Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯২ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯২ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯২ (২)
সাইয়্যারা খান

বাইরে আজ মেঘলা মেঘলা ভাব। বৃষ্টি ছিটেফোঁটা যা ছিলো তা আর অবশিষ্ট নেই তবে রাত নেমেছে নিয়মানুযায়ী। আশেপাশে ঝিঝি পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। ঘাটের কাছে ব্যাঙ ডেকেই যাচ্ছে সন্ধ্যা হতে। বৃষ্টি হলেই তাদের ডাকাডাকি বাড়ে। তৌসিফের ফ্ল্যাটে আজ রাতের খাবারে খিচুড়ি করা হয়েছে। দাঁড়িয়ে থেকে খাসির ভুনাটা পৌষ করেছে। নাড়ানাড়ি আর মসলা কষানো পর্যন্ত করেছে। তৌসিফ বাকি কিছুই করতে দেয় নি ওকে। খিচুড়ি করেছে বুয়া। পৌষের মনটা তখন থেকেই খারাপ। মুখে যতই বলুক, মনটা খারাপ লাগছে। তুহিন থাকলে রান্না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতো না। তার চিৎকারে পৌষের কান ঝালাপালা হয়ে যেতো। ঘ্রাণে নাকি ওর ক্ষুধা বেড়ে যায়। তখন যত যাই দাও না কেন রান্না না হওয়া খাবারের প্রতিই তীব্র ঝোক থাকবে তখন ওর।

বাচ্চাদের মতো সে কি বায়না! কত আবদার পৌষের নিকট। উমুক খাব, তুমুক রাঁধো কতই না বায়না। পৌষ মুখেচোখে রাগ দেখালেও কোনদিন মন বেজার করে নি। রেঁধে খাওয়াতে বরাবরই ভালোবাসে পৌষ। তুহিনটা যেন অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। ফ্ল্যাটে যতক্ষণ থাকতো পৌষকে শান্তি দিতো না। পৌষ এটা খাবে না, ওটা ধরবে না। টোকোরা দিতে দিতে পৌষকে ত্যক্তবিরক্ত বানিয়ে যেতো। অবশ্য তার থেকে দুই কাঠি উপরে যায় তৌসিফ। চরম মাত্রার যত্নে পৌষ খেই হারিয়ে ফেলে। পৌষ ক্ষুদ্র শ্বাস ফেললো। তুহিন থাকলে এখন খুব মজা করে খেতো। পৌষ একবার ভাবলো মিনুকে দিয়ে পাঠাবে কিন্তু পরক্ষণেই মত বদলালো। পলক যদি আবার চরিত্র নিয়ে কথা বলে? যদি আবার ওর বাচ্চাদের তুলে গালি দেয়? পৌষ সইতে পারবে না। আজ-কাল আগের মতো শক্ত থাকতে পারে না ও। কেমন বুক ভেঙে আসে। অস্থির লাগে ভেতরে।

“হানি?”
কাঁধে হাত রেখে ডাকলো তৌসিফ। পৌষ সামান্য হাসলো। চটপটে কণ্ঠে বললো,
“খাবেন না?”
“হ্যাঁ। এসো। আমি আবার একটু অফিসে যাব।”
“কত রাতে ফিরবেন?”
“একটু কাজ আছে। চলে আসব তাড়াতাড়ি। তুমি ঘুমালেই দেখবে আমার বুকের ভেতর আছো।”
“তাই নাকি?”
“অবশ্যই। তুমি তো আর একা না। আমার দুটো কুটু পাখি আছে না সাথে? তারাও তো পাপাকে মিস করবে।”
পৌষ ঠোঁট ভেঙালো। উঠে টিভিটা বন্ধ করে ডাইনিং টেবিলে বসলো। উঠা বসায়ও প্রচুর কষ্ট। হাঁটু থেকে শুরু হয় চিনচিন ব্যথা, শেষ হয় কাঁধে এসে। মাংসপেশির পীড়া উঠলে চড়থাপ্পড় মা’রে পৌষ। তৌসিফ থাকলে সুন্দর করে মালিশ করে। শরীর ব্যথা জিনিসটা খারাপ। প্রচন্ড বিরক্তিকর।
খেতে বসেও ততটা খেতে পারলো না পৌষ। কারো কথা মনে পড়লে নাকি তাকে ছাড়া খাবার নামে না গলা দিয়ে। পৌষের আজ তাই হলো। ও সত্যিই তুহিনকে মিস করতে লাগলো। যদিনা তার বাচ্চাদের নিয়ে কথা উঠতো, যদিনা চরিত্র নিয়ে টান দেওয়া হতো তবে কোনদিনও পৌষ এতটা কঠিন হতো না।

