Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৬
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

চারপাশে মৃদু বাতাস বইছে। সন্ধ্যার আকাশটা যেন অন্যরকম শান্তিতে ভরে আছে। সবাই চুপচাপ হয়ে বসেছিলো। হঠাৎ মাগরিবের আজান পড়তেই একে একে সবাই নিচে নেমে গেলো, শুধু লামিয়া বাদে।
নামাজ শেষে রাশেদা বেগম সবাইকে ডাক দিলেন পাকোড়া খেতে। সবাই নিচে বসে পড়লো।
তখন লতিফা বেগম হামিদার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন – লামিয়া কোথায়?
হামিদা গ্লাস হাতে নিয়ে বললো – ও তো নিচে আসেনি। বলেছে কিছুক্ষণ পর আসবে।
লতিফা বেগম কিছু না বলে আবার খাবার দিতে লাগলেন।

এদিকে, লাবিব পাকোড়ায় হাত না দিয়েই উঠে দাঁড়ালো।
লতিফা বেগম অবাক হয়ে বললেন – ওকি লাবিব, তুই খাবি না?
লাবিব হালকা হেসে উত্তর দিলো – খাবো আন্টি, একটু পরে। আমার একটু কাজ আছে।
বলেই চলে গেলো। মাহির বাঁকা চোখে লাবিবের দিকে তাকালো আবার চুপচাপ খাওয়ায় মন দিলো।
চিলেকোঠার সামনে এসে দাঁড়াতেই কপালে ভাঁজ ফেললো লাবিব।
ছাদের ফ্লোরে শুয়ে আছে লামিয়া। বুকের ওপর হাত রাখা, চোখ দুটো বন্ধ।
মৃদু বাতাসে তার চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়ে মুখে এসে পড়ছে।
লাবিব পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে লামিয়ার পাশে বসলো।
হালকা হেসে আস্তে করে চুলগুলো সরিয়ে দিতে গিয়েই তার চোখ গেলো লামিয়ার গালের দিকে।
লাবিব এক মুহূর্ত চুপ করে তাকিয়ে রইলো। তারপর আস্তে করে গালে হাত রাখতেই লামিয়া নড়েচড়ে উঠলো।
লাবিব দ্রুত হাত সরিয়ে দূরে সরে গেলো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

চোখ খুলে পাশে তাকাতেই লামিয়া ভ্রু কুঁচকে বললো – আপনি এখানে কী করছেন?
লাবিব কপালে ভাঁজ ফেলে বললো – সেটা তো আমার প্রশ্ন। তুই এখন এইখানে কী করছিস?
লামিয়া উঠে বসলো। এলোমেলো চুলগুলো খোঁপা করে নিলো।
তারপর সামনে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললো – আপনাকে কৌফত দিতে বাধ্য নই।
বলেই উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে লাগলো।
লাবিব হঠাৎ রেগে গিয়ে লামিয়ার খোঁপা ধরা চুল শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো। নিজের সামনে টেনে নিয়ে গিয়ে বললো – সবসময় ত্যাড়ামি করিস কেন? আর এমন ত্যারা তো তুই ছিলি না আগে।
চুল টানাটানিতে ব্যথা পেলেও লামিয়া শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো লাবিবের দিকে।
লাবিব লামিয়ার চোখে চোখ রেখে বললো – ত্যারামি আমার সাথে করবি না। মেয়েদের আমি অনেক সম্মান করি, তাদের গায়ে হাত তোলা আমার পছন্দ নয়।

বলেই খোঁপা ছেড়ে দিতেই এলোমেলো চুল গুলো লামিয়ার মুখে এসে পড়লো।
তারপর ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে বললো – এই চুল খোলা রেখে এতক্ষণ ছাদে বসে ছিলি? তোর ভয় হয় না? যদি জীন-ভূত এসে তোকে নিয়ে যেতো? জানের ভয় নাই? মরার কী এত সখ?
লামিয়া বাঁকা হেসে চুলগুলো আবার খোঁপা করে গিটার হাতে নিলো।
শান্ত চোখে লাবিবের চোখে তাকিয়ে বললো – আমি ভোরের ঝরা পাতা। আমার মরার কীসের ভয়?
বলেই ছাদের সিঁড়ি ধরে নেমে গেলো।

