Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৮

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৮

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৮
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

রাশেদা, লতিফা, তাহমিনা, মনিরা, লুবনা, সাবরিনা, হালিমা, ফিরোজা বেগম সবাই মুখ ভার করে বসে আছে। আজ খান পরিবারের সবাই ইসলাম বাড়ি ছেড়ে নিজেদের বাসায় উঠে যাবে। যদিও ইসলাম বাড়ির ঠিক সামনেই খান বাড়ি, তবুও তারা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে চায় না। এ নিয়েই সবার মন খারাপ।
ঠিক তখনই বাড়ির গেট দিয়ে ঢুকলো কালো রঙের একটি গাড়ি।
এদিকে কেবল ঘুম থেকে উঠে নিজের রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দাঁত ব্রাশ করছিলো লামিয়া। বাড়ির ভেতরে অচেনা গাড়ি ঢুকতে দেখে চোখ ছোট করে নিচের দিকে তাকালো।

গাড়ি থেকে নামলো এক অতি সুন্দরী রমণী। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, গায়ে রয়্যাল ব্লু শার্ট আর ক্রিম রঙের প্যান্ট। চোখে কালো সানগ্লাস, ঠোঁটে হালকা নুড লিপস্টিক। একেবারে ঝলমলে সৌন্দর্য। তার পিছনে নেমে এলো কালো স্যুট-বুট পড়া একজন লোক, দেখে মনে হচ্ছে বডিগার্ড।
লামিয়া বারান্দার রেলিংয়ে বসে ভ্রু উঁচিয়ে তাকাতেই দেখলো লাবিব হাসিমুখে এগিয়ে এসে মেয়েটির সাথে হাত মেলাতে চাইল। কিন্তু মেয়েটি উত্তেজিত হয়ে সরাসরি লাবিবের গলায় ঝাঁপিয়ে পড়ে গালে চুমু খেলো। লাবিব বিরক্ত হয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু মেয়েটি নাছোড়বান্দা।
লাবিব আশেপাশে তাকিয়ে উপরে তাকাতেই তার চোখে চোখ পড়লো লামিয়ার সাথে। ব্রাশ হাতে বসে আছে লামিয়া। এক মুহূর্ত তাকিয়ে ‘ছ্যা’ বলে মুখ বাঁকিয়ে চলে গেলো। তা দেখে লাবিব বিরক্ত গলায় বললো —

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– Leave my throat.
লাবিবের কণ্ঠ শুনে মেয়েটি ছেড়ে দিয়ে বললো — কালকে তো বললে আজ বাসা ছেড়ে চলে যাবে। এখনো এখানে কেনো?
– হ্যাঁ, একটু পরেই যাবো। এসো এখন।
বলেই মেয়েটিকে নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো।
লুবনা বেগম চোখ কুঁচকালো। এই মেয়েটিকে তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না। সবসময় লাবিবের আশেপাশে ঘেঁষাঘেঁষি করে, এসব তার একদম সহ্য হয় না।
ভেতরে ঢুকেই মেয়েটি লুবনা বেগমকে জড়িয়ে ধরলো। লুবনা বিরক্ত হলেও কিছু বললেন না। লাবিবও বুঝতে পারলো, তার মা এই মেয়েকে পছন্দ করেন না এটাও সে জানে। তারপর ও কিছু বললো না।
এদিকে রাশেদা বেগম সাবরিনাকে ফিসফিস করে বললেন —

– মেয়েটা তো খুব সুন্দর, বিদেশি নাকি? কে এ?
সাবরিনা বেগম কপাল কুঁচকে উত্তর দিলেন —
– চিনলে না নাকি? আবিরের বাবার বন্ধুর মেয়ে। আমাদের সাথেই তো দেশ ছেড়ে ছিলো। বিদেশে পড়াশোনা করেছে। লাবিবের সাথেই পড়তো।
সবাই ধীরে ধীরে পরিচিত হলো।
ঠিক তখনই সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো লামিয়া। বললো —
– মা, খেতে দাও। খুব খিদে পেয়েছে।
লতিফা বেগম হেসে মনিকার দিকে তাকিয়ে বললেন —
– অনেক দূর থেকে এসেছো, এসো খাও।
তারপর লাবিবের দিকে তাকিয়ে বললেন —
– তুইও তো এখনো খাসনি, ওকে নিয়ে একসাথে খেতে বস।
লামিয়া মায়ের এসব আদিখ্যেতা দেখে বিরক্ত হয়ে টেবিলে বসলো। খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করলো —

