Home দাহশয্যা দাহশয্যা পর্ব ৯১ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৯১ (২)

দাহশয্যা পর্ব ৯১ (২)
Raiha Zubair Ripti

রাত তখন বাজে হয়তো আড়াইটা। রুমাইসার কবরের পাশে স্থির হয়ে বসে আছে এজওয়ান। চোখ দুটো থেকে থেকে ভীষণ ঝাপসা হয়ে আসছে। তার মানতে কি যে কষ্ট হচ্ছে যে তাদের একমাত্র বোন রুমুটা আর পৃথিবী তে নেই। অথচ আজ তার মৃত্যুর ছয় দিন। এজওয়ান কবরের উপর হাত রাখলো। তার গলা আঁটকে আসছে। বুকের ভেতর অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। আর একটা পীড়াদায়ক যন্ত্রণা অনুভব হচ্ছে সেটা হলো ভাইজান তাকে মা’রতে দিলো না ঐ শু’য়োরের বাচ্চা দের। তেহরান মারলো,ভাইজান মারলো অথচ এজওয়ান কে কিছু করতে দেওয়া হলো না। তার হাত নিশপিশ করছিলো। শরীরের র’ক্ত টগবগ করছিলো। হাত দুটো বারবার উঠে আসছিলো। কিন্তু ভাইজানের জন্য দমিয়ে রাখতে না পেরে তেহরান কে নিয়ে চলে এসেছে। আর বাহিরে এসে থেকে কবরের সামনে বসে আছে। ভেতরে তার ভাইজান খুবই অমানবিক নিকৃষ্ট ভাবে যে তাদের মারছে এ নিয়ে কোনো দ্বিধা নেই।
পাশেই তেহরান বসা। শরীর জুড়ে র’ক্ত। কবর টা জড়িয়ে ধরে শুয়ে ছিলো এতক্ষণ। কিন্তু এখন ঘুমিয়ে গেছে। ছেলেটার ভবিষ্যৎ কি? তেহরানের বাবা মা খুঁজছিল ছেলেকে ফোন করে। এজওয়ান তাদের শান্ত করে বলেছিল নিবাসেই আছে,চিন্তা করবেন না।

এজওয়ান আকাশের দিকে তাকালো। কালো মেঘ ছাড়া আর কিছুই দেখতে পেলো না। এমনই কালো মেঘ,অন্ধকারে ডুবে আছে সুলতান বংশ। এজওয়ান দীর্ঘ একটা শ্বাস ফেলে। আর তখনই পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠে। এজওয়ান রিসিভ করে ফোন টা। কানে নিতেই শুনতে পারে তাকে তিনদিনের ভেতরে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে। অস্ট্রেলিয়া নারী পাচারের বিষয়টা খুব তীব্র হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন ৪ জন করে নিখোঁজ হচ্ছে। আর তাদের কাছে খবর এসেছে দ্য মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ইন দ্যা আন্ডারওয়ার্ল্ড মনস্টার নামক ব্যক্তিটা অস্ট্রেলিয়ায় আছে। সেই করছে এই অঘটন গুলো। তাকে যে করেই হোক ধরতে হবে।
এজওয়ানের কপালে দুটো ভাজ পড়লো সে কথা শুনে।
“ আর ইউ শিওর?”
“ ইয়েস। তুমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অস্ট্রেলিয়া ব্যাক করো। ”
“ আমার পক্ষে ফেরা এখন অসম্ভব। নিউজ টা তো শুনেছেন আপনারা তারপরও কিভাবে আমাকে আশা করছেন?”
“ আমরাও নিরুপায় হয়েই তোমাকে আসতে বলছি এজওয়ান। ”
“ আমাকে কিছুটা সময় দিন। ”

এজওয়ান কেটে দিলো ফোন। উঠে দাঁড়াতেই এজওয়ান শুনতে পেলো তেহরান বিরবির করে ঘুমের ঘোরে রুমু কে খুঁজছে। এজওয়ান ফের বসে পড়লো। ছেলেটাকে ডেকে তুললে আবার পাগলামি করবে। আবার একা এখানে রেখে চলে যাওয়াটাও সম্ভব নয়। সেজন্য এজওয়ান বসে রইলো বোনের কবরের পাশে সারা রাত।
ভোরের দিকে নিবাসের বাহিরে শোরগোলের আওয়াজ শুনে এজওয়ানের কপাল কুঁচকে আসে। তেহরান তখনও গভীর ঘুমে। এজওয়ান উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে দেখে নিবাসের বাহিরে পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সাংবাদিক দের ভীড় হয়ে আছে। এজওয়ান প্রথমে বুঝলো না। বাশার সুলতান ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতেই পুলিশদের মধ্যে থাকা একজন জিজ্ঞেস করলো-
“ সোলেমান সুলতান বাড়িতে আছেন?”
বাশার সুলতান উত্তর দিলেন না। বরং পাল্টা প্রশ্ন করে বললেন-

