নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৫
রূপন্তী সরকার
ইয়াশফা একটা কথাও বলল না। ওর মুখে কোনো ধরনের প্রতিক্রিয়া নেই, ও একদম পাথরের মতো নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওপরের রুমে তখন ছোট ইয়ান শুয়ে আছে, আর ওর পাশে একলা ঘরে পাহারা দিয়ে বসে আছে রাহা।
এইদিকে নিচতলা থেকে রিদ সবাইকে সাথে নিয়ে ওপরের ওই রুমটার দিকে গেল। ওহিদুল ও ইউভানসহ দুই পরিবারের সবাই একজোট হয়ে ঘরের ভেতর এসে দাঁড়াল। ইউভান এখন একদম চুপ হয়ে আছে।
ও নিজের টলমল চোখে একভাবে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লাল বেনারসি পরা ইয়াশফার দিকে। ওর ভেতরের ভাঙা মনটা কিছুতেই এই সত্যিটা মেনে নিতে পারছিল না।ইয়াশফা নিজের মাথা নিচু করে ঘরের এক কোণায় থাকা চেয়ারটায় বসে রইল। ঋষভ পুরোটা সময় ইয়াশফাকে চোখে চোখে রাখছিল, ও হুট করেই ইউভানের ওই একনাগাড়ে তাকিয়ে থাকার বিষয়ট লক্ষ্য করল। ও সবার সামনেই ইউভানের দিকে আঙুল তুলে কড়া গলায় চেঁচিয়ে বলে উঠল, “আজকে থেকে ও তোর মা হয়! খবরদার, ওর দিকে অন্য কোনো নজরে তাকালে আই সোয়ার, তোর চোখ আমি তুলে নেবো!”
ঋষভের মুখ থেকে সবার সামনে এমন কথা শোনা মাত্রই ঘরের ভেতরে থাকা বাকি সবাই একদম চমকে ওর দিকে তাকাল। ইউভান ওভাবে সবার সামনে আচমকা এমন নোংরা অপমানে বড্ড অপ্রস্তুত আর লজ্জিত হয়ে নিজের মুখটা নিচু করে ফেলল। ওহিদুল সাহেবও নিজের ছেলের এই অপমানে নিজের চোয়াল শক্ত করলেন। উনি রেগে গিয়ে বললেন “তিন বছর কই ছিলো ওর এতো ভালোবাসা? তখন তো বউয়ের খোঁজ ও নেই নি। আর এখন এসে নাটক করছে?”
ঋশের মুখের রং পাল্টে গেলো। চোখ দুটো বড় বড় করে তাকালো ওহিদুলের দিকে।
রিদ এবার ঋশের এই মেজাজ দেখে সোফা থেকে একটু সোজা হয়ে বসে কড়া গলায় ডাকল, “ঋশ!”
ঋষভ রিদের দিকে তাকাতেই রিদ ওকে নিজের চোখের ইশারায় শান্ত হয়ে থামতে বলল, ও ইশারায় বোঝাল যে এখন হুলস্থুল করার সময় নয়। রিদ এবার ঘরের থমথমে পরিবেশটা হালকা করার জন্য দুই পরিবারের সবার উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে বলল, “আচ্ছা, অনেক তো নাটক হলো। এবার বলুন, তিন বছর ধরে কার মনে কী কী প্রশ্ন জমে আছে? কার মনে কী খটকা আছে, সব আজ খোলাখুলি জিজ্ঞেস করুন।”
ওদের সবার মাঝখান থেকে জ্যোতি এক পা এগিয়ে এলো। ও ঋষভের চোখের দিকে তাকিয়ে কৌতূহল মাখা গলায় প্রশ্ন করল, “ঋশ ভাইয়া তিন বছর আগে ইয়াশফাকে এভাবে একা রেখে হুট করে চলে গিয়েছিল কেন? ও নিজের পুরো পরিবারকে এভাবে না বলে একা ফেলে কেন নিখোঁজ হয়েছিলো?”
