Home প্রাণসঞ্জীবনী প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৬

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৬

প্রাণসঞ্জীবনী পর্ব ৫৬
রাত্রি মনি

সন্ধ্যা সাতটা। রোমের সন্ধ্যা তখন এক মায়াবী ক্যানভাস। আকাশের বুক জুড়ে গাঢ় নীল আর রাজকীয় বেগুনি রঙের খেলা। কলসিয়ামের প্রাচীন পাথুরে দেয়ালে বিকেলের শেষ রোদটুকু মিলিয়ে যেতেই চারপাশের ল্যাম্পপোস্টগুলো ধীরলয়ে জ্বলে উঠেছে। ঠিক সেই মুহূর্তেই ব্যস্ত হাইওয়ের যানজট চিরে একটি কুচকুচে কালো মার্সিডিজ তার আভিজাত্য নিয়ে ডানা মেলল। পেছনে ছায়ার মতো অনুসরণ করছে আরও কয়েকটি কালো এসইউভি।
রাস্তার ট্রাফিক লাইটের নিয়ন আলো যখন গাড়ির পালিশ করা চকচকে বডিতে পড়ছে, তখন মনে হচ্ছে একখণ্ড অন্ধকার যেন রাজপথ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। ইঞ্জিনের সেই গম্ভীর গর্জন আর টায়ারের সাথে পিচঢালা রাস্তার ঘর্ষণ এক অন্যরকম উন্মাদনা তৈরি করেছে। খোলা হাইওয়েতে আসতেই গাড়িটি যখন গতি বাড়িয়ে ‘সাই সাই’ করে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন দুপাশের ক্যাফে আর রঙিন দোকানগুলো এক একটা ঝাপসা রঙিন ফিতের মতো পেছনে হারিয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো এক আধুনিক ‘ব্ল্যাক প্যান্থার’ তার সাম্রাজ্য দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

“স্টপ দ্য কার!!”
হঠাৎ জেইনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর গাড়ির নিস্তব্ধতা চিরে দিল। ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ কষে ব্রেক চাপল। চাকার শব্দে চারপাশ কেঁপে উঠলেও জেইনের সমস্ত পৃথিবী তখন তার কোলের ওপর নেতিয়ে পড়া মানুষটিকে কেন্দ্র করে থমকে গেছে। জেইন অস্থির হয়ে রিমের ফ্যাকাশে দু’গালে হাত রাখল। রিম পুরোপুরি নেতিয়ে পড়েছে, তার চিবুক জেইনের বাহুতে আলগাভাবে ঠেকে আছে। সে কোনোমতে মুখ হাঁ করে বড় বড় শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করছে, যেন চারপাশের অক্সিজেন ফুরিয়ে আসছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হীরের দানার মতো চিকচিক করছে।
“কী হয়েছে সোনা? খারাপ লাগছে খুব বেশি? আমাকে বলো, কোথায় কষ্ট হচ্ছে তোমার?”
রিম দূর্বল হাতে জেইনের শার্টের কলারটা কোনোমতে শক্ত মুঠোয় খামচে ধরল। তার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু শব্দ বের হচ্ছে না। অস্পষ্ট স্বরে সে ফিসফিসিয়ে বলল,

“হাঁসফাঁস করছে খুব… জানালাটা একটু খুলে দাও…”
জেইন এক মুহূর্ত দেরি না করে রিমের গলার স্কার্ফটা আলগা করে খুলে ফেলল। এসি বন্ধ করে, রিমোট দিয়ে জানালা নামাতেই হিমেল হাওয়া হু হু করে ভেতরে ঢুকে পড়ল। জেইন জলের বোতলটা রিমের ঠোঁটে ছোঁয়াল। রিম সামান্য জল খেয়েই নিজেকে আর সামলাতে পারল না; পাকস্থলী উল্টে আসার তীব্র অনুভূতিতে সে সরাসরি জেইনের বুকের ওপর সবকিছু উগরে দিল।
জেইনের মুখটা এক মুহূর্তের জন্য বিকৃত হয়ে গেল—কিন্তু সেটা ঘৃণা থেকে নয়, বরং রিমের চরম শারীরিক যন্ত্রণার কষ্ট থেকে। সে এক হাতে রিমকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে অন্য হাতে নিজের রুমাল দিয়ে জমানো পানি দিয়ে ওকে পরিষ্কার করতে শুরু করল। ড্রেস নষ্ট হয়েছে কি না, সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার মাথায় শুধু ঘুরছে ডাক্তারের সেই অবহেলার কথা। চব্বিশ ঘন্টা লাগবে রিপোর্টের জন্য? জেইনের ইচ্ছে করছে এক্ষুনি গিয়ে সেই ডাক্তারকে জ্যান্ত কবর দিয়ে আসতে।
সামনে থেকে ড্রাইভার বিচলিত গলায় জিজ্ঞেস করল, “বস, কোনো সাহায্য লাগবে?”

“না, ইটস ওকে। জাস্ট কিপ দ্য কার হেয়ার,”
জেইন ভিজে রুমাল দিয়ে রিমের মুখ, ঘাড় আর কপাল অতি সাবধানে মুছিয়ে দিল। তারপর নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল,
“এখন কেমন লাগছে সোনা?”
রিম উত্তর দেওয়ার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। সে ধীরলয়ে জেইনের গলা জড়িয়ে ধরে তার প্রশস্ত বুকের মাঝখানে মুখ গুঁজে দিল। শার্টের বোতাম খোলা থাকায় জেইনের ত্বকের সেই পরিচিত পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণ সরাসরি রিমের নাকে এল। সে নেশাক্তের মতো দীর্ঘ এক শ্বাস টেনে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“এখন ভালো লাগছে… এই ঘ্রাণটা… It gives me a strange power!”
“এটা ভালো লাগছে তোমার?”
জেইনের রিমের মাথায় আলতো হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো।
“খুব ভালো। আমি এই ঘ্রাণে মিশে থাকতে চাই, রোজ…”

ঠিক সেই সময় জেইনের ব্লুটুথ কানেকশনে ইয়াশের কল বেজে উঠল। ওপাশ থেকে ইয়াশের চিন্তিত স্বর ভেসে এল,
“কিরে, মাঝরাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রেখেছিস কেন? এনিথিং রং?”
জেইন রিমের ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে শীতল গলায় বলল,
“নাথিং। তোরা মাত্তেওকে নিয়ে চলে যা। আমাদের ফিরতে একটু দেরি হবে।”
ইয়াশকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে কলটি কেটে দিল। রিম ক্লান্তিতে তখন জেইনের বুকেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। হাইওয়ের মাঝখানে সেই নিঃসঙ্গ মার্সিডিজ, আর খোলা জানালা দিয়ে আসা রোমের হিমেল বাতাস। রিমের সিল্কি চুলগুলো উড়ে এসে জেইনের মুখে আছড়ে পড়ছে। জেইন এক সেকেন্ডের জন্য চোখ বুজল—রিমের শরীরের সেই মিষ্টি ঘ্রাণ আর বাতাসের শীতলতা তাকে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে নিয়ে গেল।
ঠিক তখনই সামনের সিট থেকে ভেসে এলো ড্রাইভারের কন্ঠস্বর,

“বস, এভাবে আর কতক্ষন মাঝ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকবো। সাধারণ মানুষ জনের চলাচলে অসুবিধা হচ্ছে।”
তৎক্ষণাৎ জেইনের চোখের মণি দুটো আগ্নেয়গিরির মতো লালাভ আগুনে জ্বলে উঠলো। এক বীভৎস, হিংস্র ক্ষুধার্ত পৈশাচিক দৃষ্টি। জেইন ঠোঁটে আঙুল চেপে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,
“Shhh! don’t make any noise, my heart is asleep, can’t you see? ওর বিউটি স্লিপ নষ্ট হলে আজ এই হাইওয়েতেই তোর সমাধি বানাবো আমি।”

ড্রাইভারের বুকের স্পন্দন যেন সেখানেই আছড়ে পড়ে থেমে গেল। কণ্ঠনালী শুকিয়ে এক টুকরো তপ্ত মরুভূমি। ভয়ে তার মেরুদণ্ড দিয়ে এক হিমস্রোত বয়ে গেল। সে আর একটাও টু শব্দ করার সাহস পেল না। জেইন ঘাড় ঘুরিয়ে রিমের দিকে তাকালো।সঙ্গে সঙ্গে সেই লেলিহান আগুনের মতো দৃষ্টি মুহূর্তেই শরতের শান্ত সরোবরের মতো স্নিগ্ধ হয়ে গেল। সে আলতো হাতে রিমের কপালের ওপর থেকে চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে সেখানে একটি দীর্ঘ, উষ্ণ চুম্বন এঁকে দিল। ঘুমের মাঝে মেয়েটাকে কোনো এক অপার্থিব স্নিগ্ধ পরীর মতো লাগছে। জেইন নেশাতুর চোখে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল রিমের দিকে। তার মনে হলো, এভাবে এই হাইওয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে যুগ যুগ পার করে দিতে পারবে, যদি রিম এভাবেই তার বুকে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকে।

রাত তখন বেড়ে চলেছে। রোম শহরের বুকে যখন উৎসবের রেশ, তখন তার তলদেশে এক শীতল অন্ধকার গ্রাস করে রেখেছে ইতালির এক প্রাচীন জেলখানার প্রতিটি ইঁট-পাথর। স্যাঁতস্যাঁতে দেয়াল বেয়ে নেমে এসেছে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জমাট বাঁধা ভয় আর আর্তনাদের দীর্ঘশ্বাস। লোহার মরিচা পড়া গেটগুলোতে যেন অতীতের শত শত কয়েদির ছায়া এখনো বন্দি। এখানকার বাতাস এত ভারী যে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে কেমন যেন পচা গন্ধ আর মৃত্যুর হিমশীতল পরশ লাগে।

অন্ধকারের এই সাম্রাজ্যে, সরু করিডোর ধরে প্রতিধ্বনি তুলে ঠকঠক পায়ে এগিয়ে চলেছে একজন রহস্যময়ী মানব। তার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন নীরবতার বুক চিরে এক অশুভ সংকেত। পুরনো জুতোর শব্দ পাথরের মেঝেতে এমনভাবে ধাক্কা খাচ্ছে যেন মৃত্যুর দেবতা নিজেই হেঁটে চলেছেন। আলো-আঁধারির খেলায় তার দীর্ঘ ছায়া দেয়ালের গায়ে কখনো বড় হচ্ছে, কখনো ছোট। কিন্তু যে জিনিসটি অন্ধকারকেও হার মানাচ্ছে, তা হলো তার চোখ দুটো—গভীর নীলাভ, হিমশীতল এবং অস্বাভাবিক উজ্জ্বল। এই চোখ যেন কোনো নিগূঢ় রহস্যের আধার, যা অন্ধকার ভেদ করে নিজের লক্ষ্য স্থির রেখেছে।

সে এগিয়ে চলেছে সেই কুঠুরির দিকে, যেখানে বন্দি এক ভয়ঙ্কর সত্তা।সেখানেই দিন গুনছে এক সাইকো কিলার, যে আজ পর্যন্ত অগণিত নিরীহ জীবন কেড়ে নিয়েছে। তার প্রতিটি খুনে রয়েছে এক বীভৎস আনন্দ, এক নারকীয় উন্মাদনা। তার অস্তিত্বই যেন জেলের এই ভয়াল পরিবেশকে আরও বেশি ভীতিকর করে তুলেছে।
কারাগারের সেই স্যাঁতস্যাঁতে করিডোরের শেষ প্রান্তে যখন ভারী বুটের ‘ঠকঠক’ শব্দটা থেমে গেল, চারপাশের বাতাস যেন ভয়ে জমে বরফ হয়ে গেল। রহস্যময়ী মানবটি থমকে দাঁড়ালো লোহার মজবুত গরাদগুলোর ঠিক সামনে। ভেতরে আবছা আলোয় দেখা যাচ্ছে এক বীভৎস দৃশ্য।
সেই সাইকো কিলার, মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে আছে। তার আলুথালু চুল মুখ ঢেকে রেখেছে, কিন্তু তার হাত দুটো অবিরাম নড়ছে। সে মেঝের ধুলো আর নিজের আঙুল দিয়ে পাথুরে মেঝেতে অদ্ভুত সব আঁকিবুঁকি কাটছে। শুধু মেঝে নয়, পুরো সেলটির দেওয়াল জুড়ে ইতালীয় ভাষায় রক্তবর্ণের আঁচড়ে কী যেন লেখা। কোনোটা অভিশাপ, কোনোটা হয়তো মৃত আত্মাদের নাম।

তার ঠোঁট দুটো থরথর করে কাঁপছে। সে একনাগাড়ে বিড়বিড় করে চলেছে—যেন কোনো অশরীরী শক্তির সাথে কথা বলছে। তার সেই ঘড়ঘড়ে অস্পষ্ট আওয়াজ বাতাসের শিরশিরানি বাড়িয়ে দিচ্ছিল।
রহস্যময়ী মানবটি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার কুঠুরির ভেতর তার নীলাভ চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠল—ঠিক যেন কোনো অতল সমুদ্রের অতল রহস্য। সে তার ভারী আর গম্ভীর কণ্ঠে মুখ তুলে চাইল। তার স্বর দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনি তুলল। তার শান্ত কিন্তু গম্ভীর স্বরে নীরবতা ভেঙে প্রথম প্রশ্নটি ছুঁড়ে দিল,
“Come ti sembra l’atmosfera qui dentro? Ti piace questo silenzio?”
(How do you like the atmosphere here? Do you like this silence?)

