Home অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩২
সুমি চৌধুরী

ঢাকা শহরের থানার গেট দিয়ে ভেতরে পা রাখতেই এক ধরণের ভ্যাপসা আর গুমোট গন্ধ নাকে এসে ধাক্কা দিল। জরাজীর্ণ দেয়ালগুলোর চুনকাম অনেক আগেই চটে গেছে। সেখানে ধুলো জমা কয়েকটা পুরনো ক্যালেন্ডার আর ওয়ান্টেড অপরাধীদের ঝাপসা হয়ে যাওয়া ছবি ঝোলানো। মাথার ওপর একটা পুরনো সিলিং ফ্যান বিশ্রী শব্দ করে ঘুরছে। যেন যেকোনো সময় খুলে পড়বে।
সামনের বড় টেবিলটায় ডিউটি অফিসার গম্ভীর মুখে বসে ডায়েরিতে খসখস করে কী যেন লিখছেন। তার চারপাশে ফাইলের পাহাড়। আর টেবিলের এক কোণে পড়ে আছে আধ খাওয়া এক কাপ ঠাণ্ডা চা। করিডোর দিয়ে যাওয়ার সময় কানে আসছে ওয়াকিটকির সেই পরিচিত কর্কশ আওয়াজ ওভার অ্যান্ড আউট।
একটু এগোলেই বাম পাশে সেই অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে হাজতখানা। লোহার মোটা শিকের ওপাশে কয়েকটা আবছা মূর্তিকে দেখা যাচ্ছে। কেউ দেয়ালে হেলান দিয়ে ঝিমোচ্ছে। কেউবা ফ্যালফ্যাল করে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। ওখান থেকে আসা এক ধরণের ভ্যাপসা গন্ধ আর গুমোট পরিবেশটা পুরো থানার বাতাসকে ভারি করে রেখেছে।

মাঝেমধ্যেই কোনো পুলিশ কনস্টেবল বুটের শব্দ তুলে করিডোর দিয়ে হনহন করে চলে যাচ্ছে। থানার এক কোণে স্তূপ করে রাখা হয়েছে জব্ধ করা পুরনো মোটরসাইকেল আর ধুলোমাখা কিছু লাঠিসোঁটা। বাইরে ট্রাফিক জ্যামের আওয়াজ শোনা গেলেও থানার ভেতরের এই পরিবেশটা কেমন যেন পাথরের মতো স্থির আর রহস্যময়। প্রতিটি দেয়াল যেন একেকটা না বলা গল্পের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
থানার সামনে একের পর এক কালো রঙের দামী ল্যান্ড ক্রুজার এসে থামল। ইঞ্জিনের গর্জন থামতেই চারপাশটা যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ছেয়ে গেল। গাড়ি থেকে নামলেন স্যুট-বুট পরা একজন বয়স্ক। কিন্তু অত্যন্ত প্রভাবশালী চেহারার পুরুষ নাইম খান। তার ব্যক্তিত্ব আর চলন-বলনই বলে দিচ্ছে তিনি এই শহরের কতটা ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাকে দেখা মাত্রই ডিউটি অফিসার থেকে শুরু করে কনস্টেবলরা তটস্থ হয়ে দাঁড়িয়ে কুর্নিশ জানাল। নাইম খান ভাবলেশহীন মুখে সেই সালাম নিলেন এবং অত্যন্ত ধীরস্থির পায়ে থানার ভেতরে প্রবেশ করলেন।
সরাসরি এসপির রুমে গিয়ে মিনিট দশেক কথা বলার পর। তিনি আসামীর সাথে কথা বলার জন্য এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করে নিলেন। একজন পুলিশ অফিসার অত্যন্ত বিনয়ের সাথে তাকে করিডোর দিয়ে নিয়ে চললেন হাজতখানার দিকে। করিডোরের স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে নাইম খানের দামী চামড়ার জুতার খট খট শব্দটা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল।
সেই শব্দে হাজতের ভেতরে কুঁকড়ে বসে থাকা আসামীটা চমকে চোখ তুলে তাকাল। ধুলোমাখা মেঝে আর মশার কামড়ে অতিষ্ঠ নির্ভান যখন দেখল লোহার শিকের ওপাশে তার বাবা দাঁড়িয়ে আছেন। মুহূর্তেই তার চোখের কোণ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে টলমলে পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে শিকের সামনে এগিয়ে এল। ফিসফিস করে কাঁপা গলায় ডাকল।

