চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৬
ইশরাত জাহান জেরিন
বাড়ির গ্যারাজে বন্দি করে রাখা হয়েছে জুনায়েদের বিশস্ত লোক মাইকেলকে। ধর্মে খ্রিষ্টান হলেও তার আসল ধর্ম পাপ করা। একে তো সরাসরি শয়তানের দূর সম্পর্কের মাসতুতো ভাই বললেও কম হয়ে যাবে। ফারাজের গায়ে ছাই রঙা একটা ব্লেজার। সে ব্লেজারটা খুলে অভ্রকে ধরিয়ে দিলো। তার সাদা ফর্মাল শার্টের ওপর ছাই রঙা ভেস্ট। শার্টের হাতার বোতাম খুলে হাতা গুটিয়ে এবার তাকালো বেঁধে রাখা মাইকেলের দিকে। ফারাজ গম্ভীর। অন্যদিনের মতো হেসে হেসে জান নিচ্ছে না। এটাই অভ্রকে আরো বেশি ভেবে করে ভাবাচ্ছে। কারণ হেসেই যেই মানুষটা এত সুন্দর করে জান কেড়ে নিতো, সে রেগে কেমন করে জান বের করবে কে জানে? তবে অভ্র বেশি অবাক হচ্ছে আজ এতদিন পর ফারাজকে এইরূপে দেখে।
সে না বলেছিল সব ছেড়ে দিবে? তাহলে এই রক্তপাত, এই গুলি এসব কি? তাহলে কি ফারাজ এলাহীর পরিবর্তন ঘটবে না? যাইহোক, খারাপ মানুষ মারলে পাপ হয় না। খারাপের জন্য দুনিয়ায় খারাপ হতে হয়। যদি না হতে পারো তাহলে এই দুনিয়ায় তোমার মতো দূর্বলদের জন্য নয়। ফারাজের দৃষ্টি মাইকেলের ডান হাতের ওপর। এই হাত দিয়েই তো চিত্রার গলা চেপে ধরেছিল তাই না সে? সে চোখ বন্ধ করে একটা নিশ্বাস ছাড়ল। রাগে ফর্সা মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে। ফারাজ হাতের ঘড়িটাও খুলে রেখে শান্ত স্বরে অভ্রকে বলল,
“হাতুড়ি দে।” অভ্র নিজের অজান্তে হাতুড়ি তুলে দিলো। রডটা শীতল, ভারী, আর তার শুষে থাকা মরিচার গন্ধটুকু মাইকেলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠল। ফারাজ রডটা হাতে নিয়ে আস্তে করে মাইকেলের ডান হাতের সামনে নাড়াল।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
তার বরফের মতো ঠাণ্ডা স্বরে পরিণত হলো, “এই হাত… এই হাত চিত্রার গলা চেপে ধরেছিল, তাই না?”
মাইকেল থতমত খেয়ে কেঁপে উঠল, চোখে জল আর অসহায়তার ছায়া। “মাফ করেন। আর হইব না।”
ফারাজ তাকে কথা শেষ করতে দিল না। কোনো রাগ নেই, কোনো চিৎকার নেই তার দৃষ্টিতে। ফারাজ অভ্রের দিকে তাকাতেই সে তার হাতে তুলে দিলো সরু অ্যালেন-কি। স্ক্রু টাইট করার ছোট্ট যন্ত্র, কিন্তু আজ এটা পেরেকের থেকেও ভয়ংকর। অ্যালেন-কি আঙুলের ডগায় ঘোরাতে ঘোরাতে ফারাজ মাইকেলের দিকে তাকাল,
