প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৭ (২)
সাইয়্যারা খান
“কি? বউ কই তোমার?”
তুহিন হেলেদুলে এসে প্রশ্নটা করলো তৌসিফকে। তৌসিফ কফির কাপে চুমুক বসিয়ে উত্তর দিলো,
“ঘুমে আছে।”
“আমি ডাকি তাহলে।”
কথাটা বলেই উঠতে চাইলো তুহিন। এতক্ষণ যাবৎ লনে বসে ছিলো দু’জন। পৌষ তখন ফোন দেওয়াতে তুহিন চলে এসেছে। পৌষ হাজার হুমরিতামড়ি দেখালেও সে ক্লান্ত। তৌসিফ এক প্রকার হাতে পায়ে ধরে ওকে খেতে রাজি করিয়েছে। পা ব্যথার ঔষধ হাজার বলেও মুখে তুলতে পারে নি। তৌসিফ ব্যর্থ হয়েই ঘুম পাড়িয়েছে ওকে। বেশ আরামে ঘুমাচ্ছে পৌষ তাই ওর ঘুম বাঁচাতে তুহিনকে নিয়ে লনে এসে বসেছে। তৌসিফ ওকে থামালো,
“বসো এখানে। ও ঘুমাচ্ছে। ঘুমাক।”
তুহিন আর জ্বালালো না। বসলো। ভাইয়ের দিকে সন্দিহান দৃষ্টি ফেলে বললো,
“তুমি গতকাল ওমন মাতলামি করলে যে?”
তৌসিফ কড়া দৃষ্টিতে তাকালো। ধমক দিলো,
“মাতলামো কখন করেছি? আমার বউ ভুগেছে। তোমরাতো আর ভুগো নি।”
তুহিন বেশ আশ্চর্য হলো। বললো,
“তোমার বউ নিজেকে বাঁচাতে আমাকে কয়বার ডেকেছে। বেচারীকে আমি ভয় পেতে দেখেছিলাম।”
তৌসিফ একটুও দমলো না৷ ছোট ভাইয়ের সামনে ইমেজ খারাপ করা যাবে না তাই বললো,
“কেউ স্পাইক করেছে।”
“আমি এটাই সন্দেহ করছি কিন্তু আমি পুরোদমে নজর রেখেছিলাম। পিয়াসী ছিলো না কাল।”
“ও না থাকুক। কাউকে পাঠাতে তো পারে আর তার চাইতেও বড় কথা, আপাতত পিয়াসী বাদে এই বিদেশের মাটিতে কারো সাথে ঝামেলা নেই আমার।”
“তুমি এত আপসেট হচ্ছো কেন মেঝ ভাইয়া? আমি দেখছি বিষয়টা।”
তৌসিফ আর মুখ ফুটে আপসেট হওয়ার কারণ বলতে পারলো না। তার বউ তার জন্য রঙিন পানি হারাম করে দিয়েছে, এমনকি বিয়ারও বাদ। তৌসিফ বউ প্রেমে সব বাতিল করেছে। তুহিনকে উদ্দেশ্য করেই অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,
“আমি দেখে আসি। লম্বা ঘুম হওয়ার কথা ওর।”
“আমিও চলি।”
তুহিন উঠে দাঁড়ালো। তৌসিফ না করতে পারলো না৷ দুই হাত হাঁটা দিলো হোটেল রুমে। তৌসিফ আগে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
“কিছু খাবার অর্ডার করে এসো৷ পৌষরাত খাবে।”
তুহিন মাথা নাড়লো। যাবে না ও৷ মুখের উপর বললো,
“পৌষকে তুলো। বাইরে যাব ওকে নিয়ে।”
“পায়ে ব্যথা ওর।”
“তুমিই দিয়েছো।”
তৌসিফ তর্ক করলো না। আগে নিজে ঢুকলো। বিছানা খালি। সরে দাঁড়িয়ে তুহিনকে ঢুকার জায়গা দিলো। তুহিন ঢুকেই আরাম করে বসলো অতঃপর চেঁচালো,
“পৌষ! এই ফুপাতো বোন। কোথায় ঢুকে বসে আছো?”
পৌষ বেরিয়ে এলো বারান্দা থেকে। মুখ হাত পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো বাইরে। তৌসিফ এগিয়ে এসে কপালে হাত রেখে তাপমাত্রা দেখলো। বললো,
“উঠেছো কেন? শুয়ে থাকতে।”
“কেন শুয়ে থাকব?”
