প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৮ (২)
সাইয়্যারা খান
অস্ট্রেলিয়ার আকাশ আজ মোটামুটি সুন্দর। বৈরী আবহাওয়া এখন থমকে আছে। ল্যাগেজ গোছানো শেষ। গাড়িতে উঠবে একটু পরই। আপাতত পৌষের হাতের চা পানে ব্যস্ত সকলে। তায়েফা খানিক পরপর চোখ মুছে যাচ্ছে। ইহান, ইরাও বেশ চুপচাপ। মন খারাপ তাদের। শেষ পর্যন্ত তুহিনেরও টিকেট কাটা হয়েছে। সে আজই চলে যাচ্ছে। তৌসিফ আর তুহিন বোনের দু’পাশে বসে তাকে স্বান্তনা দিচ্ছে। তায়েফার মন মানে না। মিস্টার কিবরিয়া স্ত্রীকে হাসানোর চেষ্টা করছেন। পৌষ বসে বসে এদের দেখছে। তার খারাপ লাগছে না। হ্যাঁ, দুটো মাস সে এখানে আনন্দ করেছে, ইহান আর ইরাকে নতুন চিনেছে কিন্তু বিদায়কালীন সময়টা তার নিকট ততটাও কষ্টকর নয়। জন্ম থেকে যেখানে থেকে এসেছে, যাদের সাথে এত সুন্দর সুন্দর দিন কাল পাড় করে এসেছে, যাদের এই বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুম পাড়িয়েছে তাদেরই যখন ছাড়তে পেরেছে তাহলে এই দুই মাসের মায়া আর কি? পৌষের কাছে এসব কেন জানি ভালো লাগে না। তার নিজের মধ্যে খারাপ লাগাটাই কম কাজ করে। পৌষ ছোট থেকে নিজেকে শক্ত করে গড়েছে। চায়ের কাপে শেষ চুমুক বসিয়ে পৌষ একে একে বাকিদের কাপ তুললো। ইহান, ইরা উঠে বাকি সব গোছালো হাতে হাতে। পৌষ সিঙ্কে নিয়ে সব ধুয়েমুছে রাখলো। তায়েফা কাজ জমায় না। পৌষ দেখেছে। এই অভ্যাস ওর নিজেরও আছে। ইরা বক্সে বিরিয়ানি ভরে ওভেনে দিলো গরম হতে। তায়েফা দেশে পাঠানোর জন্য অনেক কিছু গুছিয়েছে এক ল্যাগেজে। ওরা তিনজন মানুষ বলে বাঁচা গিয়েছে নাহয় এত কেজি দেশে নিতে ঝামেলা হতো।
সময় আর ততটা বাকি নেই। এয়ারপোর্টে পৌঁছাতে হবে। তৌসিফ, তুহিন তৈরী। পৌষ পরণের কাপড়ের উপরই মাথা প্যাঁচালো। তৌসিফ নিজের গায়ে লং কোট জড়িয়ে পৌষের গায়ে একটা পড়িয়ে দিলো। তারা সবার থেকে বিদায় নিলো। এয়ারপোর্টে সবাই যেতে চাইলেও তৌসিফ না করেছে, যদি আবহাওয়া আবার বিগড়ে যায়? ইহানকেও যেতে দেয় নি সাথে। মিস্টার কিবরিয়া স্ত্রীর কপালে চুমু খেয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
“আর কেঁদো না, কিছুদিন পর দেশে যাব আমরা।”
“হুঁম।”
ড্রাইভিং সিটে মিস্টার কিবরিয়া। তায়েফা শেষবারের মতো দুই ভাইকে আদর করলো। পৌষকে কিছুটা সময় জড়িয়ে রাখলো। গাড়িতে উঠে সবার থেকে বিদায় নিলো তখন পৌষেরও একটু খারাপ লাগলো। এখানকার রাস্তাঘাট সুন্দর। চোখ দুটো শান্তি পায় আশেপাশে তাকালে। বাড়ীঘর কম। গাছপালা বেশি। মাঝেমধ্যে মানুষজন দেখা যায়। এখানে এসে কম এডভেঞ্চারও হয় নি তাদের। পৌষ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে সুন্দর দেশটা দেখতে লাগলো। তৌসিফ আর তুহিন তখন দুলাভাইয়ের সাথে কথাবার্তা বলছে। ইতিমধ্যেই তুহিন পেছনে ফিরে বললো,
“ক্ষুধা লেগেছে।”
পৌষের কানে কথাটা পৌঁছাতেই ও পেছন থেকে ব্যাগ বের করে তা থেকে বক্স নিলো। চামচ দিয়ে এগিয়ে দিলো তুহিনের দিকে। জিজ্ঞেস করলো,
“সামনে পানি আছে?”
