প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৮০
সাইদা মুন
আজ শুক্রবার,
তালহা মায়ের ঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দুহাত বুকের ওপর গুঁজে রাখা। চোখজোড়া স্থির হয়ে আছে সামনের দৃশ্যটায়। তার বউ মায়ের খয়েরি জামদানি শাড়িতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে। মা নিজের গহনার বাক্স খুলে খুব যত্ন করে মেহরীনের সাজটা সম্পূর্ণ করছেন। সিম্পলের মধ্যে সুন্দর একটা সোনার হার ও কানের দুল পরিয়ে দিলেন। তারপর নিজের একজোড়া মোটা সোনার বালা বের করে মেহরীনের হাতে পরিয়ে দিলেন। মেহরীন অবাক চোখে বালাগুলো দেখল। এগুলো তার শশুড় তার শাশুড়িকে নিজ পছন্দে বানিয়ে দিয়েছিলেন। কি সুন্দর কারুকাজ বালাজোড়ায়, উনার পছন্দ দেখেই বুঝলো তালহাও তার বাবার মতোই হয়েছে। তিতলি বেগম ততক্ষণে তার চুলগুলো আঁচড়ে পেছনে এনে সুন্দর করে খোপা বেঁধে দিয়েছেন। তাহিয়া আগেই মুখে হালকা মেকআপ করে দিয়েছে। শাড়ির আঁচলটা পেছন থেকে এনে সুন্দর করে অন্য বাহু ঢেকে সামনে পিন করে দিলেন তিতলি বেগম। তারপর মেহরীনকে দাঁড়াতে বলে নিজে বসে পড়লেন। শাড়ির কুচিগুলো একে একে ঠিক করে নিচ থেকে সুন্দর করে গুছিয়ে দিলেন।
সবশেষে উঠে দাঁড়িয়ে মেহরীনের থুতনিটা আলতো করে ধরে মুগ্ধ চোখে তাকালেন। ঠোঁটে ফুটে উঠল প্রশান্ত এক হাসি,
—মাশাআল্লাহ! এখন লাগছে একদম সিকদার বাড়ির বেটার বউ।
মেহরীনের গাল মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। মৃদু হেসে আয়নার দিকে তাকাল সে। নিজেকেই যেন চিনতে পারছে না। খয়েরি জামদানির সঙ্গে গাঢ় লাল লিপস্টিক, পরিপাটি খোপা আর হাতে কানে গলায় মায়ের দেওয়া সোনার গহনা, সব মিলিয়ে সত্যিই যেন একেবারে বউ বউ লাগছে তাকে। সিকদার বাড়ির বউ লাগছে।
তিতলি বেগম এবার তাকে ঘুরিয়ে তালহার বরাবর দাঁড় করিয়ে দিলেন। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে কপট বিরক্তিতে বললেন,
—নির্লজ্জ ছেলে। সেই কখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছিস। দেখ, এবার মন ভরে দেখ তোর বউকে। আমার এখনো রেডি হওয়া বাকি।
বলেই কপট রাগ দেখিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। তালহা মায়ের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে মাথা চুলকে হেসে ফেলল। মা দরজার বাইরে যেতেই সে দরজাটা আলতো করে ভিড়িয়ে দিল। তারপর ধীরে ধীরে মেহরীনের দিকে এগিয়ে এল। মেহরীন আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখছিল। তালহার পায়ের শব্দ শুনে তার দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করল,
—কেমন লাগছে আমায়?