লাবিব লামিয়ার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো নিঃশব্দে। অতোটা চেঞ্জ কীভাবে হতে পারে একটা মানুষ তা ভেবে পায় না লাবিব।
নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করলো লামিয়া।
কিছুক্ষণ থ হয়ে বসে রইলো। ছাদে বসে শুয়ে থাকার কারণে শরীরটা চুলকাচ্ছিলো।
তাই জামা নিয়ে বাথরুমে ঢুকে গোসল করতে চলে গেলো।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ধীর পায়ে রাশেদের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো শারমিন। দরজায় হালকা টোকা দিতেই ভিতর থেকে রাশেদ বললো – মা এসেছো? ভিতরে আসো।
শারমিন কোনো কথা না বলে আস্তে পা ফেলে রুমে ঢুকলো। ভিতরে ঢুকতেই তার চোখ হা করে থেমে গেলো। একটু আগেই অফিস থেকে ফিরে মাথা ধরেছে বলে আনোয়ারা বেগমকে চা দিতে বলেছিলো রাশেদ। তারপর রুমে এসে গোসল করে ফ্রেশ হলো। এইমাত্রই বের হয়েছে, ভেজা চুল মুছছে। পরনে শুধু শর্ট প্যান্ট।
রাশেদ ভেবেছিলো তার মা চা নিয়ে আসবে। তাই পেছনে না তাকিয়ে বললো – মা, এতোক্ষণ লাগে চা দিতে? বলেই ঘুরে দাঁড়াতেই তার চোখ পড়লো শারমিনের দিকে। হা করে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে দ্রুত আলমারি খুলে একটা টি-শার্ট বের করে পরে নিলো।

রাশেদ মুখ গম্ভীর করে বললো – আপনি আমার রুমে কেনো?
শারমিন চোখ নামিয়ে আস্তে বললো – আপনার নাকি মাথা ব্যথা তাই বড় মা আমাকে দিয়ে চা পাঠিয়েছেন।
রাশেদ রূঢ় স্বরে বললো – আমি তো মা’কে বলেছিলাম। আপনি কেনো এসেছেন?
শারমিন শান্ত গলায় উত্তর দিলো – বড় মা একটু ব্যস্ত ছিলেন, তাই আমাকে দিয়ে পাঠালেন।
রাশেদ বিরক্ত হয়ে বললো – নিয়ে যান এই চা। আমি খাবো না।
শারমিন বললো – কেনো? আপনার তো মাথা ব্যথা খেয়ে নিন না।
রাশেদ গম্ভীর কণ্ঠে বললো – আমি খাবো না। নিয়ে যান।
শারমিন কষ্টের স্বরে বললো – আমি নিয়ে এসেছি দেখে খাবেন না?
রাশেদ ঠান্ডা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো – আপনি যেমন ভাবেন।
শারমিন এবার জেদি ভঙ্গিতে সামনে গিয়ে কাপটা রাশেদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো – আপনাকে এই চা-ই খেতে হবে।

রাশেদ বিরক্তিতে হাত ঝাড়া দিতেই কাপটা কাত হয়ে গরম চা ঢেলে পড়লো শারমিনের হাতে।
ব্যথায় চোখ মুখ বুজে কেঁদে উঠলো শারমিন। সাদা হাত লাল হয়ে গেছে।
রাশেদ মুহূর্তেই হতবাক। তাড়াতাড়ি পানি এনে শারমিনের হাত ধরতে গেলো। কিন্তু শারমিন হাত সরিয়ে নিলো।
রাশেদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো – থাপ্পড়ে গাল লাল বানিয়ে ফেলবো হাত দিন বলছি। পানি না দিলে ফোসকা পড়ে যাবে।
কিন্তু শারমিন কিছু না বলে চোখ মুছে আস্তে উঠে দাঁড়ালো। হাতের যন্ত্রণা চেপে ঠোঁট কামড়ে নিচ থেকে ভাঙা কাপের টুকরো কাঁপা হাতে তুলতে লাগলো।
রাশেদ দেখে ভীষণ রেগে গেলো। ধমক দিয়ে বললো – আপনাকে এসব তুলতে বলেছি আমি? রাখুন, হাতে লেগে যাবে!

