Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২ (২)
সাইয়্যারা খান

রাজনীতির প্রাঙ্গণে সম্রাট ছাড়িয়ে গিয়েছিলো সকলকে। তার বাপ, চাচা, দাদাকে টপকে গিয়েছিলো কয়েক ধাপ উপড়ে। উঁড়েছিলো সম্রাট। সে জানতো উড়ন্ত পাখির ডানা ক্লান্ত হয় কিন্তু সম্রাট ক্লান্ত হয় না৷ বছরের পর বছর নেতাদের সাথে আর মন্ত্রীদের ছায়াতলে সম্রাটের রাজত্ব বাড়লো। ছাককাগজে তার উন্নতি বৈ অবনতি দেখা গেলো না। দেখতে দেখতেই যেন সম্রাট হয়ে উঠেছিলো এই এলাকার সবচাইতে বিশ্বস্ত মানুষ। গরীব দুঃখী হোক বা বিত্তবান সবার চোখেই সম্রাট নামটা ছিলো ভরসার, নিজেদের একান্ত পরিজন। তার সেই এলোমেলো ভাব, ছন্নছাড়া জীবনে জুড়ে গিয়েছিলো অসংখ্য মানুষ। সম্রাট যখন পুরোদমে রাজনীতি করছিলো তখনই এক সন্ধ্যায় খবর আসে শাহজাহান তালুকদার দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করেছেন। সম্রাট তখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে খুব জরুরি কোন এক কাজে গিয়েছিলো। সেখান থেকে ছুটে যখন বাড়ী ফিরলো তখন নিথর শাহজাহান তালুকদার বাড়ীর উঠানে পড়ে ছিলো। তাহমিনা আর তামিমা দুই বোনের আহাজারিতে ভরে উঠেছিলো তালুকদার বাড়ীর আঙিনা। শাহরিয়ারও সাভার থেকে চলে এসেছিলো। এরমানে সবচাইতে দেড়ী হয়েছিলো সম্রাটের। কথাটা ভাবতেই তার বুকের একদম বাম পাশে সূক্ষ্ম ব্যথা সৃষ্টি হয়। দৃষ্টিতে আটকায় বাবার সাদা পাঞ্জাবির লাল রঙটা। মারার জন্য একটা বুলেটই তো যথেষ্ট ছিলো তাহলে তার বাবাকে মারতে কেন এত এত বুলেট ছাড়তে হলো? যেন খুব রাগ করে ঝাঝড়া করেছিলো শাহজাহান তালুকদারের বুকটা। সম্রাট তখনই ডাকে,

“তাহমি?”
তাহমিনা কান্নার মাঝে শুনে ভাইজানের ডাক। ছুটে এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে সম্রাটের বুকে। আর্তনাদ করে কেঁদে উঠে,
“ভাইজান! ভাইজান আব্বার কি হলো? ভাইজান আমার আব্বাকে কে মারলো ভাইজান? তুমি দেখো না কিভাবে মেরেছে। আমার বাবার বুক ফালাফালা করে দিয়েছে। তুমি কোথায় ছিলে ভাইজান? আমার বাবা…”
চারপাশে গ্রামবাসী ঘিরে তালুকদার বাড়ী। এত এত মানুষের মাঝে কাঁদছে বাড়ীর মেয়ে। সম্রাট বোনকে বুকে জড়িয়ে রাখে। সবাই ভাবে বড় ভাই স্বান্তনা দিচ্ছে বোনকে কিন্তু সম্রাট তখন ভিন্ন কাজে ব্যস্ত। তাহমিনার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
“আমার রাইফেল কোথায় রেখেছিস?”
কান্না ভুলে তাহমিনা৷ তাকাতে চায় ভাইয়ের মুখের দিকে। সম্রাট বুক থেকে ছাড়ে না। তাহমিনা আস্তে করে উত্তর করে,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আলমারির পেছনের দিকে।”
“একটা নিয়ে আয়। আমি বাগান বাড়ীর দিকে যাচ্ছি। আম গাছটার নিচে আসবি।”
“কোন মডেল আনব?”
“আজকে তোর মন ভালো করার জন্য ছাড় দিলাম তাহমি। যেটা তোর পছন্দ হয় নিয়ে আয়।”
অতঃপর তাহমিনাকে ছেড়ে সম্রাট বাবার লাশ পেড়িয়ে চলে যায়। সবাই এবারেও ভুলই ভেবে নেয়। ভেবে নেয় বাড়ীর বড় ছেলে হয়তো জানাজার ব্যবস্থা করতে গিয়েছে অথচ সম্রাট ফিরে না ঘন্টার পর ঘন্টা পেরিয়ে গেলেও। সমশের তালুকদার ততক্ষণে আয়োজন করেছে। গোসল শেষ করে খাটিয়ায় লাশ রাখা হয়। তাহমিনা চুপচাপ তখন। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাবার লাশের দিকে। মুখে তার দোয়া-দরুদ। তাহমিনার মন তখনও জানে না সে আসলে কার জন্য দোয়া করছে। সে কি বাবার জন্য দোয়া করছে নাকি ভাইজানের জন্য তাহমিনা সেদিন সত্যিই বুঝতে পারে নি।
এশারের আজানের পরও যখন সম্রাট ফিরলো না তখন সমশের নিজেই আদেশ করে,

