তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৮
নওরিন মুনতাহা হিয়া
লাইব্রেরি থেকে বড় বড় পা ফেলে বের হয়ে যায় মেঘ পিছনে ঘুরে একবার ও আদ্রিয়ানের দিকে তাকায় না। এরপর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে চলে যায় তার ক্লাস রুমের দিকে। মাএ ক্লাস শেষ করে টিচার্র ক্লাস রুম থেকে বের হয়েছে সকল ছাএ ছাএী ব্যাগপএ গুছিয়ে বাহিরে করিডরে আড্ডা দিতে চলে যায়। মেঘ তখন ক্লাসে প্রবেশ করে এতোখন আদ্রিয়ানের সাথে কথা বলার কারণে সে ক্লাস করতে পারেনি। দরজা দিয়ে মেঘকে প্রবেশ করতে দেখে নূহা তার সিট ছেড়ে মেঘের কাছে এগিয়ে যায় আর বলে
“মেঘ তুমি এতোখন কোথায় ছিলে? ক্লাস করলে না কেনো? আর আদ্রিয়ান স্যার তোমাকে কি নোট দিয়েছে? “
নূহার কথার বিপরীতে মেঘ কিছুক্ষণ চুপ থাকে মূলত তার এখন কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। কিন্তু নূহা যেহেতু তাকে কোনো কথা জিজ্ঞেস করেছে তাই সে ভদ্রতার জন্য বলে
“আদ্রিয়ান স্যার কালকে নোট দিবে বলেছে, আর আমি এতোখন লাইব্রেরিতে ছিলাম। পরীক্ষার জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের প্রয়োজন ছিল আমার …
“ওহ্ আচ্ছা“..
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
মেঘ নূহা সাথে আর কথা বাড়ায় না সে তার সিটে যাওয়ার উদ্দেশ্য পা বাড়ায়। কিন্তু হঠাৎ কি ভেবে আবার পিছনে ঘুরে নূহাকে থামিয়ে বলে
“নূহা আজ আমি তোমার সাথে যাব৷ ক্লাস শেষ করে একসাথে আটো করে বাড়ি ফিরব। তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করো“।
“কিন্তু কেনো মেঘ?তুমি কি গাড়ি করে যাবে না আজ? “
“না আমার ড্রাইভার আজ অসুস্থ, গাড়ি নিয়ে আসতে পারবে না। অটো বা ক্যাপ বুক করে যেতে হবে। “
মেঘ শেষের সারির সিটে বসে পড়ে আবার স্যার আসে ক্লাস শুরু হয়। পর পর তিনটা ক্লাসের পর কলেজ ছুটি হয় মাঝে খাবারের জন্য বিরতি দেওয়া হয়েছে। দুপুর ২:০০ টার দিকে ক্লাস ছুটি হওয়ার পর মেঘ আর নূহা একসাথে গাড়ি করে বাসায় ফিরে আসে লাইব্রেরি থেকে চলে আসার পর আদ্রিয়ানের সাথে আর দেখা হয়না মেঘের। কলেজের গেইট আদ্রিয়ানের গাড়ি ও দেখতে পায় না সে আদ্রিয়ান ক্লাস শেষ করে কি বাড়ি ফিরে গেছে? না কি হাসপাতালে চলে গেছে?
