প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৮
সাইয়্যারা খান
বাবার হাতে এক বিরাট চড় খেয়ে চুপ করে মাথা নামিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আদিত্য। মীরা স্বামীর ভয়ে চুপসে আছে নাহয় এগিয়ে আসতো। অদিতি তখন ঘুম নাহয় চোখের সামনে বড় ভাইকে মার খেতে দেখা তার জন্য সহজ হতো না। তুরাগের রাগে গা কাঁপছে। নিজেকে সামলাতে ব্যর্থ হলো সে। আদিত্যের ডান পাশের গালে আরোকটা চড় পড়লো। শব্দটা এবারে বোধহয় বেশি হয়েছে। মীরা ছটফট করে। ছেলের দিকে এগিয়ে আসতে চায়। তুরাগ ভয়ংকর ভাবে হুংকার ছেড়ে বলে উঠে,
“জেনেশুনে তুই তৌসিফের বউ নিয়ে বাগান বাড়ী কেন গিয়েছিলি আজ? তুই জানতি না ওখানে কে থাকে? কথা বল আদিত্য! জানতি না তুই?”
ছোট্ট করে আদিত্য উত্তর করে,
“জি, আব্বু।”
তুরাগ হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে আরেকটা চড় দিতে যায়, এবারে মীরা আটকে ফেলে। স্বামীকে ঝাপটে ধরে হাহাকার করা কণ্ঠে আর্তনাদ করে উঠে। দোষারোপ করতে থাকে পৌষকে। তুরাগ মীরা থেকে নিজেকে ছাড়ায়। মীরাকে চাইলেও ততটা শাসন সে করতে পারে না। প্রচন্ড ভালোবাসে কি না৷ গম্ভীর কণ্ঠে তুরাগ তাকে বলে,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
“এসবের মাঝে এসো না মীরা। আমাকে রাগীও না৷”
আদিত্য বিরবির করে। অলরেডি যে রেগে আছে তাকে আর কি রাগাবে? তুরাগ ধমকে উঠে,
“কি বার ছিলো আজ?”
আদিত্য চুপ করে যায়। দুই থাপ্পড় খেয়ে সে ভুলে গিয়েছে আজ কি বার। মাথা নিচু করে ভাবাতে গেলেই তার মনে পরলো আজ বৃহস্পতিবার। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এলো আদিত্যের। মাথা তুলে তাকালো বাবার দিকে। তুরাগ ছেলের বিস্মিত হওয়া মুখ দেখে এতটুকু অন্তত বুঝলো আদিত্যের মনে ছিলো না আজকের দিন। বাগান বাড়ীটা অন্যান্য দিনগুলোয় স্বাভাবিক থাকলেও বৃহস্পতিবার আর স্বাভাবিক থাকে না৷ এক হিংস্রতা সেই জায়গাটাকে গ্রাস করে নেয়। তুরাগের রাগ কমে না৷ আজ উনিশ থেকে বিশ হলেই খুব খারাপ কিছু হয়ে যেতো। খুব খারাপ। আদিত্যকে ধমকে ঘরে পাঠায় তুরাগ অতঃপর ধপ করে বসে পড়ে সোফায়। মীরা পাশে বসে। তুরাগের হাত ধরতেই ঠান্ডা স্বরে তুরাগ বললো,
“আজ যদি কোন অঘটন ঘটতো মীরা। তৌসিফ কি করতো তুমি ভাবতে পারছো? তুহিনটাও দেশে নেই। আমি একা হাতে কিভাবে সামলাতাম? ভাবলেই আমার গা শিউড়ে উঠছে মীরা। আমার প্রচন্ড শরীর খারাপ লাগছে।”
মীরা তুরাগের মাথা এলিয়ে দেয়। পানি পান করিয়ে কিছুক্ষণ হাত-পা টিপে মোটা কম্বল দিয়ে ঢেকে দেয়। তুরাগ চোখ বুজে। কিছু দৃশ্য ভাসে চোখের সেই বন্ধ পৃষ্ঠায়। তুরাগ চাইলেই তা ভুলতে পারে না৷ তালুকদার বাড়ীর এমন কতশত অতীত রয়েছে অথচ কিছু অতীত আজও মুছে যায় নি বরং জ্বলজ্বল করে জ্বলছে বাড়ী জুড়ে। এই বাড়ীর সামনের ঘাট, এই মাগুর মাছের ঘাট, এই বাগান বাড়ী, এই বাঁশ ঝাড়। সবই যেন নিদর্শন হয়ে ঠাই দাঁড়িয়ে আছে। চাইলেও যাদের ভুলা যায় না৷ চাইলেও যেই অতীত থেকে নিজেদের নিরবিচ্ছিন্ন করা যায় না।
