Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮২

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮২

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮২
সাইয়্যারা খান

পৌষকে টেনেটুনে হোটেল রুমে নিয়ে এসেছে তৌসিফ। এই মেয়ে কিছুতেই আসবে না৷ তৌসিফ হতভম্ব হয়ে আছে ওর আচরণে। পৌষ এমন আচরণ শেষ একবার সোহার সম্মুখে করেছিলো কিন্তু এবারে যে এমন করবে তা যেন ওর ধারণার বাইরে ছিলো। রুমে এনে ছেড়ে দিতেই একপ্রকার ঝাঁপিয়ে পড়লো পৌষ তৌসিফের উপর। তৌসিফ দরজা লক করছিলো বিধায় খেয়াল করে নি তেমন ভাবে। আচমকা হামলা সে পড়ে গেলো মেঝেতে। পৌষ তখনও থেমে নেই৷ তৌসিফের পেটের উপর চাপা দিয়ে বসেছে। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এলো তৌসিফের। বুকের দিকে খামচে ধরলো পৌষ৷ চাপা স্বরে বলে উঠলো,

“কে ছিলো ওই ন’টি?”
“হানি, লিসেন টু মি। আমি বলি…”
“আপনার বলার উত্তর কালা কু’ত্তা হিসু করুক। কয়টা মেয়ে নিয়ে রঙঢঙ করেছেন আপনি? আপনি আগেও এসেছেন এই দেশে, এসে এগুলো করতেন? চরিত্রহীন ব্যাটা!”
“তোমাকে কে কি বলেছে হানি? ওঠো, ওঠো, আমার কথা শুনো।”
“আমি কোন চরিত্রহীন লোকের সংসার করব না৷ তোর সংসারে লাত্থি মারি।”
তৌসিফের চোখ দুটো বড় বড় হয়ে এলো। পৌষ ঝুঁকে এসে কামড়ে ধরেছে ওর কাঁধ। তৌসিফ সেটাকে লাভ বাইট হিসেবে ধরতে পারলো না। রীতিমতো গোস্ত তুলে নিতে চাইছে পৌষ। তৌসিফ ব্যথাতুর শব্দ তুলে সরাতে চাইলো। পৌষের শক্তি বেড়েছে। তৌসিফ এবারে জোর দিয়ে সরালো। বুকের সাথে চেপে ধরে উঠে বসলো। মেঝে কার্পেট মোড়ানো তাও ঠান্ডা। উঠে দাঁড়াতেই পৌষ ছটফট করে সরে গেলো। ওর ঠোঁটে র’ক্ত লেগে আছে। তৌসিফ নিজের কাঁধে হাত চাপ ধরতেই ‘আহ’ শব্দ করে উঠলো। পৌষের দিকে তাকিয়ে দেখলো ও রাগে ফুঁসছে। চোখ দুটোয় অকৃত্রিম রাগ বিরাজমান। তেড়েফুঁড়ে এগিয়ে এসে তৌসিফের বুকে জোরে ধাক্কা দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,

“পরকীয়া করেন? এলাকার মানুষ তো সোহা আর আপনাকে নিয়েও কথা বলতো। এখন তো আমার তাতেও সন্দেহ হচ্ছে। আদৌ সৎ বোন? রনি ভাইয়া বিয়ে করতে চাইলো অথচ না করে দিলেন। কারণ কি? কোন তো কারণ হবে তাই না?”
“পৌষরাত!”
তৌসিফ ধমক দিলো। বিশেষ লাভ হলো না তাতে। পৌষও রেগে আছে,
“কিসের পৌষরাত? বা’ল ছিড়বে পৌষরাত।
এই দেশে এসে এসে নষ্টামি করতি তুই? হায় আমার কপাল, এমন লম্পট লিখা ছিলো আমার কপালে? এতিমের ভাগ্য এত খারাপ হলো কেন?”
হাতের কাছে থাকা গ্লাস ছুঁড়ে দিলো পৌষ৷ তৌসিফ ভাঙা কাঁচ সাবধানে পেড়িয়ে এগিয়ে এলো। এসে ঝট করে পৌষের দু-হাত একত্রে করে ধরলো। শান্ত করতে বললো,

