Home প্রিয় রাগিনী প্রিয় রাগিনী পর্ব ৯

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৯

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৯
লামিয়া ইসলাম শাম্মী

প্রবল বেগে ঝড় বইছে। বিকেলের ম্যাচ শেষ করে সবাই বৃষ্টিতে ভিজে হৈচৈ করতে করতে খান বাড়ির ছেলেমেয়েরা খান বাড়ি আর ইসলাম বাড়ির ছেলেমেয়েরা ইসলাম বাড়িতে প্রবেশ করলো। সবাই এ নিয়ে অনেক বকাও খেলো। লতিফা বেগম রেগে লামিয়ার পিঠে দুই ঘা বসিয়ে দিলো।

– মেয়ে মানুষের কিসের এত খেলা-খেলি!
সব ভাইবোনদের উদ্দেশে বলে গেলেন, কারোর যদি ঠান্ডা বা জ্বর বাঁধে তবে ইচ্ছামতো কেলাবেন। সব ভাইবোন মাথা নিচু করে মুখ গম্ভীর করে শুনলো আর যে যার রুমে ফ্রেশ হতে চলে গেলো।
লম্বা এক সাওয়ার নিয়ে মাথায় গামছা পেঁচিয়ে বেরিয়ে এলো লামিয়া। বিছানায় পিঠ ঠেকিয়ে পা লম্বা করে আরাম করে বসতেই ধপ করে তায়েবা রুমে ঢুকলো। তা দেখে লামিয়া ভ্রু নাচালো।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

– বড় চাচি তাদের বাসায় যেতে বলেছে আমাদের। সবাইকে ডেকেছে। নিচে আয়, মেজো মা তোকে ও যেতে বলেছে।
– ওই বাড়িতে যাবো কেনো এই ঝড়-বৃষ্টির রাতে? বিরক্ত হয়ে বললো লামিয়া।
– জানি না। ছোট্ট করে উত্তর দিলো তায়েবা।
– আমি যাবো না, তোরা যা। বলেই চোখ বন্ধ করে শুয়ে পড়লো।
তায়েবা আর কিছু না বলে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পর লতিফা বেগম টেনে-হিঁচড়ে সবার সাথে লামিয়াকেও খান বাড়িতে পাঠালেন। মায়ের জোরাজুরিতে না পেরে লামিয়া কালো মুখে খান বাড়িতে গেলো।

রাত নয়টা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।
খান বাড়ির খাবার টেবিলে বসেছে হামিদা, লামহা, রাশেদ, আরিফ, জায়েদ, আবির, সাফওয়ান, ফাহিম, লামিয়া, মাহির, তায়েব, তায়েবা, শারমিন, হাফসা, ফারিয়া, লাবিব আর মনিকা।
বাড়ির কর্তারা আগে খেয়ে যে যার রুমে চলে গেছেন।
পুরো ডাইনিং রুমজুড়ে খিচুড়ির গন্ধ মৌমৌ করছে। এতক্ষণ লামিয়া রেগে থাকলেও খিচুড়ি দেখে রাগ উধাও হয়ে গেলো। এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে গরম গরম খিচুড়ি, সাথে কষা মাংস থাকলে তো আর কোনো কথা নেই!
চট করে বলে উঠলো—

– ও বড় চাচি, তাড়াতাড়ি আমার প্লেটে আগে দাও! আহা কী ঘ্রাণ আসছে, ঘ্রাণে আমার খিদে আরও বেড়ে গেলো।
লামিয়ার কথা শুনে সবাই হেসে উঠলো। সাবরিনা বেগম হেসে সবার আগে লামিয়ার প্লেটেই খিচুড়ি বাড়লেন।
– আম্মুর হাতে খিচুড়ি আর কষা মাংস ভুনা, কি যে মজা হয় খেয়ে দেখ! খুশি হয়ে বললো শারমিন।
লামিয়া কিছু না বলে চটজলদি খেতে শুরু করলো।
– উহু বড় চাচি, অনেক মজা হয়েছে।
সাবরিনা বেগম হেসে বললেন—
– আস্তে আস্তে খা মা, যত লাগবে নিয়ে খাবি।
লামিয়া মাথা নাড়লো।

