প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৯
সাইদা মুন
সন্ধ্যার আবছা আলো গড়িয়ে রাতের দিকে এগোচ্ছে। সারাদিনের ঘুরাঘুরি শেষে তালহা আর মেহরীন এখন ড্রয়িংরুমে পাশাপাশি বসে আছে। সন্ধ্যার দিকেই বাড়ি ফিরেছে দুজন। ফ্রেশ হয়ে পোশাক বদলে কিছুক্ষণ আগে এসে বসেছে তারা। রান্নাঘরে তখন ব্যস্ত তিতলি বেগম। দুজনের জন্য আদা দিয়ে গরম চা বসিয়েছেন চুলায়। চায়ের সুবাস ছড়িয়ে পড়লেও তার মেজাজে বিন্দুমাত্র কোমলতা নেই। বরং রান্নাঘর থেকেই একের পর এক বকাঝকা ছুড়ে দিচ্ছেন,
—তালহা, তুই তো বড়। তুইও ওর সঙ্গে তাল কীভাবে মেলালি? এখন কি বৃষ্টির সময়? এই অসময়ের বৃষ্টি শরীরের জন্য কতটা খারাপ, জানিস না? জ্বর বাধানোর এতই শখ হয়েছে তোদের?
ড্রয়িংরুম থেকে তালহা চেঁচিয়ে বলল,
—আহ আম্মু। এত হাইপার হয়ো না। কিছু হবে না। একদিনই তো।
কথাটা শেষ করার আগেই অদ্ভুত কাকতালীয়ভাবে তালহা আর মেহরীন দুজনেই একসঙ্গে হাঁচি দিয়ে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই হাতে দুটো ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ নিয়ে ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করলেন তিতলি বেগম। টি-টেবিলের ওপর কাপ দুটো নামিয়ে রেখে তিনি ধীরে ধীরে দুজনের দিকে তাকালেন। চোখেমুখে এমন দৃষ্টি, যেন এইমাত্র পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপরাধ করে বসেছে তারা,
—কিছু হবে না, তাই না? এখন হাঁচি দিচ্ছে কে? তোর বাপ কি কবর থেকে উঠে এসে হাঁচিটা দিল?
দুজনই চুপ। তিতলি বেগম থামলেন না,
—নিজেদের কী ভাবিস তোরা? অনেক বড় হয়ে গেছিস, তাই না? নিজেদের মতো করে চলবি, মায়ের কোনো দরকার নেই। তো আমাকে রেখে দিয়েছিস কেন? পাঠিয়ে দে না বাপের বাড়ি। আমার আর ভাল্লাগছে না এই বাড়িতে থাকতে। এতদিন ছেলে মেয়ের কাছে কোনো দাম ছিল না। এখন ছেলের বউয়ের কাছেও দাম নেই।
বলতে বলতে তিনি আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। গজগজ করতে করতে আবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। মায়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল তালহা। তারপর মেহরীনের সঙ্গে চোখাচোখি হতেই দুজনের ঠোঁটের কোণে একসঙ্গে হাসি ফুটে উঠল। শেষ পর্যন্ত ফিক করে হেসেই ফেলল দুজন। রাগী মায়ের সামনে হাসিটা অবশ্য খুব বেশি সময় স্থায়ী হলো না। তিনি ফের আসতেই দুজনেই চুপচাপ নিজেদের চায়ের কাপে চুমুক দিতে শুরু করল।
কিছুক্ষণের মধ্যে একে একে পরিবারের অন্য সদস্যরাও ড্রয়িংরুমে এসে জড়ো হতে লাগলেন। সন্ধ্যার এই সময়টা সিকদার পরিবারের সময়। অফিস থেকে বিল্লাল সাহেব আর আফতাব সাহেবও ফিরে এসেছেন। ফ্রেশ হয়ে এসে তারাও পরিবারের সঙ্গে বসে পড়লেন। সবাই টুকটাক কথা বলছেন। কিছুক্ষণ পর কথার মোড় ঘুরে গেল মেহরীন আর তাহিয়ার দিকে। বিল্লাল সাহেব জানতে চাইলেন,
—আজকের পরীক্ষা কেমন হয়েছে?
তাহিয়া মেহরীন মৃদু হেসে উত্তর দিল,
—অনেক ভালো হয়েছে।
—তো এবার সামনের প্ল্যানিং কী তোমাদের?
