসা জীবনে কারো পা ধরে নি। সেই রুমাইসা আজ তূর্ণর পা ধরছে। অসহায় কন্ঠে বলছে-
“ এমনটা কেনো করছেন তূর্ণ? আপনি না আমাকে ভালোবাসেন? তাহলে? তাহলে কেনো এমন করছেন? আমি তো আপনাকে অনেক ভালেবাসছি। অন্ধের মতো ভালোবাসছি। সেজন্যই তো দেখেন ভাইয়া মানা করার পরও আপনার সাথে দেখা করতে আসছি। আপনার কি আমাকে পছন্দ হয় নি? আমাকে কি ভালোবাসেন নি? ভালো না বাসলে বলে দিন,ছেড়ে দিন। এমন করার কি মানে? ”
তূর্ণ লাথি দিয়ে সরিয়ে দিলো রুমাইসা কে।
“ ভালোবাসা মাই ফুট। কোনোদিন ভালোবাসি নি আমি তোকে। যা করেছি এই এক বছর,জাস্ট তোকে পটাতে। আর আজকের দিনে তোর সর্বনাশ করার জন্য। তোর দোষ কি জানিস? তোর একমাত্র দোষ তুই সোলেমানের বোন। ”
রুমাইসার দু চোখ ভরে গেলো অশ্রু তে। মনে হচ্ছে সে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। কেউ ডেকে তুললেই এই দুঃস্বপ্ন টা ভেঙে যাবে। কিন্তু কেউ তো ডাকছে না। তার ভালোবাসা এভাবে মিথ্যা প্রমাণিত হলো! এখন রুমাইসা বুঝতে পারলো তার ভাইয়া কেনো মানা করছিলো! রুমাইসা কেনো শুনলো না ভাইজানের কথা?সোলেমান বলেছিল ভাইয়ার উপর ভরসা রাখতে। অথচ রুমাইসা রাখলো কই? নিজের ভালোবাসার প্রতি অন্ধ হওয়ার ফল আজ এভাবে পাচ্ছে! তার ভাইজান কি করেছে তূর্ণর?
রুমাইসা তূর্ণর কলার চেপে ধরে বলল-
“ কি করেছে কি আমার ভাই আপনার? ”
“ সেটা তোর না জানলেও চলবে। তোর ভাই খুব ভালো করেই জানে এটা। ”
কথা বলার মাঝখানেই সৈকত ফের ঝাঁপিয়ে পড়লো রুমাইসার উপর,তবে মুখে কালো কাপড় বাঁধা এবার। এক টানে শাড়ি টা খুলে ফেললো। পড়নের ব্লাউজ গুলো টেনে ছিঁড়ে ফেললো। রুমাইসা চিৎকার করে ডাকলো ভাইকে। তার ভাই কি আর এই ডাক শুনতে পাবে? পাবে না। রুমাইসা আল্লাহ কে বললো তার ভাইদের পাঠাতে। আল্লাহ পাঠালো না। রুমাইসার চিৎকারে কানের পর্দা ফেটে যাচ্ছে বলে তূর্ণ গিয়ে শাড়িটা দিয়ে হাত মুখ বেঁধে দিলো। তারপর সিগারেট ধরিয়ে ফোনের ক্যামেরা অন করে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভিডিও করতে লাগলো। সৈকত প্রথম ধর্ষণ করলো রুমাইসা কে। সৈকত তার তৃপ্তি মেটানো শেষ হলে তূর্ণও মুখে কালো কাপড় বেঁধে রুমাইসা কে ধর্ষণ করে। তখন ঝুম বৃষ্টি নামলো। বাতাসটাও ভারী হলো।
রুমাইসা চিৎকারও করতে পারছে না মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা থাকায়। সে শুধু ছটফট করছে। নিজের প্রেমিকের হাতে ধর্ষণ হতে হলো রুমাইসা কে! শুধুই কি প্রেমিকের হাতে? তেহরানের বন্ধু আছে,শেষে সাথে এসে জুটলো নেশায় বুদ হয়ে থাকা নাজিম। তাকে সৈকতই টেনে নিয়ে এসেছে। তারপর উস্কে দিয়েছে,কিভাবে রুমাইসা কে উত্যক্ত করার কারনে এজওয়ান পিটিয়েছিল। কিভাবে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছে। সব কিছুর ক্ষোভ নাজিম মিটিয়ে নিলো রুমাইসার শরীরের উপর দিয়ে।