“তুইতোকারি করে না।”
“হাত ছাড়! একশতবার করব।”
“হানি, লিসেন টু মি। পিয়ু আমার হাত হুট করে ধরেছে। আমরা দূরত্বেই বসা ছিলাম৷ তুমি কখন থেকে দেখেছো?”
“যেখান থেকেই দেখি। পিয়ু কি? অ্যাঁই এক মিনিট, ওটা পিয়াসী? ওটাকে পিয়ু মারাস তুই? আপু… পলক আপু ঠিক বলেছিলো। তোর স্বভাবচরিত্র ভালো না। আমি…আমি বলদ বিশ্বাস করি নি৷ অন্ধবিশ্বাস করেছিলাম তোকে।”
তৌসিফ কপাল কুঁচকে ফেললো। পৌষের হাত নিজের মাঝে জড়িয়েই আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“পলক? কি বলেছে পলক তোমাকে?”
“যাই বলেছে সত্যি বলেছে। আপ..আপনি ঠিক কোন পর্যায়ের খারাপ হলেন? কোন পর্যারের খারাপ হলে কোন পুরুষ রুমে বউ রেখে বাইরে আসে ভাইয়ের বউয়ের বোনের সাথে রঙ্গলীলা করতে।”
“শাট আপ পৌষরাত! কথা শুনছো না৷ শুধু বলছোই।”
“কি শুনব? আরেকটু হলে আপনার কাঁধে থাকা মহিলাটা আপনার ঠোঁট ছুঁতে নিয়েছিলো। এরপর ঠোঁটে ঠোঁট রাখতেন? ইশ! পৌষ বাগড়া দিয়ে দিলো? আফসোস হচ্ছে খুব?”

“পৌষরাত!”
তৌসিফের রাগ মাথায় উঠে যাচ্ছে। এই মেয়ে কোথাকার কথা কোথায় টেনে নিচ্ছে? পৌষের দুই বাহু সামান্য চেপে ধরলো ও। নিজের মতো বলতে লাগলো,
“আমরা দূরত্বেই ছিলাম পৌষরাত। ও হঠাৎ বাহুতে মাথা রেখেছে। আরেক হাত ওঠার আগেই আমি ধরতে নিয়েছিলাম কিন্তু তুমি চলে এলে।”
“ওহহো! খুব ক্ষতি করে দিলাম।”
“প্লিজ পৌষরাত৷ ডোন্ট ডু দিস। আমরা হানিমুনে আছি৷”
“একথা ঐ মহিলার কাছে যাওয়ার আগে মনে পড়লো না কেন?”
তৌসিফ পৌষের রাগ আয়ত্তে আনতে চাইলো। ঠোঁটে ঠোঁট চেপে রাগ নিবারণ করতে চাইলো। আজ অবশ্য লাভ হলো না। পৌষ ওকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,
“আমাকে আগে কেন বলেন নি? কেন বলেন নি ওই মহিলার সাথে দেখা করতে যাচ্ছেন? সত্যি করে বলুন, আপনি শুয়েছেন ওর সাথে? আমার মতো করে ভালোবেসেছিলেন না? আদর করেছিলেন? আমার… আমার বিশ্বাস হচ্ছে না অথচ আমাকে বলেছিলো পলক আপু৷ আমি উল্টো ওনার সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিলাম। ভাবলাম আমার সুখের সংসার দেখে এমন করছে।”

পৌষ পাগলের মতো প্রলাপ বকে যাচ্ছে। তৌসিফ হাজার বুঝাতে চাইলেও বুঝতে চাইছে না। তৌসিফ জানে ও এখন বুঝবেও না তবুও শেষ চেষ্টা করলো,
“ও কোন গুরুত্বপূর্ণ কেউ না পৌষরাত যে আমি তোমাকে জানাব। আমার জীবনের একটা অংশ ছিলো ব্যাস। যা এখন নেই। তুমি বাদে কেউ নেই পৌষরাত। ট্রাস্ট মি।”
“এরমানে ওর সাথে শুয়েছিলেন?”
পৌষ ক্লান্ত চোখে তাকালো। তৌসিফ ঢোক গিললো। এগিয়ে এসে পৌষকে জড়িয়ে ধরলো বুকের মাঝে। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললো,
“নাহ্।”
“আমি বিশ্বাস করতে পারছি না।”
“পলক তোমাকে কি বলেছে আমি জানি না পৌষরাত তবে আমার কথা শুনো পৌষরাত৷ সি ওয়াজ নাথিং বাট এ ডিসগাসটিং পাস্ট।”
পৌষ চুপ করে আছে। তৌসিফ লক্ষ্য করলো পৌষের হার্টবিট হচ্ছে খুব দ্রুত৷ ও পৌষকে নিয়ে বিছানায় গেলো। সারা মুখে চুমু খেলো। বুঝানোর স্বরে বললো,