জ্যোতির এই মোক্ষম প্রশ্ন শোনা মাত্রই ঘরের চারদিকের নীরবতা আরও গভীর হয়ে উঠল। রিদ এবার ঋশকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে নিজেই গম্ভীর গলায় বলল, “আচ্ছা, এটার উত্তর ঋশ নয়, আমি নিজে দিচ্ছি। কারণ সব কিছুর পিছনে আমিই ছিলাম”
সবাই তখন ড্রয়িংরুমে থমথমে মুখে বসে ছিল। পিনপতন নীরবতার মাঝে রিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবারো বলতে লাগলো, “ঋশ আসলে একজন আন্ডারকভার এজেন্ট। ও সবার সামনে স্রেফ একজন ভার্সিটি স্টুডেন্ট হিসেবে চলাফেরা করলেও, আড়ালে ওর আসল পরিচয় আর কাজ সম্পূর্ণ আলাদা। ও একটা বিশেষ মিশনের দায়িত্বে ছিলো। এটা আমি শুরু থেকেই জানতাম, কিন্তু পরিবারের বাকিদের কাছে ওর এই ব্যাপারটা পুরোপুরি অজানা ছিল।”
রিদের মুখ থেকে এমন একটা অবিশ্বাস্য সত্যি শুনে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লো। ঘরের সবাই স্তব্ধ হয়ে রিদের দিকে তাকালো। মিহি তো বিস্ময়ে বড় বড় চোখ করে চেয়ে আছে, যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছে না।পাশে বসা রুহি আর নিজের কৌতুহল চেপে রাখতে পারলো না। সে সোজা হয়ে বসে অবাক গলায় বললো, “এটা কী করে সম্ভব পাপা? তুমি এতো বড় একটা বিষয় আমাদের কে বলো নি এতোদিন? মাথা ঘুরছে আমার”
জ্যোতি পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য রুহির হাতে আলতো চাপ দিয়ে থামিয়ে দিলো। তারপর রিদের দিকে তাকিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে বললো, “হুম, তারপর কী হলো বলুন?”
রিদ টেবিল থেকে পানির গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক ঢোক পানি খেলো। নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে নিয়ে সে আবার বলতে শুরু করলো, “ঋষভের এই মিশনে যাওয়ার কথা ছিল অনেক আগে থেকেই। ও নিজের কাজের ঝুঁকিটা খুব ভালো করেই জানতো। তাই ও কখনো চায়নি মিশন চলাকালীন অন্য কারো সাথে নিজের জীবন জড়াতে বা কাউকে বিপদে ফেলতে। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু চেয়েছিল। মুগ্ধর বিয়েতে গিয়ে হুট করেই ইয়াশফার সাথে ওর বিয়েটা হয়ে যায়। আর পরিস্থিতির ফেরে ইয়াশফাও জড়িয়ে পড়ে ঋষভের এই রহস্যময় জীবনের সাথে।”
রিদ একটু থামতেই বাড়ির সবাই একে অপরের দিকে তাকিয়ে হালকা একটু কেশে উঠলেন। ইয়াশফা কোনো কথা কানে নিচ্ছে কিনা কে জানে, ও একভাবে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই ওর। রিদ সেদিকে খেয়াল করেও না দেখার ভান করে মৃদু হেসে বলতে লাগলো, “বিয়ের পর স্বাভাবিকভাবেই ঋষভের মিশনে যাওয়ার প্ল্যানটা সাময়িকভাবে থমকে দাঁড়ায়। এজেন্সির নিয়ম আর নিজের কর্তব্যের খাতিরে ও তখন আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, ইয়াশফার প্রতি যেন ওর কোনো রকমের দুর্বলতা তৈরি না হয়। ও নিজেকে সবসময় দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতো”
এটুকু বলে রিদ একটা ছোট দীর্ঘশ্বাস ফেললো,
“কিন্তু মন তো আর নিয়মের বেড়াজাল মানে না! দিন যত যাচ্ছিল, ও মনে মনে বুঝতে পারছিল যে ও ইয়াশফার প্রতি প্রচণ্ড অবসেসড হয়ে যাচ্ছে। শত চেষ্টা করেও ও নিজের মনকে আটকাতে পারেনি। ঠিক এমন একটা টানাপোড়েনের মাঝেই আচমকা ওর মিশনের একদম শেষ সময় ঘনিয়ে আসে। দেশের স্বার্থে আর কর্তব্যের টানে ও তখন বাধ্য হয়েই ইয়াশফাকে ছেড়ে চলে যায়।”
এতক্ষণ মিহি চুপচাপ সব শুনছিল, এবার সে কিছুটা ক্ষোভ আর কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলো, “তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু ও যাওয়ার আগে ইয়াশফাকে সবটা খুলে বলে যেতে পারতো না? নিজের ঘরের বউয়ের কাছে এতো বড় একটা সত্যি লুকিয়ে রাখার কী দরকার ছিল?”