– মা, মাহির, তায়েব, তায়েবা কোথায়?
– তুই ছাড়া সবাই কলেজ-ভার্সিটিতে চলে গেছে।
লামিয়া চুপ করে ফোন বের করে মাহিরকে কল দিলো। একবার রিং হয়ে কেটে গেলো। বিরক্ত হয়ে ফোন পাশে রেখে খেতে লাগলো।
এরপর টেবিলে এসে বসলো লাবিব আর মনিকা। মনিকা লামিয়ার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকালো, কিন্তু লামিয়ার সেদিকে খেয়াল নেই। দিব্যি খেতে ব্যস্ত।
মনিকা হঠাৎ বাঁকা হাসি দিয়ে বললো —
– ও মাই গড, এটাই সেই কালো মেয়েটা না? কুচকুচে কালো, মোটা ছিলো এখন কীভাবে স্লিম আর গাঁয়ে রং বাদামী হলো?
লাবিব শান্ত চোখে তাকালো মনিকার দিকে। তারপর আবার সামনে তাকিয়ে দেখলো, লামিয়া ফোনে ব্যস্ত থেকেও দিব্যি খেয়ে যাচ্ছে। সে কিছুই শুনছে না, যেন কিছু যায় আসে না। এতে লাবিবের ভ্রু কুঁচকালো। তারপর গম্ভীর গলায় বললো —

– চুপচাপ খাও, মনিকা।
মনিকা পরোটার দিকে তাকিয়ে মুখ বিকৃত করে বললো
– ইয়াক, তেলে ডুবানো! আমি এগুলো খাবো না। তুমি আমার জন্য অন্য কিছু আনো, প্লিজ। আমি ডায়েটে আছি।
লাবিব শান্ত গলায় উত্তর দিলো —
– একটা খেলেও কিছু হবে না।
– তাহলে তুমি খাইয়ে দাও। তুমি খাওয়ালে আমি বিষও খেতে রাজি।
এটা বলেই বাঁকা হেঁসে লামিয়ার দিকে তাকালো মনিকা।
লাবিব চুপচাপ পরোটা ছিঁড়ে খাওয়াতে লাগলো মনিকাকে। মনিকা একটানা কথা বলছে, আর লাবিব হু-হা করছে। মাঝে মাঝে আড়চোখে লামিয়ার দিকে তাকাচ্ছে। লামিয়া দিব্যি খেতে ব্যস্ত। আশেপাশে কি হচ্ছে না হচ্ছে সেদিকে তার মাথা ব্যথা নেই।
মনিকা হঠাৎ বলে উঠলো —

– ও মাই গড, তোমার হাতে এমন কামড়ের দাগ কেনো? এত বিশ্রী কামড় কে দিয়েছে!
লাবিব চমকে উঠলো। আড়চোখে দেখলো, লামিয়া খাওয়া শেষ করে উঠে যাচ্ছে।
লাবিব গম্ভীর গলায় উত্তর দিলো —
– জংলি বিড়াল কামড়েছে। বেশি কিছু না।
মনিকা তা বিশ্বাস করে বললো
– ও গড! ইনজেকশন নিয়েছো তো?
– হুঁ।
মনিকা আর কিছু না বলে খেতে লাগলো।
খাওয়া শেষে লামিয়া গেলো হল রুমে। একা একা ভীষণ বিরক্ত লাগছিলো। সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে মাহিরকে মেসেজ দিতে গিয়েই হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে একটা মেসেজ আসলো।
অবাক হলো লামিয়া। এ নম্বর তো একেবারে প্রাইভেট। মাহির, তায়েব, তায়েবা, হামিদা আর লামহা ছাড়া কারো কাছে নেই। তাহলে এলো কোথা থেকে?
কৌতূহল নিয়ে মেসেজ খুললো।