“খাচ্ছো না যে?”
“মন চাইছে না।”
“দেখি, হা করো তো।”
পৌষ মুখ খুললো তবে বেশি না তৌসিফের হাতে দুই লোকমা মুখে নিলো। আর খেতে পারলো না পৌষ। মনটা বড্ড পুড়ছে। মা, বোনদের মনগুলো যে কেন এমন হয়? এমন মন নিয়ে বেঁচে থাকাটা কষ্টের। পৌষ আর খেলো না। তৌসিফও জোর করলো না। অফিস থেকে উঠে আবার নাহয় খাওয়াবে। পৌষ উঠে রুমে চলে এলো। খাটে পা ঝুলিয়ে বসে ফোন হাতে তুললো। আজ সারাদিনে ভাই-বোনদের সাথে কথাবার্তা হয় নি। এখন একটু না বললেই নয়।

নাইট স্যুট পরেই বেরিয়ে এসেছে তুহিন। পৌষকে আজ না দেখলেই নয়। তুহিনের কথা না শুনে যাবে কোথায় ও? বেয়াদব মেয়ে! আজ ওকে দেখে নিবে তুহিন। কত কথা জমে আছে তুহিনের পেটে। ওগুলো না বললে পেট ফেটে যাবে। দরজার বাইরে পর্যন্ত ঘ্রাণ আসছিলো। নিশ্চিত ভালোমন্দ রেঁধেছে। কত সাহস ফুপাতো বোনের! সে তুহিনকে ছাড়া খায়?
তুহিন পায়ে পায়ে হেঁটে বাড়ীর পেছন দিকে এসেছে। এখান দিয়ে উঁচু একটা গেট আছে তাদের। চাবিটা তুরাগের কাছে থাকে। এখন চাইতে গেলেই নানান প্রশ্ন করবে তুরাগ। তুহিন তো আর বলতে পারবে না কুটনি ফুপাতো বোনের কাছে চোরাই পথে যাচ্ছে। একবার উঁচু গেটটা দেখলো তুহিন পরপর আকাশ পানে তাকিয়ে বললো,
“আল্লাহ বাঁচিয়ে নিও আমাকে। নিজের বাপের বাড়িতে চোরের মতো ঢুকতে হচ্ছে। কুটনি ফুপাতো বোনের বাচ্চা!”

তুহিন পা রাখলো লোহার শিকে। এক দুই পা করে উঠেছে সে। ওমনই টর্চের আলো পড়লো ওর উপর। তুহিন একপাশ অতিক্রম করলেও অপরপাশে অর্ধেক গিয়েছে। মাঝপথেই তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। পেছন থেকে দারোয়ান হইহই শুরু করেছে। অন্ধকারে তুহিনকে মাইরটাইর না দিয়ে বসে শালা। তুহিন ধমক দিলো,
“অ্যাঁই চোপ!”
তুহিনের কণ্ঠের এক ধমকে দারোয়ানের হুঁশ ফিরলো যেন। তাদের ভাইদের ভারী কণ্ঠে কিছু একটা আছে যা একদম জমিয়ে দেয় মানুষকে। তুহিন চোখ পাকিয়ে বললো,
“মুখে তালা ঝুলিয়ে দূরে সরো।”
দারোয়ান চুপ করে গেলো। একবার প্রস্তাব দিলো,
“বড় স্যার থেকে চাবি এনে দেই ছোট স্যার?”
তুহিনের মেজাজ চটলো। এমনিতেই অধিক কান্নার ফলে তার মাথা ম্যথা হচ্ছে। চিরবিড়িয়ে তুহিন ধমকালো,

