নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৪
রূপন্তী সরকার
“কবুল, কবুল, কবুল!”
ইয়াশফার মুখ থেকে এই তিনটি বাক্য একনাগাড়ে উচ্চারণ করার সাথে সাথেই চারদিকের পুরো পরিবেশ যেন এক নিস্তব্ধতায় থমকে গেল। ইউভানের বুকের ভেতর তখন তীব্র এক যন্ত্রণার ছুরি চালানো হলো। ও খুব ভালো করেই জানতো যে এই পুরো বিয়েটাই একটা নাটক ছিল, অথচ কাজী সাহেবের সামনে ইয়াশফার এই আকুল আত্মসমর্পণ ওর ভেতরের মনটাকে এক নিমেষে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিল। ও আর এক সেকেন্ডও সেই বিয়ের আসরে বসে থাকতে চাইল না। ও যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে যেই সোফা ছেড়ে উঠে চলে যেতে চাইল, অমনি পাশে বসা ওর বাবা ওহিদুল এক হাত দিয়ে ওকে শক্ত করে চেপে ধরে আবার সোফায় বসিয়ে দিল। ও ফিসফিসিয়ে বলল, “শান্ত হও ইউভান, বসে থাকো!”
কিছুক্ষণ আগের ঘটনা…
ঋষভ নিজের পাপা রিদকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে সোফায় বসা ইয়াশফার একদম কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়াল। ওর চোখ দুটো তখনো রাগে জ্বলজ্বল করছে। রিদ
রাশভারী গলায় বলল, “ঋশ, তুমি খুব বেশি বাড়াবাড়ি করছো, কেনো এসেছো এইখানে? আর এমন অসভ্যতা কেনো করছো? ডোন্ট ক্রস ইউর লিমিটস!”
ওদের এই বাবা-ছেলের লড়াইয়ের মাঝেই হুট করে কোত্থেকে যেন মিহি এসে ওদের মাঝখানে দাঁড়াল। মিহি আর কোনো কথা বলার সুযোগ দিল না, ও নিজের পুরো শক্তি এক জায়গায় এনে ঠাস করে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল ঋষভের গালে! পুরো ড্রয়িংরুমের মেহমানরা এই কাণ্ড দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের জীবনে এই প্রথমবার হয়তো মিহি নিজের ছেলের গায়ে এভাবে হাত তুলল।
ঋষভ নিজের গালে হাত দিয়ে অবাক আর অবুঝ চোখে নিজের মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। মিহি নিজের চোখের পানি মুছে রাগে আর ক্ষোভে কাঁপতে কাঁপতে বলতে লাগল, “আর কত ঋশ? আর কতটা নিচে নামবে তুমি? এতো জেদ তোমার? এতো জেদ কিসের? তুমি যখন যা বলবে তখন সেটাই হবে? সব কিছু তোমার কথা মতো হবে?”