“ও এখন আমার ভাইয়ের বউ বাদে কিচ্ছু না পৌষরাত। আমার চাচাতো ভাইয়ের বউ। তুমি তাকে চিনো। তুষারের নাম তুমি জানো? সুলাইমান চাচার বউ, যাদের দুটো ছোট ছেলে ছিলো। তার মধ্যেই বড়জনের নাম তুষার। পিয়ু এখন তুষারের বউ। ও আমার সাথে খুব সাধারণ কথাবার্তা বলছিলো। নাথিং সিরিয়াস। এই ধরো বিজনেসের কথাবার্তা। ওদের ডায়মন্ডের ব্যাবসা স্বামী-স্ত্রীর৷ আমার গোল্ডের ব্যাবসার সাথে একটা অ্যাকজিবিশন হবে জয়েন্টলি। তুষারও আসতো তবে তুমি তার আগেই চলে এসেছো। হঠাৎ যে ও আমার বাহুতে মাথা রাখবে আমি তা বুঝতে পারি নি। এটা এখানকার নরমাল একটা কালচার ওদের জন্য।”
পৌষ চুপ করে ভাবছে কিছু। তৌসিফ অবাক হলেও ভাবলো হয়তো বুঝেছে। কিন্তু বেচারা এবারেও বেমালুম ভুলে গেলো এটা পৌষরাত হক।
তৌসিফ ওর মুখটা এগিয়ে আনলো পৌষের কাছাকাছি। লম্বা হয়ে শুয়ে আছে পৌষ৷ তৌসিফ আলতো হাতে ওর সুইটার খুলে দিলো। গলার দাগগুলোয় পুণরায় মুখ ডুবালো ও। পৌষ প্রতিক্রিয়া দেখালো না। একদমই নির্জীব হয়ে রইলো। চোখ দুটো উপরের সিলিং এর দিকে।

বেলা গড়িয়ে যাচ্ছে। সূর্যর দেখা নেই আজ কয়েকদিন। হোটেল রুমটা সামান্য উষ্ণ তবে বেশি না৷ মোটা কম্ফোটার দিয়ে ঢেকে রাখা তৌসিফের দেহ। ঘুমের মধ্যেই এদিক ওদিক হাতালো ও। পৌষ নেই। একবার ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই ডাকলো,
“হানি? আর ইয়্যু দেয়ার?”
উত্তর আসে না। তৌসিফ ধীরে ধীরে চোখ খুলে। কয়েকঘন্টার একটা লম্বা ঘুম দিয়েছে ও। ক্লান্ত লাগছে বেশ। দিনদাহারে বেশ আদর আদর সময় কাটিয়েছে সে পৌষের সাথে। উঠে বসে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। আরেকবার ডাক দিলেও উত্তর পেলো না। তৌসিফের শাওয়ার নেওয়া বাকি। দুষ্ট হেসে উঠে বাথরুম নক করলো। ওখান থেকেই বললো,
“মে আই কাম ইন হানি?”