“আছে। তুমি খাবে না?”
“আপনি খান।”
“মেঝ ভাইয়া, খাবে?”
তৌসিফ মাথা নাড়ে। খাবে সে। দুই ভাই আগে, পরে করে খেলো। মাঝে মিস্টার কিবরিয়া দুইবার খেয়েছেন। তৌসিফ শেষেরটা পৌষের মুখে দিতেই পৌষ আর না করলো না। এখনও ঘন্টা খানিক লাগবে তাদের।
এয়ারপোর্টের বাইরে থেকে বিদায় জানালেন ওদের। ওরা অপেক্ষা করলো ভেতরে। ফ্লাইট আরো অনেক পরে।
প্লেন টেকঅফ করেছে কিছুক্ষণ আগে। বিজনেস ক্লাস হওয়াতে এখানটায় অনেক ফাঁকা। পৌষ রিল্যাক্স হয়ে বসেছে। তৌসিফ নিজেও সব ঠিকঠাক করছে। টেক অফ করতেই পৌষের মাথা ঘুরে গিয়েছিলো। বমি করে ফেলেছিলো মেয়েটা। তৌসিফ চিন্তিত ওকে নিয়ে। অভ্যাস হতে সময় লাগবে। তুহিন এসে খোঁজ নিয়ে গেলো মাত্রই। তৌসিফ পৌষের মাথাটা নিজের কাঁধে নিলো। কপালে হাত দিয়ে তাপমাত্রা দেখে বললো,
“খারাপ লাগছে?”
“না।”
“একটু খেয়ে ঘুমাবে হানি। তোমাকে খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছে।”
“ভালো লাগে না আমার।”
“এই তো চলে যাচ্ছি।”
পৌষ কাঁধ থেকে মাথা তুললো। এদিক ওদিক তাকিয়ে বললো,
“ওয়াশরুমে যাব।”
“চলো।”
তৌসিফ ওকে নিয়ে গেলো। পৌষের বমি পাচ্ছে আবারও। নিজের উপর খুব বিরক্ত ও৷ এভাবে বমি পাওয়ার কথা না৷ বমির ভয়ে খাচ্ছেও না কিছু। তৌসিফ বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলো। পৌষ ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো অতঃপর বমি করে ফেললো। বেশি বমি হলো না অবশ্য। মুখটা কোনমতে মুছে কুলি করে বাইরে আসতেই তৌসিফ বুঝে ফেললো৷ ওকে ধরে নিজেদের জায়গায় বসিয়েই বললো,
“আবারও হলো?”
“একটু।”
“খাবে। দেখি, শুবে না পৌষরাত। তুমি এতটা অসুস্থ কিভাবে হলে? আমি কি দেখলামই না।”
বলতে বলতে তৌসিফ খাবার খুললো। পৌষকে নিজ হাতে খাওয়ালো। এবারে পৌষ ক্ষুধার্ত ছিলো তাই চুপচাপ খেয়ে নিয়েছে। পেছন থেকে তুহিন এসেছে তখন। এসেই কপাল কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
“খারাপ লাগছে আবারও?”