বলতে না বলতেই হাতের কাঁচের টুকরো বিঁধলো। রক্ত ঝরে পড়তে শুরু করলো।
এবার রাশেদের রাগ চরমে উঠলো। সে শারমিনের হাত জোরে টেনে দাঁড় করিয়ে বললো – এতো জেদ কেনো? থাপ্পড়ে এই জেদ বের করে দিবো। বেয়াদব মেয়ে!
শারমিন তৎক্ষণাৎ ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো রাশেদকে। চোখ ভিজে গেলেও তেজি স্বরে বললো – হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন। আমি বেয়াদব। আপনার জন্য চা আনতে চাইনি। জোর করে পাঠানো হয়েছে বলে এসেছিলাম। ভুল হয়েছে আমার। ক্ষমা করবেন। আমাকে আপনি যে এতো ঘৃণা করেন, আমি জানতাম না। সত্যিই জানতাম না। আর কখনো এমন বেয়াদবি করবো না, কোনোদিনই না।
বলেই দরজা ঠেলে দ্রুত চলে গেলো।
রাশেদ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। নিজের ওপর রাগ লাগছে ভীষণ। যদি কাপটা সরাসরি হাতে নিতো, তাহলে শারমিনের হাতে গরম চা পড়তো না। কাঁচের টুকরোও হাত কেটে দিতো না।
রাগে গটগট করে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সে।

হাতে বই নিয়ে চোখে সাদা চশমা এঁটে দোতলার লম্বা বারান্দায় অন্ধকারে চুপচাপ হয়ে বসে আছে লামহা।
ফোনে কথা বলতে বলতে বারান্দায় পা রাখলো আবির। কথা শেষ করে পাশে তাকাতেই চমকে উঠলো। বুকের ভেতর থুথু মেরে বললো – এইভাবে ভুতের মতো বসে আছিস কেনো তুই?
লামহার কোনো উত্তর নেই। সে আকাশের দিকে চেয়ে চুপচাপ বসে আছে।
আবির ভ্রু কুঁচকে কাছে গিয়ে বললো – লামহা
তবুও কোনো উত্তর নেই।
আবির বিরক্ত হয়ে মাথায় হালকা টোকা দিলো। লামহা ধীরে ঘাড় কাত করে শান্ত চোখে তাকালো আবিরের দিকে। সেই চোখে এমন এক নিস্তব্ধতা যে আবির হঠাৎ ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেলো। মনে হলো মেয়েটা যেন ভুতের মতো আচরণ করছে।

এমন সময় পিছন থেকে তায়েব চিৎকার করে উঠলো – লামহা! এক টিলো!
তায়েবের হঠাৎ চিৎকারে আবির ভয়ে লাফিয়ে উঠলো। সেটা দেখে তায়েব ভড়কে গিয়ে বললো – ভাইয়া, এভাবে ভয় পাচ্ছেন কেনো? কী হয়েছে?
আবিরের ভয় পাওয়া মুখ দেখে লামহা ফিক করে হেসে উঠলো। তারপর তায়েবের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো – তায়েব, তায়েবাকে খুঁজে আন, আমি আসছি।

তায়েব একবার আবিরের ভয় পাওয়া মুখের দিকে তাকালো, তারপর নিচে নেমে গেলো।
আবিরের ভয় পেয়ে যাওয়া দেখে লামহা মুচকি হেসে বললো – ভয় কি খুব পেয়েছেন?
আবির বেচারা, ভয়ে মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হচ্ছে না।
লামহা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে আবিরের দিকে তাকিয়ে বললো – আপনি দেখি ভীষণ ভীতু। ভয় পাবেন না। আমরা লুকোচুরি খেলছিলাম।
এ কথা বলে হাসতে হাসতে চলে গেলো লামহা।
আবির নিঃশ্বাস ফেলে তার চলে যাওয়ার দিকে চেয়ে রইলো। মনে মনে ভাবলো – আরেকটু হলে তো হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতো! ভেবেই ঠোঁট উল্টালো আবির।

