শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৪
নূরজাহান আক্তার আলো
চৌধুরী বাড়ির মূল ফটক পেরিয়ে ধীর গতিতে একে একে এগিয়ে যাচ্ছে চারটে বাইক। প্রথমে সায়নের বাইক, এরপর অর্কের, তারপর রুবাবের এবং সবার শেষে শুদ্ধর। সায়ন প্রথমে থাকায় রাস্তা দেখে শুনে যাচ্ছে। সামনে থেকে দ্রুত গতির গাড়ি দেখলে সিগন্যাল দিচ্ছে। হাতের ইশারায় গতি কমাতে বলতে কিংবা থামতে বলছে। কিছুক্ষণ আগে অফিস ছুটি হওয়াতে রাস্তায় জ্যাম বেঁধেছে। জ্যামের কারণে বাইক টানতে পারছে না। তাই সায়ন সামনে থেকে প্রটেকশন দিচ্ছে আর শুদ্ধ পেছন থেকে।
মোদ্দাকথা, বাড়ির মেয়েরা সঙ্গে আছে সাবধানে না নিলে চলে? এভাবে চলতে চলতে রাস্তা ফাঁকা পেয়ে গতি বাড়াল। চারটে বাইকে বর-বউকে দেখে অনেকে তাকাচ্ছে। কনুইয়ের গুঁতো মেরে পাশের জনকে দেখার ইঙ্গিত দিচ্ছে। দূরন্ত গতিতে পাশ কাটিয়ে যাওয়া গাড়ির মানুষগুলোও মুখ বাড়িয়ে দেখছে। দেখছে পথচারীরা। টং দোকানের সামনে আড্ডায় মশগুল বন্ধুর দলটা তাদের দেখিয়ে সিটি বাজাল। চিৎকার করে বলল,’ভাইরা আমার দোয়া দিয়ে যান। আমগোর কপালেও যেন বউ জোটে।’ তাদের কথা শুনে সকলে হেসে ফেলল। চলতে চলতে হাইওয়ে পেরুল। চার কাপলের মধ্যে চলছে টুকটাক কথাবার্তা। খুনশুঁটি। মুখ চাপা হাসি।
এদিকে তখন বিকেলের শেষ মুহূর্ত। দিনের আলোর তেজ ফুরিয়ে শুরু হবে রাতের রাজত্ব। ঘুটঘুটে অন্ধকার গিলে খাবে পুরো পৃথিবীকে। সূর্য নিজ নিয়মে অস্ত যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাগরিবের আজান দিবে। সায়ন কিছু একটা ভেবে বাইক থামাতে বাকি তিনটে বাইক থেমে গেল। রুবাব জিজ্ঞাসা করলো
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-‘কি হলো ভাই থামলে যে?’
-‘ সামনে একটা নদী আছে একটু থেমে তারপর যাই?’
-‘নতুন বউ নিয়ে নদীর পাড়? বড় মামী জানলে তোমার খবর আছে।’
-‘ আরে কিছু হবে না।’
-‘চলো তাহলে।’
অতঃপর তারা নদীর পাড়ে বাইক স্ট্যান্ড করল। শরীর জুড়ানো বাতাসে মনটাও জুড়িয়ে গেল। সিঁড়ির উপর চার বউ বসলে অর্ক তাদের সুন্দর করে ছবি তুলল। কামরান চার বরের ছবি তুলল। কাপল ছবিও তুলল।তখন এক মাঝবয়সী মহিলা এলেন ভাজা বাদাম নিয়ে। তারাও বাদাম নিলো। মহিলা তাদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তারাও জানাল। মহিলা তখন ফট করে বলে বসল,
-‘ সম্পর্কে বাঁচাইতে চাইলে আপনের ভিত্রে সম্পর্ক গড়তি নাই। পরকে দুইডা কথা কওন যায় আপনেরে কওন যায় না। আইজ ভালো সম্পর্ক আছে কাইল থাকবে ইর তো গ্যারান্টি নাই। আম,,।’
উনি আরো কিছু বলতে চাচ্ছিলেন তার আগেই শুদ্ধ টাকা বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-‘এ যে টাকাটা। আর আপনি ওসব ভাববেন না আন্টি পারলে দোয়া করবেন আমাদের জন্য। ‘
মহিলা নিজের কথা শেষ না করতে পেরে বোধহয় বেজার হলেন। বিরক্ত মুখে চলে গেলেন। হঠাৎ সবার মধ্যে এক নীরাবতা দেখা গেল। মহিলা কিন্তু একটা শব্দও ভুল বলে নি। উনি যা বলেছেন চরম সত্য বলেছেন। তখন শীতল হঠাৎ এক হাত বাড়িয়ে বলে বসল,