তালহার চোখ আটকে আছে সাজে। বিশেষ করে গাঢ় লাল লিপস্টিক দেওয়া ঠোঁটের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে আলতো হেসে বলল,
—একদম লালসুন্দরী।
মেহরীন ফিক করে হেসে ফেলল। শাড়ির কুচি সামলে সামনে এগোতে নিতেই তালহা তৎক্ষণাৎ সতর্ক গলায় বলে উঠল,
—সাবধানে পা ফেলো।
মেহরীন হেসে হেসেই বলল,
—মশাই, আমি শাড়ি পরে হাঁটতে পারি। এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
কথাটা বলতে বলতে তালহার সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর তার খয়েরি পাঞ্জাবির বুকের কয়েকটা বোতাম ঠিক করে লাগিয়ে দিল। একটু পেছনে সরে মাথা কাত করে তালহাকে ভালো করে পরখ করল। তারপর সন্তুষ্ট ভঙ্গিতে বলল,
—এবার লাগছে আমার পারফেক্ট সিকদার।
তালহার মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। পরক্ষণেই মেহরীনের কোমর পেচিয়ে ধরতেই মেহরীন চমকে ঝারি মেরর উঠল,
—এই! ছাড়ুন বলছি।
সে শাড়ির আঁচল সামলাতে সামলাতে তালহার দিকে রাগী চোখে তাকাল,
—আম্মু কত কষ্ট করে শাড়িটা পরিয়ে দিয়েছে। একটু যদি নষ্ট হয়, আপনার খবর আছে বলে দিলাম।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। মেহরীন তখনও ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তারপর সে আয়নার সামনে গিয়ে শাড়িটা ঠিক আছে কি না দেখতে দেখতে বলল,
—আক্কেল-জ্ঞান নেই আপনার? শাড়িটা যদি এখন নষ্ট হয়ে যেত?
তালহা নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল। সামান্য একটা শাড়ির জন্য এই পরিমাণ ঝাড়ি, তার ওপর এমন ভয়ংকর হুমকি। মুহূর্তের মধ্যেই যেন অদৃশ্য কেউ এসে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গেল, “বাবা তালহা, সবে তো শুরু। বউয়ের ঝাড়ি কত প্রকার, কী কী সবই আস্তে আস্তে দেখতে পাবি।” তালহা মেহরীনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বউয়ের সাজ দেখে যে মানুষটা কয়েক মুহূর্ত আগেও মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সেই মানুষটাই এখন ঝারি খেয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশ চিন্তিত।
গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন বাড়ির সব মহিলারা। তাহিয়া ছাড়া মা, চাচি, দাদি, মেহরীনসহ সবাই শাড়িতে সেজেছেন। আর পুরুষদের পরনে পাঞ্জাবি। তাহিয়ার পরনে অবশ্য লং ড্রেস। এক এক করে সবাই গাড়িতে উঠে বসল। মেহরীনকে পাঠানো হলো তালহার গাড়িতে।
মেহরীন ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগিয়ে যেতেই তালহাও তার পিছু নিল। শাড়ির কুচিগুলো সামলে হাঁটছে মেয়েটা। তবু তালহার দুশ্চিন্তা কাটছে না, যদি কোথাও পা আটকে যায়। তাই পেছন থেকে সে রেডি তাকে সামলে নিতে। গাড়ির কাছে এসে মেহরীন ফ্রন্ট সিটের দরজার পাশে দাঁড়াতেই তালহা এগিয়ে এসে দরজাটা খুলে দিল। শুধু তাই নয়, সে এক হাত দিয়ে সিটের উপরটাও আড়াল করে দিল, যেন বসতে গিয়ে মাথায় আঘাত না লাগে। তারপর বলল,
—বসুন, ম্যাম।
মেহরীনের মুখে গালভরা হাসি ফুটে উঠল। সাবধানে শাড়ির কুচিগুলো সামলে গাড়িতে বসল সে। তালহা আবারও একবার তার কুচিগুলো ঠিকঠাক করে দিল। আঁচল কোথাও আটকে আছে কি না দেখে নিশ্চিত হয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তারপর নিজে গিয়ে ড্রাইভিং সিটে বসল। গাড়ি চলতে শুরু করল। কিন্তু তালহার গাড়ি চালানোর চেয়ে মেহরীনের দিকেই যেন মনোযোগ বেশি। কয়েক সেকেন্ড পরপরই একবার করে পাশ ফিরে তাকাচ্ছে। কখনো তার শাড়ির দিকে, কখনো মুখের দিকে।
মেহরীন প্রথমে কিছু বলল না। কিন্তু এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর আর চুপ থাকতে পারল না,
—এভাবে চলতে থাকলে তো যেতে সারাদিন লেগে যাবে।
তালহা তপ্ত শ্বাস ফেলে স্টিয়ারিংয়ে মন দেওয়ার চেষ্টা করে বলল,
—ড্রাইভার সঙ্গে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল।
মেহরীন ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
—কেন?
