Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪১

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪১

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪১
সাইয়্যারা খান

আফ্রিকান ব্লাকউড দরজাটা খুলার সময় বিন্দু মাত্র শব্দ হয় নি। সন্তপর্ণে খুলে তৌসিফ ভেতরে ঢুকেছে। গায়ে ছাই রঙা এক শাল জড়ানো। ভেতরে রাতের পরিহিত পাতলা একটা টিশার্ট আর টাউজার। সবে মাত্র তাহমিনাকে বাসায় দিয়ে তৌসিফ ঢুকেছে নিজের ফ্ল্যাটে। খুব সামান্য হলদেটে আলো জ্বলছে ড্রয়িং রুমে। তৌসিফ নিজের রুমে যেতে পা বাড়াবে তখনই মনে হলো এখানে কেউ আছে। কেউ থাকার কথা না তবুও মনের সন্দেহবশত তৌসিফ পা ঘুরিয়ে ড্রয়িং রুমে তাকালো। সোফায় এক পা ভাজ করে নিজের ভাঙা পা নাড়িয়ে যাচ্ছে পৌষ। সাক্ষাৎ ভূত বাদে তাকে আর কিছু মনে করার কথা না কোন সাধারণ মানুষের। তৌসিফের বুকের ভেতর মৃদু চিলিক দিলো। পৌষের এখানে থাকার কথা না এখন। তাকে বেভুর ঘুমে রেখে গিয়েছিলো তৌসিফ। কখন উঠেছে কে জানে? রাতে খাওয়ার অভ্যাস তার কিন্তু তাই বলে এখানে এভাবে তো থাকার কথা না। তৌসিফ সুইচ চেপে দিতে দিতেই প্রশ্ন করলো,

“এখানে এসময় কি করছো পৌষরাত?”
“স্বামী পরকীয়ায় জড়িত হলে বউদের এভাবে রাত জেগে জেগেই পাড় করতে হয়।”
তৌসিফ এক মূহুর্ত থমকে গেলো। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বললো,
“পাগল হয়ে গিয়েছো তুমি?”
“না, তা হবো কেন?”
“তাহলে এসব ফাউল কথা বলার জন্য নিশ্চিত এত রাতে এখানে বসে নেই তুমি?”
বলতে বলতে তৌসিফ এগিয়ে এসেছে। পৌষের সাথে বসা মাত্রই পৌষ কণ্ঠ শক্ত করে বলে,
“বাইরে পরকীয়ায় যান নি না?”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আরেকবার এসব বললে চটকানা খাবে পৌষ। নিশ্চিত তুমি এতরাতে এটা খেতে চাইবে না৷”
“মুখে বলুন, আপনি এই রাতে বাইরে কোন নারীর কাছে যান নি?”
তৌসিফ না বলতে গিয়ে আটকে গেলো। শক্ত হয়েই বললো,
“পরকীয়া করতে যাই নি। পরকীয়া করার মতো জঘন্য কাজ আমি তৌসিফ করি না৷”
“বিশ্বাস করতে বলছেন?”
“আলবাত।”
“তাহলে কোথায় গিয়েছেন?”
“আগে বলো…. ”
“উঁহু৷ আগে আপনি বলবেন কারণ প্রশ্নটা আমার।”
“তুমি কিন্তু দুই দিন যাবৎ আমার প্রতি কঠিন হচ্ছো পৌষরাত। টের পাচ্ছো?”
“যেখানে মূল্যায়নের কোটা শূন্য সেখানে নরম, কঠিক বিষয় না।”
“আমি তোমাকে মূল্যায়ন করি না?”
তৌসিফ ভীষণ অবাক হয়েই প্রশ্নটা করে ফেললো যার উত্তর না দিয়ে পৌষ বললো,
“করেন কিন্তু নাও ডোন্ট চেইঞ্জ দ্যা টপিক প্লিজ।”