“বা-বাবা?”
নির্ভানের সেই করুণ ডাকে নাইম খান এক মুহূর্তের জন্য চোখ ফিরিয়ে নিলেন। পাথরের মতো শক্ত মনে হয়তো কোনো চোরা টান লেগেছে। কিন্তু তিনি সেটা প্রকাশ হতে দিলেন না। তিনি সাথে থাকা পুলিশ অফিসারকে ইশারা করলেন দূরে যেতে। অফিসার সসম্মানে সরে দাঁড়ালে নাইম খান আবার নির্ভানের দিকে তাকালেন। নির্ভান এখনো অবাক চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে তার বাবা এই নোংরা থানায় তার সাথে দেখা করতে আসবেন।
নাইম খান গলা পরিষ্কার করে বেশ গম্ভীর আর শীতল কণ্ঠে বললেন।
“বেশি আবেগপ্রবণ হওয়ার দরকার নেই নির্ভান। ভাবিস না আমি তোকে দেখতে এখানে এসেছি। আমি নেহাত প্রয়োজনেই এসেছি।”
মুহূর্তের মধ্যে নির্ভানের উজ্জ্বল হয়ে ওঠা মুখটা ম্লান হয়ে গেল। মাথাটা নিচু করে নিল সে। মনে মনে ভাবল। ঠিকই তো। সে তো তার বাবার যোগ্য ছেলে হতে পারেনি। তবে তাকে দেখতে কেন আসবেন তিনি? নাইম খান আবার বললেন।

“আমি তোর কাছে একটা বিশেষ সাহায্য চাইতে আসছি। করবি আমায় সাহায্য?”
নির্ভান তার বাবার কথা যেন কিছুতেই মেলাতে পারছে না। জেলের এই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে সে তার প্রভাবশালী বাবাকে কী এমন সাহায্য করতে পারে? নাইম খান যখন দেখলেন নির্ভান পাথরের মতো স্থবির হয়ে আছে। তখন তিনি কিছুটা অধৈর্য হয়ে বললেন।
“কথা বলছিস না কেন? বোবা হয়ে গেলি নাকি?”
নির্ভান শুকনো গলায় ঢোক গিলে অস্ফুট স্বরে বলল।
“কিন্তু বাবা? আমি এই চার দেয়ালের ভেতর থেকে তোমাকে কী সাহায্য করব? আমি তো নিজেই কয়েদি।”
নাইম খান দুই হাত পিঠমোড়া করে জেলের করিডোরে পায়চারি করতে করতে রহস্যময় গলায় বললেন।
“উঁহু। তোকে জেলে থেকে সাহায্য করতে হবে না। সাহায্য করবি জেলের বাইরে থেকে।”
নির্ভান ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে তাকাল। ওর বিস্ময় যেন কাটছেই না। সে অবাক হয়ে শুধাল।
“বাইরে থেকে মানে?।”

নাইম খান এবার থমকে দাঁড়ালেন। নির্ভানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে হুকুমের সুরে বললেন।
“হ্যাঁ। বাইরে থেকেই। তোকে আমি আজই জামিন করাব। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। শুধু আমার প্ল্যানমতো তোকে কাজ করতে হবে। একটা চুল পরিমাণ এদিক-ওদিক হওয়া চলবে না।”
নির্ভান সাথে সাথে মাথা নিচু করে নিল। ওর চোখে বিষণ্নতার ছায়া। সে অপরাধবোধে জর্জরিত হয়ে ধীর গলায় বলল।
“বাবা? আমি এখন জামিন চাই না। কারণ আমি আমার বোনটাকে কথা দিয়েছি। কথা না রাখলে ও অনেক কষ্ট পাবে।”
নির্ভানের মুখে বোনের প্রতি এই মমত্ববোধ দেখে নাইম খান যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে জেলের লোহার গ্রিলটা দুহাতে খামচে ধরে গর্জে উঠলেন।
“যদি বোনের আত্মা শান্তিই না পায়। তবে বোনের দেওয়া কথা রেখে কী হবে?”

