Home প্রেমসুধা সিজন ২ প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৩ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৩ (২)

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৩ (২)
সাইয়্যারা খান

পৌষের অদ্ভুতুরে কান্নায় চারপাশ ভার হয়ে এসেছে। ওর কানে এখনও বাজছে, ‘বাদ ফজর তুহিনের জানাজা’। শ্রেয়া আর হেমন্ত কখন এসেছে পৌষ জানে না৷ ও দেখলো ওর হেমু ভাই ওর হাত দুটো ধরেছে। নরম স্বরে ভীষণ উদ্বিগ্নতার সহিত ওকে কিছু বলছে, পৌষ তা শুনতে পাচ্ছে না। ওর ঘুম ছুটে নি। মস্তিষ্ক জাগ্রত হয় নি। শ্রেয়া ওকে পাশ থেকে চেপে ধরলো। পৌষের এহেন বেদশায় বাচ্চাদের না সমস্যা হয়ে যায়। গতকালও ফোনে কথা হলো, জানালো শরীর ভালো লাগছে না। শ্রেয়া তো আজ এমনিতেই আসতো দেখতে কিন্তু ভাগ্যের টান এই ভোর রাতে ওদের টেনে এনেছে এখানে। আসার পর জ্ঞানহীন পৌষকে পেয়েছিলো ও। হেমন্ত ডাক্তারকে কল করেছে। তিনি রাস্তায় আছেন, আসছেন হয়তো। এদিকে তৌসিফের খবর নেই। ওখানকার পরিস্থিতি এখনও সঠিক জানে না ওরা। হেমন্ত ডাক্তার বিদায় করে হাসপাতালে যাবে। ওখান থেকে তিশা আর তাহিয়া ভাইয়ের কাছে চলে গিয়েছে। অবস্থা কতটা কি তারা কেউ জানে না। শ্রেয়া হাতের পানিটা পৌষকে খাওয়াতে চাইলো। খুব দরদ মিশিয়ে বললো,

“পৌষ, বোন আমার একটু পানিটা মুখে দাও। তুমি এমন করো না পৌষ। শরীর খারাপ করবে।”
পৌষ বোধহয় শুনলো না। পানি মুখে দিতে পারলো না ও। হেমন্ত হাত দুটো আরেকটু শক্ত করে ধরলো। পৌষের মাথায় হাত রেখে ডাকলো করুন স্বরে,
“পৌষ? পৌষ তাকা ভাইয়ের দিকে। তাকা বলছি। পৌষ!”
হুঁশে এলো পৌষ। হেমন্তকে দেখলো ঘোলা চোখে। এতক্ষণে যেন আঁকড়ে ধরার কাউকে পেলো তবে ভাইয়ের বুকে পড়ে কাঁদার অধিকার যে পৌষের নেই৷ ওর ভেতর ফাটা চৌচির হলেও হেমু ভাইয়ের বুকে মাথা পাতার ক্ষমতা পৌষের নেই। হেমন্ত বোনের দশা দেখে নিজেই দূর্বল হলো ক্ষণে ক্ষণে। কোনমতে সে বললো,
“আমার বাচ্চা কাঁদতে পারে?”

“হেমু ভাই, হেমু ভাই.. তুহিন ভাইয়া। তুহিন ভাইয়া নেই৷ আমার কাছে এসেছিলো। আমি ওনাকে দূরে সরিয়ে দিয়েছি। আমি ভয় পেয়েছি হেমু ভাই, আমি ভয় পেয়েছি৷ আম..আমি ওনার ঝুলন্ত পা দেখেছি। উনি… ওনার নাকি আমাকে মা লাগে। আমি কিভাবে মা হব হেমু ভাই? আমি ওনার মা হব কিভাবে? আমি তো আজ পর্যন্ত তোমার বাচ্চাই হতে পারলাম না, আমি পৌষ কিভাবে ওনার মা হব? উনি আমার কাছে আসলো, আমার হাতে খেতে চাইলো। আমি দেই নি৷ মাথায় হাত দেই নি৷ খায়িয়ে দেই নি৷ কেন দিলাম না? আমি কেন দিলাম না হেমু ভাই? আমি স্বার্থপর! কতবড় স্বার্থপর আমি, আমার নাম বদনাম হবে বলে ওনাকে খায়িয়ে দেই নি৷ আমার নাম বদনাম হবে বলে ওনাকে দূরে সরিয়ে দেই অথচ আমি জানতাম, আমার মন জানতো উনি সবসময় একটা বাচ্চার মতো আদর চাইতো। আমি কিভাবে দিব সেই আদর? আমি তো চরম স্বার্থপর হয়ে গেলাম৷”

