শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭৩
নূরজাহান আক্তার আলো
ঘড়িতে সময় একটা বেজে তেরো মিনিট। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমন্ত্রিত মেহমানরা উপস্থিত। বেড়েছে হৈ-হুল্লোড়। বাগানের মাঝখানে উঁচু করে
তৈরি করা হয়েছে রাজকীয় স্টেজ। চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্য মন্ডিত স্টেজ বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকার মতোই। গোল্ডেন ফ্রেমে অর্কিড ও টকটকে লাল গোলাপের ফুলঝুরি দিয়ে সাজানো চারপাশ। আধুনিক, রুচিসম্মত ডেকোরেশন দেখে সকলে চৌধুরীদের রুচির প্রশংসা করতে বাধ্য। তারা যে ছেলে-মেয়ের বিয়েতে দিলখোলা মনে অর্থ ব্যয় করেছে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। স্টেজের মাঝখানে ক্রিস্টাল সিংহাসন। নতুন বর-বউ জোড়ায় জোড়ায় বসবে এখানে। সিংহাসনের পেছনের দিকে ছোট বড় কাঁচের লণ্ঠন। যাওয়া আসার জন্য রয়েছে লম্বা ওয়াকওয়ে। কার্পেট এর উপর পাপড়ি ছড়ানো রাজপথ। এ পথ দিয়ে প্রবেশ করবে চার দম্পত্তি।
স্টেজের নিচু আসনে বসে আছেন অতিথিরা। সারি সারি চেয়ার পেতে বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনেকে বসে গল্প আড্ডায় মেতেছে কেউবা ছুটেছে ফুড কর্নারের দিকে। বর-বউ যেহেতু আসে নি সুযোগ বুঝে পেট ঠান্ডা করে নিচ্ছে। বাগানের ডান পাশে তৈরি করা হয়েছে বিশাল লাইভ ফুড কর্নার। একদিকে ধোঁয়া উঠছে লাইভ কাবাব স্টেশন থেকে। সেখান তৈরি হচ্ছে চিকেন মালাই, রেশমি ও বিফ সিক কাবাব। কাবারের ঘ্রাণে ম ম করছে চারিপাশ। আরেকদিকে ব্যবস্থা করা হয়েছে লাইভ পাস্তার।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মাঝবয়সী এক শেফ অতিথিদের পছন্দমতো পাস্তা রেডি করে দিচ্ছে।
এর পাশে ফুচকার স্টল। টক, ঝাল, মিষ্টি, মিশ্র চার রকমের পানি দিয়ে ফুচকা খাচ্ছে নানান বয়সী গেস্ট। বিশেষ করে একটু বেশি ভিড় করেছে মেয়েরা। বেশ মজা করে খাচ্ছে ফুচকা। খাবারের মান যথেষ্ট ভালো এই নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। এসবের পর মেইন বাফেটে টেবিলে সাজানো৷ সেখানে রয়েছে কাচ্চি, রোস্ট, রেজালা, চাইনিজ ডিশ, স্যালাড, ডিপস আর এসব সোনালি ঢাকনাওয়ালা হিটারে সাজানো। গেস্টটা নিজেদের
মতো তুলে নিতে পারবে। এর অপরপাশে বেশ বড়ো সড় ডেজার্ট জোন। সেখানে চকোলেট ফাউন্টেন টপ টপ করে পড়ছে আর বাচ্চারা পছন্দ সই ফল ডুবিয়ে মজা করে খাচ্ছে। চকলেট মুখ মেখে একাকার। পরনের ড্রেস নষ্ট হচ্ছে তবুও থেমে নেই। খেতেই হবে চকলেট বলে কথা! ডেজার্ট জোনের সঙ্গে লাগোয়া আরেকটি স্টলে মিঠাই আইল্যান্ড, রসমালাই, লালমোহন, বাসুন্ধরা, কস্টমাইজড কাপকেক সাজিয়ে রাখা। এর থেকে একটু দূরে পানীয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। সেখানে মিন্ট লেমোনেড, স্ট্রবেরি ফিজ, ব্ল্যাক কারেন্ট মিক্স সব কাঁচের আলোঠাসা কাউন্টারে রাখা আর অন্যপাশে কফি বার।
সময় যত বাড়ছে মানুষের সংখ্যাও তত বাড়ছে। নামি-দামি অনেকজন গেস্ট হিসেবে এসেছে। মেহমানরা বসে আছেন দেখে শারাফাত চৌধুরী ছেলেদের পুনরায় তাড়া দিলেন। বকলেনও ইচ্ছেমতো। যেখানে বউরা সেজেগুজে রেডি সেখানে ছেলেরা এখনো নামে নি। বউয়ের মেকাব কি তারা করছে? ছেলে মানুষের রেডি হতে এতক্ষণ লাগে? পৃথিবীতে আর মানুষ বিয়ে করে নি নাকি ওরাই একা বিয়ের পিঁড়িতে বসছে? এত বকে যখন কাজ হলোই না তখন সাফওয়ান চৌধুরী দোতলায় ছুটলেন। গিয়ে দেখলেন তিনজন জমিয়ে গল্প করছে। হুরমুড়িয়ে উনাকে আসতে দেখে
সায়ন বলল,
-‘ চাচ্চু আমাদের কি লজ্জা পাওয়ার ভাণ ধরতে হবে? মুখে রুমাল ধরে রাখব? কতক্ষণ রাখব টাইম বলে দাও।’
একথা শুনে সাফওয়ান চৌধুরী হতবাক হয়ে বললেন,
-‘তোরা কি লজ্জা পাচ্ছিস?’
