Home তোমার নামে নীলচে তারা তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৯

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৯

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৯
নওরিন মুনতাহা হিয়া

মেঘ অবাক হয়ে যায় জিয়ার আ’ত্মা’হত্যা’র কথা শুনে জিয়া সুই’সা’ই’ড কেনো করবে? আদ্রিয়ানের জন্য? কিন্তু আদ্রিয়ানের সাথে জিয়ার কোনো প্রকার রিলেশন নাই যদিও শুরুর দিকে মেঘ ও মনে করেছিল আদ্রিয়ান জিয়াকে ভালোবাসে। কিন্তু কাল কেবিনের বাহিরে দাঁড়িয়ে দুইজনের মধ্যে যা কথা শুনল তাতে স্পষ্ট হয়ে যায় আদ্রিয়ান জিয়াকে ভালোবাসে না? সে শুরু থেকেই জিয়াকে নিজের ছাএীর চোখে দেখে এসেছে। তবে কি কালকে জিয়ার বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেওয়ার কারণে জিয়া আত্মাহত্যা করেছে? জিয়ার আত্মাহত্যার কথা কি আদ্রিয়ান শুনেছে? এইজন্য কি রাত নয়টা বাজে তবুও সে বাড়িতে ফিরে আসেনি? আদ্রিয়ান কি এখন হাসপাতালে গেছে জিয়াকে দেখতে? জিয়ার অবস্থা এখন কেমন?

জিয়া শরীর আর আদ্রিয়ানের বাড়ি ফিরে না আসার কারণে মেঘের বেশ চিন্ত হয়। মেঘ এখন কি করবে? মেঘের কি উচিত আদ্রিয়ানকে ফোন করা? জিয়ার কি অবস্থা তা জিজ্ঞেস করা? তাছাড়া রাতে আদ্রিয়ান বাড়ি ফিরবে না কি তা জানা উচিত তার। আর জিয়া যদি আদ্রিয়ানের জন্য আত্মাহত্যা করে থাকে তবে নিশ্চয়ই তার পরিবার আদ্রিয়ানকে ছেড়ে দিবে না৷ আদ্রিয়ান এখন কি করছে? মেঘ দ্রুত টেবিলের উপর রাখা তার ফোন হাতে নেয় এরপর আদ্রিয়ানের নাম্বারে কল দেয়।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

প্রথমবার কল দেয় কলের শব্দ করে কিন্তু আদ্রিয়ান রিসিভ করে না, মেঘ যখন পরের বার কল দেয় তখন ও শব্দ করে কিন্তু অপর পাশ থেকে কল রিসিভ করেনা আদ্রিয়ান। মেঘ বিরক্ত হয়ে আরো চার থেকে পাঁচবার ফোন করে কিন্তু প্রতিবার শব্দ হয়ে ফোন কেটে যায়। ফোন টেবিলে শব্দ করে রেখে মেঘ বলে উঠে

–“আদ্রিয়ান স্যার ফোন রিসিভ করেন দয়া করে? আদ্রিয়ান পিক আপ দ্যা ফোন।“
হাসপাতালে কেবিনের দরজা পাশে বসে আছে ইরফান সাহেব তার চোখে রাগ, ঘৃণা, জেদ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। কিন্তু তার ঠিক সামনে থাকা পুরুষ বিস্ময়, হতাশা, আর অবাক হয়ে একটা চিঠির দিকে তাকিয়ে আছে। আদ্রিয়ানের হাতে থাকা চিঠি হলো সু’ই’সা’ই’ড নোট যা সে আত্মাহত্যা করার আগে লিখে গেছে। যেখানে স্পষ্ট ভাষায় লেখা আছে জিয়ার মৃত্যুর সম্পূর্ণ দায় আদ্রিয়ানের। আদ্রিয়ান তার সাথে প্রতারণা করেছে বলে সে মৃত্যুর মতো এমন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে। ইরফান সাহেব আদ্রিয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে

—“কি আদ্রিয়ান এখন বিশ্বাস হয়েছে? যে আমি মিথ্যা বলছি না, জিয়া তোমার কারণে আত্মাহত্যা করেছে? তুমি জিয়ার সাথে দীর্ঘদিন রিলেশনে থাকার পর এখন তার সাথে প্রতারণা করেছ বলে। জিয়া দুঃখে, কষ্টে, আত্মাহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে? এখন কি বলবে তুমি আদ্রিয়ান? “
ইরফান সাহেবের কথা আদ্রিয়ানের কানে পৌঁছায় এতোখন আদ্রিয়ানের জিয়ার জন্য খারাপ লাগছিল। কিন্তু এই চিঠি পড়ার পড়ে সে বুঝে গিয়েছে জিয়া ইচ্ছা করে তাকে ফাঁসাতে এই আত্মাহত্যার মিথ্যা নাটক করেছে। আদ্রিয়ানের এখন জিয়ার প্রতি মায়া নয় বরং রাগ কাজ করছে বেহায়া, নির্লজ্জ মহিলা। একজন নারী যে এতো বেহায়া হতে পারে তা হয়ত জিয়াকে না দেখলে সে জানত না। আদ্রিয়ান ইরফান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে

—-“স্যার আপনার মেয়ে একটা মিথ্যাবাদী আর ওর লেখা চিঠি সম্পূর্ণ মিথ্যা।“
আদ্রিয়ানের না বোধক কথা শুনে ইরফান সাহেবের রাগ উঠে যায় ওনি রাগান্বিত কণ্ঠে বলে উঠে
—“ আদ্রিয়ান তুমি এখন আমার মেয়েকে মিথ্যাবাদী বলছ? সাহস তো কম না তোমার? আর একজন মৃত্যু পথযাত্রী ব্যক্তি নিশ্চয়ই তার মারা যাওয়ার আগে মিথ্যা কথা বলবে না? “
ইরফান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান হেঁসে উত্তর দেয়
—-“স্যার আপনি ঠিক বলেছেন একজন মানুষ মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে মিথ্যা কথা বলবে না। কিন্তু যদি ওই ব্যক্তি আপনার মেয়ে না হয় তো? আপনার মেয়ে একটা নির্লজ্জ, বেহায়া, ফালতু, আর লোভী মেয়ে যাকে ভালোবাসা তো দূরের কথা ওর মুখ দেখতে অবধি আমার ঘৃণা করে।“
আদ্রিয়ানের কথা শুনে ইরফান সাহেব রাগে জ্বলে উঠে তার শার্টের কর্লার ধরে বলে

—-“আদ্রিয়ান তোমার কি লজ্জা করে না? আমার অসুস্থ মেয়ের নামে এমন মিথ্যা কথা বলতে?“
আদ্রিয়ান ইরফান সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে
—“লজ্জা আমার নয় বরং আপনার করা উচিত স্যার । শুধু জন্ম দিলে বাবা হওয়া যায় না, মেয়েকে শিক্ষা, আর উপদেশ দিতে হয়। আর যদি মেয়ে কোনো ভুল করে তবে ছোটবেলা থেকে তাকে শাসনে বড়ো করতে হয়। আপনার মেয়ে অসুস্থ বলে আমি এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলছি না হলে ওর গালে গুণে গুণে দশটা থাপ্পড় দিয়ে বুঝিয়ে দিতাম। ফাইজলামি করার শাস্তি কি হয়।“
ইরফান সাহেব আদ্রিয়ানের শার্টের কর্লার ছেড়ে দেয়, এরপর শান্ত আর প্রতিশোধ পরায়ণ কণ্ঠে বলে উঠে

—“ আদ্রিয়ান তুমি হয়ত ভুলে যাচ্ছো। তুমি যে হাসপাতালে ডক্টরি কর ওই হাসপাতালের মালিক আমি। যদি তোমার জন্য আমার মেয়ের কোনো ক্ষতি হয় তবে কিন্তু তোমার কেরিয়ার আমি ধ্বংস করে দিব।“
ইরফান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান ভয় পায় না বরং জোড়ালো কণ্ঠে বলে উঠে
—“ইরফান স্যার, আপনি হাসপাতালের মালিক আমার জীবনের নয়। আর আমার কেরিয়ার শেষ করার কোনো ক্ষমতা আপনার নাই। “
আদ্রিয়ানের কথা শুনে ইরফান সাহেব জিয়ার সুই’সা’ই’ড নোট তার মুখের সামনে ধরে বলে