তালহা গম্ভীর মুখে বলল,
—এভাবে গাড়ি চালাব, নাকি তোমাকে দেখব, বুঝে উঠতে পারছি না।
মেহরীনের গাল মুহূর্তেই লজ্জায় রাঙা হয়ে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে তালহার বাহুতে আলতো একটা চাপড় দিয়ে বলল,
—বেশি কথা না বলে চুপচাপ গাড়ি চালান তো।
তালহা মুখে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
—রাস্তায় ধ্যান দিতে পারছি না তো, ম্যাম।
মেহরীন এবার রাগী চোখে তাকাতেই তালহা সঙ্গে সঙ্গে গম্ভীর হওয়ার ভান করল,
—ফিউচার ডাক্তার ম্যাম, এমন রাগ দেখাবেন না। রোগীকে একটু হেল্প করুন।
মেহরীন এবার কৌতূহলী ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল,
—রোগীর আবার কী রোগ?
তালহা একবার তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—রোগী তার বউ থেকে নজরই সরাতে পারছে না। রাস্তায় ফোকাসই করতে পারছে না।
কথাটা শুনে মেহরীন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল। তারপর একটু ভেবে গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল,
—এজন্য আপনাকে ফোকাসিটামল খেতে হবে।
তালহা সঙ্গে সঙ্গে ভ্রু তুলল,
—তা এই ওষুধটা কোন গ্রহের ফার্মেসিতে পাওয়া যাবে, ম্যাম?
মেহরীন গর্বিত ভঙ্গিতে বলল,
—আমার নিজস্ব গ্রহের।
তালহা মুচকি হেসে মাথা নাড়ল,
—তাহলে তো এখনই নিতে হচ্ছে।
বলেই এক হাত মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল সে। মেহরীন সঙ্গে সঙ্গে সেই হাতে আলতো একটা চাপড় দিয়ে বলল,
—ফাজলামো না করে গাড়ি চালান।
তালহা হেসে আবার স্টিয়ারিংয়ে মন দিল। গাড়ি ছুটে চলল সামনের পথ ধরে।
সুখ নীড়ের সামনের পুরো জায়গাটাই আজ উৎসবের আমেজে সেজেছে। প্রবেশপথের দুপাশে রঙিন কাপড় আর ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। মাথার ওপর ঝুলছে বড় একটি ব্যানার “সুখ নীড় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান”। সকাল থেকেই একে একে অতিথিরা আসতে শুরু করেছেন। স্থানীয় চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি, ব্যবসায়ী, স্কুলের প্রধান শিক্ষক, কয়েকজন শিক্ষক, মসজিদের ইমাম, সমাজসেবী ও স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এতিমখানার প্রাঙ্গণটি ধীরে ধীরে মুখর হয়ে উঠেছে। আর ছোট ছোট শিশুরা পরিপাটি পোশাকে সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, চোখেমুখে তাদের নতুন দিনের স্বপ্নমাখা উচ্ছ্বাস।
তালহা পরিবারের সবাইকে নিয়ে গাড়ি থেকে নামতেই কয়েকজন আয়োজক এগিয়ে এলেন। ফুলের তোড়া দিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানানো হলো। মেহরীন তালহার পাশে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ চোখে পুরো আয়োজনটা দেখছিল। তালহা এক হাতে আগলে নিল মেহরীনের হাত। তাকে নিয়ে সাবধানে আগ বাড়াল।
কিছুক্ষণ পর সবাইকে নিয়ে মঞ্চে বসানো হলো। সঞ্চালকের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হলো অনুষ্ঠান। সুখ নীড়ের প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য, শিশুদের পড়াশোনা, থাকা-খাওয়া এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা নিয়ে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখলেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক। এরপর মাইক্রোফোন হাতে তালহাকে বক্তব্য দেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো। তালহা ধীর পায়ে উঠে দাঁড়াল। একবার সামনের সারিতে বসে থাকা শিশুদের দিকে তাকাল। ছোট ছোট মুখগুলো তার দিকেই তাকিয়ে আছে। কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখে বলল,
—আসসালামুআলাইকুম সবাইকে। বেশি কিছু বক্তব্য দিব না। শুধু এইটুকু বলবো, এই শিশুগুলোর প্রত্যেকেরই স্বপ্ন আছে। কারও স্বপ্ন ডাক্তার হওয়ার, কারও ইঞ্জিনিয়ার, কারও শিক্ষক, কারও আবার বড় কোনো দায়িত্বে যাওয়ার। আমাদের দায়িত্ব শুধু তাদের মাথার ওপর একটা ছাদ তৈরি করে দেওয়া নয়, তাদের সেই স্বপ্নগুলো পূরণ করার পথটাও তৈরি করে দেওয়া। সুখ নীড় যেন শুধু একটি এতিমখানা না হয়, বরং এই শিশুদের কাছে সত্যিকারের একটি পরিবার হয়ে ওঠে, এটাই আমার প্রত্যাশা।
তালহার বক্তব্য শেষ হতেই চারপাশ করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। সে মাইক্রোফোনটা রেখে দিয়ে সরে আসতে নিতেই সাংবাদিকদের ভিড় থেকে একজন প্রশ্ন করে উঠলেন,
—স্যার, আপনার পত্রিকায় প্রকাশিত ওই নিউজটা পড়ে আমাদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মনেও একটা প্রশ্ন আর কৌতূহল তৈরি হয়েছে। কে সেই বিশেষ মানুষ, যার জন্য আপনি ‘সুখ নীড়’ উৎসর্গ করেছেন?
