প্রিয় রাগিনী পর্ব ২
লামিয়া ইসলাম শাম্মী
চারপাশে নানান রকমের গাছগাছালি। তার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি। বাড়ির বাহিরের গেটের পাশে দেয়ালে বড় বড় করে খোদাই করা আছে খন্দকার ভিলা। বাড়ির সামনেই খন্দকার সাহেব শখ করে বানিয়েছেন একটি সুন্দর বাগান। বাগানের একপাশে বসার জন্য সাজানো হয়েছে ছিমছাম জায়গা। সেখানেই বসে আছেন হামিদ সাহেব।
পাঁচ মাস পর আদরের মেয়েটাকে একটাবার দেখার আশায় মন খারাপ করে বসে আছেন তিনি।
তার সামনে বসে আছেন সাদা পাঞ্জাবি পরা, মেহেদী রঙে লাল দাড়ি ওয়ালা এক ভদ্রলোক। তিনি লামিয়ার নানা, নাম ফারুক খন্দকার। হাতে ধোঁয়া ওঠা চা, আর মুখে প্রশান্তির ছাপ। নাতি-নাতনিদের প্রতি তাঁর ভালোবাসা অপরিসীম।
হামিদ সাহেবকে মন খারাপ করে বসে থাকতে দেখে ফারুক সাহেব মৃদু গলায় বললেন
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
– বুঝলে হামিদ , আমার নাতনি কিন্তু দশে একজন। যেদিন থেকে এসেছে সেদিন থেকে আমার বাড়িটা যেনো মাতিয়ে রেখেছে।
হামিদ সাহেব তার কথায় মলিন হাসলো। সে তো জানে তাঁর মেয়ে এক দ্বন্দ্ব স্থির থাকে না। যেখানে যাবে সেখানে মাতিয়ে রাখবে সব। তাই তো এখানে চলে আসায় তাদের ইসলাম বাড়ি অন্ধকার হয়ে আছে।
এসব ভেবে হালকা হাসলো। তারপর ফারুক সাহেবের সাথে কথা বলতে লাগলো।
ঠিক তখনই গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করলো লামিয়া। পাশে মামাতো ভাই ইভান আর ইমন। হাসিঠাট্টা করতে করতে তিনজন ঢুকলো বাড়ির আঙিনায়।
পাঁচ মাস পর মেয়েকে দেখে, তার হাসিখুশি মুখ দেখে হামিদ সাহেবের বুক ভরে গেলো আনন্দে। তাঁর কাছে সব মেয়েই প্রিয়, কিন্তু এই মেয়েটি একটু বেশিই প্রিয়। তা কখনো মুখে বলে ওঠা হয়নি।
লামিয়া বাবাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো।
হামিদ সাহেব উঠে এসে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কেমন আছো?
লামিয়া হাসি মুখে উত্তর দিলো, ভালো আছি আব্বু। তুমি কেমন আছো? আর আপারা সবাই কেমন আছে?
হামিদ সাহেব হেসে বললেন, ভালো। তারপর একটু থেমে বললেন, বাসায় সবাই তোমার জন্য মন খারাপ করে বসে আছে। তোমার মা অসুস্থ হয়ে গেছে তোমার চিন্তায়। অনেক হলো, এখন আর নয়। চলো বাড়ি যাই।
– হায় হায় কী বলো?? নানার মেয়ে অসুস্থ আর তুমি এখন বলছো আমাকে?? তুমি এখুনি বসো আমি এখুনি ব্যাগ গুছিয়ে আনছি।
এ কথা বলে ভেতরে চলে গেলো লামিয়া। তার পেছন পেছন ইভান আর ইমনও দৌড়ে গেলো।
লামিয়ার কাধে হাত রেখে ইমন বললো
– তোকে অনেক মিস করবো রে।
ইভান দুখি দুখি মুখ করে বললো
– ইস, চান্দু মিঞা কে এখন আর জ্বালাতে পারবো না, এইটা ভেবে কষ্ট হচ্ছে আমার।
লামিয়ারও মন খারাপ লাগছে, এতোদিন এখানে থেকে মজা করেছে।
ইমন মুখ ফুলিয়ে বললো
– লামু, তুই কি আমাদের মিস করবি না?
