Home প্রিয় প্রণয়িনী ২ প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৭

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৭

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৭
জান্নাত নুসরাত

সূর্যের উত্তপ্ত রশ্মি কী নিদারুণভাবে পৃথিবীর বুকে এসে পড়ছে। গরমে তাপে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে জনজীর্ণের মানুষ। গত মাস খানেক ধরে বৃষ্টির দেখা নেই। বিকেলের দিকে আবহাওয়া কিছুটা মেঘলা হলেও বৃষ্টি নামছে না পৃথিবীর বুকে। শুক্রবারের সকাল থাকায় বাড়িতেই সবাই। জায়িন, ইসরাত, আরশ বাহিরে পাড়ি দেওয়ার প্রায় পাঁচ মাস কেটে গেছে। নুসরাতের সাথে কথা হয় প্রতিদিন ইসরাতের। আগের তুলনায় গা শুকিয়ে গেছে তার। চোখ দুটো কোটরে ঢুকে গেছে। মুখটা ও সরু হয়ে এসেছে৷ নুসরাত যখন জিজ্ঞেস করল,”খবার দাবার খাস না তুই?

ইসরাতের শান্ত চেহারার শান্ত উত্তর ভেসে আসলো,”ভালো লাগে না খেতে। মুখে স্বাদ পাই না। আশাটে আশাটে গন্ধ করে সবকিছুতে।
নাজমিন বেগম ইসরাতের দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে ছিলেন। কী মেয়ে ছিল তার, এখন কী হয়েছে। ইসরাতের কথা শোনে বললেন,”প্রেগন্যান্সি টেস্ট একবার করে নিস, মেবি পজেটিভ আসতে পারে।
নুসরাত সরু চোখে তাকাল ইসরাতের দিকে। বিছানায় বসা ছিল সে। গায়ে ঢিলেঢালা টি-শার্ট। গলায় ওড়না প্যাঁচানো। চোখ দুটো পেটের দিকে স্থির করে নাজমিন বেগমকে জিজ্ঞেস করল,”বেবি বাম্প তো নেই, তাহলে প্রেগন্যান্ট হবে কীভাবে? আগের মতোই তো লাগছে দেখতে।
মেয়ের কথায় সামান্য বিরক্ত হলেন ভদ্রমহিলা। চোখের আকার ছোট করে বললেন,”তোকে এত বুঝতে হবে না, যা নিজের কাজে যা। আর হ্যাঁ ইসরাত, প্রেগন্যান্সি টেস্ট করে নিস।
কথা শেষ করে উঠে চলে গেলেন নাজমিন বেগম। নুসরাত ইসরাতের সাথে আরো কিছুক্ষণ কথা বলা শেষে রাখতে যাবে ইসরাত শুধাল,”আরশ ভাইয়ের ই-মেইল এর জবাব দিস না কেন তুই?
নুসরাত অবাক কন্ঠে জিজ্ঞেস করল,”তোর কাছে বিচার দিয়েছে?

“না, বিচার দেয়নি। বলেছে জিজ্ঞেস করতে।
“তো উনি কল দিয়ে জিজ্ঞেস করে না কেন?
“তুই কল ধরেছিস উনার একটা ও?
নুসরাত নিষ্পাপ ভঙ্গিতে দু-পাশে মাথা দোলাল। তারপর পকেট থেকে মোবাইল বের করে মেইল পড়ে শোনাল,”এজ সুন এজ পসিবল আই’ল বিরিং ইউ টু মি. এখন বল এটার আমি কী উত্তর দিব? একত্রিশ শব্দের ই-মেইলের উত্তর মানুষ কী দেয় আমি জানি না। এরপর আরেকটা মেইল দিয়েছে,’আমাকে বেশি করে মিস করিস।’ আশ্চর্য, পাগল নাকি? ওকে আমি মিস করতে যাব কোন দুঃখে।
ইসরাতের ঠোঁটে হাসি দেখা গেল এবার। নুসরাতের কথা বলার ভেতর ইসরাতের সামনের ল্যাপটপ ছুঁ মেরে নিয়ে নিল। ভেসে উঠল আরশের মুখ। চোখ মুখ কুঁচকে কিছুক্ষণ নুসরাতের দিকে তাকিয়ে থেকে শুধাল,”কয়টা কল, কয়টা মেসেজ, আর কয়টা ই-মেইল পাঠিয়েছি?হু? না কল ধরেছিস, না মেসেজের রিপ্লাই দিয়েছিস, না একটা ই-মেইল করেছিস। তোর সমস্যাটা কী আমাকে খুলে বল?
নুসরাত শ্রাগ করল। দু-কাঁধ উপরে তুলে বলল,“আমার আবার সমস্যা কী হবে!
আরশ চোখ সরু করে তাকাতেই, নুসরাত বলল,”এভাবে তাকাচ্ছেন কেন?

“দেখছি, ঘরের মিথ্যুকটাকে দেখছি।
“ কী মিথ্যা বলেছি?
“সেটা পরে বলছি, আগে বল কল, মেসেজের রিপ্লাই দিলি না কেন? হিসাব আছে কয়টা কল দিয়েছি?
“ না হিসেব নেই, কয়টা কল দিয়েছেন বলুন?
“গত পাঁচ মাসে আঠারো শো টা কল দিয়েছি। তিনহাজার আটশত সাত প্লাস মেসেজ৷ আর মেইল দিয়েছি ত্রিশটা।
“একটু ভুল হয়েছে ত্রিশটা মেইল আপনি পাঠাননি। তিনটা পাঠিয়েছেন। ত্রিশটা মেইল ঘুরে ফিরে তিনটা-ই হয়। একই অর্থ বহন করে।
আরশ খ্যাঁক করে উঠল,” তিনটা তো দিয়েছি। তুই একটা কিছু দিয়েছিলি?
“কেন দেশে থাকতে একটা কিস যে দিয়েছিলাম ওইটা?
“ তুই এখনো ওইটার হিসেব ধরে বসে আছিস? বাপ-চাচার মতো বাটপারি করবি না।
“এ্যাহ, ফোন রাখুন তো, ফোন রাখুন, আপনার সাথে কথা বলতেই আমার বিরক্ত লাগছে। কাজের কথা না বলে হুদাই প্যাঁচাল পাড়ছেন।