“ কিজন্য? ”
“ উনাকে গ্রেফতার করার পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ”
বাশার সুলতান চমকে উঠলেন সেই কথায়।
“ কি করেছে কি আমার ছেলে? আর গ্রফতারের আদেশ দিলো কে?”
পুলিশ লোকটি তার ফোন থেকে নাজিম কে জনসম্মুখে পু’ড়িয়ে মা’রার ভিডিওটি দেখিয়ে বলল-
“ এই হচ্ছে আপনার ছেলের অপরাধ। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে একটা মানুষকে মে’রে ফেলছে। ”
“ মানুষ! ও কোনো মানুষ ছিলো? ও একটা ধর্ষক ছিলো। একজন ধর্ষককে মানুষ বলে আখ্যায়িত করে মানুষ শব্দ টার অপমান করবেন না। ”
এজওয়ানের কথায় পুলিশটা একবার বাঁকা চোখে তাকায়।

” তাই বলে আইন নিজের হাতে তুলে নিবে আপনার ভাই?”
“ আইন যদি আইনের প্রকৃত নিয়মে চলতো তাহলে অবশ্যই আমার ভাইজান আইন নিজের হাতে তুলে নিতো না। ”
“ আপনার সাথে তর্কে জড়াতে চাচ্ছি না। আমাদের কে আমাদের কাজ করতে দিন। ”
পুলিশ গুলো নিবাসের ভেতরে চলে গেলো। বসার ঘরে যেতেই তারা আবিষ্কার করলো সোলেমান সোফায় পায়ের উপর পা তুলে কফি খাচ্ছে আর টিভিতে নিজের গ্রেফতার হওয়ার নিউজ গুলো দেখছে। বাংলাদেশে বর্তমানের টপ ব্রেকিং নিউজ এটাই।
সোলেমান তাদের দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসলো। পুরো কফিটা শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল-
“ কত টাকা পেলেন?”

পুলিশ গুলো একে অপরের দিকে তাকালো।
“ মানে?”
“ বললাম কত টাকা পেলেন আমাকে জেলে নেওয়ার জন্য? ”
“ টাকা কেনো দিবে আমাদের? আমরা একজন অপরাধী কে ধরতে এসেছি। ”
“ আমার অপরাধ? ”
“ আপনি জন সম্মুখে নাজিম নামের লোকটিকে পু’ড়িয়ে মেরেছেন। তারা বাবা নাসির উদ্দীন মামলা করেছে আপনার নামে। ”
“ কবে পু’ড়িয়ে মেরেছি?”
“ গত কাল। ”
“ আর আমাকে ধরতে এসেছিস তার পরের দিন। তা আমার বোন কে হত্যা করা হয়েছিল কবে যেন?”
“ ছয় দিন আগে। ”
সোলেমান এবার রক্তাক্ত চোখে তাকিয়ে বলল-

“ তাহলে আমার বোনের হত্যা কারী দের তোরা ধরতে পারলি না কেনো তার পরের দিন? আমাকে কেনো খুঁজে বের করতে হলো তাকে? আমার বোনের হত্যা কারী দের খুঁজে বের করতে পারিস নি আমি খুঁজে মেরেছি বলে তোরা এখন আমাকে জেলে ভরতে এসেছিস! ওয়াও নাইস! এদেশে হত্যাকারীর বিচার নেই অথচ হত্যাকারী কে হত্যা করলে তার বিচার ঠিকই আছে! ওকে ফাইন চল। দেখি কতক্ষণ আমাকে ঐ জেলের ভেতর আঁটকে রাখতে পারিস তোরা। ”
সোলেমান হাঁটা ধরলো। বাশার সুলতান আটকাতে চাইলেন। কিন্তু সোলেমান শুনলো না। পুলিশ দের সাথে বেরিয়ে আসলো। সাংবাদিক রা একের পর এক ছবি তুলছে নিউজ করছে সোলেমান কে প্রশ্ন করছে। কেনো সে আইন নিজের হাতে তুলে নিলো? দেশে কি আইন নেই? ক্ষমতাশালী দেখে কি যা ইচ্ছে তাই করবে?
সোলেমান এক সাংবাদিক কে শুধু এটুকু বলল-

“ আপনার মাকে অথবা আপনার বোনকে যদি কেউ ধর্ষণ করে মে’রে ফেলে তার ভিডিও করে তা ছেড়ে দেয় কেউ, তখন আপনি কি করবেন?”
সাংবাদিক টা এক বাক্যে বলে দিলো-
“ ঐ শুয়োরের বাচ্চাকে নিজ হাতে মে’রে ফেলতাম। ”
“ আশা করি আপনার প্রশ্নের উত্তর আপনি পেয়ে গেছেন। ”
সোলেমান আর কথা বাড়ালো না। চলে গেলো পুলিশদের সাথে পুলিশ স্টেশনে। পুরো মিডিয়া জগৎ উলোটপালোট আজ এই নিউজে। বাশার সুলতানের মাথা প্রচণ্ড গরম হয়ে গেলো। এজওয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল-
“ কিছু একটা কর। সোলেমান কে বের করার ব্যবস্থা কর। ”
এজওয়ান পকেট থেকে ফোনটা বের করে কাউকে ফোন করলো। জেলে ঢোকা আর বের হওয়া এসব তো তাদের কাছে বা হাতের কাজ। সেজন্যই তো সোলেমান নীরবে চলে গেলো। আর তাছাড়া তরুণরা,দেশের জনগণের ৮৫% সোলেমান কে সমর্থন করছে তার কাজের জন্য। বিশেষ করে যারা ধর্ষণের শিকার হয়েছে,কোনো ইনসাফ পায় নি,তারা সোলেমানের হয়ে পোস্ট করছে। পাশে এটাও উল্লেখ করছে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরাই যদি ইনসাফ না পেয়ে আইন হাতে তুলে নেয় তাহলে আমরা সাধারণ মানুষরা সেখানে ইনসাফ পাবো কোন আশায়?
মেহরিন নিউজ চ্যানেলে সোলেমানের গ্রেফতারের নিউজ টা দেখলো। টানা পাঁচ দিন স্বামীর সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। আজ হঠাৎ এই নিউজ টা দেখে আর নওগাঁ থাকতে পারলো না। শ্বশুরের সাথে ঢাকা চলে আসলো। রমনার থানায় আসতেই মেহরিন স্বামী কে দেখার জন্য ছুটে যেতে নিলে মাঝপথে আঁটকে দিলো এক পুলিশ। মেহরিন দাঁড়িয়ে গেলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো-

