প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৩
সাইয়্যারা খান
রাতের তখন একদম শেষ প্রহর চলমান৷ কুয়াশায় ঢাকা চারপাশ। ঠান্ডাটা রাত হতেই বেড়ে ওঠে। ব্যথায় মৃদু শব্দ করে পৌষ। তৌসিফ একপলক তাকায় পৌষের মুখের দিকে, পরপরই চোখ সরিয়ে নেয়। তার বউয়ের মতো ত্যড়া বউ আর কারো আছে বলে মনে হয় না। তখন তৌসিফ বাসায় ঢুকেই দেখেছিলো রাগের বশে পৌষ নিজের ভাঙা পা ইচ্ছেমতো দুলাচ্ছিলো। ব্যান্ডেজ দিয়ে র ক্ত বেরিয়ে প্লাজু সহ ভিজে উঠেছে। সেই ব্যান্ডেজ খুলেই নতুন করে ব্যান্ডেজ করছে তৌসিফ। স্বাভাবিক ভাবেই এই মূহুর্তে পৌষ বাদে অন্য কোন মেয়ে থাকলে কেঁদে ভাসিয়ে ফেলতো। কাঁদাটাও স্বাভাবিক। টাটকা র ক্ত গড়াচ্ছে। ভালোই জখম।
সেখানেই তৌসিফ অপারগতায় স্যাভলন দিয়ে মুছে দিচ্ছে। ওর নিজেরই ড্রেসিং করতে গিয়ে কলিজার পানি শুকিয়ে যাচ্ছে এদিকে দাঁত চেপে পৌষ ঠাই বসে আছে। ব্যথা পাচ্ছে অথচ প্রকাশ করছে না৷ কেন করছে না তৌসিফ তা এখন বুঝে তাই জোর করে না। ছোট ছোট ব্যথায় যখন বাচ্চারা দৌড়ে মায়ের কোলে উঠে কাঁদতো, বাবাদের কাঁধে চড়ে সামান্য ব্যথা নিয়ে কতশত অভিযোগ করতো সেখানে পৌষ হয়তো নিজের বড় বড় ব্যথা নিয়েও কারো কাছে যাওয়ার সুযোগ পায় নি। অন্তত তৌসিফ এতটুকু আগেই বুঝেছিলো। বিচক্ষণ তৌসিফ তো জানতোই পৌষ ঠিক কতটা ভালো বা খারাপ ছিলো হক বাড়ীতে। হেমন্ত বাদে সেদিন একটা মানুষ তো দাঁড়ায় নি পৌষের সামনে ঢাল হয়ে বরং চাচা-চাচিরা উঠেপড়ে এক হয়ে তৌসিফের হাতে তুলে দিয়েছে।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
এমনও না কোন আপত্তিকর অবস্থায় তৌসিফ আর পৌষ ধরা খেয়েছে তবুও ওর নিজের ঘরের মানুষরাই বিশ্বাস করে নি সেখানে পাড়া-প্রতিবেশীদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। তৌসিফ খুব করে চায় পৌষের জীবনে ঐ স্থানটা নিতে, যে স্থানে তৌসিফ শুধু পৌষের স্বামী না বরং এমন একজন আপনস্থল হবে যেখানে পৌষ আবদার জুড়ে দিতে পারবে, হুটহাট রেগে যেতে পারবে, অল্প ব্যথায় আহ্লাদী হয়ে কাঁদতে পারবে। এই বুকে তৌসিফ তার পাখিটাকে বন্দী করে রাখতে চায়। সেই বন্দীত্বে দাসও তৌসিফ স্বয়ং নিজেই হতে চায়। তবুও তৌসিফ চায় পৌষ হাসুক, কাঁদুক, অভিমান জমিয়ে রেগে থাকুক। তৌসিফ হাসিমুখে, নত গর্দানে সব মেনে নিবে। টু শব্দ করবে না। পৌষের ঐ অনুভূতিহীন চোখ দুটোয় তৌসিফ ভালোবাসা দেখতে চায়। সেই ভালোবাসার স্বাদ পৌষকেও চেখে দেখাতে চায়। তার পৌষরাত অন্তত জীবনে একটা বার বুঝুক ভালোবাসা কেমন হয়। সে একবার বুঝুক বুকের ঐ লালচে খয়েরী রঙের প্রাণকেন্দ্র যখন অন্য কারো নাম জপে তখনকার অনুভূতিটা ঠিক কেমন হয়।
“এই এক *ল করতে কতক্ষণ লাগে?”