“মানুষ ভুল করে, মাইকেল…” ধীরে, খুব ধীরে সে যন্ত্রটা মাইকেলের কড়ার ওপর বসিয়ে দিল। “ভুল শোধরাতে একটু কষ্ট হয়।” এমনিতেই ইতিমধ্যে ডানহতটা নিজের চোখের সামনে পুড়িয়ে যন্ত্রণা দিয়েছে ফারাজ। সেই পুড়ে যাওয়া মাংসের ওপর ধাতব ঠাণ্ডা ছুঁতেই মাইকেল কাঁপলো। অ্যালেন-কি ধীর লয়ে মাংসের নিচে ঢুকছে। ব্যথা অস্বাভাবিক, প্রতিটি ক্ষতে কাঁটার মতো ধাতব চুম্বন।মাইকেলের গলা ফেটে চিৎকার ভেসে উঠল,
“আআআআ!! প… প্লিজ!!” ফারাজ মুখ কাছে এনে অদ্ভুত শান্ত স্বরে বলল, “চিত্রা শ্বাস নিতে পারছিল না…
তুই তাকে শ্বাস নিতে দেসনি।” তারপর আরও একটু চাপ। ব্যথা আর যন্ত্রণা মিলিয়ে যেন শরীর ভেঙে প্রতিটি স্নায়ু আলাদা হয়ে যাচ্ছে। রডটা আবার তুলে নিয়ে ফারাজ নিঃশব্দে বলল, “আমিও তোকে শ্বাস নিতে দেব না।” বলেই সে অ্যালেন-কী এবার হাতুড়ির সাহায্যে একেবারে পোড়া মাংস ভেদ করে হাড়ের মধ্যিখানে ঢুকিয়ে দিলো। মাইকেলের ডান হাত রক্তে ভিজে যাচ্ছে। অ্যালেন-কি এখনও তার মাংসের ভেতর আধা ঢোকানো। ব্যথা এখন আর চিৎকার আনছে না বরং শরীর নিঃশব্দ হয়ে গেছে। ফারাজ এক কোণে রাখা ছোট একটা বাক্স খুলল। সে একটা চিকন স্টেইনলেস স্টিলের প্লায়ার্স হাতে নিল। ধাতব অংশটা গাঢ় ঠান্ডা।
অভ্র দম আটকে দেখছিল। যদিও এসব দেখা তার জন্য কোনো ব্যাপার না। ফারাজ ধীরে এগিয়ে এসে মাইকেলের সামনে দাঁড়াল। তার শ্বাস, তার দৃষ্টি—একটা মাত্র দিকে বাঁকা। মাইকেলের ডান হাত।
“এই হাত কাঁপছে। ভয় পাচ্ছো নাকি জান্টুস?”ফারাজ শান্তভাবে জিজ্ঞেস করল।
মাইকেল কাঁপা গলায় ফিসফিস করল, “প্লিজ… আর না… আমি ভুল করেছি… আমি করব না… আমি—”
ফারাজ তার কথা থামিয়ে দিল। “ভুলের মূল্য তো দিতেই হবে। তা না হলে ভুল বারবার হবে।” সে প্লায়ার্সের সরু মাথাটা মাইকেলের তর্জনী নখের নিচে ধীরে ঢুকিয়ে দিল। পুরোটা নয়। নখের কোণে, যেখানে মাংস আর নখের আলাদা অস্তিত্ব বোঝা যায়। সেই স্থানে যন্ত্রটা ঢুকতেই মাইকেলের শরীর শিউরে উঠল।
“তুই চিত্রার গলা ধরেছিলি…” সে ফিসফিস করে বলে নখের অর্ধেকটা টেনে উঠিয়ে দিল। ব্যথায় মাইকেলের শরীরটা ধপ করে বাঁধা অবস্থাতেই কেঁপে উঠল। কোনো চিৎকার নেই, কেবল ভেতরের হাড় কাঁপা শব্দ, নিঃশ্বাসের ভাঙচুর, আর কণ্ঠ থেকে বের হওয়া মোছড়ানো আর্তনাদ। রক্ত প্রথমে একটা সরু রেখা হয়ে বের হলো, তারপর উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ল আঙুলে। ব্যথা এত সূক্ষ্ম, এত ধারালো যে শব্দে প্রকাশ পাওয়া অসম্ভব। নখের অর্ধেকটা ঝুলে আছে। তোলা হয়নি পুরোটা। অসমাপ্ত যন্ত্রণা সবচেয়ে গভীর। ফারাজ তার মুখের কাছে ঝুঁকে বলল, “হাতটা আর কখনো গলা চেপে ধরতে পারবে না। জানিস কেন?”