লামিয়া ঠোঁট উল্টে নকল কান্নার অভিনয় করে বললো – করবো রে, করবো কিন্তু তোদের না ওই চান্দু মিঞার চান্দীকে।
বলেই ভ্যাস ভ্যাস করে নাক টানলো।
তারপর তিনজন একে উপরের দিকে তাকিয়ে হেঁসে উঠলো।
হামিদ সাহেব মেয়ের কথা শুনে হাসলেন। বড় হয়েছে ঠিকই কিন্তু এখনো দুষ্টুমি, ফাজলামি যায় নি তার।
কিন্তু মেয়ের চোখে যে আজকেও কষ্ট দেখতে পেলো। উপরে শক্ত থাকলেও মেয়ে যে ভিতরে শেষ হয়ে যাচ্ছে সেটা তিনি বুঝতে পারছেন।
লামিয়া তার রুমে গিয়ে ব্যাগ গুছিয়ে, কাঁধে প্রাণ প্রিয় গিটার নিয়ে বের হলো। খন্দকার বাড়ির সবার মন খারাপ। লামিয়া চলে যাবে বলে। এই পাঁচ মাসে মেয়েটা সবার বদ্দ আপন হয়ে গেছে। ইমন, ইভান মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে। লামিয়া সবার কাছে বিদায় নিয়ে বাবার হাত ধরে রওনা হলো নিজ বাড়ির উদ্দেশ্যে।
অন্যদিকে ইসলাম বাড়িতে,
জর্জেটের একখানা গাঢ় কমলা রঙের শাড়ি পড়েছে আজমেরী বেগম। শুধু তাই নয়, চোখে টেনেছে গাঢ় কাজল, মুখে পাউডারের গোডাউন, ঠোঁটে লাল টকটকে লিপস্টিক, গালে গোলাপি রঙের ব্লাশন। চোখে লাল চশমা, গলায় মোবাইল ব্যাগ ঝুলিয়ে, পায়ে হালকা হিল জুতো। ব্যাস, হয়ে গেছে তার সাজ।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে কোনো কিছু কম হলো কি না। সবকিছু তার কাছে পারফেক্ট মনে হলেও যেকেউ দেখলে পুরোই হার্ট অ্যাটাক করবে। রাতের বেলা এই অবস্থা তে বের হলে তো ভুত ও তাকে দেখলে পালাবে। কিন্তু তার কাছে তাকে দেখতে পুরো নাইকা লাগছে এটা তার কথা।
পান খাওয়া লাল দাঁতগুলো বের করে সেই একখানা হাঁসি দিলো। তারপর বললো – আজকে আমাকে দেখলে হাঁটুর সমান ছেলেরাও প্রেমের প্রস্তাব দিবে। বলেই সামনে থাকা পাকা চুল গুলো নায়িকাদের মতো উড়িয়ে দিলো।
তারপর কাঁধে ভেনুটি ব্যাগ ঝুলিয়ে রুম থেকে বের হলো।
হলরুমে বসে নিজ মনে চা পান করছে আর খবরের পত্রিকা পড়ছেন আনিসুল সাহেব। আজমেরী বেগম ধীর পায়ে এসে তার সামনে দাঁড়াতেই আনিসুল সাহেব উপরে তাকিয়ে চমকে বুকে হাত চেপে চিৎকার করে উঠলেন – আল্লাহ আকবর ।
বলেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।
ছেলেকে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে আজমেরী বেগম ভয় পেয়ে পাশে বসে হাই হুতাশ করতে লাগলেন।
চিৎকার শুনে দৌড়ে আসলেন তার স্ত্রী রাশেদা বেগম। স্বামী ভক্ত নারী তিনি। স্বামীর কিছু হলে অস্থির হয়ে ওঠেন। এমনিতেই তার স্বামী হার্টের রোগী। স্বামীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে রাশেদা বেগম চিৎকার করে বললেন – কে কোথায় আছো গো, আমার স্বামী আর নাই গো, দেখে যাও তোমরা । বলেই মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
