প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৭
সাইয়্যারা খান
রাত তখন আনুমানিক এগারোটা বেজে সাতাশ। তালুকদার বাড়ীর মেইন গেট খোলা হয়েছে। তৌসিফের গাড়ি ঢুকেছে গ্যারাজে। সারাদিনের ক্লান্ত ভাব তার মাঝে নেই। সিনা টান টান করে হেঁটে সরাসরি গ্যারাজের পাশে করা অফিসে ঢুকে গটগট পায়ে। অমসৃণ মেঝেছে জোড়ালো ঘর্ষণের শব্দ তুলে এগিয়ে যায় তৌসিফ। তার আসার পূর্বেই অনেকে উপস্থিত এখানে। রোজই দিনের শেষ সময়টুকু নানান কাজের হিসেব-নিকাশ এখানে তৌসিফ করে। আজ তুরাগকে এসময়ে এখানে দেখে সামান্য কপালে ভাজ পড়লেও কোনরূপ বাক্য ব্যায় না করেই তৌসিফ নিজের সেই লাক্সারী বস চেয়ারে বসে। টনি ততক্ষণে পানির গ্লাস এনে রেখেছে টেবিলে। রনি ঠাই দাঁড়িয়ে তৌসিফের পাশে। তৌসিফ ইশারায় বসতে বলে রনিকে। তার সাথে সারাদিন ছেলেটাও ছিলো। ক্লান্তি সবারই আছে। এ-র মাঝে এত রাতে এক বিচার কার্য করতে হলো তৌসিফকে। বুঝলো এরজন্যই তুরাগ উপস্থিত এখানে। তাদের বৈঠকে তখন তৌসিফ তুরাগকে বললো,
“বড় ভাই, শুরু করুন।”
তুরাগ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“আজমল বলতে থাকো। শুনছে সবাই।”
আজমল নামের পুরুষটি বলতে শুরু করে। নিতান্তই ভদ্র স্বরে সে জানায়,
“বস, আমার দাদার জায়গা এটা৷ গত বাইশ বছর যাবত মামলা চলছে। বাড়ী আজও বাটোয়ারা হচ্ছে না। আমার ছেলের বিয়ে দিব কিছুদিন পর। এখনও বাড়ীঘর তুলতে পারছি না ঠিকমতো। পিলার গাড়তে নিয়েছিলাম। তারা ভেঙে দিয়েছে গতকাল রাতে… ”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তৌসিফ থামালো। থমথমে শাসিত কণ্ঠে বললো,
“কত দাগের জায়গা, কার নামে, কর কে দিচ্ছে সাথে ভোগ কে করছে এসব একসাথে বলো। ছেলের বিয়ে করার হলে ভাঙা ঘরেই করবে। সমস্যা নেই।”
আজমল সাহেব কিছুটা ভরকে যান। হাতে থাকা দলিলপত্র এগিয়ে দিয়ে বেশ শুকনো গলায় বলেন,
“এখানে সব আছে বস। আমার পিলার ভেঙে… ”
“আপনি যখন চারবার তার দেয়া দেয়াল ভাঙলেন তখন আমার কথা মনে পরে নি? পিলার তো ভাঙার নির্দেশ আমি দিয়েছি। নিজের বিচার কি করব আর। এক কাজ করুন, আপনি নাহয় আমার বিচার করুন। ঐ পিলার ভাঙার অনুমতি আমার থেকে গিয়েছে।”
আজমল সাহেবের মুখটা নগদে শুকিয়ে এলো। তার ধারণার বাইরে বিষয়টা। তৌসিফ তালুকদার তার পিলার ভাঙিয়েছে সে তা ঘূর্ণাক্ষরেও টের পায় নি। উপস্থিত কেউ কেউ আগে থেকেই জানে। বাকিদের চোখে সামান্য কৌতুহল। তৌসিফের বিরক্ত লাগলো। রোজ রোজ এত বিচার করতে মন চায় না। কণ্ঠে ধারালো ভাব এনে বললো,