চারপাশে ঘনকুয়াশা। তালুকদার বাড়ীটা যেহেতু প্রকৃতির মাঝে এক টুকরো বাসস্থান সেহেতু এ-ই দিকে যেন শীতের প্রকোপ একটু বেশি। ঠান্ডার এই সকালে চারপাশটাও কেমন আবছা আবছা। ফজরের সময় কেটেছে বেশ আগে। রান্নাঘরে টুংটাং শব্দ করে রান্না করছে পৌষ। এত সকালে উঠতে মন চাইছিলো না অথচ সাংসারিক জীবনটা তার খুব পছন্দ। নিজ হাতে সবকিছু গুছিয়ে করা ওর অন্যতম পছন্দের কাজ। তৌসিফ এই ভোরেই দৌড়াতে বেরিয়েছে। পৌষ সব গোছগাছ শেষ করতেই দেখলো মিনু উঠেছে। পৌষ ওকে ডেকে ড্রয়িং রুমে বসে। দরজার দিকে একবার তাকিয়ে মিনুকে জিজ্ঞেস করে,
“আচ্ছা, কখনো বাড়ীর পেছনে গিয়েছিস তুই?”
মিনু মাথা নাড়ে। জানায়,
“মামা তো সন্ধ্যার পর জানালা খুলতেই বারণ করেছে। বাড়ীর পেছনে গেলে পা ভেঙে দিবেন।”
পৌষ মুখ বাঁকা করে। ভাবুক হয়। গতকালের সেই অদ্ভুত শব্দ পৌষ প্রথম যখন গিয়েছিলো তখন শুনে নি। কৌতুহল হুরহুর করে বাড়তে থাকে যেন। দরজায় তৌসিফ এসে দাঁড়িয়েছে ততক্ষণে। পৌষ তার সাথে রুমে যায়। তৌসিফ জ্যাকেট খুলে বাথরুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো,
“নাস্তা তৈরী?”
“হ্যাঁ।”
“একটা শাল বের করো তো পৌষরাত।”
পৌষ তৌসিফের কালচে খয়েরী পাড় দেওয়া ক্রিম রঙের শালটা বের করে। একটু নিজের গালে ঘষে। তৌসিফ বেরিয়ে এসেই পৌষের পায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমাকে না বলেছি ঘরে জুতা পরতে?”
পৌষ হেসে বললো,
“মনে থাকে না।”
বলেই খাটের পাশ থেকে নরম পশমি জুতাটা পায়ে দিলো। তৌসিফ গায়ে শাল জড়িয়ে খেতে বসে পৌষকে নিয়ে। আজকে বেশ ঠান্ডা, পরিবেশও বেশ নরম। তৌসিফ খেতে খেতে পৌষকে বললো,
“চা খেয়ে কাজে হাত দিও না৷ আজ বুয়া রাঁধবে।”
“কেন?”
বেশ স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্নটা করে পৌষ তবে তৌসিফের ঠান্ডা দৃষ্টি তাকে থামিয়ে দেয়। খাওয়া শেষ হতেই আরেকটা শাল দিয়ে জড়িয়ে দেয় তৌসিফ পৌষকে। মাথায় ওরনা টেনে দিয়ে হাত ধরে বলে,
“চলো।”
“কোথায় যাব আমরা?”
“এই তো, এখনেই। হাঁটব একটু তোমাকে নিয়ে।”
নাস্তার পর পৌষের সংসারে অনেক কাজ। এগুলো নিজ হাতে করা তার বেশ পছন্দ তবে তৌসিফের মুখের উপর না করতে পারলো না ও। দু’জন বেশ আস্তেধীরে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো। তৌসিফ যখন বাড়ীর পেছন দিকে হাঁটা দিলো পৌষ তখন খানিকটা চমকালো তবে মুখে কিছু বললো না। তৌসিফ নিজেই বললো,
“আজ এত চুপচাপ?”
“প্রচুর ঠান্ডা।”
“ঘরে চলবে তাহলে। গরম করে দিব, একদম জড়িয়ে রাখব।”
“এ্যাহ, কি ছেঁচড়ামো কথাবার্তা।”
“ছেঁচড়া বললে স্বামীকে?”
“না তো, আমার স্বামীকে কেন আমি একথা বলব?”