-‘একেবারেই যে পাচ্ছি না, তা না। নতুন বর হিসেবে একটু একটু পাচ্ছি আর কি।’
-‘আরে ব্যাটা, ছেলে মানুষের আবার কিসের লজ্জা?’
-‘ আমিও তো রুবাব আর শুদ্ধকে এটাই বোঝাচ্ছি। কিন্তু ওরা বলল একটু লজ্জা না পেলে নাকি শাহাদত চৌধুরী বউ দিবে না। তাই ভাণ
ধরার রিহার্সাল করছিলাম।’
একথা শুনে সাফওয়ান চৌধুরী হেসে ফেললেন। নজর ঘুরিয়ে তাকালেন তিনছেলের দিকে। মুখভরে হাসলেন তবে কিছু বললেন না। ছেলেরা বড় হলে বাবারা মুখের উপর প্রশংসা করতে পারে না, করলে ছেলেরা লজ্জা পায়। তবে বিপরীতে কিছু বলার আগেই নিচ থেকে পুনরায় ডাক ভেসে এলো। উনি ওদেরকে নিয়ে নিচে নামলেন। সায়ন, শুদ্ধ, রুবাব তিনজনে বরের বেশে ড্রয়িংরুমে শারাফাত চৌধুরীর সামনে দাঁড়াল। লম্বা-চওড়া, তিন সুদর্শন যুবককে দেখে চোখ জুড়িয়ে এলো শারাফাত চৌধুরীর।মনে
মনে যা বলেন আজও সেটাই বললেন, ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা বারিক।”
ছেলেরা ছোটো থাকতেও যখনই একসাথে নিয়ে বের হতেন তখন প্রায় অনেকেই ছেলেদের দিকে তাকিয়ে থাকত। সুন্দর, সুন্দর বলত। আদর করে কাছে রাখতে চাইত। ঘুরে বাড়ি আসতে না আসতেই দেখা যেতো ছেলেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। পরে একদিন শুক্রবারের নামাজের পর মসজিদের এক ইমাম উনাকে এই ছোট্ট দোয়াটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন।
বলা বাহুল্য, এখনো যখনই উনার মনে হয় কোনো পোশাকে ছেলে বা মেয়েদের একটু বেশি ভালো লাগছে, তখনই উনি এই দোয়া পড়ে দেন। মুখ স্থির। চোখ স্থির। অথচ মনে মনে দোয়া জপে ফেলেন। আজও তাই করলেন। এরপর উনি সবার প্রথমে সায়নের মাথায় পাগড়ি পরিয়ে মুখে মিষ্টি তুলে দিলেন। একটু পানি খাইয়ে তারপর বুকে জড়িয়ে ধরলেন।
হাসিমুখে শুভ বিবাহের শুভেচ্ছা জানালেন। ছাড়তে গেলে কেন জানি সায়ন ছাড়ল না ওভাবে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কিছু বলল না। কিচ্ছুটি না।
আচ্ছা, আজকের এই বিশেষ দিনে ছেলেটা কী খুব কষ্ট পাচ্ছে? আপন বাবা-মা’র জন্য? পাওয়া টাই তো স্বাভাবিক। সায়ন বুকের সাথে লেগে গেছে দেখে শারাফাত চৌধুরীও ছাড়ানোর চেষ্টা করলেন না। বরং বাঁধন শক্ত করলেন। বিরবির করে আওড়ালেন, ‘আব্বা,,আমার আব্বাজান!’