—“যদি এই সু’ই’সা’ই’ড পুলিশের কাছে জমা দেয় তবে জিয়ার মৃত্যু সম্পূর্ণ দায় তোমার থাকবে৷ আর আমেরিকার আইন অনুযায়ী, বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এক নারীকে ঠকানোর অভিযোগে তোমার জেল হতে পারে। আর তোমার তিল তিল করে গড়ে তুলা কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে৷ তোমার ডক্টরির লাইসেন্স বাতিল হয়ে যাবে, তুমি আর কোনো হাসপাতালে কখন ডক্টর হিসাবে জয়েন করতে পারবে না। “
ইরফান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান ভয় পেয়েছে কি না তা বুঝা যায়নি। আদ্রিয়ান বলে
— “সত্যি করে বলুন ইরফান আপনি কি চান? আমার শাস্তি না জেল? “
আদ্রিয়ানের কথা শুনে ইরফান সাহেব বলে

—- “আমি চাই জিয়া সুস্থ হয়ে উঠলে তুমি জিয়াকে বিয়ে করবে। একমাত্র এই উপায়ে তুমি তোমার কেরিয়ার আর মান সম্মান রক্ষা করতে পারবে। “
—-“কিন্তু এইটা আমার দ্বারা সম্ভব নয় ইরফান স্যার। কারণ আমি বিবাহিত, বাংলাদেশে আমার স্ত্রী রয়েছে। আর যদি আমার কেরিয়ার ধ্বংস হয়ে যায় বা আমার জেল হয় তবুও আমার দ্বারা জিয়াকে বিয়ে করা সম্ভব নয়। কারণ জিয়ার মতো এমন বেহায়া, আর অহংকারী মেয়ের সাথে সারাজীবন সংসার করা যায় না। আমি জিয়াকে বিয়ে করতে পারব না।“

— “তবে কি তুমি জেলে যেতে চাও আদ্রিয়ান?
ইরফান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান বলে উঠে
—- “পুলিশ পাঠিয়ে দিয়েন, আমি বাসায় অপেক্ষা করব। আর আমার বাসার ঠিকানা নিশ্চয়ই আপনি জানেন।
আদ্রিয়ান আর কথা বাড়ায় না জিয়ার শরীরের অবস্থা কেমন তা জানার আর আগ্রহ দেখায় না বড় বড় পা ফেলে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে যায়। ইরফান সাহেব রাগে দাত কটমট করে তাকিয়ে থাকে শুধু আদ্রিয়ানের যাওয়ার দিকে। আদ্রিয়ান চলে যাওয়ার পর ডক্টর আইসিইউে থাকা জিয়ার কেবিন থেকে বের হয়। ডক্টরকে দেখে ইরফান সাহেব আর ডলি বেগম এগিয়ে যান ডলি বেগম চিন্তিত কণ্ঠে বলে
— “ডক্টর, আমার মেয়ে জিয়া কেমন আছে? ওর শরীরের অবস্থা এখন কেমন? “
—“রোগীর অবস্থা এখন ভালো। হা’ত কে’টে যাওয়ার ফলে শরীর থেকে প্রচুর র’ক্ত বের বের হয়েছিল। তবে শরীরে নতুন রক্ত ভরা হয়েছে আর হাতে বেন্ডেজ করা হয়েছে। আশা করি কালকে রাতের মধ্যে হুঁশ ফিরে আসবে।“
জিয়ার সুস্থতার কথা শুনে ইরফান সাহেব আর ডলি বেগমের চিন্তা দূর হয়। ডক্টর ইরফান সাহেবের সাথে জিয়ার শরীরের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অন্য বিভিন্ন কথা বলে।

[ রাত প্রায় ১০: ৩০ ]
রাত সাড়ে দশটার সময় বাড়ির মেইন গেইট দিয়ে আদ্রিয়ানের গাড়ি প্রবেশ করে। গাড়ি থেকে বের হয়ে আদ্রিয়ান বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করে, ড্রয়িং রুমে থাকা কাজের মহিলা আদ্রিয়ানকে দেখে এগিয়ে আসে আর বলে
— “আদ্রিয়ান স্যার আপনি এসে পড়েছেন? স্যার আজ হঠাৎ এতো দেরি করে বাড়ি ফিরলেন কেনো? “
কাজের মহিলার কথার জবাবে আদ্রিয়ান ছোট করে উত্তর দেয়
—“হাসপাতালে জরুরি অপারেশন ছিল। “
আদ্রিয়ান কথাটা বলে সিঁড়ি দিকে পা বাড়ায় তখন কাজের মহিলা আবার তাকে পিছন থেকে ডেকে প্রশ্ন করে
—- “আদ্রিয়ান স্যার রাতের খাবার খাবেন না? আমি কি খাবার গরম করব? “
— “না, খাবার গরম করার প্রয়োজন নাই। আমার খুদা লাগেনি। আর আমি এখন রুমে গিয়ে বিশ্রাম করব, আমাকে বিরক্ত করবে না। “