“দুই দাগের জমি সেটা। তোমার দাদা বিক্রি করেছে এক দাগের জায়গা। মালিকানা এখন অন্যের। তোমার বাপ সেই বিক্রি করা জমি নিয়েই মামলা করেছিলো বাইশ বছর আগে। আরেকজনের টাকাও খাবে আবার জমিও চাইবে সেটা তো ঠিক না আজমল। তুমি এক দাগের জায়গার মাঝের দেয়াল চারবার ভেঙেছো। তুমি স্হানীয় বলে দাপট আর সে বাইরের বলে কিছুই না? মামলার কাগজ আমাকে দেখাচ্ছো? এই আইনের ধার ধারি আমি? জায়গা সুন্দর মতো খালি করো। মাঝে আগামী পরশু দেয়াল তুলা হবে। আমিন ডেকে আমি অথবা বড় ভাই কেউ একজন দাঁড়িয়ে দেয়াল তুলব। কিছু বলতে চাও তুমি? চাইলে এখনই বলবে ভরা মজসিলে অথবা কোর্টে যাও। বাইশকে ত্রিশ বছর বানাও তাতে কোন যায়-আসে না আমার।”
আজমল সাহেব একদম চুপসে গেলেন। বলার মতো কিছুও পাচ্ছেন না। তবুও বললেন,
“আমাকে তাহলে পেছনের কোলনি থেকে একটু জায়গা বাড়িয়ে দিন বস। বাসাটা নাহয় ছোট হয়ে যাবে।”
“হাতের কব্জিতে দুটো চাপাটির আঘাত দিলেই ছুটে পড়বে বুঝলে আজমল। আমার বউয়ের জায়গা সেটা। রক্ষক হিসেবে আমি আছি।”
আজমল সাহেবের গলা শুকিয়ে এলো। আজ তার দিনটাই খারাপ। সে তো জানতো ঐ কোলনি হেমন্তের বাবার কিন্তু সেটা যে পৌষের নামে সেই খবর তার অজানা৷ একদমই অজানা।
তৌসিফ পানির গ্লাস হাতে নিতেই তুরাগ বৈঠক শেষ করলো। আজ আর বেশিক্ষণ থাকবে না এখানে তৌসিফ। বাকিদের চলে যেতে বললো সরাসরি। সালাম দিয়ে বের হতে হতে তৌসিফ রনিকে বললো,
“বাসাও যাও। আজ আর হাসপাতালে যেতে হবে না।”
“একবার নাহয় দেখে আসি বস?”
“প্রয়োজন নেই।”
টনিকেও ইশারায় বের হতে বলে তৌসিফ। অফিসে তখন মাত্র ওরা দু’জন। তৌসিফ গা এলিয়ে দেয় চেয়ারে। তুরাগ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“বউ সামলে রাখ তৌসিফ।”
চট করে তাকালো তৌসিফ। চোয়াল ফাঁক করে হেসে বললো,
“তোমার বউ থেকে আমার বউ বেশি সামলানো।”
“মীরাকে টেনে লাভ নেই এখানে। আজও বাগান বাড়ী গিয়েছে আদিত্যকে নিয়ে। কি হতো বুঝছিস তো নাকি? মুখে আর বলছি না। ওকে সামলা। এতই যেহেতু চঞ্চল, দুটো বাচ্চা নে। বাচ্চা সামলাতে গিয়ে বাইরের কৌতুহল মিটবে। পড়াশোনার চাপ বাড়া৷ এক কাজ কর, কোন এক্টিভিটিতে ভর্তি করিয়ে দে। তাত্ক্ষণিক ভাবে এটাই বেস্ট হবে। ক্যারাটে অথবা ম্যারাথন কিছু একটায় ঢুকিয়ে দে। এরপর বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে ভাব।”
সকল কথা বাদ দিয়ে তৌসিফ বিক্ষিপ্ত হয়ে বললো,
“এমনিতেই যা খেল ও আমাকে দেখায়, ক্যারাটে করালে কুংফু সব আমার উপরই এপ্লাই করবে।”
“যা খুশি কর। প্রয়োজনে শিকল দিয়ে রাখ তবুও আটকে রাখ।”
তৌসিফ উঠে নিচে বসলো। গায়ে এখনও প্যান্ট,শার্ট। সোফায় বসা তুরাগ। ভাইয়ের কোলের দিকে মাথা দিয়ে তৌসিফ বললো,
“ভালোবেসে ফেলেছি, ও বরং আমাকে শেকল বেঁধে ঘুরাতে পারবে। আমি পারব না৷ আগেই সারেন্ডার্ড আমি।”
“শেষমেষ বউয়ের প্রেমে পড়লি?”