রিদ মিহির দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বুঝিয়ে বলার ভঙ্গিতে বললো, “ঋশ চেয়েছিল বিষয়টাকে একদম গোপন রাখতে। কারণ আন্ডারকভার মিশনের নিয়মই এটা। একটা ছোট ভুল, একটা অসতর্কতা বা সামান্য তথ্য ফাঁসও শুধু ঋশের নয়, এই বাড়ির সবার জীবনকে বড়সড় ঝুঁকিতে ফেলে দিতো। তবে হ্যাঁ, ও দূরে গেলেও ইয়াশফাকে নিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত চিন্তিত থাকতো। আর সেই কারণেই ও যাওয়ার আগে ইয়াশফার ঘরে, ওর গলার চেইনে এবং এমনকি হাতের আংটিতেও হিডেন ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়ে গিয়েছিল
শুধুমাত্র ওর সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে।”
কথাটা শোনামাত্রই ইয়াশফা চমকে উঠলো। সে এক অদ্ভুত আতঙ্ক আর বিস্ময় নিয়ে হুট করে নিজের গলা আর হাতের আঙুলগুলো চেক করতে লাগলো, যেন এখনো সেখানে ক্যামেরাগুলো লুকিয়ে আছে।
ওর এই অপ্রস্তুত কাণ্ড দেখে রিদ আর হাসি চেপে রাখতে পারলো না। সে মৃদু হেসে অভয় দেওয়ার সুরে বললো, “আরে শান্ত হও, ক্যামেরাগুলো এখন আর সেখানে নেই। ওগুলো আমি নিজেই খুঁজে বের করে নষ্ট করে দিয়েছি।”
রিদ যখন ক্যামেরা নষ্ট করার কথা বললো, তখন ঋশ বেশ কটমট করে, রাগী দৃষ্টিতে তাকালো রিদের দিকে। ঋশের সেই চাউনি দেখে রিদ বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে বরং বেশ শব্দ করে হেসে উঠলো।
রিদ হেসে বললো, “এখানে অবশ্য আমি একটু নিজের চাল চেলেছিলাম। ঋশ যখন মিশনে যায়, ও কিন্তু পুরো বাড়ি কড়া সিকিউরিটি দিয়ে মুড়ে রেখে গিয়েছিল, যাতে ইয়াশফার বা বাড়ির কারো কোনো ক্ষতি না হয়। কিন্তু ও চলে যাওয়ার ঠিক দুই মাসের মাথায় আমি আড়ালে বসে নিজের গেম খেলা শুরু করি।”
রিদের মুখে এমন চক্রান্তের কথা শুনে এবার খোদ ঋশও অবাক হয়ে গেল। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়লো। সে অত্যন্ত কৌতুহলী আর সংশয়ভরা দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকালো যেন জানতে চাইছে রিদ আসলে কী করেছিল।
রিদ ছেলের মনের ভাব বুঝতে পেরে একটু নড়েচড়ে বসলো। তারপর রহস্যময় হেসে বলতে লাগলো, “আমি আসলে ঋশের ওই চামচাগুলোকে… ওহ সরি, আই মিন ওর বিশ্বস্ত গার্ডগুলোকে এক এক করে নিজের দলে টেনে নিই। এরপর আমি ঋশের সাথে বাড়ির সবার সব ধরনের কন্টাক্ট একদম অফ করে দিই। ফলে ঋশ ওখান থেকে কোনোভাবেই এই বাড়ির ভেতরের কোনো খবর পাচ্ছিল না। আর এসব করার আগে আমি ঋশের ব্রেনওয়াশ করি, এই বলে যে ওর এতো সিকিউরিটি গার্ডের জন্য ইয়াশফা ও বাড়ির সকলের আরো ক্ষতি হবে, আর ঋশ ও সব মেনে নিলো। আসল কথা হলো, ও ইয়াশফার পুরো দায়িত্বটা আমার ওপর ছেড়ে দিলো। মানে ও সব সময় আমার থেকেই খোঁজ নেওয়া শুরু করলো। ও আমাকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করতো। আর আমি সেই অন্ধ বিশ্বাসের পুরো সুযোগটাই নিলাম।”