-‘আমরা ভাই-বোনরা একে অন্যের প্রাণ ছিলাম, আছি, ভবিষ্যতেও তাই থাকব। দেহে প্রাণ থাকাকালীন একে অন্যের রক্ষাকবজ হবো।’
শীতলের কথা শেষ হতেই শীতলের হাতের উপর সায়ন ডান হাত রাখল। স্বর্ণ, রুবাব, সাম্য, সৃজন, সবাই রাখল। শুদ্ধ বুকে দুহাত গুঁজে তাকিয়ে দেখছিল ওদের কান্ড। সে হাত রাখছে না দেখে সবাই ঘুরে তাকাল তার দিকে। শুদ্ধ অর্ক, ঐশ্বর্যকে হাত রাখার ইশারা করল। তারা তো বাইরের কেউ না বরং আপন হয়ে গেছে। শুদ্ধর কথা শুনে তারাও হাসি মুখে যুক্ত হলো। এরপর শুদ্ধ শীতলের হাতের নিচে একহাত আর অর্কের হাতের উপর আরেক হাত রাখল। অর্থাৎ প্রাণথাকা কালীন দু’হাতে সামাল দেবে সকলের প্রতি তার সমস্ত দায়িত্ব, স্নেহ, ভালোবাসা।
এ মুহূর্তে নতুন করে ওয়াদাবদ্ধ হলো তারা। কেন জানি মনে জোর পেলো। মন খারাপ মুহূর্তে হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়ে সকলে হইহই করে উঠল। অতঃপর আজান হয়ে গেলে তারা বাইক নিয়ে রওনা হলো অর্কের বাড়ির পথে। দশ মিনিটের মধ্যেই চারটে বাইক ঢুকল বাড়ির গেট দিয়ে। হর্ণ শুনে অর্কের মা ছুটে এসে চার দম্পত্তিকে সাদরে গ্রহন করলেন। হাসি মুখে তাদেরকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। নানান ধরনের খাবার এনে খেতে সাধলেন। অর্কের বিয়ে উপলক্ষে আসা গেস্টরা ঘুরে ঘুরে তাদেরকে দেখল। বোনকে শশুরবাড়ি রাখতে আসা নিয়ে কেউ কেউ খুশি হলো, কেউ বিরক্তিমুখে দেখে গেল। ফিসফাস করে কটুবাক্য চলল। চৌধুরীর পুত্ররা সব বুঝলেও হাসি মুখে সবার সঙ্গে কথা বলল। তারা পৌঁছানোর পরপরই একটা গাড়িও এলো, গাড়ির ড্রাইভার কেজি কেজি মিষ্টির প্যাকেট, ফলমূলসহ আরো নানান জিনিস পৌঁছে দিয়ে গেল।
এসবের বাহার দেখে উপস্থিত অনেকের চক্ষু চড়কগাছ। অর্ক, অর্কের মা এসব আনায খুব করে বকলেন সায়ন, শুদ্ধ, রুবাব হাসিমুখে বকা শুনল। খুশির সময় বোধহয় তাড়াতাড়ি চলে যায়। দেখতে দেখতে ঘড়ির কাঁটা দশের ঘরে স্থির হয়েছে।শখ একটু দূরে বসে আছে। কত মানুষ এসে দেখে যাচ্ছে। কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে নিচু স্বরে জবাব দিচ্ছে। অর্কের মা উনার চেনা পরিচিত মানুষের সঙ্গে শখের পরিচয় করিয়ে সায়নদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে। মহিলা যে ভীষণ খুশি তা উনার কথার ভঙ্গিতে স্পষ্ট। এত কথা, এত আনন্দের মাঝে শুদ্ধ জানাল তাদের যেতে হবে। ভাইয়া চলে যাবে শুনে শখের মুখ মলিন হয়ে গেল। চোখজোড়া পুনরায় ছলছল করে উঠল। অসহায় চোখে তাকাতেই অর্ক বুঝল তার মনের কথা। কি এক কথাতে হাসতে হাসতে এসে বসল শখের পাশে। এদিক ওদিক তাকিয়ে সুযোগ বুঝে ফিসফিস করে বলল,