– আজ নাকি ম্যাচে জয়ী হয়ে ফিরেছিস, শুনলাম। পিছন থেকে বললেন লুবনা বেগম।
লামিয়া মাথা নাড়তেই লুবনা বেগম খুশি হয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করলেন।
লাবিবের পাশে বসা মনিকা তা দেখে মনে মনে রেগে উঠলো। পাশ ফিরে তাকাতেই দেখলো, লাবিব চুপচাপ বসে খাচ্ছে। আবার চোখ ফিরিয়ে দেখলো লামিয়া তৃপ্তি করে খাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে মুখ বাঁকিয়ে বললো—
– ও গড! জানেন আন্টি, লামিয়া সালোয়ার কামিজ পরে খেলেছে। খেলার পোশাক ছেঁড়ে। দেখতে একদমই ভালো লাগেনি, গাঁওয়া গাঁওয়া লেগেছে।
বলেই চোখ উল্টিয়ে ভাব নিলো।
মনিকার কথায় সবাই বিরক্ত হলো।
লামিয়া খাবার রেখে একবার মনিকার দিকে তাকালো। তার গায়ে বেবি পিংক কালারের নাইটসুট। কিছু না বলে আবার খাওয়াতে মন দিলো।

মাথা নিচু করে কোনোদিকে না তাকিয়ে চুপচাপ খাবার খাচ্ছে আবির। খেতে আসার পর থেকে সে কারো সাথে কোনো কথা বলেনি। বিষয়টা কারোর চোখে না পড়লেও লামহার চোখ এড়ালো না।
লামহা খেতে খেতে আবিরের দিকে তাকালো। তখনই আবির মাথা তুলে তাকাতেই চোখাচোখি হলো। লামহা তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলো। আবির তা দেখে মলিন হাসলো।
হামিদা, তায়েবা, লামিয়া, লামহা আর শারমিন পাশাপাশি বসেছে। হামিদার সামনে সাফওয়ান, শারমিনের সামনে রাশেদ, লামহার সামনে আবির আর লামিয়ার সামনে মাহির। তার পাশেই তায়েব, সামনে হাফসা। হাফসার পাশের চেয়ারে মনিকা আর তার ঠিক সামনে বসেছে লাবিব।
সাফওয়ান টেবিলের নিচে দিয়ে পা বাড়িয়ে হামিদার পায়ে খোঁচা দিচ্ছে।
তায়েবা খাওয়া থামিয়ে টেবিলের নিচে তাকাতেই দেখলো সাফওয়ান পা দিয়ে খোঁচা দিচ্ছে, আর হামিদার দিকে মিটিমিটি হাসছে।
তায়েবা হেসে খাবার খেতে খেতে বললো—

– সাফওয়ান ভাই, ভুল জায়গায় ভুল নম্বরে ডায়াল করছেন। অনুগ্রহ করে সঠিক নম্বরে ডায়াল করুন।
সাফওয়ান কিছু না বুঝে বললো—
– মানে?
– খোঁচা দিতে চান দেন, কোনো সমস্যা নেই, কিন্তু ভুল জায়গায় কেনো খোঁচা দিচ্ছেন? দেখে-শুনে সঠিক জায়গায় খোঁচা দিন একটু। বিরক্ত হয়ে বললো তায়েবা।
তায়েবার কথা বুঝে সাফওয়ান তাড়াতাড়ি পা সরাতে গিয়ে টেবিলে ধাক্কা খেলো। তা দেখে সবাই হেসে উঠলো।
শারমিন হাসতে হাসতে গলায় খাবার আটকে খেকখেক করে কাশতে লাগলো। রাশেদ তাড়াতাড়ি পানি বাড়িয়ে দিলো, কিন্তু শারমিন জেদ করে সেটা না নিয়ে লামহার এগিয়ে দেয়া পানি নিলো।
রাশেদ কিছু না বলে খাওয়ায় মন দিলো। সবাই তা দেখেও কিছু বললো না। হাঁসি-মজায় ভরে উঠলো ডাইনিং টেবিল।
মনিকা সেটা দেখে রাগে গজগজ করছে—কেউ তাকে পাত্তাই দিচ্ছে না।
লাবিবের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে হালকা হেসে খাচ্ছে। তখনই ন্যাকা কণ্ঠে বললো—

– লাবিব, আমার আর খেতে ইচ্ছে করছে না।
লাবিব তাকিয়ে বললো—
– আর একটু আছে, খেয়ে নাও।
মনিকা খুশি খুশি মুখ করে বললো—
– তাহলে সকালের মতো খাইয়ে দাও।
লাবিব কিছু না বলে খাওয়াতে লাগলো। মনিকা বাঁকা হেসে লামিয়ার দিকে তাকালো, দেখলো সে খাবার খাচ্ছে।