ঋষভ কোনো জবাব দিল না, ও শান্ত মুখে মায়ের বকুনি শুনতে লাগল। মিহি একনাগাড়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে আবার বলতে লাগল, “ঋশ, ইয়াশফাও একটা মানুষ! ও কেনো পুতুল না, যে তুমি যখন যে ভাবে চাইবে সেভাবে ওকে নিয়ে খেলবে। ওরও একটা মন আছে, ওরও কষ্ট হয় ও নিজে মন থেকে কী চায়, সেটা কি কোনোদিন একটা বারও ওর থেকে জানতে চেয়েছ তুমি? ওর সাথে জবরদস্তি করা, ওরে তীব্র মানসিক কষ্ট দেওয়া ছাড়া আর কী করেছ তুমি ওর জীবনে? বিয়ের শুরু থেকেই ওই ছোট বাচ্চা মেয়েটাকে প্রতিটা মুহূর্তে ফিল করিয়েছ যে তুমি তাকে নিজের বউ হিসেবে মানো না, তাকে অপছন্দ করো। তারপর ওইটুকু মেয়ের সাথে জোর-জবরদস্তি করে তাকে একলা ফেলে রেখে দেশ ছেড়ে চলে গেলে! মেয়েটা যে এত বড় মানসিক আর শারীরিক ঝড় সামলে বেঁচে আছে, এটাই অনেক বিষয় ঋশ! আজ ও সব কষ্ট ভুলে নতুন করে নিজের একটা সুন্দর জীবন শুরু করতে চাচ্ছে, তাতেও তোমার সহ্য হচ্ছে না? আর কী চাও তুমি ওর থেকে? ও মরলে শান্তি পাবে তুমি? আচ্ছা আমি আজকেই ওকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলবো ও না থাকলে ঝামেলা ও থাকবে না”
মায়ের মুখ থেকে এতোগুলো কথা শুনে ঋশ স্তব্ধ হয়ে গেলো। ওর মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললো। ও
নিচু গলায় আকুল হয়ে ডাকল, “মাম্মা…”
মিহি নিজের চিৎকার করে বলল, “শাট আপ! ডোন্ট কল মি মাম্মা! কেউ না তুমি আমার, আমার কোনো ছেলে নেই। তুমি আমার কাছে মৃত”
মিহি নিজের চোখ দুটো মুছে ওখান থেকেই ঋষভের বুক লক্ষ্য করে এক ধাক্কা দিয়ে রাগে ফেটে পড়ে বলল, “গেট আউট ঋশ! জাস্ট গেট আউট অব মাই সাইট! আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু সি ইউর ফেস !”
ঋষভ মায়ের কথা শুনে নিজের ঠোঁটের কোণে এক তীব্র তাচ্ছিল্যের আর বেদনার হাসি ফুটিয়ে তুলল। ও ওভাবেই শূন্য চোখে চেয়ে রইল লাল বেনারসি পরা ইয়াশফার দিকে।
এর মধ্যেই মেহমানদের ভিড় থেকে একজন মহিলা একটু চড়া গলায় বলে উঠলেন, “একবার বিয়ে করে বউ মানে নাই, বউকে ফেলে রেখে চলে গেল। এখন মেয়েটা একটু সুখের মুখ দেখছে, তাও ওর সহ্য হচ্ছে না!”
ঋষভ বাঁকা শয়তানি হাসি হাসল। ও চারদিকের সবার দিকে তাকিয়ে নিজের সেই চেনা রাশভারী কণ্ঠে বলল, “একবার বিয়ে করে বউ মানি নাই বলে কি কোনোদিন মানবো না? এমন কথা কি কোথায় লেখা আছে? আর আপনি কী বললেন? শান্তি? ওর শান্তি তো একমাত্র আমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ, তাই না সুইটহার্ট?”
কথাটা শেষ করতে না করতেই ইয়াশফা কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঋষভ ওর হাতটা শক্ত করে খামচে ধরে টানতে টানতে সোজা কাজী সাহেবের সামনে নিয়ে গেল। ও ইয়াশফাকে জোর করে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল। তারপর নিজের পকেট থেকে একটা কুচকুচে কালো রিভলভার বের করে খট করে লোড দিয়ে সোজা কাজী সাহেবের কপালে তাক করে ধরল। ও ওনার চোখের দিকে তাকিয়ে বরফশীতল কণ্ঠে হুংকার দিয়ে বলল, “স্টার্ট করুন!”
কাজী সাহেব নিজের চোখের সামনে আস্ত বন্দুক দেখে ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে থতমত খেয়ে বললেন,
“কী… কিতা?”
ঋষভ ওনার মাথার ওপর বন্দুকের নলটা আরেকটু চেপে ধরে গম্ভীর গলায় বলল, “বিয়ে পড়ানো শুরু করুন!”
কাজী সাহেব ভয়ে ঢোক গিলে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে ইয়াশফার দিকে তাকিয়ে খাতা খুলে বললেন, “কবুল কও মা!”
