প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৮ (২)
সাইয়্যারা খান
দরবার খানার ভেতর প্রবেশ হতেই পৌষের গা হিম হয়ে আসে। অদ্ভুত একটা পরিবেশ এখানে। এত বড় বিশাল জায়গা জুড়ে এমন একটা ঘর এই বাগান বাড়ীতে হতে পারে তা যেন ওর কল্পনারও বাইরে। তৌসিফ মাঝখানে থাকা বসার স্থানটা দেখিয়ে বললো,
“এখানে দরবার বসতো। সেই দরবারের প্রাণকেন্দ্র সম্রাট ভাইজান। এই লাল রঙা গালিচাগুলোয় তার বন্ধুরা থাকতো।”
“আর মাঝে নৃত্য চলতো। আপনি আমাকে কাহিনী শোনাচ্ছেন? এগুলো কিভাবে সম্ভব?”
পৌষের অবিশ্বাস্য কণ্ঠস্বরে তৌসিফ সামান্য হাসলো। এগুলো বিশ্বাস করার জন্য পৌষের আরো অতলে হারাতে হবে যা তৌসিফ কখনোই হতে দিবে না৷ যতটুকু ঠিক না জানলেই নয় ততটুকুই পৌষকে জানাবে তৌসিফ। পৌষ তৌসিফের হাত ছাড়ে না৷ তৌসিফ ভুল শুধরে দিতে বললো,
“শুধু নৃত্যকার নৃত্য করতো না পৌষ। কিছু লিখিত তাওয়াইফও ছিলো।”
“কিহ!”
পৌষ হতভম্ব হয়ে উচ্চারণ করলো,
“বাইজি?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“নাহ্। বাইজি আর তাওয়াইফ এক না। তাওয়াইফরা হলো শিক্ষিতা দরবারি নারী। ভাইজান, শিক্ষিত ছিলেন৷ অশিক্ষিত কোন মানুষই তার পছন্দ ছিলো না৷ এই যে কাঠের আলমারি দেখছো, এটা চন্দন কাঠের। এটার ভেতর বোঝাই করা কিতাব। নানান দেশের বই।”
পৌষ ঢোক গিললো। এই ঘরে ঢুকার সাথে সাথেই তার নামে চন্দনের ঘ্রাণ এসেছিলো। এই ঘ্রাণ তার ততটা পছন্দ না। তৌসিফ মোটা একটা চাবি নিলো পাশের টেবিল থেকে। আলমারি খুলতেই পৌষ অবাক নয়নে শুধু দেখে গেলো। এত বিশাল বিশাল বই দু’চোখে কখনো দেখেনি সে। শত-শত বইয়ের মাঝে একটা বই তার নজরে বিঁধলো। পৌষ হাত বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“এই বইটা কিসের?”
তৌসিফ নিঃশ্বাস আটকে প্রতিত্তোরে জানালো,
“সম্রাট ভাইজানের।”
“উনি বই লিখতেন?”
“এই বই ভাইজান বাদে কেউ পড়তে পারবে না পৌষরাত। পুরো বইটা জাফরানের কালি দিয়ে লিখেছিলেন তিনি।”
তৌসিফ নিজ হাতে বইটা বের করলো। পৌষ যে এটা দেখতে চাইছে তা খুব করে বুঝলো ও৷ বইটার গায়ে কোন ধুলোময়লা নেই। পৌষ প্রশ্ন করলো না এ-বিষয়ে। নিশ্চিত তাহমিনা আপা এসে পরিষ্কার করে এগুলো। একমাত্র তারই তো আনাগোনা চলে এখানে। বইটা পৌষ হাতে নিলো। অদ্ভুত মলাট। লালচে খয়েরী। উপরে আরবিতে লিখা। পৌষ হরফ গুলো উচ্চারণ করলো,
“সারদিয়্যাতুল ইমবিরাতোর।”
উচ্চারণ করেই তাকালো তৌসিফের দিকে। তৌসিফ বাংলা বলে দিলো,
“সম্রাটের আখ্যান।”
দম ফেলে পৌষ বইটা খুললো। প্রতিটি পৃষ্ঠা ভর্তি নিখুঁত হাতের টেনে টেনে আরবি লিখা৷ হাতের দক্ষতা স্পষ্ট বলে দিচ্ছে আরবিতে সে কতটা পারদর্শী ছিলো। গাঢ় হলুদ জাফরানের কালির মাঝেমাঝে হঠাৎ লাল কালির দাগ। ওগুলো বেশ শুকিয়ে গিয়ছে। পৌষ তৌসিফের দিকে দৃষ্টি দিলো। লাল দাগ গুলো ছুঁয়ে বললো,
“জাফরান লালও হয়? কখনো শুনি নি। আপনার ভাইজান কত বড়লোক ছিলো।”
কথাটা বলে পৃষ্ঠা উল্টে দেখছিলো পৌষ তখনই একটা কথা কানে এলো তার। হাত থেকে পড়ে গেলো সম্রাটের সেই আখ্যান৷ আহাম্মক বনে তাকিয়ে রইলো পৌষ তৌসিফের দিকে। তৌসিফ পৌষের মুখে হাত ছুঁয়ে বললো,
“এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই পৌষরাত। এসব পুরাতন কথা।”
“আবার বলুন, কি বললেন?”