“ আমার কথা ভালো লাগবে কেন? আমাকে তো বিষাক্ত লাগবেই। সত্যি কথা যে বলে দিয়েছি।
ইসরাত পেছন থেকে মুখ দিয়ে চ মিশ্রিত শব্দ বের করল। বলল,”আহ্, দু-জন ঝগড়া করছ কেন? এই ভালোবাসা দু-জনের ভেতর?
ইসরাতের কথা শেষ হতে পারল না, সমস্বরে দু-জন বলে ওঠল,”কীসের ভালোবাসা! ভালোবাসা টাসা নেই।
ঠোঁট টিপে কিৎকাল তাকিয়ে থেকে ইসরাত চুপ হয়ে গেল। নুসরাত বলল,”আমি কল কাটছি, পরে কথা হবে।
আরশ চোখ সরু করে হুশিয়ারী দিল,”কল কেটে দেখ, তোকে আস্তো রাখব না। আমার শরীর কেমন আছে একবারো জিজ্ঞেস করেছিস?
নুসরাত হেসে উড়িয়ে দিল তার কথা।। বলল,”ওখান থেকে বসে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তাই ভয় ও পাচ্ছি না

“চ্যালেঞ্জ করবি না একদম।
“ চ্যালেঞ্জ করলে কী করবেন?
“তা নিজ চোখে দেখে নিস।
“দেশে চলে আসবেন?
“চ্যালেঞ্জ করেই দেখ না।
নুসরাত আরশের কথায় গা করল না। বলল,” চ্যালেঞ্জ করলাম আপনাকে, যা করার করে নিন। রাখছি!
বলেই কল কেটে দিল। আরশ চোখ বড় বড় করে ইসরাতের দিকে তাকিয়ে বলল,”আমাকে ভয় পেল না, দেখলে কীভাবে কল কেটে দিল?
ইসরাত মাথা দোলাল সে দেখেছে বলে। আরশ ল্যাপটপের সাটার বন্ধ করে দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে ইসরাতের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ল,”তুমি কী অসুস্ত, ইসরাত?
মাথা দু-পাশে দুলিয়ে মেয়েটা বলল,“জ্বি না।

“অসুস্থ হলে বলো, আমি তোমাকে হসপিটালে নিয়ে যাব?
“ অসুস্থ নয়, সামান্য জ্বর মনে হয়।।
“ওষুধ আছে?
“ না!
“আমি এনে দিচ্ছি, দাঁড়াও!!
ইসরাত হাসল। বলল,” প্রয়োজন নেই, ভাইয়া। সামনেই তো ফার্মেসি, আমি গিয়ে নিয়ে আসতে পারব। আপনাকে এত প্যানিক হতে হবে না।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। কোনো প্রয়োজন হলে আমাকে বলো আমি পাশের রুমেই আছি। আর যদি আমাকে না বলো মাম্মা বা পাপাকে বলো।
ইসরাত মাথা দোলাল। বলল,”জ্বি আচ্ছা।
আরশ রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ইসরাত রেডি হয়ে বের হলো। ক্রপ টপ আর স্কার্ট পরেছে। গলায় ঝুলিয়েছে ওড়না। লিপি বেগম কিচেনে ছিলেন, তাই ইসরাত সেদিকে অগ্রসর হলো। ইসরাতকে কিচেনে আসতে দেখে লিপি বেগম ব্যস্ত কন্ঠে বললেন,”আরে ইসরাত, এখানে এসেছ কেন? তোমার না শরীর খারাপ? যাও গিয়ে রেস্ট নাও।
ইসরাত ক্ষীণ হাসল। বলল,”একটু বাহিরে বের হবো।

“কেন? বাসায় ভালো লাগছে না? আচ্ছা, যদি ভালো না লাগে একটু হেঁটে আসো।
ইসরাত মাথা দোলাল। বলল,”আমি বাহিরে বের হব এজন্য আপনার অনুমতি নিতে এসেছি।
“বোকা মেয়ে, অনুমতি নেওয়ার কী প্রয়োজন? যাও ঘুরে আসো। তোমার বড় বাবাকে সাথে নিবে? ডেকে দিব? উনি ও বের হচ্ছেন হাঁটতে৷
ইসরাত ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ঝুলিয়েছে। বলল,”প্রয়োজন নেই, বড় আম্মু। আমি একাই যেতে পারব। একটুই তো হাঁটতে যাব।
কন্ঠে চিন্তা রেখে লিপি বেগম জানতে চাইলেন,”সবকিছু তো চিনো? হারিয়ে যাবে না তো?
“জ্বি না!
“ সাবধানে মার নেই, এক কাজ করো তোমার লোকেশনটা আমাকে সেন্ড করে যাও। আসতে দেরি হলে আমি না হয় এগিয়ে আসব।
ইসরাত মাথা দুলিয়ে বাহিরে বের হওয়ার জন্য ঘুরল। লিপি বেগম তাকে পিছু ডাকলেন। বললেন,”তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে ইসরাত। কোনো খবর আছে কি? কয়েকদিন ধরে লক্ষ করলাম খাবারে তোমার অনিয়মি হচ্ছে, প্রেগন্যান্সি টেস্ট একবার করিয়ে নিও। আমার ধারণা, শুধু আমার ধারণা বলছি, পজেটিভ মনে হয় হব্র।