নির্ভান আকাশ থেকে পড়ল। বাবার কথার মানে ও কিছুতেই বুঝতে পারছে না। বোনের আত্মা শান্তি পাবে না মানে? নাইম খান এবার আর নিজের ভেতরের আগ্নেয়গিরি চেপে রাখতে পারলেন না। এতক্ষণের কঠোর ব্যক্তিত্ব ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি হু হু করে ছোট বাচ্চার মতো কেঁদে উঠলেন। কান্নায় ভেঙে পড়ে নাইম খান বলতে লাগলেন।
“আরে আমার কলিজার টুকরো মেয়েটা যে মরে গেছে। কিসের জন্য মারা গেল সে? একজনকে ভালোবেসে পেল না বলেই তো চলে গেল না-ফেরার দেশে। অথচ যার জন্য ও এই পৃথিবীটা ছাড়ল। সেই মানুষটা দিব্যি সুখে আছে। সেই সুখ আমি সইব কীভাবে? আমার মেয়েটা কী চেয়েছিল ওই সোহান চৌধুরীর ছেলের কাছে? স্রেফ এক মুঠো ভালোবাসা তো। একটু ভালোবাসলে কী এমন ক্ষতি হতো রে? বল?”
নির্ভান পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর চোখ ফেটে লোনা জল গড়িয়ে পড়ছে। বাবার প্রতিটি শব্দ যেন তপ্ত সিসার মতো ওর কানে বিঁধছে। সেও তো একই কথা ভেবেছিল শুভ্রর কী এমন ক্ষতি হতো যদি নেহাটাকে একটু ভালোবাসত। অবহেলা কি এতই বিষাক্ত যে একটা প্রাণ কেড়ে নিল।

নাইম খান শার্টের হাতা দিয়ে চোখ মুছে আবার বলতে শুরু করলেন। কণ্ঠস্বর এবার যন্ত্রণায় বুজে আসছে।
“নির্ভান? তোর মা একদম ভালো নেই রে। আমি তাকে সামলাতে সামলাতে প্রায় পাগল হয়ে যাচ্ছি। দিন-রাত শুধু একটাই চিৎকার আমার নেহাকে এনে দাও। আমার নেহাকে ফিরিয়ে দাও। বুক ফেটে যায় ওর কান্না দেখলে। দিনের পর দিন ইনজেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হচ্ছে ওকে। আমি আজ ভেঙে পড়েছি নির্ভান। একজন বাবার কাছে নিজের কাঁধে মেয়ের লাশ বয়ে বেড়ানোর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?”
বলেই নাইম খান জেলের শিকের ওপর মাথা ঠেকিয়ে হু হু করে কাঁদতে লাগলেন। এক সময়ের দাপুটে নাইম খান আজ সন্তানের শোকে কতটা অসহায়। তা তার কান্নার শব্দই বলে দিচ্ছে। হঠাৎ তিনি ঝটকা দিয়ে মাথা তুললেন। চোখের জল মুছে তার দৃষ্টি এবার তীক্ষ্ণ আর প্রতিহিংসায় ভরে উঠল। নির্ভানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন।