তাহিয়া বেশ আগ্রহের সঙ্গেই বলল,
—পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নেব।
মেহরীনও একই কথা বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই তালহা কথার মাঝখানে বলে উঠল,
—মেহরীনের তো ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছে ছিল। ভাবছিলাম, এবার ওর মেডিক্যালের প্রস্তুতি শুরু করুক।
কথাটা শুনেই মেহরীন চমকে তালহার দিকে তাকাল। ডাক্তারি পড়ার ইচ্ছেটা তার ছিল। কত রাত যে সেই স্বপ্নের কথা ভেবে কাটিয়েছে, তার হিসাব নেই। কিন্তু ডাক্তারি পড়ার যে বিশাল খরচ। এই পরিবারের ওপর বাড়তি বোঝা চাপানোর কথা ভেবেই নিজের ইচ্ছেটাকে সে ধীরে ধীরে বুকের ভেতর চাপা দিয়ে দিয়েছিল। তাই দ্রুত মাথা নেড়ে বলল,
—না, না। আমিও পাবলিক যেকোনো ইউনিভার্সিটিতেই পড়ব।
বিল্লাল সাহেব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন,
—কেন?
মেহরীন ইতস্তত করে বলল,
—এমনি তাহিয়ার সঙ্গে।
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই তাহিয়া তাকে থামিয়ে দিল বলল,
—তোর নিজের ইচ্ছে কোনটা, সেটা বল।
মেহরীন চুপ করে গেল। তালহা এবার মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
—তোমাদের ছেলের বউ আমাকে ফকির মনে করে।
কথাটা শুনে ঘরের সবাই একসঙ্গে তার দিকে তাকাল। হালকা হাসল সকলে। মেহরীনও অপ্রস্তুত হয়ে ইতস্তত চোখে তালহার দিকে তাকাল। তালহা এবার সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে বলল,
—তোমাকে টাকার চিন্তা করতে কে বলে? ইনকাম কার জন্য করি আমি? অন্য কারো বউ পালার জন্য?
মেহরীন আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। ধীরে ধীরে মাথাটা নিচু হয়ে গেল তার। তালহার কথায় তিতলি বেগমও এবার কোমল হলেন। ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে মেহরীনের দিকে ফিরে বললেন,
—মেহরীন, তালহা তোর স্বামী। তোর প্রয়োজনীয় সবকিছু দেওয়ার দায়িত্ব তার। আর আল্লাহ দিলে আমার ছেলের অবস্থাও অনেক ভালো, এমন না যে বউয়ের ডাক্তারি পড়ার খরচ চালাতে তার কষ্ট হবে। বরং সে অনায়াসে চালাতে পারবে। তাহলে এত চিন্তা কিসের?
মেহরীন এবার ধীরে ধীরে মাথা তুলল। বুকের ভেতর জমে থাকা সংকোচটা যেন একটু একটু করে হালকা হয়ে গেল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৃদু স্বরে বলল,
—তাহলে আপনার ছেলে যা ভালো মনে করে।
তালহার ঠোঁটের কোণে তখন তৃপ্তির হাসি। শেষ পর্যন্ত তার বউ নিজের স্বপ্নটা বেছে নিয়েছে। এরপর সিদ্ধান্ত হলো তাহিয়া আর মেহরীন দুজনকেই কোচিংয়ে ভর্তি করানো হবে। তাহিয়া প্রস্তুতি নেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য, আর মেহরীন শুরু করবে মেডিক্যালের প্রস্তুতি। কথাবার্তা যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন হঠাৎ দাদি মেহরীনের বিয়ের প্রসঙ্গ তুললেন।
—এখন তো মেহরীনের পরীক্ষা শেষ। ওদের বিয়ের অনুষ্ঠানটা এবার করে ফেললে কেমন হয়? বেশি দেরি করা উচিত হবে না।
কথাটা উঠতেই ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই বদলে গেল। কয়েক জোড়া চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল। তালহাও যেন কথাটা শোনার অপেক্ষাতেই ছিল। সঙ্গে সঙ্গে সায় দিয়ে বলল,
—আমিও সেটাই বলতে চাচ্ছিলাম। তাদের রেজাল্ট দেওয়ার আগেই বিয়ের কাজটা সেরে রাখলে ভালো হয়। এরপর এডমিশনের পড়াশোনায় ঢুকে গেলে তখন আর এসব নিয়ে ঝামেলা থাকবে না।
বিল্লাল সাহেব যেন সিদ্ধান্তটা পাঁকা করে দেওয়ার জন্য বললেন,
—তাহলে দেরি কিসের? লাগাও বিয়ে!