-‘শখ, কেঁদো না প্লিজ। ওদেরও আজ বিশেষ দিন। ওদেরও এবার একা ছাড়া উচিত। কতকিছু পর ওরাও আজকে এক হয়েছে। যার যার প্রিয় মানুষকে নিজের করে পেয়েছে। ভাই-বোনদের হাসি মুখে বিদায় দাও। তোমাকে কাঁদতে দেখলে ওরা কষ্ট পাবে। এমনিতেই দেখো মুখটা মলিন হয়ে গেছে। শুধু তোমার জন্য ক্লান্ত হয়েও কতক্ষণ বসেছিল। জানি তো তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে। নিজেকে একটু সামলে নাও, প্লিজ। আমি..আমি আগামীকালই তোমাকে চৌধুরী বাড়িতে নিয়ে যাব, প্রমিস।’
অর্ক ভুল বলে নি বুঝে শখও নেত্রজোড়া মুছে নিলো। শুদ্ধরাও যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়িয়েছে। বিনয়ীভাবে কথাবার্তা বলে বিদায় নিচ্ছে অর্কের বাবা-মায়ের থেকে। শখ এসে দাঁড়ালে ওর মুখ দেখে তিন ভাই আগলে নিলো। থেমে থেমে কত কথা বোঝাল। বোঝাতে গিয়ে তাদেরও কন্ঠস্বর ভারি হয়ে চোখজোড়া ছলছল করে উঠল। স্বর্ণ, ঐশ্বর্য, শীতলও বিদায় নিলো। অতঃপর বুকচাপা কষ্ট নিয়ে বোনকে রেখে বেরিয়ে এলো তারা। তবে বাইকে উঠে যেতে যেতে কতবার যে ঘুরে ঘুরে তাকাল। বার বার বলল, কাল দেখা হবে। মন খারাপ যেন না করে। তাদের বলা কথা আর অসহায় দৃষ্টি দেখে শখের চোখের পানি ভর ধরল না ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেলল। বোনকে দূর থেকে কাঁদতে দেখে বাইক স্টার্ট করেও থেমে গেল তিনভাই। অর্ক হাতের ইশারায় আশ্বস্ত করে এবার সামলে নিলো শখকে। কামরান, হাসান, স্যান্ডি তিনজন তাদের যেতে ইশারা করে তারা হইহই করে শখ আর অর্ককে নিয়ে ভেতরে চলে গেল। অর্ক আর শখকে নিয়ে শুরু করল হাসি-ঠাট্টা। এমন সব কাহিনির মাঝে এর পর্যায়ে শখও না হেসে পারল না। তার হাসিমাখা মিষ্টি মুখের ছবি অর্ক সেন্ড করল বন্ধুর কাছে। বোনকে হাসতে দেখে তবেই শুদ্ধরা রওনা হলো চৌধুরী বাড়ির দিকে। নতুবা অর্কের বাড়ির থেকে একটুদূরে তিন বাইকে তখনো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। অপেক্ষায় ছিল ‘বোন হাসছে’ এমন একটা মেসেজ পাওয়ার।
অনেক রাত হয়েছে দেখে শারাফাত চৌধুরী একের পর এক কল করতে লাগলেন ছেলেদের। কিন্তু একজনও যদি ফোন ধরে! এ নিয়েও বকলেন কিছুক্ষণ। বকা না থামতেই হর্ন বাজাতে বাজাতে শুদ্ধরা বাইক নিয়ে মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। গিন্নিরা পুনরায় তিন ছেলে-বউদের বরণ করে নিলেন। বাড়িতে তখনো অনেক মেহমান। বরণ করতে গিয়ে হাসাহাসি হলো খুব। এরপর সিরাত তিন বউকে আগে শখের রুমে নিয়ে গেলেন। তিনজনে বিছানায় শুয়ে পড়েছেন। আজ সারাদিন অনেক কষ্ট হয়েছে। সিঁতারা এসে তাদের অবস্থা দেখে হেসে ফেললেন। সিমিন এসে খাওয়া-দাওয়া করালেন। শখের খোঁজ খবর নিলেন। সিরাত ওদের এই হাল দেখে তো বলেই ফেললেন,
-‘এখনই ক্লান্তিতে হাল ছাড়লে হবে, মা গো? আসল পরীক্ষা তো হবে চার দেওয়ালের মাঝে। না ক্লান্তি মানবে আর না অজুহাত শুনবে।’
একথা শুনে শীতল ভীষম খেলো। মনে পড়ল দুপুরে বলা শুদ্ধর কথা। এদিকে রুবাবও আসতে আসতে যা তা বলেছে ঐশ্বর্যকে। আর স্বর্ণ? তার ফোনে যে কিসব মেসেজ এসেছে সেসব কাউকে বলার মতো না। তবে মেজো মা থামাতে হবে বুঝে স্বর্ণ বলল,
-‘ছিঃ! কিসব বলো মেজো মা? লজ্জা পর্দা কি লকারে রেখে এসেছো?’