সায়ন চোখ বন্ধ করে চুপ করে রইল। ভয়ও পেল, ঝরঝর করে কেঁদে ফেলার ভয়। শারাফাত চৌধুরী ছেলের পিঠে হাত বুলিয়ে বোঝালেন এতদিন ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন; থাকবেন। সায়ন মৃদু মাথা নেড়ে সরে দাঁড়াল।
একইভাবে উনি শুদ্ধকেও পাগড়ি পরিয়ে দিলেন। মিষ্টি মুখ করিয়ে বুকে জড়িয়ে নিলেন। ছেলেরা বড় হয়ে গেলে বুকে জড়ানোর এই মুহূর্তটুকু সহজে আসে না। ছেলেরাও বাবার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে পারে না। আজ সুযোগ বুঝে শারাফাত চৌধুরী শুদ্ধকেও বুকে জড়িয়ে নিলেন। বললেন, ‘বাবার প্রতি অভিমান জমিয়ে রেখো না, মাই সান। তোমাদের দাম্পত্য জীবনের জন্য অনেক দোয়া রইল।’ শুদ্ধ মৃদু মাথা নাড়িয়ে সরে দাঁড়াল।
উনি এবার রুবাবের সামনে দাঁড়ালেন। ছেলেটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। দৃষ্টিজোড়া মেঝেতে স্থির। তারও তো বাবা নেই। এই বিশেষ দিনে নিজের হাতে পাগড়ি পরিয়ে, দোয়া করে,বুকে জড়িয়ে নেওয়ার মানুষটা ওই অন্ধকার কবরের বাসিন্দা। বাবাকে ছাড়া, বাবার দোয়া ছাড়া তাকে আরেকটা শুভকাজ সারতে হবে। শারাফাত চৌধুরী হাসিমুখে আরেকটা পাগড়ি রুবাবের মাথায় পরিয়ে দিতেই ছেলেটা বুকের সঙ্গে লেগে গেল।
সবাইকে চমকে দিয়ে রুবাব ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল। উপস্থিত সবাই
কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললেন। রক্তে, মাংসে গড়া প্রতিটা মানুষের জীবনে গোপন কিছু অপূর্ণতা থাকে। না পাওয়ার আফসোস থাকে। এটা যেমন সবাই দেখে না। দেখলেও বুঝে না। ছেলেটা ভালো চাকরি করে।
ভালো পরিবারের ছেলে। অনেক কষ্টের ভালোবাসার মানুষটাকে পেতে যাচ্ছে। অবশ্যই এটা খুশিরই সংবাদ কিন্তু এই খুশির দিনেই বাবা নামক ছায়াটা তার মাথার উপর নেই। বাবা থাকলে এ দিনটি হয়তো অন্যরকম হতো। পরিপূর্ন হতো। এদিকে শতরুপা চৌধুরীও রান্নাঘরের এক কোণে কেঁদে লাল হওয়া চোখে দেখলেন রুবাব তার মামার বুকে। কত স্নেহের সাথে ধরে আছে মামাকে। বাবার জন্য রাখা শূন্য সেই আসনটা মামাকে দিয়ে পূর্ণ করা কী নিদারুণ চেষ্টা তার। সৌভাগ্য করে ভাইদেরও পেয়েছে যারা, উনার স্বামী বিয়োগের পরও সবদিক থেকে মনোবল শক্তি, সাহস জুগিয়ে আসছেন।
তখনই নতুন বর এসেছে, বর এসেছে, রব উঠল। চৌধুরীর গিন্নিরা নতুন বরকে মিষ্টি মুখ করিয়ে গাড়ি থেকে নামানোর জন্য ছুটলেন। মূল ফটকে
গিয়ে দাঁড়ালে দরজা খুলে আগে কামরান, স্যান্ডি, হাসান নামল। এরপর নামল অর্ক। তখন একে একে সায়ন, শুদ্ধ, রুবাব এসে অর্কের আরেক পাশে দাঁড়াল। অর্ক এ বাড়ির জামাই তাই তাকে দিয়েই কাজ শুরু হলো।
শাহাদত চৌধুরী এগিয়ে এসে স্বর্ণের রিং, গলার চেইন আর হাতে ওয়াচ পরাতে গেলে অর্ক শুদ্ধর দিকে তাকাল। এসব তার পছন্দ না। অর্কের দৃষ্টি বুঝে তখন শাহাদত চৌধুরী হাসতে হাসতে বললেন,
-‘তাকিয়ে লাভ নেই, তোমার বন্ধুকেও পরতে হবে। এজন্যই সব কটাকে
এখানে দাঁড়িয়ে করিয়েছি ।’
এরপর অর্কের সঙ্গে বাড়ির ছেলেদেরও নতুন বরের মতো সাদরে গ্রহন করা হলো। যদিও এটা বড়দের গোপন প্ল্যান ছিল। এত মানুষের ভেতরে
কিছু বলা ঠিক হবে না ভেবে তারা আপাতত চেপে গেল। চারজন একে একে হেঁটে আসার সময় আচমকা সকলে চেঁচিয়ে উঠল। সিটি বাজাল। পেছনে ঘুরে তাকাতে তাকাতেই যার যার সহধর্মিণী বামপাশের জায়গা দখল করে দাঁড়াল। তাদের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে সঙ্গে হাঁটতে লাগল।