রুমাইসা কাউকেই বাঁধা দিতে পারলো না। তিন তিনটা পুরুষ তাদের তৃপ্তি ভরে টানা ৫ ঘন্টা রুমাইসার শরীর টা খুঁড়ে খুঁড়ে খেলো। রুমাইসার চোখের জল বৃষ্টির পানির সাথে মিশে একাকার। রুমাইসার বোবা আর্তনাদে কারোরই মন গলে নি।
ধর্ষণ শেষে তারা রুমাইসা কে আগুনে পুড়িয়ে মা’রতে চেয়েছিল। কিন্তু বৃষ্টির জন্য তা সম্ভব হয় নি। তখন তারা সিদ্ধান্ত নিলো রুমাইসার হাত পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিবে।
এই সেই বৃষ্টি, যেটা প্রেমা মৃত্যুর আগে চেয়েছিল। কিন্তু আকাশ থেকে সেদিন এক ফোটাও বৃষ্টি নামে নি। আর আজ রুমাইসার মৃত্যুর সময় বৃষ্টি এসে হাজির।
রুমাইসার মুখের বাঁধন খুলে দেওয়া হলো এবার। শরীর জুড়ে তীব্র ব্যথা। কি কষ্ট! এভাবেই বুঝি মেয়েরা ধর্ষণ হয়! ওদেরও এমন নরক যন্ত্রণা লাগে! রুমাইসা বুঝে গেলো আজই হয়তো তার পৃথিবীতে শেষ দিন। সে ম’রে গেলে তার পরিবার তো শোকের ছায়ায় ডুবে যাবে। কত আদরের মেয়ে সুলতান বংশের রুমাইসা। মেয়ে হারানোর শোক সহ্য করতে পারবে না তার পরিবার। তারপরও একটুখানি বাঁচার আশা নিয়ে ব্যাথা যুক্ত শরীর নিয়ে আহাজারি করে দু হাত একত্রে করে ভিক্ষা চেয়ে রুমাইসা বলল-
“ ও তূর্ণ, নাজিম আমারে অন্তত একেবারে মাইরা ফেলাইয়েন না। আমি মরে গেলে আমার চাচা চাচি পাগল হয়ে যাবে। তাদের তো কোনো সন্তান নাই। আমারে নিজের মেয়ের মতো ভালোবাসছে। আর আপনারা তো জানেন আমার ভাইজানের কলিজার টুকরা আমি। আমার ভাইয়ের কলিজা টাকে তার থেকে অন্তত চিরতরে আলাদা কইরা দিয়েন না। আমার ভাইজান কদিন পর বাপ হবে। তার সন্তান টা আমারে কোলে নিয়ে দেখার একটু সুযোগ দেন। হ্যাঁ আমি ভুল করছি। আপনার মতো জঘন্য এক পুরুষরে ভালোবেসে আমি জীবনের সর্বপ্রথম ভুল করছি। আমার ভাইজান মানা করছিলো আপনারে ভালোবাসতে। আমি শুনি নাই। সবার বিরুদ্ধে গিয়া আপনারে ভালোবাসছি। তার শাস্তি আমি আজ পাইছি। আপনারা আমারে শেষ করে দিছেন। আমার মান সম্মান, ইজ্জত জীবন সব শেষ কইরা দিছেন, এইবার অন্তত ছাইড়া দেন। আর কষ্ট দিয়েন না আমারে। এমন কষ্ট আমি জীবনেও পাই নাই। আমার ভাইরা আমারে আজীবন আগলায় রাখছে। কোনোদিন ফুলের টোকাও লাগতে দেয় নাই শরীরে। সেই বোনের শরীর টা আজ ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাইছেন আপনারা। আল্লাহর দোহাই লাগে মাইরেন না। আমি মরে গেলে আমার ভাইরা উন্মাদ হয়ে যাবে…খ্যাপা পশুর মতো হয়ে যাবে..আমার ভাইরে পশু হইতে বাধ্য কইরেন না..অনেক কষ্টে আমার ভাই ভালো মানুষ হইছে এবার পশুতে রূপান্তর হয়ে গেলে দুনিয়া জাহান্নাম হয়ে যাবে..চারিদিকে লাশের বন্যা বসে যাবে….