শীতল বলল,
-‘বয়কট, লজ্জাছাড়া চাচী শাশুড়ি।’
ঐশ্বর্য মিনমিন করে বলল,
-‘ভয় দেখাচ্ছেন কেন আন্টি?’
সিরাত ওদের অবস্থা দেখে হো হো করে হাসলেন। বললেন,
-‘ওমা না বললে জানবি কিভাবে? এ্যাই তার আগে বল তো তিনজনই ঠিক আছিস তো? মানে আমার ছেলেদেরকে উপোস রাখবি না তো? ‘
মা আর বড় মা সামনে থাকায় তিনজনই মুখ কাচুমাচু করতে লাগল। সিরাতের সাথে যথেষ্ট ফ্রি হলেও তারা সিমিন আর সিঁতারের সঙ্গে এসব ব্যাপারে এতটাও ফ্রি না। সিরাত লাগাছাড়া কথা বলায় সিমিন, সিঁতারা ডাক শুনে চলে গেলেন। তখন সিরাত দুষ্টু হেসে ফিসফিস করে বললেন,
-‘ আর বুদ্ধি দেবো?’
-‘থামবে তুমি!’
এভাবে নানান কথা বলে উনি পঁচাতে লাগলেন। তিনজন কখনো শুনল কখনো বা হাসল, লজ্জা পেল, কখনো রাগ দেখাল। ছেলেরা বাড়ি ফিরে আবার কোথায় গিয়েছে কে জানে। যার যার রুমে সাজানো হয়ে গেছে। রাত বাড়ছে। সারাদিন অনেক ধকল গেছে বিধায় তিনজনকে যার যার রুমে রেখে আসলেন সিরাত। মেয়েগুলোর বিশ্রাম দরকার। ক্লান্তি ভেসে উঠেছে তাদের চেহারায়। রেখে আসার সময়ও কত গল্প, কত হাসাহাসি হলো। ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি স্তব্ধ হতে লাগল৷ তখন শেরওয়ানি বদলে ছেলেগুলো কোথাও গিয়েছিল রাত বারোটার পর হাসতে হাসতে কেবল ফিরল। তাদের গায়ে মাটি দেখে সিঁতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন,
-‘এই তোরা কোথায় গিয়েছিলি? তোদের গায়ে কাঁদা মাটি কেন?’
সায়ন দাঁত বের করে হাসতে হাসতে জবাব দিলো,
-‘সারাদিন বসে থাকতে থাকতে শরীর ম্যাজম্যাজ করছিল। তাই তিন ভাই মিলে ফুটবল খেলে এলাম।’
ছেলেদের কান্ডে শারাফাত চৌধুরী বিরক্ত মুখে কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। এদের কিছু বলা মানে যেচে বাঁশ খাওয়া। তাই বিরবির করতে করতে রুমের দিকে হাঁটা ধরলেন। সিঁতারা ছেলেদের ফ্রেশ হতে পাঠিয়ে দিলেন। তিনভাই রুমে যাওয়ার বদলে এগোলো সাফওয়ান চৌধুরীর কাছে। সাফওয়ান চৌধুরী ফোনে কথা বলে ঘুরতেই তাদের দেখে অবাক হলেন। কিছু বলার আগে রুবাব লাজুক মুখে বলল,
-‘মেজো মামা, এমতাবস্থায় বউয়ের কাছে যাওয়া ঠিক হবে না, ফটাফট পাজামা-পাঞ্জাবি ম্যানেজ করে দাও, প্লিজ!’
-‘তোদের এ হাল কেন?’