চারজন ঘাড় ঘুরিয়ে পাশে তাকালে ক্যামেরা মান ক্লিক ক্লিক শব্দে ছবি উঠাতে লাগল। বউদের আগমন যে এভাবে হবে তারা জানত না। ভাবে নি এমনভাবেও হতে পারে। সচারাচর বর স্টেজে থাকে বউ একটু পরে
আসে। তারা ভেবেছিল এমনকিছুই হবে কিন্তু এখানে ঘটল উল্টো কিছু।
আর এই উল্টো কিছু ঘটানোর কারিগর সিরাত। উনার মতে, যার সঙ্গে আজীবন পথ চলতে হবে, চলতে ইচ্ছুক, তাহলে শুরু থেকেই পথচলার সঙ্গী হতে সমস্যা কি? এদিকে চার বরই থমকে দাঁড়িয়ে গেছে বউ বেশে যার যার প্রিয়শীকে দেখে। কারো মুখে কোনো কথা নেই। তবে একেক জনের চোখে মুখে মুগ্ধতা ঝরে পড়ছে। শখ, স্বর্ণ, শীতল, ঐশ্বর্য কারো মুখে ভারী মেকাব নেই। অতিরিক্ত সাজ নেই। তবুও তাদের ড্রেসআপ, পরিপাটি লুক, চোখের কাজল আর হালকা লিপস্টিকে অনিন্দ্য সুন্দর লাগছে। সায়নের কালো শেরওয়ানির সঙ্গে মিলিয়ে স্বর্ণের পরনে সাদা মাটা কাজের গোল্ডেন লেহেঙ্গা। শুদ্ধর অফ ওয়াইট শেরওয়ানির সঙ্গে মিলিয়ে শীতলের পরনে এ্যাশ কালার লেহেঙ্গা। রুবাবের ব্লু শেরওয়ানির সঙ্গে মিলিয়ে ঐশ্বর্যের পরনে ডার্ক রেড লেহেঙ্গা। অর্কের অলিভ কালার শেরওয়ানির সঙ্গে মিলিয়ে শখের পরনের ব্লাশ পিংক লেহেঙ্গা।
ড্রেসআপ চমৎকারভাবে মিলিয়ে তারা। আশেপাশে অনেক মানুষের ভিড়, তাদের দৃষ্টি স্থির ওদের চারজোড়ার দিকে। তাই কেউ কিছু বলল না পুনরায় পথ চলতে লাগল। সবার বড় সায়ন তাই সায়ন-স্বর্ণ এরপর শুদ্ধ-শীতল, এরপর রুবাব- ঐশ্বর্য তারপর অর্ক-শখ। তারা ধীরে সুস্থে হেঁটে স্টেজে উঠে বসল। কয়েকজন ক্যামেরাম্যান এসে ছবি তুলতে থাকল। উপস্থিত মেহমানরা বর-বউ দেখতে ব্যস্ত। সবার মুখে একই কথা, চারজোড়াকে ভালো মানিয়েছে। রাজযোটক যেন। ঘরে ঘরে বিয়ে করল এখন টিঁকে থাকলেই হয়। এত কথা, এত মানুষ, এত আয়োজনকে অগ্রাহ্য করে স্বর্ণ হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে সায়নের দিকে তাকাল। চোখাচোখিও হলো দুজনের।
তখন সায়ন নিচু স্বরে বলল,
-‘ এত মানুষের ভিড়ে বউয়ের দিকে তাকিয়ে শান্তি পাচ্ছি না।’
এইটুকু বলে থামল তারপর পুনরায় বলল,,
-‘তোকে মনভরে দেখার সময় টুকু দিস জান, প্লিজ।’
স্বর্ণ দৃষ্টি সরিয়ে নিলো। ঠোঁটের কোণে মুচকি হাসি। ঘটা করে জিজ্ঞাসা করতেও হলো না তাকে দেখতে কেমন লাগছে। তার আগেই সায়ন তার জবাব দিয়ে দিলো। এতক্ষণ শীতল দৃষ্টি নত রাখলেও এবার আড়চোখে তাকাল শুদ্ধর দিকে। সে বলতে বলতে বাধ্য, মানতে বাধ্য, তার বিশুদ্ধ পুরুষ আসলেই সু-পুরুষ, সুদর্শন পুরুষ। তবে এত সুদর্শন হওয়া ভালো না। নজর লাগে! কিন্তু এখন কি করা যায়? একথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ
অনুভব করল, তার আঙুলের ভাঁজে কেউ আঙুল গুঁজে দিয়েছে।
তড়িৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। বুঝল, পাশে বসা মানুষটার কাজ। যদিও তাদের হাতটা ঘোপটার বাড়তি কাপড়ে ঢাকা। কেউ দেখতে পাচ্ছে না, পাবেও না। তখন শুদ্ধ হাতের বাঁধনটা শক্ত করে ধীর লয়ে বলল,
-‘কাছে ডাকলে যে আসে না, আমার কথা শোনে না, সে যেন আমার দিকে না তাকায়। তার তাকানোর উপর নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো।’
একথা শুনে শীতল কোনোমতে হাসি আঁটকাল। মুগ্ধ নয়নে দেখল অফ হোয়াইট পাগড়ি পরা প্রেমিকপুরুষটার দিকে। সাহেব তার হাতটা দখলে নিয়েছে। আঙুলের ভাঁজে আঙুল ডুবিয়ে এখন বড় বড় কথা বলা হচ্ছে। ভালোবাসবে তবে মুখে স্বীকার করবে না। করতেও হবে না। সে এমনই থাকুক; গোপনে এভাবেই ভালোবেসে যাক। সে এতেই খুশি;এতেই সুখী।শুদ্ধ- শীতলের পরের আসনে ঐশ্বর্য-রুবাব বসেছে। রুবাব পাশে বসা নার্ভাস ঐশ্বর্যের দিকে তাকাল। ফিসফিস করে বলল,
-‘ বর পছন্দ হয়েছে, ম্যাম?’