“চুপ থাকতে বলেছি!”
ব্যাস, দারোয়ান একদম চুপ করে গেলেন। তুহিন গেট টপকে এবারে পাইপের দিকে গেলো। ডান পাশে একটু জিভ বের করে কিছুক্ষণ মেপেঝুপে উঠে পড়লো পাইপে। বেয়ে বেয়ে সুন্দর করে উঠে গেলো তৌসিফের বারান্দায়। বহুত কষ্টে বুকে ভর দিয়ে উঠেছে সে। বারান্দায় লাফিয়ে পড়তেই ঝপাৎ করে শব্দ হয়েছে। ভেতর থেকে কপাল কুঁচকেছে পৌষের। কথাবার্তা শেষ করে ফোনটা রাখতে না রাখতেই কাচের স্লাইড ডোর খুলে ভেতরে ঢুকলো তুহিন। পৌষ সেকেন্ডের জন্য চেঁচাতে গিয়েও থামলো। তুহিনকে হঠাৎ দেখে বুক কেঁপে উঠেছে ওর। তুহিন দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছে। পৌষ নিজেকে ধাতস্থ করলো সময় নিয়ে অতঃপর আঙুল তুলে শাসালো,
“কি সমস্যা! চোর কোথাকার! এখানে কি? বান্দর আপনি? বারান্দা দিয়ে কেন এসেছেন?”
তুহিন গা ছাড়া ভাব দেখালো। এগিয়ে আসতে আসতে বললো,

“তুমি ঢুকতে দিচ্ছিলে?”
“ঢুকতে দিচ্ছিলাম না মানে এটা না যে বেয়ে বেয়ে উঠবেন।”
তুহিন হেলেদুলে এগিয়ে এলো। পৌষ বিছানায় বসা। তুহিন এসে একদম করে ওর পায়ের কাছে বসে পড়লো। পাশ থেকে বালিশ টেনে পৌষের হাঁটুতে রেখে খুব দ্রুত নিজের মাথাটা রাখলো সেখানে। পৌষ হাঁসফাঁস করে উঠলো তাতে। কিছু বলবে তার আগেই তুহিন বলে উঠলো খুব কণ্ঠে,
“খুব রাগ হয়েছে আমার ফুপাতো বোনের?”
কথাটা শুনলো তৌসিফ। মাত্রই হাত ধুয়ে রুমে ঢুকছিলো। তুহিনকে দেখে থমকে গিয়েছে সে। বারান্দার থাই খোলা দেখে আর বুঝতে বাকি রয় নি কিছু। তৌসিফ দরজায় দাঁড়িয়ে রইলো। পৌষের উত্তর শোনার অপেক্ষায় দুই ভাই। পৌষ আস্তে করে বললো,
“পায়ের থেকে উঠুন।”
“কেন উঠব?”
“আপনি তো অবুঝ না ভাইয়া। এসব মানায় আপনাকে? এমন আচরণ ভালো দেখায়? আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না। আমার ভুল। আমার কঠিন হওয়া উচিত ছিলো।”

“তুমি খুব কষ্ট পেয়েছো না?”
“পলকের জায়গায় আমি থাকলে আরো চেঁচাতাম। আমার স্বামী তার ভাবীর হাতের রান্না খাবে রোজ তা আমি মানব?”
“পলক রাঁধে না পৌষ। বুয়াদের রান্না আমার ভালো লাগে না। আম্মুর পর তোমার রান্নাই পেট ভরে খাই। আপা তো দেশে থাকে না।”
“আমি মাঝেমাঝে রেঁধে পাঠব।”
“আমার উপর রেগে থেকো না। পলক শুধু তোমাকে কষ্ট দিতে এসব বলেছে।”
“সে সফল হয়েছে। আমি কষ্ট পেয়েছি কিন্তু আর পেতে চাইছি না।”
“পৌ…”
তুহিনকে থামালো পৌষ। নিজেই বলতে লাগলো,