আফতাব সাহেবও হেসে উঠলেন উচ্ছ্বাসে বললেন,
—হ্যাঁ, লাগাও বিয়ে। সিকদার বাড়ির দ্বিতীয় বিয়ে বলে কথা। পুরো এলাকা জানবে।
মুহূর্তের মধ্যেই বাড়িটা যেন আনন্দে ভরে উঠল। কে কীভাবে আয়োজন করবে, কবে দিন ভালো, কতজনকে দাওয়াত দিতে হবে, এসব নিয়েই তাদের আলোচনা শুরু হয়ে গেল। মেহরীন চুপচাপ বসে সব শুনছিল। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে আটকাল তালহার চোখে। তালহা সেই কখন থেকে একদৃষ্টিতে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। চোখাচোখি হতেই মেহরীনের ঠোঁটে অপ্রস্তুত হাসি ফুটে উঠল। এত মানুষের সামনে তালহার এমন নির্লজ্জ দৃষ্টি সহ্য করতে না পেরে সে ধীরে ধীরে পাশ থেকে উঠে যাওয়ার চেষ্টা করল। কিন্তু এক পা এগোতেই টান পড়ল হাতে। মেহরীন থেমে গেল। পেছনে ফিরতেই দেখল, তালহা তার চুড়ি টেনে ধরেছে। মেহরীন ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। তালহার মুখে তখন দুষ্টু এক হাসি। কোনো কথা না বলেই সে চুড়িটা ধরে আরেকটানে মেহরীনকে আবার নিজের পাশে বসিয়ে দিল। মেহরীন হতভম্ব চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষন। আর তালহা? সে যেন কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গিতে আবার পরিবারের কথোপকথনে মন দিল।
সকলের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত ও হিসাব-নিকাশ শেষে বিয়ের তারিখ নির্ধারিত হলো আগামী মাসে। তিতলি বেগম কালই মেহরীনকে সাথে নিয়ে যাবেন গয়না গড়াতে দেওয়ার উদ্দেশ্যে। ওদিকে বিল্লাল সাহেব ও আফতাব সাহেব বসেছেন নিমন্ত্রণপত্রের তালিকা তৈরিতে, যাতে ভুলবশত কোনো আত্মীয় বা পরিচিতজন বাদ না পড়েন, তাই আগেভাগেই সেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছেন। দাদিও পিছিয়ে নেই, তিনি বোনদের ফোনে কল দিয়ে নাতির শুভ পরিণয়ের খবর জানাতে ব্যস্ত।
খাওয়াদাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত সিকদার বাড়িতে বিয়ের জোরদার তোড়জোড় চলতে লাগল। খাওয়াদাওয়ার পর্ব চুকিয়ে সবাই নিজ নিজ কক্ষে ফিরতেই হইচই শেষ হলো। সুযোগ বুঝে মেহরীনও এবার কফির মগ হাতে হাজির হলো তার ভবিষ্যৎ ঘরে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসল। আর কটা দিন পরই এই ঘর তার ও।দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরে প্রবেশ করেই সে বুঝতে পারল তালহা বাথরুমে। অমনি তার মাথায় এক দুষ্টু বুদ্ধি চেপে বসল। কফির মগটি ঢেকে রেখে সে নিঃশব্দে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ধীরহস্তে বাথরুমের সুইচটি বন্ধ করে দিয়ে ঠোঁট কামড়ে অপেক্ষা করতে লাগল তালহার আর্তচিৎকার শোনার আশায়। কিন্তু দীর্ঘ পাঁচ মিনিট পার হয়ে গেলেও ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ মিলল না। মেহরীন কৌতূহল সামলাতে না পেরে দরজায় হালকা টোকা দিয়ে মৃদু স্বরে বলল,
—এই, আপনি ঠিক আছেন?