— “ওকে স্যার। “
আদ্রিয়ান বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। কাজের মহিলা চলে যায় রান্নাঘরে রাতের খাবার ফ্রিজে তুলে রাখতে। মেঘ যখন রুমে বসে পড়াশোনা করছিল তখন বাহিরে নিচ থেকে গাড়ির শব্দ শুনতে পায়। মনে হয় আদ্রিয়ান চলে এসেছে! জিয়ার অবস্থা কেমন তা জানার আগ্রহ হয় মেঘের। দ্রুত বই বন্ধ করে মেঘ পড়ার টেবিল থেকে উঠে পড়ে, এরপর রুম থেকে বের হয়ে যায়।
বাড়ি ফিরে আসার পর আদ্রিয়ান হয়ত রাতের খাবার খাওয়ার উদ্দেশ্য হয়ত টেবিলে বসে আছে এইটা মেঘ ভাবে। মেঘ সিঁড়ি বেয়ে দ্রুত নিচে চলে যায় কিন্তু টেবিলে আদ্রিয়ানকে বসে থাকতে না দেখে মেঘ অবাক হয়। রান্নাঘরে থাকা কাজের মহিলার কাছে গিয়ে যায়, কাজের মহিলা মেঘকে দেখে বলে

— “মেঘ ম্যাম আপনি এখানে রান্নাঘরে? আপনি কি চা – নাস্তা কিছু খাবেন? আমি বানিয়ে দিব? “
— “না, আমি কিছু খাব না। আদ্রিয়ান স্যার কি বাড়ি ফিরে এসেছে? বাহিরে গাড়ির শব্দ শুনলাম! “
— “হুম স্যার একটু আগেই বাড়ি ফিরে এসেছে। “
আদ্রিয়ান বাড়ি ফিরে এসেছে অথচ রাতের খাবার খেতে টেবিলে এসেনি কেনো? জিয়ার শরীরের অবস্থা কি খুব খারাপ? হাসপাতালে কি কিছু হয়েছে? আদ্রিয়ান স্যার কি আপসেট? মেঘ পুনরায় প্রশ্ন করে
—“আদ্রিয়ান স্যার, রাতের খাবার খাবে না? তুমি ওনাকে খাবার খাওয়ার কথা জিজ্ঞেস করনি? “
— “জি ম্যাম করেছি। কিন্তু স্যার বলল ওনার খুদা নাই। স্যার রুমে গিয়ে বিশ্রাম করতে চাই, আর ওনাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছেন। “

কাজের মহিলার কথা মেঘ শুনল আদ্রিয়ানের খুদা নাই এর মানে কি? দুপুরে নিশ্চয়ই খাবার খায়নি আর এখন রাতে ও খাবে না। আজ মাএ জ্বর থেকে একটু সুস্থ হয়েছে আর এর মধ্যে যত অনিয়ম শুরু করে দিয়েছে। মেঘ কাজের মহিলাকে আদেশ করে বলে
— “তুমি আদ্রিয়ান স্যারের খাবার রেডি করে দাও। আমি ওনার রুমে খাবার নিয়ে যাব। “
— “কিন্তু আদ্রিয়ান স্যার তাকে বিরক্ত করতে নিষেধ করেছে। “
— “হুম জানি। তবুও তুমি ওনার খাবার রেডি করে দাও। “
—“ ওকে মেঘ ম্যাম –। “
কাজের মহিলা খাবার রেডি করে গুছিয়ে থালায় সাজিয়ে দেয়। মেঘ খাবার হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায় আদ্রিয়ানের রুমে যাওয়ার জন্য।