এবার অধৈর্য্য সায়ন বলল,
-‘চাচ্চু আমার খুব বাসর বাসর ফিল আসছে একটু তাড়াতাড়ি করো না প্লিজ।’
সাফওয়ান চৌধুরী কাশলেন। গলা খাঁকারি দিয়ে তিনজনকে গেস্ট রুমে পাঠিয়ে খোঁজ করলেন সিরাতের। সিরাত তিনটে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি এনে সাফওয়ান চৌধুরীর কাছে দিলেন। উনিও পৌঁছে দিলেন ছেলেদের কাছে। গেস্টরুমে ফ্রেশ হয়ে খাবারের ট্রে নিয়ে তিনজনে দোতলায় উঠে এলো। স্বর্নের আগের রুম রুবাব আর ঐশ্বর্যের জন্য সাজানো হয়েছে।অতঃপর সিঁড়ি দিয়ে ভদ্রভাবে উঠে সায়ন সবার আগে রুবাবকে বিদায় দিলো। রুবাবের বুকে, মাথায় ফুঁ দিয়ে বলল,
-‘ ভয় পাস না ভাই,, বেঁচে থাকলে কাল দেখা হবে। আর শোন, সমস্যা থাকলে আমাকে আগে জানাইস আমি চাঁদা তুলে তোকে হারবাল কিনে দেবো।’
রুবাব হাসতে হাসতে রুমে প্রবেশ করল। সায়ন শুদ্ধ আরেকটু হেঁটে তাদের রুমের দিকে আসতেই সায়ন শুদ্ধকে থামিয়ে বলল,
-‘ ভাইরা ভাই কি অবস্থা আপনার? সব ঠিকঠাক তো? অভিজ্ঞ মানুষ..!’
শুদ্ধ ভ্রুঁজোড়া বাঁকাতেই সায়ন থেমে গেল। বোকা বোকা হেসে নিজের রুমে প্রবেশ করল। ভুল মানুষকে খোঁচানো যাবে না। নয়তো তার বাসর নামক সোনা ডিম আজও হাতছাড়া হতে পারে। আজ কোনোভাবে মিস করা যাবে না। আজ সে বাসর করবেই; করেই ছাড়বে। এসব ভেবে মনে মনে খুশিতে আটখানা হয়ে রুমে ঢুকে দেখে স্বর্ণ বসে আছে। স্বর্ণ এখন শাড়ি পরে আছে। তার দিকে চোখ পড়তেই সায়নের দম আঁটকে আসার জোগাড়। কোনোমতে ট্রে রাখল। ধীরে সুস্থে দরজা আঁটকাল। ধীর পায়ে
স্বর্ণের কাছে গিয়ে দুই হাতে কোমর জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ল। ভাবখানা এমন যেন কিচ্ছুটি জানে না। স্বর্ণ খেয়াল করল তার চুলে পানি জবজব করছে। ঘাড়, কাঁধ ভেজা। সে শাড়ির আঁচল দিয়ে সায়নের মাথার চুল মুছতে লাগল। নরম স্বরে জিজ্ঞাসা করল,
-‘কোথায় যাওয়া গিয়েছিলে?’
জবাবে সায়ন বলল,
-‘একটা প্রশ্নের জবাব একটা চুমুর বিনিময়ে কিনে নিতে হবে। যতটা প্রশ্ন ততটা চুমু। রাজি থাকলে এক চাপুন নয়তো চুপ থেকে আদর করতে সহায়তা করুন।’
-‘মান্থলি প্রবলেম। সেকেন্ড ডে। দুঃখিত, পাঁচদিন ওয়েট করতে হবে।’
একথা কর্ণকুহুরে প্রবেশ করামাত্রই সায়ন আঁতকে উঠে বসল। আবারও বাঁধা! তারমানে আজও হবে না? কেন জানি এবার তার ভীষণ অভিমান হলো। সে অভিমানী মুখে কিছুক্ষণ স্বর্ণের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর
অভিমানি সুরে বলল,
-‘বালের বউ আমার। বালের বাসর। যখনই কিছু ভাবি তখনই ঠাডা উড়ে আসে। এত বাঁধা তো যা বাসরই করব না। এক্ষুণি বনবাসে চলে যাব। ছোটো ভাইরা বিয়ে করে বাসর করে ফুটফুটে চেহারা নিয়ে চোখের সামনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আর আমি,,,আমি বাসরে ঠাডা পরাই শেষ হচ্ছে না।’
রাগে অভিমানে কথাগুলো বলতে বলতে সে দরজার দিকে পা বাড়াতেই
স্বর্ণ পেছন থেকে তার পাঞ্জাবির আঁকড়ে ধরল। স্বজোরে টানে নিজের দিকে ঘুরাতেই সায়ন মুখ ফিরিয়ে নিলো। স্বর্ণ বলল,
-‘কোথায় যাচ্ছো?’