লিখা ছিলো — ওহে বালিকা তোমার প্রেমে উল্টে পড়ে গিয়েছি, তুলে নাও আমায় তোমার বুকে।
লামিয়া মেসেজ দেখে তার রাগ হলো।
বিরক্ত হয়ে রিপ্লাই দিলো — তাহলে উল্টেই পড়ে থাক সালা।
বলেই ব্লক করে দিলো নাম্বার।
মেজাজ খিটখিটে নিয়ে সোফা থেকে উঠতেই সবাই হল রুমে চলে এলো। খান বাড়িতে চলে যাবে বলে ইসলাম বাড়ির সবাই এগিয়ে দিতে এসেছে।
শারমিন, ফারিয়া, হাফসা এসে লামিয়ার দুই বাহু জড়িয়ে ধরলো।
– কী হয়েছে, এভাবে ধরেছো কেনো? – অবাক হয়ে বললো লামিয়া।
শারমিন মুচকি হেসে বললো —
– চল আমাদের সাথে। একা বাড়িতে কী করবি? তুই থাকলে আমাদেরও ভালো লাগবে।
লামিয়া যেতে চাইছিলো না, কিন্তু মায়ের ধমকে শেষমেশ খান বাড়িতে যেতে হলো।

খান বাড়ি এসে স্তব্ধ হয়ে বসে আছে লামিয়া। শারমিনরা একটার পর একটা কথা বলতেই আছে।
লামিয়া কে চুপচাপ থাকতে দেখে হাফসা বলে উঠলো – লামিয়া কিরে এমন চুপচাপ বসে আছিস কেনো?
লামিয়া হালকা হাঁসি দিলো। ঠিক তখনই দরজা খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো লাবিব আর মনিকা।
মনিকা শক্ত করে লাবিবের হাত ঝাপটে ধরে আছে।
শারমিন মনিকাকে দেখে বললো – আরে আসো আসো মনিকা, আমাদের সাথে আড্ডা দাও।
লাবিব লামিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে শারমিন কে বললো – আজ থেকে ও তোর রুমে থাকবে।
শারমিন ছোট ছোট চোখ করে বললো – মানে?
লাবিব বিরক্তি নিয়ে বললো – মনিকার সাথে তুই রুম শেয়ার করবি। যতদিন মনিকা এখানে আছে। আর দু’মাস পরেই মনিকা আমার সাথে চলে যাবে। তাই এই দু’মাস এডজাস্ট করে নে।
শারমিন মাথা নেড়ে হ্যাঁ বললো। লাবিব কিছু না বলে চলে গেলো।
মনিকা শারমিনের রুমে ঢুকে নিজের জামাকাপড় ভাঁজ করে আলমারিতে গুছিয়ে রাখতে লাগলো। শারমিন, হাফসা আর ফারিয়া বিরক্ত চোখে মনিকার দিকে তাকালো। তারপর ওরা লামিয়ার দিকে তাকাতেই দেখলো লামিয়া ভ্রু উঁচিয়ে তাকিয়ে আছে।

তা দেখে শারমিন ফিক করে হাঁসি দিলো।
লামিয়া বিরক্ত হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো।
এর মধ্যেই লামিয়ার ফোনে কল আসলো। মাহির কল।
ফোন কানে দিয়ে দাঁড়াতেই বললো – হারা* মজাদা, কোথায় গিয়ে মরছিস আজকে?
মাহির হাসি গোপন করে বললো – ভাই একটা কাজে গিয়েছিলাম। তুই কোথায়?
লামিয়া বললো – খান বাড়িতে আছি।
মাহির ভ্রু কুঁচকে বললো – তুই ওই বাড়িতে কী করছিস?
লামিয়া শারমিনদের দিকে তাকিয়ে বললো – পরে বলবো। তুই দাঁড়া, আমি আসছি। বলেই কল কেটে দিলো।
তারপর শারমিনের দিকে তাকিয়ে বললো – শারমিন আপু, এখন আমাকে যেতে হবে। পরে আবার আসবো।
শারমিন বললো – আরো একটু থাক।
লামিয়া মাথা নেড়ে বললো – না আপু, আজকে ম্যাচ আছে। পরে কথা হবে।
বলে সে বেরিয়ে গেলো খান বাড়ি থেকে।