রাশেদা বেগমের এমন মরা কান্না শুনে বাড়ির সবাই দৌড়ে আসলো হলরুমে। তখনই বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো লামিয়াদের গাড়ি। বাড়ির এমন চিল্লাচিল্লি শুনে লামিয়া আর হামিদ সাহেব একে অপরের দিকে চাওয়া-চাওয়ি করে তারপর দুজনেই দৌড়ে গেলো বাসার ভেতর।
রাশেদা বেগমের কান্না শুনে তার বড় ছেলে রাশেদ বিরক্ত হয়ে বললো – চুপ করো মা, এভাবে কান্না করছো কেনো? কিছু হয়নি, বাবা কে ডক্টরের কাছে নিতে হবে। আমি এখনই অ্যাম্বুলেন্স কল করছি।
আনিসুল সাহেবের এমন অবস্থায় সবাই তাকে নিয়েই ব্যস্ত, কেউ আজমেরী বেগমকে খেয়াল করেনি।
হামিদ সাহেব বাড়িতে ঢুকে ভাইকে এইভাবে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে তার কাছে যেয়ে
ডাকতে লাগলেন, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। ভয় পেয়ে সামনে তাকাতেই দেখলেন হাশিম সাহেব আর আজমির সাহেব ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। আজ ছুটির দিন হওয়ায় সবাই বাড়িতেই ছিলো।
হামিদা, লামহা এক কোণায় ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে আছে বড় চাচার দিকে। তায়েব, তায়েবা চুপচাপ দাঁড়িয়ে মন খারাপ করছে। আরিফ বাবার মাথায় পানি দিচ্ছে। লতিফা, মনিরা, তাহমিনা বেগম রাশেদা বেগমকে শান্ত করছে।
আজমেরী বেগম মাথা নিচু করে হাই হুতাশ করে কান্না করছে। হাত দিয়ে চোখ মুছছেন, যার ফলে সাদা পাউডার আর কাজল মিশে পুরো মুখে এক বিশ্রী অবস্থা তৈরি হয়েছে। মাথা নিচু করে থাকায় সাদা পাকা চুল সামনে নেমে এসে তাকে আরও ভুতুড়ে বানিয়ে তুলেছে।
এমন সময় মাহির ঘর থেকে বের হলো। নিচে খাবারের জন্য এসে হলরুমে যেতেই দেখলো সবাই মরা কান্নায় লিপ্ত। সামনে তাকাতেই দেখলো তার বড় চাচা মাটিতে পড়ে আছে, পাশেই আরিফ মাথায় পানি দিচ্ছে, আর হামিদ-হাশিম-আজমির মালিশ করছে।
মাহির ভ্রু কুঁচকে বড় চাচার কাছে যেতেই পাশে কমলা শাড়ি পরা একজন মহিলাকে দেখলো। চুল দেখে চিনলো – এ তো তার দাদী!
সে দাদীর কাঁধে হাত রেখে বললো
– দাদী, বড় চাচার কি হয়েছে?
আজমেরী বেগম নাতির কথা শুনে চোখে পানি নিয়ে সুর করে কাঁদতে লাগলেন – ও ভাইরে আমার পোলার কী হইলো রে!
দাদীর কান্না শুনে মাহির নিজেরই কান্না চলে এলো। দাদীকে শান্তনা দিতে পাশ ফিরে তাকাতেই ভয় পেয়ে চিৎকার করে উঠলো – আল্লাহ গো ওমা! বলে ছিটকে দূরে সরে গেলো।
সবাই আনিসুল সাহেবের থেকে চোখ সরিয়ে মাহির দিকে তাকালো। নাতি কেন ভয় পেলো বুঝতে পারলো না। আজমেরী বেগম কাছে যেতেই মাহির ছিটকে আরো দূরে সরে গেলো। হাতের কাছে পানি ভর্তি মগ পেয়ে সেটা হাতে নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে পানি ছিটাতে ছিটাতে বললো – আউযুবিল্লাহি মিনাশায়িতনির রজিম, হুস হুস পেত্নী, দূরে যা!
মাহির এমন কান্ড দেখে সবাই আজমেরীর দিকে তাকালো। মনিরা বেগম ছেলেকে ভয় পেতে দেখে দৌড়ে এসে সামনে তাকিয়েই বড় বড় চোখ করে ফিট খেয়ে পড়ে গেলো।
আজমেরী বেগম এইবার চোখ কুঁচকালো। তাকে দেখে সবাই এমন করছে কেনো?