“ পথ আটকালেন কেনো?”
পুলিশ অফিসার বলল-
“ দেখা করতে পারবেন না। ”
“ কেনো?”
“ শুনেন নি আপনার স্বামী কি করেছে?”
“ শুনেছি তো। একজন ধর্ষককে, একজন হত্যাকারী কে সে হত্যা করেছে। ”
“ সে ধর্ষক ছিলো নাকি কুকুর ছিলো সেটা আইন বুঝতো। আপনার স্বামী কেনো আইন তুলে নিলো নিজ হাতে?”
“ কারন আপনাদের হাত টাকার কাছে তালাবদ্ধ সেজন্য। ”
“ আপনি আপনার স্বামী কে সমর্থন করছেন! ”
“ না করে উপায় আছে? আমি তো বলি বেশ করেছে আমার স্বামী তাকে মেরেছে। আমার স্বামী কে তার এই কাজের জন্য আমি পূর্ণ সমর্থন করছি। ”
“ অন্যায় যে করে আর অন্যায় কে যে প্রশ্রয় দেয় তারা দুজনই অপরাধী। ”
“ এর দায়ে কি এবার আমাকেও জেলে নিবেন পুলিশ মহোদয়? রাস্তা ছাড়ুন। আমার স্বামীর সাথে আমাকে দেখা করতে দিন। ”

এজওয়ান এসে পেছনে দাঁড়ালো। তার পেছনে উকিল। সোলেমানের আগাম জামিন করা ছিলো আগে থেকেই। পুলিশ সরে দাঁড়ালো। মেহরিন আর সময় নষ্ট করলো না এক সেকেন্ড ও। চলে গেলো ভেতরে।
সোলেমান তখন জেলের ভেতর বসে সিগারেট খাচ্ছিলো। কারো ধুপধাপ পায়ের আওয়াজ শুনে ঘাড় বেঁকিয়ে তাকাতেই দেখলো কালো বোরকা নিকাবে তার বউ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসছে। সোলেমান হাতে থাকা সিগারেট টা ফেলে দিলো। বসা থেকে এগিয়ে এসে লোহার শিকের সামনে দাঁড়িয়ে মেহরিন কে সতর্ক করে বলল-
“ আসতে আসো। পড়ে যাবা তো। ”
মেহরিন পায়ের গতি কমিয়ে দিলো হাল্কা। তবে মনের ভেতরে থাকা অস্বস্তি কমনি বরং আরো বেড়ে গেছে। স্বামীর সম্মুখে দাঁড়িয়ে অস্থির গলায় বলল-
“ ওরা কি আপনাকে মেরেছে?”
সোলেমানের কপালে দু ভাজ পড়লো।
“ সাহস আছে নাকি আমাকে মা’রার? ”

“ এজওয়ান ভাইয়া আপনার জামিনের ব্যবস্থা করেছে। আপনাকে আর জেলে থাকতে হবে না। ”
সোলেমানের ভাজ পড়া কপাল সটান হলো। এজওয়ান করে নি জামিনের ব্যবস্থা। খোদ সোলেমান নিজে করে রেখেছিল তার আগাম জামিন। কারন সোলেমান জানে লোকসমাগমে কাউকে মারলে তার কি কি ফেইস করতে হতে পারে। আর কাকে লোক সমাগমে মারলে জনগণ তার বিরুদ্ধে যাবে না। তাকে সাপোর্ট করবে। সোলেমান কেবল বাঁকা হাসলো। মেহরিনের অগোচরে থেকে গেলো সেই হাসি।
উকিল সকল কাগজপত্র জমা দিতেই সোলেমান কে ছেড়ে দেওয়া হলো। উপর মহল থেকেও চাপ দেওয়া হয়েছিল সোলেমান কে ছেড়ে দেওয়ার জন্য। সোলেমান ২৪ ঘন্টার মধ্যে বেরিয়েও আসলো। তবে সেটা বাহিরের কেউ জানলো না। বের হয়ে আসার আগে পুলিশ অফিসার সোলেমান কে প্রশ্ন করলো-

“ সুবহান ,সৈকত এদের কি করেছেন আপনি?”
“ খোঁজ পাই নি। পেলে নিশ্চিন্ত থাকুন বেঁচে থাকবে না আর এই পৃথিবীতে শ্বাস নেওয়ার জন্য একটাও।”
সোলেমান চলে আসলো। ক’দিন সোলেমান কে বাড়ির ভেতরই থাকতে হবে। বাহিরে যাওয়া যাবে না। পরিস্থিতি শান্ত হলে এই বিষয়টা ধামাচাপা পড়লে তখন সোলেমান আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে চলাচল করতে পারবে।
বাশার সুলতান চিন্তায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। সোলেমানের দিকে তাকিয়ে দাঁত চেপে বলছে-
“ জনসম্মুখে মা’রার কি দরকার ছিলো তোর? আমি কি তোকে কখনো আটকিয়েছি এসব কাজে? করি নি তো। কসাইখানায় এনে ওদের সাথে এটাকেও জ’বাই দিতি। ”
সোলেমান চাচার কথাটাকে জাস্ট উড়িয়ে দিয়ে বলল-