“ভয় পাচ্ছো পৌষরাত?”
“পৌষ ভয় পেতে শিখে নি।”
বলেই সামনে তাকালো। কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে তখন সম্রাট চেয়ারম্যানের বাগান বাড়ী। তৌসিফ এখানে কেন এনেছে তার খানিকটা আঁচ করতে পারছে পৌষ। তৌসিফ এতমাসে পৌষকে যতটুকু চিনেছে তার মধ্যে অন্যতম বৈশিষ্ট্য পৌষ কথা শুনে না। তার প্রশ্নের উত্তর যেকোনো হালতে তার চাই। তৌসিফ এতটুকুও জানে পৌষ এপ্যাথেটিক। তার আবেগ, অনুভূতি, রাগ, কান্না সবকিছু স্বাভাবিক মানুষের তুলনায় ভিন্ন। চাইলেই সে হুট করে সাধারণ কারো মতো কাঁদতে পারে না। চাইলেই আবেগের তাড়নায় দূর্বল হতে পারে না। হেমন্ত থেকে যতটুকু তৌসিফ জানে ততটুকুই যথেষ্ট তৌসিফের জন্য পৌষকে চিনতে। আজ এই বাগান বাড়ীতে না আনলে পৌষ আবার আসবে। গতকালের চাইতে লোমহর্ষক আর কোনদিন হতে পারতো না।
আজ শুক্রবার, তৌসিফ যেহেতু বাসায় আছে তাই সারারাত ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে করেই হোক পৌষকে এখানে উপস্থিত করবে। তাই এই ভোর সকালে আজ তৌসিফ এসেছে। দীর্ঘ কয়েক বছর পর পা রাখছে সম্রাটের সম্রাজ্যে।
এক হাতে পৌষের হাত ধরে আরেক হাতে প্যানেল ডোর খুলার নিদিষ্ট ইট ধাক্কা দেয় তৌসিফ। খুলতেই মিচমিচে অন্ধকারে হারিয়ে যায় দু’জন। ডগ টেইল লোহার সেই সিঁড়ি দিয়ে চারটি পা এগিয়ে যায়। পৌষ টু শব্দ করে না। তারা এগিয়ে যায়। বিশাল বড় খোলা জায়গাটায় যখন তৌসিফ থামে তখন চোখ তুলে তাকায় পৌষ। এই জায়গায়ই গতবার পৌষ এসেছিলো। ঐ সামনের কোণায় শাহরিয়ার থাকে। তৌসিফ ওদিক নিলো না ওকে বরং এগিয়ে এলো একটা বিশাল দরজার দিকে। পৌষ এই দরজা আগেও দেখেছে। কৌতুহল জেগেছিলো তার কিন্তু সময়, সুযোগ কোনটাই হয় নি এটা নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার কাউকে। আজ তৌসিফ নিজেই এনেছে ওকে এখানে। দরজার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ দুটোই যেকোনো দরজার থেকে ভিন্ন। তার উপর আরকি কিছু অক্ষর দিয়ে বেশ জটিল ভাবে পেঁচিয়ে কিছু লিখা। পৌষ পড়ার চেষ্টা করেও সিন বাদে কিছু পড়তে পারলো না। তৌসিফ দরজার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ অতঃপর ভারী হয়ে আসা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
“এই দরজা দেখেছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“বিশেষ কিছু মনে হয় নি?”
