Home চিত্রাঙ্গনা চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৫

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৫

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৫
ইশরাত জাহান জেরিন

চিত্রা ঘুমিয়ে পড়েছে। এই মাঝ রাতে আচমকা ফারাজের ঘুম ভেঙে যায়। আসলেই কি তার ঘুম ভেঙে গিয়েছে নাকি সে ঘুমায়নি? ইতালি থেকে কল এসেছিল। তাকে জলদি ফিরতে হবে। এই বাংলাদেশ, এই উটকো জনঝাট তার জন্য নয়। তার পছন্দ পারমাণবিক বোমা, সেখানে সাপোজিটরি দিয়ে কাজ চলবে কি? ফারাজ মাথা দু’দিকে ঝাঁকিয়ে ঘাড়ে হাত দিলো। ব্যাথা করছে ঘাড়টা। সে খালি গায়ে বিছানা ছাড়ল। বারান্দায় যাওয়ার আগে চিত্রার গায়ে চাদরটা ভালো করে জড়িয়ে কপালে একটা আলতো করে চুমু বুলিয়ে দিলো।

নিজের বালিশের নিচ থেকে পিস্তুলটা বের করে বারান্দায় গিয়ে বসল। রকিং চেয়ারে বসে পিস্তলটা ভালো করে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। হাতের এই পিস্তলটা ফারাজের কাস্টমাইজ করা। এখানে স্বর্ণ আর হিরা দু’টোই বসানো। তার থেকে বড় কথা,এই পিস্তলের গুলিতেও স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে। মানে এই পিস্তলের একটা গুলি যার কপালে লেখা আছে তার বরঞ্চ লাভই হবে। কারণ এতে যেই পরিমান স্বর্ণ ব্যবহার করা হয়েছে তা একটা মানুষকে নিচ থেকে মুহূর্তেই উপরে পৌঁছে দিতে সক্ষম। ফারাজ একটা সিগারেট ধরালো। ধোঁয়া ছেড়ে চোখ দুটো বন্ধ করতেই আগের জীবনটার কথা মনে পড়ল। মনে পড়ে গেল সেই ফারাজ এলাহীকে যার দাপট সারা ইতালি জুড়ে এখনো বিচরণ করছে। একটা সাধারণ ফারাজ এলাহীর কিন্তু স্মাগলার হয়ে ওঠার গল্পটা এত সহজও ছিল ন।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রোজ সারা বিশ্বে মাছ রপ্তানির পাশাপাশি অবৈধ মাদকদ্রব্য, অস্ত্র পাচার কি এতটাই সহজ? তাছাড়া কেবল যে তাদের কাজ এখানেই সমাপ্ত ছিল তাও তো না। এই অস্ত্র তৈরি করা, মাদক তৈরি করা কত কী? এত বছর ধরে সাজানো সাম্রাজ্য কী একটা মানুষ এভাবেই শেষ করে দিতে পারে? ফারাজ চোখ খুলল। হাতে যেই সিগারেটটা, সেটা ইতালিয়ান একটা ব্যান্ড। যেটা ফারাজ এলাহীর নিজস্ব ব্যান্ড। তবে ফারাজের সবই অবৈধ তাও নয়। লাইসেন্স প্রাপ্ত মাদক তৈরি আর অস্ত্রের কারখানা আছে। তবে কথায় আছে না, সকল বৈধর পেছনেও কোনো না কোনো অবৈধ বিষয় লুকিয়ে থাকে। ফারাজ ঘুমন্ত চিত্রার দিকে তাকায়৷ ওর পাসপোর্ট হয়নি। কোনো সমস্যা আছে। ফারাজ চিত্রার দিকে তাকালো। সে কিছু জানে? মনে মনে সুধাল, “আমি কিছুই বিশ্লেষণ করে দেখব না আগুন সুন্দরী। আগুন আপনি থেকে জলের কাছে ধরা দেবে।” সে আকাশের দিকে তাকাতেই হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন জড়িয়ে ধরল। ফারাজ না তাকিয়েই বলল, “এত ক্লান্ত করে দেওয়ার পরেও আগুন সুন্দরীর ঘুম ভাঙ্গল যে?”