ভেতর থেকে তখনও কোনো উত্তর এলো না। এবার সে খানিকটা চিন্তিত হয়ে পড়ল। জোরে জোরে দুইবার দরজায় করাঘাত করতেই আচমকা তড়িৎবেগে দরজা খুলে একটি হাত বেরিয়ে এলো। পলক ফেলার আগেই হাতটি মেহরীনকে এক টানে ভেতরে নিয়ে বাথরুমের দরজা আবার বন্ধ করে দিল।
হঠাৎ এই কাণ্ডে মেহরীনের নিঃশ্বাস যেন আটকে এলো। অন্ধকার বাথরুম, তার ওপর এমন আকস্মিক পরিস্থিতি। আবার তালহা তার হাত দুটি দরজার সাথে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। দুজনের দূরত্ব এতটাই কম যে, তালহার তপ্ত নিঃশ্বাস মেহরীনের চোখে-মুখে এসে পড়ছে। পরিস্থিতি বুঝতে একটু সময় লাগল। তবে আস্তে আস্তে মেহরীন স্বাভাবিক হয়ে এলো সে। ভীত গলায় বলল,
—কেউ এভাবে ভয় দেখায়? আমার তো প্রাণটাই বেরিয়ে যাচ্ছিল!
তালহা আরও খানিকটা কাছে এলো। মেহরীনের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল,
—প্রাণ যদি চলেও যেতে চাইত, আমি তা আটকে রাখতাম।
মেহরীন কিছুটা ইতস্তত করে নড়েচড়ে ওঠার চেষ্টা করল,
—ছাড়ুন আমাকে।
তালহা এবার বেশ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল,
—একদম নয়। লাইট বন্ধ করার শাস্তি তো পেতেই হবে।
মেহরীন থমকে গিয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল,
—আ…আমি তো ভেবেছিলাম ভেতরে কেউ নেই, তাই আলোটা নিভিয়ে দিয়েছিলাম..
কথাটা আর শেষ হতে পারল না। অন্ধকারেই তালহা অতি সূক্ষ্মভাবে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। আকস্মিক এই স্পর্শে মেহরীন একদম আড়ষ্ট হয়ে গেল। তাকে নির্জীবের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তালহা পুনরায় একই কাজ করল, এবার স্পর্শটা ছিল আরও কিছুটা গভীর ও স্পষ্ট। মেহরীন যেন এক মূর্তিতে পরিণত হয়ে অন্ধকারে গোল গোল চোখে চেয়ে রইল। অন্ধকারে মেহরীনের অভিব্যক্তি দেখা না গেলেও তালহা তা ঠিকই অনুভব করতে পারল। সে হালকা হেসে মেহরীনের নাকে, কপালে এবং গালে একের পর এক ভালোবাসার পরশ এঁকে দিতে লাগল। সম্পূর্ণ মুখমণ্ডল নরম স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে দিতে দিতে সে কখন যে তার গলায় নেমে এলো, তা হয়তো দুজনের কেউই টের পায়নি। গলায় উষ্ণ স্পর্শ পেতেই মেহরীন শিউরে উঠে তালহার চুল আঁকড়ে ধরল এবং তাকে দূরে সরানোর চেষ্টা করল। তবে তালহা সরল না। গলার ভাঁজে ঠোঁট রেখেই সে অনুচ্চ স্বরে আশ্বাস দিল,
—I’ll stay gentle, believe me.
মেহরীনের হাতের বাঁধন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে এলো। তালহা সযত্নে মেহরীনের গলা, ঘাড় ও চিবুকে আদর এঁকে দিতে লাগল। ধীরে ধীরে সে যখন আরেকটু নিচে নেমে এলো, মেহরীন সামান্য কেঁপে উঠল। তালহা সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। ঘন নিঃশ্বাস ছেড়ে সে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে মেহরীনকে এক টানে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। দরজা খুলতেই ঘরের আলো এসে বাথরুমের অন্ধকারের ওপর পড়ল।
তালহার দৃষ্টি আটকে আছে লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠা মেহরীনের মুখশ্রীর ওপর। লাজুক মেয়েটি লজ্জায় চোখ তুলে তাকাতেও পারছে না। তালহা ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি রেখে তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো। ড্রেসিংটেবিলের আয়নার সামনে মেহরীন একপ্রকার সংকুচিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তালহা তার ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তার হাতে ছিল একটি হার্ট পেন্ডেন্ট। সেটির হুক খুলে সে সযত্নে মেহরীনের গলায় পরিয়ে দিল। তারপর আয়নায় চোখ রেখে বলল,
—দিস প্রিটি পেন্ডেন্ট ফর মাই প্রিটি লেডি। পছন্দ হয়েছে?