“আমি খারাপ চরিত্রের মেয়ে না। কেন শুনব তাহলে?”
তুহিন উত্তেজিত হলো। বলতে লাগলো একনাগারে,
“পৌষ! পা’গল তুমি। সম্পর্কে দেখো, আমার বোন হও তুমি। বোন মায়ের মতো হয়। আমার ভাবী হও তুমি। ভাবী তো মায়ের মতো হয়। দেখো দুই দিক থেকে তুমি আমার মায়ের মতো হও। আমাকে আদর থেকে বঞ্চিত করো না পৌষ।”
“ফুপাতো বোন হই আমি। আর রইলো ভাবী! ভাবী কোনদিন মা হয় না। উল্টাপাল্টা কথা বলবেন না।”
“আমি নাহয় উল্টাপাল্টাই বললাম। তুমি মেনে নাও। পৌষ, আমাকে একা করে দিও না।”
পৌষ নড়লো তবুও তুহিন সরলো না৷ মাথাটা বালিশে দিয়ে রেখেছে। গুনগুন করে মাফ চাইছে। পৌষ দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তুহিন আবদার ধরলো,
“মাথায় হাত বুলিয়ে দাও।”
“না।”
কঠিন স্বরে না বললো পৌষ। তৌসিফ ওদের মাঝে আর ঢুকলো না বরং মিনুকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলো। গড়গড় করে সবটা বললো মিনু। তৌসিফ অবাক হলো। তার পৌষকে কেউ এতকথা শুনালো অথচ সেটা তৌসিফ জানে না।
পৌষ তুহিনকে ঢেলে বললো,

“উঠুন। খিচুড়ি খাবেন।”
“খাব না।”
“ঢং দেখতে চাইছি না।”
“আগে বলো রাগ কমেছে?”
“উঠুন বলছি।”
তুহিন উঠলো। চোখ মুখের করুণ অবস্থা। কি হয়েছে সাহস করে আর জিজ্ঞেস করলো না পৌষ অথচ মনে মনে তুহিন চাইছে পৌষকে বলতে। বলতে চাইছে কিভাবে পলক তাকে ধোঁকা দিয়েছে। কিভাবে তার সন্তানদের মে’রেছে। কথাগুলো আর বলা হলো না। বুকে চেপে রাখলো তুহিন।
ঘুরেফিরে সেই একই অবস্থা হলো আবার। পৌষ হতাশ হলো৷ তুহিনকে নিয়ে উঠে টেবিলে গেলো। তৌসিফ দেখলো তবে আগ বাড়িয়ে কিছু বললো না আপাতত। খিচুড়ি দেখে তুহিনের কথাবার্তা শুরু হলো রীতিমতো। পৌষ বেড়ে দিতেই ছোট্ট এক বাচ্চার মতো আবদার শোনা গেলো,
“খায়িয়ে দিবে?”
“না।”

“মেঝ ভাইয়া? তুমি দাও। হাত দিয়ে খেতে মন চাইছে না।”
তৌসিফ কথা বাড়ালো না। উঠে এসে ছোট ভাইকে মুখে তুলে খাওয়ালো। সন্দিহান চোখে তাকিয়ে রইলো তুহিনের দিকে। পরপর রাগারাগি করলো,
“মুখের এমন দশা কেন তুহিন? তুই কেঁদেছিস কিন্তু কেন?”
“তোমার বউ কথা বলছিলো না।”
“এজন্য নিশ্চিত কাঁদিস নি।”
তুহিন হাসছে। তৌসিফ ওকে খায়িয়ে সাথে করে অফিসে নিলো। পৌষের মনটা খারাপ লাগছে তখনও। তুহিনটাকে দেখলেই এখন মায়া লাগে। তৌসিফ এতক্ষণ অনেক বকাঝকা করেছে ওকে। নিজের যত্ন না নিয়ে সুন্দর মুখটা এলোমেলো করে রেখেছে তুহিন। পৌষও খেয়াল করেছে সেটা। উদাস মুখে পৌষ বসে রইলো সেখানে। বুক চিরে বেড়িয়ে এলো দীর্ঘশ্বাস।