“বমি করেছে মাত্র আবার।”
“জুস আনাব? পৌষ, জুস খাবে?”
পৌষ মাথা নাড়লো। খাবে না ও। তুহিন তবুও কিছুক্ষণ থেকে গেলো। পৌষকে ব্ল্যাংকেট দিয়ে ঢেকে দিলো তৌসিফ। ঘুমাক একটু। মাথাটা এলিয়ে চোখ বুজলো পৌষ। তৌসিফও মাথা এলিয়ে দিলো। টেনে নিলো পৌষকে নিজের কাছে।
টানা দুই মাসের হানিমুন শেষ করে তৌসিফ তালুকদার বাড়ী ফিরলো বউ নিয়ে। সুস্থ সবল বউ নিয়ে গেলেও ফিরেছে অসুস্থ করে। তুহিন নিজের ফ্ল্যাটে না ঢুকে তৌসিফের এখানেই উঠলো কিন্তু নিজের ব্যাগপত্র পাঠিয়ে দিলো নিজের ফ্ল্যাটে। পলক তা দেখেই ছুটে এসেছে এখানে।
আসার পরই পৌষ ফ্রেশ হতে ঢুকেছে। বুয়া রান্নাবান্না করে রেখেছেন সব। তৌসিফ রুমে ঢুকেছে বউয়ের সাথে। তুহিন একাই বসে ছিলো এখানে। হঠাৎ বুকের উপর ঝাপিয়ে পড়ে পলক। যেহেতু ব্যাগপত্র তোলা হচ্ছিলো সেহেতু দরজা খোলাই ছিলো। পলক ওর বুকে পড়েই ফুঁপাতে লাগলো। দুই দুটো মাস ও তুহিন ছাড়া ছিলো। তুরাগ তো ওর দিকে ফিরেও তাকায় না। একা একা দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো ওর৷ তুহিন ওর পিঠ আঁকড়ে ধরলো। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
“কাঁদছো কেন?”
কোন ভালোমন্দ খোঁজখবর নেই শুধু ঠান্ডা কণ্ঠে ‘কাঁদছো কেন’ জিজ্ঞেস করলো তুহিন। আচ্ছা, সে কি জানে না কেন কাঁদছে পলক? জানে, অবশ্যই জানে তবুও এমন প্রশ্ন তার। পলকের মুখটা তুললো তুহিন। কপালে ছোট্ট একটা চুমু খেয়ে বললো,
“যাও। আমি আসছি পরে।”
“কেন? পরে কেন? তুমি এখনই চলো।”
পলক অসাহয় কণ্ঠে বলে উঠলো। তুহিন ওর কপালে আবারও চুমু খেলো। একই ভাবে বললো,
“খেয়ে আসব।”
“আমি..আমি রেঁধেছি তো।”
“আমার জন্য?”
“হ্যাঁ।”
পলকের ঠোঁটে হাসি ফুটলো। তুহিন ওর গাল ছুঁয়ে বললো,
“তুমি জানতে আমি আসব?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু আমি তো জানাই নি তোমাকে পলক। কে জানালো তোমাকে? পিয়াসী? আজ-কাল বোনের সাথে খুব কথাবার্তা বলছো দেখছি? যাবে বোনের কাছে? আজ টিকেট কেটে দেই তাহলে?”
পলক যেন ওখানেই জমে গেলো। মুখের কথা ফুরিয়ে গেলো। তুহিন সরালো ওকে বুক থেকে। গা এলিয়ে শুয়ে রইলো ওভাবেই। পলকও নড়লো না। ওভাবেই ঠাই বসে রইলো। পিয়াসী তো বলেছিলো তুহিন জানে না কিছু৷ মিথ্যা কেন বললো ও?
বেসিনে যেয়ে মুখে পানি দিলো তুহিন। টেবিলে বসে ডাকলো,
“পৌষ, খেতে দিবে আজ?”