“জ্বি আচ্ছা করে নিব! বাহির থেকে কিছু আনতে হবে?
“হ্যাঁ কিছু ফ্রুটস নিয়ে এসো, তোমার জন্য।
ইসরাত হ্যাঁ ভঙ্গিতে মাথা নাড়াল। সে আসার সময় নিয়ে আসবে। লিপি বেগম তাকে শুধালেন,“সাথে ইউরো আছে, না থাকলে বলো আমি দিচ্ছি!
“আছে! জায়িন কার্ড দিয়েছে।
“ কার্ড নিয়ে বের হচ্ছো, সাথে ক্যাস না থাকলে কিছু নিয়ে নাও। দাঁড়াও আমি নিয়ে আসছি।
ইসরাতকে মানা করার সুযোগ দিলেন না লিপি বেগম। নিজের ব্যাগ থেকে টাকা এনে ধরিয়ে দিলেন। বললেন,”বাহিরে কিছু খেতে চাইলে খেয়ে ফেলো। মানা করবে না, নিতে। মা হিসেবে দিচ্ছি।

ইসরাতের হাতের মুঠোয় টাকা পুরে দিলেন লিপি বেগম। ঘড়ির কাটায় তখন দশটা বেজে গিয়েছে। ইসরাত পায়ে জুতো পরে বের হলো বাসা হতে। স্ট্রিট দিয়ে হেঁটে এগোল৷ আবহাওয়া আজ সামান্য ঠান্ডা। শীতল বাতাস এসে তার গা ছুঁয়ে যাচ্ছে। ইসরাত প্রথমে ঘোরার সিদ্ধান্ত নিল। নিজেকে সময় দিবে আজ সে! মুক্ত বাতাসে শ্বাস নিল চোখ বন্ধ করে। সেভেন অ্যারোন্ডিসমেন্ট এর উঁচু বিল্ডিং গুলো তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। রাস্তায় ব্যস্ত ভাবে চলাচলকৃত মানুষকে অবলোকন করল। সবার মুখে শুনলেও সরাসরি যখন দেখল ইসরাত প্যারিসের মানুষদের, তার কাছে মনে হলো তাদের ফ্যাশন সেন্সের কাছে যে কেউ হার মানবে। কী চমৎকার লাগছে সবাইকে। মে মাসের শুরু হওয়ায় চেরি ব্লসম গাছে গাছে ফুটেছে। পাতা দেখা যাচ্ছে না। বাতাসের সাথে ঝড়ে পড়ছে ফুলগুলো। ইসরাতের সেদিকে তাকিয়ে থাকতে আকস্মিক, অপ্রত্যাশিত এক লোকের কথা মনে হলো। সুঠাম দেহি উঁচু লম্বা লোকটা বলেছিল,’আমাদের বিচ্ছেদ ঝড়ে পড়া ফুলের মতো সুন্দর!’
এটা কোথায় সে শুনেছিল আরো কয়েকবার। পোয়েট ছিল মনে হয়। এখন এই মুহুর্তে এটা বড় কথা না, সব থেকে বড় কথা আসলেই ঝড়ে পড়া চেরি ব্লসম দেখতে সুন্দর। ইসরাত রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আশ্চর্য নয়নে উপভোগ করল সবকিছু। প্রকৃতি মনোরম দৃশ্য তার মুখের উপর অবাকের চরম প্রলেপ লেপে দিল। অনেকে ভিডিও করছে দাঁড়িয়ে। তার মন চাইল না আজ আর ভিডিও করার, সে দেখল হা করে সেসব। মনটা ভার হয়ে ছিল এতক্ষণে মনের ভারটা নেমে গিয়েছে।

ইসরাত ঘন্টা দুই বাহিরে হেঁটে বসে কাটাল। হাঁপিয়ে উঠেছে সে জায়িনের সাথে থাকতে থাকতে। তার মনে হয় না জায়িন আসলেই একজন কার্ডিওলজিস্ট। ফ্রড মনে হয় আজকাল। একজন কার্ডিওলজিস্ট মানুষের মন বোঝে না কীভাবে? ইসরাত তিক্ত অনুভূতি মনে করতে চায় না, তবুও যেন পীড়া দেয়া অনুভূতি গুলো তার মনের কোণে ঘাপটি মেরে বসে থাকে। সে তাকিয়ে থাকল আকাশের দিকে। এর মধ্যে লিপি বেগম অনেকবার তাকে কল দিয়ে ফেলেছেন। সে বলেছে আরো কিছুক্ষণ বাহিরে ঘুরবে, তারপর বাসায় ফিরবে। ওখানে ফিরতে তার মন চায় না। দম বন্দ হয়ে আসে। কাকে বোঝাবে এসব সে? কেউ নেই তাকে বোঝার! দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল। সোজা গাইনি ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ভাবল ইসরাত, যেমন ভাবনা তেমন কাজ করল। বিভিন্ন ধরণের পরীক্ষা করতে হলো। এই পাঁচ মাসে কিছুটা বলা ভুল হবে পুরোটা ফরাসী ভাষা তার আয়ত্তে চলে এসেছে। জায়িন এখানে এনেই তাকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল ফরাসী শিখার জন্য। তাই অসুবিধা খুব একটা হলো না। ভদ্রমহিলা বললেন,”রিপোর্ট এসে যাবে, আপনি আগামীকাল এসে নিয়ে যাবেন।