ওয়াশরুম থেকে গোসল শেষ করে বের হয় আদ্রিয়ান গায়ে তার টাউজার আর সফট শার্ট। আমেরিকায় এখন শীতকাল চলছে এই প্রচণ্ড শীতের রাতে গোসল করার ফলে তার শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে পড়েছে। বাহির থেকে আসা শীতল বাতাস রুম ঠাণ্ডা করে তুলেছে তবে আদ্রিয়ানের এই বিষয়ে কোনো হুঁশ নাই। হাতে থাকা টাওয়াল মেঝেতে ফেলে দিয়ে, টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সিগারেট বের করে জ্বালায়। এরপর ধপ করে শরীর ছেড়ে দিয়ে ছোফায় বসে পড়ে।

মেঘ খাবার প্লেট হাতে করে রুমে প্রবেশ করে চোখ বন্ধ করে ছোফায় শরীর ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচুঁ করে বসে ছিল আদ্রিয়ান। হঠাৎ করে কারো পায়ের নুপুরের শব্দ শুনে তাকায় সামনের দিকে খাবারের থালা হাত নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেঘ। আদ্রিয়ান মেঘকে দেখে অবাক হয়েছে! বিরক্ত হয়েছে! বা খুশি হয়েছে যা বোঝা যায়নি। শুধু কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে মায়া ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল, এরপর আবার পূর্বের মাথা নিচুঁ করে বসে থাকে। মেঘ আদ্রিয়ানের তাকিয়ে থাকা সহ সমস্ত কার্যকলাপ খেয়াল করল, মেঘ বলে

— “আদ্রিয়ান স্যার আপনার রাতের খাবার। খাবার খাবেন না আপনি? “
মেঘের কথা হয়ত আদ্রিয়ান শুনল সে মাথা নিচুঁ করা অবস্থায় উত্তর দেয়
— “হুম খাব। খাবার নিয়ে আসো। “
আদ্রিয়ানের অনুমতি নিয়ে মেঘ খাবার নিয়ে যায় তার কাছে। এরপর মেঘ তার হাতে থাকা খাবার টেবিলে রেখে জিজ্ঞেস করে
—“শুনলাম ডক্টর : জিয়া আ’ত্মা’হ’ত্যা করেছে? এখন তার শরীরের অবস্থা কেমন? আপনি হাসপাতালে গিয়েছিলেন?“
আদ্রিয়ান মেঘের কথার বিপরীতে উত্তর দেয়

—-“ হুম জিয়া সু’ই’সা’ই’ড করেছে। আমি হাসপাতালে গিয়েছিল ওর শরীরের অবস্থা খুব ভালো না। হা’তে’র র’গ কেটে যাওয়ার ফলে প্রচুর র’ক্ত বের হয়েছে। “
আদ্রিয়ানের মেঘের কথার উত্তর দিচ্ছে দেখে মেঘ পুনরায় সাহস করে প্রশ্ন করে
— “ডক্টর : জিয়া হঠাৎ আ’ত্মা’হ’ত্যা কেনো করেছে? “
—“আমাকে ভালোবাসে তাই! “
—“ আপনি কি জিয়াকে ভালোবাসেন না? “
— “মেঘ তুমি কি প্রশ্নের উত্তর জানো না, না আমার মুখ থেকে শুনতে চাও? “
— “না আমি জানি না এই প্রশ্নর উত্তর। “
— “তবে জানার প্রয়োজন নেই। “
—- “হুম ঠিক বলেছেন জানার প্রয়োজন নাই। আর আমি আপনাকে প্রশ্ন করার কে? কে হয় আমি আপনার?“

মেঘ খাবার রেখে যখন কথাটা বলে চলে যাবে তখন হঠাৎ পিছন থেকে আদ্রিয়ান তার হাত ধরে ফেলে। মেঘ থমকে যায় তার গুটিয়ে পিছনে ফিরে তাকায় আদ্রিয়ান তার মাথা উঁচু করে শান্ত স্বরে বলে
— “মেঘ খুব খুদা লাগছে আমার। শরীরে একদম শক্তি নাই একটু খায়িয়ে দাও না আমায়। “
আদ্রিয়ানের কণ্ঠ বেশ অসহায় লাগল মেঘের কাছে আজ প্রথমবার কেমন জানি অদ্ভুত লাগছে আদ্রিয়ানকে তার। মুখে গম্ভীরযর্তা বা রাগ নেই রয়েছে শুধু একরাশ মায়া। তবে মেঘ এতো সহজে গলে যায়নি সে বলে উঠে
— “আদ্রিয়ান স্যার আমার পড়াশোনা আছে আমাকে রুমে যেতে হবে আপনি একাই খেয়ে নিন। “
মেঘের না বোধক কথায় হয়ত আদ্রিয়ান খুশি হয়নি তার কণ্ঠে থাকার অসহায়ত্ব অধিক দৃঢ় হয়। একপ্রকার আকুতি মিনতি করে বলে উঠে