পৌষ বের হলো তখনই। চোখ দুটো ক্লান্ত অথচ মুখ চললো খুব,
“মাত্র এসেছি৷ দেখি খালা কি রেঁধেছে।”
পৌষ রান্নাঘরে ঢুকলো। পলককে দেখে নি ও। টেবিলে খাবার সাজাতে সাজাতে তৌসিফও এসেছে। রাত এখন প্রায় এগারোটা। তুরাগ বাসায় নেই। মীরার বাবার বাড়ীতে সবাই। পৌষ হঠাৎই দেখলো সোফায় কেউ বসা। মিনুর দিকে তাকাতেই বললো,
“ছোট মামী।”
সেকেন্ডের জন্য থমকালো পৌষ পরপর ডেকে উঠলো,
“আপু, খেতে আসুন।”
পলক নড়ে-চড়ে উঠলো। তৌসিফ সরু চোখে তাকালো তবে কথা বললো না। পৌষ নিজে যেয়ে হাত ধরে আনলো টেবিলে। খাবার বেড়ে দিলো। তুহিনের পাশে বসেই চুপচাপ খেলো পলক তবে তুহিনের পৌষের প্রতি এতটা ঝুঁকে থাকা ওর বুকে আগুন ধরালো। তুহিন এভাবে পৌষের কাছে আবদার করছে কেন?
পৌষ ঘুমিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। শরীর ভালো লাগছিলো না। তৌসিফ নিজে বুকে নিয়ে জোর করে ঘুম পাড়িয়েছে। ওর ধারণা দেশের বাইরের আবহাওয়া পৌষের ততটা স্যুট করে নি অথচ মেয়েটা প্রথম দিকে কতই না আনন্দে ছিলো। তৌসিফ ভেবেই রাখলো যদি বেশি খারাপ হয় তাহলে আগামী কাল ডাক্তারের কাছে নিবে। তৌসিফ তাকালো বুকের দিকে। তার তোতাপাখির মুখটা নেতিয়ে আছে। এভাবে এত করুণ ভাবে বুকে ঘুমায় না ও৷ দুষ্টামিও ছিলো না ওর মাঝে। তুহিন যাওয়ার আগে বেশ ঝামেলা করার চেষ্টা করেছিলো তবে পৌষ তেমন ঝগড়া করে নি আবার ছেড়েও দেয় নি। সবকিছু জানার পরও যে পলককে দেখে পৌষ এমন ব্যবহার করবে তাও তৌসিফ ভাবে নি৷ একথা পৌষকে জিজ্ঞেস করতেই উত্তর দিয়েছে, “আমার প্রতিশোধ আমি নিয়েছি আপনার পিয়ু থেকে”।
কথার কি ধাঁচ তার তোতাপাখির। তৌসিফ ওর কপালে চুমু খেলো। তার ভাবনা পৌষকে নিয়ে অনেক দূর বিস্তর। তার পৌষরাত যেমনটা চাইবে তৌসিফ ঠিক তাই তাই করবে। বাঁধা হবে না কোনদিন৷ ওর মতো মেয়েমানুষ যে দুনিয়ায় বিরাজ করে তাই তো তৌসিফ জানতো না। এই যুগের মেয়েরা এমন মায়েদের মতো হয়? তুহিন কি শুধু শুধু পা’গল হয়েছে ওর পেছনে?
প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৮৮
মীরা আছে সেই শুরু থেকে। কোনদিন ওমন আদর পায় নি ওরা দু’জন। উল্টো মীরার সাথে পলকের অদৃশ্য কলহ লেগে থাকে। পৌষের ব্যবহারে মীরার মতো মানুষ গলে এখন নরম ব্যবহার করে ওর সাথে তাহলে পলক কেন পারছে না? পৌষ তো পলককে কোনদিন খারাপ নজরে দেখে নি। তৌসিফ চোখ বন্ধ করলো। মানুষ অদ্ভুদ!