মেঘ আর আদ্রিয়ানের বিষয়ে চিন্তা করেনা। বিকাল সাড়ে তিনটার দিকে মেঘ বাসায় ফিরে আসে এরপর সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যায়। কাজের লোক রুমে দুপুরের খাবার দিয়ে যায়‚ওয়াশরুম থেকে গোসল করে এসে মেঘ খাবার খেয়ে নেয়। এরপর শরীর ভীষণ টার্য়াড থাকায় মেঘ বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
[ আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটি, প্রেসবিটিয়ার হাসপাতাল ]
আমেরিকায় নিউইয়র্ক সিটির জনপ্রিয় হাসপাতাল প্রেসবিটিয়ান হাসপাতালের আইসিইউর কাছে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসে আদ্রিয়ান। তখন ইরফান সাহেব চিন্তিত আর ভয়ার্ত শরীরে পায়চারি করছে আর ডলি বেগম কেবিনের বাহিরে থাকা ট্রুলের উপর বসে চিৎকার করে কান্না করছে।
আদ্রিয়ান আইসিউর বাহিরে ডলি বেগম আর ইরফান সাহেবকে দেখে দ্রুত ছুটে আসে তাদের কাছে। আদ্রিয়ান যখন লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে যখন তারে কেবিনে বসে মেঘের বলা প্রতিটা কথা ভাবছিল তখন হঠাৎ তার ফোনে কল আসে। আদ্রিয়ান ফোন হাতে নিয়ে রিসিভ করার পর সে জিয়ার আত্মহত্যার কথা জানতে পারে। জিয়ার এক বন্ধু আদ্রিয়ানের কলিগ তাকে এই খবর দেয়‚জিয়ার অবস্থা এখন খুব খারাপ। হাত থেকে অতি’রি’ক্ত র’ক্ত পড়ার কারণে তার শরীরে র’ক্তশূন্যতা দেখা দিয়েছে। আদ্রিয়ানের প্রথম বিশ্বাস হয় না জিয়ার আত্মাহত্যার কথা ‚ জিয়ার মতো এমন একজন মেয়ে আত্মাহত্যা করতে পারবে তা কি সত্যি বিশ্বাসযোগ্য?
কিন্তু তার কলিগ যেহেতু বলেছে তবে এই ঘটনা মিথ্যা না তাই আদ্রিয়ান দ্রুত কলেজ থেকে বের হয়ে হাসপাতালে ছুটে আসে। আদ্রিয়ান চিন্তিত কণ্ঠে বলে উঠে
“ইরফান স্যার জিয়া কেমন আছে? ওর অবস্থা কি এখন? জিয়া হঠাৎ করে কেনো আত্মাহত্যা করেছে?“
আদ্রিয়ানের প্রশ্ন ছিল ইরফান সাহেবের কাটাঁ গায়ে লবণ ছিটিয়ে দেওয়ার মতো। ইরফান সাহেব তার হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে এরপর আদ্রিয়ানের শার্টর কর্লার চেপে ধরে রাগী কণ্ঠে বলে উঠে
“কেনো এসেছ এখানে আদ্রিয়ান তুমি? আমার মেয়ের মৃ’ত লা’শ দেখতে? জিয়া মারা গেলে তুমি খুব শান্তি পাও তাই না? আর জিয়া কেনো আত্মাহত্যা করেছে তা তুমি জানো না? আদ্রিয়ান তুমি আমার প্রিয় ছাএ ছিলে, তোমাকে সবসময় আমি নিজের ছেলের মতো ভালোবাসা আর আদর দিয়ে বড়ো করেছি আমি। অথচ তুমি কি করে আমার মেয়ের সাথে এতো বড়ো অন্যায় করলে? তুমি এতোটা নিচু মন মানসিকতার মানুষ? “