ইসরাত মাথা দোলাল। হসপিটাল থেকে বের হয়ে আরো কিছুক্ষণ ঘুরতে চাইল, তার পূর্বেই জায়িনের কল আসলো। মুখের বিকৃতি ঘটল তার। ভাবল কল ধরবে না, তারপর কী মনে করে কল ধরে কানে লাগাতেই জায়িনের গলার স্বর ভেসে এলো,”ইসরাত?
তার ব্যবহার আগের মতো নমনীয় থাকলেও ইসরাত কেন জানি সেসব সহ্য করতে পারে না। জায়িনকে গলা টিপে মেরে ফেলতে মাঝেমধ্যে তার ইচ্ছে হয়। সে কী মেন্টালি সিক হয়ে যাচ্ছে? এমন ইচ্ছে তো তার আগে কখনো করত না। তাহলে এখন কেন ইচ্ছে করে? নিজের তিক্ততা ভেতরে চেপে বলল,”হ্যাঁ, আমি বলছি!
“আপনি বাহিরে গিয়েছেন?
“জ্বি!
“আমি কী আপনাকে নিতে আসব?

ইসরাত জানে সে না বললে ও এই লোক আসবে। তাই নিজের জন্য সহানুভূতি প্রকাশ করল নিজেই। ঠোঁটের ফাঁক গলে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে গেল। বলল,”আসুন।
ইসরাত হাঁটতে লাগল রাস্তার পাশ ঘেঁষে। মনোযোগ তার মাটির দিকে। এতক্ষণ সবকিছু ভালো লাগলে এখন আর ভালো লাগছে না। পাঁচ মিনিট অতবাহিত হলো না জায়িনের গাড়ি এসে তার কাছে এসে থামল। তৎপর গতিতে গাড়ি থেকে নেমে, দরজা খুলে দিল তার জন্য। বলল,”উঠে বসুন।
ইসরাত উঠে বসল বাকবিতন্ডিতা ছাড়া। গাড়িতে বসে সিট বেল্ট বেঁধে নিল। জায়িন জিজ্ঞেস করল,”কোথাও ঘুরতে যাবেন?

প্রশ্ন করে অনিমেষ দৃষ্টিতে চেয়ে রইল জায়িন। ইসরাত বলল,”আপনার ইচ্ছে হলে নিয়ে যান।
গা ছাড়া ভাবে কথাটা বলে গা এলিয়ে দিল গাড়ির সিটে। জায়িন গাড়ি উলটো দিকে ঘুরিয়ে নিল। একসময় গাড়ি গিয়ে থামল সমূদ্রের কাছে। দূর থেকে দেখা গেল সমুদ্রের পানি টলটলে, স্বচ্ছ৷ ইসরাতের সেসব দেখে কোনো উচ্ছ্বাস কাজ করল না৷ সে নির্লিপ্ত বদনে চেয়ে রইল। যেন কাঠপুতলি সে, আর তাকে চালনা করা হচ্ছে চাবি দিয়ে। যে চাবির মালিক জায়িন। গাড়ি থেকে নামতেই বাতাসের ঝাপ্টা এসে লাগল মুখে। শিরশির ধরিয়ে দেওয়ার মতো। ইসরাতের মুখটা কালো থাকলে এবার ছায়া সরে গেল মুখ থেকে৷ জায়িন তার আঙুলের ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করল,”ভালো লাগছে?

উত্তর আসলো না। উত্তর পাবে সে আশাও করে না। ইসরাত যে তার সাথে থাকছে এটাই বেশ। ইসরাতের গায়ে জড়ানো ফিনফিনে নরম কাপড় বাতাসের ঝাপটায় সামান্য দুলে উঠল। উত্তাল বাতাস এসে গা ছুঁয়ে যাচ্ছে৷ ইসরাত সমূদ্র মুখী হয়ে দাঁড়াল। জায়িন জিজ্ঞেস করল,”খাবার খেয়েছ? নাকি খালি পেটে ঘুরছ?
ক্ষীন স্বরে মেয়েটার উত্তর আসলো, যা বাতাসের ঝাপটায় মিলিয়ে গেল,“খেয়েছি!
ক্ষীণ বাতাস, আর বড় ঢেউ গুলো আছড়ে পড়ছিল এসে তীরে। ইসরাত নিষ্পলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল সমূদ্রে প্রতিচ্ছবি ফেলা সূর্যের দিকে ৷ তেমন প্রখরতা না থাকায় তার দৃষ্টি স্থির ছিল ওইদিকে।
মৃদু বাতাস জায়িনের ডেনিম শার্টে ধাক্কা খেয়ে ইসরাতের গায়ে ধাক্কা খাচ্ছিল। জায়িন মুহুর্ত গুলো উপভোগ করছিল। ইসরাতের বাদামি বর্ণের চুলগুলো আলোর জন্য চিক চিক করছে, কিছুটা উড়ছে। একসময় তার দৃষ্টি তার পুরো শরীর পরখ করল। বাতাসের ধাক্কায় পাতলা ক্রপ টপটা শরীরের সাথে লেগে যেতেই, তার শারিরীক গঠন স্পষ্ট দেখা গেল। জায়িনের না চাইতেও চোখের আকার সরু হয়ে আসলো। শরীরের অধিকাংশ অংশ আগের তুলনায় সরু হয়ে গেলেও পেটটা খানিকটা উঁচু হয়ে উঠেছে। জায়িন আরো ভালো করে দেখার জন্য দু-পা আগাল। ইসরাত তার সংশ্লিষ্ট দৃষ্টি নিজের পেটের দিকে বুঝতেই গুটিয়ে গেল। দু-হাতে ঘুরে ফেলার ব্যর্থ চেষ্টা করল। সম্ভব হয়ে উঠল না। জায়িনের প্রখর দৃষ্টি সূর্যের ন্যায় ঠাঁই সেখানে। যখন সে বুঝতে পারল এটা সত্যি তখন তার ঠোঁটে ক্ষীন হাসির ছায়া দেখা গেল। চোখ সেদিকে রেখে আরো এক পা আগাতে ইসরাত দু-পা সরে গেল। জায়িনের মুখের হাসি তখনো লেগে আছে। সে ফিসফিস করে মেয়েটার নাম উচ্চারণ করল দুয়েকবারের মতো থেমে থেমে,”ইসরাত… ইসরাত…”