-‘যে যৌবন কাজে লাগে না সেই যৌবন রাখব না।’
-‘এত পাগল হলে হবে?’
-‘কেন হবো না? আর কত ওয়েট করা যায়? আগে কেন বললি না যে ডেট আছে?’
-‘বললে কি হতো? বিয়ের তারিখ বদলে ফেলতে?’
-‘ফেলতাম।’
একথা বলে সে পাঞ্জাবি ছাড়িয়ে যেতে গেলে স্বর্ণ পুনরায় ধরে ফেলল। তখন সায়ন বলল,
-‘ গরম পানি আর কী কী যেন লাগে নিয়ে আসি। বউটা তো আমারই। কষ্ট তো দিতে পারি না। এতদিন ধৈর্য্য ধরেছি আর এক সপ্তাহ নাহয়….!’
সায়ন আর কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই স্বর্ণ তার ওষ্ঠজোড়া আঁকড়ে ধরল। হতভম্ব সায়ন বিষ্ময়ে কথা ভুলে গেল। ভুল গেল নিজের অবস্থান। কাল, ক্ষণ, সময়। লম্বা, চওড়া সায়নের হাইটের সঙ্গে দাঁড়াতে একটু কষ্টই হচ্ছিল। সায়ন মাথা নিচু করতেই স্বর্ণের জন্য সুবিধা হলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সরতে গেলে সায়ন আঁকড়ে ধরল স্বর্ণকে। চুপ করে তাকিয়ে রইল স্বর্ণের দিকে। মুখে শব্দ নেই। তবে তার চোখজোড়া যেন খুব অভিমান করে বলছে, ‘যেহেতু ছুঁতে পারব না আর জ্বালাস না, জান। দোহায় লাগে, থাম, প্লিজ।’ তার অবস্থা দেখে স্বর্ণ দুষ্টু হাসল। তারপর সায়নের পায়ের পাতার উপর দাঁড়িয়ে কানে কানে ফিসফিস করে বলল,
-‘অনুমতি দিলাম।’
-‘কিসের?’
-‘ মিথ্যা বলেছি।’
সায়ন এবার ফট করে ঘুরে তাকাল। অবাকের সুরে বলল,
-‘ মান্থলি প্রবলেম নেই?’
-‘না।’
-‘আবার মজা নিচ্ছিস?’
-‘না।’
সায়নের বুঝতে বাকি রইল না স্বর্ণ এতক্ষণ মিথ্যা বলে মজা নিচ্ছিলো। সে এক ধাক্কায় স্বর্ণকে সরিয়ে দিলো। বিনাবাক্যে দ্বিতীয় ধাক্কায় দুজনে বেডে। স্বর্ণ কিছু বলার আগে অগ্রাসী সায়ন অধৈর্য্যের মতো ওষ্ঠজোড়া দখলে নিলো। চুমুর তালে তালে দাঁত বসাতে লাগল স্বর্ণের কাঁধে, গলায়। হাতজোড়াও লাগামছাড়া অবাধ্য হলো। স্বর্ণ বাঁধা দিতে গেলে বেহায়ার মতো হাসল। পরনের পাঞ্জাবি ছুঁড়ে ফেলে স্বর্ণের আঁচলটাও সরে গেল। দুষ্টু, বেহায়া, অসভ্য পুরুষটা সেদিকে তাকিয়ে ঠোঁট কামড়ে কেমন করে যেন হাসল। ভ্রুঁ নাচাল। তারপর স্বর্ণের কানে কানে মেঘদূতের কবিতার কয়েকটা লাইন আওড়াল,
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৩
সত্যিই ক্ষেপে গেছি এবার,
চুমুতে চুমুতে ছিঁড়ে নেবো ঠোঁট।
পাঁজকোলা তুলে নিয়ে ছুঁড়ে দেব বিছানায়,
বারো হাত কাপড়ের কানায় কানায়।
সাধ্য থাকে তো শুধু এক বার ওঠ,
গোগ্রাসে ভালোবেসে যাব এক চোট।
__ মেঘদূত (কবিতা সংগৃহীত)

dan na kan? akta ep 10 den 5 den por den, ata thik nh apnader jai golpo gula amon sagolar deka khail rakhian