তৌসিফ জমিন থেকে কিতাব তুলে। পৌষের দিকে তাকিয়ে বলে,
“তাওয়াইফদের রক্ত এই লাল দাগ গুলো।”
পৌষ শক্ত মনের মেয়ে অথচ ওর বমি পেলো। কপাল কুঁচকে তাকিয়ে বললো,
“কেন মারতো?”
“তার ইচ্ছে ছিলো। আমি তখন ততটাও বড় ছিলাম না যে এসে জিজ্ঞেস করব কেন মারতো।”
“কোন কারণ? কোন সমস্যা তো ছিলো নাকি?”
“ছিলো তো। ভাইজানকে তারা বিয়ে করতে চাইতো। ভাইজানের রূপ পোস্টারে দেখেছো তুমি। সরাসরি দেখেছি আমি। ঐ রূপ তালুকদার বাড়ীর কারো ছিলো না৷ ভাইজান উপরওয়ালার এক বিশেষ সৃষ্টি ছিলো।”
“বিয়ে করতে চাইলেই মেরে ফেলতে হবে?”
তৌসিফ বই রাখলো। আলমারির ড্রয়ার খুলে কিছু ছবি দেখালো পৌষকে। অকৃত্রিম সৌন্দর্যের অধিকারী কিছু নারী। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য তাদের। তৌসিফ ছবিগুলো জায়গামতো রেখে বললো,
“পুরুষ প্রেমে একবার ঠকলে দ্বিতীয় দফায় আর প্রেমে পড়তে চায় না।”
“এটা মিথ্যা কথা।”
“জানি। এটা ভাইজানের বইতে আরবিতে লিখা আছে। আমি তো শুরু তোমাকে বাংলা জানালাম৷”
“কে ঠকিয়েছে তাকে? দরজায় যার নাম লিখা ছিলো, সেই লাবন্য? তার প্রেমিকা?”
“তুমি খুব বুদ্ধিমতি। তবে লাবন্য ভাবী ভাইজানের প্রেমিকা না বরং বিয়ে করা স্ত্রী ছিলো।”
“মিথ্যা। সম্রাট চেয়ারম্যান কখনো বিয়ে করেন নি।”
তৌসিফ হাসলো। পৌষকে নিয়ে অন্যপাশে যেতে যেতে বললো,
“সম্রাট আর সম্রাট চেয়ারম্যানকে গুলিয়ে ফেলো না পৌষরাত। একজন মানুষের দুটো সত্তা থাকতেই পারে। রাজনৈতিক প্রাঙ্গণের সম্রাট চেয়ারম্যান যেমন ধূর্ত ছিলো, দাপুটে ছিলো, বিশ্বাসযোগ্যতা ছিলো তেমনই ব্যাক্তিগত সম্রাট ছিলো এক ক্রূর দংশনপ্রবণ পুরুষ, নরক-বন্যতার ছায়া তার মাঝে বিরাজমান ছিলো।”
তৌসিফ সেই দরবার খানার এক কোণায় দাঁড় করালো পৌষকে। জলদগম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,
“দেয়ালগুলোয় চোখ বুলাও। তুমি সম্রাট দেখতে পাবে।”
পৌষ তাকালো। এখান থেকে স্পষ্ট সবটা। চারপাশে অসংখ্য ভাস্কর্য, সম্রাটের ছবি, নানান নীতিবাক্য যার কোনটাই বোধগম্য না। সবগুলো আরবিতে লিখা। তৌসিফ পৌষের হাত ধরে আঙুল তাক করলো পূর্ব দিকের দেয়ালে। বললো,
“ঐ ভাস্কর্য দেখছো, ওটা ভাইজান লাবন্য ভাবীর বিয়ের শাড়ী দিয়ে তৈরী করেছে।”
পৌষ ঘোরের মাঝে জিজ্ঞেস করলো,
“লাবন্য ভাবী কোথায় এখন?”