তৌসিফ ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। তুলা দিয়ে বাকিটুকু পরিষ্কার করে বললো,
“হয়ে গিয়েছে হানি।”
পৌষ পা সরাতে নেয় কিন্তু তৌসিফ আটকে দিলো। এতক্ষণ যাবৎ কোলের উপর পা নিয়ে তৌসিফ মলমপট্টি করছিলো। পৌষের পা আটকাতেই ভ্রু কুঁচকায় পৌষ। তৌসিফ আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“এটা বদলে এসো। কাম।”
বলেই নিজের হাত বাড়িয়ে দেয়৷ বাড়ানো হাতের তালুতে একটা আলতো চড় দিয়ে পৌষ খিটমিট করে উঠে,
“অসহ্যের চরম মাত্রায় উঠে যাচ্ছি আমি।”
“কারণটা আমি?”
“নয়তো কি আপনার এগারো দাদী?”
তৌসিফ মুখ লটলে ফেললো। এই এক পাপ সে করেছে। মনের ভুলেই সত্যি কথা বলেছে। কি দরকার ছিলো দাদার এগারো বিয়ের কথা বলার? এখন তার বউ তাকে ততটা সহজেও ছাড়বে না। তৌসিফ পুণরায় হাত বাড়িয়ে বললো,
“মৃত মানুষকে নিয়ে এসব বলে না পৌষরাত।”
“*লছাল বাদ দিয়ে আসল কথা বলুন, ঐ ব্যাটি কে ছিলো? কাকে বুকে নিয়ে ল্যালা ল্যালা গান গাইছিলেন?”
“কিহ! গান গাইছিলাম আমি? তুমি শুনেছো?”
“না শুনতে চাইছি।”
“এসো, বদলাবে এগুলো।”
“র ক্ত আমার শুকিয়ে শুটকি হয়ে যাক তবুও নড়ব না। আগে বলুন, কে ছিলো ঐ কু ত্তার বাচ্চা মহিলা?”
গালির কূলকিনারা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে। তৌসিফ বুঝে গেলো তার জীবনের এতগুলো বছরের পৃষ্ঠাও তার বউয়ের মন থেকে আজ রাতের দৃশ্য মুছতে সক্ষম হয় নি। নিজে ভালোবাসবে না অথচ তার বুকে ভিন্ন নারীও মানবে না। উল্টো সমান তালে গালিগালাজ করছে। কিছুটা ধরাবাঁধা হয়েই তৌসিফ উত্তর করলো,
“তাহমিনা আপা ছিলো।”
পিনপতন নীরবতা চলল টানা দুই সেকেন্ড। তৌসিফ তাত্ক্ষণিক উত্তর না পেয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“আমাকে বিশ্বাস করো নি?”
“আমি জানি আপনি মিথ্যা বলেন না৷”
স্বস্তির শ্বাস ফেলে তৌসিফ এবার নিজেই ধরলো পৌষকে। ধরে বাথরুম পর্যন্ত দিয়ে এসে বললো,
“এখানেই আছি। চেঞ্জ করে এসো।”
পৌষ মাথা নাড়ে। বেরিয়ে আসামাত্রই তৌসিফ ওকে কোলে তুলতে চায় কিন্তু হাজার হোক বউ তার পৌষ, সে ত্যাড়া করে বললো,
“কি ভেবেছেন, আমি লুলা? লুলা বউ নিয়ে জ্বালায় আছেন? খবরদার লুলাটুন্ডা ভাববেন না আমাকে!”
মুখটা চুষে রাখা আমের মতো করে তৌসিফ বউয়ের হাত ধরেই বেরিয়ে খাটে এলো। বাতি বন্ধ করে আগে পৌষকে ঢাকলো পরপর নিজেকে। আস্তেধীরে টেনে বুকের মাঝে নিতেই স্বভাবসুলভ মাথাটা বুকের যথাসম্ভব ভেতরে নিলো পৌষ। তৌসিফ ঢেকে নিলো পুরোপুরি পৌষকে। মাথায় হাত বুলালো গভীর ভাবে। হালকা করে চুল টেনেও দিলো। বেশখানিকটা সময় পর হঠাৎ আধঘুম জড়ানো কণ্ঠে পৌষ বলে উঠলো,
“অ্যই, আপনার দাদা সব রেখে এগারোটা বিয়ে কেন করেছিলো?”