“হয়েছে।”
“এই দরজার ওপারে লুকিয়ে গোটা সম্রাট চেয়ারম্যান। এই দরজা থেকে শুরু তার পরিচয়। আজ তোমাকে বলব, সম্রাট চেয়ারম্যান কে ছিলো। কি ছিলো। কেমন ছিলো। কবরে শায়িত অতি মর্যাদাবান সেই সম্রাট চেয়ারম্যান আর এই দরজার ওপাশে বসবাসরত সম্রাট চেয়ারম্যানের মাঝে আকাশ-পাতাল তফাত।”
এতটুকু বলে থামলো তৌসিফ অতঃপর ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে বললো,
“এই যে দরজা দেখছো, এই দরজার যেই নকশা দেখছো, যেই হাতের কাজ দেখছো এগুলো করতে আড়াই বছর তিন মাস চৌদ্দ দিন লেগেছিলো। এই যে উপরে লিখা দেখছো আরবি হরফে, এটা দিয়ে লিখা আছে,”মারহাবান বিকা ইলা আলামি সামরাত।”
পৌষ পলক ঝাপটা দিয়ে কৌতুহল দৃষ্টি ফেলে চাইলো। চোখের দৃষ্টি যেন অর্থ জিজ্ঞেস করলো। তৌসিফ জানালো,
“সম্রাটের রাজ্যে স্বাগতম৷”
পৌষের কাছে কেমন অদ্ভুত ঠেকলো। ও অবাক হয়ে বললো,
“এটা আলাদা রাজ্য।”
তৌসিফ সংশোধন করে দিলো,
“সাম্রাজ্য।”
তৌসিফ নিজ থেকেই শুধালো,
“এই দরজার নিখুঁত এই কারুকার্য করেছেন বিশিষ্ট এক শিল্পী। উনি বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠিত হওয়া বিভিন্ন শিল্পকর্মের জন্য পুরুষ্কার প্রাপ্ত ছিলেন। এই যে দরজার নকশা দেখছো, এখানে খাঁটি সোনা আছে, যেই পাথরগুলো দেখছো এগুলো রুবি আর চুন্নি। সাদা যেই দাগ গুলো আর এই ফুল করা এগুলো হাতির দাঁত দিয়ে করা হয়েছে। সবচাইতে আকর্ষণীয় কি জানো? এই আলেক্সান্দ্রাইট পাথর৷ এটা আলোর সাথে সাথে রঙ বদলায়।”
পৌষ বিমোহিত হয়ে তাকিয়ে রইলো। মানুষ ঠিক কতটা শৌখিন হলে এমন দরজা বানায় তাও নিজের বাগান বাড়ীতে? তৌসিফ ওকে অবাক করে দিয়ে আরেকবার বললো,
“এই দরজায় কোন লোহা নেই। পুরোটা সোনা আর রুপা। আর এই যে পুরোটা দরজায় খচিত নকশা এগুলো মূলত সম্রাট ভাইজানের নীতিবাক্য যা আরবি ভাষায় লিখা। এরমধ্যে একটা শুনাচ্ছি তোমাকে।”
পৌষ তৌসিফের দিকে তাকায়। হলদেটে আলোয় তাকে ভিন্ন দেখায়। তৌসিফ আওড়ায়,
“আনা উহিব্বু লাবনী কাছীরান।
ওয়া ইযা আহবাবতুহা, ফা-আলাইয়া আন আকতুলাহা। এর মানে কি জানো পৌষরাত? এর মানে হলো আমি লাবন্যকে ভালোবাসি আর ভালোবাসলে তাকে খুন করতে হয়।”
পৌষ তৌসিফের হাত শক্ত করে ধরে। আস্তে করে বলে,
“লাবন্য কে?”
“আরো শুনবে আয়াত?”
“না। ঐ শিল্পী কোথায় এখন? দেশে থাকে?”
“হ্যাঁ।”
“তাকে দেখা উচিত। এত নিখুঁত হাতের কাজ।”
“তাকে যতবার দেখতে চাইবে ততবার এই দরজা দেখবে। এই দরজা মানেই জাবির তাইওয়ান হোজ্জা।”
“ওনার নাম এটা?”
“হ্যাঁ।”
“বেঁচে থাকলে দেখা কেন যাবে না?”
“বলা হয় তাজমহল নির্মানের পর নির্মানকারীদের হাত কেটে দেন শাজাহান। আর এই দরজা নির্মানের পর দাফন করা হয় জাবির তাইওয়ান হোজ্জাকে।”
“কিহ!”
“আস্তে।”
পৌষ অবাক হতে ভুলে গেলো। কথা কণ্ঠনালীতে আটকে গেলো। জোর করে যেন বললো,
“কে মেরেছিলো? সম্রাট চেয়ারম্যান? যাতে এমন দরজা আর কেউ না বানাতে পারে?”
“তুমি বুদ্ধিমান পৌষরাত।”
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৭
পৌষের পা যেন আসাড় হয়ে এলো৷ তৌসিফ দরজা ধাক্কা দিতেই তা খুলে গেলো। চোখের সামনে তখন দৃশ্যমান হলো বিশাল এক কক্ষ। পৌষ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেখানটায়। চারপাশে লাল রঙের বিশাল পর্দা টানানো। আসনের জন্য চারপাশে অনেক জায়গা। বিশাল বড় গোলাকৃতি এক বিছানা যার চারপাশে মশারীর মতো কাপড় দেয়া। একটা দেয়াল জুড়ে আয়না। তৌসিফ বড় একটা দম ফেললো। বললো,
“এটা দরবারখানা।”