“খাটিয়া তুল শাহরিয়ার। দেড়ী হচ্ছে।”
“না, তুলবে না এখন। ভাইজান আসবে।”
তাহমিনার কথায় সমশের এগিয়ে আসে। ভাইঝির মাথায় হাত রেখে শান্ত স্বরে বুঝায়,
“লাশ এতক্ষণ রাখতে নেই মা। সম্রাট হয়তো ব্যাস্ত।”
“না, ভাইজান আসছে। আমাকে বলে গিয়েছে।”
সমশের কথা বাড়ায় না। সময় দেয়। তাহমিনা বাবার খাটিয়া ধরে রাখে। নিতে দিবে না কাউকে। যখন আম গাছের নিচে সে রাইফেল দিতে গেলো তখন তার কপালে চুমু খেয়ে সম্রাট বলেছিলো,
“বাবার শরীর থেকে যতটুকু র ক্ত গিয়েছে ততটুকু খু নীর দেহ থেকেও যাবে। তুই অপেক্ষা করিস তাহমি। তোর ভাইজান লাল হাত নিয়েই ফিরবে।”

সম্রাট ফিরেছিলো রাত বারোটা নাগাদ৷ একদম লাল হতেই ফিরেছিলো। ফিরে এসে চুপচাপ পুকুড় ঘাটে গোসল করে সাদা পায়জামা, পাঞ্জাবি পরে মাথায় টুপির আড়ালে তার ঝাঁকড়া চুল লুকায়। গায়ে আতর মেখে বেরিয়ে যায়। বাবার খাটিয়া কাঁধে তুলে এই প্রথম সে উচ্চারণ করে,
“ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।”
অতঃপর বিরবির করে বলে,
“চাচার খু নিকে খু ন করার আগে তার দাফন করেছিলাম বাবা কিন্তু তোমার খু নিকে আগে আমি খু ন করেছি। এখন তোমার দাফন হবে।”

শাহাজাহান তালুকদারের চল্লিশ দিনের দিনই সুলাইমানের বউ দুই ছেলে সন্তান নিয়ে প্রস্থান করেন তালুকদার বাড়ী থেকে। তাকে জোর করেও রাখা যায় নি এখানে। ভীতু নারীটি স্বামীকে প্রচুর ভালোবাসতেন। বারবার বারণ করতেন এসব রাজনীতি না করতে কিন্তু তিনি শুনেন নি। কারো কথাই শুনেন নি। কোন ভাবেই চান নি তার সন্তান দুটোও এমন রাজনৈতিক পরিবারে বড় হোক। সব শুনে সমশের তালুকদার ওয়াদা করলেন,
“আপনার বাচ্চাদের কখনো রাজনীতিতে জড়াতে দিব না আমি। বিশ্বাস রাখুন।”
“আমার প্রতি দয়া করুন। আমি মিরপুর চলে যেতে চাইছি। আমার সন্তানদের নিয়ে তার বাবার বাড়ীতেই থাকব।”
সমশের হাজার বারণ করেও তাকে আটকাতে পারে নি। সেদিন প্রথম বিছিন্ন হয়েছিলো তালুকদার পরিবার। সুলাইমান শুধু দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় নি বরং তার বংশধরেরাও নিয়েছিলো। সুলাইমানের করা মিরপুরের বাড়ীতেই আশ্রয় নিয়েছিলো তার দুই সন্তান আর স্ত্রী। এসব নোংরা, জীবনঘাতি রাজনীতি থেকে তারা চলে গিয়েছিলো বহুদূর।