রুবাবের কথা শুনে ঐশ্বর্য তাকাল। ঠোঁটে হাসি এঁটে অকপটে জবাব দিলো,
-‘ভীষণ।’
একথা শুনে রুবাব ফিক করে হেসে ফেলল। চমৎকার সেই হাসি। ঐশ্বর্য চোখ ভরে দেখল। এই মানুষটাকে হাসতে দেখতে ভালো লাগে তার। খুব আনন্দ হয় যখন মানুষটা হাসে। ইচ্ছে করে এক পৃথিবী সুখ কুঁড়িয়ে এনে মানুষটার পায়ে সপে দিতে। মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ’ই তার
নজর গেল শখ-অর্কের দিকে। শখ মুখ কাচুমাচু করে বসে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি কেঁদে ফেলবে। খুব নার্ভাস। তার মনের অবস্থা বুঝে অর্ক মুখের কাছে হাত নিয়ে গলা খাঁকারি দিলো। নিচু স্বরে শুধাল,
-‘ভয় পাচ্ছো?’
-‘ন ন মানে।’
-‘আমিও পাচ্ছি। আসলে জীবনে প্রথমবার তো। ভয় পেও না, আমরা আমরাই তো।’
শখ মাথা নিচু করে নিলো। দৃষ্টি রাখল হাতের চুড়ির দিকে। মনের ভেতর চলছে আকাশ-কুসুম ভাবনা। যাকে এতদিন ভাইয়ের বন্ধু ভেবে সন্মান করে এসেছিল আজ তার নামের পাশে নিজের নাম বসাতে হবে। তার সঙ্গে পথ চলতে হবে। বিপদের সঙ্গী হতে হবে। সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে নিতে হবে। আপন ঘর ছাড়তে হবে। প্রাণপ্রিয় বাবা-মা, চাচা-চাচীরাসহ কলিজার ভাই-বোনদের ছেড়ে যেতে হবে অন্যের বাড়িতে। নিজের হাতে সাজাতে হবে আরেকটা সংসার। তখন চাইলেও আর যখন-তখন ছোটো ভাই-বোনরা জ্বালাতে তার রুমে হামলা করবে না। এটা কিনে দাও, ওটা এনে দাও,,পেয়ারা মাখিয়ে দাও এসব বায়না ধরবে না। কোথাও কোনো আকাম করে এসে মার খাওয়া থেকে বাঁচানোর রিকুয়েষ্ট করবে না।রুমে এসে দেখবে না কেউ খাবার ভর্তি ঝুড়ি দিয়ে গেছে। এ কাজটা সচারাচর শুদ্ধ ভাই করে। দেশে বাইরে গেলে যত দামেরই জিনিস হোক বলবে না, ‘এটা তোর।’ বরং বিছানার উপর রেখে চলে যাবে।
এমন জিনিস আনবে যা পছন্দ হবেই। সায়ন ভাই হুটহাট রুমে এসে চুরি হাত ধরিয়ে দেবে না। তাকে কিছু খেতে দেখলে হাত থেকে কেড়ে এক কামড় খেয়ে ফিরিয়ে দেবে না। রুবাব ভাই দুষ্টমি করবে না। মাস শেষে বাবার থেকে হাত খরচ পায় আবার ভাইরা দেয়। মা-চাচীরা জানে সে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না তাই নিজেরা বুঝে নেন। এখনো তার জামা-কাপড় মা চাচীরাই পছন্দ করে আনে। আজকের পর থেকে এসব কিছুর পরিবর্তন আসবে।
বরং তাকে নজর রাখতে হবে তার সংসারের প্রতি; সংসারের মানুষদের প্রতি। এসব কথা ভাবতে ভাবতে শখের চোখ দিয়ে ঝরঝর করে অশ্রু ঝরে গেল। দম বন্ধ করা অনুভূতি বুকে নিয়ে হাঁসফাঁস করতে লাগল।
চারটে বিয়ে পাড়াতে হবে বিধায় কাজি সাহেব অনেকক্ষণ আগেই চলে এসেছেন । লেখালেখির পর্বও শেষ করেছেন ইতিমধ্যে। বিয়ের আসল কাজই হচ্ছে বিয়ে পড়ানো তাই বিয়ে পড়ানোর কাজটাই আগে সম্পূর্ণ করা হবে। সায়নকে দিয়ে শুভ কাজের সূচনা হলো। এতদিনের অপেক্ষা, এত ঝট_ঝামেলার পর সকলের উপস্থিতিতে সায়ন-স্বর্ণের শুভ কাজটা সম্পূর্ণ হলো। তবে সায়ন মনে মনে শুধু জপে গেল, আলহামদুলিল্লাহ! আলহামদুলিল্লাহ।’
প্রিয় পুরুষটাকে পাওয়ার জন্য এত ব্যাকুলতা। চঞ্চলতা। সব মিলিয়ে