পৌষ কথা বলতে বলতে বাঁধ ভাঙা কান্নায় ভেঙে পড়লো। এবারে গলা দিয়ে ফ্যাসফ্যাসে শব্দ এলো। হেমন্ত শ্রেয়াকে চোখের ইশারা দিতেই শ্রেয়া পৌষকে বুকে জড়িয়ে নিলো। স্বার্থপর বুঝি পৌষ একা? ছোট বেলার বদনাম হওয়ার ভয়ে সেই যে হেমন্ত তার পৌষটাকে পিঠে, বুকে নেওয়া বাদ দিলো তা তো আজও বহাল। স্বার্থপর তো হেমন্ত নিজেও। আজও আতঙ্কিত হয়ে যায় কিন্তু পৌষকে বুকে জড়াতে পারে না৷ মানুষের মুখের কথাকে আমরা কতই না ভয় পাই অথচ সেই মানুষটা তার কথার আঘাতে আমাদের জর্জরিত করে দেয়। ভেঙে টুকটো টুকরো করে দেয় আমাদের। তাদের নোংরা অপবাদ আমাদের চোখের দরিয়া ভরে পানি উপচে ফেলে অথচ আমরা তাদের মুখের বাক্যকেই প্রাধান্য দেই৷ তাদের কথাকে এতটা আঁকড়ে ধরি নিজের মাঝে যে ভুলে যাই, আমরা এই পৃথিবীর বুকে আসা স্বল্প সময়ের মেহমান। এতটুকু সময়ে বেঁচে থাকাটাই তো লড়াই সেখানে কারো কথা শুনে নিজেকে দোষী করার সময়টাই বা কোথায়? হেমন্ত ঢোক গিললো। পৌষের কান্না আরো বাড়লো,
“ও হেমু ভাই, তুহিন ভাইয়া কিভাবে পাড়লো ঝুলে থাকতে? আমি তো বুঝি নি হেমু ভাই। বুঝলে আমি ছাড়তাম না৷ যেতে দিতাম না। ওনাকে চারজন লাগলো উঠাতে। উনি তো আমার এখান থেকে হেঁটে গেলো, কিভাবে পারলো? কিভাবে পারলো? হেমু ভাই, আমার দম আটকে আসছে। উনি আমাকে এত কেন জ্বালাতো? আমি ম’রে যাব৷ আমার বুক ফেটে যাচ্ছে হেমু ভাই। আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।”

হেমন্তের টলমলে চোখ, শ্রেয়া কেঁদে ফেলেছে। ও দেখতে পারছে না পৌষের কান্না। মেয়েটা পেটের তলে হাত রেখে কাঁদছে। হেমন্ত উঠে চলে গেলো সেখান থেকে। ওর সাহস নেই পৌষের সামনে কাঁদার।
ধীর পায়ে নিজের রুমে ঢুকেছে তৌসিফ। জীবনে তৌসিফ তালুকদার এতটা ভঙ্গুর কবে হয়েছিলো? নাকি হয়ই নি? তাকে এতটা নিগূঢ় ভাবে কেউ ভাঙতে পারে নি। বাবার মৃত্যু, মায়ের মৃত্যু, হাজার অভিযোগ, শতশত মানুষের থেকে তিরস্কার, রাজনৈতিক তলায় পিষে যাওয়া অতঃপর গা ঝাড়া দিয়ে পুণরায় দাঁড়ানো। কার ক্ষমতা এত তৌসিফকে এভাবে, এত যত্ন নিয়ে মুচড়ে দিবে কাগজের ন্যায়? কার সাহস এত? কারো নেই। উপরওয়ালা তাকে কষ্ট দিয়েছে, সহ্য ক্ষমতা দিয়েছে নাহয় তৌসিফকে এতদিনে চিরে কুরে খেয়ে নিতো সকলে। তৌসিফ টিকে আছে নিজ জোরে। তবে আজ সে টিকে নেই। একদম টিকে নেই। সে খণ্ডে খণ্ডে খণ্ডিত। তাকে এভাবে চূর্ণবিচূর্ণ করেছে তার রক্তের ভাই তুহিন। তার ঐ ছোট ভাই তুহিন যাকে কিছু ঘন্টা আগেই কাঁধে ফেলে হসপিটালে নিয়েছিলো ও। যার গলার বিশ্রী দেখতে দাগ পড়েছিলো। তৌসিফ তো ভাইয়ের ঐ ফ্যাকাসে মুখটাই ভুলতে পারছে না। ঐ মুখটা ভুলবার নয়। তৌসিফ তো অন্ততপক্ষে মৃত্যু অব্দি ভুলবে না। তার ভেতর ফেটে বারুদ বেরিয়ে আসতে চাইছে। বুকের জ্বালায় তৌসিফ অতিষ্ঠ হয়ে বাড়ী ফিরে এসেছে। দরজা পর্যন্ত কোনমতে আসলেও তার পা দুটো অচেনা, সম্পূর্ণ অজানা এক কণ্ঠে আটকে গিয়েছে মেঝেতে। কেমন অদ্ভুত শব্দ। এই শব্দ তৌসিফ শুনে নি আগে। শোনার কথাও না। এই শব্দের মালিক বোধহয় নিজেও এই শব্দ করে নি আগে। নাকি করেছিলো? তৌসিফ জানে না। কান থেকে কলিজা পুরোটা জ্বালিয়ে কয়লা করার ক্ষমতা আছে এই কান্নার শব্দের। তৌসিফ বোধহয় ভয় পেলো। ও খুব ধীরে দুই কদম বাড়ালো অতঃপর কিছু মনে করে দ্রুত নিজ কামরায় ঢুকে পড়লো।