তৌসিফ বউয়ের কাছে বরাবরই থতমত খায়, এবারেও খেলো। বললো,
“অসুস্থ তো তুমি।”
“আপনার জন্য।”
তৌসিফ কথা বাড়ালো না। তুহিন পেছন থেকে বললো,
“ফুপাতো বোন, রেডি হও। চলো বাইরে যাই।”
“ও অসুস্থ। যাবে না এখন।”
“আমি যাব৷ চলুন।”
পৌষ বলতেই তুহিন সোজা দাঁড়িয়ে গেলো। তৌসিফ নিজেও গায়ে ওভারকোট জড়ালো। পৌষকে একটা গায়ে জড়িয়ে দিলো। আরো একবার নিশ্চিত হতে জিজ্ঞেস করলো,
“হাঁটতে পারবে?”
“না পারলে উড়ে উড়ে যাব।”
রাগ এখনও পড়ে নি ওর। তৌসিফ বাইরে সিংহ হলেও বউয়ের কাছে নিতান্তই বিড়াল তাও আবার ভেজা বিড়াল।
হাঁটতে হাঁটতে ওরা যখন বেশ খানিকটা দূরে এলো। চোখে পড়লো রেড ব্যালী নামের একটা ফুড কোর্ট। পৌষ তুহিনের দিকে তাকিয়ে বললো,
“ওখানে চলুন। সুন্দর ঘ্রাণ আসছে।”
তুহিন ওকে নিয়ে গেলো। মুখ কালো করে পেছনে তৌসিফও গেলো। তুহিন কোন কমতি রাখছে না। দেবড় হয়েও শাশুড়ীর মতো কুটনামি দেখাচ্ছে, স্বামী স্ত্রীর হানিমুনে পুরোদমে বাগড়া দিচ্ছে। সসেজ সিজলিং আর অস্ট্রেলিয়ান মিট পাই অর্ডার করলো পৌষ। তুহিন নিজের মতো ফিশ রেপার নিলো। সামনেই সুন্দর একটা পাইন গাছ। নিচে বেঞ্চ রাখা। তুহিনের সাথে ওখানে বসে তৌসিফকে উদ্দেশ্য করে পৌষ বললো,
“বিল দিয়ে আসুন।”
তৌসিফ বিরবির করলো। বিল পরিশোধ করে এসে ওদের সামনে বসতেই চামচে করে মিট পাই ওর মুখের সামনে চলে এলো। অবাক হয়ে তাকালো তৌসিফ। পৌষ নিজে ধরেছে চামচটা। মুখ খুলে হা করে খাবার মুখে তুললো। খাবার চিবুতে চিবুতে পৌষ বললো,
“এটা তো অনেক মজা। আরো নিন।”
তৌসিফের মুখে আরেক চামচ দিয়ে পাঠিয়ে দিলো পৌষ। পৌষের পেট ভরলেও মন ভরলো না। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“চা খাব।”
তুহিন বাঁকা চোখে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বসলো,
“পেটে রাক্ষস ঢুকলো নাকি? মুখ থামছেই না।”
“নিজে যখন গলা পর্যন্ত গিলেন তখন?”
তুহিন খ্যাঁক করে উঠলো,
“ভাইয়ের সংসারে কয়দিন খেয়েছি। এখনই খোঁটা শুনতে হচ্ছে। খাব না আর৷”
বলেই পৌষের হাতে থাকা বাকি মিট পাই ছিনিয়ে নিজের মুখে পুরলো অতঃপর উঠে কথাবার্তা ছাড়া চলে গেলো। পৌষ পেছন থেকে চেঁচালো,
“ছোঁচা কোথাকার!”
তুহিন শুনলোই না। দূর থেকে ইহানকে দেখলো তৌসিফ। সুযোগ বুঝে বউয়ের গা ঘেষলো একটু। ভেবেছিলো পৌষ ঝটকা মারবে কিন্তু কপাল খুবই ভালো গেলো এই দফায়। পৌষ ওভাবে থেকেই বললো,
“চা খাব।”
“এখানে চা কিন্তু ওমন ভালো লাগবে না হানি। র চা দিবে।”
“দুধ চা খাব।”
“কফি চলবে?”