ইসরাত জায়িনের মুখের হাসিটুকু মিটিয়ে দিতে বলল,”আপনি যা ভাবছেন তার কিছুই না৷ গ্যাস এর জন্য পেট আগের তুলনায় সামান্য ফুলে গেছে।
জায়িনের হাসিটা নিভে যাওয়ার বদলে তা আরো বৃদ্ধি পেল। ফিসফিসানোর মতো কিছু শব্দ বের হলো তার মুখ থেকে,’আপনি এ কী করেছেন? ইসরাত…
মুখের উপর ভেসে উঠল খুশির ঝলক। সে আবারো ডাকল,”ইসরাত, আমার বোকা ইসরাত, আপনি কী করেছেন এটা?
ইসরাত দু-পা পিছিয়ে গেল আরো। জায়িনের মুখের ভাব ভঙ্গিমা তার কাছে স্বাভাবিক লাগল না। একটা অস্বাভাবিক জন্তুর ন্যায় লাগল৷ তার মুখ শুকিয়ে কাঠ হয়ে আসলো। অস্পষ্ট স্বরে বলে ওঠল,”তু.. তুমি যা ভাবছ তার কিছু না। গ্যাসের জন্য পেট ফুলে গেছে।
জায়িন ভ্রু উপরে তুলে সাদা স্নিকার্স পরা পা বালুতে ফেলল। বলল,”আমি কী ভাবছি, আপনি কী করে তা বুঝলেন? হু?

ইসরাত পেছন দিকে সরে যাওয়ার চেষ্টায় রপ্ত থাকল। ছুটে যাওয়ার আগেই তার কব্জি চেপে ধরা হলো৷ বাতাসে বিড়বিড় শোনা গেল নরম কন্ঠের,”এটা তোমার বাচ্চা না, জায়িন! এটা তোমার না।
জায়িন নিজের হাতে ধরে রাখা মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল, হয়ে উঠল না৷ হাসিটা মুখ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসলো। তার চোখ জ্বলছিল তখন। উজ্জ্বল আলোয় সেগুলো চকচক করে উঠছিল। সে কানে তুলল বলে মনে হলো না সামনের মেয়েটার কথা, যে ভয়ে পা পিছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। জায়িন মাথা ঝোঁকাল তার পেটের দিকে,। ফিসফিসিয়ে পেটের দিকে বাক্য ছুঁড়ে দিল,”হাই, লিটেল গার্ল..!

ইসরাতের সাথে কথা শেষ করে নুসরাত গা এলিয়ে দিয়েছিল সোফার উপর, এখনো গা এলানো তার। নাছির সাহেব কিছুটা এখন হাঁটাচলা করতে পারেন, নিয়মিত ত্যারাপি দেওয়ার জন্য৷ নুসরাতকে সোফার উপর চোখ বুজে শুয়ে থাকতে দেখে শুধালেন,”শরীর খারাপ তোমার?
নুসরাত চোখ খুলে একবার তাকিয়ে বন্ধ করে নিল। বলল,”না, এমনি শুয়ে আছি। ভালো লাগছে শরীর।
নাছির সাহেব টিভি অন করে বসতে বসতে বললেন,”কিছু একটা খাও, তাহলে দেখবে ভালো লাগছে৷
কথা শেষ করে চ্যানেল বদলালেন। একজন মহিলাকে দেখা গেল স্ক্রিনে। নুসরাত কী ভেবে একবার তাকাল টিভির দিকে তখনই তার চোখ আটকাল শিরোনামের দিকে। প্রথমে গা ছাড়া ভাবে তাকিয়ে থাকলেও আকস্মিক উঠে বসল। ভদ্রমহিলা একনাগাড়ে কথা বলে চলেছেন, নুসরাতের কানে একটা লাইন এসে বারি খেল এবং তা শুধু পুনরাবৃত্তি হলো,”মে মাসের আট তারিখ সিলেট সেন্ট্রাল জেলে নাহিয়ান আবরার পূর্বের ফাঁসি হয়েছে।’

কথাটা শোনার পর বুকের ভেতর ধ্বক করে উঠল তআর। চোখ মুখ শুকিয়ে কাঠ হলো নিমেষেই। কানের মাঝে তখনো বাজছে,”মে মাসের আট তারিখ সিলেট সেন্ট্রাল জেলে নাহিয়ান আবরার পূর্বের ফাঁসি হয়েছে। ফাঁসির কারণ একে বিবৃথি করছেন সাংবাদিকা। সেসবের কোনোটা শুনল না নুসরাত, শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নাহিয়ানের হাস্যজ্জ্বল চেহারা দেখল।
দীর্ঘক্ষণের নীরবতার পর নুসরাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। নাছির সাহেব মুখ দিয়ে চুকচুক করলেন। হতাশ কন্ঠে বললেন,”ছেলেটা বুদ্ধিমান ছিল। সৎ পথে চললে আরো দূর যেত। বিপথে গিয়ে জীবনটা-ই নষ্ট করল। অকালেই ফাঁসি হলো।