— “মেঘ দুপুর থেকে কিছু খায়নি খুব খুদা লাগছে। যদি রাতে না খায় তবে হয়ত অসুস্থ হয়ে পড়ব। শরীর বেশ শীত শীত করছে মনে হয় কালকের জ্বর আবার উঠবে। খাবার খেয়ে ঔষধ খেতে হবে। প্লিজ, মেঘ একটু খায়িয়ে দাও। “
মেঘ থমকে যায় আদ্রিয়ানের কণ্ঠ স্বর শুনে আদ্রিয়ানের চোখে পানির বিন্দু দেখা যাচ্ছে? মনে হচ্ছে সে হয়ত কান্না করে দিবে! কিন্তু আদ্রিয়ান হঠাৎ এমন করছে কেনো? কি হয়েছে? হাসপাতালে কি ইরফান সাহেব কিছু বলেছে? আদ্রিয়ান বাচ্চাদের মতো আশাতুক দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকে মেঘের দিকে। মেঘের হয়ত একটু মায়া হয় তার ইচ্ছা না থাকার পর ও রাজি হয় খাবার খায়িয়ে দিতে।
টেবিলে থাকা কাঁচের গ্লাসের পানি দিয়ে হাত ধুয়ে খাবার প্লেট হাতে নেয়। আদ্রিয়ান এই সাইড হয়ে সরে হয় মেঘকে হাতের ইশারায় তার পাশে বসতে বলে। মেঘ বাধ্য মেয়ের মতো সেখানে বসে যায় এরপর খাবার মাখে। আদ্রিয়ান একবারের জন্য ও মেঘের হাত ছাড়ে না বরং হাতের বাঁধন দৃঢ় করে ধরে রাখে। মেঘ ভাত মাখিয়ে আদ্রিয়ানের মুখের কাছে ধরে আর সে বাচ্চাদের মতো হা করে মেঘের হাত থেকে খাবার খেয়ে নেয়।
আদ্রিয়ান প্রতি লমকা ভাত খাচ্ছিল আর মেঘের হাতে একটা ধরে ছোট কামড় বসিয়ে দিচ্ছিল। মেঘ বলে উঠে

—- “আদ্রিয়ান স্যার কি করছেন? হাতে কামড় দিচ্ছেন কেনো? আমি ব্যাথা পাচ্ছি! আরেকবার কামড় দিলে কিন্তু আমি আর খাবার খায়িয়ে দিব না। “
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনে বাধ্য ছেলের মতো এপাশ উপাশ মাথা নাড়িয়ে বলল না সে আর কামড় দিবে না। আদ্রিয়ানের এমন কাণ্ড দেখে মেঘের হাসি পায় তবে সে মনে মনে হাসে। মুখের আদলে কোনো প্রকার অভিব্যক্তি প্রকাশ করে না বরং খুব শান্ত থাকে।
খাবার খাওয়া শেষ হলে মেঘ তার হাত ধুয়ে যখন ছোফার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে লাগবে৷ তখন আদ্রিয়ান আবার তার হাত ধরে টান দিয়ে তার কোলে বসিয়ে নেয়৷ ঘটনা এতো তাড়াতাড়ি হয় যে, মেঘ অবাক হয়ে যায়। আদ্রিয়ান এতোখনে মেঘের কোমড় জড়িয়ে ধরে খুব শক্ত করে তার বুকের সাথে মিশিয়ে ফেলে। মেঘের মুখ আদ্রিয়ানের কাঁধের অপর পাশে আর তার সমস্ত শরীর আদ্রিয়ানের শরীরের সাথে মিশে আছে। মেঘ বলে