“ এখন থেকে আমি প্রতিদিন মানুষ খু’ন করবো,আর প্রতিদিনই জেলে যাব। আবার ক্ষমতার দাপটে বের হয়েও আসবো। এই টুকু ক্ষমতা এই টুকু পাওয়ার আমার আছে। এই দেশের আইন আমার একটা বা’লও ছিঁড়তে পারবে না। কারণ আইন কে পকেটে নিয়ে ঘুরার মতো, আমার টাকা আছে,ক্ষমতা আছে, নাম আছে, যশ আছে। ”
“ ক্ষমতা আছে বলে বেরিয়ে আসতে পেরেছিস। যখন ক্ষমতা থাকবে না তখন কি হবে ভেবে দেখেছিস সেটা? এই কেইস গুলো তখন আবার রিঅপেন হবে। সেদিন কি করবি? ”
“ যেদিন আমার ক্ষমতা ফুরিয়ে যাবে সেদিন আমি চিরকালের জন্য জেলে যে ঢুকবো আর বের হবো না। ”
“ ক’দিন পর বাপ হবি তুই। সন্তানের কথাটা ভাব,বউয়ের কথাটা ভাব। ও বেচারিদের উপর দিয়ে কি ঝড় টা যাচ্ছে দেখেছিস? ”

“ মেহরিন কে ঢাকায় এনেছে কেনো বাবা?”
“ কি আশ্চর্য বউ হয় তোর। স্বামী জেলে আর সে আসবে না?”
সোলেমান কোনো উত্তর দিলো না। নিজের রুমে আসলো। মেহরিন তখন এশার নামাজের সবে ৪ রাকাআত ফরজের পরে ২ রাকাআত সুন্নত আদায় শেষ করছিলো। বেতের পড়ার জন্য উদ্যোত হবে তার আগেই সোলেমান এসে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়লো। মেহরিন সোলেমানের শরীরে সেই কালো শার্ট প্যান্ট দেখে বলল-
“ আপনি জেল থেকে এসে এখনও ফ্রেশ হন নি! আমার নামাজ এখনো বাকি। উঠুন। নাপাক হচ্ছি তো আমি। পাক হয়ে আসুন। ”

“ নাপাকে বেড়ে ওঠা এক পাপ কে বলছো পাক হয়ে আসতে! পাক তো নিজেও লজ্জা পাবে পাপ কে দেখে। ”
সোলেমান মাথা সরিয়ে ফ্লোরে রাখলো। মেহরিন বেতেরের নামাজ টা শেষ করতেই সোলেমান ফের মেহরিনের কোলে মাথা রাখলো।
“ তোমাকেও নাপাক করা যাক। পাপের সংস্পর্শে থাকবে আর নাপাক হবে না এ-ও হয়?”
“ ফ্রেশ হয়ে আসা যেত কিন্তু এতক্ষণে। ”
“ হলাম না তো। ”
” নামাজ পড়বেন না?”
সোলেমানের কাঠকাঠ জবাব-
“ না। ”
“ কেনো?”
“ নামাজ পড়ে কি হবে? এর ফজিলত কি?”
মেহরিন অবাক হলো এমন কথা শুনে।
“ এ কেমন কথাবার্তা আপনার? ”
“ ঠিকই তো বলছি। ”
“ না ঠিক বলেন নি। যান ফ্রেশ হয়ে ওজু করে আসুন। ”

“ না। মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমার পক্ষে মিথ্যে ইবাদত করার সম্ভব নয়। উনাকে স্মরণ করতেও আমার ভয় হয়। উনাকে স্মরণ করে মোনাজাতে যাকেই রাখি উনি তাকেই তার কাছে নিয়ে যান। উনাকে স্মরণ করা মানে সাজা পাওয়া। উনাকে স্মরণ না করলেই বরং আমি ভালো থাকি। ”
“ নাস্তিকদের মতো কথাবার্তা বলবেন না। নামাজ পড়তে ইচ্ছে করছে না? ঠিক আছে পড়তে হবে না। তাই বলে এসব কি কথাবার্তা? উঠুন সরুন। ”
“ উঠিয়ে দিচ্ছ! বেশ তো,উঠছি। আমার একটা কথা রাখো মেহরিন। ”
“ কি?”
“ তুমি তোমার বাবার কাছে গিয়ে থাকো ক’টাদিন মা কে নিয়ে। ও বাড়িতে তার পক্ষে সম্ভব হবে না এখন থাকার। রুমাইসা তো নেই ঐ বাড়িতে। দম বন্ধ হয়ে আসবে উনার। পারবে ক’টাদিন গিয়ে থাকতে বাবার বাড়ি?”