কে কাঁদছে? তার পৌষরাত। তৌসিফ ঘাবড়ে গেলো পৌষের কান্নায়। গা হীম করানো এক কান্না তৌসিফের বুক ভেদ করে ফেললো। হৃদপিণ্ড ধ্বংস করে ভীষণ তাড়া সেই কান্নার। মিনু আর শ্রেয়া বসা ওর কাছে। পৌষকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। পেট চেপে হাউমাউ করে কাঁদছে সে। কান্নার মাঝে তুহিনকে ডাকছে। তৌসিফের চোখ দুটো দিয়ে টুপটাপ পানি পড়তে লাগলো। আজ, এখন যদি তুহিন থাকতো এখানে তবে কি হতো? পৌষের এ কান্নায় তুহিন পা’গল হয়ে যেতো অথবা ভীষণ খুশিতে পৌষের আঁচল আজীবনের জন্য মুঠোয় পুড়ে রাখতো। পৌষকে শ্রেয়া ধরে নানান ভাবে কান্না থামানোর চেষ্টা করছে। বাচ্চাদের দোহাই দিচ্ছে। পৌষ মানছে না। বাঁধভাঙা কান্নায় মেয়েটা ডুবে যাচ্ছে। অঝোর ঢেউ তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তৌসিফ টিকতে পারলো না। পালাতে চাইলো এখান থেকে। কিন্তু কিভাবে পালাবে? পালিয়ে কোথায় যাবে? তার পৌষরাত, তার সন্তানদের ফেলে এই ভেঙে যাওয়া তৌসিফের ঠাই কোথায়? এই জগতে তো নেই। কোথাও ঠাই নেই। তৌসিফ কদম ফেলে এগিয়ে এলো। শ্রেয়া আর মিনু ওকে দেখা মাত্র ছেড়ে দিলো পৌষকে। পৌষ পা’গলের মতো উঠতে চাইলো। ও যাবে তুহিনের কাছে। দেখা বাকি। কত আবদার জমে আছে, তা পূরণ করা বাকি। অহেতুক কিছু ঝগড়া করা বাকি। তৌসিফ পৌষকে উঠতে দিলো না। দুই হাতে জড়িয়ে ধরলো নিজের সাথে। নিজের বুকের মাঝে। পৌষ গলা চিরে কাঁদলো, হাউমাউ করে কাঁদছে সে। মুখটা নিজের বুকে চেপে ধরলো তৌসিফ। পৌষ কেন কাঁদছে? মেয়েটা তো কাঁদতে পারে না। তৌসিফ ওকে কান্না করতে দেখে নি। গুলি খাওয়ার পর বোধহয় কেঁদেছিলো? তৌসিফ মুখ ফুটে বলতে চাইলো,

“তুমি কেঁদো না পৌষরাত। আমার সহ্য হচ্ছে না। এই শব্দ তোমার কণ্ঠে একদম অচেনা। আমি চিনতে চাইছি না।”
পৌষ তৌসিফের বুকের কাছের কাপড় খামচে ধরলো। মুখটা তুলে তীব্র বেদনা নিয়ে বলতে লাগলো,
“আমাকে নিয়ে চলুন। নিয়ে চলুন আমাকে। আমি বোধহয় ম’রে যাব। আমার কেমন লাগছে। আমি তুহিন ভাইয়ার কাছে যাব।”
“প..পৌষ..পৌষরাত।”
পৌষের পা’গলামো খুব বাড়লো। খুব বাড়লো। এতটাই বাড়লো যে তৌসিফ ওকে সামলাতে পারলো না। কিছুতেই সামলাতে পারলো না। দ্বিতীয় বারের মতো জ্ঞান হারানোর আগে পৌষ শুধু একটা বাক্যই শুনলো,
“তুমি আর কেঁদো না পৌষরাত। তুহিন তাহলে খুব রাগ করবে।”