—“আদ্রিয়ান স্যার কি করছেন? ছাড়ুন আমায়! “
আদ্রিয়ান মেঘের কথা শুনল না বরং আরো অধিক শক্ত করে জড়িয়ে ধরল মেঘকে। দুইটা শরীরের মধ্যে এখন এক বিন্দু অবধি ফাঁকা নাই যে বাতাস চলাচল করবে। আদ্রিয়ান মেঘের কোমড় হাত রেখে ঘাড়ে থুঁতনি ঘষে কান্না মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠে
—“মেঘ তুমি মালিহা তাই না? আমার বিবাহিত স্ত্রী। যদিও এইটা আমার সন্দেহ কিন্তু তা সত্যি কি না জানি না। তবে খুব শীঘ্রই জেনে যাব। “
আদ্রিয়ানের কথা মেঘ শুনে না সে বলে
— “আদ্রিয়ান স্যার আমি মালিহা নয়। আমায় ছাড়ুন। “
আদ্রিয়ান এইবার ও মেঘের কথা শুনল না জেদ খাটিয়ে বা শক্তি দিয়ে আরো অধিক নিকটে নিয়ে আসল। আদ্রিয়ান মেঘের কাঁধে মুখ গুঁজে দেয় আর বলে
—“কিন্তু মেঘ আমার কেনো মনে হয় যে তুমিই মালিহা। পৃথিবীতে এতো এতো মেয়ে থাকতে কেনো তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা, মায়া কাজ করে? মেঘ বিশ্বাস করো আমি সত্যি দুঃখিত মেঘ। ‎তবে বিশ্বাস কর আমি তোমার সাথে সত্যি সংসার করতে চেয়েছিলাম মেঘ। বিয়ের পর তোমায় একা রেখে আমেরিকায় চলে আসতে চাইনি আমি মেঘ। এই আদ্রিয়ান স্বার্থপর নয় মেঘ। কিন্তু তখন যদি আব্বু বলত যে আমি বিয়ের পর পড়াশোনা করতে বিদেশে আসতে পারব। তবে এইসব হতো না। মেঘ তোমাকে স্ত্রী হিসাবে স্বীকার করেছিলাম আমি। কিন্তু আমার স্বপন তখন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল আমার কাছে যার জন্য আমি দুঃখিত মেঘে। “

আদ্রিয়ান পুনরায় নিশ্বাস ছেড়ে বলে উঠে
—- “মেঘ আমি তোমার সাথে আগে ও সংসার করতে চেয়েছি এখন ও চাই মেঘ৷ আমি জানি সাতটা বছর আমি তোমাকে যে অবহেলা আর কষ্ট দিয়েছি তা ফিরিয়ে দিতে পারব না। কিন্তু আমি চাই আগামী সত্তর বছর তোমাকে ভালোবেসে কাটিয়ে দিতে। আমি তোমায় অনেক ভালোবাসব মেঘ, তুমি যা চাও তাই করব। প্রয়োজন হলে সারাদিন তোমার পায়ের কাছে পড়ে থাকব তবুও আমাকে ফিরিয়ে দিও না তুমি মেঘ। আমি একা একা থাকতে থাকতে ভীষণ টার্য়াড মেঘ আর কারো ঘৃণা সয্য করার মতো ক্ষমতা আমার নাই মেঘ। “
আদ্রিয়ান পুনরায় বলে উঠে

— “মেঘ চলো আমরা বাংলাদেশে চলে যায়। এরপর সেখানে গিয়ে আমি যেকোনো হাসপাতালে ডক্টরি করব। আর তুমি পড়াশোনা করবে। এরপর তোমার শেষ হলে আমরা নতুন করে বিয়ে করে সংসার করব। তবুও মেঘ আমাকে একটা শেষ সুযোগ দাও। প্লিজ মেঘ শেষ বারে আমাকে তোমায় ভালোবাসতে দাও। শুধু মাএ একটা শেষ সুযোগ দাও? “

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৮

আদ্রিয়ান কান্না করতে করতে কথাগুলো বলে তার চোখের পানি মেঘের কাধে পড়ছে। মেঘ অনুভব করছে আদ্রিয়ানের কান্না। সত্যি কি আদ্রিয়ান কান্না করছে? মেঘের বিশ্বাস হচ্ছে না।

তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ৩০