“ জ্বি পারবো। ”
“ আচ্ছা কাল গিয়ে রেখে আসবো। আর হ্যাঁ আমি না বললে তুমি ঢাকায় আসবে না। কারোর সাথেই না। কোনো পরিস্থিতেই না। যাই হয়ে যাক না কেনো। কথা দাও? কথা দাও আসবে না এই ঢাকায়। ”
মেহরিন ভ্রু কুঁচকালো এমন কথা শুনে।
“ দিবে না কথা? আমাদের ভালোর জন্যই বলছি।”
“ আচ্ছা বেশ আসবো না। ”
“ এবার গিয়ে শুয়ে পড়ো। আমার একটু কাজ আছে। সেরেই আসছি। ”
সোলেমান চলে গেলো। মেহরিন তার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। সোলেমানের ভেতর কেমন এক অচেনা স্বত্তার আগমনের টের পাচ্ছে মেহরিন। লোকটা তাকে দূরে রাখতে চাইছে তার থেকে! বেশ, মেহরিন না হয় দূরেই থাকবে। এতে যদি ভালো কিছু হয় তাহলে দূরত্বই ভালো।
সোলেমান নিচে আসতেই দেখলো এজওয়ান বাগানের চেয়ারে বসে কাউকে ফোন করছে। সোলেমান নিজের ফোনটা বের করে বলল-

“ কাকে ফোন করছিস তুই?”
এজওয়ান ফোনটা পকেটে ভরে রাখলো। মাহিকে কতবার ট্রাই করছে ফোনে অথচ মেয়েটার ফোন সুইচঅফ বলছে। কিন্তু মেয়েটা তো বলেছিল এজওয়ানের সাথে যোগাযোগ রাখবে। মাহি তো জানেও না এদিকে কি ঘটে গেছে।
“ কিছু প্রশ্ন করেছি আমি। ”
“ আমাকে অস্ট্রেলিয়া যেতে হবে আগামীকাল ভাইজান। ”
“ তাতে অসুবিধা কোথায়?”
“ এই অবস্থায় কি করে যাই অস্ট্রেলিয়া আমি?”
“ মাহি কোথায়?”
“ আমেরিকা গিয়েছে কাজে। ”
“ যোগাযোগ নেই তাই তো?”
এজওয়ান মাথা নত করে ফেললো।
“ ভোরের ফ্লাইটে অস্ট্রেলিয়া চলে যাস কাল। ”
এজওয়ান মাথা তুলে তাকালো। সাথে বলল-
“ তোমাকে একা রেখে কি….”
“ ঘুমিয়ে পড়। ক’টা রাত ঘুমোস নি ঠিক মতো। এখন ঘুমিয়ে পড় যা। ভোরেই বেরিয়ে যেতে হবে। ”
“ কিন্তু ভাইজান…”
“ যেতে বলেছি কিন্তু আমি। ”

এজওয়ান চলে গেলো। সোলেমান সামনে থাকা দূরের তিনটি কবরের দিকে তাকালো। সেই তিন কবরে শুয়ে আছে সোলেমানের মা বাবা আর বোন। সোলেমান কবরের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে বলে উঠলো –
“ পাপের দাগে বদনাম তো হলামই। এখন থেকে বদনাম আমি আরো হবো। আর সেই বদনামের দাগ আমি একাই বয়ে বেড়াবো। পাপের বোঝা যতই দুর্বহ হোক, আমি একাই তা বইবার চেষ্টা করবো। ”
সোলেমান কথাটা শেষ করে ইব্রাহিম কে কল করলো। ইব্রাহিম কে সোলেমান নওগাঁ তেই থাকতে বলেছিল। সবাই এখানে থাকলে সুলতান ভিলার ঝড় সামলাবে কে? ইব্রাহিম কে কল করে ঢাকায় আসতে বললো কাল। সোলেমান এবার পুরোদমে নিজের বাবা মায়ের হত্যা কারী দের খুঁজবে। আর তাদের খুঁজতেই সে তার আগের দুনিয়ায় আবার ফিরবে।

পরের দিনের ভোরের ফ্লাইটে এজওয়ান অস্ট্রেলিয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। সুলতান বংশের সবকিছু যেন আজ থেকে এক অদৃশ্য অশুভ ছায়ার দিকে এগোতে থাকে। সকাল গড়িয়ে যখন প্রায় দশটা, তখন সোলেমান মেহরিনকে সঙ্গে নিয়ে ফিরে আসে সুলতান ভিলায়। বাড়িতে ঢুকতেই শোকের ভার যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে। সোলেমান সরাসরি ফোন করে মোতালেব ভুঁইয়াকে ডাকে। আফিয়া সুলতান, মেহরিন আর বাতাসিকে কয়েকদিনের জন্য তার বাড়িতে নিয়ে যেতে হবে।
জামাইয়ের ফোন পেয়ে মোতালেব ভুঁইয়া দেরি করেন না। দ্রুতই পৌঁছে যান সুলতানপুরে। কিন্তু সবকিছু এত সহজ ছিল না। সোলেমানকে দেখেই আফিয়া সুলতানের বুকফাটা কান্না ভেসে ওঠে।
মা বলে ডাকবে যে মেয়ে, সে তো আর নেই…