প্রিয় পুরুষকে হারানোর ভয়ে হসপিটালে একপ্রকার জেদ করে বিয়ে করা শীতল নতুন করে শুদ্ধর নামে কবুল পড়ল। একবার বিয়ে করেছে কবুলও পড়েছে। তবুও অনুভূতি যেন একই রকম। কান্নারত ভেজা স্বর আর কম্পিত হাতে রেজিস্ট্রি পেপারে সাইন করল। ইচ্ছে ছিল শুদ্ধর বউ সাজবে। আজকে সে শখটাও পূরণ হলো।
এরপর এলো রুবাব- ঐশ্বর্যের পালা। ঝলসানো দেহের মেয়েটাকেও যে এত ভালোবাসা যায়। আগলে রাখা যায়। তাকে হারানোর ভয়ে ডুঁকরে কাঁদা যায়, এটা রুবাবকে না দেখলে জানত না সে। যে পুরুষ পাগলের মতো ভালোবাসতে জানে তার জন্য জীবন কুরবান। তার জীবনে ভালো কিছু নেই বললে চলে। এত অপূর্নতার মাঝে রুবাব তার জীবনে এসেছে সন্ধ্যাপ্রদীপ হয়ে। একথা ভেবে সময় নিলো না ঐশ্বর্য। অধির আগ্রহে দম আঁটকে বসে থাকা রুবাবের কলিজা ঠান্ডা করে বলে ফেলল, ‘ কবুল! কবুল! কবুল!’
এবার কাজি সাহেব এলেন অর্ক আর শখের কাছে। উনাদের দেখে শখ অসহায় চোখে আশপাশে তাকাল। চোখ বুলিয়ে মাকে খুঁজল। আগে ভয় পেলে মায়ের আঁচলটাই আকঁড়ে ধরতো। মেয়ে ভয় পাচ্ছে দেখে সিঁতারা বুকের ভেতর আগলে নিতেন। এখনো তো ভয় পাচ্ছে। তাহলে কোথায় সেই মমতামাখা আঁচল? সামনে নেই কেন মা? বোন টা ভয় পাচ্ছে বুঝে তিনভাই তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। স্বর্ণ, শীতল, ঐশ্বর্য গিয়ে একসাথে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল কাঁপতে থাকা শখকে। তিন ভাইও দ্রুতপায়ে এগিয়ে গেল বোনের দিকে। আগলে নিলো যত্ন করে। ভাইদের পেয়ে শখ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। মেয়ে কাঁদছে দেখে তিন জা স্টেজে উঠে এলেন। বোঝাল না কাঁদতে। শুভকাজে কাঁদতে নেই। বেচারা অর্ক দেখে গেল।
কেন জানি নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। এরপর কাঁদতে কাঁদতেই শখ অর্কের নামের সঙ্গে নিজের জুড়ে দিলো। দুরুদুরু বুকে স্বামীরুপে কবুল করল অর্ককে। ফটোসেশান চলল। বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে ক্ষুধাও পেয়েছে বিধায় তাদেরকে খেতে বসানো হলো। হইহই করে খাওয়া-দাওয়া হলো।
হাসি-ঠাট্টা হলো। সাম্য-সৃজন বরদের জুতো চুরি করতে না পেরে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে লাগল। তাদের কান্নার চোটে টিকতে না পেরে নতুনরা বরেরা যার যার জুতো খুলে তাদের হাতে ধরিয়ে দিলো। তারপর টাকা দিয়ে জুতো ছাড়িয়ে নিলো। নতুবা এই হা আজকে আর বন্ধ হতো না।
এই নিয়েও খুব হাসাহাসি হলো। এভাবে সময় গড়িয়ে শখের বিদায়ের ঘন্টা বেজে উঠল। যাওয়ার কথা উঠতেই শখের চোখজোড়া পুনরায় ছলছল করে উঠল। ঠিক তখনই কামরান হাসানের গলা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। স্যান্ডিও গালে থুথু লাগিয়ে কান্নার অভিযোগ করল। তাদের কান্নার অভিনয় যা ছিল কোথা থেকে আজম এসে মরা কান্না জুড়ে দিলো। শখ নিজের কান্না ভুলে তাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
সায়ন তখন শখকে বুকের একপাশে আগলে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বলল,
-‘ রাতটুকুর ব্যাপার। সকালে ঘুম থেকে উঠেই দেখবি আমরা হাজির।’
শখ মৃদু মাথা নাড়াল। যতই কাঁদবে বলে মনঃস্থির করুক বাবা-মায়ের অসহায় দৃষ্টি দেখে পুনরায় কেঁদে ফেলল। সাফওয়ান, শাহাদত চৌধুরী