“কারণ আপনার আগুন সুন্দরী আরো বেশি ক্লান্ত হতে চায়।”
“তাহলে পুরো এলাহী বাড়ি আরো দুইবার ঝাড়ু দেও।” বলেই চোখ টিপে হাসল ফারাজ।
“আপনি কখনো ভালো হবেন না নাকি?” চিত্রা ফারাজের আঙুলের ভাঁজ থেকে সিগারেটটা নিয়ে নিচের দুই ঠোঁটের মাঝে রাখতে যায় তখনই ফারাজ রাগী দৃষ্টিতে তার কাছ থেকে সিগারেটটা নিয়ে বাইরে ফেলে দেয়।
“কি চাই তোমার?”
“আপনাকে?” ফারাজ প্যাকেটে রাখা পিস্তলটা বের করে চিত্রার থুতনিতে ধরল। হেসে বলল,” আমায় খুশি করতে পারবে?”

“খুশি হলে কি দিবেন?”
“এই জীবন তোমার নামে লিখে দিয়েছি আর কি চাই?” চিত্রা নিজের খোলা চুলগুলো খোঁপা করে ধীরে ধীরে ফারাজের গা ছুঁয়ে হাত স্পর্শ করল। আচমকা কৌশলে চিত্রা হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিয়ে একেবারে বুক বরাবর তাক করে ধরে বলল, “এবার তো আপনার আমাকে খুশি করতে হবে যে।” ফারাজ চিত্রাকে এক ধাক্কায় পেছনে ঘুরিয়ে তার পিঠে চুমু বসিয়ে দিতেই চিত্রা জিজ্ঞেস করল, “আপনার উদ্দেশ্য কী?”
ফারাজ বাঁকা হেসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে খাটের দিকে যাত্রা ধরে গুনগুনিয়ে বলল,

~Kya jaane tu mere iraade
Le jaunga saansein chura ke
Dil keh raha hai gunehgaar ban ja
Bada chain hai inn gunaahon se aage
Main gumshuda si raat hoon
Meri khushnuma subah tum ho
Main jo jee raha hoon
Wajah tum ho~

সকাল সকাল ফারাজ দরকারি কাজে বাইরে চলে গেছে অভ্রের সঙ্গে। বজ্রকে দায়িত্ব দিয়েছে চিত্রাকে যেন কলেজে নিয়ে যায়। এমনিতেই ফাঁকিবাজ মহিলা খালি পড়ালেখা না করার ধান্দা আটে। একাডেমিক বই না পড়ে উপন্যাসের বই নিয়ে ঘষাঘষি করে। কি পাগল মেয়ে! মানে উপন্যাসের নায়ক তার জীবনে থাকতে সে কেন উপন্যাস পড়বে? টু মাচ ছোটলোক বউ!
চিত্রা তৈরি হয়ে সকাল সকাল অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই নদীর সঙ্গে আচমকা ধাক্কা খেলো। চোখ-মুখ ফুলে ফেঁপে আছে। চিত্রা সরাসরি তাকে জিজ্ঞেস করল,”রাজন ভাই রাতে বাসায় আসেনি?”
“না মানে…”