আরো কিছুক্ষণ নাছির সাহেবের দুঃখী বাণী চলল। সেই দুঃখ স্থায়ী হলো খুব কম সময়। সময় বাড়ার সাথে সাথে মনের ভেতর থাকা খারাপ লাগাটা নিভে গেল।
মানুষের জীবন যেমন অস্থায়ী দুঃখ কষ্ট অস্থায়ী। নাহিয়ান আবরার পূর্বের ফাঁসির কথা কেউ মনে রাখল? কেউই রাখল না! সে মারা যাওয়ার কয়েক ঘন্টা পর সবার মনের উপর আছড়ে পড়া দুঃখ দুল্যিসাৎ হয়ে গেল৷ পৃথিবী চলল তার নিয়মে। মানুষ ব্যস্ত হলো তাদের কাজে।
ক্যালেন্ডারের পাতায় কাটা পড়ল সপ্তাহ খানেক সময়। নুসরাত আগের মতো শো-রুমে বসা শুরু করল। যেদিন নুসরাতকে প্রথম তারা দেখেছিল ভূত দেখার মতো চমকে উঠেছিল। অপ্রত্যাশিত ঘটনায় সবাই যখন বিমূঢ় তখন নুসরাত সবাইকে সহজ করল। রুবার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হলো। মসজিদে তার রুহের শান্তি কামনা করে কুরআনও খতম করানো হলো।
নুসরাত নিজের রুমে বসেছিল। দু-দিন ধরে আরশের কোনো মেসেজ আসেনি৷ আগের মেসেজগুলো সে দেখছিল। ইংরেজি গুটি গুটি অক্ষরে লিখা,”Heyy Sweety, How are you? If you want, you can miss me..

আরো কিছু মেসেজ। কফি খাচ্ছিল তার ছবি পাঠিয়েছে। নিচে লিখে দেওয়া,”YOU Wanna Test?
নুসরাত রিপ্লাই করেছিল,”What?
আরশ উত্তরে লিখেছে,”Coffee or what! পাশে চোখ উল্টানোর ইমোজি। এরপর কালো রঙের একটা ইমোজি পাঠিয়ে জিজ্ঞেস করেছে,”You Wanna Test something better?
“what?
“ my lips…
নুসরাত কী উত্তর দিবে খুঁজে পেল না, এরপর আর রিপ্লাই দেয়নি মেসেজের। প্রতিদিন মেসেজ এসেছে আরশের কাছ থেকে। ‘meet you again, very soon! Miss me.. Miss me.. And miss me….

মেসেজ গুলোতে চোখ বোলানোর সময় বাহির থেকে নকের শব্দ আসলো। মুখ তুলে একবার তাকাল। দরজার ওপাশে কে দেখা যাচ্ছে না। ঝাপসা দেখাচ্ছে। ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের এপাশে বসা নুসরাতের মুখটায় সামান্য বিরক্তি দেখা গেল। অভার সাইজড কালো রঙের হুডি অভার সাইজড ট্রাউজার পরে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় পরা ক্যাপ। এই গরমের মধ্যে কে এসব পরে? আকস্মিক তার মুখের বিরক্তি স্বরে গেল, মনের ভেতর প্রতিধ্বনি হলো,’আরশ ভাই নাকি! তারপর সেই চিন্তা ফেলে দিতে হলো, এই অসময় সে কোথায় থেকে আসবে। নুসরাত ভালো করে দেখার চেষ্টা করল, সম্ভব হয়ে উঠল না। ঝাপসা দেখা যাচ্ছে লোকটাকে। ক্যাপটা কপালের একাংশ ঢেকে রেখেছে। নুসরাত তিরিক্ষি কন্ঠ ভেতরে চেপে রেখে বলল,”কামিং!
কথা শেষ করার আগেই ধড়াম করে ভেতরে ঢুকল হুডি পরিহিত লোকটা। নুসরাত লাফ মেরে বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মুখ দিয়ে ‘আপনি’ উচ্চারণ করতে পারল না তার পূর্বেই কন্ঠদেশে শক্ত সামর্থ হাতের চাপ পড়ল। হিসহিসিয়ে উঠে বলল লোকটা,”বলেছিলাম না, চ্যালেঞ্জ না করতে।

নুসরাত অবাক হওয়ার সুযোগ পেল না, তার পূর্বেই তাকে চেপে ধরে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হলো। আরশের হাতের স্পর্শ ঢিলে হলো সামান্য। কন্ঠদেশ হতে পালস পয়েন্টের দিকে বুড়ো আঙুল অগ্রসর হচ্ছে। নুসরাতের সামনের লোকটা গ্রীবা বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসলো। ভ্রু নাচিয়ে শুধাল,”কী, এখন মুখ বন্ধ কেন?
নুসরাতের চেহারা বিস্ময়। তার মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। সে বিশ্বাস করতে পারছে না এই পাগল লোক সপ্তাহ খানেকের ভেতর দেশে চলে আসছে। বেকার নাকি? কাজ-কাম কিছু নেই নাকি? সামান্য কল কেটে দেওয়ায় এভাবে কে দেশে আসে? আশ্চর্য, আশ্চর্য! আরশের দিকে নুসরাত নেত্রপল্লব না ঝাপটেই তাকিয়ে রইল। অস্পষ্ট কন্ঠে উচ্চারণ হলো ঠোঁট দিয়ে,”আমি সামান্য কল কেটে দেওয়ায় আপনি চলে এসেছেন? আপনি পাগল? আর ইউ সিক?
আরশের হাতের চাপ বাড়ল আবারো গলায়। কন্ঠ খাদে নামিয়ে হিসহিসাল,“কল কেটেছিলি কেন তাহলে? সাহস কী করে হয় তোর আমাকে ইগনোর করার? গলা টিপে মেরে ফেলি?
মেয়েটার ঠোঁট গলে দীর্ঘ শ্বাস বের হলো। আরশের হাত কন্ঠদেশ থেকে ছাড়িয়ে নিতে চাইল, সম্ভব হলো না। বলল, “সাহস আমার অনেক আগ থেকেই ছিল।