বাইরে বৃষ্টি তখনো থামেনি। খাবার শেষে সবাই হল রুমে বিশ্রাম নিচ্ছে, হাঁসি-মজায় জমে উঠেছে পরিবেশ।
মনিকা লাবিবের একদম গা ঘেঁষে বসেছে, পারে না কোলের উপর বসতে। লাবিব বিরক্ত হলেও মুখে কিছু বললো না।
ঠিক তখনই ফোন আসলো, লাবিব উঠে চলে গেলো।
এদিকে রাশেদ সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ভাইবোনদের নিয়ে নিজেদের বাড়ি চলে গেলো।

বৃষ্টি যেন শপথ করেছে থামবে না আজ। মেঘ গর্জন করছে গুরুম গুরুম করে।
ডুপ্লেক্স বাড়ির চারদিকে কালো পোশাক পরা লোকেরা দাঁড়িয়ে আছে হাতে বড় বড় বন্দুক নিয়ে।
ঘুটঘুটে অন্ধকার রুমে জানালার সামনে উদম গায়ে দাঁড়িয়ে আছে একজন সুঠাম দেহের পুরুষ।
– স্যার, একটু একটু খবর পেয়েছি। সে এখন বাংলাদেশে আছে, বললো নিহিড়।
– আর?
– স্যার, আর কোনো খবর এখনো পাইনি।
– তাহলে খুঁজে বের করো সে কোথায় আছে, আর তার দুর্বলতা কী। আমি তো মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করতে ভীষণ পছন্দ করি, বলেই বাঁকা হাসলো।
– জী স্যার। বলেই চলে গেলো নিহিড়।
নিহিড় বেরিয়ে যেতেই একজন মেয়ে রুমে ঢুকে দরজা আটকে দিলো।
পুরুষটি এগিয়ে এসে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে বললো—
– not interest, get out.
মেয়েটি মুখ ভার করে চলে গেলো। আজ রাতে টাকা পাওয়া হলো না তার।
পুরুষটি সিগারেট জ্বালালো, ধোঁয়া ছেড়ে দিলো। তারপর কিছু ভেবে বাঁকা হেসে উঠলো।

রাত একটা বেজে দশ মিনিট।
বাইরে ঝুম বৃষ্টি।
বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করছে লামিয়া, ঘুম আসছে না তার। শোয়া থেকে উঠে বসলো। বারান্দা দিয়ে বাইরে উঁকি দিয়ে দেখলো, বৃষ্টি এখনো কমেনি। কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকে রুমের দরজা খুলে ছাদের দিকে পা বাড়ালো।
ছাদের দরজা খুলতেই মেঘ গর্জে উঠলো। সাথে সাথে হাত দিয়ে কান চেপে ধরলো লামিয়া। তারপর এক বুক সাহস নিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়ালো। টিপটিপ বৃষ্টি তার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ ভিজিয়ে দিচ্ছে। সাদা জামা লেপ্টে আছে শরীরের সাথে। ঠান্ডা পানিতে হালকা কেঁপে উঠলো সে। ঠোঁট গুলোও কাঁপছে।

পাখির মতো হাত দুটো মেলে চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। চোখ থেকে নোনতা দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো, কিন্তু বৃষ্টির ফোঁটার সাথে মিলিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর মেঘের গর্জন শুনে ভয় পেয়ে কান চেপে ধরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো মেঝেতে।
সারাদিন যে মেয়েটা হাসি-তামাশা, ঝগড়া-মারামারি করে কাটায়, সেই মেয়েই যে বজ্রপাতকে ভয় পায়—কে বলবে? না, কেউ জানে না। কারণ লামিয়া কাউকে তার দুর্বলতা দেখাতে চায় না। সবাই ভাবে সে খুব শক্ত আর সাহসী।
কিছুক্ষণ বসে থেকে লামিয়া আবার রুমে ফিরে গেলো। চারপাশে অন্ধকার থাকায় খেয়াল করলো না, কেউ তাকে মন ভরে দেখছিলো। লামিয়া চলে যাওয়ার পর সেই পুরুষ হালকা হেসে সিগারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে দিলো।
– ভীতু একটা।