এটুকু বলে রিদ একটু থামলো। ঘরের বাকি সবার চোখ তখন রিদের ওপর আটকে আছে। রিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের আসল উদ্দেশ্যটা পরিষ্কার করলো, “আমি আসলে খারাপ কিছু চাইনি। আমি চেয়েছিলাম ঋশ যেন এই বাড়ির চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে পুরো সময় আর মনোযোগটা নিজের মিশনে দিতে পারে। প্রথমে আমি যেভাবে চেয়েছিলাম, সবকিছু ঠিক সেভাবেই ছক মেনে এগোচ্ছিল। কিন্তু একটা জায়গায় এসে আমার পুরো হিসাব ওলটপালট হয়ে যায়। আমি তো স্বপ্নেও ভাবিনি যে মিশন শেষ হওয়ার পরও ঋশ আর কোনোদিন আমাদের মাঝে, বা ইয়াশফার কাছে ফিরে আসতে চাইবে না! ও নিজেকে সবার থেকে গুটিয়ে নিচ্ছিল। আর ঠিক এই কারণেই, নিজের ছেলেকে বাধ্য হয়ে এই পরিবারে আর ইয়াশফার জীবনে টেনে ফিরিয়ে আনার জন্য আমাকে শেষমেশ ইয়াশফার আবার বিয়ে দেওয়ার এই নাটক টা সাজাতে হয়েছিল।”
জ্যোতি এবার সোজা ঋশভের দিকে তাকিয়ে বেশ স্পষ্ট গলায় প্রশ্ন করলো, “আচ্ছা ঋশ ভাইয়া, সবকিছু তো বুঝলাম। কিন্তু মিশন শেষ হওয়ার পরও আপনি কেন ফিরে আসতে চাননি ইয়াশফার কাছে? কী এমন কারণ ছিল?”
রিদ জ্যোতিকে থামিয়ে দিয়ে একটু হালকা সুরে বললো, “জ্যোতি, এটাও কি আমিই বলে দেবো?”
জ্যোতি এবার একটু রাগি চোখে রিদের দিকে তাকিয়ে বললো, “আরে না, সব কথাই যদি আপনি বলে দেন, তাহলে ঋশ ভাইয়া নিজে কী বলবে? আমরা উনার নিজের মুখ থেকেই আসল সত্যিটা শুনতে চাচ্ছিলাম।”
রুহি বললো “হ্যাঁ ভাইয়া তুমি বলো”
ঋশ তখন দুই আঙুলে নিজের কপালটা চেপে ধরেছিল। সে বেশ ক্লান্ত গলায় রিদের দিকে তাকিয়ে বললো,
“পাপাই বলুক… আমার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা করছে।”
ছেলের মুখের ক্লান্তি দেখে রিদ আর কথা বাড়ালো না। সে পরিবেশটা স্বাভাবিক করার জন্য বললো, “আচ্ছা ঠিক আছে, এটা বাদ দাও। এই অধ্যায়টা পরে কোনো এক সময় শুনো।”
কিন্তু জ্যোতি সহজে দমবার পাত্রী নয়। সে এবার বেশ শক্ত গলায় ঋশকে উদ্দেশ্য করে বললো, “ঋশ ভাইয়া, আপনি কি আদেও জানেন আপনি চলে যাওয়ার পর ইয়াশফার ওপর দিয়ে কী ঝড় বয়ে গেছে? এই ছোট বয়সে ও একা একা কী কী সহ্য করেছে? আজ ওর এই অবস্থার জন্য সব দোষ কিন্তু একমাত্র আপনার!”
এতক্ষণ ঘরের এক কোণায় চুপচাপ বসে পুরো ঘটনা দেখছিলেন ওহিদুল রহমান। জ্যোতির কথা শুনে তিনি একটা তীব্র তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে ব্যঙ্গ করে উঠলেন, “হুম! এই হলো তার বউয়ের প্রতি দায়িত্ব আর কর্তব্য!”