মেহরীন অবাক চোখে আয়নার দিকে তাকাল। নজর গেল নিজের গলায়, চকিতে হাত দিয়ে লকেটটি স্পর্শ করল সে। ভারী সুন্দর একটা পেন্ডেন্ট। মুহূর্তেই তার ঠোঁটে স্নিগ্ধ হাসি ফুটে উঠল। আয়নায় তালহার চোখের দিকে তাকিয়ে উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলল,
—খুব পছন্দ হয়েছে।
তালহা তৎক্ষণাৎ ড্রেসিংটেবিলের দিকে ইঙ্গিত করল। মেহরীন আয়না থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিচে তাকাতেই বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। একটি বড় কালো বক্স, যার কাচের স্বচ্ছ ঢাকনার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছে নানা রঙের রেশমি চুড়ি। আর উপরের কালো ভেলভেটের ওপর সোনালি অক্ষরে খোদাই করা রয়েছে ‘মেহরীন’ নামটা। সে অবাক চোখে মাথা ঘুরিয়ে প্রশ্ন করল,
—এটা আমার জন্য?
তালহা বাক্সটি খুলতে খুলতে বলল,
—তোমার ছাড়া আর কারই বা হতে পারে?
বাক্সটি মেহরীনের সামনে মেলে ধরে সে শুধাল,
—পছন্দ হয়েছে?
মেহরীন আনন্দে কয়েকবার মাথা নাড়তেই সে আরেকটি ছোট্ট কালো বক্স বের করল। বক্সটা দেখতে সাধারণ কোনো চেইনের বাক্সের মতো। মখমলের গায়ে এটায় ও সোনালি অক্ষরে খোদাই করা, ‘মেহরীন”। মেহরীন আরও অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করল,
—এটাও আমার?
তালহা শুধু মাথা নেড়ে মৃদু হেসে বলল,
—খুলো।
মেহরীন খুব সাবধানে ঢাকনাটা তুলল। ঢাকনা টান দিতেই ভেতরের বাক্সটা ধীরে ধীরে চারদিকে প্রসারিত হয়ে গেল। একটির পর একটি করে চারটি তাক একে একে খুলে গেল। প্রতিটি তাকে চার জোড়া করে সাজানো মোট ষোলো জোড়া ঝুমকা। প্রতিটি জোড়াই আলাদা ডিজাইনের। মেহরীনের বিস্মিত দৃষ্টি ধীরে ধীরে গিয়ে থামল তালহার মুখে প্রশ্ন করল,
—এতগুলোও আমার?
তালহা পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বলল,
—আমার ষোড়শী বধুর জন্য ষোলো জোড়া ঝুমকো আর কাঁচের চুড়িভরা এক বাক্স ভালোবাসা।
মেহরীন আনন্দে কেঁদে ফেলবে ভাব। এক হাতে কাঁধে থাকা তালহার গালটা আগলে ধরল বলল,
—কিন্তু আমি তো এখন আঠারো..
তালহা সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—তুমি ষাটোর্ধ হলেও আমার চোখে সেই ষোড়শী বধুই রয়ে যাবে।
মেহরীন মুচকি হেসে ফেলল বলল,
—অনেক, অনেক ধন্যবাদ।
তালহা কপাল কুঁচকে কৃত্রিম অসন্তোষ প্রকাশ করল,
—এমন শুকনো ধন্যবাদে আমার চলবে না।
মেহরীন ভ্রু তুলে জিজ্ঞেস করল,
—তাহলে?
—আমার সিক্ত ও সজীব ধন্যবাদ চাই।
কথাটা শুনে মেহরীন না হেসে পারল না। সে তাকে ছেড়ে দাঁড়াল৷ দু-পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে সামান্য উঁচিয়ে উঠে তালহার গালে আলতো করে একটি চুম্বন এঁকে দিল। তারপর চুড়ি ও ঝুমকার বাক্স দুটো নিয়ে দরজার দিকে একছুটে পালিয়ে গেল। তার পথের দিকে তাকিয়ে তালহা মাথায় হাত বুলিয়ে আপন মনেই হেসে ফেলল।
সকালের নাস্তার টেবিলে বসে আছেন সকলেই। নাস্তা সেড়ে চা খাচ্ছেন বিল্লাল সাহেব হাতে নিউজপেপার আচমকাই জোরে বলে উঠলেন,
—আজকালের দিনেও যে এমন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা বেঁচে থাকে, জানা ছিল না!