প্রতিদিনের মতো ক্লাস শেষ করে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে হামিদা। আজকে ক্লাস শেষ হতে একটু বেশিই দেরি হয়ে গেছে।
হঠাৎ একটা বাইক এসে থামলো তার সামনে। ভয়ে পিছিয়ে গেলো হামিদা। সামনে তাকাতেই দেখলো, তার ক্লাসের একটা ছেলে নাম নয়ন। তাকে দেখেই বিরক্ত হলো সে। কিছুদিন ধরে এই ছেলেটা তার পেছনে লেগে আছে।
– হামিদা জান, এই রৌদ্রে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছো বুঝি?
হামিদা বিরক্ত হয়ে অন্য দিকে হাঁটতে লাগলো।
নয়ন দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়িয়ে রাস্তা আটকালো।

হামিদা রেগে বললো – কি সমস্যা? রাস্তা আটকে আছেন কেনো? সরুন সামনে থেকে।
নয়ন ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো – আমার কথা না শুনলে তোমাকে যেতে দিবো না।
হামিদা রাগে সাইড দিয়ে যেতে যাবে, এর আগেই নয়ন তার হাত ধরে ফেললো।
হামিদা রেগে কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই একটা জোরালো বারি খেলো নয়ন পিঠে।
ব্যথায় হাত ছেড়ে নিচে বসে পড়লো সে।
হামিদা অবাক হয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখলো— ক্রিকেট ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া।
হাতে থাকা ঘড়ি খুলে দিয়ে হামিদার হাতে ধরিয়ে দিলো। হামিদা বুঝলো লামিয়া এখন কি করতে যাচ্ছে। বাঁধা দিতে চাইলো, কিন্তু লামিয়া ঝাড়া দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো।
তারপর সামনে গিয়ে এলোপাথাড়ি ব্যাট দিয়ে পেটাতে লাগলো নয়নকে।
মাহির দৌড়ে এসে লামিয়াকে জোর করে সরিয়ে নিলো। সুযোগ বুঝে নয়ন বাইক নিয়ে পালালো।
কিন্তু লামিয়ার রাগ তখনো থামছে না।

দূরে দাঁড়িয়ে দু’জন অনেকক্ষণ ধরে পুরো দৃশ্যটা দেখছিলো।
রাসেল হাঁ করে তাকিয়ে থেকে গিলতে গিলতে বললো – ভাই, মাইয়া তো জল্লাদ!
জুনায়েদ মুচকি হেসে বললো – এমন মেয়েই আমার পছন্দ।
রাসেল কষ্টের গলায় বললো – ভাই, আপনে দেখছেন ওর রাগ? সেদিন আমাকেও এক কিক মেরেছিলো, এহনো ব্যাথা পাই কথাটা মনে পরলে।
জুনায়েদ বিরক্ত হয়ে বললো – তুই খুবই দুর্বল, তাই মেয়েদের কিক খেয়ে কাত হয়ে গেছিস। দাঁড়া, তোর জন্য কলিকাতা হারবাল অর্ডার করছি কালকে।
রাসেল ঠোঁট উল্টে আস্তে বললো – ভাই, আপনে এই মাইয়ার প্রেমে একদম অন্ধ হইয়া গেছেন।
জুনায়েদ হালকা হাঁসি দিলো।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠলো। কল রিসিভ করে বললো – তাড়াতাড়ি আয়, আমি অপেক্ষা করছি। বলেই কল কেটে সামনে তাকালো। কিন্তু দেখলো— লামিয়া নেই।