এই শূন্যতা যেন তার বুকের ভেতর আগুন হয়ে জ্বলতে থাকে। প্রথমে তিনি কিছুতেই যেতে চান না। এই বাড়ি, এই দেয়াল, এই স্মৃতিগুলো ছেড়ে কোথাও যাওয়ার শক্তি তার নেই। কিন্তু সোলেমান সময় নিয়ে বোঝায়। শেষ পর্যন্ত, অনেক কষ্টে রাজি হন আফিয়া সুলতান। মোতালেব ভুঁইয়া যখন মেয়েদের নিয়ে চলে যায়, তখন সুলতান ভিলা অদ্ভুতভাবে নিঃশব্দ হয়ে পড়ে।
সেই নীরবতার মধ্যেই সোলেমান আর ইব্রাহিম ঢাকার পথে রওনা দেয়। ঢাকায় ফিরেই সোলেমান যেন একেবারে অন্য মানুষ হয়ে ওঠে। ২৭ বছর আগে ঘটে যাওয়া সেই হত্যাকাণ্ডের শিকড় থেকে খোঁজা শুরু করে সে।
বিদেশে যাদের সঙ্গে আগে যোগাযোগ ছিল, সেই ছায়ার জগতের মানুষদের আবার সক্রিয় করে তোলে সে। একে একে ফোন যায় বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আন্ডারওয়ার্ল্ডের সংযোগগুলোতে।
তার নির্দেশ স্পষ্ট। পৃথিবীতে যতগুলো মানুষের পায়ে ওরোবোরোস ট্যাটু আঁকা আছে, সেই সব মানুষের পূর্ণ বায়োডাটা আবার তার চাই নতুন করে।

শুধু এতে খ্যান্ত হয় নি সোলেমান। এবার সে সরাসরি আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়মে খেলতে নামলো।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়ারা সাধারণত কাজ করে ছায়ার আড়ালে। তাদের নিজস্ব নেটওয়ার্ক থাকে, যেখানে তথ্য কেনাবেচা হয়, মানুষ গুম হয়ে যায়, পরিচয় বদলে ফেলা হয় মুহূর্তে।
মানি লন্ডারিংয়ের মাধ্যমে অবৈধ টাকা বৈধ রূপ নেয়, অস্ত্র পাচার হয় এক দেশ থেকে আরেক দেশে, ভাড়াটে খুনি দিয়ে নির্দিষ্ট টার্গেট সরিয়ে দেওয়া হয় নিঃশব্দে। ডার্ক ওয়েব থেকে শুরু করে ভুয়া ডকুমেন্ট, ট্র্যাকিং, নজরদারি সবকিছুই তাদের খেলায় ব্যবহার হয়। সোলেমান এবার সেই পুরো নেটওয়ার্ককেই নিজের কাজে লাগাতে চায়।
ফোনের ওপাশে থাকা মানুষদের সে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে-
“ আর শোনো… পুরনো সব রুট অর্গান ট্রেডিং,সাইবার ক্রাইম,এক্সটরশন,অস্ত্রপাচার,ড্রাগ ট্রাফিকিং সব আবার চালু করো। যে যত গভীরে যেতে পারো, যাবে। কেউ থামবে না। যে রুটে সমস্যা হবে, সেটা পরিষ্কার করবে। যে মানুষ বাধা দেবে, তাকে সরিয়ে দিবে। আর কেউ যদি আমার অর্ডার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আমার পথে বাঁধা সৃষ্টি করে সে যেন আর কালকের সকাল দেখতে না পারে সেটাও ইনশিওর করবে। সেই সাথে সবাইকে জানিয়ে দাও এস.এস ইজ ব্যাক। যেই জায়গা সে ছেড়ে এসেছিল বহু বছর আগে সেই জায়গায় পূনরায় রাজ করতে সে আবার ফিরছে। পুরো ওয়ার্ল্ড কে আবারও নাকানিচুবানি খাওয়াবো আমি। ”

একটা দীর্ঘ নীরবতা নেমে আসে লাইনের ওপাশে।
তারপর একে একে সবাই সম্মতি জানায়।
কল কেটে দিয়ে সোলেমান জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ঢাকার ব্যস্ত শহর নিচে ছুটছে। এই শহরের আড়ালে আজ থেকে আরেকটা অন্ধকার জগত জেগে উঠছে।
ফ্রান্সের রেইমস শহর…মায়ের জন্মভূমি তে পা রেখেছে মাহি আজ এই প্রথম। এর আগে কখনো আসা হয় নি ফ্রান্সে। তবে আজ আসলো। কাউকে খোঁজার জন্য। কারো সম্পর্কে জানার জন্য।
মাহি দশটা দিন আমেরিকায় কাটিয়ে আজ ফ্রান্সে এসেছে কেবল এজওয়ানের মায়ের বিষয়ে জানতে। ফ্রান্সের রেইমস শহরের প্রভাবশালীর মেয়ে ছিলেন এমিলা সুলতান। মাহি রেইমস শহরের স্থানীয় পুলিশ স্টেশনে এসে খোঁজ করলো যে ২৭ বছর আগে এই শহরের প্রভাবশালীর মেয়ে প্রেমিকের সাথে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রেমিকের হাতে মৃ’ত্যু হয়েছে,এমন কোনো ঘটনা ঘটেছিল কি না।