ওহিদুল রহমানের এমন ত্যাচ্ছিল্যভরা কথা আর জ্যোতির অভিযোগ শুনে ঋশ একদম আকাশ থেকে পড়লো। সে এক বুক উৎকণ্ঠা আর বিস্ময় নিয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে প্রায় চিৎকার করে উঠলো, “ওরা এসব কী বলছে পাপা? কী হয়েছিল ইয়াশের? আমি তো তোমাকে প্রতিদিন গোপনে কল দিতাম, ইয়াশের খোঁজ নিতাম! তুমিই তো প্রতিবার আমাকে বলতে ও খুব ভালো আছে, হাসছে, খেলছে, আগের মতোই সারা বাড়ি বাঁদরামি করে বেড়াচ্ছে! তাহলে ওরা এসব কী বলছে?”
ছেলের এই আকুল প্রশ্ন শুনে রিদের মুখের চেনা হাসিটা এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। তার পুরো মুখাবয়ব প্রচণ্ড গম্ভীর হয়ে উঠলো। ড্রয়িংরুমের সবাই এবার এক বুক সংশয় আর কৌতুহল নিয়ে রিদের দিকে তাকালো। রিদ বুঝতে পারলো পরিস্থিতি এবার তার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে হঠাৎ মিহির দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বললো, “মিহি,ইয়ানের কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে মনে হয়। ও মনে হয় কাঁদছে, ওকে একটু এই রুমে নিয়ে আসো তো।”
মিহি আর কোনো প্রশ্ন না করে বাধ্য মেয়ের মতো দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে গেল।
এদিকে ইয়াশফা তখনো পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে চুপচাপ সোফায় বসে ছিল। ঋশ আর ইউভান দুজনেই বার বার ইয়াশফার থমথমে মুখের দিকে তাকাচ্ছিল, যেন ওর মনের ভেতরের ঝড়টা বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু ইয়াশফার মুখ দেখে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না মনে হচ্ছে ওর কিছু যায় আসে না। ঋশ আর থাকতে না পেরে সোজা ইয়াশফার পাশে গিয়ে বসলো। তারপর ওর হাত বাড়িয়ে ইয়াশফার নাকের সামনে আঙুল ধরলো ও কি আদেও জেগে আছে নাকি চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে গেছে, সেটা পরীক্ষা করার জন্য।ঋশের এই অদ্ভুত আর ছেলেমানুষী কাণ্ড দেখে রিদের গম্ভীর মুখেও হুট করে একটা হালকা হাসি ফুটে উঠলো। তবে ইয়াশফা ঋশের এই কাণ্ডে কোনো তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখালো না। সে শুধু একবার শান্ত, ক্লান্ত চোখে ঋশের দিকে তাকালো, তারপর আবার মাথা নিচু করে নিলো। ওর এই নীরবতা ঋশকে আরও বেশি অপরাধী বানিয়ে দিল।
রিদ এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের সবার দিকে তাকালো। তার চোখে-মুখে এবার এক অদ্ভুত অপরাধবোধ। সে দুই হাত জোড় করে অত্যন্ত ভারী গলায় বললো,
“আমি এই বাড়ির সকলের কাছে আগে থেকেই হাত জোড় করে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আর ঋশ… বাবা, তুমিও প্লিজ তোমার পাপাকে ক্ষমা করে দিও। আমি আসলে তোমার কাছে কাছে আরও একটা মস্ত বড় সত্যি লুকিয়েছি।”
রিদের মুখে আরও একটা সত্যি লুকিয়ে রাখার কথা শুনে ঋশ প্রচণ্ড চমকে গেল। সে অত্যন্ত গম্ভীর আর থমথমে গলায় শুধু একটা শব্দ উচ্চারণ করলো,
“কীহ?”