প্রশ্নটা শুনে তালহার পা থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত নীরব রইল সে। তারপর ধীরে ধীরে একবার মঞ্চের দিকে তাকাল। সবার মাঝে বসে থাকা মেহরীনের চোখের সঙ্গে চোখ মেলাতেই তালহার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। এরপর কোনো দ্বিধা না করে আঙুল তুলে তার দিকেই ইশারা করল ফের মাইক তুলে বলল,
—আমার অর্ধাঙ্গিনী। আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে এই ‘সুখ নীড়’ উৎসর্গ করেছি।
কথাটা শেষ হতেই চারপাশে আবারও করতালির ঢেউ উঠল। কয়েকজন উৎসাহী কণ্ঠ ভেসে এল,
—ভাই, ভাবিকে একসঙ্গে দেখতে চাই!
তালহা হেসে মাথা নাড়ল। তারপর সোজা এগিয়ে গেল মেহরীনের দিকে। মেহরীনের সামনে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। মেহরীন এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল। তারপর সেই বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। দুজনকে একসঙ্গে উঠতে দেখে উপস্থিত মানুষের মধ্যে আবারও উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ল। কেউ হাততালি দিচ্ছে, কেউ শিস বাজাচ্ছে। তালহা খুব সাবধানে মেহরীনকে সঙ্গে নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর সবার উদ্দেশে মৃদু হেসে বলল,
—মিট মাই ওয়াইফ, মিসেস মেহরীন সিকদার মাহা।
মেহরীনের চোখের কোণ তখন ছলছল করছে। সামনে ক্যামেরা, সাংবাদিকদের মাইক্রোফোন। মুহূর্তটা হয়তো কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবাদ হয়ে ছড়িয়ে পড়বে পুরো দেশে। আজ যেন তার এক জীবনের সব অপূর্ণ স্বীকৃতি একসঙ্গে পূর্ণতা পেল। প্রথমে তালহার কাছ থেকে স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে সে। এরপর পেয়েছে তার পরিবারের সামনে সেই মর্যাদা। আর আজ, সবার সামনে, পুরো দেশের সামনে, তালহা নিজে তাকে নিজের অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিল।
মেহরীন নিজ থেকেই ধীরে ধীরে মাইক্রোফোনটা হাতে নিল। একবার গভীর শ্বাস নিয়ে গলা পরিষ্কার করল বলতে লাগল,
—আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আমি মিসেস তালহা সিকদার। আজ আপনাদের সবার সামনে কিছু কথা বলতে চাই। জানি না এমন সুযোগ আবার কবে পাব। তাই আজ একটা গোপন কথা পুরো দেশের সামনে প্রকাশ করতে চাই।
কথাটা বলে মেহরীন একবার তালহার দিকে তাকাল। তালহা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। তবে মেহরীনের শেষ কথায় তার কপালে সামান্য ভাঁজ পড়েছে। কী বলতে যাচ্ছে তার স্ত্রী, সেটা বুঝতে না পেরে সে নীরবে অপেক্ষা করছে। মেহরীন মুচকি হেসে তালহার দিকে ইশারা করে বলল,
—এই যে উনি। নিশ্চয়ই সবাই তাকে চেনেন। একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে অনেকেই তাকে অনুসরণ করেন। কিন্তু উনার আরও একটা পরিচয় আছে, যেটা হয়তো আপনারা জানেন না।
কথাটা শুনে উপস্থিত সবাই আরও কৌতূহলী হয়ে উঠল। ক্যামেরাগুলোও যেন মুহূর্তেই দুজনের দিকে স্থির হয়ে গেল। মেহরীন হাসিমুখে প্রশ্ন করল,
—আপনারা কি সেটা জানতে চান?