স্থানঃ ধানমন্ডির ল্যাবএইড হসপিটাল।
সময়ঃ রাত ৩ টা ৪০ মিনিট।
তৌসিফ যখন পুরোপুরি ভেঙে পড়লো, যখন দেখলো আশার আলো আর নেই তখনই তাহিয়া আর তিশাকে দৌড়ে আসতে দেখা গেলো। পরপর তিনবার ইলেকট্রিক্যাল শক তুহিনকে জাগ্রত করতে পারে নি৷ ডাক্তাররা হাল ছাড়ে নি। দুই বোনের কান্না করিডোরটাকে আরো ভারী করে তুললো। পলক যে কখন এসেছে কেউ জানে না। মেয়েটাকে পা’গলের মতো দেখাচ্ছে। কখনো কাঁদছে, কখনওবা অবাক দৃষ্টিতে দরজার গোল কাচটা দিয়ে ভেতরে দেখছে। পলক ভীষণ অবাক হয়ে দেখছে সবকিছু। আজ পর্যন্ত কতকিছু হলো। তার আর তুহিনের ভালোবাসা হলো। পলক তো সারাটা জীবনই এমন করে গেলো। সবচাইতে বড় ধাক্কা তো পিয়াসীকে ভাগিয়ে দিয়ে পর পর ক্যাশ আর স্বর্ন দিয়ে দিয়েছিলো। তখনও তো তুহিন তাকে তেমন কিছু বলে নি৷ হ্যাঁ, তুহিন বাজেভাবে নেশায় জড়িয়ে গিয়েছিলো। পলক তো তখনও থেমে ছিলো না৷ কতকিছুই তো করেছিলো সে। তার ভালো লাগেনা কাউকে ভালো দেখতে। ভেতরে কেমন এক পিশাচ জেগে ওঠে৷ পলক তো আগেও কত করেছে। কই? তুহিন তো এমন করে নি কোনদিন। বাচ্চা তো আগেও চেয়েছিলো। পলক দেয় নি। বাচ্চা হলে তুহিন যদি তাকে কম ভালোবাসে? আচ্ছা, তুহিন ম’রে যেতে চাইলো কেন? পলক তো ওর মৃত্যু কল্পনা করতে গিয়েও নিজে মরে যাচ্ছে। পলক সরলো ওখান থেকে পরপর আবারও কাঁদতে লাগলো৷ ওর কি সমস্যা ও নিজেই বুঝতে পারছে না৷ পলক মৃত্যু ভয় পায় তাই তো এই মূহুর্তে নিজেকে শেষ করতে পারছে না নাহয় এই অন্তর জ্বালানো কষ্টে সে এতক্ষণে মরে যেতো।

আদিত্য বাবার হাত শক্ত করে ধরে আছে। ছেলেটা নিজেও ভয়ে তটস্থ। তৌসিফ দুই বোনকে সামলানোর মতো অবস্থায় নেই। চোখের পানি ওর গাল ভিজিয়ে দাড়ি চপচপে করে ফেলেছে। দরজাটায় আবারও গিয়ে দাঁড়ালো তৌসিফ। বিরবির করলো একমনে,
“আল্লাহ, আল্লাহ তুমি তো সব পারো মাবুদ। আমি ঐ নিসাড় হয়ে পড়ে থাকা ছেলেটার মেঝ ভাই হই। ইয়া আল্লাহ, আমার ছোট ভাই অবুঝ, ও বুঝে নি। ও বুঝে নি আত্মহ’ত্যা মহাপাপ। ও পাপ করেছে মালিক, তুমি মহান৷ তুমি ক্ষমার দৃষ্টান্ত মালিক। তুমি আমার ছোট ভাইকে মাফ করে দাও। আল্লাহ, ওকে আমার বুকে ফিরিয়ে দাও। আমি ওকে আমার কাছে যত্ন করে রেখে দিব। আমার মুখের দোয়া কবুল করো মালিক। আমি তৌসিফ কথা দিচ্ছি তোমাকে, আমার এই মুখে আর কোনদিন কোন হারাম তুলব না। আল্লাহ, তুমি দয়া করো। আমাকে জীবিত অবস্থায় মে’রে ফেলো না।”
তৌসিফ নাক টানলো। ছুটে গেলো বাথরুমে। করিডোরে কিবলা মুখী হয়ে উপস্বরে ইকামত দিয়ে দাঁড়িয়ে গেলো সে। পরপর পেছন থেকে আরো চারটা পুরুষ কণ্ঠে শোনা গেলো,
“আল্লাহু আকবর।”