“হ্যাঁ, তা তো দেখতেই পাচ্ছি।
আরশ নুসরাতের দিকে আরেকটু ঝুঁকে আসতেই এক্সকিউটভ চেয়ার দুলে উঠল। পেছনের দিকে ছুটল। শেষ পর্যন্ত গিয়ে ধাক্কা খেল ট্রান্সপারেন্ট দরজার সাথে। নুসরাত ভ্রু কুটি করল,”কী মতলবে দেশে এসেছেন? ঝেড়ে কাশুন তো!
“যেই মতলবে আসি, এটা একান্ত আমার ব্যাপার। আপনাকে বলব কেন?
“তুই থেকে আপনি তে চলে গেছেন কেন? আপনি তো অতি দ্রুত নিজের রঙ পাল্টাচ্ছেন দেখি!
“সেটা ও আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার।
“আমি বুঝিনা মনে হয় কী জন্য দেশে এসেছেন!
“কী জন্য এসেছি, দেখি বল?
নুসরাত হাসল। ঠোঁট বেঁকে গেল একপাশে। শুধাল,”পাঁচ মাসেই এই অবস্থা আপনার?
“হ্যাঁ, এই অবস্থা!
“আপনি তো দেখছি অবসেসড হয়ে গেছেন?
সহজ স্বীকারোক্তি করল সে,“হয়ে গেছি!
“হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাচ্ছেন কেন? আপনার কী মনে হয়, আমি বুঝিনা?
“আপনি বুঝলেই বা কী, মিসেস আ.র.শ!

নুসরাত দু-হাতে আরশের গলা প্যাঁচিয়ে ধরল। ভ্রু উচিয়ে বলল,”তা আপনার মতলব কী বলুন তো?
আরশ তার কোমর চেপে ধরে শূণ্যে তুলে ফেলল। বলল,”মতলব পরে বলছি, আগে ক্যাপটা খুলে ফেলুন।
নুসরাত বিনা বাক্য ব্যয় করে খুলে ফেলল। শুধাল,”এত তাড়াতাড়ি ধৈর্য শেষ?
” হ্যাঁ, শেষ!
কথা শেষ করেই আরশ তাকাল তার মুখের দিকে। একহাতে তার কোমর আকড়ে ধরে রাখল নিজের সাথে অন্য হাত ঠেকাল তার গালে। নুসরাত হাতে নেওয়া ক্যাপ টেবিলের উপর রাখার সুযোগ পেল না, তার পূর্বেই অপ্রত্যাশিত আক্রমন হলো তার উপর।
এই আকস্মিক আক্রমনে মেয়েটা চোখে অন্ধকার দেখল। ঠোঁট নাড়িয়ে কিছু বলার পূর্বেই ঝড়ের গতিতে তার ঠোঁট দুটো দখলে চলে গেল সামনের ব্যক্তির। বাতাসে মিলেমিশে একাকার হলো আরশের গলার স্বর,”টুডেই ইউ আর টোটালি গন, নুসরাত নাছির..!
পিঠ ঠেকল কোথায় বুঝতে পারল না সে। চোখ বন্ধ হয়ে আসলো তার। আরশের অবাধ্য আচরণ বৃদ্ধি পেল। নুসরাতের পা ঠেকল আরশের পায়ে উপর। পিঠ ধাক্কা খেল ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসে। হাতের চাপ লাগল কোনো একটা সুইচের মধ্যে। মোটরাইজড কার্টেন ট্রান্সপারেন্ট গ্লাসের উপর থাকায় তা দু-পাশে সরে গেল। দৃশ্যমান হলো বাহিরের দৃশ্য। গ্লাসের অপাশে কয়েকজন এমপ্লয়ি দাঁড়িয়ে ছিলেন। হঠাৎ পর্দা সরে যাওয়ায় এদিকে তাকালেন তারা। আরশ একবার চোখ তুলে তাকাল। সবাই হা করে এদিকে তাকিয়ে আছে। মুখে কোনো ভাবাবেগ দেখা গেল না তার। স্বাভাবিক ভাবেই ওয়াল সুইচে চাপ দিতেই তা দু-পাশের পর্দা আবারো চারিপাশে ছড়িয়ে পড়ল। নুসরাত ধাক্কা দিল আরশের বুকে। বলল,”দূরে সরুন!

“আমার এখনো হয়নি। দূরে সরা সম্ভব না।
“ তাহলে আমিই সরে যাচ্ছি, আপনি গ্লাস আঁকড়ে ধরে বসে থাকেন।
নুসরাত হাতের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে নিল তা আর সম্ভব হলো না। আরশ এক হাতে টেনে ধরল তার হাত। টেনে এনে দাঁড় করাল আগের জায়গায়। বলল,”আমাকে দেশে আনিয়েছে কে?
“কেউ আনেনি, নিজে নিজে এসেছেন। নিজ পায়ে হেঁটে এসেছেন।
“মিথ্যা বলবে না, তুমি আমার কল না কাটলে আমি আসতাম?। আমার মেসেজের রিপ্লাই দিলে আমি কী এভাবে আসতাম?
“তাহলে এখন কী আমার দোষ?
“ অবশ্যই, তোমার দোষ। যেহেতু তুমি আনিয়েছ, তাহলে এখন তুমি নিজ দায়িত্বে আমাকে সামলাবে।
“আমি কী ঠেকা নিয়ে রেখেছি আপনাকে সামলানোর?
“ সেটা সময় বলে দিব।