তৌসিফ এই শেষরাতে অসহায় বোধ করলো। এখন কিভাবে সে মৃত দাদাকে জিজ্ঞেস করবে কেন এগারোটা বিয়ে করেছিলো? নিজেও আস্তে করেই উত্তর দিলো,
“আই ডোন্ট নো হানি।”
“আমি কিছু ভাবলাম।”
“কাল সকালে শুনি। সকাল হয়েই আসছে তোতাপাখি।”
“উমম।”
পুরোপুরি ঘুমে তলিয়ে গেলো পৌষ। তৌসিফ ওকে নিজের কাছে আটকে রাখলো। কপালে খুব সন্তপর্ণে হাত বুলিয়ে নিজেও চোখ বুজলো। ঠান্ডাটা ক্রমশই বাড়ছে তবে দেহের উষ্ণতায় তা সহনীয় হয়ে আসছে বরং আরাম দিচ্ছে।
বিশাল ফ্ল্যাটটায় একাই থাকছে পলক। জানালার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সে। রাতের পোশাকের উপর পাতলা একটা শাল। ঠোঁট গুলো শুষ্ক হয়ে আসছে। চোখের সামনেই তুহিনের রাজহাঁস গুলো দৌড়ে দৌড়ে ঘাট পাড় ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এগুলো দেখেই যেন শান্তি পাচ্ছে পলক। নিজের শরীরের ইদানীং আর যত্ন নেওয়া হয়ে উঠে না। হাজার হোক, মানুষ সে। মানুষ হাজারও চাকচিক্যের মাঝে একটু শান্তি চায়৷ পলক বছরের পর বছর নিজের সৌন্দর্য, জৌলুশ আটকে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছিলো। সে চাইতো তুহিন আটকে থাকুক তার রূপ লাবন্যে কিন্তু কতটা আটকাতো পলক বুঝতেই পারতো না৷ নারী সৌন্দর্যকে হার মানিয়ে তুহিন নেশায় ডুবে যাওয়া এক পুরুষ অথচ পলক ভালোবাসেছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন পুরুষকে।
এক এলোমেলো সুন্দর মুখশ্রীর তুহনকে যাকে দেখলেই পলকের মন টানতো তাকে ছুঁয়ে দিতে। হয়তো পলকেরই ভুল ছিলো, তুহিন তার থেকে আজ এতটা দূরে। রিহ্যাবে থেকে শুধু ভাইদের সাথে যোগাযোগ করে সে। তৌসিফের কাছে কেঁদেকেটে পলক কথা বলেছিলো তুহিনের সাথে। আজও চোখের পাতাগুলো তৃষ্ণায় ধুঁকছে, একটু দেখার জন্য। পলক বড়ই পিপাসিত। আয়নায় নিজেকে দেখলে কিছুটা ভয়ও লাগে। খাওয়া দাওয়া এখন ঠিকমতো করে বিধায় ওজন বাড়ছে। কি করবে পলক, তার ক্ষুধা পায়। তুহিন আসার মাস খানিক আগে থেকে খাওয়া কমিয়ে দিবে। শরীরচর্চা করবে তাহলেই শরীর শুকাবে। এই কিছুদিন পলক নিজের মতো খাবে।
“মামি চা।”
কলির ডাকে তাকালো পলক। সামান্য হেসে চা নিয়ে বললো,
“নাস্তা হয়েছে?”