রক্তে ভেজা আঙুলটা সে খুব আলতো করে স্পর্শ করল, যেন ব্যথাটাকে আরও জাগ্রত করে তুলছে।
“কারণ এই ব্যথা তোকে দেখিয়ে দেবে, কারো নিঃশ্বাস থামানো ঠিক কতটা কষ্টের।” মাইকেল কাঁপছে, চোখে পানি, নাকে শ্বাস আটকে যাচ্ছে। সে কিছু বলতে পারছে না। ফারাজ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে প্লায়ার্সটা মুছলো।
“আমি খুন করছি না, মাইকেল।” তার স্বর স্থির, মৃত জলস্রোতের মতো ঠান্ডা। ফারাজ এবার অভ্রর দিকে তাকালো। পাশে তার আরো লোক দাঁড়িয়ে আছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই ইতালিয়ান। কিছু কিছু এর বাইরেরও আছে। ফারাজ অভ্রকে বলল, “গ্রাইন্ডার মেশিনটা এনে এই শালাকে জ্যান্ত অবস্থায় জবাই দিবি। তারপর বডিপার্ট আলাদা করে কিছু পার্ট গায়েব করবি আর কিছু পার্ট যাবে জুনায়েদ এলাহীর কাছে। ভবিষ্যৎতে যেন এমন পরিস্থিতির শিকার সে না হয়ে যায় তাই অগ্রীম সাবধান আরকি।”
“সমস্যা নেই ভাই, সব ব্যবস্থা করে রাখব। আপনি এখন কাজে যাবেন না?”
“না ক্ষুধা পেয়েছে।”
“তোর ভাবিকে। সে টু মাচ ফাকিং ডিলিশিয়াস।”
কলেজ থেকে সবেমাত্র বের হয়েছে চিত্রা৷ বজ্র এখনো আসেনি। কই যে থাকে খোদা ভালো জানে। শেষে অপেক্ষা করতে করতে পা ব্যথা হয়ে গেল। গিয়ে বসল একটা বসার জায়গায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সোহান ভেতর থেকে বের হয়ে আসতেই তার চোখ গেল চিত্রার দিকে। সিফাত খালি ঝামেলা করে। এটাকে রেখেই যাওয়া ভালো। সে সিফাতকে রেখেই চিত্রার সামনে এগিয়ে যেতে নিবে ঠিক তখনই ফারাজ এসে চিত্রার ব্যাগটা নিজের হাতে তুলে, অভ্রের কাছে দিয়ে দেয়। চিত্রার কপালে চুমু দিয়ে বলে, “মুখটা কত শুঁকনো লাগছে। আজকে কিছু খাওনি?”
“খেয়েছি। কিন্তু এত যে ক্ষুধা লাগে। মনে হয় দুনিয়া সহ খেয়ে ফেলি।”
ফারাজ চিত্রার কাছে গেল। ফিসফিস করে বলল, “বাসায় চলো স্পেশাল খাবার আছে।”
“কি খাবার?”
“ফারাজ এলাহী।”
সোহানের সেই দৃশ্য সহ্য হলো না। তার রাগে হাত নিশপিশ করছে। হঠাৎ পেছন থেকে সিফাত, ভাইজান বলে ডাকতেই ফারাজ সেদিকে তাকালো। সোহান সিফাতের দিকে একবার তাকিয়ে সামনে ফিরতেই দেখল ফারাজ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এগিয়ে গেল। ফারাজের কাছে গিয়ে বলল, “কি খবর ফারাজ এলাহী নাকি?”