মাহির মাকে ফিট খেতে দেখে ধরে দাঁড়ালো, কিন্তু নাদুসনুদুস হওয়ায় তার ভর বহন করতে না পেরে বসে পড়লো মাকে নিয়ে। আজমেরী বেগম এগোতেই মাহির টেনে টেনে মাকে দূরে সরিয়ে নিলো।
সবাই ভয় পেয়ে আজমেরীর দিকে তাকিয়ে আছে। হামিদ সাহেব বললেন – মা, একটু চুল খোঁপা করে সামনে তাকান তো!
আজমেরী বেগম এবার চুল খোঁপা করে বললেন – কী? সবাই আমারে দেখে এভাবে ভয় পাচ্ছে কেনো?
আজমেরী বেগম হামিদ সাহেবের দিকে তাকাতেই হামিদ সাহেব চমকে গেলেন।
সবাই চুপ। লামিয়া দূর থেকে দাঁড়িয়ে মুখ চেপে হাসছে। তাকে এখনো কেউ খেয়াল করেনি।
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বললো – দাদী, তুমি এমন ভুতের মতো সেজেছো কেনো?
আজমেরী বেগম রাগি চোখে তাকিয়ে বললেন – রাশেইদ্দা, তুই আমারে ভুত কইলি?
রাশেদ মুখ দিয়ে “চ” শব্দ করলো। এই মহিলা কে কিছুই বলা যায় না, সবসময় রেগে যায়।
এদিকে আনিসুল সাহেবের হুঁশ ফিরলো। চোখ মেলে তাকাতেই সামনে আজমেরী বেগমকে দেখে আঁতকে উঠে হাশিম সাহেবকে জড়িয়ে ধরে বললেন – বাঁচা ভাই আমাকে! ভুত ভুত।
হামিদ সাহেব শান্ত করে বললেন – বড় ভাই, এটা আমাদের আম্মা। আপনি শান্ত হন।
আম্মার কথা শুনে আনিসুল সাহেব শান্ত হলেন।
তায়েব হোহো করে হেসে বললো – দাদী, তোমারে দিয়ে আমি ভুতের মুভি বানাবো। ইউটিউবে কোটি ভিউ আসবে।
তার কথা শুনে হামিদা, লামহা, তায়েবা হেসে উঠলো। পাশ থেকে তাহমিনা বেগম জুতা নিক্ষেপ করতেই তায়েব চুপ হয়ে গেলো।
হামিদ সাহেব বিরক্ত হয়ে বললো – আম্মা, যান মুখ সুন্দর করে ধুয়ে আসেন। দেখছেন তো সবাই আপনাকে দেখে ভয় পাচ্ছে। আর এইভাবে সেজেছেন কেনো?
আজমেরী বেগম কিছু না বলে রেগে উঠে চলে গেলেন।
মনিরা বেগমের মুখে পানি ছিটা দিতেই ধরফর করে উঠলো। মাহির তার মা কে শান্ত করে বললো – মা, শান্ত হও, ওইটা দাদী ছিলো।
মনিরা বেগম রাগে হাশিম সাহেবের দিকে তাকিয়ে তেতিয়ে বললো – আপনার মা কোনদিন জানি বাসার শুদ্ধ লোকদের হার্ট অ্যাটাক করে মেরে ফেলবে, আমি বলে দিলাম।
হাশিম সাহেব তার স্ত্রীকে শান্ত হতে বললেন।
রাশেদা বেগম স্বামীর গলা ধরে হুঁ হুঁ করে কেঁদে বললো – আমি ভেবেছিলাম, আপনি এইবার ইন্না লিল্লাহি হয়ে গেছেন।
রাশেদা বেগমের কথা শুনে আরিফ বিরক্ত হয়ে বললো – মা, তুমি চুপ করবে! যাও, বাবা কে নিয়ে ঘরে যাও।
হামিদা, লামহা, তায়েবা, তায়েব মুখ চেপে হাসছে। হঠাৎ মাহির দরজার দিকে তাকাতেই দেখলো লামিয়া মুখে হাত দিয়ে হাসছে।
এতো মাস পর লামিয়া কে দেখে মাহির দৌড়ে গিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরলো। মাহিরের দৌড় দেখে সবাই দরজার দিকে তাকালো, আর তখনই সবাই লামিয়াকে দেখলো।
হামিদা-লামহা খুশিতে একসাথে বলে উঠলো – মা, লামিয়া এসেছে দেখো! – বলেই দৌড়ে গিয়ে লামিয়াকে জড়িয়ে ধরলো।