“জি মামি। রুটি ভাজছি।”
“পরটা ভাজ আজকে। ঘি দিয়ে মুচমুচে করে একদম৷ ভীষণ মন চাইছে।”
কলি মাথা নেড়ে চলে যায়। আজ-কাল পলকের মাঝে বিস্তর পার্থক্য দেখা দিয়েছে। কলির সাথে যথেষ্ট ভালো ব্যাবহার করে সে। পলক এখনও একদৃষ্টে রাজহাঁসগুলোকে দেখছে। গুন গুনিয়ে গান গাইছে,
“চমকিবে ফাগুনেরও পবণে,
বসিবে আকাশবাণী শ্রবণে।
দূর হতে আমি তারে সাধিব,
গোপনে বিরহডোরে বাঁধিব।”
নিজের ছাড়া গলায় গানে নিজেই অবাক বনে গেলো পলক। আজ কতবছর পর গান ধরলো সে? এককালে তুহিন কতই না পাগল ছিলো তার কণ্ঠের।
কলিং বেলের বারবার শব্দ হচ্ছে। মিনুর পায়ের ধপধপ শব্দ শোনা গেলো। দৌড়ে সে তৌসিফের দরজায় টোকা দিলো। ডাকলো,
“মামা, মামা? রনি মামা ডাকে।”
তৌসিফ চোখ খুলে। বেশ সকাল হয়েছে। সে উঠেছিলো মাঝে একবার। জগিংটা কোনমতে করে আজ হালকা ব্যায়াম করে আবারও পৌষকে নিয়ে ঘুমিয়ে ছিলো। পৌষ অবশ্য উঠে নি একবারও। পায়ের ব্যথায় জ্বর আসছে হালকা অথচ মেয়ের মাঝে হেলেদুল নেই। তৌসিফ পৌষের কানে হাত দিয়ে গলাটা দরজার দিকে করে গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
“বসতে বলো। আসছি।”
“আচ্ছা।”
রনি সচরাচর বাসায় আসার ছেলে না৷ নিশ্চিত গুরুত্বপূর্ণ কিছু। তৌসিফ কালবিলম্ব করলো না৷ পৌষের দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বুক থেকে সরালো। বেণীরা গুছিয়ে রাখলো পাশে। বুক পর্যন্ত ঢেকে দিয়ে নিজে পা টিপে টিপে বাথরুমে গিয়ে মুখচোখ পরিষ্কার করলো সময় নিয়ে। এলোমেলো ভাবে থাকা তৌসিফ পছন্দ করে না অথচ জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ মানুষটাই পুরো এলোমেলো। ভাবতেই মুচকি হাসলো তৌসিফ। একদম বাবুসাহেব সেজে বের হলো।
রনি বসা সোফায়। তৌসিফকে দেখেই উঠে দাঁড়ালো। তৌসিফ ইশারায় না করলো। রনি বসে রইলো। ওর চোখমুখ দেখেই মনে হচ্ছে ভালো কিছু হয় নি। তৌসিফ কপাল কুঁচকে ফেললো সহসা। প্রশ্ন করলো,
“মারা যাওয়ার মতো তো পরিস্থিতিই হয় নি রনি৷ অবস্থা খুব খারাপ?”
“নিজের মুখ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলো ভাই৷ ভোরের দিকে জ্ঞান ফেরার পর আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। হাতের শিরা কেটে ফেলেছে। পাগলামি করছিলো বিধায় ধরে রক্ত থামাতেও সময় লেগেছিলো। আর.. ”
“উফ, আটকে যেও না রনি৷ আর কি?”
তৌসিফের গলার স্বর বেশ ঠান্ডা। রনি নিচু গলায়ই বললো,
“ওর সাথে মনে হচ্ছে খারাপ কিছু হয়েছে। ধারণা করছি আমি৷ ডাক্তার কিছু বলে নি।”
“ভুল ধারণা তোমার।”
“ভাই আমি..”
“বললাম না, ভুল ধারণা। যেখানে সে যেতো সেখানকার অধিপতিই নেই রনি। শাহরিয়ার ভাই ওসব করতে পারবে না। অসুস্থ সে।”
“জি, ভাই।”
“ডাক্তার কি বলে জানিও আমাকে। এখন বাসায় যাও৷ সারারাতের ধকল গিয়েছে তোমার। টনিকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দাও যদিও এসব আমার দায়িত্ব না।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪২ (২)
“জি, ভাই। ভাই?”
“হ্যাঁ, বলো।”
“ভাবী যদি আবার ওখানে যায়? আমি কি কিছু ছেলেপেলে চারপাশে দিয়ে রাখব? ভাবীকে দেখলেই জানিয়ে দিবে।”
তৌসিফ মুচকি হাসলো। বললো,
“তোমার ভাবী যেই দৌড়ানি খেয়েছে। শিক্ষা হলে মনে হয় না আর যাবে।”
“শিক্ষা হয় নি আমার। লাল গাড়ি দেখা হয় নি। ওটা দেখতে যাব তো।”
পেছন থেকে পৌষের কণ্ঠে তৌসিফ সহ রনি চমকালো। পৌষকে দেখা যাচ্ছে না অথচ গলার স্বর স্পষ্ট। তৌসিফ চমকালো, ভরকালো। বউকে না ঘুমন্ত রেখে এলো? উঠলো কিভাবে? কতটুকুই বা শুনলো!