“পড়লাম।”
“বাহ্। উন্নতি হলো না অবনতি বুঝলাম না।”
“মীরা ভাবীর মতো আধ-পাগলা বউয়ের প্রেমে তুমি পড়লে আমি তো তাও ভালোটার প্রেমে পড়েছি। ঐ সামান্য একটু ঘাড়ত্যাড়া।”
বলেই তৌসিফ হাসলো। তুরাগ ভাইয়ের মাথায় হাত রাখলো। চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বললো,
“ঘরে যা। বউকে শাসন করবি আজ।”
তৌসিফ উঠলো কিন্তু যেতে যেতে বললো,
“আজ আর না। বেশি শাসনে মানুষ হারিয়ে যায়।”
তুরাগ কথা বাড়ায় না। নিজেও অফিস থেকে বেরিয়ে যায়।
তৌসিফ বাসায় ঢুকে একদম নীরব একটা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলো। বুয়া দরজা খুলেছে। টেবিলে খাবার সাজানো। ঢেকে এভাবে পৌষ সাজিয়ে রাখে। তৌসিফ জুতা সহই কক্ষের দিকে পা বাড়ালো। পৌষের এই কাজটা পছন্দ না৷ ও সবসময় বলবে দরজার ওখানে খুলে রেখে আসতে। তৌসিফ মনে থাকা সত্ত্বেও আজ মানলো না। কক্ষ জুড়ে অন্ধকার। পৌষ সাধারণ আলোটুকুও সহ্য করতে চায় না। জুতামুজা খুলে এদিক ওদিক ফেলে গায়ের শার্ট, কোর্টও আশেপাশে কোথাও ছুঁড়ে মারলো তৌসিফ। কারণ সে জানে না কিন্তু ঘরে এসেছে থেকে ভালো লাগছে না। বাথরুমে ঢুকেও আরেক দফা অবাক হলো। তার কাপড় থেকে শুরু করে পানি সবই গুছিয়ে রাখা। ঠিক সেভাবে যেভাবে তৌসিফ পছন্দ করে। ঘন্টাখানেক সময় লাগলো তার গোসল করতে। আজ অবশ্য চাইছিলো পৌষকে চোটপাট দেখাতে কিন্তু ওমন ভাবে শুয়ে আছে, যা দেখে তৌসিফের মন সামান্য নরম হয়েছে। মাথা থেকে গড়িয়ে পানি গুলো পা বেয়ে যখন চলে গেলো তখন তাদের বয়ে চলা দেখতে লাগলো তৌসিফ। মনে মনে শুধু একবার ভাবলো কি হতো আজ। কি হতো যদি টনি আর ছেলেপেলেরা পাহারা না দিতো। অক্ষত পৌষরাত আজ এভাবে ঘুমিয়ে থাকতো না। কিভাবে থাকতো তাহলে? ভাবতেই রাগে, ক্ষোভে শরীর জ্বলে উঠে তৌসিফের। গরম পানির শাওয়ার বন্ধ করে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে সে। তার শীতলতা প্রয়োজন। রাগে শরীর উষ্ণ হয়ে যাচ্ছে বারবার।
তৌসিফ যখন বেরিয়ে এলো তখনও একই অবস্থায় আছে পৌষ। গা ঝাড়া দিয়ে তৌসিফ গিয়ে বসে পৌষের পায়ের কাছে। কম্বল সরিয়ে ভাঙা পা দেখে। দেখতে হবে তো পৌষের মায়ের বংশ কোনটা, তালুকদারদের জাত। সাহস তার পা থেকে চুল পর্যন্ত। তৌসিফ ভাঙা পায়ের তালুটা ধরে আছে নিজ হাতে। ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দেয় সে। আদুরে ভঙ্গিতে বুলানো হাতটা খুব ধীরে সুস্থে জোড়ালো হয়। চাপ বাড়ে। ঘুমের মধ্যেই একটু নড়ে পৌষ। তৌসিফের ডান হাতটা তখন শক্তি প্রয়োগ করে আরেকটু। ঘুম ছুটে যায় পৌষের। দৃষ্টি মেলেই মুখে অস্পষ্ট শব্দ করে। পায়ের কাছে তৌসিফকে দেখে চিরায়ত ভাবে হাসে। তৌসিফ ঠিক এই জায়গায় আটকে যায় তবে আজ শক্ত রইলো। হাতের চাপ বাড়িয়ে একটু ডান দিকে মোচড় দেওয়ার ভঙ্গি করে ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করে,
“এই পা দিয়েই তো এদিক ওদিক। ভেঙে দেই?”