“কিন্তু আমি এত সহজে হার মানব না। সোহান চৌধুরীর সুখ আমি সইতে পারছি না। ওর ছেলে দিব্যি ঘুরে বেড়াবে আর আমার মেয়েটা মাটির নিচে পচে মরবে তা হবে না।”
নির্ভান বাবার এই ভয়ংকর রূপ দেখে শিউরে উঠল। সে রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করল।
“বাবা? তুমি আসলে করতে কী চাইছো? তোমার মাথায় কী ঘুরছে?”
নাইম খান নির্ভানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে হুকুমের সুরে বললেন।
“তোকে আজই জামিন করাব। তোকে এই নরক থেকে বের হতে হবে। এখনই।”
নির্ভান কিছুটা দ্বিধা নিয়ে মুখ খুলল।
“কিন্তু বাবা? আমি তো।”
বাকিটুকু আর বলতে দিলেন না নাইম খান। তিনি গর্জে উঠে নির্ভানের কথা থামিয়ে দিলেন।
“কোনো কিন্তু নয় নির্ভান। যদি তুই আজ এই জামিন কাগজে সই না করিস। তবে কথা দিচ্ছি নিজের বোনের লাশের পাশে এই বাপের লাশটাও দেখবি। আর আমি চলে গেলে তোর মা তো এমনিতেই মরে যাবে। এখন তুই ঠিক কর। তুই কী চাস?”
বাবার মুখে এমন মরণপণ হুমকির কথা শুনে নির্ভানের কলিজাটা কেঁপে উঠল। তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে যাচ্ছে। সে আর এক মুহূর্ত দেরি না করে ব্যাকুল হয়ে বলে উঠল।
“না না বাবা। দোহাই লাগে তোমার। এসব অলক্ষুণে কথা বলো না। ঠিক আছে। আমি রাজি। তুমি যা বলবে আমি তা-ই করব। আমি আজই বের হতে চাই।”

“ভূত ভূত ভূত। ভূতে ধরেছে শুভ্রকে। ও সবাইকে মেরে ফেলবে।”
পুরো বাড়ি যেন মাথায় তুলে ফেলছে রাসেল। ওর আর্তচিৎকারে বাড়ির শান্ত পরিবেশ মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। বিলকিস চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রাসেলকে থামানোর চেষ্টা করছেন। সোহান চৌধুরী আর মাহবুব চৌধুরীও মিলে ওকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। কিন্তু রাসেলের মুখে ওই একই বুলি।
“ভূত। শুভ্রের ওপর নির্ঘাত কোনো শয়তানি আত্মা চেপেছে।”
সাহেরা চৌধুরী রাসেলের মাথায় হাত বুলিয়ে পরম মমতায় বললেন।
“শান্ত হও বাবা। এভাবে চিল্লাহাল্লা করো না। হয়তো তুমি ভুলভাল কিছু দেখেছ। অত সকালে ছাদের আলো-আঁধারিতে কত কী মনে হয়।”
গোলমাল শুনে রিদি। শুভ্রা। মিহি আর পাখিও ড্রয়িং রুমে চলে এল। রিদিকে দেখতেই রাসেলের চোখদুটো যেন ভয়ে ঠিকরে বেরিয়ে আসার উপক্রম হলো। সে আরও জোরে চিৎকার করে বলতে লাগল।
“আমি নিশ্চিত শুভ্রের ওপর কিছু একটা ভর করেছে। না হলে এমন হওয়া অসম্ভব।”
শুভ্রা বিরক্ত হয়ে বলল।