ইয়াশফা একদম পাথর হয়ে চুপ করে রইল। ওর মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হচ্ছে না, ও নিজের লাল বেনারসির আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। ঋষভ ওর এই নীরবতা দেখে নিজের দাঁতে দাঁত ধমকে উঠে বলল, “কবুল বল সাকুরা!”
ইয়াশফা তবুও একগুঁয়ে জেদি মেয়ের মতো একদম চুপ মেরে রইল। ও ঋষভের এই জবরদস্তি কিছুতেই মেনে নিতে পারছিল না। ঋষভ এবার নিজের বন্দুকটা কাজী সাহেবের মাথা থেকে সরিয়ে সোজা ড্রয়িংরুমের মেহমানদের দিকে তাক করে নিষ্ঠুর আর পৈশাচিক হেসে ইয়াশফার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “কবুল বল! নাহলে আজ এই মুহূর্তেই বিয়ে বাড়ি থেকে অনেকজনের লাশ বের হবে! আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নিস না।”
ইয়াশফা তাও পাথরের মতো চুপ করে রইল। ঋষভ এবার নিজের ধৈর্যের বাঁধ হারিয়ে জোরে একটা ধমক দিতেই ইয়াশফা ভয় পেয়ে কেঁপে উঠল। ওদিকে সোফায় বসে থাকা রিদ কিন্তু পুরোটা সময় একদম শান্ত মুখে চুপচাপ বসে রইল। ও নিজের ছেলের কাজ কর্ম দেখে মজা পাচ্ছিল, ওনার ঠোঁটের কোণে চতুর হাসিটা ফুটে উঠল। আর পাশে থাকা মিহিও ওনার এই কড়া চড় মারার পর নিজের রাগটা কোনোমতে চেপে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল,
বিয়ে শেষ হলো। কাজী সাহেবের খাতা সই করার পর্ব মিটে যেতেই ঋষভ এবার শক্ত হাতে ইয়াশফার হাতটা চেপে ধরে সোফা থেকে উঠে দাঁড়াল। এরপর ইয়াশফার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো
“অহেতুক নতুন আশ্রয় খুঁজে কী হবে পাখি? দিনশেষে তোমার শেষ গন্তব্য তো শুধুই আমি।”
এই কাণ্ডের পর ওহিদুল সাহেব আর নিজের মেজাজ গরম রাখলেন না। উনি বুঝতে পারলেন রিদ আর ইয়াশফার এই চালের কাছে ওনাদের পরাজয় হয়েছে। ওহিদুল ধীরপায়ে এগিয়ে এসে রিদের কাঁধে একটা হাত রেখে মলিন হেসে বললেন, “থাক রিদ, যাই এবার আমরা। আমাদের এই ডিলটা এখানেই ক্লোজ। আবার না হয় অন্য কোনোদিন দেখা হবে।”
রিদ ওহিদুলের হাতটা চেপে ধরে বলল, “নাহ এখনই যাওয়া যাবে না। একটু বসো, জরুরি কিছু কথা আছে তোমার সাথে।”
দেখতে দেখতে রায়ান কুঞ্জের মেইন ড্রয়িংরুমটা প্রায় ফাঁকা হয়ে এলো। আমন্ত্রিত মেহমান আর আত্মীয়স্বজনরা এই হুলস্থুল কাণ্ড শেষ হতেই আস্তে আস্তে ডাইনিং হলের দিকে চলে যাচ্ছেন দুপুরের খাবার খেতে। চারদিকের হইচই কিছুটা কমে আসতেই ঘরের ভেতর এক থমথমে নীরবতা নেমে এলো।
ঋষভ ইয়াশফার হাতটা ওভাবেই শক্ত করে ধরে এগিয়ে গেল মিহির সামনে। মিহি তখনো ওনার দিকে পেছন ফিরে ওড়না দিয়ে নিজের চোখের পানি মুছছিল, ও ছেলের দিকে এক পলক চোখ তুলেও তাকাচ্ছিল না। ঋষভ নিজের ভেতরের সবটুকু অহংকার এক সেকেন্ডে ঝেড়ে ফেলে অপরাধীর মতো শান্ত গলায় ডাকল, “সরি মাম্মা! আই অ্যাম রিয়েলি সরি।”
মায়ের ভেতরের বাঁধটা এবার আর নিজেকে কোনোমতে সামলাতে পারল না। মিহি এক ঝটকায় পেছনে ঘুরে হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে নিজের দুই হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ঋষভকে। তিনটে বছরের সেই তীব্র একাকীত্ব আর মাতৃত্বের হাহাকার যেন এই একটা জড়িয়ে ধরার মাঝে এসে মিশে গেল। ঋষভ নিজের ঠোঁটের কোণে এক মুচকি হাসি ফুটিয়ে মাকে আরও শক্ত করে নিজের চওড়া বুকের সাথে আগলে ধরল। ও ঝুঁকে পড়ে মিহির কপালে গভীর ভালোবাসার একটা চুমু দিল
মিহি ওর বুকে মুখ গুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আই হেট ইউ ঋশ! আই হেট ইউ!”