চারপাশ থেকে একসঙ্গে উত্তর এল,
—হ্যাঁ!
মেহরীনের মুখের হাসিটা আরও প্রশস্ত হলো বলল,
—উনি একজন আদর্শ স্বামী। একজন আদর্শ মায়ের আদর্শ সন্তান। আর একজন আদর্শ ভাইও।
কিছুক্ষণ থেমে তালহার দিকে তাকিয়ে আবার বলল,
—আমার জীবনে অনেক মানুষ দেখেছি। কিন্তু আমার মিস্টার পারফেক্ট সিকদারের মতো মানুষ একটাও দেখিনি। উনি সবদিক থেকেই পারফেক্ট। বাইরে যেমন সফল, ঘরেও ঠিক তেমনই একজন অসাধারণ মানুষ। আর আমার জীবনের সবচেয়ে বড় পাওয়া, এই সিকদার সাহেব।
মেহরীন থামতেই তালহার ঠোঁটের কোণে গাঢ় হাসি ফুটে উঠল। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার মেহরীনের দিকে। চোখেমুখে এমন এক তৃপ্তি, যেন এত মানুষের সামনে আজ পাওয়া এই কয়েকটি কথাই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পুরস্কার। মেহরীন আবার মাইকের দিকে ফিরল,
—লটারি বলে একটা জিনিস আছে, তাই না? যেটা লাগলে মানুষের জীবনটাই বদলে যায়। আমার জীবনের লটারিটাও আমার সিকদার সাহেব।
চারপাশে মৃদু হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল, সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনছে। সে ফের বলল,
—উনি আমার জীবনে আসার পর থেকে দুঃখ কী জিনিস, সেটাই যেন ভুলে গেছি। এখন আপনারা নিশ্চয়ই বলবেন, নিজের স্বামীর নামে এত গুণগান করছি কেন?
মেহরীন একটু থেমে তালহার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসল বলল,
—আমার স্বামীর যদি এত গুণই থাকে, তাহলে আমি বলব না কেন শুনি?
বলেই ফিক করে হেসে ফেলল সে। সঙ্গে সঙ্গে বাকিরাও হুহু করে হেসে উঠল। হাসি থামিয়ে শেষে একটু দুষ্টু হাসি দিয়ে বলল,
—আজকের জন্য এতটুকুই। আবার সুযোগ পেলে আরও বেশি করে সুনাম করব।
কথা শেষ হতেই চারপাশ দ্বিগুন হাসিতে মুখর হয়ে উঠল। পরক্ষণেই সবাই দাঁড়িয়ে করতালি দিতে শুরু করল। সিকদার বাড়ির কর্তা-কর্তারাও মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছেন তাদের ছেলে আর ছেলের বউয়ের দিকে। চোখেমুখে গর্ব আর আনন্দের ছাপ স্পষ্ট। মেহরীন মাইক্রোফোনটা তালহার হাতে তুলে দিল। তালহা এতক্ষণ এক পলকও যেন তার দিক থেকে চোখ সরায়নি। এবার ধীরে ধীরে পলক ফেলল। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে সামনের দিকে তাকাল। তারপর মেহরীনের হাতটা নিজের হাতে নিয়ে হেসে বলল,
—বউ মানুষ দুই লাইনকে দশ লাইন করে বলতে ভালোবাসে তা আমরা সবাই-ই জানি। আশা করি কেউ বেশি বেশি ভাববেন না এই কথাগুলো নিয়ে। বউ মানুষ হিসেবে একটু মানিয়ে নেবেন।
কথাটায় আবারও হাসির রোল উঠল। তালহা মেহরীনের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে যোগ করল,
—তবে সত্যি বলতে কী, বউয়ের মুখ থেকে নিজের প্রশংসা মানে বিশাল কিছুই। এখন তো মনে হচ্ছে আমি হাওয়ায় উড়ছি।