অফিস থেকে আগে আগে বেরিয়ে এলো তুহিন। দুই ভাইয়ের সাথে অনেকক্ষণ কথাবার্তা হয়েছে। কথা বলে গ্যারেজে গিয়ে দড়ি নিয়ে নিজের ফ্ল্যাটের উদ্দেশ্যে ঢুকেছে তুহিন। তাকে খুব স্বাভাবিক দেখালো। পলক অন্য রুমে ছিলো। তুহিন দড়িটা খাটে রেখে ঠান্ডা মাথায় ড্রয়িং রুম থেকে চেয়ার তুলে নিলো। দুটো দৃশ্যই দেখেছে কলি। কেন জানি ওর কাছে তুহিনকে দেখে খটকা লাগলো। পলক বলেছিলো তুহিন আসলে ওকে ডাকতে। কলি তাই করলো। পলক উঠে আসতে আসতে তুহিন দরজা আটকেছে। পলক ডাকলো কয়েকবার কিন্তু ওপাশ থেকে সাড়াশব্দ পাওয়া যায় নি। পলক টেবিলে গিয়ে বসে। ওখানেই তুহিনের ফোনটা রাখা। পলক তখন-ই নিজের ফোনটা হাতে নেয়।

সাইলেন্ট ছিলো এতক্ষণ। হাতে নিতেই দেখলো তুহিনের নাম্বার থেকে ম্যাসেজ। কপালের ভাজ বাড়লো ওর। এমনিতেই শরীর খারাপ যাচ্ছে তার উপর মানুষিক অবস্থা আজকাল খারাপ। পলক না চাইলেও কেন জানি খারাপই করে ফেলে। ওর ভালো লাগে না কারো সুখ। কেন জানি ওর মনে হয় ও সুখ পাচ্ছে না ঠিকঠাক। এটা মনে হলেই ও অন্যের সুখ নষ্ট করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। এটা তো আজ নতুন না। ছোট থেকেই তো এমন পলক। আগে তো সমস্যা হতো না। এখন কেন এত সমস্যা হচ্ছে?
ম্যাসেজ ওপেন করলো পলক। ইটালিয়ান অক্ষরে বাঁকা বাঁকা লিখা, “I can’t hate you that’s why I always love you and I hate myself for that. I hate this phase of my life. May you live and may I flee.”
পলকের হাত কেঁপে উঠলো। কলির বলা দড়ি আর চেয়ারের কথা মনে পড়লো। পলক যেন পা’গল হয়ে উঠলো।
“তুহিন! তুহিন দরজা খোলো!”
আতঙ্কিত কণ্ঠে ডাকলো পলক। ওপাশ থেকে সাড়াশব্দ আসলো না। আসার কথাও না। বলা হয়, মানুষ যখন নিজেকে শেষ করতে চায় তখন শয়তান তার ঘাড়ে ভর করে। ইবলিশ ঐ পর্যন্ত থাকে যতক্ষণ না ফাঁ’সের দঁড়ি এমন ভাবে চেপে ধরে যেন মুক্তি নেই। আত্মা তখন তড়পায়, রুহ বেরিয়ে আসতে চায়। ইবলিশ তখন ঐ মানুষকে ত্যাগ করে। ঐ চরম মূহুর্তে মস্তিষ্ক জাগ্রত হয়। ধ্যান হয়, ভুল ছিলো সিদ্ধান্ত। তখন বেঁচে ওঠার তীব্র আকাঙ্খা দেখা যায় কিন্তু চাইলেই কি আর বেঁচে থাকা যায়?