কথা বলার মধ্যেই আরশ নুসরাতের গায়ের শার্টের বোতাম খুলে ফেলেছে। তা ছুঁড়ে ফেলল মেঝেতে। নুসরাত বলল,”আমার সাথে ডিল করতে হলে রুমে করবেন, এমন অফিস রুমে ডিল করার কোনো মানে হয় না।
আরশ চোখ বুজে দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। বলল,”কিছু হবে না।
“অনেক কিছু হবে। এখানে আমি আপনাকে অনুমতি দিচ্ছি না।
আরশ নুসরাতের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কোলে তুলে নিল। বলল,” বড় জ্বালাচ্ছো তুমি। কো-অপারেট করলে সমস্যা কোথায়?
“সমস্যা আছে!
“ তুমি এবার জেদ করছ।
“আপনি জেদ করছেন। এটা কোনো জায়গা হলো যেখানে আমি আপনার কাছে আআত্মসমর্পণ করব?
“সমস্যা কোথায় আমায় বল?
“এটা প্যারিস না, বাংলাদেশ। আপনি সেটা বুঝতে চাচ্ছেন না কেন?
“আমি এখন কিচ্ছু শুনব না, বুঝব না। বি কো-অপারেট।
নুসরাত আরশের চোখের দিকে তাকাল। বলল,” কো-অপারেট করলে কী দিবেন?
“যা চাইবে, এনিথিং!
“ অনেক কিছু চাইতে পারি, বুঝে শোনে কথা দিন। আপনার চৌদ্দ গুষ্টির সম্পত্তি চেয়ে বসে থাকতে পারি, বুঝে শোনে!

“বুঝে শোনেই দিচ্ছি। কী চাই বলো?
নুসরাত তার পকেটের দিকে ইশারা করল। বলল,“আপনার কার্ড আমার চাই।
আরশ এক বাক্যে রাজী হয়ে গেল,“দিয়ে দিব।
নুসরাত দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল,“ উঁহু, দিয়ে দিব না, এক্ষুণি চাই!
আরশ পকেট হাতড়াল। ওয়ালেট বের করে একটা কার্ড এগিয়ে দিল, নুসরাত সেটা নিল না। হাতেই তুলল না। আরশ ভ্রু উচাল,”নিচ্ছো না কেন?
“এটা না, ব্ল্যাক কার্ডটা।
“ব্ল্যাক কার্ড দিয়ে তুমি কী করবে?
“আমি কো-অপারেট করছি, আপনি তার বদলে আমাকে কার্ড দিচ্ছেন, লেনদেন এখানেই শেষ।
আরশ এগিয়ে আসতে আসতে বলল,”লেনদেন এখানেই শেষ? হু?
“হ্যাঁ!
আরশ তার মুখ হাতের আজলায় তুলে নিল। বিড়বিড় করল,”Tu es très belle.

“এটার মানে কী?
ঠোঁটের কোণায় সূক্ষ্ম চুমু খেল নুসরাতের। গালে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল,” ইউ আর টুউউ এনয়িং, নুসরাত নাছির।
অবাক কন্ঠস্বর নুসরাতের, “এটাই বলেছেন?
“অবিয়েসলি, আর কী বলব?
নুসরাত মাথা দোলাল সে বুঝেছে বলে। তার মাথা ঠেকল আরশের বুকে। নুসরাত কার্ড হাতে নিয়ে দেখল ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। জিজ্ঞেস করল,”আসল না নকল?
“তুমি নিজে বোঝে নাও! আমাকে বলেছ আমি দিয়েছি, এবার লেনদেন পরিষ্কার করো।
কথা শেষে আরশের হাসির শব্দ ভেসে এলো। নীরব রুমে তার হাসি প্রতিধ্বনি হলো। নুসরাত ঠোঁটে হাত রেখে বলল,”আরশ ভাই, হাসবেন না। চুপ থাকুন।

নুসরাতের কথায় আরশের হাসি থামল না, আরেকটু বৃদ্ধি পেল। তার দুই ঠোঁট হাত দিয়ে চেপে ধরল নুসরাত। বলল,”মুখ বন্ধ! হাসবেন না! আমি বলছি হাসবেন না। আপনার হাসি বিচ্ছিরি রকম খারাপ।
তবুও আরশের হাসি থামল না। রুমের মধ্যে প্রতিধ্বনি হলো,”ইউ আর টু এনয়িং, নুসরাত নাছির। এখনো আমাকে বিরক্ত করছ, আশ্চর্য! তুমি আমার সাথে লেনদেন করছ? দাও নাও টাইপ!
আরশের চুলের ভাঁজে নুসরাতের আঙুল নাড়াচাড়া করছে। বলল,“পৃথিবী টিকেই আছে দাও নাও এরপর। আপনার সাথে আমার সম্পর্ক তেমন। আপনি নিবেন, তার বদলে আমাকে সমান ফিরিয়ে দিবেন। সবার সমান পাওনা।

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৬

আরশ হো হো করে হাসছে। তার হাসি প্রতিধ্বনি হচ্ছে পুরো রুমে। নুসরাত না চাইতেও হাসি মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসলো। কন্ঠে হাসির ছায়া,”আপনি হাসি বন্দ করবেন? আমার হাসি পাচ্ছে আপনার হাসি শোনে। আশ্চর্য, মানুষ এভাবে হাসে? পাগলের মতো আচরণ করবেন না৷ আপনি আরো বেশি হাসছেন কেন? কী হয়েছে আপনার? মুখ বন্দ করুন৷ এভাবে হাসবেন না৷
আরশের হাসি থামল না, তাকে থামাতে গিয়ে নুসরাত নিজেও হেসে গড়াগড়ি খেল। বলল,”চুপ, চুপ! ঠোঁট স্টেপলার করে দিব। একদম চুপ…

প্রিয় প্রণয়িনী ২ পর্ব ৬৮