কথাটা কানে যেতেই সাইকো কিলারের হাতের নড়াচড়া হঠাৎ থেমে গেল। সে ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকালো। তার আলুথালু চুলের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা চোখ দুটোতে যেন নরকের আগুন জ্বলছে। সে পশুর মতো ফোঁস ফোঁস করে নিঃশ্বাস নিতে শুরু করল, যেন কোনো ক্ষুধার্ত বাঘিনী তার শিকারকে ছিঁড়ে ফেলার আগে হিসহিস শব্দ করছে। তার চোখেমুখে ফুটে উঠল এক চরম হিংস্রতা আর উন্মাদনা।
তাকে এভাবে জ্বলতে দেখে রহস্যময় মানবটির ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। সে আরও এক ধাপ এগিয়ে এল, তার কণ্ঠস্বর এখন আগের চেয়েও বেশি প্রগাঢ় আর মায়াবী। সে শান্ত স্বরে বলল,
“Calmati… la tua attesa è finita. Sono venuto io stesso a portarti via……..”
(Calm down… Your wait is over. I’m here to take you out of here………)

রহস্যময় মানবটির কথাগুলো যেন সেই রক্তপিপাসু মানবের অন্তরে এক নতুন অন্ধকারের বীজ বপন করল। জেলের সেই দেয়ালগুলোও যেন শিউরে উঠল এক আসন্ন প্রলয়ের আশঙ্কায়।এই রহস্যময়ী মানব এবং ভয়ংকর খুনির সাক্ষাতের মধ্য দিয়ে রোমের পাতালপুরীর অন্ধকার যেন আরও ঘনিয়ে আসছে, কী উদ্দেশ্য এই নীলাভ চোখের মানুষটির? আর কীসের ইঙ্গিত এই অশুভ মিলন?………….

রিম ঘুমের ঘোরে জেইনের তপ্ত বুকে মুখ ঘষে একটু নড়েচড়ে উঠল। তার উষ্ণ নিশ্বাস জেইনের চামড়ায় আছড়ে পড়তেই জেইনের শিরদাঁড়া দিয়ে এক মৃদু শিহরণ বয়ে গেল। কিন্তু সাগরের নোনা বাতাসের হিমেল ঝাপটা রিমের গায়ে লাগতেই সে শিউরে উঠল।
“উমম…. ঠান্ডা লাগছে খুব!…”
রিম ফিসফিস করে বলে উঠল। এক হাতে চোখ কচলাতে কচলাতে পিটপিট করে তাকানোর চেষ্টা করল।
“তোমার ঘুম হয়েছে সোনা? শরীর ভালো লাগছে এখন?”
জেইনের গাঢ় হাস্কি ভয়েজ। রিম চোখের পাতা মেলে নিজেকে জেইনের বাহুবন্ধনে আবিষ্কার করল। সে আবছা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আমরা কোথায় আছি?”
জেইন রিমের চুলের ভাঁজে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে গাঢ় স্বরে আঠালো গলায় বলল,
“যেখানে হারানোর কোনো সীমানা নেই। যেখানে জগতটা শুধুই আমাদের দুজনের। একান্ত ব্যক্তিগত, ঠিক এই মুহূর্তটার মতো স্বর্গীয়, শুধু তুমি আর আমি।”
রিম জেইনের হেঁয়ালিপূর্ণ কথার অর্থ পুরোপুরি বুঝতে পারল না, কিন্তু পরক্ষণেই মাথা ঘুরিয়ে চারপাশে তাকাতেই তার চোখ দুটো বিস্ময়ে আর খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠল। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলো ছাপিয়ে সামনে এখন শুধুই অসীম সমুদ্র।
নীলচে-কালো ঢেউগুলো বালির ওপর আছড়ে পড়ছে এক অদ্ভুত ছন্দে—’সাই সাই’ শব্দে বাতাস যেন গান গাইছে। রিম খুশিতে আত্মহারা হয়ে জেইনের গলায় দুহাত জড়িয়ে ধরে হঠাৎ করেই তার গালে একটা গভীর চুমু বসিয়ে দিল।
জেইন মুহূর্তের জন্য থমকে গেল, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত আদর সে প্রত্যাশাই করেনি। তার মুখে ফুটে উঠল এক প্রশান্তির হাসি। সে রিমকে কোলে নিয়ে বালির ওপর থাকা এক ছোট্ট কাঠের কটেজে বসেছিল, রিম কোল থেকে নেমেই চপল পায়ে ছুটে গেল সমুদ্রের তীরের দিকে।

“আস্তে! পড়ে যাবে তো!”
“কিচ্ছু হবে না আমার!”
রিমের উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ বাতাসে প্রতিধ্বনিত হলো।
রিম সমুদ্রের একদম কিনারায় গিয়ে দাঁড়াল। ঢেউ এসে তার ন*গ্ন পায়ে আছড়ে পড়তেই এক তীব্র ঠান্ডা ঝাঁকুনিতে শরীরটা কেঁপে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই সে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। সমুদ্রের পানিতে অসংখ্য জোনাকি পোকার মতো নীল রঙা আলো ঝিকমিক করছে। প্রতিটি ঢেউ যেন নীলাভ আগুনের ফুলকি নিয়ে তীরে আছড়ে পড়ছে। রিম অবাক হয়ে নিজের হাতের আজলায় পানি তুলে নিল। তার হাতের তালুতে, আঙুলের ফাঁকে ছোট ছোট নীল আলোকবিন্দু হীরের মতো ঝিকমিক করছে।
জেইন নিঃশব্দে রিমের ঠিক পেছনে এসে দাড়ালো। পকেটে দুহাত গুঁজে সে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল এই দৃশ্যটার দিকে—না, সে সমুদ্র দেখছে না, সে দেখছে তার পুথিবী তার ‘ফায়ারফ্লাই’কে।
রিম ঘুরে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আরাত্র… এগুলো কী? এত্তো সুন্দর কেন?”
জেইন রিমকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ওর কাঁধে চিবুক রাখল।
” ‘সি স্পার্কল’ (Sea Sparkle)। এদের বৈজ্ঞানিক নাম ‘ডাইনোফ্ল্যাজিলেট’ (Dinoflagellates)। এগুলো এক ধরনের আণুবীক্ষণিক জীব, যারা ছোঁয়া লাগলেই এমন মায়াবী আলো ছড়ায়।”
“অপূর্ব! তোমার কাছে যদি এখন ক্যামেরা থাকত! আমি এই মুহূর্তটাকে বন্দি করে রাখতাম।”
জেইন রিমের গলার খাঁজে মুখ ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“তার কোনো প্রয়োজন নেই। আমি আমার চোখের লেন্সে সবকিছু ক্যাপচার করে নিয়েছি। সময় হলে তোমাকে প্রিন্ট আউট করে দেব।”
“মানে?” রিম কিছুটা ধন্দে পড়ে গেল।
“মানেটা সময়ই বলে দেবে।”
জেইন রিমের ঘাড়ের ঠিক নিচের সেই সংবেদনশীল জায়গায় ছোট্ট একটা কামড় বসিয়ে দিল। রিমের সর্বাঙ্গে এক বিদ্যুৎ খেলে গেল। জেইন ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“হয়েছে, এখন আর এখানে থাকা যাবে না। ঠান্ডা লেগে যাবে। এবার চলো।”
“উমম না! আমি আরও কিছুক্ষণ থাকব,”
রিম বাচ্চাদের মতো জেদ ধরল।

“এখন শরীর খারাপ লাগছে না তোমার?”
“উমম্ নাআ্!”
“কিন্তু আমার যে ভীষণ খারাপ লাগছে! এই যে দেখো, কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে,আমার মুখটা!”
জেইন খুব করুণ মুখ করে বলল।
রিম আঁতকে উঠে জেইনের মুখের দিকে তাকাল।
“কী হয়েছে তোমার? কোথায় খারাপ লাগছে?”
জেইন রিমের হাতটা টেনে নিয়ে নিজের হৃদপিণ্ডের ওপর শক্ত করে চেপে ধরল।
“এখানে… এই বুকের ভেতরটা…….”
জেইনের সেই গভীর নেশাক্ত চোখের দিকে তাকাতেই রিমের শরীরে এক তীব্র শিহরণ বয়ে গেল। জেইন আর সময় দিল না, আচমকা রিমকে পাজাকোলে তুলে নিল। রিম ভয়ে জেইনের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
“চলো এবার বাড়ি ফেরা যাক।”
“আরাত্র, শোনো না…”
রিম মিনমিনে গলায় আদুরে আবদার তুলল। জেইন রিমের নাকের সাথে নাক ঘষে মৃদু হেসে একই সুরে বলল,
“বলো না!”