“কেরে কে কথা বলে? আরে সোহান ভাই নাকি? আসলে একে তো আপনার রঙের সানগ্লাস পড়েছি, তার ওপর আপনি সামনে দাঁড়িয়ে। বুঝলেন তো অমাবস্যা সাহেব, আপনাকে দেখতে পাইনি।”
সোহান মেকি হাসল। বলল, “একদিন বুঝবা ফারাজ এলাহী৷ সেদিন যেন দেরি না হইয়া যায়।”
“আমি ক্লোজআপ দিয়ে দাঁত মাজি ভাই, তাই এমনিতেও দূরত্ব, দেরি বেশি সইতে পারি না। তবে বেচারা নিরুটা আপনার জন্য নিখোঁজ হলো। কেন যে বাচ্চা মেয়েটাকে বিয়ে করতে চলে আসলেন।”
সোহান জবাব দেয় না। সিফাতকে ডাক দিতেই সিফাত এসে তার পাশে দাঁড়ায়। সিফাত একেবারে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। কারো সঙ্গে নজর মেলাচ্ছে না। ফারাজ সিফাতের দিকে এক পলক তাকিয়েই চোখ সরিয়ে নিলো। সোহানকে বলল, “মশাই যদি একটু সাইট দিতেন। না মানে এটা আমার বউকে মানচিত্র দেখানোর সময়। বাসায় জলদি গিয়ে কাজটা শেষ করতে হবে তো।”
চিত্রা বিপাকে পড়ে গেল। শুরু হয়ে গেছে এই লোকের। ফারাজ চিত্রার হাত ধরে পাশ কাটিয়ে চলে যেতেই সোহান সিফাতের দিকে তাকিয়ে বলল, “মানচিত্র দেখানোর সময় মানে? কি বুঝাইলো এই এলাহী? আমার বউরে সে কি দেখাবে।”
“ভাইজান আপনার বউ তো এখন তার বউ, আর তার বউ দেখেই তো সে দেখাবে।”
“দেখাইবো মানে?”
“আরে মানচিত্র?”
“আরে সেটাই। কিসের মানচিত্র দেখাইবো?”
“আরে ভাই ওইটা।”
“ওইটা মানে কি সেই ওইযে ওইটা?”
“জ্বে।”
” ওর সাহস কত বড়। এই ফারাজ এলাহীর মানচিত্রের ম্যাপ যদি না ছিঁড়ছি।”
“পারবেন কী ভাই? আয়তনে তো বড়।”
“বড় মানে? কী বড়?”
“আরে ওই মানচিত্র।”
“ওহ সেইটা কইবি তো। জলদি চিত্রারে বিয়া কইরা আমিও মানচিত্র দেখামু আমার।”
সিফাত তা শুনে বিরবির করে আওরালো, “আপনার মানচিত্র তো অন্ধকার, দেখাবেন কেমনে?”
সোহান সামনের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল, “বাতি জ্বালাইয়া।”
তা শুনে সিফাত অবাক হলো। ওমা শুনে ফেলল ভাইজান? সোহান এগিয়ে যেতেই সিফাত তার পাশাপাশি দাঁড়ালো। সোহান গুরুগম্ভীর ভঙ্গিতে বলল, “একটা কথা কইবি?”
“বলেন।”
“ওইদিন তোর হাত থাইকা গুলি ফসকাইয়া কেমনে গেছে? তোর কি মনে হয় ফারাজ এলাহীরে কেউ একজন গুলি করছে, আর এতদিন হইয়া গেল ওইটা সে খুঁইজা বাইর করে নাই?”
চিত্রাঙ্গনা পর্ব ৬৫
সিফাত ঢোক গিলল। প্রথমত তার সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল। ওইদিন আসলেই সে গুলি করতে গিয়ে হাত ফসকে ফেলে। কারণ সোহান পালোয়ান, ফারাজকে গুলি করতে বললেও সিফাত কিন্তু গিয়েছিল চিত্রাকে গুলি করতে। গুলি ফসকে সেদিন ফারাজের গায়ে লেগে যায়। তবে আসলেই চিন্তা হচ্ছে এখন। ফারাজ মরে গেলে এত ভয় হতো না, ভয় হচ্ছে সে এখনো বেঁচে আছে। আর এতদিনে যে সে তার ওপর গুলি করা ব্যক্তির বিষয়ে জানে না, বললেও ভুল হবে। আচ্ছা সে কিছু করার আগেই তাকে সরিয়ে ফেলা যায় না? হঠাৎ সিফাতের ধ্যান ভাঙল। সোহান বলল, “অনেক হইল। এবার ফারাজরে সরাইতে হইব। চিত্রারে আমি আমার বউ করমুই। ওরে তুইলা আনি?”