সেই পুলিশ স্টেশনের লোক গুলো অদ্ভুত ভাবে তাকালো মাহির দিকে। মাহি সেই চাহনি দেখে নিজের আইডি কার্ড টা শো করলো তাদের সামনে। আইডি কার্ড টা দেখে তাদের চাহনির বদল ঘটে। এবং জানায় তারা সবাই নতুন। কেউ ৫ তো কেউ ১০ বছরের। এমন ঘটনা ঘটে থাকলেও তারা জানে না।
মাহি সে কথা শুনে বলল-
“ সিনিয়র অফিসার তো জানবে। তাহলে তাদের কেউ কি নেই?”
“ একজন আছে। তবে উনি কদিন আগেই রিটায়ার করেন। ”
“ ঠিকানা টা পাওয়া যাবে?”
মাহিকে তারা ঠিকানা দিলো। মাহি সেই ঠিকানা নিয়ে সেই সিনিয়র অফিসারের সাথে দেখা করতে তার বাড়িতে আসেন। কিন্তু এসে জানতে পারেন তিনি বাড়িতে নেই। মাহি বাগানে দাঁড়িয়ে তার অপেক্ষা করে ফেরার। তিন ঘন্টা পর লোকটা আসলে মাহি তাকে তার পরিচয় দিয়ে ঘটনাটার কথা জিজ্ঞেস করে। প্রথম দিকে মনে পড়লো না। অত বছরের পুরোনো কথা মনে থাকে কারোর? মাহি একটু ভেবে বলতে বললো। লোকটা একটু ব্রেনে চাপ দিয়ে ভাবতেই তার স্মৃতি তে ঘটনাটা স্মরন হলো।

“ হ্যাঁ, এমন একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমি তখন সবে একমাস হবে জয়েন হয়েছি। রেইমস শহরের প্রভাবশালী রিচার্ডসনের মেয়ে রিচার ঘটনা টা এমন ছিলো। ”
মাহির কেমন যেন রিচা নাম টা শোনা শোনা মনে হলো। কোথাও হয়তো শুনেছিল। কিন্তু কোথায় শুনেছিল ঠিক তা মনে নেই। তবে এজওয়ানের মায়ের নাম তো এমিলা সুলতান।
“ না না রিচা না নাম টা। নামটা এমিলা সুলতান। ”
“ এমিলা? রিচা তো ছিলো উনার খ্রিস্টান নাম। ”
“ উনি খ্রিস্টান ছিলেন?”
“ হ্যাঁ, তবে মুসলিম এক ছেলেকে ভালোবেসে মুসলিম হয়ে বিয়ে করেছিলেন। তখন নাম চেঞ্জ করে এমিলা হয়। উনার বাবা শুরুতে মানেন নি এই বিয়ে। রিচার স্বামী তাকে বাংলাদেশে নিয়ে যেতে চাইলে তখন রিচার্ডসন মেনে নেয়। এবং ঘর জামাই করে রাখেন মেয়ের জামাই কে। রিচা বিবাহের চার বছর পর দু বছরের ছেলে স্বামী কে রেখে তার খ্রিস্টান বয়ফ্রেন্ডের সাথে পালিয়ে যান। তার তো মৃ’ত দেহও উদ্ধার করা হয়েছিল। উনাকে এতিম খানার পাশে কবর দেওয়া হয়। ”

“ এতিম খানার পাশে কেনো? ”
“ উনার বাবার কথায়। ”
“ উনি বেঁচে আছেন?”
“ রিচার্ডসন? ”
“ হু। ”
“ না বেঁচে নেই। মেয়ে মরার এক বছর পর তিনিও অস্বাভাবিক ভাবে মা-রা যান। ”
“ কোন এতিমখানায় এমিলা সুলতানের কবর দেওয়া হয়?”
“ maison du bon pasteur এতিমখানায়। এটা রিচাদেরই এতিমখানা। ”
এতিমখানার নামটা শুনে চমকে উঠলো মাহি। এই এতিমখানায় তো তার মা থাকতো।
“ উনার কোনো ছবি হবে?”
“ না। উনার লাশটাও আমরা পেয়েছিলাম বিকৃত ভাবে। ডিএনএ টেস্ট করে মেলাতে হয়েছিল। ”
“ আর উনার প্রেমিক সে?”
“ তাকে আমরা আর খুঁজে পাই নি। রিচার সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু হয়তো এতিনখানায় পেলেও পেতে পারেন। ”
“ ধন্যবাদ আপনাকে। ”
“ ওয়েলকাম। ”
মাহি চলে গেলো সেই এতিমখানায়। খুবই সুন্দর আর পরিপাটি করে গুছানো সেই এতিমখানা। তার মায়ের পুরো শৈশব টা কেটেছে এই এতিমখানায়। তাহলে কি তার মা এমিলা সুলতান কে চিনতো? বাহিরে সিকিউরিটি গার্ড আছে। মাহি ভেতরে ঢুকতেই বাচ্চা আর বৃদ্ধদের বাগানে বসে খেলতে দেখলো। ন্যান্সি নামের এক মহিলা অপরিচিত এক মেয়েকে ভেতরে দেখে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো-

“ কে আপনি? কাউকে খুঁজছেন? ”
মাহি চমকে উঠলো। মাথা ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখলো মধ্যবয়সী এক মহিলা। মাহি চোখের ইশারায় হু বললো।
“ আপনি কে?”
“ আমি এই এতিমখানার একজন সদস্য। ”
“ এমিলা সুলতানের কবর টা কোথায়?”
ন্যান্সির ভ্রু কুঁচকে আসলো সে কথা শুনে।
“ আপনি রিচার কবরের কথা বলছেন?”
“ জ্বি। ”
“ কিন্তু আপনি কে?”
“ আমি উনার পুত্র বধূ। ”
মহিলা টা যেন বরফের মতো জমে গেলো। রিচার ছেলের বউ এটা! মহিলা টা চিৎকার করে উঠলো-
“ ফ্রান্সি ফ্রান্সি,দেখো কে এসেছে। রিচার ছেলের বউ এসেছে। ”
ফ্রান্সি নামের এক বৃদ্ধ মহিলা বেরিয়ে আসলো ভেতর কক্ষ থেকে। পড়নে নীল রঙের হ্যাবিট। মাথায় সাদা ভেইল,গলায় ক্রুসিফিক্স লকেট। লাঠিতে ভর করতে করতে এগিয়ে এসে বলল-