তূর্ণ কেবল বলল-
“ আমি চাই তোর ভাইরা খ্যাপা পশু হোক। ওরা যত খ্যাপা পশু উন্মাদ হবে। ততই ওরা নিজেদের মৃত্যুর পথ স্পষ্ট করবে,পদে পদে ভুল করবে। আমার জন্য ততই সহজ হবে ওদের মা-রা। ”
তারপর আর কোনো কথা হলো না। রুমাইসার দেহটা নিয়ে তারা আত্রাই নদীর মাঝে গিয়ে জীবন্ত হাত পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে আসে। রুমাইসা দুই ভাবে মৃত্যুর স্বাদ অনুভব করলো। সাঁতার কেটে নদী ঘুরে বেড়ানো মেয়েটা আজ আর সাঁতার কেটে নিজেকে বাঁচাতে পারলো না। নাক মুখ দিয়ে ক্রমাগত যখন পানি ঢুকে নিশ্বাস আঁটকে আসছিলো..তখন রুমাইসার স্মৃতিচারণে কেবল তার ভাই ছিলো। তার ভাই কি জানতে পারবে রুমাইসার এই পরিনতির কথা? কিভাবে কত কষ্ট দিয়ে মারা হলো রুমাইসা কে। ভাইয়ের সন্তান টাকে যে আর দেখা হলো না রুমাইসার। বাচ্চাটা আর হিংসে করবে না রুমাইসা কে। হিংসে করার জন্য যে রুমাইসা আর নেই। ভাইজানের সবটুকু ভালোবাসা পাবে এবার। আর মেহরিন? সে তো খুব চাপা স্বভাবের। বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। ভাইজান কে সবসময় সব কিছু তো রুমাইসাই বলতো মেহরিনের হয়ে। এবার থেকে কে বলবে? বাতাসি মেয়েটা কি আবার অযত্নে থাকা শুরু করবে? রুমাইসা তো শিখিয়েছিল কিভাবে নিজের যত্ন নিতে হয়। আফিয়া সুলতান কতদিন অসুস্থ হয়ে থাকবে মেয়ে হারানোর শোকে? আমিরুল সুলতান কে বাবা ডেকে ডেকে কে পাগল করে তুলবে? বাশার সুলতান কে ফোন করে কে খোঁজ খবর নিবে? কে বলবে চাচা আমাকে এখানে নিয়ে যাও। ওখানে নিয়ে যাও। আর এজওয়ান.. তাকেই বা কে ফোন দিয়ে বলবে- ভাই হোয়াটসঅ্যাপ… আজও কি ঝগড়া করেছো মাহি ভাবির সাথে? তারা তো আবার স্বামী স্ত্রী কম,টম জ্যারি বেশি।
আর তেহরান? তেহরানের কথাও আসলো স্মৃতিতে। তাদের বিয়ের কথাবার্তা চলছিলো। যতই অসহ্য লাগুক। ভাইজানের কথা শুনে তাকে বিয়ে করলে হয়তো রুমাইসা আজ বেঁচে যেত?
এই বিশাল এক পৃথিবী থেকে কিভাবে সবার আড়ালে রুমাইসা নামের একটা মেয়ে হারিয়ে যেতে লাগলো। ইশ কেউই জানলো না,কেউ না!
আচ্ছা কি দোষ ছিলো তার? ভালোই তো বেসেছিলো একটা পুরুষ কে। এটাই কি তাহলে তার অপরাধ? একটা ভুল মানুষকে ভালোবেসেছিল! সেজন্যই কি তার সাজা এভাবে পেতে হলো!
নাহ্ রুমাইসার কোনো অপরাধ নেই তার ভালোবাসায়। আর না সে ভালোবেসেছিল কোনো ভুল মানুষকে। কিন্তু রুমাইসা এই চিরন্তন সত্যি টা আর কখনো জানতেই পারবে না যে, সে তূর্ণ ভেবে যাকে ভালোবেসেছিল…সে আসলে তার ভাবির খালাতো ভাই তেহরানই ছিলো..যাকে রুমাইসা সহ্যই করতে পারতো না….
একটা অপ্রাপ্তি,একটা অসত্য,আর অজানাকে নিয়েই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলো সর্বদা পুষ্পের ন্যায় আগলে থাকা রুমাইসা নামের এক রমণী মার্চের ৩১ তারিখ,সাল ২০২২।
নাজিম কে খুঁজে বের করতে খুব একটা কষ্ট করতে হয় নি সোলেমানের। নেশায় বুদ হয়ে রুমাইসার সাথে করা অমানবিক কাজের কথা তেমন একটা মনে ছিলো না। যখন পুরোপুরি মনে পড়লো তখন মাথা কাজ করলো না। পালাবে পালাবে করেও আর পালানো হলো না। তার আগেই সোলেমান তাকে ধরে ফেলেছে এক জনসভার ভীড় থেকে। সোলেমান সেই জনসভার মাঝেই নাজিম কে মেরেছে কু’ত্তার মতো। নাজিম মা’র খেয়ে জনসম্মুখে স্বীকার করেছে সব টা। মূলত সৈকতই তাকে সেদিন ডেকেছিল। তার দুদিন আগে দেশে এসেছিল নাজিম। প্ল্যান মাফিকই নাজিম কে দেশে আনা হয়েছি। অনেক দিনের প্ল্যান কি না? আর সেদিন সৈকত ডেকে খুব নেশা করায়। মূলত নাজিম কে তারা গুটি হিসেবে ইউজ করেছে। সব স্বীকার করার পর সোলেমান তার শরীর থেকে জামাকাপড় খুলে,হাত পা বেঁধে ওভার ব্রিজের সাথে ঝুলিয়ে উন্মুক্ত শরীরে কেরোসিন তেল ঢেলে পু’ড়িয়ে মে’রেছে।