“দেখুন ভাবি, যে মানুষ হওয়ার সে মানুষ হবেই। আর যার জন্মই হয়েছে অমানুষ হওয়ার জন্য তাকে কখনো মানুষ বানাতে পারবেন না। ভাবি শুনছেন, পশু হত্যা কিন্তু জায়েজ আছে।” বলেই চিত্রা নিচে নেমে গেল। চিত্রা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসতেই জুনায়েদ এলাহী সঙ্গে সাক্ষাৎ। জুনায়েদ এলাহীর একজন সহকর্মী আছে। চিত্রা বউ হয়ে আসার পরপরই একটা কাজে তাকে কই যেন পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আজ মনে হয় ফিরেছে। জুনায়েদ চিত্রাকে দেখেও না দেখার ভান ধরে রুমে চলে যেতে নিলেই জুনায়েদের সেই লোক চিত্রার সামনে এসে দাঁড়া হয়। চেঁচিয়ে বলে, “আমার স্যারের এই হাল আপনার জন্য হইছে। আপনার মরণের দিনও ঘনাইয়া আসছে। ভুইলা যাবেন না আপনার স্বামীও ফারাজ এলাহী। রক্ত কিন্তু এই বাড়িরই। আর তার বাপ কেমন ছিল জানেন তো?”

” দুঃখিত আমি আর্বজনার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছুক নই।” জুনায়েদ লোকটিকে চলে আসতে বললেও লোকটি মুহূর্তেই রেগে উঠল। হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে আচমকা চিত্রার গলা চেপে ধরতেই চিত্রার যন্ত্রণা হতে শুরু করল। ভাগ্যিস তার চিৎকারে বজ্র জলদি এসেছিল নইলে কি যে হতো? জুনায়েদ পরিস্থিতি সামলে তার লোককে নিজের রুমে নিয়ে যায়। চিত্রাকে বজ্র সামলায়। চিত্রা নিজেলে সামলে বজ্রকে বলল, “প্লিজ ফারাজকে এসব কিছু জানাবেন না। সে জানলে কেয়ামত করে ফেলবে।”
বজ্র চুপ করে রইল। যে লোক তার গলা চেপে ধরেছে তাকে বাঁচাতে চাইছে? তবে ফারাজের কি এই ঘটনা অজানা থাকবে বলে মনে হয়? বজ্র দেয়ালের কোণে থাকা ছোট্ট হিডেন ক্যামেরার দিকে এক পলক তাকিয়ে মনে মনে বলল, “আরেকটা কোরবানি।” পরক্ষণেই চিত্রার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠিক লাগছে তো?”
“হুম চলুন।”
চিত্রা বজ্রের সঙ্গে বাড়ি থেকে বের হতেই ফারাজ একটা নিশ্বাস ছেড়ে ল্যাপটপটা বন্ধ করে। তীক্ষ্ণ কণ্ঠে গাড়ির সামনের সিটে বসে থাকা অভ্রকে বলল, “গাড়ি ঘুরা অভ্র। একটা জরুরী কাজ আছে।”
“জরুরী কাজ মানে? ওখানেই তো যাচ্ছি।”
“তুই বাড়ির দিকে গাড়ি ঘুরা।” ফারাজ ধমকে উঠতেই অভ্র পাশে বসে থাকা ড্রাইভারকে বলল, “এই বয়রা কানে শুনো না? পেছনে ফ্লিম বানানোর সময় তো কান সহ পশ্চাৎদেয়ও সজাগ হয়ে যায়।

ফাস্ট ইয়ারের আজকে নবীনবরণ আছে। অনেক মানুষকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। অতিথিদের বরণ করবে সেকেন্ড ইয়ারের মেয়েরা। চিত্রাকেও সিলেক্ট করা হয়েছে। দুনিয়ায় নিজের খেয়ে পরের ব্যাটা-ব্যাটিকে মালা পড়িয়ে বরণ করার লজিক চিত্রা বুঝে না। চিত্রা হাতের ফুলের মালাটা অতিথিকে পড়িয়ে দেওয়ার জন্য চোখ তুলে তাকালো। ওমাগো ব্যাটা দেখি ডিপজল ফেইল। আলু-থালু চোখ আর মুখটা নিয়ে তাকিয়ে আছে চিত্রার দিকে। স্যার মাইক্রোফোন দিয়ে বললেন, ” এই হলেন সোহান পালোয়ান। উনি একজন গুন্যমান্য উদ্দোক্তা। উনি জনসেবায় অনেক ভূমিকা রাখেন। সকলের বিপদে-আপদে পাশে থাকেন।”সকলে করতালি দিলো। চিত্রা মঞ্চ থেকে নেমে যেতেই সিফাত, পাশ থেকে সোহানকে বলল, “এভাবে তাকিয়ে থাইকেন না মিয়া ভাই। মানুষ কি মনে করব।”
সোহান গলা নামিয়ে বলল,” মানুষ গোল্লায় যাক। আমি আমার বউয়ের দিকে তাকাইছি।”