“জানি না।”
“তাকে লুকিয়ে কেন রাখতো?”
“লুকিয়ে কেন রাখবে? একশত বাইশ ভরী স্বর্ন আর সেই আমলে হীরার গহনা দিয়ে বউ সাজিয়ে এনেছিলো ভাইজান।”
“ত..তাহলে?”
এই প্রথম পৌষের কণ্ঠ কাঁপে। তৌসিফ ওকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে জানায়,
“বিয়ের রাতেই সকল গয়না নিয়ে পালিয়ে যায় লাবন্য ভাবী।”
“কিহ্!”
দফায় দফায় যেন মরে যাচ্ছে পৌষ৷ তৌসিফ ওর দিকে তাকিয়ে রয় এক দৃষ্টিতে। ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে বলে,
“পারিবারিক বিয়ে ছিলো। বিয়ের প্রথম রাতেই ভাইজান বুঝেছিলেন লাবন্য ভাবীর কোন সমস্যা আছে। তিনি যেমন লাবন্যময়ী সৌন্দর্যের অধিকারী ছিলেন তেমনই ত্রুটিপূর্ণ ছিলো তার নারীদেহ। বাসর রাতে ভাইজান এটা দেখেই অবাক হয়ে যান। লাবন্য ভাবীকে এতটাই ভালোবেসে ফেলেছিলেন যে এতবড় ধোঁকা মেনে নিতে পারেন নি৷ জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন তখনই। লাবন্য ভাবী সেই সুযোগে সকল গয়নাগাটি নিয়ে পালিয়ে যান৷ তাহমিনা আপাই পরদিন সকালে প্রথম সেই ঘরে গিয়ে ভাইজানকে পান।”
“এজন্যই আপনার বোনেরা আর ভাবী আমাকে বিয়ের আগে ওভাবে দেখেছিলো পোশাক ছাড়িয়ে?”
তৌসিফ মাথা নিচু করে নিলো। এ বিষয়ে সে কিছু করতে পারে নি। করার মতো কিছু ছিলোও না৷ তাদের পরিবারের নিকট ধাক্কাটা নিছক ছোট ছিলো না। পৌষ উদ্বীগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“এরপর? এরপর কি হলো? লাবন্য ভাবীকে পেয়েছিলো?”
“জানি না। এ বিষয়ে আর জানা নেই আমার।”
পৌষের এলোমেলো লাগলো সব। হঠাৎ তৌসিফের হাত শক্ত করে ধরে বললো,
“শাহরিয়ার এখানে কেন তাহলে? আর তাদের আরেকটা বোন ছিলো, সে কোথায়? তাহমিনা আপা, না না আমি এখানে অন্য মেয়েদের আসতে দেখেছিলাম।”
তৌসিফ একটু ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। পৌষের হাত ধরে বেরিয়ে এলো দরবারখানা থেকে। বেরিয়ে এলো ফেলে রাখা ইতিহাস থেকে। এখানেই তো একসময় আসর বসতো, হইচই হতো, গানের তালে তালে দুলে উঠতো কতশত নারী পুরুষ। আজ তারা নেই। মৃত্যু নামক শব্দের কাছে পরাজিত প্রতিটি দেহ অথচ রহস্য লুকিয়ে আরো কত যার দোর উন্মোচন হলো না৷ কত জানা প্রশ্নেরও উত্তর তৌসিফ দিলো না। বেরিয়ে আসার আগে তাকিয়ে রইলো লাবন্যর শাড়ী দিয়ে তৈরী ভাস্কর্যের দিকে।
দরবারখানা থেকে বের হতেই বোধহয় দুপুর গড়িয়ছে। সামান্য আলো একটা ছিদ্রপথ দিয়ে এসে পড়েছে সেই রহস্যময় দরজায়। রঙ বদলালো তাতে থাকা কিছু পাথর। পাথরটার কঠিন এক নাম বলেছিলো তৌসিফ, পৌষ তা মনে করতে পারলো না। শুধু বললো,
“এত স্বর্ন কোথায় পেতো উনি?”