তুহিনের ঘাড়ে সেই ইবলিশ চেপেছে। ভেতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা বিরাজমান। শূন্যতা ঘিরেছে তাকে চারপাশ থেকে সেই সাথে মিশে একাকার লজ্জা। এই লজ্জাটা নিজের প্রতি। নিজের অশান্ত সেই আত্মার প্রতি যে একবার ভালোবেসে ঘৃণা করতে পারে না। তৌসিফ এদিক থেকে এগিয়ে। সে ভালোবেসেছিলো। প্রতারণা পেয়ে ওখান থেকে সরে এসেছিলো। তুহিনের এখনও মনে পড়ে, সে একদিন তৌসিফকে জিজ্ঞেস করেছিলো, পৌষকে পিয়াসীর থেকেও অধিক ভালোবাসে কি না তৌসিফ। উত্তর ছিলো ঋণাত্মক। তুহিন সেদিন না বুঝলেও তৌসিফের কথার গভীরতা বুঝেছে দেড়ীতে। তৌসিফ তার জীবনের প্রতিটি বাঁক থেকে টেনেহিঁচড়ে ছুঁড়ে ফেলেছে পিয়াসীকে। যার অস্তিত্বই শূন্য তাকে আর কমবেশি কিই বা ভালোবাসবে সে? যার অস্তিত্ব জুড়ে পৌষ তাকেই বা কমবেশি কি ভালোবাসবে তৌসিফ? পুরোটা জুড়েই তো পৌষমাসের বিচরণ। কি সুন্দর, কি চোখজুড়ানো, কি মায়াময় সেই সংসার যা তুহিন রোজ দেখে। তুহিন নিজের প্রতি ঘৃণা অনুভব করলো, কেন সে পলককে ঘৃণা করতে ব্যার্থ। ব্যার্থতার গুহা আজ ভরে উঠেছে তবুও কেন তুহিন বাকরূদ্ধ? তুহিন যেন নিজের উপরই মায়া ত্যাগ করে ফেললো।

দড়িটা শক্ত করে বেঁধে চেয়ারে উঠে দাঁড়ালো। গলায় মালার মতো পড়লো সেই ফাঁদ যা ইবলিশ পেতেছে তার জন্য, কানে কানে ফিসফিস করে বলছে,
“আয় এখানেই মুক্তি। এটাই শান্তি। এই জীবন বৃথা৷ এই প্রেম এক ছলনা। তুই ধ্বংসের দারপ্রান্তে এখন। শেষ করে দে নিজেকে। শেষ কর!”
তুহিন আর কোনদিকে তাকালো না। তাকে তার সর্বকালের বন্ধু যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে৷ মুক্তির পথ দেখাচ্ছে। এই তো পা দিয়ে লাথি দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দেওয়া বাকি শুধু। এই তো আর একটু পথ। আর মাত্র একটু।
পলক ডেকে গলা বসিয়ে ফেললো। লাভ হলো না তাতে। অপারগ হয়ে দৌড়ে গেলো তৌসিফের ফ্ল্যাটে। তৌসিফ তখন অফিস থেকে উপরে উঠেছে মাত্র। পৌষের কাঁধ মালিশ করছে সোফায় বসে। পৌষ খুব অশান্ত আজ। কি হয়েছে মেয়েটার? পলক পথহারা এক পা’গল তখন। তৌসিফের উপর হামলে পড়েছে সে। হতভম্ব উভয়। পৌষ পেট চেপে উঠে দাঁড়ালো। ওর মন কু ডাকছে। পলক হরবড়ালো,

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯২

“মেঝ ভাইয়া! তু…তুহিন ফাঁ’সি দিচ্ছে। ও কিভাবে ফাঁ’সি দিবে মেঝ ভাইয়া? আমাদের ঘরে তো দড়ি নেই।”
তৌসিফ স্তব্ধ হয়ে গেলো। পৌষ তাকালো না কোনদিনে। এক হাতে পেট চেপে দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেলো। শরীরের অস্থিরতা ওকে দূর্বল করে দিচ্ছে ক্রমশ। পৌষের আগেই ওকে টপকে তৌসিফ দৌড়ে উঠে গেলো। তার আদরের ছোট ভাই তুহিন। খুব আদরের। পৌষ সিঁড়ি দিয়ে খুব কষ্টে নড়েচড়ে দৌড়ে যাচ্ছে। মনে আশঙ্কা যেন একটাই, তুহিনটা তার জন্য অপেক্ষা করবে তো?

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৩