“আপনার বউ?”
“ভবিষ্যৎ কইলাম আর কী। যাইহোক ওরে এখন থেকে ভাবি বইলা ডাকবি। ”
“কিন্তু ভাবি তো আপনারে দেইখাই মুখ ভেংচি কাটছে।”
“আজ মুখ ভেংচি কাটছে, কালকে আমার লগে ভালোবাসার ফোঁড়ন কাটব। এটাই বাস্তব।”
সোহান সাদা দাঁত গুলো বিকশিত করে হাসল। চিত্রা গিয়ে তার সহপাঠী সঙ্গে বসতেই পাশ থেকে তার সহপাঠী বলে উঠল, “তোর সঙ্গে কালুয়াকে কিন্তু জম্পেশ লেগেছিল। উফ চাঁদ আর পাদ এক ফ্রেমে। এক কাজ কর বোন, তুই তোর জামাইকে ছেড়ে দে আর এটাকে বিয়ে করে নে। তাহলে তোরটাকে আমি পটিয়ে নেব। কারণ তোর জামাইটাকে আমার সঙ্গেই ভালো মানাবে।”

চিত্রা চারপাশে একবার তাকিয়ে মেয়েটিকে মিডেল ফিঙ্গার দেখিয়ে বলল, “ওইটার সঙ্গে তোকেই মানাবে। দুইটার কালারও একইরকম গুয়ের মতো। বাচ্চাও হবে গুয়ের মতো। একেবারে পারফেক্ট।”
চিত্রাকে আশপাশের কেউ না দেখলেও সোহান ঠিকই লক্ষ করেছে। সে উঠে দাঁড়াতে গেলেই সিফাত তাকে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছে? কই যান ভাই? বলেছিলাম বাসা থেকে জরুরী কাজ সেরে আসেন। এখন এখানে বাথরুম কই খুঁজব?”

“জানোয়ারের বাচ্চা, কানা মগা তোরে কইছি আমায় প্রকৃতি ডাক দিছে? দেখোস না তোর ভাবি মাঝের আঙুল দেখাইয়া তার কাছে আমায় ইশারায় ডাকল?”
সিফাত কোনমতে সোহানকে জায়গায় বসিয়ে বলল, “এই জন্যই বলছিলাম একটু ট্রেন্ড ফলো করেন। আপনারে ভাবি ডাকছে নাকি কচু দেখাইছে।”
“কচু দেখাইছে?”
“জ্বী। ওই আঙুল দেখানোর মানে হইলো ওইসব।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৪

সোহানের চোখ বড় বড় হয়ে এলো। সে মুহূর্তেই বলল, “নাউজুবিল্লাহ। তাহলে আমায় দেখায় নাই। হয়তো ওই পাশের মাইয়ারে দেখাইছি। এই সিফাত বাদ দে, তুই ওই বাল পাকনা স্যারেরে গিয়া বল, আমার ভাষণটা যেন জলদি দেবার দেয়। কয়টা খুন করার এখনো বাকি আছে। শেষ করতে হইব আবার ওইসব? দেরি হইয়া যাইতাছে। ভালো কথা, ওইটা মানে কি আসলেই ওইসব?”
সিফাত নিশ্বাস ছেড়ে কপালে হাত দিয়ে বলল, “আরে হ্যাঁ ভাইজান। আপনারে আমি প্রমাণ দেখাব?”
“ছিঃ নাউজুবিল্লাহ দূরে যাহ।”

চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৬