পুলিশ এসে থামাতে চাইলে সোলেমান হাতের ইশারায় দূরে থাকতে বলে বলেছে-
“ একদম আইন শেখাতে আসবি না আমাকে। তোদের আইনের দূর কতটা সেটা আমাকে শেখাস না। ধর্ষণ করা অপরাধী দের ক’জনের শাস্তি দিতে পেরেছিস তোরা? বল কজন পেয়েছে ইনসাফ? কেউই পায় নি। সেই আমি তোদের ভরসায় থাকবো? আমার বোনের অপরাধী দের শাস্তি দিবি তোরা? আমি সোলেমান, তাই আমার বোনের ইনসাফের ন্যায় আমি দিব। কোনো আইন না। কোনো আইন আমাকে ঠেকাতে আসলে তার খবর আছে। আমি আজ ডিক্লেয়ার করে দিলাম…যখনই কোনো ধর্ষক কে আপনারা পাবেন,কোনো আইনের হাতে তুলে দিবেন না। এভাবে জনসম্মুখে এনে চিরতরে মে’রে ফেলবেন। এতে একটা জন্মপরিচয়হীন অজাত কমবে পৃথিবী থেকে। এমন অজাত,খা**কির ছাওয়াল রা বাংলাদেশ থেকে বিদায় নিলে বাংলাদেশের কোনো সমস্যা হবে না। যাদের সমস্যা হবে,সেই খা**কির ছাওয়াল দেরও বাংলাদেশ থেকে তাড়াবো চিরতরে। ধর্ষকের হয়ে যেই সব উকিল কোর্টে কেইস লড়িস…তোদের নিজেদের জন্মের ঠিক নেই। তোরা নিজেরাও হয়তো নিজেদের পরিবারের মানুষদের দিনরাত ধ’র্ষণ করিস। সেজন্য এমন কেইস নিয়ে লড়িস। লজ্জা পা একটু। নিজের সততা কে বিক্রি করে দিচ্ছিস তোরা টাকার কাছে। এমন দিন যেন না আসে যে নিজের মেয়ের ধর্ষণের কেইস তোকে লড়তে হয়।”
সোলেমান ক্ষমতাশালী ছিলো,সেজন্য না হয় তার বোনের ন্যায় সে পাইয়ে দিলো। কিন্তু যারা সাধারণ মানুষ তারা? যারা রাস্তাঘাটে হাঁটতে গিয়ে ধর্ষণ হয়। মসজিদে ইমাম,মন্দিরের পুরোহিত, বখাটে ছেলেদের হাতে বিনা কারনে ধর্ষণ হয়? পাঁচ দশ বছরের মেয়ে গুলোর তো পিরিয়ড টাও শুরু হয় না এই বয়সে। তাদের শরীর তো তেমন আকর্ষণীয়ও না। তারা তো কেবল শিশু,সেই তারাও তো ধর্ষণের শিকার হয়। তাদের ন্যায় পাইয়ে দিবে কে? তাদের তো সোলেমানের মতো ক্ষমতাশালী ভাই নেই। আর আইন? তার কথা কি বলবো? তারা তো ক্ষমতাশালী দের কাছে টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যায়। এই বাংলাদেশে বসবাস করে ধর্ষণের শিকার হবে। আবার ধর্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করবে। আর সেই রায়ে তুমি ইনসাফ পাবে! বড়ই বোকা চিন্তা ভাবনা তোমাদের। এ দেশে কোনো বিচার হয় না অপরাধীর। বিচার হয় কেবল নিরপরাধীর। যেমন,ফেলানি,বাতাসির ভাই ফাহাদ মোস্তফা,প্রেমা আরো অনেক আছে এই ভুক্তভোগীর তালিকায়। গুনে শেষ করা যাবে না।
আমরা মানুষ বড় অদ্ভুত জাতি। নিজের উপর আঘাত আসলেই কেবল আওয়াজ তুলি। আর অন্যের বেলায় মুখ বুঝে কেবল চুপ থাকি…
কাঠফাটা এক রোদ্দুরে দিন। তেহরান ঘর্মাক্ত শরীর দাঁড়িয়ে আছে এক ধুলোপড়া রাস্তার মোড়ে। বারবার হাত ঘড়িতে সময় দেখছে। রুমাইসার আসার কথা। রুমাইসা আসছে না কেনো? অপেক্ষা আর শেষ হচ্ছে না। তেহরান বিরক্ত হয়ে আশেপাশে তাকালো। মেয়েটা আসলে খুব করে বকুনি দিবে। ট্যিসু দিয়ে ঘর্মাক্ত মুখটা মুছতেই সামনে আবির্ভাব হলো প্রেয়সীর। সাদা সফেদ শাড়ি,ঠোঁটে লাল টকটকে ডার্ক লিপস্টিক। কানের পাশে এক গুচ্ছ গোলাপ গোঁজা। আর হাতেও লাল গোলাপের গুচ্ছ। তেহরানের মুখে হাসি ফুটলো। রুমাইসা কি চমৎকার মৃদু হেঁসে এগিয়ে আসছে। তেহরান ঘড়িতে সময় দেখিয়ে বলল-
“ কতটা দেরি করলে? পুরো চল্লিশ মিনিট অপেক্ষা করিয়েছো আমার পঁচা মেয়ে। ”
রুমাইসা কিছু বলছে না। কেবল হেঁসে এগিয়ে আসছে।
“ অপেক্ষা করিয়ে হাসছো?”