ঠিক সেই মুহূর্তেই মিহি ছোট বাবু ইয়ানকে কোলে নিয়ে ঘরে ফিরে আসলো। এত মানুষ একসাথে দেখে ইয়ান ভয় পেয়ে বেশ জোরে কেঁদে উঠলো। ছেলের কান্নার আওয়াজ পেয়ে ইয়াশফা আর চুপচাপ বসে থাকতে পারলো না। সে দ্রুত সোফা থেকে উঠে গিয়ে মিহির কোল থেকে ইয়ানকে নিজের বুকে টেনে নিলো। মায়ের ওমে আসতেই বাচ্চার কান্না কিছুটা থিতিয়ে এলো। ইয়ানের বয়স এখন দুই বছর, কিন্তু অন্য সাধারণ বাচ্চাদের তুলনায় ওর শারীরিক গঠন ও গ্রোথ বেশ কম। আসলে ও সাত মাসেই পৃথিবীর আলো দেখেছিল, একটা অপুষ্ট প্রিম্যাচিউর বাবু হওয়ার কারণে ও এখনো ঠিকঠাক কথা বলতে পারে না। তবে টুকটাক আধো-আধো শব্দ করতে পারে।
রিদ এবার অপরাধী চোখে ঋশের দিকে তাকালো। ঘরের পিনপতন নীরবতার মাঝে সে মূল বোমাটা ফাটালো,
“ঋশ, তুমি চলে যাওয়ার ঠিক তিন মাস পর ইয়াশফা জানতে পারে ও প্রেগন্যান্ট।”
কথাটা শোনামাত্রই ঋশ যেন পাথরের মূর্তি হয়ে গেল। ওর মুখের সব ভাষা হারিয়ে গেছে, সে একদৃষ্টিতে স্তব্ধ হয়ে রিদের দিকে তাকিয়ে রইলো।রিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেছনের ঘটনাগুলো বলতে লাগলো, “তখন ইয়াশফার মানসিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। ও দিন-রাত শুধু কান্না করতো। আর ঠিক একই সময়ে কাকতালীয়ভাবে রাহাও প্রেগন্যান্ট হয়। খবরটা শুনে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়েছিল। কারণ ইয়াশফার তখন যে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা, তাতে ওর নিজের জীবনের যেমন ঝুঁকি ছিল, তেমনি গর্ভের বাচ্চারও প্রচণ্ড ঝুঁকি বাড়তো। এই পুরো বিষয়টা তখন রায়ান, কঞ্জ আর ওহিদুলের পরিবার ছাড়া বাইরের কেউ জানতো না। কারণ আমি কাউকে কিচ্ছু জানতে দিইনি। এমনকি তোমাকেও না! আমি তোমার কাছ থেকে এই এতো বড় সত্যিটা ইচ্ছা করেই লুকিয়েছিলাম। কারণ আমি খুব ভালো করে জানতাম, তুমি যদি একবার জানতে পারতে যে ইয়াশফা তোমার সন্তানের মা হতে চলেছে, তবে তুমি নিজের মিশন-কর্তব্য সবকিছু ফেলে মাঝপথেই এ বাড়ি ছুটে চলে আসতে। আর সেটা করলে তোমার নিজের জীবনসহ আমাদের সবার বিপদ আরও একশো গুণ বেড়ে যেতো।”
রিদের কথাগুলো শুনে ইয়াশফা একবার অত্যন্ত অসহায় আর আকুল চোখে ওর শ্বশুরের দিকে তাকালো, তারপর আবার নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে বাবুর দিকে চেয়ে রইলো। অন্যদিকে ঋশের মুখে তখনো কোনো কথা নেই, ও যেন পুরো ব্যাপারটা এখনো মাথায় প্রসেস করে উঠতে পারছে না।
রিদ বলতে লাগলো, “তবে হ্যাঁ, রাহার প্রেগনেন্সির বিষয়টা মোটামুটি আমাদের পরিচিত সবাই জানতো। আর এই খবরটাই আমি তোমাকে মিশন চলাকালীন দিয়েছিলাম,
যাতে বাড়ির ভেতরের সব ধরনের গোপনীয়তাকে আমি রাহার প্রেগনেন্সির অজুহাতে হাইড করতে পারি। তুমিও দূর থেকে ওটাই বিশ্বাস করেছিলে যে বাড়িতে যা হচ্ছে সব রুহিকে কেন্দ্র করেই হচ্ছে। প্রথম দিকে সবকিছু আমার ছক মতোই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, কয়েক মাসের মাথায় রুহার বাবুটা নষ্ট হয়ে যায়। ঘটনাটা আমাদের সবার জন্যই ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক ছিল, কিন্তু অন্য দিক থেকে বিচার করলে আল্লাহর এক অদ্ভুত ইশারায় ইয়াশফার জন্য একটা সুযোগ তৈরি হয়। রাহার বাবু যে নষ্ট হয়ে গেছে এই সত্যিটাও আমি বাড়ির কাউকে বা বাইরের কাউকেই টের পেতে দিইনি।”