বুকের আগলে নিলেন। চাচীরা নিজেরা কাঁদতে কাঁদতে তাকে কাঁদতে বারণ করল। বোনরা কাঁদছে। এত কান্নাকাটির মাঝে শুদ্ধ আর অর্কের চোখাচোখি হলো। শুদ্ধ কিছু বলতে গেলে অর্ক বন্ধুকে জড়িয়ে ধরল। বলল,
-‘জানি তো তোর বোন নয় কলিজা নিয়ে যাচ্ছি। ভরসা রাখ বন্ধু। আমি
আমার সবটুকু দিয়ে তাকে ভালো রাখার চেষ্টা করব।’
শুদ্ধ মৃদু হাসল। তার চোখজোড়া লাল হয়ে উঠেছে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল বোনের দিকে। শখটা সায়নের বুকে হামলে পড়ে খুব কাঁদছে। তার দেখে সায়নের চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরে গেল। রুবাব কাঁদছে। দুই ভাইকে পেলেও শুদ্ধকে না পেয়ে খুঁজল। সায়ন দেখিয়ে দিলে ধীরে ধীরে এলো শুদ্ধর কাছে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারল না দেখে শুদ্ধ বোনকে বুকে জড়িয়ে নিলো। আলতো হাতে চোখ মুছে দিলো। মাথায় একটা চুমু খেয়ে আদুরে সুরে বলল,
-‘কাঁদে না। সাবধানে যাও, নিজেও ভালো থেকো; অন্যেদেরও ভালো রেখো, হুম? আমরা ভাইরা সব সময় তোমার পাশে আছি।’
একথা বলতে বলতে শুদ্ধ শখকে অর্কের গাড়িতে তুলে দিলো। অর্কও সবার থেকে বিদায় নিয়ে পাশে বসল। শখ জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে অঝরে কাঁদতে লাগল। অশ্রুসিদ্ধ ঝাপসা চোখে দেখে গেল তার প্রিয় পরিবারকে। দম্ভের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা চৌধুরী বাড়িটাকে। মেহমানরা চলে যাচ্ছে একে একে। মেয়ে বিদায়ের পর বাড়িটা কেন জানি মিইয়ে যায়। শখ চলে যাওয়ার পর বাড়িটা যেন থমকে গেছে। বাড়ির প্রতিটা সদস্য এখনো অশ্রুসিদ্ধ চোখে তাকিয়ে রাস্তার দিকে। মেয়ে তো নয় যেন একেকজনের কলিজা ছিঁড়ে নিয়ে গেছে। আর শখ এমন একটা মেয়ে টেবিলভর্তি খাবার থাকার পরও তাকে যদি শুধু শাক-ভাত দেওয়া হয়, সে সেটা দিয়ে খেয়ে উঠবে। তবুও মুখ ফুটে বলবে না তাকে কেন মাছ, মাংস দেওয়া হলো না। কিছু এনে দিলে বলবে না পছন্দ হয় নি। পছন্দ যদি নাও হয় বুঝতেই দেবে না। অন্য বাড়ির মেয়েরা চাচীদের সঙ্গে কত ঝগড়া করে। খোঁচা মারামারি করে। আর এই বাড়িতে যা মাকে বলতে পারে না বাড়ির মেয়েরা সেটা সিরাতকে বলে। কারণ সিরাত বন্ধুর মতো মিশে তাদের সঙ্গে।
সবাই মন খারাপ করে যখন ভেতরে যাবে তখনই অর্কের গাড়িটা ফিরে
এলো। কি হলো জানার জন্য সকলে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। অর্ক নেমে এলো। সকলের চিন্তিত মুখ দেখে জানাল তারা সবাই ঠিক আছে।
কোনো সমস্যা হয় নি। তখন অর্কের মা গাড়ি নেমে শারাফাত চৌধুরীর উদ্দেশ্যে বললেন,
-‘ভাই, আপনার ছেলে-মেয়েদের আমি আমার সঙ্গে নিতে যেতে চাই। এত ভাই-বোনদের মাঝে বড় হয়ে হঠাৎ একা হয়ে যাচ্ছে এজন্য বউমা কষ্ট পাচ্ছে। আপনাদের বাসার মতো আমাদের বাসায় এত মানুষ নেই। আরো নার্ভাস হয়ে যাবে মেয়েটা।’
একথা শুনে শারাফাত চৌধুরী ছোটো ভাইদের দিকে তাকালেন। এরপর তাকালেন তিন ছেলেদের দিকে। ছেলে গুলো হচ্ছে ঘাড়ত্যাড়া। উনি যা বলবেন তারা উল্টো কাজ করবে তাই ছেলেদের হয়ে সিদ্ধান্ত নিলেন না। বরং তাদেরকে বললেন,
-‘ যাবে?’