“কী আবোলতাবোল বলছেন রাসেল ভাইয়া? ভাইয়ার ওপর আবার কী চেপে বসবে?”
রাসেল এবার হাঁপাতে হাঁপাতে গড়গড় করে সব বলতে শুরু করল।
“হ্যাঁ। চেপেছে। সকালে আমি যখন ছাদে গেলাম। গিয়ে দেখি রিদি একাই দাঁড়িয়ে আছে। শুভ্র কোথাও ছিল না। তারপর আমি রিদির সাথে গল্প করছিলাম। হঠাৎ করে দেখি শুভ্র ব্রো কোত্থেকে যেন হুট করে উদয় হলো। রিদি ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার পর আমি যেই নিচে নামতে যাব। অমনি ব্রো আমার গেঞ্জির কলার বাঘের মতো খামচে ধরল। তারপর কর্কশ গলায় বলল। সমস্যা কী তোর? আমার বউয়ের পিছে এভাবে আঠার মতো লেগে আছিস কেন?”
মাহবুব চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে অবাক হয়ে বললেন।
“কী বলছিস এসব তুই? বউ? শুভ্রের বউ কোত্থেকে আসবে? ওর তো বিয়েই হয়নি।”
রাসেল গলার দাগটা দেখানোর চেষ্টা করে বলল।
“আমিও জানি না। ব্রোর চোখ তখন আগুনের মতো লাল ছিল। আর বারবার খালি বউ বউ করে চিৎকার করছিল। আমি যেই বলেছি যে তুমি তো বিয়েই করোনি। বউ কোত্থেকে আসবে? অমনি ব্রো আমার গলা টিপে ধরল। এত জোরে চেপে ধরেছিল যে আমি শ্বাস নিতে পারছিলাম না। ওটা কোনো মানুষের শক্তি ছিল না মামা। নির্ঘাত কোনো জিন-ভূত হবে।”

রাসেলের কথা শুনে রিদি মুহূর্তের জন্য একদম স্থির হয়ে গেল। রাসেলের আতঙ্কিত চেহারা দেখে ওর আর বুঝতে বাকি নেই যে শুভ্র সত্যিই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছে। শুভ্রর মতো গম্ভীর একটা ছেলে এমন পাগলামি করেছে ভেবেই রিদি আর হাসি চেপে রাখতে পারল না। ও হঠাতই হা হা হু হু হি হি করে শব্দ করে হেসে উঠল।
রিদির এমন অসময়ে অট্টহাসি দেখে ড্রয়িংরুমে থাকা বাড়ির বড়রা থেকে শুরু করে সবাই ওর দিকে গোল গোল চোখে তাকাল। মুহূর্তেই রিদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে হাসি থামিয়ে দিল। রিদির বাবা ইকবাল এহসান ভ্রু কুঁচকে মেয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন।
“কী হয়েছে রিদি? এমন অসভ্যের মতো হাসলি কেন তুই?”
রিদি আমতা আমতা করে কোনোমতে হাসি চেপে বলল।
“এ-এমনি আব্বু। জাস্ট একটা জোকস মনে পড়ে গিয়েছিল।”

রাসেল রিদির দিকে প্রায় কান্নাকাটি করার মতো মুখ করে তাকিয়ে বলল।
“রিদি? তুমি কি এটাকে মজা ভাবছো? আমি একটুও ইয়ার্কি করছি না। খোদার কসম বলছি। শুভ্র ব্রো আমার সাথে ঠিক এটাই করেছে। আমার গলায় এখনো দাগ বসে আছে মনে হয়।”
রাসেলের কথা শেষ হওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তে ঘর থেকে বের হয়ে এল ঈশান। তুর্য আর রিফাত। তাদের সবার পেছনে পকেটে হাত দিয়ে অত্যন্ত শান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে আসছে শুভ্র। শুভ্র ওর পরনের শার্টের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটাতে গুটাতে ডাইনিং টেবিলের কাছে গিয়ে আয়েশ করে বসল। ড্রয়িংরুমের এই গম্ভীর পরিবেশ যেন ও টেরই পায়নি। ও বিলকিস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে নির্বিকার গলায় বলল।
“চাচি?খেতে দাও তো। খুব খিদে পেয়েছে।”
সবাই যখন হতভম্ব হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। তখন বিলকিস চৌধুরী শুভ্রের দিকে এগিয়ে এসে কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন।