কথা শেষ করে মেহরীনের হাত ধরে হেসে নিজের জায়গায় গিয়ে বসল তালহা। তার কথায় আবারও একফাঁক হাসির রেশ ছড়িয়ে পড়ল পুরো প্রাঙ্গণে। মুহূর্তের মধ্যেই তাদের দুজনের মধ্যকার সেই মিষ্টি বন্ধনটা যেন সবার চোখে ধরা দিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে একে অপরের দিকে তাকানো, ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা হাসি, সবকিছুতেই যেন এক ধরনের নির্ভরতা মিশে আছে। যা মুগ্ধ করল সবাইকে।
এরপর একে একে বক্তব্য রাখলেন বিল্লাল সাহেব ও আফতাফ সাহেব ও অন্যান্য অতিথিরাও। তাদের বক্তব্য শেষে সবাই মিলে এগিয়ে গেলেন ‘সুখ নীড়’-এর প্রবেশদ্বারের সামনে। গেটের সামনে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে উদ্বোধনের স্থান। মাঝখানে মেহরীনকে রেখে তার দুপাশে দাঁড়াল তালহা ও পরিবারের অন্য সদস্যরা। পাশে উপস্থিত রয়েছেন অন্যান্য অতিথিরাও। সামনে লাল ফিতা বাঁধা। তালহা কাঁচিটা হাতে নিতেই শিশুদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ল। কৌতূহলী চোখগুলো একসঙ্গে স্থির হয়ে গেল তাদের দিকে। কিন্তু সবাইকে অবাক করে তালহা কাঁচিটা নিজের হাতে না রেখে মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিল। মেহরীন বিস্মিত চোখে একবার তার দিকে তাকাল। তালহা মৃদু হেসে শুধু বলল,
—শুভ কাজ তোমার হাত দিয়েই শুরু হোক।
মেহরীনের চোখের কোণে তখন অদ্ভুত এক আলো। কাঁপা কাঁপা হাতে কাঁচিটা নিয়ে সে ফিতায় ধরল। এক মুহূর্তের জন্য চোখ বুজে মনে মনে কিছু একটা চাইল। তারপর কাঁচি চালিয়ে ফিতাটা কেটে দিল। সঙ্গে সঙ্গে করতালিতে মুখর হয়ে উঠল। আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হলো ‘সুখ নীড়’-এর। মেহরীন কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। চোখের সামনে নিজের স্বপ্নটা সত্যি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন ভরে উঠল।
এরপর সবাইকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করা হলো। দরজা পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই মেহরীন যেন অন্য এক জগতে চলে গেল। চারপাশের প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি ঘর, ছোট ছোট বিছানা, পড়ার টেবিল, বইয়ের তাক—সবকিছু সে মুগ্ধ চোখে দেখছে।
এটা শুধু একটা ভবন নয়। এটা তার বহুদিনের স্বপ্ন। একসময় যে স্বপ্নটাকে কেবল কল্পনায় দেখেছিল, আজ সেটাই বাস্তব হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেহরীন ধীরে ধীরে চারপাশ দেখছিল। চোখের সামনে সবকিছু থাকলেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর সবাইকে বসতে দেওয়া হলো। দোয়ার আয়োজন করা হলো। সবাই নীরবে মাথা নিচু করে বসে রইল। দোয়া শেষে পরিবেশটা আবারও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল।
তালহা আর মেহরীন তাহিয়া সহ পরিবারের বাকিরাও সোজা চলে গেল শিশুদের কাছে। তালহা একেকজনের সঙ্গে কথা বলছে। কারও মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে জানতে চাইছে,
—পড়াশোনা কেমন চলছে?
কেউ লাজুক মুখে উত্তর দিচ্ছে, কেউ আবার উৎসাহ নিয়ে নিজের গল্প শোনাচ্ছে। কারও কাছে জানতে চাইছে,
—বড় হয়ে কী হতে চাও?