“চা বলেছি আমি।”
তৌসিফ পৌষের হাত মুঠো করে উঠে দাঁড়ালো। সামনে আরো কিছু স্টল আছে। ওখানে গিয়ে একটা স্টলে বললো যাতে র চায়ে দুধ, চিনি মিশিয়ে দেয়। রাজি হলো না ছেলেটা তবে কিছু অতিরিক্ত টাকা দিতেই হাসিমুখে রাজি হলো সে। তৌসিফ সতর্ক করলো যাতে চা মজা হয়। লোকটা পাকিস্তানি ছিলো তাই বোধহয় চা খুব দক্ষ হাতে বানিয়েছে। দুধ চা দুই কাপ এনে তৌসিফ পৌষের পাশে বসলো। চা পান করতে করতে পৌষ বেশ ফুরফুরে মেজাজে বললো,
“ঐ দেখুন। সুন্দর না?”
তৌসিফ তাকালো। বৃদ্ধ এক দম্পতি কফি পানে ব্যাস্ত। তৌসিফ পৌষের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো। বেশ আবেগ নিয়ে বললো,
“আমরাও এভাবে থাকব একদিন।”
“কিভাবে থাকব?”
“কেন?”
তৌসিফ অবাক হলো। পৌষ ঠেস মে’রে বললো,
“আপনি তো লিভার, কিডনি, গুর্দা, ফেপসা সব নষ্ট করে ফেলছেন। যেই মুখ ভরে লাল পানি খান। বাবাগো বাবা।”
তৌসিফের মুখ কালো হলো। ওর জানা নেই বিগত কয়বছর এই খোঁটা শুনতে হবে ওর। চা শেষ করে দু’জন যখন উঠলো তখন সিনডি শহরে রাত নেমেছে। রাতে ভীর কমার বদলে বাড়লো। আজ তুষারপাত হয় নি। চমৎকার ঠান্ডা এক আবহাওয়া। তৌসিফ লাল রঙের হার্ট সেপের কতগুলো বেলুন কিনে পৌষের হাতে দিলো। হাঁটু ভেঙে ওর সামনে বসে কান ধরে বললো,
“আ’ম স্যরি হানি৷”
পৌষ হাসলো তবুও মুখে বললো,
“পরেরবার থোঁতা ভেঙে দিব।”
তৌসিফ মাথা নাড়লো। পৌষ চোখা মুখ করে বললো,
“শুধু শুধু টাকা নষ্ট।”
অথচ তৌসিফ দেখলো ওর মুখ জুড়ে চমৎকার হাসি। দুজন বেশ চমৎকার সময় কাটাচ্ছিলো যতক্ষণ পর্যন্ত না পৌষ যা খেয়েছিলো তার সবটা উগলে দিলো।
টানা দুই মাস চারদিনের হানিমুন শেষ করে আগামী কাল দেশে ফিরবে তৌসিফ, পৌষ। তৌসিফ সময়টা বাড়াতে চেয়েছিলো কিন্তু পৌষ এখানে আর থাকতে পারছে না। বিগত দিনগুলো খুব সুন্দর কেটেছে তাদের। অস্ট্রেলিয়ার শহরগুলো ঘুরেছে পৌষ তৌসিফের হাত ধরে কিন্তু আর টিকতে পারছে না। শেষ রাতটা তায়েফার বাসায়ই থাকবে দু’জন। তায়েফা কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখ মুছচ্ছে। পৌষ আজ নিজে রান্না করবে বলেছে। ইহান, ইরাও মুখ ভার করে আছে। তুহিন বলেছিলো সাথে নিবে কিন্তু পড়াশোনার ব্রেক নেই আপাতত তবে ওরা যাবে শিঘ্রই। তৌসিফ বোনকে বের করে আনলো রান্না ঘর থেকে। হাত ধরে চোখটাও মুছালো। নরম স্বরে বললো,
“এমন করলে কিভাবে যাব আমি আপা?”
“থাক না তাহলে আপার কাছে।”
“দেশে কত কাজ আপা।”
“তুই তো জানিস তুসু। আমি কিভাবে থাকব?”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৭
তায়েফা হুহু করে কেঁদে ফেললেন। তুহিনও বোনকে সামলাতে এগিয়ে এলো। দুই ভাইয়ের বড় বোন কাঁদলো তখন। রান্না ঘরে থাকা পৌষ নাক মুখ চেপে ধরলো। কোনমতে চুলার আঁচ কমিয়ে সবাইকে পাশ কাটিয়ে নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত রুমে চলে গেলো।