নিজের রুমে ফিরে ভেজা জামাকাপড় বদলে ফোন হাতে নিলো লামিয়া। সময় তখন তিনটা বেজে ত্রিশ মিনিট। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বিছানায় শুয়ে পড়লো। ভেজা চুল থেকে টপ টপ করে পানি পড়ছে, তবু মুছলো না, সেই ভেজা চুলেই ঘুমিয়ে গেলো।

সকাল আটটা বাজতেই সবাই উঠে পড়লো। নাস্তা সেরে যে যার কাজে লেগে গেলো। সকাল থেকে লামিয়াকে না দেখে মাহির, তায়েব আর তায়েবা তার রুমে এলো। দেখলো নবাবজাদি তখনো ঘুমিয়ে।
তাদের দেখে তায়েবা বিরক্ত হয়ে টেনে তুলতে গেলো। কিন্তু হাত ছুঁতেই কপালে ভাঁজ পড়লো। কপাল-গলায় হাত রাখতেই বুঝলো—ওর তো জ্বর এসেছে।
মাহির এগিয়ে এসে ডাকতেই লামিয়া ধীরে চোখ মেলে বললো,

– কয়টা বাজে?
মাহির কোনো উত্তর না দিয়ে গম্ভীরভাবে বললো,
– তোর এতো জ্বর আসলো কীভাবে?
লামিয়া হালকা হাসলো।
– মাঝরাতে ঘুম আসছিলো না, তাই বৃষ্টিতে ভিজতে গিয়েছিলাম ছাদে।
তিনজন একসাথে অবাক হয়ে উঠলো।
– মানে তুই ছাদে গিয়েছিলি? মাঝ রাতে? মেজোমা জানলে কী করবে, বুঝছিস?
– জানবে কীভাবে? তোরা না জানালে তো আর জানবে না। – হেসে উত্তর দিলো লামিয়া।
ঘড়ি দেখে বললো, – দশটা বাজে তো। তোরা নিচে অপেক্ষা কর, ফ্রেশ হয়ে আসছি।
মাহির, তায়েব আর তায়েবা বিরক্ত হয়ে বেরিয়ে গেলো।
ফ্রেশ হয়ে নেভি ব্লু কামিজ পরে নিলো লামিয়া। চুল বেণী করে নীল রঙের চিকন বেল্টের ঘড়ি হাতে পড়লো। অন্য মেয়েরা যেখানে শখ করে চুড়ির কালেকশন করে কিনে কিনে সাজায়। সেখানে
লামিয়া ঘড়ির কিনে কিনে ভরে ফেলছে করেছে। ড্রেসিং টেবিল ভর্তি নানা রকম লেডিস ঘড়ি। তা দেখে হালকা হাসলো।

বিছানায় ফেলে রাখা ভেজা গামছা হাতে নিয়ে বারান্দায় মেলে দিলো। মা সেটা বিছানায় দেখলে সর্বনাশ হবে। গামছা মেলতে গিয়ে সামনের দিকে তাকাতেই চোখ কুঁচকে গেলো।
সামনেই খান বাড়ি। লামিয়ার রুমের বিপরীতে লাবিবের রুম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফির মগ হাতে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে লাবিব—সরাসরি লামিয়ার দিকে। তার পাশেই দাঁড়িয়ে মনিকা।
হঠাৎ মনিকা লাবিবের হাত থেকে কফির মগ কেড়ে নিলো। যেখানে লাবিব ঠোঁট রেখেছিলো, ঠিক সেইখানে ঠোঁট রেখে কফি খেলো সে।
লাবিব কিছুই লক্ষ্য করলো না। সে শুধু তাকিয়ে রইলো লামিয়ার দিকে।
মনিকার কান্ড দেখে লামিয়া বিরক্ত হয়ে বমি করার ভঙ্গি করে ভেতরে চলে গেলো।
লাবিব সেটা দেখে মনে মনে হেসে উঠলো। মনিকা আবার মগটা এগিয়ে দিলে লাবিব ঠাণ্ডা গলায় বললো,
– লাগবে না।
বলেই নিজ রুমে চলে গেলো।