আফতাব সাহেব কৌতুহলী হওয়ার ভান করে জিজ্ঞেস করলেন,
—কী হয়েছে, ভাইজান?
বিল্লাল সাহেব হাতের খবরের কাগজটা আফতাব সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে আড়চোখে তালহার দিকে তাকালেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন,
—দেখ, কে যেন নিজের ভালোবাসার জন্য ‘সুখ নীড়’ নামে একটা এতিমখানা বানিয়ে ফেলেছে।
আফতাব সাহেব চমকানো ভাব নিয়ে বলল,
—বলো কি এতদিন তো ইতিহাপড়ে এসেছি সম্রাট শাহজাহান তার ভালোবাসার জন্য তাজমহল বানিয়েছেন। এখন কি তবে ইতিহাস বদলাবে।
তাদের কথা শুনে উপস্থিত সকলের মাঝেই কৌতুহল জেগে উঠল। নামটা শোনামাত্রই মেহরীনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল, চেনা একটা শিহরণ বয়ে গেল সারা শরীরে। সে আগ্রহ সামলাতে না পেরে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে খবরের কাগজটি হাতে নিল। পত্রিকার পাতায় ফুটে থাকা ‘সুখ নীড়’ নামের দোতলা বাড়িটির ছবিতে নজর গেল তার পাশে লেখা,
“দৈনিক জনকণ্ঠ
বিশেষ সংবাদ
“সুখ নীড়” পথশিশু ও এতিম শিশুদের জন্য নতুন আশ্রয়স্থল উদ্বোধন। আগামী শুক্রবার আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে “সুখ নীড়” নামে একটি আধুনিক এতিমখানা। সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত অর্থায়নে নির্মিত এই প্রতিষ্ঠানটি অসহায় ও এতিম শিশুদের নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, এখানে শুধু আশ্রয়ই নয়, প্রতিটি শিশুকে পরিবারের মতো পরিবেশে বড় করে তোলার ব্যবস্থা থাকবে। তাদের শিক্ষা, নৈতিক মূল্যবোধ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার জন্য প্রয়োজনীয় সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটির নামকরণ প্রসঙ্গে কর্তৃপক্ষ বলেন,
“একজন বিশেষ মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন ছিল এমন একটি ঘর, যেখানে কোনো শিশুই নিজেকে এতিম মনে করবে না। সেই স্বপ্নের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই এই আশ্রয়স্থলের নাম রাখা হয়েছে ‘সুখ নীড়’।”
প্রতিষ্ঠাতার পরিচয় প্রকাশ করতে অনুরোধ করা হলে তিনি বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি শুধু একটি বাক্য সংবাদমাধ্যমের কাছে পৌঁছে দিতে বলেন,
“কিছু উপহার করতালির জন্য নয়, প্রিয় মানুষের মুখের এক চিলতে হাসির জন্য।”
এতদিন দেখেছি, সম্রাট শাহজাহান ভালোবাসার স্মারক হিসেবে মুমতাজ মহলের জন্য নির্মাণ করেছিলেন তাজমহল। আজ এই দিনে এসে এক ভদ্রলোক তাঁর ভালোবাসার স্বপ্নকে বাস্তব রূপ দিতে নির্মাণ করেছেন ‘সুখ নীড়’, এতিম শিশুদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল। একজন ভালোবাসাকে স্মৃতিতে অমর করেছেন,
প্রেমসন্ধিক্ষন পর্ব ৭৮
আরেকজন ভালোবাসাকে আশ্রয়ে পরিণত করেছেন। বেঁচে থাকুক এমন ভালোবাসা, যুগের পর যুগ।”
মেহরীনের হাত রিতীমত কাঁপছে। সে বিস্মিত চোখে চাইল তালহার দিকে। সে মুচকি হেসে বলল,
—আম্মু সামনের শুক্রবারেই উদ্বোধন, তোমার ছেলের বউকে বউ সাজিয়ে দিও…