লতিফা বেগমের চোখে পানি চলে এলো। এতো দিন পর মেয়েকে দেখে কেঁদে উঠলেন। তাহমিনা বেগম লতিফা বেগমকে কাঁদতে মানা করে নিজেই কেঁদে উঠলো।
তায়েব-তায়েবা খুশিতে লাফাতে শুরু করলো।
একে একে লামিয়া সবার সাথে কথা বললো। আনিসুল সাহেব বললো – তুমি ছাড়া এই বাড়ি শূন্য লাগছিলো। এখন তুমি এসেছো, এখন থেকে বাড়ি পুরো পূর্ণ হলো।
লামিয়া হালকা মাথা নাড়লো।
সবাইয়ের সাথে কথা বলে লামিয়া উপরে নিজের রুমে যেতে লাগলো। তার পিছন পিছন হামিদা, লামহা, তায়েবা, তায়েব আর মাহির যেতে লাগলো।
রুমে এসে টানটান হয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো লামিয়া। কতদিন পর নিজের রুমে এসেছে।
মাহির এসে বসলো তার পাশে, কতোক্ষণ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রইলো।
লামিয়া পাশ থেকে বালিশ তুলে মাহিরের মুখ বরাবর ছুঁড়ে মারলো।
মাহির বললো – এইভাবে বালিশ ছুঁড়ে মারছিস কেনো?
লামিয়া বললো – তুই এমন ভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো?
মাহির বললো – আমি একা না, সবাই তোর দিকেই তাকিয়ে আছে দেখ।
লামিয়া চোখ ঘুরিয়ে দেখলো – লামহা, হামিদা, তায়েব, তায়েবা সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে বললো – কি তোরা সব আমার দিকে এইভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? আমার কি রূপ বেয়ে পরছে?
লামহা বললো – না, তুই এমন কউয়ার মতো হয়ে গিয়েছিস কেনো?
লামিয়া সরু চোখে লামহার দিকে তাকালো, তারপর বললো – দেখ মেজো আপা, এতো দিন পর আসলাম, কোথায় একটু আদর আপ্যায়ন করবি তা না করে তুই এসব বলছিস?
একটু থেমে বললো – যা, তোরা সব বিদেয় হ। আমি একটু ঘুমাবো। আর মাহির, তায়েব, তায়েবা – বিকেলে রেডি থাকিস, বের হবো একটু।
কেউ আর কিছু না বলে চলে গেলো।
সবাই চলে যাবার পর লামিয়া কিছু একটা ভেবে সয়তানি হাঁসি দিয়ে ঘুমের রাজ্যে পারি দিলো।
দুপুরে খাবার টেবিলে বসে আছে সবাই। হরেক রকম খাবার দিয়ে টেবিল সাজানো। আজমেরী বেগম মুখ ফুলিয়ে নিজের ঘরে বসে আছেন। তাই তার চার ছেলেই গিয়েছে ডেকে আনতে।
লতিফা বেগম হামিদাকে বললেন – “লামিয়া কোথায়?”
হামিদা জবাব দিলো – “মা, লামু ঘুমাচ্ছে। ঘুম থেকে উঠলে খেয়ে নেবে।”
লতিফা বেগম আর কিছু না বলে খাবার বাড়তে লাগলেন।
কিছুক্ষণ পর আজমেরী বেগমকে মানিয়ে খাবার টেবিলে নিয়ে এলো তার ছেলেরা।
রাশেদা বেগম আজমেরী বেগমকে খাবার পরিবেশন করে দিলেন।
খাবার খাওয়া শুরু করলো সবাই। তখনই আনিসুল সাহেবের ফোনে টেবিল কাঁপিয়ে কল এলো।
তিনি বিরক্ত হয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করলেন। স্ক্রিনে “খান” নামটা দেখে তার চোখ খুশিতে চকচক করে উঠলো।
ফোন কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো—
আনিসুল, আমরা আজ সবাই দেশে ফিরছি। দুদিন তোর বাসায় থাকবো, তারপর নিজের বাসা পরিষ্কার করে চলে যাবো। এতে কি তোর সমস্যা আছে?