ঋষভ মিহির মাথায় হাত রেখে একটু দুষ্টুমি করার সুরে ফিসফিসিয়ে বলল, “ও আচ্ছা বেশি ঘৃণা করো আমায়? তাহলে ঠিক আছে, আমি আবার এই মুহূর্তে যেখান থেকে এসেছিলাম সেখানেই চিরতরে চলে যাই?
ছেলের মুখ থেকে চলে যাওয়ার কথা শোনা মাত্রই মিহি এক সেকেন্ডে চমকে উঠল। ও নিজের দুই হাত দিয়ে ঋষভের শার্টের কলারটা আরও শক্ত করে খামচে ধরে ওরে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল, যেন ও হাত আলগা করলেই ছেলে আবার হারিয়ে যাবে। মায়ের এই ব্যাকুলতা দেখে ঋষভ নিজের গম্ভীর রূপটা ভুলে জোরে খিলখিল করে হেসে দিল। মিহি তখনও অনবরত কেদেই চলেছে। ঋষভ এবার নিজের গলার স্বরটা নরম করে বলল, “আমি বেশি কষ্ট দিয়েছি তোমাদের তাই না মাম্মা?”
মিহি ওর চোখের পানি মুছে কাতর চোখে চেয়ে বলল, “তুমি খুব নিষ্ঠুর বাবু, অনেক পাষাণ তুমি! মা তোমাকে অনেক ভালোবাসে ঋশ। এবার যদি তুমি মাকে না বলে আবার কোথাও চলে যাও, তাহলে মা সত্যি সত্যি মরে যাবে!”
মিহি কখনো এভাবে ঋশকে বলতে পারে নি। ছেলের কাছে কাঁদতে পারে নি। আজকে ওর অনেক বছরের বুকে জমে থাকা কষ্ট গুলো ছেলের কাছে উগ্রে দিলো।
ঋষভ মিহির চোখের কোণের জলটুকু নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে মুছে দিয়ে দৃঢ় গলায় বলল, “যাবো না মাম্মা, আর কোনোদিন তোমায় ফেলে কোথাও যাবো না। এখন একদম কেঁদো না তুমি,”
নেশাক্ত প্রহর পর্ব ৪৩
ঠিক তখনই সোফায় হেলান দিয়ে বসা রিদ নিজের পাকা দাড়িতে হাত বুলাতে বুলাতে গম্ভীর আর কড়া গলায় সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলল, “আচ্ছা, এই কান্নাকাটি আর নাটক এবার বন্ধ করো। সবাই মিলে ওপরের রুমে চলো। তিন বছর ধরে কার মনে কী কী জটলা পেকে আছে, সব বিষয় আজ পরিষ্কার করা হবে। সবার মনেই বেশি কৌতুহল জমে আছে, আজ সব সত্যি সামনে আনার সময় এসেছে।”