কেউ বলছে ডাক্তার হবে, কেউ শিক্ষক, কেউ আবার পুলিশ। মেহরীনও একে একে সবার সঙ্গে কথা বলছে। কখনো কারও গাল টিপে দিচ্ছে, কখনো মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। শিশুদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে কখন যে নিজের মধ্যেই হারিয়ে গেছে, সে নিজেও টের পাচ্ছে না। ছোট ছোট মুখগুলো কেন যেন ভীষণ আপন লাগছে তার। বারবার নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ছে। হাসি, গল্প আর আদরে পুরো জায়গাটা তখন মুখর।
এরই মধ্যে একটা ছোট্ট মেয়ে হঠাৎ তালহার হাত ধরে টান দিল। তালহা সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেল। মেয়েটা তার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বলল। তালহা মনোযোগ দিয়ে কথাটা শুনল। তারপর আচমকাই মেহরীনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। পুরো ব্যাপারটা লক্ষ্য করছিল মেহরীন। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো হাসি ফুটে উঠল। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বলল,
—আমাকে নিয়ে কী গবেষণা হচ্ছে শুনি?
তালহা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে মুচকি হেসে বলল,
—ও বলছে, ভাইয়া ওই খয়েরি আপুটা অনেক সুন্দর।
মেহরীনের মুখে সঙ্গে সঙ্গে হাসি ছড়িয়ে পড়ল। সে নিচু হয়ে মেয়েটার গালে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল বলল,
—তুমিও তো খুব মিষ্টি।
মেয়েটা খুশিতে হেসে উঠল। তারপর হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে তালহার দিকে তাকিয়ে আবার মেহরীনের দিকে ফিরে প্রশ্ন করল,
—আপু, এই ভাইয়াটা তোমার কী হয়?
মেহরীন আড়চোখে তালহার দিকে তাকাল। তালহাও তখন বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে। পিচ্চিটা কী উত্তর পায়, সেটা শোনার জন্য তার চোখেমুখেও কৌতূহল। মেহরীন মৃদু হেসে ইংরেজিতে বলল,
—He is my man, who is only interested in his career and me.
কথাটা শুনেই তালহার ঠোঁটের কোণে যে হাসিটুকু ছিল, সেটা আর আটকে রইল না। মুখজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল প্রশস্ত হাসি। কিন্তু বাচ্চা মেয়েটা কিছুই বুঝতে পারল না। ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল,
—আপু, কী বললে? আমি তো ইংরেজি বুঝি না।
মেহরীন হেসে তার দুবাহু আলতো করে ধরে বলল,
—এজন্যই তো তোমাকে অনেক পড়াশোনা করতে হবে। পড়াশোনা করলেই বুঝে যাবে এত অর্থ। তাই আজ থেকে পড়াশোনায় একদম ফাঁকি দেওয়া যাবে না।
মেয়েটা কিছুক্ষণ গম্ভীর মুখে ভাবল। তারপর নিশ্চিত হওয়ার জন্য আবার প্রশ্ন করল,
—পড়াশোনা করলে আমি এটা বুঝতে পারব?
—হুম।
মেহরীনের উত্তর শুনেই মেয়েটা হঠাৎ বলল,
—একটু দাঁড়াও!