রুমাইসা এবার উত্তর দিলো-
“ তাহলে কি কাঁদবো? ”
কি আশ্চর্য রুমাইসার পথ ফুরোচ্ছে না কেনো? তেহরানও হাঁটা ধরলো।
“ তুমি কাঁদবে কেনো? কাঁদবো তো আমি আজীবন। ”
“ কথাটা মন্দ বলেন নি। আসলেই কাঁদবেন। আজীবন কাঁদাবো। ”
“ তুমি কাঁদালে আমি আজীবন কাঁদতে রাজি।”
“ ভেবে বলছেন তো?”
“ এতো ভাবাভাবির কাজ আমার দ্বারা হয় না। আমাদের পথ ফুরচ্ছে না কেনো রুমু? আমরা সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে হেঁটে আসছি। অথচ কাছে আসতে পারছি না। এতো দূরত্ব কেনো আমাদের মাঝে? দাঁড়াও দৌড়ে আসছি। ”
তেহরান দৌড় দিলো। কি আশ্চর্য রুমাইসা তো আরো দূরে চলে যাচ্ছে!
“ কোথায় যাচ্ছ তুমি রুমু? পালাচ্ছ কেনো আমার থেকে?”
রুমাইসা আগের ন্যায় হেঁসে বলল-
“ এতদিন আপনি পালিয়েছেন। এবার তো আমার পালা। ”
“ দূরত্ব আর ভালো লাগছে না। আমি ঘুঁচিয়েছি। তুমিও ঘুঁচাও। ”
“ আমি তো চেয়েও পারছি না ঘুঁচাতে। এই দেখুন আপনাকে ছুঁতে চাই অথচ পারি না। এই কষ্ট এখন কোথায় রাখি বলুন তো?”
“ কেনো পারছো না ছুঁতে? আমরা তো সামনা-সামনি দাঁড়িয়ে। তাহলে কিসের দেওয়াল আছে আমাদের মাঝে?”
“ ইহকাল পরকালের এক অদৃশ্য দেওয়াল আছে আমাদের মাঝে। আপনি ইহকালের বাসিন্দা। আর আমি পরকালের বাসিন্দা। ”
“ এই মেয়ে কি বলছো কি তুমি? রাগিও না আমাকে। উল্টাপাল্টা কথা বলছো এসে থেকে। তুমি আর পালাবে না। আমি আসছি তো…
তেহরান দৌড়াতে গিয়ে ইটের সাথে বেঁধে মাটিতে পড়ে গেলো। ধুলোবালি দিয়ে মেখে গেলো পুরো শরীর। মাথা উঁচু করে তাকাতেই সামনে দেখতে পেলো খাটিয়ায় সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানে রুমাইসার মৃতদেহ। কি আশ্চর্য! সামনেই তো রুমাইসা দাঁড়িয়ে আছে। তাহলে খাটিয়ায় কিভাবে আসবে!
তেহরান উঠে দাঁড়াতেই খাটিয়া ধরে চারজন লোক নিয়ে যেতে লাগলো। তেহরান অবাক হয়ে বলল-
“ রুমাইসা কে কোথায় নিয়ে যাচ্ছ তোমরা? রুমু ওরা তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? ”
রুমাইসা হাসতে হাসতে জবাব দিলো –
“ পরকালে…আমি যে ম’রে গেছি। ভুলে গেছেন? আমাকে যে মেরে ফেলা হলো। ওদের শাস্তি দিবেন না? ওরা আমাকে আপনার থেকে চিরকালের জন্য দূরে সরিয়ে দিয়েছে যে। ”
তেহরান একবার রুমাইসা তো আরেকবার খাটিয়ার দিকে তাকায়। তারপর দিশামিশা না পেয়ে খাটিয়ার পেছনে ছুট লাগায়। আবার পায়ের সাথে পা বেঁধে পড়ে যায়। তেহরান উঠার আগেই কেমন যেন অন্ধকারের সাথে মিলিয়ে যেতে থাকে রুমাইসার লাশ বহনকারী খাটিয়া..তেহরান কেঁদে উঠে…
~কোন ভুলে তুমি শুলে বলো,এই ফুলসজ্জায়….
স্বপ্নের লাশ কাঁধে নিয়ে, ওরা কেন চলে যায়…
আজ ভাঙা বুক, খোঁজে হাসি মুখ
দেখি জ্বলে সে চিতায়….. প্রেম আমার…….
“ রুমাইসা..!!”