রিদ এটুকু বলে হঠাৎ থেমে গেল। পুরো ড্রয়িংরুমে তখন এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। সোফায় বসা মুগ্ধ তখন চাতক পাখির মতো রিদের দিকে তাকিয়ে আছে।
রিদ ঋশের স্তব্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে আবারো বলতে লাগলো, “এরপর যথাসময়ে ইয়াশফার কোল আলো করে এই বাবুটা পৃথিবীতে এলো। আর আমি দূর থেকে তোমাকে জানালাম যে রাহা একটা ফুটফুটে সন্তানের জন্ম দিয়েছে, অর্থাৎ এটা মুগ্ধ আর রুহির বাচ্চা। পরিস্থিতির মারপ্যাঁচে পড়ে তুমিও তখন সরল বিশ্বাসে সেটা মেনে নিয়েছিলে।”
রিদ এবার ড্রয়িংরুমের সবার দিকে চোখ বুলিয়ে অপরাধ স্বীকারের ভঙ্গিতে বললো, “ইয়াশফার বাবু হয়ে যাওয়ার পর আমি নিজেই ঋশকে বললাম এবার তুমি চাইলে আড়াল থেকে ইয়াশফাকে নিজের মতো করে প্রটেকশন দিতে পারো। ঋশও এরপর থেকে দিন-রাত সবসময় চোখে চোখে রাখতো ইয়াশফাকে। কিন্তু ও দূর থেকে শুধু বাইরের নিরাপত্তাটাই দিতে পেরেছিল, বাড়ির ভেতরের আসল সত্যটা ও সবসময় কেবল আমার মুখ থেকেই জানতো। আর ঠিক এই কারণেই, ও কোনোদিন টের পায়নি যে এই বাচ্চাটা আসলে মুগ্ধর নয়, বরং ওর নিজের রক্ত!”
রিদের এই শেষ স্বীকারোক্তিটা শোনামাত্রই সোফায় বসে থাকা ইউভান তীব্র যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘ শ্বাস নিলো। ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি হয়ে যাচ্ছে, দম বন্ধ হয়ে আসছে ওর। এতদিনের চেনা পৃথিবীটা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে গেল।
এদিকে ঋশের চোখ দুটো তখন নোনা জলে ছলছল করছে। সে এক অদ্ভুত ঘোর আর কাঁপাকাঁপা পায়ে আস্তে আস্তে ইয়াশফা আর ইয়ানের দিকে এগিয়ে গেল। ইয়ান তখনো মায়ের কোলে হালকা কাঁদছিল। ঋষভ আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না, সে দুই হাত বাড়িয়ে ইয়ানকে নিজের কোলে তুলে নিলো। পরম আশ্চর্যের বিষয়, এতক্ষণ কাঁদতে থাকা ইয়ান তার বাবার বুকে আসতেই একদম চুপ হয়ে গেল, যেন সে তার চেনা আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে। ঋশ স্তব্ধ হয়ে পরম আবেশে ওর ফুটফুটে সন্তানের শরীরের সুবাস নিলো। তারপর নিজের কাঁপা ঠোঁট দুটো দিয়ে ইয়ানের নরম কপালে একটা গভীর চুমু এঁকে দিল।
ঋশ অশ্রুভেজা চোখে নিজের বাবার দিকে তাকিয়ে ভাঙা গলায় জিজ্ঞেস করলো, “পাপা… ও কি সত্যিই আমার সন্তান? ও আমার অস্তিত্ব? আমার নিজের রক্ত? ও… ও ঋষভ রায়ান চৌধুরীর সন্তান?
বাবার কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়ার আগেই ঋশ তৃপ্তিতে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে কেঁদে ফেললো,
“ইয়াশ, দেখো ও আমাদের সন্তান! ও হাসছে ওর বাবাকে দেখে! বাবা… , আমাকে একবার শুধু বাবা বলে ডাকবে, প্লিজ?”