“আমার ‘পিস্তাচ্চিও’ (Pistacchio) ফ্লেভারের আইসক্রিম খেতে ইচ্ছে করছে খুব।”
জেইন একটু ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই রিম ঠোঁট ফুলিয়ে বায়না ধরল,
“উমম না বলো না প্লিজ! খুব বেশি ক্রেভিং হচ্ছে… একদম সহ্য করতে পারছি না!”
রিমের এই মায়াবী রূপে জেইনের পাথরের মতো কঠিন হৃদয় গলে জল হয়ে গেল।
“আচ্ছা বাবা, চলো। আগে তোমাকে আইসক্রিম খাওয়াবো তারপর বাড়ি ফিরবো।”
রিম খুশিতে লাফিয়ে উঠে জেইনের গলা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল,
“সত্যিই খাওয়াবে?”
“হ্যাঁ, খাওয়াব। কিন্তু রিটার্নে আমারও কিছু চাই,”
“কী?”
জেইনের ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তৃষ্ণার্ত রহস্যময়ী হাসি।
“আগে বাড়ি চলো… নির্জনে বোঝাচ্ছি।”

বাইরে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে, কিন্তু মাত্তেও-র মনের ভেতরে এক অস্থির ঝড়। ডাক্তার কড়াভাবে বলে দিয়েছেন মাথায় চাপ না নিতে, কিন্তু হাতের ফোনটা যেন তার অস্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে একের পর এক ডায়াল করে যাচ্ছে সেই পরিচিত নম্বরটিতে। ওপাশ থেকে শুধু নীরবতা।
মাত্তেওর বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠছে। মেয়েটা কি তবে তাকে ভুল বুঝল? অভিমানে কি নিজেকে গুটিয়ে নিল আরও দূরে?
হাসপাতাল থেকে ফেরার পর সবকিছুই স্বাভাবিক ছিল। ঔষধ খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিল সে। কিন্তু বালিশের পাশে পড়ে থাকা ফোনটা হাতে নিতেই তার রক্ত হিম হয়ে গেল। গত তিন দিনে একটা বাংলাদেশি নম্বর থেকে ১৩টি মিসড কল! মাত্তেও জানে, এই কলগুলো কার!
সে শেষবারের মতো ডায়াল করল। মনে মনে ভাবল, হয়তো এবারও ওপাশ থেকে কোনো শব্দ আসবে না। নিভে যাওয়া আশার প্রদীপ নিয়ে সে যখন ফোনটা কান থেকে নামাতে যাবে, ঠিক তখনই ওপাশ থেকে আগ্নেয়গিরির লাভার মতো শব্দ ধেয়ে এল,

“কোন কু*ত্তার বাচ্চা রে!!! যখন দেখছিস আমি বারবার ফোন কেটে দিচ্ছি, তারপরেও কেন ফোন করছিস? বেহায়া, বেলজ্জা, বেসরম! আর যদি কখনো এই নম্বরে ফোন দিয়ে বিরক্ত করেছিস, তাহলে তোর কপালে দুঃখ আছে!”
“হেই মিস ফায়ার আইস… এখনো আগের মতোই আছো!”
মাত্তেওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। অনেক দিন পর যেন চেনা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে। খুব মৃদু স্বরে, অনেকটা ফিসফিসিয়ে সে বলল কথাটা।
রাহির ওপাশে যেন বিদ্যুৎ খেলে গেল। মুহূর্তের জন্য সময় থমকে দাঁড়াল। পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে এখন কেবল ফোনের দুই প্রান্তে দুই হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি আর ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ।
“হঠাৎ চুপ করে গেলে যে? তোমাকে এত চুপচাপ একদম মানায় না। জানো তো, তোমার তপ্ত গালি শুনতেই আমার বেশি ভালো লাগে।”

রাহি নিজেকে সামলে নিয়ে কঠিন গলায় বলল,
“কে আপনি? আর কখনো আমাকে ফোন করবেন না!”
রাহি ফোনটা কেটে দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু মাত্তেও-র পরের কথাটি তাকে থামিয়ে দিল।
“রাগ করে আছো, তাই তো? নাকি সত্যিই চিনতে পারছো না? যদি না-ই চিনতে, তবে এই তিন দিনে ১৩ বার ফোন করার পাগলামিটা করতে না নিশ্চয়ই!”
রাহির গলা ধরে এল, কিন্তু সে তা বুঝতে দিল না।
“দেখুন, আপনি কে বা কী বলতে চাইছেন, আমি জানি না। কাল আমার এক্সাম। দয়া করে এভাবে বিরক্ত করবেন না।”
রাহি ফোনটা নামিয়ে রাখছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মাত্তেও খুব শান্ত এবং ক্লান্ত গলায় বলল,
“আমি এতো দিন হসপিটালে ছিলাম। আইসিইউতে! তাই যোগাযোগ করে উঠতে পারিনি তোমার সাথে।”
রাহির হাতের ফোনটা যেন হঠাৎ সিসার মতো ভারী হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা তীব্র এক ব্যথায় ‘ধক’ করে উঠল। চোখের কোণে জমা হওয়া অভিমানের জলটুকু নিমেষেই আতঙ্কে রূপ নিল।
“কিহ্?”

ড্রাইভিং সিটে বসে জেইন—এক হাতে স্টিয়ারিং, অন্য হাতটি অবহেলায় গিয়ার নব-এর ওপর রাখা। তার প্রতিটি মুভমেন্টে এক অদ্ভুত ক্ষিপ্রতা আর আভিজাত্য। ড্রাইভারকে সে আগেই অন্য গাড়ি করে পাঠিয়ে দিয়েছে। জেইনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সামনের অন্ধকার ফুঁড়ে যাওয়া হেডলাইটের আলোর ওপর নিবদ্ধ। ড্যাশবোর্ডের নীলচে আলোয় তার চোয়ালের শক্ত রেখাগুলো বারবার দৃশ্যমান হচ্ছে।
পাশেই রিম। দুনিয়ার সব চিন্তা ভুলে সে মগ্ন হয়ে তার হাতের আইসক্রিম উপভোগ করছে। কখনো ঠোঁটের কোণে আইসক্রিম লেগে যাচ্ছে, কখনো বা বাচ্চাদের মতো শব্দ করে তৃপ্তি প্রকাশ করছে। জেইন আড়চোখে একবার ওকে দেখল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। এই মেয়েটার চপলতা জেইনের পাথুরে হৃদয়েও বসন্তের হাওয়া বইয়ে দেয়। তবে জেইনের অবচেতন মনে একটা খটকা বারবার উঁকি দিচ্ছে—রিমের এই হঠাৎ বাচ্চাদের মতো বদলে যাওয়া স্বভাব, এই অসময়ের ক্রেভিং… এর পেছনে বড় কোনো কারণ নেই তো?
হঠাৎ ড্যাশবোর্ডে মাউন্ট করা ফোনটি কেঁপে উঠল। একটি এনক্রিপ্টেড ভিডিও কল। জেইন এক সেকেন্ড রিমের দিকে তাকিয়ে কলটি রিসিভ করল। ওপাশ থেকে এক কর্কশ কণ্ঠ ভেসে এল,
“বস, বাচ্চাগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছে। আপনি বললে আজকেই রাশিয়া নিয়ে যাওয়া হবে।”
জেইনের চোখের মণি মুহূর্তে সংকুচিত হয়ে এল। আড়চোখে একবার রিমের দিকে তাকিয়ে বরফের মতো শীতল কন্ঠে বললো,

“নো, ওয়েট। এখনই না। হাইওয়েতে অ্যাটাক হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। Keep them in extreme security wherever they are now. বাকি প্ল্যান আমি নিজে এসে বলব।”
“ওকে বস।”
কলটি কেটে দিতেই রিম আইসক্রিম খাওয়া থামিয়ে কৌতূহলী চোখে তাকাল। তার ভ্রু জোড়া কুঁচকে আছে।
“বাচ্চা! কোন বাচ্চা? কার বাচ্চা?”
জেইন স্টিয়ারিংয়ে হাত শক্ত করল।অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে জবাব দিল,
“আ্ কিছু না। একটা এনজিওর। চ্যারিটির জন্য কিছু অনাথ বাচ্চাকে শিফট করা হচ্ছে।”
“ওহ্।”
রিম ঠোঁট উল্টে মাথা নেড়ে আবার খাওয়ায় মনোযোগ দিল। তবে জেইনের মনে তখন কি চলছে তা বোঝা গেল না।গাড়িটি ক্যালাব্রিয়ার ঘন জঙ্গলের পথে প্রবেশ করেছে। দুপাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল সব ওক আর পাইন গাছ। চাঁদের আলো সেই ঘন পাতার অরণ্য ভেদ করে নিচে পৌঁছাতে পারছে না। হেডলাইটের আলোয় মাঝেমধ্যে কোনো বন্য প্রাণীর চোখের প্রতিফলন চিকচিক করে উঠছে।এই জঙ্গলের গভীরে, যেখানে পৃথিবীর কোনো সভ্যতার ছোঁয়া নেই, যেখানে নেটওয়ার্কের সিগন্যাল মৃত—সেখানেই যেন এক অন্য জগতের শুরু।
হঠাৎ করেই ব্রেক কষলো জেইন। মার্সিডিজটি এক বিশাল লোহার গেটের সামনে এসে থেমে গেল। গেটটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যেতেই সামনে উন্মোচিত হলো এক দানবীয় স্থাপত্য।ঘন জঙ্গলের হৃদপিণ্ডে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে সেই সুবিশাল পেন্টহাউজ!

পেন্টহাউসের নিচে মাটির গভীর স্তরে তৈরি করা ‘সিক্রেট কন্ট্রোল রুমে’ তখন এক গুমোট নিস্তব্ধতা। নীলচে নিয়ন আলোর আভা ইয়াশের চিন্তিত মুখে এসে পড়ছে। তার হাতের তালুতে রাখা সেই ছোট্ট চিপটা যেন এখন কোনো জীবন্ত আগ্নেয়গিরি। এলেনার সেই বিষাক্ত হাসি আর রহস্যময় কথাগুলো ইয়াশের কানে ড্রামের মতো বাজছে— ‘এটা দেখার পর তোমার ধারণাই বদলে যাবে!’
ইয়াশ একবার ল্যাপটপের পোর্টের দিকে তাকালো, আবার চিপটার দিকে। এক অদ্ভুত মানসিক দ্বন্দ্ব তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সত্য কি আসলেই এতই ভয়াবহ?
ঠিক তখনই ভারী দরজার ইলেকট্রনিক লকটা যান্ত্রিক শব্দে খুলে গেল। চমকে উঠে ইয়াশ চোখের পলকে চিপটা নিজের পকেটে চালান করে দিল। ঘরে প্রবেশ করল জেইন। জেইনের পরনের সাদা সিল্কের ভেজা শার্ট, যা তার পেশিবহুল বুকের সাথে লেপ্টে আছে। হয়তো একটু আগেই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে। কপাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়া পানির ফোঁটাগুলো টুপটুপ করে মেঝেতে আছড়ে পড়ছে। জেইনের তীক্ষ্ণ, শিকারি চোখ দুটো ইয়াশের ওপর স্থির হলো। মাফিয়া বসের সেই ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন মুহূর্তেই ঘরের গুমোট ভাবটা টের পেয়ে গেল।
“কাল থেকে দেখছি, তোকে এমন ফ্যাকাসে লাগছে কেন?”

জেইনের কণ্ঠস্বর এখন বরফ শীতল।
“তুই কি আমার কাছ থেকে কিছু লুকাচ্ছিস? মনে রাখিস, আমার চোখ ফাঁকি দেওয়ার ক্ষমতা আজ পর্যন্ত কেউ অর্জন করেনি। তুইও না। সত্যটা আমি কোনো না কোনো ভাবে ঠিক জেনে নিবো!”
ইয়াশ মুখে কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুললো,
“তোর কাছ থেকে কী লুকাবো আমি? বেশি ভাবছিস তুই।”
সে দ্রুত প্রসঙ্গ ঘোরানোর জন্য বলল,
“কালই তো রাশিয়ার সেই কনাইনমেন্টের লাস্ট ডেট! তুই যে সশরীরে যাচ্ছিস, এটা কি লিটল সিস্টার জানে?”
জেইন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে দেয়ালের এলএডি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“না, এখনো বলিনি। ওকে কীভাবে বলবো সেটাই বুঝতে পারছি না। মেয়েটা ইদানিং বড্ড জেদি হয়ে গেছে। মাঝেমধ্যে মনে হয় একটা অবুঝ বাচ্চাকে আগলে বড় করছি আমি!”
জেইনের ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটতে গিয়েও ফুটল না। ঠিক সেই মুহূর্তে ওপর তলা থেকে এক বিদীর্ণ আর্তচিৎকার পুরো পেন্টহাউস কাঁপিয়ে দিল,
“আআআআহহহহ্…. আরাত্রওওও!!!!…………..”