রুমাইসার নাম নিয়ে ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে তেহরান। হাতের দিকে তাকাতেই দেখতে পেলো স্যালাইন লাগানো। রুমাইসার মৃ’ত্যুতে শরীর দূর্বল হয়ে অসুস্থ হয়ে গেছে তেহরান। দানাপানি এখনও পেটে যায় নি তার। বাবা মা ধরে ধরে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে শান্ত রেখেছিল। সেই ঘুমও শান্তি দেয় নি তেহরান কে। ঠিকই জাগিয়ে তুলেছে। তেহরানের কানে এখনও আসে নি যে তার প্রানপ্রিয় বন্ধ সৈকতের হাত আছে তার রুমাইসার মৃত্যুর পেছনে। জানলে হয়তো তেহরানকে শান্ত রাখা যেত না ইনজেকশন দিয়ে।
তেহরান বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। উষ্কখুষ্ক চুল,শুঁকিয়ে যাওয়া চোখ মুখ নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে বসার ঘরে দেখে তার মা সোফায় ঘুমিয়ে আছে। হয়তো এতক্ষণ জেগে জেগে বসে পাহারা দিচ্ছিলো ছেলেকে। তানভীর হয়তো কোথাও আছে একটা। তেহরান সোজা হেঁটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। সুলতান নিবাসে আসে পায়ে হেঁটে। এসে রুমাইসার কবরের পাশে শুয়ে থাকে। এই পৃথিবী এত বিষাক্ত কেনো? ভালো লাগছে না। বুক ফেটে যাচ্ছে। কি যে সেই কষ্ট! তেহরান রুমাইসার কবরে হাত বুলিয়ে বলে-
“ ভালো আছো? আমি তো ভালো নেই মেয়ে। এভাবে আমাকে একা করে ফেলে চলে গেলে! ভাবলে না আমার কথাটা একবারও! এই তুমি কি শুনেছো? আমি তেহরানই তোমার তূর্ণ। নাকি এই সত্যি টা না জেনেই চলে গেছো? জানো আমি কত কি প্ল্যান করে রেখেছিলাম? তোমাকে নিয়ে দেশ বিদেশে ঘুরবো। দেখেছো তো আলমারি ভর্তি কত শাড়ি কিনেছিলাম তোমার জন্য। এখন সেগুলোর কি হবে? শাড়ি আছে অথচ সেগুলো পরিধান করার মানুষটাই আর নাই। তোমার এই অবেলায় চলে যাওয়ার শূন্যতা আমাকে শেষ করে দিচ্ছে। খোদার কাছে মৃত্যু চাচ্ছি। দিচ্ছে না কেনো? আমার কাছে এক একটা দিন একটা বছরের মতো লাগছে রুমু। আর পারছি না….”
এজওয়ান নিবাস থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। তেহরান কে দেখে দাঁড়িয়ে গেলো। ছেলেটাও পাগল হয়ে গেছে তাদের মতো। সুবহান আর সৈকতের লোকেশন খুঁজে বের করেছে এজওয়ান। সোলেমান গিয়েছে সেখানে। এজওয়ান কে যেতে দেয় নি। সে সৈকত কে ধরতে বলেছে। এজওয়ান তেহরানের দিকে এগিয়ে আসলো। পিঠে হাত রাখতেই তেহরান তার দিকে তাকালো। সাথে সাথে শোয়া থেকে উঠে বসে বলল-
“ আপনারা পেয়েছেন রুমুর হত্যাকারী দের? দিয়েছেন শাস্তি? জঘন্য মৃত্যু কি দিয়েছেন? ”
এজওয়ান বুঝলো তেহরান খুনি কারা তাদের বিষয়ে অজানা। সেজন্য এজওয়ান প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল-
“ পেয়েছি। চলো সাথে। ”
তেহরান উঠে দাঁড়ায়।
“ কোথায়? রুমাইসার কাছে?”
এজওয়ান আহত দৃষ্টি নিয়ে তাকায়।
“ সৈকতের কাছে। ”
তেহরান কিছুটা চমকায়। সৈকতের কাছে কেনো যাবে?