তাদের জবাবের আগে অর্কের মা হাসিমুখে পুনরায় বললেন,
-‘ কিছুক্ষণ থেকে নাহয় চলে আসবে। পথ তো আর বেশি দূরে না।’
শুদ্ধ, সায়নের চোখাচোখি হলো। দু’জনে ঠোঁট চেপে ভদ্র হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সিঁতারাও বললেন যেতে তাহলে স্বর্ণ, শীতলেরও ভালো লাগবে।
তবুও ছেলেরা খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে দেখে সিরাত বিরক্ত হলেন। বিরক্ত নিয়ে বললেন,
-‘হ্যারে শুদ্ধ, এ সায়নকেও বলি হারি যায়; তোদের কি শখ আহ্লাদ বলে কিছু নাই? ইয়াং ছেলেপুলে এত অলস হলে চলে? বাড়িতে বাইক আছে, নতুন বউ আছে, সুযোগ পেয়েছিস যা ঘুরে আয়। ওদিকে রুম সাজানো এখনো বাকি ফিরতে ফিরতে কমপ্লিট হয়ে যাবে।’
মেজো মার কথা শুনে শুদ্ধ একবার তাকাল শীতলের দিকে। শীতলের চোখজোড়ায় আনন্দ ঝলঝল করছে। সে আবার বাইকে ঘুরতে পছন্দ করে কী না। তার সঙ্গে বের হওয়ার সুযোগ পেলেই হয়। অগত্যা সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো নতুন বর-বউরা বাইকে করে ঘুরতে যাবে। ঘুরে তারপরে যাবে অর্কদের বাসায়। শুদ্ধ ও সায়নের বাইক আছে,রুবাব আর অর্কের বাইকের ব্যবস্থাও হয়ে গেল। সায়নের বাইকে স্বর্ণ, শুদ্ধর বাইকে শীতল, রুবাবের বাইকে ঐশ্বর্য আর অর্কের বাইকে শখ। শখের ঠোঁটের কোণে এখন মিষ্টি হাসি। তাকে হাসতে দেখে অর্ক যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। প্ল্যান তাহলে সাকসেক হলো। বউটাকে কাঁদতে দেখে মনে হচ্ছিল আজই দম আঁটকে মারা যাবে। অতঃপর শুদ্ধর বাকি বন্ধুরা, আজম, সাম্য-সৃজনরা গাড়িতে উঠে বসল। গাড়ি বেরিয়ে গেলে শুদ্ধরাও একে একে বের হলো।
তাদেরকে যেতে দেখে অর্কের মা হেসে চৌধুরীর বাড়ির সদস্যদের দিকে তাকালেন। বললেন,
-‘ছেলে-মেয়ে গুলো ভালো থাকলে আমরাও ভালো থাকব। আমরা যদি সুযোগ না দেই তাহলে কিভাবে হবে? ঘুরে এলে ওদের মনও ভালো হবে।
আজ যদি ফিরে না আসতাম আপনাদের মন খারাপ থাকত ;বাকিরাও মন মরা থাকত। এতে কি ভালো হতো? আমরা যা করি/করছি সবই তো ওদেরকে ভালো রাখার জন্য, তাই না? বেয়ান-বেয়াইন এবার আমাকেও যে যেতে হবে। আমার চারছেলে নতুন বউদের নিয়ে বাড়ি যাবে, তাদের বরণ করতে হবে তো নাকি।’
নিজের কথা শেষ করে অর্কের মা চমৎকার করে হাসলেন। সহধর্মিণীর কথায় সহমত জানালেন অর্কের বাবা। উনাদের মন-মানসিকতা দেখে উপস্থিত সকলে মুগ্ধ হলেন। বুঝলেন শুদ্ধ কেন বার বার এটা বলেছিল অর্কের বাবা-মায়ের চিন্তা ধারা দেখে আপনাআপনি সন্মান চলে আসে।
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭২
আর গাছ ভালো হলে ফল ভালো হবে এটা স্বাভাবিক। অতঃপর শখকে নিয়ে সবার মনে যা চিন্তা ছিল অনেকটাই কমে এলো। সিঁতারা, সিমিন, সিরাত একে একে অর্কের মাকে জড়িয়ে ধরে নতুন করে বিদায় দিলেন।

Next part Kobe asbe
December 13
Next part taratari dao apuu