“আচ্ছা।”
হাসিটা চওড়া হলো পৌষের। তৌসিফ শক্ত করে ধরলো আরো। একই ভাবে বললো,
“এক পা দিয়ে চলে যাবে না তোমার?”
“দুটোই ভেঙে দিন।”
“শিওর?”
পৌষ চোখের দিকে তাকালো। দৃঢ় দৃষ্টি তৌসিফের। পৌষ হেসে মাথা নাড়লো। চোখ নামালো। সম্মতি জানিয়ে বললো,
“একদম। শতভাগ শিওর।”
চাপ বাড়লো। পৌষ একই ভাবে বসা। নড়চড় নেই। তৌসিফ চাইলো রাগের মাথায় অঘটন ঘটাতে কিন্তু পারলো না৷ এত শক্ত করে ধরেছে তবুও যার হেলদুল নেই তাকে আর কি মোচকাবে তৌসিফ?
ভীতু নাহলে তাকে ভয় দেখিয়ে লাভ নেই। পৌষের চোখে ভয় তৌসিফ দেখলো না বরং ঠোঁট দুটো ভরা তার মায়া মায়া হাসি।
হাত সরাতেই পৌষ তাকালো। ঘুমে আধ ভাঙা গলায় বললো,
“কখন এলেন হুঁ?”
“ঘন্টা হলো।”
“ধুর, সব ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে বোধহয়।”
বলেই পৌষ উঠতে নেয়। তৌসিফ ওকে আটকায় না। কিছুটা অবাক হয়। পৌষ যেতে যেতে শুধালো,
“আপনার গালিটা কিন্তু মারাত্মক ছিলো মামাতো ভাই।”
“মাইরও মারাত্মক হবে আজেবাজে নামে ডাকলে।”
“সম্পর্কে আগে মামাতো ভাই না আপনি?”
তৌসিফ হাত ধরে হেঁচকা টান দিলো। পৌষ বুকে আসতেই কপালের কাটা চুল সরালো তৌসিফ। থুতনিতে শাহাদাত আঙুল বুলিয়ে বললো,
“ভয় করো। ভয় করার চেষ্টা করো। আজ খুব খারাপ কিছু হতো।”
“আচ্ছা।”
“এত সহজে না পৌষরাত। তুমি খুব অবাধ্য।”
“পুরাতন অভ্যাস।”
“আজকের আমার ওসব বাক্য আওড়াতে তুমি বাধ্য করেছো।”
পৌষ তৌসিফের গলার দিকে হাত রাখলো। নখ দিয়ে দাগ কাটতে কাটতে খুব সহজ গলায় বললো,
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৪৬
“গালি দুটো আমার গায়েই লাগে নি। আপনি তো গালি দিয়েছেন আপনার ফুপি আর ফুপাকে। আমি তাদের বাচ্চা। তাহলে আমার শিক্ষা হবেটা কিভাবে? এরপর থেকে আমার নামে গালি তুলবেন। আর হ্যাঁ, এর চাইতে মারাত্মক সব গালি আমি পাড়ি। একদিন শোনাব ঠিক আছে? দুই চাচি মিলেমিশে প্রচন্ড গালির শিক্ষা দিয়েছিলো আমাকে। বিয়ের পর চর্চা কমেছে কিন্তু ভুলে যাই নি। গালি খাওয়া তো ম্যাথ না যে চর্চার অভাবে ভুলে যাব।”
পৌষ রইলো না। চলে গেলো। তৌসিফ তাকিয়ে রইলো সেই পানে এক দৃষ্টিতে। অপলকভাবে।