প্রায় এক ঘণ্টা ধরে গোসল শেষে বেরিয়ে এলো লামিয়া। চোখ দুটো লাল টুকটুকে হয়ে গেছে। নিচ থেকে খাবারের জন্য ডাক আসছে। চুলে গামছা পেঁচিয়ে নিচে নেমে টেবিলে বসল।
হঠাৎ তাঁর মন টা কেমন করছে। ভালো লাগছে না কিছুই। এতো অস্থির লাগছে কেনো, বুঝতে না পেরে চুল না মুছেই চলে গেলো খাবার খেতে।
খাবারের টেবিলে সবাই উপস্থিত, শুধু শারমিন নেই।
তাই সাবরিনা বেগম সাফওয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন – তোমার বোন কোথায়?
ফারিয়া খেতে খেতে উত্তর দিল – তখন ডাকতে গিয়েছিলাম, আপু বলেছে ওর পেট ভরা, খাবে না।
সাবরিনা আর কিছু বললেন না।
কিন্তু রাশেদের গলা দিয়ে খাবার নামছে না। মাথা নিচু করে প্লেটে আঁকিবুঁকি করতে দেখে আনোয়ারা বেগম বললেন

– কী ব্যাপার রাশেদ, খাচ্ছিস না কেনো?
রাশেদ নিচু গলায় বললো – খাচ্ছি তো মা। বলেই ভাত মুখে নিলো।
লাবিব নিশ্চুপ খাচ্ছে। লামিয়া একবার তার দিকে তাকালো, তারপর আবার নিজের খাওয়ায় মন দিলো।
খাওয়া শেষে সবাই যে যার রুমে চলে গেলো।
রাশেদ রুমে গিয়ে ছটফট করতে লাগলো।
রাত বারোটা, সবাই ঘুমিয়ে গেছে। রাশেদ আস্তে আস্তে নিচে নেমে ফ্রিজ থেকে খাবার আর পানি নিয়ে আবার উপরে উঠলো। শারমিনের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজা টোকা দেওয়ার আগেই তার কাঁধে কেউ আলতো করে হাত রাখলো।

পিছন ফিরে দেখে সাফওয়ান দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
সাফওয়ান হেসে বললো – রাগের আড়ালে যে ভালোবাসা, সেটা কবে দেখাবি আমার বোনকে?
রাশেদ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো।
সাফওয়ান বললো – আচ্ছা, ভুল হয়েছে তোদের বিষয়ে কথা বলে। আর বলবো না। বলে হেসে চলে গেলো।
রাশেদ খাবার হাতে নিয়ে আস্তে করে শারমিনের রুমে প্রবেশ করলো। দরজা ভেতর থেকে লাগিয়ে দিলো।

খোলা আকাশের নিচে দোলনায় বসে আছে লামিয়া। চুল থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। তাকিয়ে আছে ওই দূর আকাশের চাঁদের দিকে।
ফোনে কথা বলতে বলতে সবেই ছাদে প্রবেশ করেছে লাবিব।
অসময়ে লামিয়া কে ছাদে দেখে বেশ কপাল কুঁচকে তাকালো।
ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে লামিয়ার সামনে দাঁড়াতেই লামিয়া চোখ তুলে লাবিবের দিকে তাকিয়ে ভ্রু উঁচিয়ে বললো

– কী চাই?
লামিয়ার কথায় লাবিব বললো
– এতো রাতে এখানে কী করছিস?
– বসে আছি! দেখতে পাচ্ছেন না?
– তা তো দেখতে পাচ্ছি তবে এতো রাতে ছাদে কী করছিস? তাও একা।
– চাঁদের যেমন কেউ নেই সে একা আমিও মূলত চাঁদের মতোই একা লাবিব ভাই।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৫

লামিয়ার কথা শুনে লাবিব চুপচাপ তাকালো লামিয়ার দিকে।
লামিয়া কে কিছু বলার সাহস তাঁর নেই। তাই সে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে রইল।
ছোট্ট বেলার ঝগড়াটে লামিয়া বড় হয়ে গিয়েছে এখন আর লামিয়া ছোট্ট নেই। লামিয়ার কপালে এলোমেলো চুল গুলো লাবিব সরিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই লামিয়া সরে দাঁড়িয়ে লাবিবের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে ছাদ থেকে নেমে গেলো । লামিয়ার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে লাবিব হালকা হেসে উঠলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৭