তারপর দৌড়ে চলে গেল। মেহরীন আর তালহা দুজনেই অবাক হয়ে তার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটা হাতে একটা কাগজ আর কলম নিয়ে দৌড়ে ফিরে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে কাগজটা মেহরীনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
—তাহলে এটা লিখে দাও। আমি পড়াশোনা শিখতে শিখতে যদি কথাটা ভুলে যাই, তখন তো আর বুঝব না।
মুহূর্তখানেক মেহরীন স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটার দিকে। তারপর তালহা আর সে একসঙ্গে শব্দ করে হেসে উঠল। মেয়েটার এমন সরল যুক্তির কাছে দুজনেরই যেন হার মানতে হলো। হাসতে হাসতেই মেহরীন কাগজটা হাতে নিল। তারপর মেয়েটার বলা কথাটা লিখে দিল। কাগজটা হাতে নিয়ে মেয়েটা এমনভাবে হাসল, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান কোনো জিনিস পেয়ে গেছে।
এবার শিশুদের হাতে নতুন পোশাক, বই, খাতা ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা-সামগ্রী তুলে দেওয়া হলো। সবশেষে সবাইকে দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হলো।
সব আয়োজন শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে এলো। দিনের ব্যস্ততা আর আনন্দ পেছনে ফেলে সিকদার পরিবার সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই বাড়িতে ফিরে এল। সবার শরীরেই ক্লান্তির ছাপ, অথচ মুখজুড়ে অদ্ভুত এক তৃপ্তি। এতগুলো ছোট ছোট মুখ, তাদের হাসি আর আজকের সুন্দর মুহূর্তগুলো যেন সারাদিনের ক্লান্তিকেও মধুর করে দিয়েছে। একে একে সবাই ফ্রেশ হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হলো। কেউ সোফায় গা এলিয়ে দিল, কেউ আবার সারাদিনের এই সেই গল্প করতে শুরু করল। এরই মধ্যে রান্নাঘর থেকে ট্রেতে করে চা নিয়ে হাজির হলো মেহরীন।
বিল্লাল সাহেব অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন,
—সারাদিন অনেক ধকল গেছে। এসে একটু বিশ্রাম না নিয়ে আবার চা বানাতে গেলি কেন? একটু পর বানালেও তো হতো।
মেহরীন মিষ্টি করে হেসে সবার সামনে চায়ের কাপগুলো এগিয়ে দিতে দিতে বলল,
—আমার কোনো ক্লান্তি নেই। আজ আমি এত খুশি যে ক্লান্তিটাই যেন গায়ে লাগছে না। আর আজ কিন্তু আমার স্পেশাল চা বানিয়েছি। খেয়ে বলো তো, কেমন হয়েছে?
বিল্লাল সাহেব মেয়েটার দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে হেসে উঠলেন বললেন,
—পাগলি মেয়ে একটা।
মেহরীনও হেসে ফেলল। সবাই চায়ে চুমুক দিতেই ড্রয়িংরুমটা আবারও ছোট ছোট কথাবার্তা আর হাসিতে মুখর হয়ে উঠল।
—ভাইয়া, মেহেদি আর্টিস্ট কি বসে থাকতে এসেছে নাকি? সেই কখন থেকে তুমি মেহরীনের হাত দখল করে বসে আছো।
তাহিয়ার কথায় তালহা বিরক্ত চোখে তাকাল,
—আমি কি একবারও বলেছিলাম মেহেদি আর্টিস্ট আনতে?
তাহিয়া হতবাক হয়ে বলল,
—তো মেহেদি কে দেবে?
তালহা এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে উত্তর দিল, যেন প্রশ্নটাই অপ্রয়োজনীয়,
—আমি দেব।
—কিইই? তুমি?
তাহিয়ার প্রায় চিৎকার করে ওঠায় তালহা বিরক্তিতে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
—উফ! কানের কাছ থেকে সর তো।
তাহিয়া অসহায় চোখে মেহরীনের দিকে তাকাল। বিয়ে জীবনে একবারই আসে। আর সেই একবারের মেহেদিও যদি তালহার কাঁচা হাতের কারসাজিতে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে তার বান্ধুবির বিয়ে ব্যস্তে যাবে। প্রায় কাঁদো কাঁদো মুখে রিকোয়েস্ট করে সে বলল,
—ভাইয়া, প্লিজ ছাড়ো। নষ্ট হয়ে গেলে কিন্তু ছবি ভালো আসবে না।
তালহা এবার যেন অপমানিত বোধ করল। হাতে ধরা মেহেদির কোনটা ঠিক হবে, সেটা পরীক্ষা করতে করতে ঝাড়ির সুরে বলল,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৯
—এই! আমি এক মাস ধরে ইউটিউব দেখে মেহেদির কোর্স করেছি। শুধু নিজের বউয়ের হাতে সুন্দর করে মেহেদি দিয়ে দেওয়ার জন্য। আর তুই বলছিস আমি নাকি হাত নষ্ট করে ফেলব।
তালহা আর এক মুহূর্তও তার সঙ্গে তর্কে যেতে রাজি নয়। মেহরীনের হাতটা আবার নিজের দিকে টেনে নিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকল,
—এই আম্মু! তোমার বান্দরটাকে নিয়ে যাও তো। আমাদের ডিস্টার্ব করছে…