আনিসুল সাহেব হাসিমুখে জবাব দিলেন –
কোনো সমস্যা নেই! আমরা আমরাই তো, তোর যতোদিন খুশি থাকবি, কোনো অসুবিধা নেই।
তারপর অনেকক্ষণ ফোনে কথা বলে কল কেটে খুশিতে লাফিয়ে উঠে সবাইকে জানালেন –
শফিউর আর তার পুরো পরিবার নিয়ে আসছে বাংলাদেশে! আমাদের বাড়িতে কতদিন থাকবে, তারপর ওদের বাসা পরিষ্কার করে চলে যাবে।
শফিউর খান আর তার পরিবার আসছে শুনে সবাই খুশিতে লাফিয়ে উঠলো।
শুধু খুশি হলো না রাশেদ আর হামিদ। তারা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে খাবার খেতে লাগলো।
এদিকে বাড়িতে হৈচৈ পড়ে গেলো—খান বাড়ির মানুষ আসছে এ খবর শুনে।
( খান বাড়ির পরিচয়)
খান বাড়ি আর ইসলাম বাড়ির পরিবারের সম্পর্ক অনেক ঘনিষ্ঠ। আনিসুল সাহেবের ছোটবেলার বন্ধু শফিউর খান।
খান পরিবারের সবাই আগে দেশেই থাকতো। খান পরিবার আর ইসলাম পরিবার মিলে একসাথে ব্যবসা দাঁড় করিয়েছে, এতে তাদের সম্পর্ক আরও মজবুত হয়েছে।
খান বাড়ির বড় ছেলে শফিউর খান। তার দুই সন্তান – বড় ছেলে সাফওয়ান আর ছোট মেয়ে শারমিন।
খান বাড়ির মেজো ছেলে আমির খান। তার দুই সন্তান – বড় ছেলে আবির খান আর ছোট ছেলে লাবিব খান।
খান বাড়ির সেজো ছেলে জায়েদ খান। তারও দুই সন্তান – বড় মেয়ে হাফসা আর ছোট ছেলে জাহিদ।
খান বাড়ির ছোট মেয়ে ফিরোজা – স্বামী মারা যাবার পর ভাইদের সাথেই থাকেন। তার দুই সন্তান – বড় মেয়ে ফারিয়া আর ছোট ছেলে ফাহিম।
এবং তাদের বাড়ির বড় কর্তা – জনাব শফিকুল খান।
এই নিয়েই খান পরিবারের সদস্যরা।
গল্পে ফিরে আসা যাক,
খাবার শেষ করে বাড়ির কর্তিরা কাজে লেগে গেলো। এতো বছর পর খান বাড়ির মানুষ আসছে, তাদের আপ্যায়নে যেন কোনো ত্রুটি না থাকে, তাই ব্যস্ততা বেড়ে গেলো সবার।
কিন্তু মন খারাপ করে বসে আছে হামিদা।
এতো বছর পর সেই মানুষটাকে দেখবে সে। কিন্তু তার কি মনে আছে হামিদার কথা?
“উহু… হয়তো না।” – মনে মনে ভাবলো হামিদা।
প্রিয় রাগিনী পর্ব ১
“ইতালিতে থাকে তারা। সেখানে আমার থেকেও সুন্দর সুন্দর মেয়ে আছে। সেখানে কি করে আমাকে মনে রাখবে সেই মানুষটা? যদি মনে রাখতো, একবারও খোঁজ নিতো, অন্তত যোগাযোগ করতো। কিন্তু এতো বছরে কোনো খোঁজ-খবরই নেয়নি। তাহলে এখন কিভাবে সে মানুষটা আমাকে মনে রাখবে?”
এইসব ভেবেই হামিদা আরও মন খারাপ করে বসে রইলো।