ঋশের এই আকুল আর আবেগী আর্তি দেখে দুই বছরের ছোট ইয়ান হুট করেই খিলখিল করে হেসে উঠলো। তারপর আধো-আধো কণ্ঠে স্পষ্ট শব্দে ডাকলো, “বা…”
ঋশ একদম অবাক হয়ে চেয়ে রইলো। ওর চোখের জল তখন গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, অথচ মুখে ওর বাচ্চাদের মতো এক চিলতে নিষ্পাপ হাসি। সে আনন্দের আতিশয্যে ড্রয়িংরুমের সবার দিকে তাকিয়ে পাগলের মতো বলতে লাগলো, “পাপা দেখো! আমার সন্তান আমাকে বাবা বলে ডেকেছে! তোমরা সবাই শুনলে তো? ও মাত্রই আমাকে বাবা বলেছে!”
ঋশের এই আনন্দ দেখে ইউভানের বুকটা যেন ফেটে যাচ্ছিল। ওর মনে হলো কেউ যেন ওর কলিজাটা টেনে ছিঁড়ে নিচ্ছে। গত দুই বছর ধরে যাকে নিজের সন্তান ভেবে বুকে আগলে রেখেছে, সে আজ অন্য কারো হয়ে গেল! কিন্তু কিছু করার নেই, এই নির্মম সত্যটাকে আজ মেনে নিতেই হবে এই বাচ্চা ওর নয়, এটা ঋষভের সন্তান।
ছেলের এই পাগলামি আর ইউভানের ভেঙে পড়া দেখে রিদের নিজের বুকটাও আজ ভীষণ কেঁপে উঠলো। তার নিজের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে তার নিজেরই একটা ছেলের এত বড় খুশি সে এতদিন কেড়ে নিয়েছিল!
ইয়াশফা তখনো এক জায়গায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিল। তার চোখেও জল। তবে পাশে দাঁড়িয়ে মিহি তার ছেলের এই পাগলামি আর আনন্দ দেখে আলতো করে হাসছে। ঘরের বাকি সদস্যরাও এই প্রাপ্তি দেখে মনে মনে খুব খুশি।
ঋশ তখনো কাঁদছে। সে ইয়ানের দিকে তাকিয়ে করুণ সুরে বললো, “তুমিও কি এখন সবার মতো পাপাকে ঘৃণা করবে বাবা? অবশ্য তোমার পাপা একজন ঘৃণিত ব্যক্তিই, তাকে ঘৃণা করাই যায়। কিন্তু তুমি আমাকে ঘৃণা করো না বাবা… তোমার বাবার যে তোমরা ছাড়া আর কেউ নেই”
ছোট ইয়ান হয়তো তার বাবার ভেতরের এই তীব্র হাহাকারটা বুঝতে পারলো। সে নিজের ছোট্ট, নরম হাত দুটো বাড়িয়ে ঋশের ভেজা গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল। ও যেন নিঃশব্দে ওর বাবাকে বোঝালো সে তার বাবাকে একটুও ঘৃণা করে না।
ছেলের হাতের ছোঁয়া পেয়ে ঋশ আবেগে আপ্লুত হয়ে আবারো ইয়ানকে বাবা বলার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো। কিন্তু ইয়ান আর নতুন কোনো শব্দ করতে পারলো না, সে শুধু চেয়ে রইলো। রিদ এবার ছেলের মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিয়ে বললো, “এত অধৈর্য হয়ো না ঋশ। ও আস্তে আস্তে তোমাকে বাবা বলে ডাকবে।”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৪
ঋশ তখন চোখের জল মুছে হালকা হেসে ইয়ানের দিকে তাকালো। তারপর নিজের চেনা দাপুটে ভঙ্গিতে অথচ নরম গলায় বললো, “তুমি ঋষভ রায়ান চৌধুরীকে কাঁদিয়ে ছাড়ছো? এতো ক্ষমতা তোমার?”
ঋশের এই হঠাৎ গম্ভীর আর সুন্দর রসিকতা শুনে থমথমে ঘরের সবাই একসাথে হেসে উঠলো। দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক মস্ত বড় মেঘ যেন এক নিমেষে কেটে গেল।