সম্রাটের রাজত্ব তখন বাড়তে লাগলো। চারপাশে তার নাম-ডাক বাড়তে লাগলো হু হু করে। এলাকার মসজিদটা সেই গড়েছিলো। নিজ হাতে দুই তলা পর্যন্ত ঢালাই করিয়েছিলো। হাজারও গরীবের আহার জুগিয়েছিলো। লাল গাড়িটা নিয়ে সে ঘুরে বেড়াতো এদিক ওদিক। দৈহিক গঠন তার দেখতে দেখতে একদম চিত্রনায়কের মতো। সিনেমায় কাজ করলে তার হাঁক-ডাক দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে যেতো। দলের হয়ে এত এত কাজ আর জনগণের প্রচেষ্টায় অবশেষে দল থেকে তাকে দাঁড় করানো হলো চেয়ারম্যান পদে। রীতিমত তারই হওয়ার কথা ছিলো। এত এত বড় মানুষকে ছাড়িয়ে জোয়ান এক ছেলে যখন চেয়ারম্যান হলো তখন মূহুর্তেই পাড়া মহল্লায় শোরগোল দেখা গেলো। মিষ্টিমুখ করা হলো ঘরে ঘরে। সবার এত খুশি, এত উচ্ছাস সম্রাটকে যেন আরো আগ্রহী করে তুললো। তাহমিনা বাদে পুরো তালুকদার বাড়ীতে কেউ বোধহয় ততটা খুশি ছিলো না। সাহারা ছেলে অন্তপ্রাণ। ছেলের খুশিতে সে বড় হাড়িতে চাল বসালেন। সমশের তালুকদার খুশি ছিলেন কিন্তু তিনি দুই ভাই হারিয়ে আর চাইছিলেন না সম্রাট এই রাজনীতিতে জড়াক। তিনি নিজেও কিছুটা দূরে দূরেই থাকতেন এই রাজনীতি থেকে। তার ছয় সন্তান ততটাও বুঝের না। তবে তুরাগ আর তৌসিফ তখন ভালোই বুঝে। তুহিন তখন ভালোই ছোট। মেয়েগুলো তার পড়াশোনা আর খেলাধুলার বাইরে ততটা কোন বিষয়ে মাথা ঘামায় না৷ সমশের দীর্ঘ শ্বাস ফেলেন। তাদের বাড়ীটায় আজ অনেকদিন পর এত আমেজ দেখা যাচ্ছে।

রাত করে বাড়ী ফিরলো সম্রাট। টলমলে পায়ে এসে ঢুকে গেলো নিজের কামড়ায়। আজ বেশ ধকল গিয়েছে তার উপর দিয়ে। তার বন্ধুদের যখন খেতে বসানো হয় তখন শাহরিয়ার গিয়ে তুরাগ, তৌসিফ আর তুহিনকে নিয়ে আসে। তৌসিফের আম্মু জোর দিয়ে না করতে পারেন না। বাড়ীর মধ্যেই তো তাই ততটাও চিন্তা হয় না। তাহমিনা সম্রাটের খাবার নিয়ে আলাদা করে ঘরে ঢুকে। ভাইয়ের পিঠে হাত রেখে ডাকে,
“ভাইজান, অ্যই চেয়ারম্যান ভাইজান। তুমি খাবে না?”
“তাহমি।”
মাথা না তুলেই ডাকে সম্রাট। তাহমিনা খাবার নিয়ে পা তুলে বসে। মুখে তুলে খায়িয়ে দেয় ভাইকে। দুই ভাইয়ের মাঝে তার সম্রাট ভাইজানকেই বেশি ভালো লাগে। তামিমা আবার শাহরিয়ারের প্রতি দূর্বল। দু’জন জমজ কিনা।