“ সৈকত, নাজিম,সুবহান মেরেছে আমার বোন টাকে। ”
হাতের মুঠো শক্ত হয়ে আসলো তেহরানের। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যেতে চাইলেও তেহরান তা ধরে রাখে। বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না। কিন্তু এজওয়ান ছবিগুলো যখন দেখালো তখন বিশ্বাস না করে উপায় আছে কোনো? ঢাকার এক অভিজাত হোটেল থেকে সৈকত কে তুলে নিয়ে আসে এজওয়ান আর তেহরান। তারপর কসাইখানায় নিয়ে আসে।
আর ধানমন্ডি থেকে সুবহান কে তুলে নিয়ে আসে। সুবহান তখন ফোনে কথা বলছিলো। হয়তো ভাইয়ের সাথে। তার ভাই সতর্ক করছিলো। কিন্তু সুবহান অহং এর সাথে বলছিলো-
“ চিন্তা করবেন না আমাকে নিয়ে। আমি সব প্ল্যান করেই মাঠে নেমেছি। আমাকে ধরা এতো সহজ নয়। আমি অব্দি পৌঁছাতে পারবে না সোলেমান। ”
ঠিক তখনই সোলেমান রাম দা হাতে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। সুবহানের সব অহং মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে দিয়ে তাকে টেনে হিঁচড়ে কসাইখানায় নিয়ে আসে।
সুবহান আর সৈকত কে পাশাপাশি চেয়ারে বসিয়ে রাখা হয়। তেহরান দেখে যাচ্ছে সৈকত কে। একজন বন্ধু কিভাবে পিঠ পিছে ছুরি মারে তা সৈকত কে দেখে বোঝা যাচ্ছে। এই ছেলেকে নিজের ভাইয়ের চোখে দেখেছে সর্বদা। সেই সৈকত তার প্রেয়সী, তার রুমুকে ধর্ষণ করে মেরেছে! তেহরান কোনো কথায় গেলো না। কোনো কথা শুনলো না,কোনো বোঝাপড়া করলো না। পাশ থেকে চাকু টা নিয়ে সোজা সৈকতের পুরুষাঙ্গ টা কে’টে দিলো। তারপর হাতের আঙুল দিয়ে ওর চোখ দুটো টেনে বের করে আনলো। পুরো কসাইখানা টা সৈকতরের চিৎকারে ভেসে গেলো। আশ্চর্যের বিষয় হলো সুবহানের মাঝে একটুও ভয়ডর দেখা যাচ্ছে না। যে ছেলে অন্যদের ভয় দেখায় সে ছেলে কি আর অন্যের ভয়ে ভয় পায়?
তেহরান পাশ থেকে এবার রাম দা টা তুলে নিলো। সৈকতের মাথার মাঝ বরাবর কোপ দিয়ে শরীরে অর্ধেক টা মাঝ বরাবর চিঁড়ে ফেললো। সৈকত মাফ চাইলো,কিছু বলতে চাইলো তেহরান শুনলো না। সৈকত মাফ চাইলেই কি তার রুমু ফিরে আসবে? না আসবে না।
সৈকতের মৃ’ত দেহটা ছটফট করতে লাগলো। এজওয়ান তেহরান কে নিয়ে চলে গেলো। সোলেমান আসলো। সুবহানের সামনে চেয়ার টেনে বসে বলল-
“ তোকে আমি ভুলেই গিয়েছিলাম জানিস? আমার শত্রুতা কেবল ছিলো তোর বাপ ভাইয়ের সাথে। আমি কখনোই নিজ থেকে আগ বাড়িয়ে করি নি। তোরাই আগ বাড়িয়ে করেছিস। তোর সাথে আমার দেখা হলো এই নিয়ে দু বার। একবার হয়েছিল অনেক বছর আগে ডেনমার্কে। মনে আছে? কিভাবে মে’রে এসেছিলাম? তখনও জানতাম না তুই শেখরের ভাই। জানলে সেদিনই তোর কেচ্ছা আমি খতম করে আসতাম। তাহলে আমার বোনটা আজ বেঁচে থাকতো। আমি কখনো কোনো নিরীহ মানুষদের মা’রি নি। যার পাপ আছে তাকে অনায়াসে হাসতে হাসতে মেরেছি। ”
“ নিজেকে স্বান্তনা পুরষ্কার দেওয়া হিসেবে এই বাণী রোজ কতবার বলা হয়?”
সোলেমান হাসে। ফিসফিসিয়ে বলে-
“ রোজ। ”
“ বোন হারিয়েই এই দশা তোমার। যখন বউ হারাবে তখন কি করবে নওয়াজ সোলেমান সুলতান? ওরফে মাফিয়া কিং এস.এস?”
“ আমার বউকে মা’রার প্ল্যান করছিস?”
“ না, তোর ঐ বোকা গাধা,হাঁদারাম বউকে মা’রার প্রয়োজন পড়বে না রে। তোকে তো অন্ধের মতো বিশ্বাস করে। যেমনটা করেছিলো তোর বোন আমাকে। তোর আসল রূপটা তোর বউ জানলেই হয়ে গেলো। বেচারি এমনিতেই অতি শকে ম’রে তোর বোনের কাছে চলে যাবে। ”
“ এত সহজ? হাহ! হাস্যকর। কোনোদিন জানবে না আমার বউ আমার এই রূপ। ”
“ সত্য কোনো দিন চাপা থাকে রে? বেরিয়েই আসে। আর যেদিন এই সত্য বেরিয়ে আসবে,সেদিন কি করবে নওয়াজ সোলেমান সুলতান? ”
“ যদি তাই হয় তাহলে আমি আমার বউ কে ঠিক সেভাবেই তৈরি করবো,যেভাবে তৈরি করলে ভবিষ্যতে আমি তার জন্য কখনও ক্ষতিকর হয়ে উঠলেও তার যেন আমার বুকে ছু’রি চালাতে হাত না কাঁপে। ”
“ গুড। এখন কি আমার বুকে ছুরি চালাতে চাইছিস?”