ইরফান সাহেবের কথার মানে হয়ত আদ্রিয়ান কিছুটা বুঝল। কিন্তু জিয়ার সাথে সে প্রতারণা করেছে এর মানে কি? আদ্রিয়ান জিয়াকে কখনো বলেনি সে তাকে ভালোবাসে বা তার মনে জিয়ার জন্য কোন অনুভূতি রয়েছে। শুরু থেকে শেষ অবধি আদ্রিয়ান সবসময় জিয়ার থেকে দুরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করছে। যতটুকু জিয়ার কাছে সে গিয়েছে তা হয় হাসপাতালে কাজের প্রয়োজনে না হয় শিক্ষক বা কলিগ হিসাবে। কিন্তু জিয়া তার জন্য আত্মাহত্যা করছে? আদ্রিয়ান বলে
“ইরফান স্যার আমি আপনাকে শিক্ষক বা গুরু হিসেবে সবসময় সম্মান করে এসেছি, আর জিয়া আপনার মেয়ে ওর সাথে আমার কোনো প্রেমের সম্পর্ক কখনো ছিল না। জিয়া আমাকে ভালোবাসতো কিন্তু আমি না? জিয়ার সাথে কোনো অন্যায় আমি করিনি?“
আদ্রিয়ানের কথা ইরফান সাহেব বিশ্বাস করল না উল্টো সে আরো রাগ আর জেদ দেখিয়ে বলে উঠে
“ আদ্রিয়ান মিথ্যা বলার চেষ্টা করবে না তুমি? জিয়ার সাথে তোমার প্রেম ঘটিত সম্পর্ক ছিল। তুমি জিয়াকে মিথ্যা ভালোবাসার কথা বলে ওর সাথে শারিরীক সম্পর্ক অবধি করেছ। কিন্তু এখন যখন জিয়া তোমাকে বিয়ের কথা বলছে তুমি ওকে অস্বীকার করছ? ওর সাথে প্রতারণা করেছ তুমি আদ্রিয়ান। “
ইরফান সাহেবের কথা শুনে আদ্রিয়ান যেনো আকাশ থেকে পড়ে তার কানকে সে বিশ্বাস করতে পারছে না। জিয়ার সাথে তার শারীরিক সম্পর্ক ছিল মানে? জিয়াকে কখন সে নিজ থেকে জড়িয়ে অবধি ধরেনি? আর জিয়া তার ছাএী ছিল সে এইরকম কিছু করার কথা ভাবতে অবধি পারে না। আদ্রিয়ান বলে
“স্যার আপনি কি বলছেন এইসব? জিয়ার সাথে আমার ফিজিক্যাল রিলেশন ছিল মানে? জিয়াকে আজ অবধি আমি ছুঁয়ে ও দেখেনি? আপনার এই কথার কোনো ভিত্তি নাই, সম্পূর্ণ মিথ্যা কথা বলছেন আপনি? জিয়াকে কখনো ভালোবাসিনি আমি আর না ওর সাথে কোনো প্রকার অবৈধ সম্পর্ক ছিল আমার? “
আদ্রিয়ানের না বোধক কথা শুনে ইরফান সাহেব তার পকেটে থাকা একটা চিঠি বের করে। এরপর আদ্রিয়ানের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে
“যদি তোমার সাথে জিয়ার কোনো সম্পর্ক না থাকে তবে এই চিঠির মানে কি? জিয়া সুইসাইড করার আগে তার মনের কথা তোমার প্রতারণার কথা সব এখানে লিখে দিয়েছে গেছে? কোনো মানুষ নিশ্চয়ই মৃত্যুর আগ মুহূর্তে মিথ্যা কথা বলবে না? “
ইরফান সাহেবের হাতে থাকা চিঠি আদ্রিয়ান দ্রুত তার হাত বাড়িয়ে নেয়। এরপর তা খুলে পড়তে থাকে যেখানে স্পষ্ট লেখা ছিল জিয়া আর তার প্রেম ছিল। তাদের শারিরীক সম্পর্ক ছিল। আদ্রিয়ানকে যখন জিয়া বিয়ের কথা বলে তখন আদ্রিয়ান তার সাথে প্রতারণা করে। এইসব কথা জিয়া আত্মাহত্যা করার আগে লিখে রেখে দিয়েছে? চিঠির একটা কথা ও সত্যি না তা আদ্রিয়ান জানে। কিন্তু জিয়া এমনটা কেনো করল? এইটা জিয়ার কোনো নতুন পরিকল্পনা নয় তো? জিয়া ঠিক কতটা পা’গ’ল আর উন্মাদ তার জন্য তা সে যানে। কিন্তু তাই বলে জিয়া এমন আ’ত্মাহ’ত্যা করে আদ্রিয়ানকে ফাঁসিয়ে দিবে তা ভাবতে পারেনি।