চেয়ারম্যান হওয়ার তখন বছর পাড় হয়েছিলো বোধহয়। এত এত নাম-ডাক শুনাম ছাপিয়ে গিয়েছিলো তার চারপাশে। এক নামে তখন সম্রাট চেয়ারম্যান বলে পরিচিত পেয়ে গেলো সে। দলের এক মিটিং এ সম্রাট সেদিন গিয়েছিলো দেড়ীতে। তাদেরই দলের মিটিং। তিন নং এবং চার নং এই দুই ওয়ার্ডের নেতা কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন সেখানে। সবাই একই দলের। সম্রাট ফরিদকে দেখেই হেসে গলায় মিলে। আজও সাদা পাঞ্জাবী আর সাদা পাজামা। হালকা শীত হওয়াতে গায়ে ছিলো ছাই রঙা এক শাল। এমনিতে শার্টের তিন বোতাম খুলে অনায়াসে সম্রাট চলাফেরা করতো। তার চোখের চাহনিই যেন সবাইকে অবাক করে দিতো। এই বয়সে এত ক্ষমতা, এত তীক্ষ্ণ চাহনি! বাজপাখির দৃষ্টি যেন তার। বিয়ারের ক্যান একটা খুলে গ্লাসে ঢালতে নিলেই সম্রাট বাঁধা দেয়,
“ঢেলে খায় ছোটলোকেরা। সম্রাট চেয়ারম্যান কি ছোটলোক? ক্যান দে।”
তখন তার চারপাশে সবাই গ্লাসে ঢেলেই বিয়ার পান করছিলো। তার তাচ্ছিল্যের কথাটা গায়ে লাগলো অনেকেরই তবে কিছুই বললো না কেউ। আজ সব মাফ। সম্রাটের জন্য সেই রাতটায় সব মাফ ছিলো।
একের পর এক মদ্যপান করতে করতে সম্রাট যখন টলতে লাগলো তখন তাকে জোর করে আরো দেওয়া হলো। মানা করে না সম্রাট। শেষ পর্যন্ত পান করতে থাকে অমৃতসুধা।

ভোরের আলো ফুটতে তখন ভীষণ দেড়ী। একাই ক্লাব থেকে বেরিয়ে আসে সম্রাট। নিজের লাল গাড়িটায় উঠে ড্রাইভিং সিটে বসে। একা একাই চালিয়ে যায়। নয়াবাজার ব্রীজ অতিক্রম করার পর থেকেই চোখে সামান্য ঘোলা দেখে সে। গাড়ির বেগ তার তখনও একই ভাবে চলছে। মেইন রোডেও গাড়িঘোড়া নেই ততটা। সম্রাট বায়ে ঘুরায় তার গাড়ি। বাজারের পথ ধরে যখন বাড়ীর দিকে বাঁক নেয় তখনই তার ব্রেক ফেল হয়, সামলে উঠার আগেই পেছন থেকে একটা সাদা প্রাইভেট গাড়ি ধাক্কা দিয়ে শাঁই শাঁই করে চলে গেলো। বাড়ীর পুকুরেই ধীরে ধীরে তলিয়ে গেলো সম্রাটের সেই লাল গাড়ি। নেশায় ধুত হওয়া সম্রাট তখন হুঁশহারা।

দাপুটে মানুষটার জীবনটা সংক্ষিপ্ত ছিলো। সেদিন পুকুর ঘাটে ডুবেছিলো সম্রাটের দেহ কিন্তু কারো হৃদয় থেকে তা মুছা যায় নি৷ খচিত ছিলো প্রতিটি দেওয়ালের গায়ে। কেউ টের পায় নি সেই রাতে। একটা কাকপক্ষীও বোধহয় জানতে পারে নি যে সম্রাট চেয়ারম্যান সেদিন পানিতে তলিয়ে যাচ্ছিলো। তালুকদার বাড়ীর গৌরব, সম্ভ্রান্ত, অভিজাতপূর্ণ সম্রাটের দেহটা সেদিন আটকে ছিলো ঐ লাল গড়ির ভেতর।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২

গাড়িটা অবশ্য তার ভীষণ প্রিয় ছিলো। প্রিয় গাড়িটাকে উদ্ধার করা গেলেও আগের সম্রাটকে আর উদ্ধার করা যায় নি বরং সৌন্দর্য চুইয়ে পড়া নিখুঁত সম্রাটের বিপরীতে মানুষ তুলেছিলো ফ্যাকাসে মুখের এক নতুন সম্রাটকে, যার সমাধিতে কেঁদেছিলো জনগণ। হাহাকার করেছিলো রাজপথ আর বিলাপ করেছিলো তাহমিনা, শোকে মূর্ছা গিয়েছিলো সাহারা। পুত্র শোকে কাতর হয়েছিলো। ক্রন্দন স্বর সেবার ছড়িয়ে গেলো চারপাশে। বড় বড় নেতারা ভীর জমালো তালুকদার বাড়ীর উঠানে। তবে আজ তারা সম্রাটের সাথে সাক্ষাৎ এ নয় বরং তার দাফনে অংশ নিতে এসেছিলো।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৩