“ কে এসেছে?”
“ রিচার ছেলের বউ। ”
মহিলাটাও চমকায়। সামনের দিকে তাকিয়ে মাহিকে দেখে জিজ্ঞেস করে –
“ তুমি রিচার ছেলের বউ? রিচার ছেলেটা কি এসেছে?”
মাহি এগিয়ে এসে বলল-
“ না,উনি আসেন নি। আমি একাই এসেছি। ”
“ রিচার ছেলেটা অনেক বড় হয়ে গেছে। রিচার মতোই দেখতো হয়েছে তাই না? রিচার স্বামী টা সেই যে রিচা মরার পর চলে গেলো। আর আসলো না ছেলেটাকে নিয়ে। ”
“ উনার কবর টা কোন দিকে?”
ফ্রান্সি নিয়ে গেলো রিচার কবরের সামনে। মাহি দেখলো পাশাপাশি দুটো কবর। একটা রিচার আর একটা রিচার্ডসনের।

“ এমিলা সুলতানের কোনো ছবি হবে?”
“ হ্যাঁ আছে একটা ছবি অ্যালবামের ভেতরে। আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি ওদের ছবি টা। ভেতরে এসো। রিচার ছেলের নাম যেন কি? ও আসলো না যে?”
“ এজওয়ান সুলতান উনার নাম। আর উনি জানে না যে আমি এখানে এসেছি। জানলে হয়তো আমাকেও আসতে দিত না। ”
ফ্রান্সি নামের মহিলা টা মাহি কে নিয়ে ভেতরে গেলো। ন্যান্সি মাহির জন্য চা নাস্তার আয়োজন করলো। মাহি ন্যান্সি কে জিজ্ঞেস করলো-
“ এই এতিমখানার এখন খরচ বহন করে কে? মালিক কে? ”
“ রিচার স্বামী প্রতি মাসে পাঠিয়ে দেয়। ”
মাহি বিরবির করে বলল বাশার সুলতান!
ফ্রান্সি স্টোর রুমে গিয়ে একটা পুরোনো অ্যালবাম নিয়ে আসলো। ধুলো দিয়ে ভরে গেছে। কাপড় দিয়ে ময়লা ঝেড়ে অ্যালবাম টা নিয়ে মাহির পাশে বসলো। তারপর অ্যালবাম টা খুলে একটা ছবি বের করে মাহির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

“ এই যে ডান পাশের টা রিচা। ”
মাহি অ্যালবামের দিকে তাকিয়ে ডান ছবিটা দেখে যতটা না মুগ্ধ হলো তার চেয়ে বেশি চমকালো বাম পাশে থাকা একজনের ছবি দেখে। কাঁপা কাঁপা হাতে অ্যালবাম টা ধরে বললো-
“ ম…মেরিলিন দেমির। ”
ফ্রান্সি মুচকি হাসলো।
“ হ্যাঁ বাম পাশের টা মেরিলিন দেমির। রিচার প্রিয় বান্ধবী। কিন্তু তুমি মেরিলিন দেমির কে চিনো কি করে?”
মাহি চমকালো ফ্রান্সির কথা শুনে। মেরিলিন দেমির এমিলা সুলতানের বেস্ট ফ্রেন্ড! মাহি নিজেকো সামলিয়ে বলল-
“ ম…মেরিলিন দেমির আমার মা। ”

দাহশয্যা পর্ব ৯১

ফ্রান্সি এক অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে তাকালো মাহির দিকে। চোখ মুখে কেমন হাসির ঝলক। আর অপ্রত্যাশিত চাহনি।
“ কিহ! তুমি মেরিলিনের মেয়ে! মেরিলিন তাহলে সত্যি সত্যি রিচার ছেলের সাথে নিজের মেয়ের বিয়ে দিয়েই ছাড়লো! রিচা আর তোমার মা তো ঠিক করে রেখেছিল যে রিচার ছেলের সাথে তোমার মায়ের ২য় বারও মেয়ে হলে তার সাথে বিয়ে দিবে। তুমি তাহলে মেরিলিনের ছোট মেয়ে? তোমার মা আর বোন কেমন আছে? তোমার বড় বোনটার নাম টা যেন কি ছিলো? ভুলে গেছি সব। ”
মাহি এবার চমকের শেষ পর্যায়ে চলে গেলো। সে খুঁজতে এসেছিল কি আর খুঁজে পাচ্ছে কি! তার আর এজওয়ানের বিয়ে ছোট বেলাতেই ঠিক করে রেখেছিল তাদের মায়েরা! অথচ তারা তো জানে না এই বিষয়টা। না জেনেও তারা এইভাবে অপ্রত্যাশিত ভাবে একে ওপরের সাথে জুড়ে গেল !

দাহশয্যা পর্ব ৯১ (৩)