রিমের সেই যন্ত্রণাতুর চিৎকার সিক্রেট রুমের স্পিকারে প্রতিধ্বনিত হওয়ার আগেই জেইনের রক্ত হিম হয়ে গেল। তার বুকটা আতঙ্কে এমনভাবে ‘ধ্রীম ধ্রীম’ করে উঠল যেন হৃৎপিণ্ডটা পাঁজরের হাড় ভেঙে বেরিয়ে আসবে। এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র—জেইন কোনো কথা না বলে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ির দিকে ছুটল। তার ভেজা পায়ের ছাপ মেঝের ওপর এক ভয়াবহ ঝড়ের ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে।
“ফায়ারফ্লাইইইইইই!!!!”
জেইনের চিৎকারে পুরো পেন্টহাউস যেন কেঁপে উঠল।

কিছুক্ষণ আগেই জেইন নিজের হাতে রিমকে ফ্রেশ করিয়ে, খাবার আর ওষুধ খাইয়ে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিল। রিমের গভীর ঘুম সুনিশ্চিত করে সে নিজেই শাওয়ার নিয়ে, ঘরের ভারী দরজাটা সন্তর্পণে চাপিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল ইয়াশের সাথে দেখা করতে।
হঠাৎ ঘুমের মাঝেই রিমের মনে হলো তার শ্বাসনালী কেউ চেপে ধরেছে। এক অসহ্য গুমোট আর অক্সিজেনের অভাব তাকে তাড়িয়ে নিয়ে এল বিছানার বাইরে। অবশ শরীরটা টেনে সে করিডোরে বেরিয়ে এল একটু খোলা বাতাসের আশায়। হাঁটতে হাঁটতে সে এক অন্ধকার বাঁকের মুখে এসে দাঁড়াল, যেখানে একটি সংকীর্ণ সিঁড়ি সাপের মতো এঁকেবেঁকে নিচের দিকে নেমে গেছে। ওই সিঁড়ির গভীর থেকে একটা অদ্ভুত নোনা গন্ধ আর চাপা শোঁ শোঁ শব্দ ভেসে আসছে।

রিম নিজের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারল না। যেন কোনো অদৃশ্য সুতো তাকে ওই অন্ধকারের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। সে প্রতিটি ধাপ অত্যন্ত সন্তর্পণে পা ফেলল। সিঁড়ির শেষ প্রান্তে পৌঁছাতেই ঘুটঘুটে অন্ধকারে সে দেখতে পেল জোড়ায় জোড়ায় কিছু নীলচে-হলুদ আগুনের গোলক জ্বলছে। সেগুলো স্থির নয়, বরং এক আদিম হিংস্রতায় কাঁপছে। মনে হচ্ছে অন্ধকার ঘরটা কোনো ক্ষুধার্ত শিকারি বাহিনীর জ্বলন্ত চোখে ভরে আছে।
রিম কাঁপাকাঁপা হাতে দেয়ালের গায়ে থাকা লোহার সুইচটা টিপতেই পুরো ঘরটা ব্লাাইন্ডিং সাদা আলোয় ভেসে উঠল। তৎক্ষণাৎ সেই দৃশ্য দেখে রিমের শরীরের রক্ত হিম হয়ে পাথর হয়ে গেল। তার বুকের নিশ্বাস মুহূর্তেই দাবানলের মতো তপ্ত হয়ে উঠল।

সামনেই দাঁড়িয়ে আছে কতগুলো বিশালকার হাইব্রিড নেকড়ে। তাদের চোয়াল থেকে লালা ঝরছে, আর দাঁতগুলো যেন তীক্ষ্ণ কাঁচের টুকরো। প্রতিটি নেকড়ে রিমকে দেখার সাথে সাথে নিচু স্বরে এক ভয়াবহ গর্জন (Growl) ছাড়ল। রিম আর্তনাদ করতে ভুলে গিয়ে কেবল বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইল। সে যখন ধীর পায়ে এক কদম পেছনে যেতে শুরু করল, ঠিক তখনই একটি নেকড়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য পায়ের পেশি শক্ত করল।
কিন্তু ঘরের মূল আকর্ষন ছিল ঠিক মাঝখানে। একটি দানবীয় বুলেটপ্রুফ কাঁচের বক্সের ভেতর পায়চারি করছে এক অতিপ্রাকৃত বিশাল সাদা বাঘ। বাঘটি সাধারণ কোনো বাঘ নয়; তার চোখের মনিতে এক দানবীয় আভা। রিমকে দেখা মাত্রই সাদা বাঘটি এক আকাশ কাঁপানো গর্জন ছাড়ল। কাঁচের দেয়ালের ওপর সজোরে নিজের বিশাল থাবা দিয়ে আঘাত করতে শুরু করল। ‘ধুপ ধুপ’ শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠছে, যেন কাঁচের দেওয়ালটি আজই ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
নেকড়েগুলোর হিংস্র চোখ আর বাঘের সেই প্রলয়ঙ্করী গর্জন—এই মৃত্যুপুরীর মাঝে রিম নিজেকে এক তুচ্ছ পতঙ্গের মতো আবিষ্কার করল।
“আআআআহহহহ্…. আরাত্রওওও…….!”
একটি নেকড়ে হিংস্রভাবে রিমের ঘাড় লক্ষ্য করে শূন্যে ঝাঁপ দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে সে নিজের জীবনের শেষ মুহূর্তটা যেন চোখের সামনে দেখতে পেল।

অন্ধকার প্রকোষ্ঠের এক কোণে একটা উঁচু কাঠের টেবিল। সেটার একেবারে শেষ প্রান্তে রিম, কোণ ঘেঁষে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। টেবিলের নিচে ঘুরপাক খাচ্ছে জীবন্ত যমদূতের দল। নেকড়েগুলোর নখ ঘষার শব্দ কাঠের ওপর এক বিভীষিকাময় সুর তৈরি করছে। রিমের বুকটা তখন কামারের হাপরের মতো ধুকপুক করছে; নিঃশ্বাস এতটাই দ্রুত যে মনে হচ্ছে ফুসফুস ফেটে যাবে। কপালের শিরাগুলো দিয়ে ভয়ের শীতল ঘাম চুঁইয়ে পড়ছে মেঝেতে। আতঙ্কে সে নিজের হাত এত শক্ত করে খামচে ধরেছে। তার হাতে নখের আঁচড়ে চামড়া চিরে রক্তবিন্দু জমাট বেঁধেছে।
জেইন ঝড়ের বেগে সেই মৃত্যুপুরীর দরজায় এসে আছড়ে পড়ল। জেইনকে দেখা মাত্রই রিম দড়িকানা মানুষের মতো হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে টেবিল থেকে এক মরণঝাঁপ দিল। জেইন তাকে শূন্যেই লুফে নিল। রিম এক মুহূর্তেই জেইনের শরীরের সাথে সেঁটে গেল—দুই হাতে শক্ত করে গলা জড়িয়ে আর দুই পায়ে কোমর পেঁচিয়ে সে জেইনের ঘাড়ের খাঁজে মুখ লুকাল। দুজনের হৃদস্পন্দনের শব্দ তখন একে অপরের সাথে তীব্রভাবে ধাক্কা খাচ্ছে, যেন দুটো ড্রাম একসাথে বাজছে।

জেইন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হলো। তার চাউনি তখন সেই বন্য জানোয়ারগুলোর চেয়েও বেশি হিংস্র। সে কেবল একবার মাথা ঘুরিয়ে নেকড়ে গুলোর দিকে তাকালো।সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অমোঘ কমান্ড, এক আদিম কর্তৃত্ব। জেইনের চোখাচোখি হতেই সেই ক্ষুধার্ত হাইব্রিড নেকড়েগুলো ল্যাজ গুটিয়ে মেঝেতে শুয়ে পড়ল। কাঁচের বক্সের ভেতরে থাকা সেই দানবীয় সাদা বাঘটি, যা একটু আগেও কাঁচ ভেঙে রিমকে ছিঁড়ে খেতে চাইছিল, সেও মুহূর্তের মধ্যে শান্ত হয়ে মাথা নিচু করে বসে পড়ল। যেন তাদের আসল ‘মালিক’, তাদের আসল ‘শিকারি’ হাজির হয়েছে। তার হুকুম ছাড়া বাতাসের একটি কণাও নড়ার সাহস নেই এখানে।
জেইনের দৃষ্টি গিয়ে থামল সেই নেকড়েটির ওপর, যার মুখে রিমের জামার সামান্য অংশ আর নখে আঁচড়ের চিহ্ন লেগে আছে। জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, চোখ দুটো পাথরের মতো শীতল। কোনো কথা না বলে, নিথর নিস্তব্ধতার মাঝে রিমকে বুকের সাথে পাথরের মতো চেপে ধরে সে সেই অন্ধকার কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল।

পেন্টহাউসের লিভিং রুমে এখন এক ভারী নিস্তব্ধতা। সোফায় বসে থাকা রিমের শরীরটা তখনো আতঙ্কে কাঁপছে। জেইন অত্যন্ত সাবধানে তুলোয় স্যাভলন নিয়ে রিমের হাতের আঁচড়গুলোতে ছোঁয়াতেই এক তীব্র জ্বালায় রিম চোখ খিঁচিয়ে ফুঁঁপিয়ে উঠল। রিমের সেই ব্যথাতুর শব্দ জেইনের কানে পৌঁছানো মাত্রই তার চোয়াল শক্ত হয়ে পাথরের মতো টানটান হয়ে গেল। সে রিমের হাতের ওপর ব্যান্ডেজটা লাগিয়ে দিল—অত্যন্ত নিখুঁত কিন্তু কঠোর ভঙ্গিতে।
“বারবার! প্রতিটা পদক্ষেপে আমার কথার অবাধ্য হচ্ছো তুমি!”
জেইনের কণ্ঠস্বর এখন গুমোট মেঘের গর্জনের মতো। সে রিমের দুই বাহু এমনভাবে চেপে ধরল যে রিমের ক্ষতস্থানে চাপ লেগে সে আবার যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল।

“আজ যদি আমি ঠিক ওই মুহূর্তে না পৌঁছাতাম, তবে কী হতে পারতো সেটা কি তোমার ওই ছোট্ট মগজে আদৌ ঢোকে? আমি তোমাকে স্পষ্টভাবে বারণ করেছিলাম বিছানা থেকে এক পা-ও নিচে ফেলবে না! তবুও কেন আমার নিষেধ অমান্য করলে?”
রিমের চোখের জল টপটপ করে গড়িয়ে পড়ছে। জেইন তাকে নিজের দিকে আরও ঝটকা দিয়ে টেনে এনে হিংস্র গলায় বলল,
“এই একদম কাঁদবি না তুই! আজকে তোকে জানেই মেরে দেব আমি। অনেক সহ্য করেছি, অনেক ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েছিস! তোর একেকটা বোকামির জন্য আমার নিশ্বাস আটকে যায়। যদি তোর এই শরীরে একটাও গভীর আঁচড় লাগত, কি হতো তবে! কি করতাম আমি!”

“কী আর হতো? বড়জোর ফেলে দিতি আমায়! ভালো তো আর বাসিস না, শুধু এই শরীরটাই তো চাই!”
অভিমানে মুখ ফসকে নিজের অজান্তেই বলে ফেললো রিম।
কথাটা শেষ হতেই ঘরের বাতাস যেন জমে বরফ হয়ে গেল। জেইনের মস্তিষ্কে যেন কেউ জ্বলন্ত লাভার ঢেলে দিল। তার দৃষ্টি হিমশীতল, শান্ত যেন ঝড় আসার পূর্ব মুহূর্ত। নিজের বলা কথাটার ভয়াবহতা বুঝতে পেরে রিম মুহূর্তেই কুঁকড়ে গেল। সকালেও এই বিষয় নিয়েই একটা ঝড় বয়ে গেছে, তবুও কেন আবার ওই একই তীরে জেইনকে আঘাত করল সে!
জেইন চোয়ালে ভয়ংকর রকমের কাঠিন্য। সে রিমের চোয়ালটা নিজের শক্ত হাতের মুঠোয় নিল। তার আঙুলের চাপে রিমের মুখটা সামান্য কুঁচকে গেল। জেইন চিবিয়ে চিবিয়ে অত্যন্ত নিচু আর শীতল স্বরে বলল,

“শরীর হুহ? কী আছে তোর এই শরীরে? নাথিং! যখন তুই একটা ছোট্ট বাচ্চা ছিলি, তখন থেকেই তোর ওপর এমন এক অন্ধ আসক্তিতে ডুবে আছি যে নিজের বিবেক-বুদ্ধি সব বিসর্জন দিয়েছি। শরীর চাইলে অনেক আগেই তোকে ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারতাম! ঠিক আছে… তুই যেহেতু এমনটাই ভাবিস, আজ থেকে কথা দিলাম—আমি তোকে আর স্পর্শ করব না। যতদিন না পর্যন্ত তুই নিজে এসে আমার কাছে আমার এই স্পর্শের জন্য ভিক্ষা চাইবি, ততদিন এই আরাত্রিক জেইন চৌধুরী তোর ছায়াও মাড়াবে না!”
রিম তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত হয়ে জেইনের শার্টের হাতা মুঠোয় টেনে ধরল।
“এই শোনো না… আমি আসলে ভুল করে বলে ফেলেছি। ইচ্ছে করে বলিনি কিছু, বিশ্বাস করো…”
“চুপ!!!”
জেইনের চিৎকারে দেওয়ালে ঝোলানো দামি শোপিসগুলো পর্যন্ত যেন কেঁপে উঠল। তার চোখে এখন শুধু শূন্যতা আর ক্রোধ।
“একদম চুপ! আই ডোন্ট রিপিট হোয়াট আই সে ওয়ান্স! নাউ গেট আউট অফ হেয়ার! রাইট নাও!!!!”
জেইনের সেই পাথুরে কণ্ঠ আর ধমকে রিমের আত্মা পর্যন্ত কেঁপে উঠল। সে আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। ছলছল চোখে এক পলক জেইনের রক্তবর্ণ চোখের দিকে তাকিয়ে সে এক ছুটে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেল। নিচে দাঁড়িয়ে জেইন কেবল নিজের মুষ্টিবদ্ধ হাতটা পাশের কাঁচের টেবিলের ওপর সজোরে আছড়ে ফেলল!