“স্বর্নের ব্যাবসা ছিলো পারিবারিক।”
“ওহ।”
ক্ষুদ্র করে বলে পৌষ। তারা যখনই শাহরিয়ারের ঘরের দিকে এগিয়ে এলো পৌষ তৌসিফকে খামচে ধরলো। তৌসিফ আগলে নেয় ওকে। দরজার কাছে দাঁড়াতেই দেখে এই ঠান্ডায় খালি গায়ে শুধু একটা প্যান্ট পরে মেঝেতে উল্টে পড়ে আছে শাহরিয়ার। তৌসিফ মায়াভরা দৃষ্টিতে ভাইকে দেখে। চোখ দুটো ফেটে যেন পানি আসতে চায়। তৌসিফ আস্তে করে বলতে লাগলো,
“সম্রাট ভাইজানকে যখন দলের মানুষই ক্ষমতার লোভে খুন করতো তখন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে একমাত্র বাকি ছিলো শাহরিয়ার ভাইজান কারণ আমরা তিন ভাই তখন ছোট। শাহরিয়ার ভাইজান জাহাঙ্গীর নগরের মেধাবী ছাত্র তখন। রাজনৈতিক বিষয়ে জানতেন না তেমন কিছু কিন্তু…
কিন্তু তাকে সম্রাট চেয়ারম্যানের আপন ছোট ভাই হওয়ার প্রতিদান দিতে হলো। তাকেও বিয়ার অথবা মদের সাথে কিছু একটা মিশিয়ে খাওয়ানো হয়েছিলো যার ফলে শাহরিয়ার ভাইজান ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যান৷ দেশ, বিদেশ কত ডাক্তার দেখানো হলো, লাভ হয় নি। মানুষ সহ্য করতে পারেন না তিনি। তার একমাত্র প্রিয় এখন তাহমিনা আপা। নিজের মাকেও ততটা পছন্দ করেন না। তার মানুষিক অবস্থা আগে আরো খারাপ ছিলো। বংশের উত্তরাধিকার বলতে শুধু আমরা তিন ভাই যা তাহমিনা আপা মানতে পারেন না৷ শাহরিয়ার ভাইজানকে মাঝে বিয়ে দিতে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। ভেবেছিলেন, কোনভাবে দূর্বল এতিম একটা মেয়ে এনে দিবেন। একবার বাচ্চা হলেই উত্তরাধিকার পেতেন তারা।”
“দূর্বল, এতিম মেয়েটা আমি ছিলাম?”
“হ্যাঁ, তোমার চাচারা জেনেশুনে রাজি হচ্ছিলো বোধহয়। আদিত্য আমাকে বলায় আপার সাথে কথা বলেছিলাম।”
“তামিমা, হ্যাঁ তামিমা ছিলো না ওনার জমজ?”
তৌসিফ হ্যাঁ বোধক মাথা নেড়ে বলে,
“আপা নেই এখন।”
“কোথায় আছেন?”
“এত সব জেনে কি করবে পৌষরাত। বাড়ীর একমাত্র বউ তুমি যে এতদূর এলে। বাকিসবাই যতটুকু জেনেছে তাতেই সাহস করে এমুখো হয় নি।”
পৌষ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় শাহরিয়ারের পানে৷ মানুষের পরিণতি কতই না খারাপ হয়? কোথা থেকে কোথায় তার অবস্থা। পৌষের দিকে তাকিয়ে তৌসিফ বললো,
“এবার বের হই তাহলে?”
“শেষ একটা প্রশ্ন।”
“শুনছি।”
“গতকাল আমি এখানে অদ্ভুত শব্দ শুনেছি..”
বাকিটা বলার আগেই তৌসিফ বললো,
“গতকাল বৃহস্পতিবার ছিলো। প্রতি বৃহস্পতিবার শাহরিয়ার ভাইজানকে বিশেষ ঔষধ দেওয়া হয়। আর মেয়ে পাঠানো হয় এখানে। আজ-কাল তো আর তাওয়াইফ পাওয়া যায় না তবে… ”
শব্দটা আর উচ্চারণ করলো না তৌসিফ। পৌষ মনমরা হয়েই বললো,
“টাকার জন্য মানুষ এত নীচে নামে?”
“টাকার জন্য মানুষ সব করতে পারে পৌষরাত। তুমি দুনিয়ার দেখেছোই বা কতটুকু।”
পৌষ কথা বলে না। কিয়ংকাল পর ছোট্ট করে বলে,
“তাহামিনা আপা সোহাকেও এখানে পাঠিয়েছিলো। সেই মেয়ে তো সেধেই নিজেকে আপনার প্রেমিকা বলেছিলো।”
“সোহা তালুকদার বাড়ীর কারো একজনের জারজ সন্তান।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৮
পৌষ বিস্মিত হয়েও যেন হয় না৷ একদিনে এত ধকল আর যেন নিতে পারে না। তৌসিফের গায়ে ভর ছেড়ে দিয়ে বলে,
“বাসায় চলুন। আমার বমি পাচ্ছে।”