উত্তর আসলো না এবারেও। তৌসিফ দরজা ঠেলতেই তা খুলে গেলো। বুকটা ধ্বক করে উঠলো ওর। নেই। পৌষ এখানে নেই। দৌড়ে এসে ফোন হাতে তুলে ওর নাম্বারে ডায়াল করতেই দেখলো ফোন বন্ধ। তৌসিফ হোটেলের রিসিপশনে ফোন করলো। জানতে চাইলেই মেয়েটা সিসিটিভি ফুটেজ দেখে জানালো, প্রায় ঘন্টা দেড় আগে বাইরে গিয়েছে পৌষ। তৌসিফ ধপ করে বসে পড়লো বিছানায়। কোথায় যাবে ও? চিনে না তো কিছু? যদি গিয়েও থাকে তাহলে আসছে না কেন? দেড় ঘন্টা হয়ে এলো। তৌসিফ হতবুদ্ধ হয়ে গেলো। কাকে ফোন করবে ভেবে ভেবে তুহিনকেই কল দিলো। খুব সংক্ষেপে এখানার ঠিকানা দিয়ে আসতে বলে নিজে শাওয়ার নিতে ঢুকলো। পরিপাটি হয়ে ঘন্টা লাগিয়ে গোসল করা তৌসিফ তালুকদার আজ দশ মিনিটের আগেই গোসল শেষ করলো। কোনমতে প্যান্ট আর টিশার্ট পরেই গায়ে জ্যাকেট জড়িয়ে বেরিয়ে এলো। ওর মন কু ডাকছে। আজ পৌষ আদরের সময়ও তো সাড়া দেয় নি। কোথায় গেলো? কিছু তো খায়ও নি। তৌসিফ চিন্তায় চিন্তায় ভেতর থেকে ঘেমে উঠলো। জ্যাকেট খুলে ফেললো। তুহিন সহ ইহান, ইরা চলে এসেছে। তায়েফাকে জানায় নি এখনও। তুহিন এসেই একগাদা প্রশ্ন করলো,

“কোথায় যাবে ও? তুমি কোথায় ছিলে? এতবড় মেয়ে মানুষ চোখের সামনে দিয়ে হারিয়ে গেলো?”
“ঘুমে ছিলাম আমি।”
“মেঝ ভাইয়া!”
বাহু ধরে ঝাঁকি দিতেই তৌসিফ চমকে তাকালো। তার ধ্যান কোথায় গিয়ে আটকেছে। তুহিনকে দেখেও যেন চমকে গেলো। আচমকা বলে উঠলো,
“পিয়ু এসেছিলো। আমরা ঐ জয়েন্ট প্রজেক্টের বিষয়ে কথা বলছিলাম। পৌষ দেখে ভুলভাল ভেবে নিয়েছে। পলক নাকি ওকে কিছু বলেছে।”
“ব্লাডি বিচ!”
তুহিনের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। ঠিক এই কারণে ও একা ছাড়তে চাইছিলো না। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে বললো,
“*লের মিটিং এখানেই কেন করতে হলো? আর পৌষ চিনলো কিভাবে ওকে? কতটুকু জানে ও?”
“পলক কি বলেছে আমি জানি না। পৌষ বোধহয় হারিয়ে গিয়েছে তুহিন। আর মনে হয় আসবে না।”
ইহান এগিয়ে এলো। ভরসা দেওয়ার কণ্ঠে বললো,
“মামি হয়তো আশেপাশে হাঁটতে বেরিয়েছে। হোটেল তো চিনবেই। চলেও আসতে পারে।”
তুহিন খেঁকিয়ে উঠলো,

“ও তো হোটেলের নামই জানে না। সকালেও কথা হয়েছিলো ওর সাথে।”
তৌসিফ তাড়াহুড়ো করছে না৷ ও থমকে আছে। শরীরটা ঘামছে এই কনকনে ঠান্ডায়। পৌষ কোথায় গেলো? আজ প্রথম ওদের একান্ত মূহুর্তে পৌষ সাড়াহীন ছিলো। একটুও কাছে টানে নি ওকে। তুহিন তাড়া দিলো। এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো সবাই। তখনই কল এলো তৌসিফের ফোনে। রিসিভ হতেই ওপাশ থেকে ইংরেজিতে একজন ইন্সপেক্টর নিজের পরিচয় দিয়ে জানালেন,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮১

“মিস্টার তৌসিফ বলছেন? আপনার ওয়াইফ এই মূহুর্তে আমাদের কাছে আছে। দয়া করে এখানে আসবেন শিঘ্রই।”
তুহিন শুনেছে কারণ তৌসিফ ফোন হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তুহিন কিছু বলা বা কওয়ার আগেই ধপ করে পড়ে গেলো তৌসিফ। ইহান আর ইরাও দৌড়ে এসেছে। তুহিন চিৎকার দিয়ে উঠলো যখন দেখলো তৌসিফের মুখ সামান্য বেঁকিয়ে যাচ্ছে। বুকের সাথে চেপে ধরতেই তৌসিফ থেমে থেমে বললো,
“ও আমার সংসার করবে না তুহিন। আমি আবারও একা হয়ে যাব।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৩

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here