– আপা, তুই বাসায় চলে যা। গম্ভীর গলায় বললো লামিয়া।
হামিদা রেগে উঠলো – তোকে একা রেখে আমি কোথাও যাবো না।
– আপা, আমার খেলা আছে।
– তোকে খেলতে হবে না, চল বাসায়।
– আপা, তুই বাসায় যা। আজকে আমার ফাইনাল ম্যাচ আছে।
হামিদা অবাক হয়ে বললো – ম্যাচ মানে? তুই ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলবি?
লামিয়া ছোট্ট ছোট্ট চোখ করে বললো – তোর মনে হয় আমি ছেলেদের সাথে ক্রিকেট খেলবো? মেয়েদের টিমের সাথে আমার ম্যাচ।
হামিদা খুশি হয়ে বললো – তাহলে আমিও তোর ম্যাচ দেখবো।
– আচ্ছা, বিরক্ত মুখে বললো লামিয়া।
ঠিক তখন পিছন থেকে আওয়াজ ভেসে এলো – আমরা এসে গেছি।
হামিদা আর লামিয়া পিছনে তাকাতেই দেখলো মাহির, তায়েব, তায়েবা, আর সাফওয়ান শারমিন সবাই দাঁড়িয়ে আছে।

হামিদা অবাক হয়ে বললো – আপনি এখানে?
সাফওয়ান হাঁসি দিয়ে বললো – তুইও এখানে? আমি জানতাম না। আসলে আজকে লামিয়ার ম্যাচ আছে তায়েব তায়েবা বললো তাই আমরা সবাই দেখতে আসছিলাম।
লামিয়া বিরক্ত মুখে বললো – হয়েছে তোমাদের গল্প, এবার চলো।
সবাই একসাথে এগিয়ে গেলো মাঠের দিকে।

সময়টা তিনটা বেজে বিশ মিনিট। আকাশে মেঘ জমেছে। শুশু বাতাস বইছে চারদিকে। মনে হচ্ছে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচণ্ড বৃষ্টি নামবে।
এখনো ক্রিকেট ম্যাচ শুরু হয়নি। মাঠের এক পাশে বসে আছে হামিদা, সাফওয়ান, মাহির, তায়েব, আবির, শারমিন, ফাহিম, লামহা, ফারিয়া, হাফসা, রাশেদ, আরিফ আর জাহিদ। সবাই এক্সাইটেড হয়ে বসে আছে, চোখ মাঠের দিকে। একে একে খেলোয়াড়দের নামতে দেখছে তারা।
মাঠের চারপাশ থেকে ভেসে আসছে চিৎকার, হৈচৈ।
বিশেষ অতিথিদের আসনে বসে আছে জুনায়েদ আহমেদ। ভার্সিটির নেতার ভাই বলে কথা।
ফোনে কথা বলতে বলতে হঠাৎ মাঠের দিকে চোখ যেতেই কথা আটকে গেলো জুনায়েদের।
স্কাই ব্লু রঙের একটা কামিজ পরে, উড়না কোমড়ে পেঁচিয়ে রেখেছে, মাথায় ক্যাপ দিয়ে, হাতে ব্যাট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লামিয়া তার টিম নিয়ে।
জুনায়েদ হা করে তাকিয়ে রইলো লামিয়ার দিকে। চারপাশে তাকিয়ে দেখলো—সবাই শুধু গেঞ্জি আর ট্রাউজার পরে খেলছে, আর লামিয়া একেবারে আলাদা।
এদিকে ভার্সিটির গেট দিয়ে সাদা রঙের একটা গাড়ি প্রবেশ করতেই জুনায়েদ উঠে দাঁড়ালো। গাড়ি থেকে নামতেই লাবিবকে দেখে বললো—

— এতোক্ষণ লাগে তোর আসতে?
লাবিব হেসে বললো—
— সরি ইয়ার, দেরি হয়ে গেলো।
তখনই গাড়ি থেকে নামলো মনিকা। লাবিব মনিকাকে নিয়ে অতিথিদের আসনে গিয়ে বসল। কিন্তু সে এখনো লামিয়াকে দেখে নি। এসেই ফোন হাতে নিয়ে কী যেনো কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলো।
জুনায়েদ খেলা শুরু করার সিগনাল দিতেই রাসেল মাইক হাতে নিয়ে দাঁড়ালো।
খেলা শুরু হলো।
টস হলো। টসে জিতলো লামিয়াদের টিম। সবার আগে লামিয়াদের টিম বলিং করবে আর তাদের অপনেন্ট টিম ব্যাট করবে।