“ শুধু ছুরি? তোর অপরাধ কি ছুরির সমান রে? ”
“ কত খু’ন করলি তুই?”
“ তোকে নিয়ে হবে এবার ২০০ টা। অনেক কষ্ট দিয়ে মেরেছিলি আমার বোন কে তাই না? এসএস কতটা ভয়ংকর জানতিস তো? নাকি ভুলে গেছিস কোনটা? ভুলে গেলে চল আবার জানাই তোকে। ”
সোলেমান প্রথমে সুবহানের পুরুষাঙ্গ কাটলো। যতই সুবহান নিজেকে শক্ত দেখাক,ব্যথা পেলে সবাই চিৎকার করে উঠে। সুবহানও গগন ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলো। চিৎকার টা কানে এসে বিঁধলো সুচের মতো। বাঁচার আকুতি মিনতি করছে। এভাবে তো তার বোনটাও করেছিল। পেয়েছিল কি মুক্তি? না পায় নি। সেজন্য মুখটা বেঁধে দিলো। তারপর ইলেকট্রনিক করাত দিয়ে সুবহানের হাত গুলো জ্যান্ত পিস পিস করে কাটলো। সুবহান গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগলো। সোলেমানের থামার নাম নেই। হাত শেষ হতেই পা তে নেমে গেলো। পা দুটোও পিস পিস করে কাটলো। পুরো রুম রক্তে ভেসে যাচ্ছে। চিৎকার করতে করতে সুবহান থেমে গেছে। এখন শুধু গুঙিয়ে উঠছে। শরীরে অক্ষত আছে এখন কোমর থেকে মাথা অব্দি। চোখ দু’টো খোলা। শ্বাস হাল্কা ওঠা-নামা করছে। সোলেমান ইলেকট্রনিক করাত নিয়ে সেই চোখের কাছে গেলো। মূহুর্তে দেহ থেকে মাথার উপরি ভাগ টা আলাদা হয়ে গেলো। কি কুৎসিত মৃত্যু! এতেও তো খ্যান্ত হলে না সোলেমান। পেটের মাঝ বরাবর করাত চালিয়ে সব নাড়িভুড়ি বের করে আনলো। হৃৎপিণ্ড টা টেনে খুললো। বুকের খাঁচা টা চুরমার করে ভাঙলো। তারপর প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ পিস পিস করে কেটে ৪০০০ টুকরো করলো। বাদ যায় নি সৈকতের মৃ’ত দেহটাও। পুরো শরীর সোলেমানের রক্তে ভেজা ছুপছুপ। নাম টা এমনি এমনি কি আর কসাইখানা রাখা হয়েছে? সোলেমান নিজেই তো এই কসাইখানার এক কসাই। দেখে মনে হচ্ছে যেন লাখ খানেক গরু জবাই দিয়েছে।
গরুর রক্তে ছুপছুপ। কিন্তু নাহ্ এ তো মানুষের র’ক্ত। কেউ সোলেমান কে এই রূপে দেখলে নিশ্চিত বমি করে ভাসিয়ে দিবে। হার্ট অ্যাটাক করবে ভয়ে। মারাও যেতে পারে। সোলেমান ফিরে গেলো তার সেই চিরচেনা জীবনে। মানুষ খুব কমই মেরেছে নিজের হাত দিয়ে। বেশির ভাগই করিয়েছে বাশার সুলতান কে দিয়ে। তাতেই ২০০ তে ঠেকে গেলো। নিজের হাতে বাকি খুন করলে হয়তো কয়েক গুন ডাবল হয়ে যেত।আজ থেকে এই হাত যে কত খু’ন করবে এভাবে তার হিসেব নেই। এবার হয়তো হাজার ক্রস করবে। মানুষ মারার সাথে সাথে হয়তো নিজের ধ্বংস কেও আমন্ত্রণ জানালো। সে জন্যই হয়তো সুবহান বলেছিল- সোলেমান উন্মাদ খ্যাপা হলেই তার জন্য সহজ হবে। আর সেটাই হলো। এবার সুলতান বংশ চিরতে অন্ধকারে ডুবে যাবে। আর কোনোদিন সূর্যোদয় হবে না। এবার থেকে যা হবে তা কেবল ধ্বংস আর ধ্বংস….হয়তো পৃথিবীর কোনো এক প্রান্তরে বসে থাকা কেউ সোলেমানের এই উন্মাদনা দেখে হাসতে হাসতে বলছে-
দাহশয্যা পর্ব ৯০ (৩)
“ তোমার মতো বোকা মাফিয়া আমি আর দুটো দেখি নি সোলেমান। বাপের উপরেও যে বাপ থাকে, এবার তুমি হারে হারে বুঝবে। নিজের পতনের দিন শুরু হলো তোমার…না না তোমার একার না,তোমাদের.. হা হা হা..!!”