“Hell Chamber”
নিস্তব্ধতা আজ ভারী হয়ে উঠেছে মৃত্যুর গন্ধে। পুরো চেম্বারটি যমপুরীর মতো কালো রঙে মোড়া থাকলেও, কোণার সেই বিশাল ওয়াশরুমটি ধবধবে সাদা টাইলসে সাজানো। কিন্তু সেই শুভ্রতা এখন আর অবশিষ্ট নেই; চারপাশের দেয়ালে কোনো উন্মাদের আঁকা বিমূর্ত শিল্পের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জমাট বাঁধা রক্তের গাঢ় স্তূপ। সাদা টাইলসের ওপর লাল রক্তের সেই আল্পনা এক পৈশাচিক বীভৎসতা ছড়াচ্ছে।
কক্ষটির ঠিক মাঝখানে সেই বিশাল আকৃতির রাজকীয় বাথটাব। সেখানে আজ কোনো স্বচ্ছ জল নেই, বরং টলটল করছে এক টকটকে লাল রক্তের গঙ্গা। সেই রক্তস্রোতের মাঝে ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে আছে সেই বিশালকার হাইব্রিড নেকড়েটির দেহ। তার সেই কুচকুচে কালো লোমগুলো এখন রক্তের সাগরে ভিজে এক বীভৎস লালচে তালের মতো দেখাচ্ছে। পশুটির নিথর চোখের মনিতে তখনো শেষ যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি লেগে আছে।

ঠিক সেই রক্তের বাথটাবের কিনারায় এক পা তুলে দিয়ে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে জেইন। তার ডান হাতে ধরা এক রক্তমাখা ধারালো কুঠার, আর বাম হাতে ধরা তার প্রিয় স্নাইপার রাইফেল। জেইনের পরনের সেই সাদা দামী শার্টটি এখন রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে, মনে হচ্ছে সে যেন লাল রঙের কোনো পোশাকে নিজেকে মুড়িয়েছে। তার সুঠাম প্রশস্ত বুকটা প্রতিটি ধীর নিশ্বাসের সাথে অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করছে। কপাল আর গাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়ছে তাজা রক্ত, কিন্তু জেইনের চোখের মনিতে কোনো অনুশোচনা নেই; বরংচ মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
জেইন নিথর নেকড়েটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটের কোণে এক পৈশাচিক হাসি ফুটিয়ে তুলল। এক গভীর আর অতিপ্রাকৃত শীতল স্বরে ফিসফিস করে বলে উঠল,

“পৃথিবীতে যা কিছু আমার ফায়ারফ্লাইয়ের কষ্টের কারণ হবে… যা কিছু ওর চোখে এক ফোঁটা জল এনে দেবে, তাকে ঠিক এভাবেই আমি নরকের স্বাদ পাইয়ে দেব। পৃথিবী থেকে মুছে দেব তার অস্তিত্বের প্রতিটি চিহ্ন! আমার সাম্রাজ্যে আমার ফায়ারফ্লাইয়ের যন্ত্রণার শেষ গন্তব্য কেবল মৃত্যু!”
সে তার হাতের কুঠারটি সজোরে বাথটাবের কিনারায় গেঁথে দিল। রক্তের ছিটে এসে লাগল তার চোখে, কিন্তু সে চোখের পলক ফেলল না। বরংচ মুখে এক ভয়ংকর উন্মাদনা।……….

রিম বিছানার ঠিক মাঝখানে পা ছড়িয়ে বসে আছে। কান্নার দমকে তার ছোট শরীরটা বারবার কেঁপে উঠছে। গাল দুটো গোল হয়ে ফুলে আছে—মুখ ভর্তি করে চকলেট চিবানোর কারণে। চোখের জল আর চকলেটের বাদামি দাগ মিলেমিশে একাকার। রিম বুঝতে পারছে না সে রাগ করবে নাকি কাঁদবে, তাই জেদের বশেই একের পর এক চকলেট মুখে পুরছে।
ঠিক তখনই রুমে প্রবেশ করল জেইন। দরজায় দাঁড়াতেই তার নজর গেল বিছানায় বিস্রস্ত অবস্থায় বসে থাকা রিমের দিকে। জেইনের কপালে ভাঁজ পড়ল। ইদানীং মেয়েটা বড্ড অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে। অতিরিক্ত প্রশ্রয় কি মেয়েটাকে জেদি করে তুলল? জেইন বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করল।
ধীরপায়ে এগিয়ে গিয়ে রিমের সামনে দাঁড়াল। রিম একঝটকায় মুখ ঘুরিয়ে নিল। কান্নার চোটে তার হেঁচকি উঠছে, সেই সাথে নাক-মুখ লাল হয়ে উঠেছে। মুখটা করুণ অথচ মনের মধ্যে অদ্ভুত জেদ।
জেইন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল।আজ আর রিমের রাগ ভাঙাবে না সে।আজ তার ধৈর্যের সমস্ত বাঁধ ভেঙে গেছে। সে চলে যেতে গিয়েও থেমে গেল। হঠাৎ তার চোখ গেল বিছানায় ছড়িয়ে থাকা চকলেটের খালি মোড়কগুলোর দিকে।

“শিট!!!!”
জেইনের কণ্ঠস্বরে যেন বজ্রপাত হলো। মুহূর্তের মধ্যে তার শান্ত চেহারাটা রাগে কুঁচকে গেল। সে আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। এক হেঁচকায় রিমের বাহু ধরে নিজের দিকে টেনে আনল সে।
“ইডিয়ঠ!!!”
জেইন দাঁতে দাঁত চেপে বললো।
“এটা কি খাচ্ছো তুমি? একবারও কি দেখার প্রয়োজন মনে করোনি এটা কী? বার বার!!! বারবার এমন ভুল কেন করো তুমি বলোতো? আমাকে পাগল করে মারতে চাও?”
রিমের ভেতরের জমে থাকা অভিমান এবার আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হলো। চোখ দুটো লাল। দুহাতে জেইনের প্রশস্ত বুকে সজোরে এক ধাক্কা দিল সে। অপ্রস্তুত জেইন কয়েক কদম পিছিয়ে গেল।
“আমি কী করি না করি তাতে তোর কী?”
রিম চিৎকার করে উঠল। চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে।
“তিনটে সাধারণ চকলেটই তো খেয়েছি! এমন ভাবে রিয়্যাক্ট করছে যেন আমি ওর পুরো সম্পত্তি খেয়ে ওকেই গিলে নিয়েছি!”
“তিনটে!!!”

জেইন বড় বড় শ্বাস নিয়ে নিজের ভেতরের অস্থিরতা কমানোর চেষ্টা করল। তারপর রিমের খুব কাছে এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বর ভয়ার্তভাবে নিচু হয়ে গেল।
“আমার সম্পত্তি আর আমি—দুটোই তোমার। সো ওগুলো খেয়ে ফেললেও কোনো প্রবলেম ছিল না। বরংচ আমি আরো খুশিই হতাম। But do you know তুমি এটা কিসের চকলেট খাচ্ছো?”
রিমের চোখের পল্লব কাঁপল। গাল দুটো ফোলা। সে অবুঝের মতো প্রশ্ন করল,
“কিসের চকলেট?”
জেইনের মুখের বিরক্তি হঠাৎ উধাও হয়ে গেল। সেখানে ফুটে উঠল, ক্রুর হাসি। সে রিমের একদম কানের কাছে ঝুঁকে এল। তার তপ্ত নিঃশ্বাস রিমের ঘাড়ে বিঁধছে। জেইন ফিসফিস করে বলল,
“সেটা তো একটু পরেই টের পাবে। তোমার শরীরের শিরায় শিরায় যখন আগুন ছুটবে, তখন নিজেই বুঝবে ওটা কী ছিল। জাস্ট ওয়েট অ্যান্ড সি, বেইবি!”

রিম চোখ পিটপিট করে তাকিয়ে রইল। জেইনের কথাগুলোর গূঢ় অর্থ তার মাথায় ঢুকছে না, কিন্তু জেইনের চোখের ওই চাউনি তাকে ভেতরে ভেতরে কাঁপিয়ে দিল।
জেইন সোজা হয়ে দাঁড়াল। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে টেবিল থেকে ল্যাপটপটা তুলে নিল সে। বারান্দার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“এখনই ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করো। নয়তো সামনে যে যন্ত্রণাময় রাত আসছে, তার ধকল সইতে পারবে না। আমার বিজনেসের কিছু ইম্পর্ট্যান্ট কাজ আছে, আজ রাতেই শেষ করতে হবে। সো, ডোন্ট ইভেন থিঙ্ক অফ ডিস্টার্বিং মি।”

সিসিলি, পার্লেমো
বাইরে ভূমধ্যসাগরের নোনা বাতাস বইছে, কিন্তু গোডাউনের ভেতরে বাতাস স্থির এবং ভ্যাপসা। চারদিকে পুরোনো কাঠের ওয়াইন ব্যারেল স্তূপ করা।
গোডাউনের মাঝখানে একটি দামি চামড়ার চেয়ারে বসে আছে ভিনসেঞ্জো। তার পরনে দামী সিল্কের শার্ট, আঙুলে সোনার আংটি। সে খুব নিপুণভাবে একটি কমলা লেবু ছুড়ি দিয়ে ছিলছে। ঘরের এক কোণে বারোজন শিশু ভয়ে সিঁটিয়ে আছে। তাদের পরনে মলিন পোশাক, চোখে অসীম আতঙ্ক। ভিনসেঞ্জো খুব শান্ত গলায়, বাচ্চাদের দিকে না তাকিয়েই বললো,

“Silenzio… (চুপ কর)। এইযে তোমরা কান্নাকাটি করছ, এতে কার লাভ হচ্ছে? কান্না দিয়ে কি সমুদ্র পার হওয়া যায়? যায় না।”
সে এক টুকরো কমলা মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে তার ডান হাত লুইগি-র দিকে তাকাল। লুইগি দরজার কাছে একটি শটগান নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
“বস, ছোটটা খুব বেশি শব্দ করছে। ওপাশে জাহাজের ক্যাপ্টেন অপেক্ষা করছে, বেশিক্ষণ দেরি করলে সে কিন্তু নোঙর ছেড়ে দেবে।”
ভিনসেঞ্জো ঠান্ডা চোখে লুইগির দিকে তাকিয়ে বললো,
“Be patient লুইগি। বাচ্চারা তো আর কার্গো বক্স নয় যে মুখ বন্ধ করে পড়ে থাকবে। ওদের বুঝতে দাও, আজ থেকে তাদের জীবন আর তাদের নিজেদের নেই। আজ থেকে তারা আমাদের ‘পরিবারের’ অংশ… তবে সেটা নোংরা কাজের জন্য।”
বাচ্চাদের মধ্য থেকে একজন বড় ছেলে সাহস করে ডুকরে কেঁদে উঠল,