খান বাড়ির বারান্দায় বসে বসে চা খাচ্ছে শফিকুল খান। ছেলেদের নিয়ে তার ভীষণ বিরক্তি—আজকাল যেনো কিছুতেই নিয়ম মানে না কেউ। ভ্রু কুঁচকে কাপটা হাতে নিয়ে চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছিলো তাই দেখছে।
ঠিক তখনই বাড়ির দরজায় ট্রিং ট্রিং করে কলিং বেল বেজে উঠলো।
শফিকুল খান বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে দরজার দিকে গেলো। মনে মনে গজগজ করছে—“এই সময় আবার কে এলো?”
দরজা খুলতেই ধুম করে ঝড়ের বেগে এক হকার ঢুকে পড়লো। হাঁপাতে হাঁপাতে মুখ ভরা শব্দে বলে উঠলো,
– দুইজন নাই!
হঠাৎ এমন আওয়াজে শফিকুল খান চমকে উঠলো। আতঙ্কে প্রায় লাফ দিয়ে উঠলো সে। বুকে হাত ঠুকে থুতু ছুঁড়ে ভয়ে কাঁপা গলায় বললো,

– ক… কোথায়?
হকার কোনো বিরতি না নিয়ে পটরপটর করে বললো,
– ঢাকাতে আর নারায়ণগঞ্জে।
ভ্রু কুঁচকে গেলো শফিকুল খানের। কণ্ঠ ভারি করে বললো,
– কীভাবে?
হকার আবার পটরপটর করে উত্তর দিলো,
– দলী ওদলী গনপিটুনিতে একজন আহত, আরেকজন নিহত। আসি… আসসালামুয়ালাইকুম।
বলেই যেনো ঝড়ের মতো দৌড়ে বেরিয়ে গেলো হকার।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্তব্ধ হয়ে রইলো শফিকুল খান। কিছুক্ষণ পর ধীরে দরজা লাগিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার নিজের আসনে গিয়ে বসলেন।
কাপের ভেতর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো তিনি।

নাসির কে. ইন্ডাস্ট্রিজ কোম্পানির এগারো তলা বিল্ডিংয়ের মিটিং রুমে বসে কোম্পানির Owner নাসির কায়সার এর জন্য অপেক্ষা করছে সবাই।
সকাল দশটা বাজতেই কোম্পানির গেট দিয়ে সারি সারি কালো গাড়ি প্রবেশ করলো। সব গাড়ির গেট খুলে বেড়িয়ে এলো কালো পোশাক পড়া কিছু লোক। মাঝখানের গাড়ি থেকে দ্রুত পায়ে নেমে গাড়ির দরজা খুললো নিহিড়।
ঠিক তখনই গাড়ি থেকে নেমে এলো সুষ্ঠোম দেহের অধিকারীর এক পুরুষ। গায়ে রং সাদা ধবধবে ফর্সা, চোখ সোনালী রঙের, ঢেউ খেলানো চুল। সাদা শার্ট ইন করা কালো প্যান্ট, বুকের কাছে বোতাম খোলা থাকায় ধবধবে ফর্সা বুক দেখা যাচ্ছে। বুকে সূর্যের ট্যাটু আঁকা। তাকে যে কোনো মেয়ে দেখলেই প্রেমে পড়ে যাবে তা নিশ্চিত।
পাশ থেকে নিহিড় বললো, “স্যার, চলুন সবাই অপেক্ষা করছে।”
লোকটি বাঁকা হেঁসে হাঁটতে হাঁটতে বললো, “যে কাজ দিয়েছিলাম, সে হয়েছে?”

– জি স্যার, হয়েছে। তবে তার দুর্বলতা এখনও পাইনি, খুব তাড়াতাড়ি খুঁজে পাব।
লোকটি আর কিছু না বলে মিটিং রুমে চলে গেলো।
মিটিং রুমে হালকা পাতলা কথাবার্তা চলছিল। অনেকে বিরক্ত হয়ে চুপচাপ বসে ছিল। কেউ কেউ বারবার ঘড়ি দেখছিল।
হঠাৎ দরজা খুলে গেল। দরজার মৃদু শব্দে সবাই স্তব্ধ। দরজার দিকে তাকাতেই ফর্মাল পোশাকে নিহিড় প্রথমে প্রবেশ করলো, তার পিছনে এলেন সেই সুদর্শন পুরুষ।
রুমে নিঃশব্দ নীরবতা। সবার চোখে ভয়। তার উপস্থিতি সবার ভিতরে কাঁপন তুললো। আস্তে ধীরে তিনি নিজের চেয়ারে বসে হাত দিয়ে সবাইকে বসতে বলে দিলেন। নিহিড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মিটিং শুরু করো।”
টেবিলে সোজা মাঝ বরাবর বসে তিনি এক এক করে সবার দিকে দৃষ্টি ফেলছিলেন।
হঠাৎ নিহিড় তার হাতে থাকা ফোন বাড়িয়ে দিল তার দিকে। ফোনে কিছু দেখে তিনি রেগে গেলেন। নিজেকে শান্ত রেখে সামনে তাকিয়ে বললেন, “মিঃ ইকবাল, শুনেছি আমার পিঠে আমার শত্রুদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আমাকে ধংস করার চেষ্টা করছেন?”