রাতে পড়ার টেবিলে বসে আছে মেঘ টেবিলে থাকা বইয়ের পৃষ্ঠা জানালা দিয়ে আসা উষ্ণ বাতাসে বারবার শব্দ করছে। যদিও এই বিষয়ে মেঘের কোনো খেয়াল নাই তার মন এখন ও দুপুরে লাইব্রেরিতে থাকা ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। মেঘের এখন কি করা উচিত? আদ্রিয়ানকে কি সত্যি সে তার পরিচয় দিয়ে দিবে? যে সে মালিহা? যদিও লাইব্রেরিতে থাকা অবস্থায় মেঘ আদ্রিয়ানকে তার কথার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছে সেই মালিহা।
কিন্তু এখন ও পরিস্কার করে কিছু বলেনি। আচ্ছা আদ্রিয়ান যদি মেঘের আসল পরিচয় জানে তখন সে কি করে? আদ্রিয়ান কি খুশি হবে? না মেঘের সাথে রাগ করবে? আদ্রিয়ান যদি চাই মেঘের সাথে সংসার করতে শেষ বারের মতো একটা সুযোগ দিতে মেঘ কি তাকে দিয়ে দিবে? না কখন দিবে না? নয় বছর ধরে সয্য করা শত কষ্ট আর যন্ত্রণা এতো দ্রুত মেঘ ভুলে যাবে না। তবে কি একমাস পর মেঘের উচিত আদ্রিয়ানকে ডিভোর্স দিয়ে তার উপর প্রতিশোধ নেওয়া। অবশ্যই উচিত আদ্রিয়ান শাস্তি স্বরূপ এইটুকু কষ্ট তার প্রাপ্য। তাছাড়া মেঘের এখন আর কোনো ইচ্ছা নাই আদ্রিয়ানের সাথে সংসার করার।
মেঘ এখন শুধু তার পড়াশোনার উপর মনোযোগ দিতে চাই। বিয়ে নামক এই মিথ্যা বন্ধন তার গলার ফাঁস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে যা দেখে তার মুক্তি চাই। কিন্তু ডিভোর্সের আগে সে আদ্রিয়ানকে তার পরিচয় দিয়ে দিতে চাই। যাতে ভবিষ্যতে মেঘের উপর কোনো দোষ না আসে। রাতে আদ্রিয়ান বাড়ি ফিরলে মেঘ তাকে এই কথা বলবে। হুম মেঘ সিদ্ধান্ত নেয় অবশ্যই বলবে।
মেঘ কথাগুলো ভাবতে থাকে তখন হঠাৎ তার ফোনে মেসেজ আসার শব্দে তার ঘোর কাছে। মেঘ ফোনে হাত দিয়ে দেখে নূহা তাকে মেডিক্যালের ম্যাসেনজার গ্রুপে অ্যাড করছে। মেঘ সকলের সাথে পরিচয় হওয়ার জন্য গ্রুপে যায়, কিন্তু গ্রুপের মেসেজ দেখে সে অবাক হয়। গ্রুপে সকল ছাএ ছাএী জিয়ার আত্মাহত্যার বিষয়ে কথা বলছিল, জিয়ার সাথে ডক্টর আদ্রিয়ান রোদায়ানের সম্পর্ক ছিল।
তোমার নামে নীলচে তারা পর্ব ২৭
কিন্তু আদ্রিয়ান তার সাথে প্রতারণা করেছে বলে জিয়া সুইসাইড করেছে। মেঘ মেসেজ গুলো পড়ে অবাক হয়ে বলে
“কি জিয়া ম্যাম আত্মাহত্যা করছে? তাও আবার আদ্রিয়ান স্যারের জন্য? “