“Per favore, ci lasci andare! (দয়া করে আমাদের যেতে দিন!) আমার মা চিন্তা করছে…”
ভিনসেঞ্জো হঠাৎ উঠে দাঁড়াল, বুটের শব্দে পুরো গোডাউন কেঁপে উঠল।সে ছেলেটির কাছে গিয়ে নিচু হয়ে বসল। তার কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল।
“Listen, my child, in Italy we respect family. কিন্তু আজ থেকে তোমার কোনো মা নেই, কোনো বাবা নেই। এই অন্ধকার গোডাউনই এখন তোমার পৃথিবী। যদি শান্ত থাকো, তবে কাল সকালে সমুদ্রের নীল পানি দেখতে পাবে। আর যদি চিৎকার করো…”
সে হাতের ধারালো ছুড়িটা দিয়ে ছেলেটির গাল আলতো করে স্পর্শ করল।
“…তবে এই গোডাউনের নিচেই তোমাকে চিরতরে ঘুমিয়ে পড়তে হবে। বুঝলে?”
পুরো গোডাউনে পিনপতন নীরবতা নেমে এল। শুধু দূর থেকে ভেসে আসছে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন আর বাচ্চাদের দমবন্ধ করা কান্নার শব্দ।
“বস, ট্রাক চলে এসেছে।”
ভিনসেঞ্জো ছুড়িটা ভাঁজ করতে করতে বললো,
“Andiamo (চলো)। Get them on the ship. Make sure there are no mistakes.”

ক্যালাব্রিয়া, পেন্টহাউজ
বিছানার নরম গদিতে শুয়ে ছিল রিম। হঠাৎ যেন নিজের অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছিল না সে। কেমন যেন হাঁসফাঁস করতে শুরু করলো।এক অজানা অস্থিরতা তার শিরায় শিরায় আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। নিঃশ্বাসগুলো ভারী হয়ে তপ্ত বাতাসের মতো বেরিয়ে আসছে তার ঠোঁট চিরে। শরীরের ভেতরকার রক্তস্রোত যেন কোনো এক অদৃশ্য উন্মাদনায় মাতোয়ারা হয়ে উঠেছে, যার প্রতিটি স্পন্দন তার কানে তপ্ত কামনার মতো বাজছে।

উত্তাপের তীব্রতায় যখন টেকা দায় হয়ে পড়ল, তখন এক ঝটকায় গায়ের ভারী কম্ফোর্টারটা সরিয়ে দিল সে। কিন্তু শান্তি কোথায়? এক অদ্ভুত শিরশিরানি তার পায়ের আঙুল থেকে শুরু করে মেরুদণ্ড বেয়ে ঘাড়ের রোমকূপ পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে। অবচেতনভাবেই তার নিজের হাত দুটি নিজের শরীরের ভাঁজে বিচরণ করতে চাইল। নিজের নখের মৃদু আঁচড় আর আঙুলের ডগার স্পর্শে সে নিজেই শিউরে উঠছিল।নিজের লালচে ঠোঁট কামড়ে ধরলো শক্ত করে। গলায় নিজেরই হাতের পরশ যেন এক নিষিদ্ধ ভালোলাগার জন্ম দিচ্ছিল। কিন্তু না, তার আরো বেশি কিছু চাই।বুকের ভেতরটা বারবার দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেন সমুদ্রের কোনো উত্তাল ঢেউ কূল ভাঙার অপেক্ষায় আছে। গায়ের উলের সোয়েটারটা তখন মনে হচ্ছিল যেন এক উত্তপ্ত খাঁচা। সেটা খুলে ফেলার পর ঘামভেজা শরীরে যখন ঘরের এসির ঠান্ডা বাতাস স্পর্শ করল, সেই শীতলতা তার ভেতরের আগুনকে নেভানোর বদলে আরও উসকে দিল।
রিম টলমল পায়ে কাবার্ডের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে সে নিজেই চমকে উঠল—চোখে এক গভীর নেশাতুর দৃষ্টি, গাল দুটো অপার্থিব লাল আভায় রাঙানো। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়েই ধীরে হাত রাখলো নিজের ঘাড়ে জামার ওপর। টেনে খুলে ফেলল জিপার।পরনের চুড়িদারটা অবহেলায় লুটিয়ে পড়ল মেঝের ওপর। কাবার্ড থেকে বের করে নিল একটি পাতলা লেসের তৈরি সিল্কের নাইট ড্রেস………।

বাইরে তখন নিকষ কালো আঁধারের রাজত্ব, যা সমুদ্রের দিগন্তে মিশে একাকার হয়ে গেছে। আকাশের রূপালি চাঁদ আজ যেন একটু বেশিই লাজুক; তার সেই ম্লান কোমল আলো রেলিংয়ের পার্পেল ডিম লাইটের সাথে মিলেমিশে এক অদ্ভুত মায়াবী আভার সৃষ্টি করেছে। সেই আলো-ছায়ার খেলায় পুরো বারান্দাটা কোনো এক মায়াপুরী বলে ভ্রম হচ্ছে। দূরে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউগুলো তটে আছড়ে পড়ার সেই গম্ভীর গর্জন আর বাতাসে ভেসে আসা নোনা জলের ঘ্রাণ চারপাশের নিস্তব্ধতাকে আরও বেশি মোহনীয় করে তুলেছে।

সেই নিঝুম রাতে, বারান্দার সুইমিং পুলের নীল জলরাশির পাশে ছাউনি দেয়া আরামদায়ক কাউচটিতে শরীর এলিয়ে বসে আছে জেইন। তার পরনের ওভারসাইজ শুভ্র শার্টটা শরীরের সাথে আলগাভাবে লেপ্টে আছে। বুকের ওপরের কয়েকটা বোতাম খোলা থাকায় উন্মুক্ত হয়ে আছে তার ব্রোঞ্জ রঙের সুঠাম এবং শক্তপোক্ত বুক।
উরুর উপরে রাখা ল্যাপটপ। ল্যাপটপের নীলচে আলো তার তীক্ষ্ণ চিবুক আর খাড়া নাকে আছড়ে পড়ছে। তার সেই গভীর নীলাভ চোখের স্থির দৃষ্টি যেন ল্যাপটপের স্ক্রিন ভেদ করে যাচ্ছে। মুখে কোনো অনুভূতির রেখা নেই, কেবল গাম্ভীর্য।কিবোর্ডের ওপর তার আঙুলগুলো যখন ক্ষিপ্র গতিতে চলছে, তখন হাতের শক্তপোক্ত পেশিগুলো প্রকট হয়ে উঠছে। ফর্সা চামড়ার নিচে তার নীলচে শিরাগুলো জেগে উঠে এক অদ্ভুত পৌরুষদীপ্ত আবেদন তৈরি করেছে।বাইরের মৃদু হিমেল বাতাস বইলেও তার কপালে জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। সেই ঘামের কণাগুলো ল্যাপটপের আলোয় হীরের মতো চিকচিক করছে, যা এই শীতল পরিবেশেও এক ধরণের তপ্ত উত্তাপ ছড়িয়ে দিচ্ছে।

রিম ধীর পায়ে বারান্দায় প্রবেশ করল।তার পরনে থাকা বেবি পিংক, লেসের নাইট ড্রেসটা শরীরের সাথে এক অবিচ্ছেদ্য লাবণ্য হয়ে মিশে আছে। পাতলা সিল্কের সেই কাপড়টা রিমের হাঁটুর অনেকটা ওপরে অবাধ্য হয়ে দুলছে, যা তার ফর্সা মসৃণ পা দুটোর প্রতিটি বাঁক উন্মুক্ত করে দিয়েছে। নাইট ড্রেসটির চওড়া গলার কারণে তার বুকের উপরিভাগের সুডৌল কোমলতা যেন চাঁদের আলোর মতো চিকচিক করছে।যা তার ভেতরের সৌন্দর্যকে আরো স্পষ্ট ভাবে ফুটিয়ে তুলছে। প্রতিবার গভীর শ্বাস নেওয়ার সাথে সাথে তার বুকের সেই উন্মুক্ত অংশটুকু এক উত্তাল ছন্দে ওঠানামা করছে।

সে এক পা এক পা করে জেইনের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিটি পদক্ষেপে তার ন*গ্ন পায়ের আঙুলগুলো মার্বেল মেঝের শীতলতা অনুভব করছে, কিন্তু তার শরীরের ভেতর বইছে এক লাভার স্রোত। বাইরের হিমেল বাতাস তার খোলা কাঁধে আর গলায় আলতো স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই শীতলতা তার ভেতরের তীব্র দহনকে স্পর্শও করতে পারছে না। বরং, সেই তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো তার ঠোঁট চিরে বেরিয়ে এসে চারপাশের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলছে।
সে জেইনের একেবারে সামনে এসে দাঁড়াল। জেইনের শরীরের সেই পুরুষালি সুবাস রিমের চেতনাকে এক ঘোরলাগা নেশায় আচ্ছন্ন করে ফেলেছে।

জেইন তখনো নিস্পৃহ। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ল্যাপটপের স্ক্রিনে স্থির, যেন এই মহাবিশ্বে রিমের কোনো অস্তিত্বই নেই। তার চোখের কোণ দিয়ে সে রিমের সেই ফর্সা পা দুটো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। জেইনের বুকের ভেতর এক অদ্ভুত টান অনুভূত হলো, পেশিগুলো পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল।সে টের পাচ্ছে রিমের শরীরের সেই উত্তাপ তার দিকে ঢেউয়ের মতো ধেয়ে আসছে। জেইন নিজের ঠোঁট দুটো শক্ত করে চেপে রাখল—না, সে আজ রিমকে কিছুতেই নিজে থেকে কাছে টানবে না। সে চায় রিম নিজের সবটুকু জেদ বিসর্জন দিয়ে তার সামনে আষ্টেপৃষ্ঠে ভেঙে পড়ুক।
বাতাসে তখন এক শ্বাসরুদ্ধকর নিস্তব্ধতা। কেবল শোনা যাচ্ছে জেইনের কিবোর্ডের শব্দের টুংটাং আর রিমের সেই অস্থির, তপ্ত নিঃশ্বাসের আওয়াজ। রিম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জেইনের ঠিক সামনে। তার পায়ের পাতা থেকে শুরু করে মাথার চুল পর্যন্ত এক আদিম শিরশিরানি বয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে, জেইন তাকে দেখেও না দেখার ভান করছে। এই অবজ্ঞা যেন রিমের ভেতরের আগুনের শিখায় এক বালতি ঘি ঢেলে দিল। তার চোখ দুটো নেশায় আর অভিমানে আচ্ছন্ন হয়ে এল।

সে জেইনের খুব কাছে ঝুঁকে এল।জেইনের পাথরপ্রতীম নীরবতা রিমের ভেতরকার সুপ্ত আগ্নেয়গিরিকে যেন উসকে দিল। তার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে রন্ধ্রে বয়ে চলা সেই নিষিদ্ধ নেশা এখন বিষাক্ত দহনে রূপ নিয়েছে। রিম আর এক মুহূর্তের অবহেলা সইতে পারল না। এক ঝটকায় জেইনের কোল থেকে ল্যাপটপটা কেড়ে নিয়ে পাশের টেবিলে আছঁড়ে ফেলার ভঙ্গিতে রেখে দিল সে।
মুহূর্তের মধ্যে জেইনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, কপালে রাগের নীল শিরাগুলো দপদপ করতে লাগল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“Didn’t I already tell you? I have important work to finish! ডিস্টার্ব করবে না। তাহলে কেন……..”