“কিরে শুভ্র? সকালে ছাদে তুই নাকি রাসেলের গলা টিপে ধরেছিস? ও তো বলছে তুই নাকি বারবার বউ বউ করে চিৎকার করছিলি? এসব কি সত্যি? তোর শরীর-টরীর ঠিক আছে তো?”
বিলকিস চৌধুরীর কথা শুনে শুভ্র টেবিলে রাখা জগ থেকে এক গ্লাস জল ঢেলে নিল। এক ঢোক খেয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রেখে অত্যন্ত শান্ত গলায় বলল।
“আসলে চাচি। হুট করে ছাদে রাসেল আমায় দেখে কেমন যেন কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ও আমাকে দেখে ভয় পাচ্ছে দেখেই আমার মাথায় দুষ্টুমি বুদ্ধি চাপল। ভাবলাম আরও একটু ভয় দেখিয়ে দিই। তারপর আর কী। এই পাগলামির অভিনয়টা করলাম। কিন্তু ও যে এতটা সিরিয়াসলি ভয় পেয়ে যাবে। সেটা আমি গেস করতে পারিনি।”
শুভ্রর কথা শেষ হতে না হতেই ড্রয়িংরুমের থমথমে পরিবেশটা মুহূর্তেই হালকা হয়ে গেল। ভয়ের বদলে এবার হাসির রোল পড়ল সবার মাঝে। ঈশান। তুর্য আর রিফাত তো হেসেই কূল পাচ্ছে না। রাসেল নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে বড় বড় চোখ করে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল।
“তার মানে? তুমি আমাকে জাস্ট ভয় দেখানোর জন্য আমার সাথে ওমন অদ্ভুত অভিনয় করেছ? আর ওই যে বউ বউ করছিলে?”

শুভ্র তখন প্লেটে খাবার নিতে নিতে আড়চোখে একবার রাসেলের দিকে তাকাল। ওর ঠোঁটের কোণে সেই পরিচিত রহস্যময় বাঁকা হাসিটা ফুটে উঠল। সে গম্ভীর মুখে রাসেলের দিকে ইশারা করে বলল।
“কাছে আসো। ভালো করে বুঝিয়ে বলছি তোমাকে।”
শুভ্রর ডাকার ভঙ্গি দেখে রাসেলের বুকটা আবার একটু কেঁপে উঠল। ও বুঝতে পারছে না শুভ্র কি এখনো মজা করছে। নাকি আসলেও কিছু বোঝাতে চায়। ড্রয়িংরুমের বাকিরা তখনো হাসাহাসি করছে। রাসেল যেন ভয়ে একেবারে জমে পাথর হয়ে সোফায় সেঁটে আছে। শুভ্রর কাছাকাছি যাওয়ার সাহস তো দূর। ওর দিকে তাকাতেও এখন রাসেলের বুক কাঁপছে। রাসেলের এই করুণ দশা দেখে ইমন হাসতে হাসতে প্রায় গড়িয়ে পড়ল। সে শুভ্রর দিকে তাকিয়ে ফোড়ন কাটল।

“ব্রো? তুমি এটা কী করলা। রাসেল ব্রো তো এখন মনে হয় রাতের বেলা বাথরুমে যেতেও একা বের হতে পারবে না। আর সব থেকে বড় কথা। ও এখন তোমার সামনে আসতেই যমের মতো ভয় পাচ্ছে।”
ইমনের কথা শুনে ড্রয়িংরুমে আবার হাসির জোয়ার বয়ে গেল। সোহান চৌধুরী আর মাহবুব চৌধুরীও মুচকি হাসছেন। শুভ্র অবশ্য কারো হাসাহাসিতে বিন্দুমাত্র কান দিল না। সে অত্যন্ত নির্বিকার মুখে নিজের প্লেটে মন দিল। যেন একটু আগে সে কিছুই বলেনি।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩১

একে একে বাড়ির সবাই ডাইনিং টেবিলে এসে আসন নিল। শুরু হলো সকালের নাস্তা। রাসেল অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে টেবিলের একদম এক কোণে গিয়ে বসল শুভ্রর থেকে যতটা দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব। ঠিক ততটাই দূরে। শুভ্র আড়চোখে একবার রাসেলের কুঁকড়ে থাকা অবস্থার দিকে তাকাল। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলল না।

অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৩