ম্যাচ শুরু হলো। লামিয়া হাতের বল তায়েবা কে দিলো। তায়েবাও এই ম্যাচে আছে। সে বলিং খুব ভালো পারে। তায়েবা হাতে বল নিয়ে বল করার জন্য রেডি হলো।
তার সামনে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে তাদের অপনেন্ট টিমের একটি মেয়ে। তায়েবা বল ছুঁড়তেই মেয়েটি জোরে ব্যাট চালালো, বল উড়ে গেলো। লামিয়াদের টিমের মেয়ে দৌড়ে ক্যাচ ধরতেই সবাই চিৎকার করে উঠলো, আউট!
হামিদারা সবাই একসাথে চিৎকার করে উঠলো। মাহির “লামিয়া” বলে চিৎকার করে উঠলো। নাম ডাক শুনতেই লাবিব চমকে সামনের দিকে তাকিয়ে হা হয়ে গেলো। এতক্ষণ সে এভাবে খেয়ালই করে নি। এই মেয়ে ভার্সিটিতে ক্রিকেট খেলছে—তা দেখে লাবিবের চোখ বড় বড় হয়ে গেলো।
জুনায়েদ হা করে লামিয়াদের খেলা দেখছে।

খুব হট্টগোল লড়াই হচ্ছে দুই টিমের সাথে। একে একে সবাই আউট। তারা অনেক অল্প রান করেছে।
এইবার লামিয়াদের টিমের পালা। একে একে তারা ভালোই খেলছে। একের পর এক রান নিয়েই চলেছে। আর মাত্র এক রান নিলেই লামিয়াদের টিম জিতে যাবে।
লামিয়া বেশ সিরিয়াস এই ম্যাচে।
হঠাৎ করেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি শুরু হলো। চারপাশ অন্ধকার হয়ে গেলো মেঘে ঢেকে।
বৃষ্টি নামতেই সবাই খুশি হয়ে উঠলো।
লাবিব অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে।
লামিয়া ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে আছে। সামনে থেকে বল আসতেই চোখ বুজে এক শর্ট করলো। অপনেন্ট টিমের মেয়েরা বল ক্যাচ ধরতে যাবে, তখনই কাদায় পিছলে ধপ করে পড়ে গেলো। বল উড়ে ছয় হতেই চারপাশ থেকে চিৎকার করে উঠলো সবাই।

জুনায়েদ হাততালি দিতে দিতে দাঁড়িয়ে গেলো। বৃষ্টিতে ভিজে সবাই একাকার হয়ে গেছে। কারো খেয়াল নেই।
রাসেল মুখ দিয়ে সিটি বাজিয়ে উঠলো। লাবিব হা করে তাকিয়ে রইলো।
শারমিন, হামিদা, মাহির, তায়েব, সাফওয়ান, আবির, লামহা, ফাহিম, ফারিয়া, হাফসা, রাশেদ, আরিফ, জায়েদ—সবাই দৌড়ে মাঠে এসে বিজয় উল্লাস করছে।
লাবিব দূর থেকে দাঁড়িয়ে সবাইকে দেখে আবার অবাক হলো। সবাই তাহলে এইখানেই ছিলো!
মনিকা মুখ বাঁকিয়ে বললো—আরেঃ এটা লামিয়া না? ও গড, কেউ স্যালোয়ার সুট পরে খেলতে নামে? উফ, ডিসগাস্টিং!

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৭

লাবিব মনিকার কথায় প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। কিছু না বলে সামনে তাকাতেই দেখলো, বৃষ্টিতে ভিজে সবাই মজা করছে। তা দেখে লাবিব মুচকি হাসলো।
মঞ্চে ডেকে লামিয়া আর তার টিমকে ট্রফি দেওয়া হলো। ট্রফি দেওয়ার সময় লামিয়া লাবিবকে খেয়াল করে নি।
জুনায়েদ লামিয়ার দিকে হা করে তাকিয়েছিলো। লামিয়া তা দেখে চোখ ঘুরিয়ে ট্রফি নিয়ে চলে গেলো।
জুনায়েদ তা দেখে বাঁকা হাসলো।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৯