কিন্তু বাক্যটা শেষ করার শক্তি জেইন হারিয়ে ফেলল। রিমের দিকে চোখ তুলে তাকাতেই জেইনের বুকের ভেতর যেন কোনো এক শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটল। ল্যাপটপের নীলচে আলো আর চাঁদের ম্লান রূপালি আভা মিশে রিমের ওপর এক অপার্থিব মায়া ছড়িয়েছে। রিমের ভেজা চোখের অতল তৃষ্ণা, তার তপ্ত ঠোঁটের কম্পন তার নিচে কুচকুচে তিল তার একটু নিচেই নাইট ড্রেসের ফাঁক দিয়ে উন্মুক্ত হওয়া গলার ভাঁজ। কলার বোনের ওপর সেই ছোট্ট কালো তিল। ঠিক আরেকটু নিচের দিকে চোখ নামতেই তুষারশুভ্র শরীরের বিভাজিকা দেখে জেইনের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। বাতাসের অক্সিজেন যেন নিমিষেই ফুরিয়ে গেল। সে নিজেকে সামলাতে কাউচের পেছনে এক হাত শক্ত করে মুষ্টিবদ্ধ করল, আঙুলের গাঁটগুলো সাদা হয়ে এল। সে প্রাণপণ চেষ্টা করছিল চোখ সরিয়ে নিতে, কিন্তু রিমের সম্মোহনী রূপ তাকে যেন শিকল দিয়ে বেঁধে ফেলেছে।

ঠিক তখনই রিম এক ঝটকায় তার কোলের উপর উঠে এল। জেইনের প্রশস্ত বলিষ্ঠ ঊরুর ওপর রিমের কোমল শরীরের ভার পড়তে জেইনের মেরুদণ্ড বেয়ে এক বিদ্যুৎপ্রবাহ বয়ে গেল। রিম দুই হাতে জেইনের শক্ত গলা জড়িয়ে ধরল। জেইনের পিঠ কাউচের সাথে পুরোপুরি মিশে গেল। রিমের শরীরের সেই তীব্র দহন আর মাতাল করা সুবাস জেইনের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নিল। জেইন বড় করে একটা গভীর ঢোক গিলল, সাথে সাথে গলার উঁচু হাড়’টা উপরনিচ করলো। তার কণ্ঠস্বর তখন অস্বাভাবিক ভারী আর ভাঙা। জবরদস্তি নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখে বলল,
“এখানে এসেছো কেন? বলেছিলাম না আমার কাছে আসবে না!”
রিম তার নেশাক্ত চোখে জেইনের চোখের মণি দুটোর দিকে তাকাল। তার ছোট ছোট নিঃশ্বাসগুলো জেইনের ঠোঁটের ওপর আছড়ে পড়ছে। রিম তার এক হাতের তালু জেইনের গালে রাখল। তারপর খুব ধীরে,জেইনের কপাল থেকে চুম্বন শুরু করল। তার ঠোঁটদুটো জেইনের চোখের ওপর নামল, তারপর খাড়া নাকের ডগায় আলতো স্পর্শ দিল। সবশেষে সে যখন জেইনের দুই গালে আদুরে ঠোঁট ঘষে জেইনের ঠোঁটের একদম সন্নিকটে নেমে এল, জেইন এক ঝটকায় মুখটা সরিয়ে নিল।
রিমের অস্থিরতা এবার যন্ত্রণায় রূপ নিল। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে। সে কাতর, ভেজা স্বরে ফিসফিস করল,

“এই শোনো না…”
“হোয়াট!!”
জেইনের কণ্ঠস্বরে এক রাস বিরক্তি আর পাথরের মতো কঠিন কাঠিন্য।রিমের কাতর স্বর বাতাসে মিশে এক করুণ আর্তি তৈরি করল,
“শোনো না…আমার না কেমন যেন লাগছে… কষ্ট হচ্ছে খুব। সারা শরীর কামড়াচ্ছে…। আমি শান্ত হতে পারছি না।”
রিম জেইনের কন্ঠমনিতে নিজের তপ্ত ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিল। “আমার শরীরে একটু হাত দাও না… প্লিজ… তুমি না ছুঁলে আমি এই যন্ত্রণায় মরে যাব।”
জেইন নিজের সর্বশক্তি দিয়ে নিজেকে সংযত রেখে নিষ্ঠুরভাবে বলল,
“তুমি এখন যাও। আমার কাজ আছে।You don’t need to come to a lustful man like me, who only thirsts for a feminine body.”
রিম চোখ দুটো এবার টলটল করে উঠলো। সে বুঝতে পারছে রাগের বসে মুখ ফসকে, তার বলা সেই অপ্রত্যাশিত বাক্যটি জেইনকে ভেতর থেকে গভীরভাবে আঘাত করেছে। রিম জেইনের চোখের গভীরে চোখ রেখে নিজেকে আত্মসমর্পণ করে দিয়ে ফিসফিস করল,
“বাট আই ওয়ান্ট আ গ্রিডি ম্যান লাইক ইউ… রাইট নাউ। আই ওয়ান্ট টু বি ইওর অনলি মিল।”
রিম জেইনের প্রশস্ত ও শক্ত বুকের ওপর তার কাঁপাকাঁপা হাতের তালু রাখল। জেইনের বুকের সেই তপ্ত ছোঁয়া রিমের আঙুলের ডগা দিয়ে সরাসরি তার মস্তিষ্কে গিয়ে আঘাত করল। রিম আর নিজেকে সংবরণ করতে পারল না; সে জেইনের ব্রোঞ্জ রঙের সুঠাম বুকে ঠোঁট ডুবিয়ে দিল। ছোট ছোট, আর্দ্র চুম্বনে সে জেইনের ত্বকের স্বাদ নিতে শুরু করল।

আকস্মিক এই আক্রমণে জেইনের শ্বাস-প্রশ্বাস অত্যন্ত ভারী হয়ে উঠল। তার মাথাটা কাউচের পেছনের দিকে এলিয়ে পড়ল, চোখের পাতা বুজে এল এক অসহ্য তৃপ্তিতে। রিম এবার জেইনের শার্টের বোতামগুলোতে হাত দিল। কাঁপা হাতে একটির পর একটি বোতাম খুলে ফেলতেই জেইনের সেই ঈর্ষণীয় আট’টি ভাঁজের পুরুষালি শক্ত-পোক্ত বুক উন্মুক্ত হয়ে পড়ল। চাঁদের আলোয় জেইনের সেই ঘামভেজা চকচকে শরীর দেখে রিম নিজের নিচের ঠোঁট শক্ত করে কামড়ে ধরল। তার নেশাতুর চোখে মনে হচ্ছে জেইনের সেই বুক যেন তার কাছে একখণ্ড নিষিদ্ধ ডার্ক চকলেট বার। যার স্বাদ নিতে সে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
“ইটস্ হট!… ডেঞ্জারাসলি হট!! ড্যামন, জাস্ট লাইক আ ক্যাটবেরি বার। আই ওয়ান্ট টু ডিভোর ইউ রাইট নাউ!”
রিম আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না।হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে জেইনের বুকের ওপর থাকা সেই তিলটায় একটা তীব্র কামড় বসিয়ে দিল।জেইনের হাতটা যন্ত্রণা আর তীব্র সুখে কাউচের গদি খামচে ধরল। রিম থামল না, সে তার ঠোঁট দিয়ে জেইনের বুকের একপাশ থেকে অন্যপাশে এক অস্থির তৃষ্ণা নিয়ে বিচরণ করতে লাগল। জেইন দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে দমিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে বলল,

“উফফ্ ছাড়ো! জ্বালাতন করো না তো!!!”
রিম মাথা তুলে সরাসরি জেইনের চোখে চোখ রাখল। তার চোখে তীব্র নেশা। জেইনের পাতলা ফিনফিনে শুষ্ক ঠোঁটে নিজের তপ্ত আঙুল বুলিয়ে সে মোহাবিষ্ট গলায় বলল,
“তোমার এই শুষ্ক খয়েরি ঠোঁট দুটো আমাকে খুব টানছে। দাও না একটু… আমি শেষ হয়ে যাচ্ছি।”
“আমার মুড নেই।”
“আমি আছি তো। আমি বানিয়ে দিচ্ছি তোমার মুড।আই উইল মেক ইউ ক্রেজি।”
জেইন চাপা ক্ষোভ নিয়ে কঠোর গলায় দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
“দেখো সোনা, আমি আজ খুব বেশি রেগে আছি। তাই আজ আমার ছোঁয়া তোমার জন্য অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক হতে পারে।বুঝতে পারছো আমি কি বল…….”

কিন্তু কথাগুলো জেইনের গলাতেই আটকে গেল। জেইন বড় বড় চোখে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় তাকিয়ে রইল।রিম এমন কিছু করল যা জেইনের কল্পনারও অগম্য ছিল। সে এক টানে নিজের পাতলা নাইট ড্রেসটা খুলে জেইনের পায়ের কাছে ফেলে দিল। তার পরনে এখন কেবল এক টুকরো পাতলা মেরুন লঞ্জারি পরিহিত, যা মৃদু আলোতে তার দুগ্ধশুভ্র শরীরের প্রতিটি বাঁককে আরও উস্কানিমূলকভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। জেইন তার মুষ্টিবদ্ধ হাত আরও শক্ত করল, চোয়াল শক্ত করে নিজেকে সংযত রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাল সে। কিন্তু তার অবাধ্য দৃষ্টি রিমের সেই মায়াবী খাঁজে আটকে গিয়ে যেন স্থির হয়ে রইল।সে দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু! তার এই চেষ্টা হয়তো সহ্য হলো না রিমের। সে জেইনের কোলে সোজা হয়ে বসল। চোখের পলকে নিজের শেষ আবরণটুকুও ছুড়ে মারল জেইনের মুখের ওপর। রিমের সেই অবারিত, ন*গ্ন সৌন্দর্যে জেইনের দুচোখ ধাঁধিয়ে গেল; নিঃশ্বাস আটকে গেল গলায়। রিম জেইনের কপাল থেকে শুরু করে স্লাইড করতে করতে আঙুল বেয়ে নাক ঠোঁট, তীক্ষ্ণ চোয়াল, কন্ঠমনিত ভেদ করে বুকের মাঝে চলে এলো।

~~”Mmm… Rokna Nahin mujhko
Jid pe aa gayi hoon main,
Iss qadar deewanaa pan chadah.. a aaa…”🎶
জেইনের নিজেকে শান্ত রাখার শেষ বাঁধটাও এবার ধসে গেল। রিমের শরীরের সেই পাগল করা সুবাস জেইনের স্নায়ুগুলোকে অবশ করে দিচ্ছিল।সে ঘোরের বশে রিমের উন্মুক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে উঠল,
“ড্যাম সে*ক্সি… মোর বিউটিফুল দ্যান এনিথিং অন দিস আর্থ। এভরিথিং ইজ সো ফাকিং পারফেক্ট…”
জেইনের গলার স্বর রিমের শরীরের প্রতিটি কোষে কাঁপন ধরিয়ে দিল।রিম তার নিজের হাতটা জেইনের বড় হাতের তালুর ওপর রেখে টেনে নিয়ে গেল তার শরীরের সবচাইতে কোমল ও সংবেদনশীল অরণ্যে। সেখানে জেইনের হাতটা সজোরে চেপে ধরে সে কাতর স্বরে ফিসফিস করলো,
“তাহলে দেরি করছো কেন! আমার শরীরে হাত দাও।এক ইঞ্চিও বাদ রাখবে না।আই ওয়ান্ট টু ফিল ইউ এভরিহয়ার। জাস্ট ডোন্ট স্টপ!”

তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নিল জেইন। এক হাতে রিমের গলা চেপে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“বলেছিলাম না? তোমাকে আর স্পর্শ করবো না! যতক্ষণ না পর্যন্ত তুমি নিজে আমার কাছে ভিক্ষা চাইবে!!”
রিমের মেঘবরণ চোখে এবার জল টলমল করে উঠল। তার শরীরের ভেতরের সেই বিষাক্ত নেশা তাকে কুরে কুরে খাচ্ছে। সে আর সহ্য করতে না পেরে ফিসফিস করে প্রায় কাঁদো স্বরে বলল,
“আমি চাই তো……”
“কি চাই?”
“তোমাকে! আমি চাই তুমি তোমার ঠোঁট আর জিভ দিয়ে আমার পুরো শরীর চু*ষে নাও। আমি তোমার রাজত্ব চাই, আমার পুরো শরীরে! আমি চাই…….”
“কি?….”
জেইন এক ভ্রু তুলে প্রশ্ন করলো।রিম এবার জেইনের উন্মুক্ত পেটের ভাঁজ থেকে হাত নামিয়ে ধীরে ধীরে নিচের দিকে নিয়ে গেল। তার আঙুলগুলো জেইনের প্যান্টের বেল্ট পেরিয়ে জিপারের ভেতরে প্রবেশ করতেই তীব্র শিহরণে খিঁচে উঠলো জেইন শরীর। ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে দীর্ঘ আর ভারী শ্বাস বেরিয়ে এলো, তার চোখদুটো সাদা হয়ে আসার উপক্রম। রিম যেন আজ নিজের সমস্ত লাজ লজ্জা জলাঞ্জলি দিয়েছে।সে সেখানে নিজের কোমল হাতের মুঠো শক্ত করে ফিসফিস করে বলল,

“এটা চাই আমার। তোমার ‘লিটেল হ্যামস্টার’!……..”
জেইন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।যেখানে সে রিমের সামান্য নিঃশ্বাসের শব্দ শুনলেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে সেখানে এভাবে এতো কাছে! সে ভেবেছিল রিমের সামান্য দুরত্বে যে যন্ত্রণা সে রোজ অনুভব করে সেই একই যন্ত্রণায় রিমকে দগ্ধ করবে, কিন্তু তা আর হলো কই এই মেয়েটি নিজেই যেন এক লেলিহান শিখা হয়ে তাকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।
রিম যখন বারান্দায় প্রথম পদক্ষেপ রাখে তখন থেকেই ভেতরে ভেতরে জেইন এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তখন থেকেই রিমের সেই মাতাল করা ঘ্রাণ তার নাকে এসে পৌঁছে, তার প্রতিটি স্নায়ুর সাথে বিদ্রোহ শুরু করে দিয়েছে।

জেইন হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে গেল। সে এক হিংস্র হেঁচকায় রিমকে টেনে নিজের বলিষ্ঠ বুকের ওপর উপুড় করে ফেলে দিল। রিমের ন*গ্ন তপ্ত ব*ক্ষ যখন জেইনের পাথরের মতো শক্ত বুকের সাথে লেপ্টে গেল। দুজনের নিঃশ্বাস মিলে এক তীব্র শিহরণ তৈরি করল।বারান্দার নিস্তব্ধতা চিরে কেবল তাদের হৃদপিণ্ডের উন্মত্ত শব্দ শোনা যেতে লাগল।
রিম কাঁপতে কাঁপতে জেইনের গলার কাছে নিজের মুখ ঘষে কাতর স্বরে ফিসফিস করল,
“কাম মি ডাউন। ইটস্ ড্রিপিং… লি*ক ইট। আই ওয়ান্ট ইউ ইনসাইড মি। প্লিইজ, ডোন্ট মেক মি বেগ এনিমোর…. জাস্ট টেক মি রাইট নাউ!”
জেইন এক ঝটকায় রিমের রেশমি চুলের মুঠিটা মুঠো করে ধরল। তার মুখটা সজোরে উঁচু করে নিজের ঠোঁটের একদম কাছে নিয়ে এল। ঠোঁট নাড়িয়ে চাপা স্বরে প্রায় হিসহিসি করে বললো,
“Nottty…. Notty…. wife!!….. আজকের রাতটা তুমি সারাজীবন মনে রাখবে।আই উইল ড্রিঙ্ক এভরি ড্রপ অফ ইওর ডিজায়ার… এন্ড মেক ইউ স্ক্রিম মাই নেম আনটিল দ্য সান রাইজেস। গেট রেডি ফর দ্য মোস্ট টর্চারাসলি সে*ক্সি নাইট অফ ইওর লাইফ!……”

রাতের শেষ প্রহর। চারপাশ নিঝুম, কেবল দুটি সত্তার ভারী নিঃশ্বাস আর সমুদ্রের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়। সোফার নরম গদিতে এলিয়ে আছে রিমের ছোট্ট শরীর, যা জেইনের বলিষ্ঠ ও পেশীবহুল দেহের নিচে পুরোপুরি পিষ্ট। জেইনের গায়ের তপ্ত উত্তাপ আর নোনা বাতাসের শীতলতা মিলে সেখানে এক বিমূর্ত আবেশ তৈরি করেছে। রিমের শরীরটা একটু পর পর খিঁচুনি দিয়ে কেঁপে কেঁপে উঠলো।জেইন তার শরীরের সম্পূর্ণ ভার রিমের ওপর ছেড়ে দিয়ে, তার ললাটে এক দীর্ঘ, সিক্ত চুম্বন এঁকে দিল। ঘাম আর পারফিউমের এক অদ্ভুত নেশাক্ত ঘ্রাণে রিম তখন দিশেহারা। জেইন তার কানের কাছে মুখ নিয়ে তপ্ত নিঃশ্বাস ছেড়ে ফিসফিসিয়ে আঠালো বলল,
“আমার ছোট্ট জংলি বিল্লি! শান্তি হয়েছে এবার?”
রিমের ফর্সা মুখ তখন লজ্জা আর তীব্রতায় টকটকে লাল জবার মতো ফুটে আছে। তার দ্রুত চলা নিঃশ্বাসগুলো যেন বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রিম হঠাত করেই তার সমস্ত শক্তি দিয়ে জেইনকে সোফায় ঠেলে দিল। অপ্রস্তুত জেইনের পিঠ গিয়ে ঠেকলো সোফায়, রিম বিদ্যুৎগতিতে তার ওপরে উঠে এলো। জেইনের প্রশস্ত, ঘর্মাক্ত বুকের বাঁ পাশে থাকা ‘R’ লেখা চিহ্নটির ওপর নিজের ঠোঁট ছোঁয়াল সে। সেই উষ্ণ পরশ জেইনের শিরদাঁড়া দিয়ে এক বিদ্যুচ্চমক বইয়ে দিল। রিম তার নেশাতুর চোখে জেইনের চোখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আই ডিডেন্ট গেট এনাফ! আমার আরও চাই….. ওয়ানস মোর টাইম প্লিজ।”
জেইন যেন আজ অবাকের ওপর অবাক হচ্ছে। তারও আরো চাই। তার নীলাভ চোখে তখন দাবানলের মতো জ্বলছে আদিম তৃষ্ণা। সে এক হেঁচকায় রিমকে নিজের চওড়া, ঘর্মাক্ত বুকের ওপর আছড়ে ফেলল। মুহূর্তের দেরি না করে জেইন তার নেশাক্ত ওষ্ঠাধর দিয়ে রিমের তুলতুলে পাপড়ির মতো ঠোঁট দুটোকে নিজের দখলে নিয়ে নিল।
বাইরে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে উপকূলে, আর ভেতরে নীল আলোয় মিশে যাচ্ছে দুটো তৃষ্ণার্ত আত্মা। সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে এই গভীর আলিঙ্গনে।

সকালের সেই সোনালি মিষ্টি রোদ যখন জানালার সিল্কের পর্দা ভেদ করে রিমের ফ্যাকাশে মুখের ওপর আছড়ে পড়ল, এক গভীর প্রশান্তিতে তার ঘুম ভেঙে গেল। শরীরের প্রতিটি কোষে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ রেশ ছড়িয়ে আছে। রিম ধীরে ধীরে বিছানায় উঠে বসল; অগোছালো চুলে তাকে কোনো এক রূপকথার রাজকন্যার মতো দেখাচ্ছে। তার পরনে জেইনের বিশাল আকৃতির সাদা শার্ট যা তার হাঁটু পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে। রিম শার্টের কলারটা উঁচিয়ে নিজের নাকের কাছে ধরল। জেইনের শরীরের সেই চিরচেনা তীব্র পৌরুষদীপ্ত ঘ্রাণটা এখনো শার্টের ভাজে ভাজে লেপ্টে আছে। সে চোখ বুজে দীর্ঘ এক শ্বাস টেনে নিল।
সে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল জেইন কোথাও নেই। ভোরের সেই ঝাপসা আলোয় জেইন তাকে ফ্রেশ করিয়ে রুমে নিয়ে এসেছিল, রিমের চোখে তখন রাজ্যের ঘুম। প্রচণ্ড খিদেয় রিমের পেট চো চো করছিল; জেইন নিজ হাতে তাকে স্যান্ডউইচ খাইয়ে দিয়ে নিজের প্রশস্ত বুকের সাথে লেপ্টে নিয়ে শুয়ে পড়েছিল। জেইনের বুকের সেই উষ্ণতায় কখন যে সে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল, টেরই পায়নি।

কিন্তু এই মুহূর্তে জেইনকে আশেপাশে দেখতে না পেয়ে রিমের মনে এক অজানা শূন্যতা কাজ করতে লাগল। সে চঞ্চল পায়ে বারান্দায় গিয়ে খুঁজল, কিন্তু সেখানেও কেউ নেই। ওয়াশরুমের দরজাটা বাইরে থেকে লক করা। একরাশ মন খারাপ নিয়ে সে যখন বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে ছিল, ঠিক তখনই সামনের দেওয়ালে ঝোলানো বিশাল আকৃতির মনিটরটি নীলচে আলোয় জ্বলে উঠল।
স্ক্রিনে জেইনের সেই গম্ভীর অথচ সম্মোহনী মুখচ্ছবি ভেসে উঠতেই রিমের হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।
“হেই ওয়াইফি… আমাকেই খুঁজছিলে বুঝি?”
স্ক্রিন থেকে জেইনের গাঢ় হাস্কিস্বর ভেসে এল।
“সরি সোনা, রাতে তোমাকে বলতে পারিনি। খুব important একটা কাজে আমাকে শহরের বাইরে যেতে হচ্ছে। তবে কথা দিচ্ছি, কাজ শেষ হওয়া মাত্রই ঝড়ের বেগে আবার তোমার কাছে ফিরে আসব। যাওয়ার আগে তোমায় বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু তোমার ওই নিষ্পাপ ঘুমটা ভাঙাতে বড্ড মায়া লাগছিল।”
জেইন একটু থেমে আবার বলতে শুরু করল,

“টেবিলের ওপর তোমার ব্রেকফাস্ট আর ওষুধ সব সুন্দর করে গুছিয়ে রাখা আছে। একদম অবহেলা করবে না কিন্তু! নিজের খেয়াল রেখো। আই উইল কাম ব্যাক সুন, ওকে!”
মনিটর স্ক্রিনটা এক লহমায় অন্ধকার হয়ে গেল। পুরো রুমে আবার সেই নিস্তব্ধতা ফিরে এল। জেইনের আকস্মিক অনুপস্থিতিতে রিমের মনটা খারাপ হলেও, পরক্ষণেই তার মনে পড়ে গেল কাল রাতের সেই অদ্ভুত অনুভুতি। রাতে জেইনকে নিজের বলা সব কথা গুলো মনে পড়তেই লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেল। রিম একবার বেডসাইট টেবিলের ওপর তাকালো সেখানে ব্রেডের ওপর জেলো দিয়ে স্মাইলি আঁকা। তার ঠোঁটে ফুটে উঠল এক তৃপ্তিময় স্বর্গীয় হাসি।
সে ফিসফিস করে নিজের মনেই বলে উঠল,
“এইবার তুমি ফিরে এলে তোমাকে তোমার লাইফের সবচেয়ে বেস্ট সারপ্রাইজটা দেব আমি ‘আরত্রিক জেইন চৌধুরী’………….

প্রাণসঞ্জীবনী শেষ পর্ব