পৌষের কণ্ঠে কিছু একটা ছিলো যা তৌসিফকে স্তব্ধ করলো সেকেন্ডের জন্য। বিয়ের দিন থেকে আজ পর্যন্ত পৌষ প্রশ্নই করে যাচ্ছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছে না৷ তৌসিফ দিচ্ছেই না উত্তর তাহলে পাবে কিভাবে? তৌসিফ তো কোনোভাবেই চাইছে না পৌষ উত্তর পাক৷ এসব জানুক বা এতে জড়িয়ে পরুক। কোন দরকার নেই এসবের। তৌসিফ শুধু তার নিজের ছোট্ট একটা সংসার চায় আর কিছুই না। এতটা বছর একা থেকে তার এই চাওয়াটা নিতান্তই তুচ্ছ করে দেখার মতো না। চাইলেই তাকে পৌষ সুখ টুকু দিতে পারে অথচ পৌষ নিষেধ সত্ত্বেও বারবার একই পথে হাঁটছে। হাঁটতে গিয়ে চোট পাচ্ছে তবুও হাঁটা থামাচ্ছে না। তৌসিফ অবশ্য জানে বা বলতে গেলে জেনেছে এতোগুলো মাসে, পৌষটা এমনই। নিরাছাট্টা, নির্বিকার মনুষ্য তার, শুষ্ক হৃদয়ের অধিকারী পৌষ। তৌসিফের তো মনে হয় ছোট থেকে দুর্ব্যবহার, তুচ্ছতাচ্ছিল্য পৌষকে এমন বানিয়ে দিয়েছে। এপ্যাথিটিক হয়ে গিয়েছে পৌষ। চাইলেও দোষটা ওকে দিতে পারে না তৌসিফ। অভিযোগ তুলতে পারে না। অসুস্থতার উপর কিসের আর অভিযোগ?
আস্তে করে পৌষের হাঁটুতে হাত রাখে তৌসিফ। বেশ ব্যথা পেয়েছে পায়ে মেয়েটা অথচ সমানতালে নাড়াচাড়া করছে এখন। রাগে হোক অথবা উত্তেজনায় হোক পা এমন ভাবে নাড়াচ্ছে দেখে তৌসিফ নিজেই কষ্ট পাচ্ছে। নিচু স্বরে তৌসিফ বললো,

“ব্যথা এই পায়ে। নাড়িও না পৌষরাত।”
“কোথায় গিয়েছেন?”
“একটু অফিসে।”
“নিচের অফিস?”
“হ্যাঁ।”
“কোথায় গিয়েছিলেন?”
বেশ সহজ গলায় পৌষ পুণরায় জিজ্ঞেস করে। তৌসিফ ভেবেছিলো মিথ্যা বলে কাটিয়ে দিবে কিন্তু পারলো না৷ পৌষকে কিছু বলবে তার আগেই পৌষ নিজের হাত রাখলো তৌসিফের অফ হোয়াইট টাউজারে। ডান হাত দিয়ে ঝাড়তে ঝাড়তে বললো,

“অফিসে গিয়ে নিশ্চিত মাটির উপর হাঁটু গেড়ে ছিলেন না? নিশ্চিত অফিসে গিয়ে কোন মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ছিলেন না? তাহলে কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিলেন আপনি? আমার চোখে ধুলো দিয়ে কেন যেতে হলো? কেন আমার চোখের সামনে দিয়ে যেতে পারলেন না? কাপুরষ কোথাকার! মিথ্যা বলতে মুখে বাঝে না একটাবার। চোখেমুখে মিথ্যা লেপ্টে আছে আপনার। পুরুষত্ব নেই! একদমই নেই! কাপুরুষের সংসার করি আমি!”
“পৌষরাত!”

ধমকটা এতই জোরে ছিলো যে বুয়ারা সহ কিছুটা সজাগ হলো। তায়েফা নিজেও চমকে উঠেছে ঘুমন্ত অবস্থায়। লাফ দিয়ে উঠলেও বের হলো না ও। এভাবে স্বামী, স্ত্রীর মাঝে যাওয়াটাও বেমানান তাও কি না এত রাতে।
পৌষ দমলো না। ধমক খেয়ে চোখ নামিয়েছে ঠিকই তবে মুখের লাগাম টানতে পারলো না আজ। বরাবরই পৌষের স্বভাব এটা। মুখে যা আসে বলে দেওয়াটাই মূখ্য তার কাছে। এতে ফলাফল কি হবে তা নিয়ে ভাবে না কখনো। দাঁত চেপে ধরে পৌষ ফের বলে উঠলো,
“আমি নিজ চোখে দেখেছি বাড়ীর পেছনে এক নারীকে যেতে। আমাকে বুকে নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে চোরের মতো প্রেমিকার কাছে ছুটে গিয়েছেন। তাকে বুকে জড়িয়ে ছিলেন। প্রেম পাচ্ছিলো খুব তাই না? কুটকুটানি সামলাতে পারেন নি। ভেবেছিলেন পৌষ আর জানবে কিভাবে? কিন্তু পৌষ তো জেনে গিয়েছে। বাড়ীর ভেতরে খারাপ নিয়ে চলাচল আপনার আর আপনার বড় ভাইয়ের।”

কথাগুলো শেষ করতে করতেই নিজের চোয়ালে শক্ত হাতের চাপ অনুভব করলো পৌষ। তৌসিফের দহনদৃষ্টি তাকে জ্বালিয়ে মারবে যেন। চোয়ালে চাপ দিয়ে তৌসিফ শক্ত করে আদেশ করলো,
“দাঁত ছাড়ো। দাঁত চেপে কথা বলবে না আমার সাথে।”
পৌষ ঠাই শক্ত হয়ে রইলো। তৌসিফ যেন ক্ষণে ক্ষণে অবাক হচ্ছে এই মেয়ের সাহস দেখে। পৌষ দুই হাত দিয়ে তৌসিফের বুকে ধাক্কা দিয়ে আরেকবার শুধু উচ্চারণ করলো,
“কাপুরুষ!”
তৌসিফ হাত তুলে ফেললো তাত্ক্ষণিকভাবে। চড় খাওয়ার জন্য প্রস্তুত পৌষের গালে অবশ্য চড় পড়ে না। তৌসিফ ওর বাহু ধরে টেনে তুলে। পৌষ নড়ে না৷ অনড়ভাবে বলতে থাকে,