ইকবাল সাহেব ভয়ে ঢোক গিললো।
লোকটি বাঁকা হেসে বললো, “বুঝলেন ইকবাল সাহেব, আমি মানুষটা মোটেই সুবিধার না। আমার দয়া-মায়া নেই, জানেন তো?”
ইকবাল সাহেব তাড়াতাড়ি পায়ে ধরে কান্নায় ভেঙে বললো, “স্যার, আমার ভুল হয়েছে। আর হবে না, একটা সুযোগ দিন, আমাকে মারবেন না। আমার পরিবার আছে।”
লোকটি বাঁকা হেসে বললো, “মানুষ একই ভুল বারবার করতে পছন্দ করে। সুযোগ দিলে ওই সুযোগ ব্যবহার করে পিছন দিয়ে বাঁশ দিয়ে দিবে তাই না, আমি আপনাকে সুযোগ দিতে পারলাম না।”
বলেই নিহিড়ের দিকে শান্ত চোখে তাকালেন। নিহিড় প্যান্ট থেকে বন্দুক বের করে কানে কানে কিছু বললো। লোকটির চোখ জ্বলজ্বল করে জ্বলে উঠলো।

তারপর ইকবাল সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “শুনেছি আপনার নাকি সুন্দরী মেয়েও আছে?”
মেয়ের কথা শুনে ইকবাল সাহেব কান্না করতে করতে বললো, “দয়া করে, স্যার, আমার মেয়েকে কিছু করবেন না। আমার মেয়ে ছোট। আমি দোষ করেছি, শাস্তি আমাকে দিন।”
লোকটি বাঁকা হেসে বললো, “কচি জিনিসে আমার বরাবরই একটু বেশি লোভ থাকে। আর আপনাকে শাস্তি দিতেই হবে, আপনার ভুলের শাস্তি আপনার মেয়েকেও পেতে হবে।”
ইকবাল সাহেব আর কিছু বলতে পারলো না। কপাল বরাবর সুট করে দিল। রুম ভর্তি মানুষের ভয়ে প্রাণ যায় যায় প্রায়।

ইকবাল সাহেবের দেহ লুটিয়ে পড়তেই লোকটি সামনে তাকিয়ে সবাইকে বললো, “যে আমার বিশ্বাস ভাঙবে, তারও ঠিক এই অবস্থাই হবে।” বলেই বেরিয়ে গেল।
পিছনে পিছনে নিহিড়ও। লোকটি দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে বললো, “আমাদের ওইখানে দ্রুত যেতে হবে। তাড়াতাড়ি গাড়ি বের করো।”
গাড়িতে বসেই বললো, “বাড়িতে ফিরে ইকবাল সাহেবের মেয়েকে যেনো আমার বিছানায় পাই।”
নিহিড় জি স্যার বলে গাড়ি স্টার্ট দিল।

ক্লাস শেষ করে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে ইসলাম বাড়ির চার বিচ্ছু।
প্রচন্ড গরমে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি যেতে চায় না, কিন্তু লামিয়া মাহির তায়েব তায়েবা কে হাটিয়ে বাসায় নিচ্ছে।
তায়েবা বিরক্ত হয়ে বললো, “আমার এনার্জি নেই, আর আমি হাঁটতে পারছি না।”
মাহির বিরক্ত হয়ে বললো, “এইভাবে এই গরমে হাঁটলে প্রাণ কখন জানি চলে যায়।
লামিয়া মুখে চ শব্দ করে ধুম করে কিল মেরে দিলো দুজনের পিঠে। কিল খেয়ে দুজন মুখ ভোঁতা করে রাখলো।
পাশ থেকে তায়েব হেঁসে বললো, “তোরা দাঁড়া, আমি আইসক্রিম কিনে আসছি।” বলেই রাস্তা পার হয়ে আইসক্রিম আনতে চলে গেলো।

তায়েবা, মাহির, লামিয়া একটা ছায়ার নিচে দাঁড়ালো।
লামিয়া আশেপাশে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো রাস্তার ওপারে। বাদামী রঙের ছোট্ট কুকুর ছানা লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছে। তা দেখে লামিয়া হালকা হাসলো, কিন্তু হাঁসি বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না।
ছানাটি দৌড়ে রাস্তার মাঝে এসে পড়লো, দূর থেকে প্রবল বেগে গাড়ি আসছে। ছানাটার উপরে উঠে গেলে বাঁচবে না। ভেবেই লামিয়া দৌড়ে চলে গেলো ছানাটিকে সড়িয়ে আনলো। গাড়িটি আচমকাই লামিয়ার পায়ের সামনে ব্রেক করলো।

মাহির ও তায়েবা তা দেখে চিৎকার করে উঠলো।
তায়েবা আইসক্রিম কিনে রাস্তা পার হতেই এই দৃশ্য দেখে আইসক্রিম ফেলে দৌড়ে লামিয়ার কাছে এলো।
গাড়ি আচমকা ব্রেক করলো করাতে। ড্রাইভ সিটে থাকা নিহিড় মাথায় বাড়ি খেয়ে পিছনে তাকিয়ে বললো, “স্যার।”
গাড়ির মধ্যে বসে লোকটি আইপ্যাডে চোখ বুলিয়ে ইকবাল সাহেবের মেয়েকে দেখছিলো।
হঠাৎ ব্রেক হওয়ায় তিনি রেগে বললেন, “কী সমস্যা, এভাবে ব্রেক করলে কেন?”

– স্যার, সামনে হঠাৎ একটি মেয়ে এসে পড়েছে।
লোকটি বিরক্ত হয়ে সামনে তাকাতেই চোখ আটকে গেলো শ্যামবর্ণের মেয়েটাকে।
মেয়েটি রেগে কুকুর ছানা কোলে নিয়ে তাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে আছে। ছানাটিও আদুরে লেপ্টে গায়ের সাথে মিশে আছে, লামিয়ার কোলে।
লোকটি লালসা চোখে তাকালো লামিয়ার দিকে। নীল রঙা কামিজ, বেণী করা চুল, সামনের চুল কপালে এসে পড়েছে। অগ্নি দৃষ্টিতে পুরো অগ্নিশিখা।
দেখে লোকটি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলো।
তায়েবা, মাহির ততক্ষণে লামিয়ার কাছে দৌড়ে এসে ধমকাধমকি করছে।
লোকটি নেমে এসে খুব শান্ত কণ্ঠে বললো, “হেই, আর ইউ ওকে?”
লামিয়া তায়েবের পিছন ঘুরে তাকালো। তায়েবা তায়েব মাহির হা করে তাকিয়ে আছে।
লামিয়া রেগে সামনে এসে বললো, “রাস্তা কী আপনার বাপের যে উড়াধুড়া গাড়ি চালাচ্ছেন? সামনে-পিছে কাউকে না দেখে মানুষ এভাবে গাড়ি চালায়?”

লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে লামিয়ার দিকে। কেউ তার সাথে গলা উঁচু তো দূরে থাক চোখ তুলে কিছু বলার সাহস পায় না। একটুখানি মেয়ে তাকে কী বললো, ভাবেই মনের মধ্যে হাসলো।
লোকটি অসহায় কণ্ঠে বললো, “সরি, আর হবে না। ছানাটা কি আপনার?”
লামিয়া বিরক্ত হয়ে উত্তর না দিয়ে বললো, “শোনেন, বিলাতি ইদুঁর, চোখ-কান খোলা রেখে গাড়ি চালাবেন এখন থেকে।”

বলেই চলে আসতে নিতেই পিছন থেকে লোকটি বললো, “নাসির কায়সার নাম। আপনার নাম কী?
লামিয়া পিছন ফিরে তাকালো, তারপর সামনে তাকিয়ে চলে গেলো। সে ছেলেদের দিকে তাকাতে বা আজাইরা কথা বলতে পছন্দ করে না।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ৮

নাসির কায়সার নিচে ঠোঁট কামড়ে নিহিড়কে বললো, “মেয়েটার খোঁজ নেও। কে এই অগ্নিশিখা। একদিন বা এক রাত, এই ব্রাউনির সাথে যেভাবে হোক, আমি থাকতে চাই।”
বলেই গাড়িতে উঠে চলে গেল নিজ গন্তব্যে।

প্রিয় রাগিনী পর্ব ১০