“যাব না আমি৷ আজ হয় উত্তর নাহয়… ”
“নাহয়? নাহয় কি করবে তুমি?”
“আপনার থেকে ছুটি। এমন *লের মিথ্যা সংসারে লাত্থি মেরে চলে যাব আমি।”
তৌসিফ এবারে ওকে সোজা টান দিয়ে তুলে ফেললো। পা মটমট করে উঠে পৌষের। ব্যথায় যেন অবশ হয়ে আসতে চায়। তৌসিফ থামলো না৷ ওকে টেনে রুমে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো। পৌষ ঝাঁঝালো গলায় বললো,
“কি মারবেন? মারবেন আমাকে?”
“মেরে একদম পুরাতন প্রেমিকের কাছে পৌঁছে দিব।”
“প্রেমিক না আমার সে। জীবিত আছে এখনও।”
“কবর দেখাই নি?”
“জীবন্ত আমি দেখি নি?”

তৌসিফ এগিয়ে এলো। পৌষ এবারে খুব সামান্য ভয় পেলো তবে প্রকাশ করলো না। তৌসিফ ওকে শক্ত করে ধরে বসিয়ে দিলো বিছানায়। প্লাজু তুলে দেখলো রক্ত বেরিয়ে গিয়েছে পা দিয়ে। কোন মেয়ে মানুষ এতটা কঠিন হয় বলে তৌসিফের জানা ছিলো না৷ ওর কি ব্যথা লাগছে না? তৌসিফ ব্যান্ডেজ খুলে নতুন করে বাঁধলো। নিজে গিয়ে টাউজার বদলে এলো। এসব ময়লায় গা খিতখিত করে তার৷ এসেই দেখলো পৌষ আগের মতোই বসে আছে। তৌসিফ এবারে ওর সামনে বসলো। হাত দুটো ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“কয়বার কাপুরষ ডেকেছো আমাকে?”
“যতবার ডাকা উচিত ছিলো।”
“আমি ঐ ডাকটার যোগ্য না পৌষরাত।”
“ঐ বেটি কে ছিলো হ্যাঁ? কে ছিলো? ধরবেন না আমাকে আপনি। আর কোনদিন আপনার বুকে ঘুমাব না আমি! আপনার এই ধোঁকা মনে থাকবে আজীবন।”

“এখন সত্যিই চটকানা খাবে পৌষরাত।”
“সত্যি বলতে এত গড়িমসি কে করে? তালুকদার বাড়ীর রক্তে এত মিথ্যা কিভাবে? জীবিতকে সহ মৃত বানিয়ে দিন আপনারা।”
“সম্রাট ভাইজান বেঁচে নেই পৌষরাত।”
“আমার চোখ মিথ্যা দেখে নি।”
“গল্প শুনবে একটা?”
“মনগড়া মিথ্যা শোনার সখ আমার নেই।”
“মিথ্যায় যদি সুখ থাকতো তাহলে মিথ্যাই বলতাম কিন্তু আমাদের মিথ্যায় তো সুখ নেই পৌষরাত৷ না আছে সত্যে সুখ। আমাদের সূচনা ঠিক যতটা আলোয় আলোকিত, উপসংহারে তার চাইতে কয়েকগুণ বেশি তমসার পর্দা।”
“পর্দা তুলে দেখুন। হতে পারে আলো লুকিয়ে আছে।”
তৌসিফ ব্যাথাতুর হাসলো। পৌষের কোলে আচমকা মাথা দিয়ে বললো,
“তুলেছি তো। এই যে পর্দা তুলতেই তোমাকে পেলাম৷ তোমার চাইতে উজ্জ্বল আলো আর কি হতে পারে আমার নিকট।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪০

পৌষ মোহাচ্ছন্ন হচ্ছে। তৌসিফ হারাচ্ছে অতীতে। ঠিক ততবছর আগে যতবছর আগে পৌষের জন্ম হয় নি। ঠিক ততবছর আগে যতবছর আগে তৌসিফ প্রথম বুঝেছিলো কোন সাধারণ পরিবারে না বরং এক রাজনীতি ঘরনায় জন্ম তার , যার শুরু এবং শেষ শুধুমাত্র ক্ষমতা।
পৌষ তৌসিফের গালে হাত রাখলো। ইচ্ছে করে তৌসিফকে উত্তেজিত করেছে পৌষ। আর তার শুনবার পালা। পৌষ জানতে চায় কি আছে এই বিশাল বাড়ীতে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২