দুইজন ভেঙে যাওয়া ভাই, ভাতিজা আর দুইজন অতি বিশ্বস্ত ভাইসম কর্মী তখন একজনের জানের ভিক্ষা চাইতে দাঁড়িয়ে গেলো তাহাজ্জুদে। দুই রাকাত, চার সিজদাহ্। প্রথম সিজদাহ্য় তৌসিফের বুক ভাঙা আর্তনাদ, তার তরতাজা দেহের কম্পন কাঁপিয়ে তুললো সকলকে। তারা দুই ভাই ভিখারির মতো কেঁদে ফেললো সিজদাহ্য় অতঃপর একবার জিজ্ঞেস করা হলো, “সিজদাহ্ এর ক্ষমতা কতটুকু?” উত্তর দেওয়ার বোধহয় প্রয়োজন পড়লো না। বান্দা তার রবের সর্বোচ্চ নিকটে তখন, যেই আল্লাহ বান্দার কপাল জমিনে পড়তে দেয় না, সিজদাহ্টুকু যেই আল্লাহ তার কুদরতি পায়ে তুলে নেয় সেই রবের বান্দারা বোধহয় কোনদিন নিরাশ হয় না। নিরাশা মুমিনের জন্য নয়। মুমিন ধৈর্য ধরবে। জানবে, এতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি। দুই ভাই আর বসে থাকা দুই বোনের অসহায় ডাক, এই তাহাজ্জুদে ফেরানো হলো না হয়তো। ষষ্ঠ ইলেক্ট্রিক্যাল শকে হৃদপিণ্ডে র’ক্ত চলাচল শুরু হলো। টুট টুট শব্দ করতে লাগলো মেশিনটা।

ডাক্তারের চোখে তখন পানি৷ তিনি মূহুর্তে সিজদাহ্ দিলেন৷ তুহিন, তুহিন বাঁচার তো কথা ছিলো না। তাকে এক প্রকার মৃত আনা হয়েছিলো এখানে। ডাক্তাররা আশা হারান নি। তারা চেষ্টা করছেন তবে জীবনের মালিক তিনি যিনি এই জীবন দান করেছেন। রবের দান করা জীবনের ক্ষতি করার অধিকার বান্দাকে কোনদিন দেওয়া হয় নি।
মোনাজাত শেষ করার আগ মূহুর্তেই তাদের কানে এলো, “তুহিনের শ্বাস চলছে”। যেই মোনাজাতে এতক্ষণ ভাইয়ের জীবন ভিক্ষা চাইছিলো, সেই একই বৈঠকে, একই মোনাজাতে তারা শুকরিয়া আদায় করলো। বাকিরা উঠলেও উঠলো না তুরাগ আর তুহিন৷ দুই ভাই একত্রে শুকরানা নামাজ আদায় করলো। তৌসিফ জানে না কেন ওর ভেতর ফেটে তখনও কান্না আসছে। হারিয়ে ফিরে পাওয়ার যে যন্ত্রণা তা বোধহয় সে সইতে পারছে না।

মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে আপাতত গলায় ড্রেসিং করা হয়েছে। তুহিনের শরীর স্টেবল হতে সময় নিচ্ছে। দরজার বাইরে ঠাই দাঁড়িয়ে রইলো সকলে। সবার ভীষণ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে তুহিনের খিঁচুনি কমলো, শ্বাস প্রশ্বাস সচল হলেও মাঝেমধ্যে নিঃশ্বাস ফেলতে তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। কৃত্রিম সহায়তা পাওয়ার দরুন সহজ হচ্ছে একটু। ডাক্তার অনুমতি দিলেন ভেতরে আসার৷ জ্ঞান ফেরনি তখনও। তুরাগ আর তৌসিফ ভেতরে ঢুকলো। তুহিনের নিথর দেহটা দেখে দুই ভাইয়ের চোখ দুটো লাল হয়ে এলো। তৌসিফ ক্ষীণ স্বরে ডাকলো,
“তুহিন।”
উত্তর আসে না ডাকের। লুকোচুরি খেলছে তার তুহিন? আর কত দীর্ঘ হবে এই অপেক্ষার প্রহর। তুরাগ তৌসিফকে বুকে জড়ালো। পিঠে শক্ত করে ধরে ভরসা দিলো,
“শান্ত হ। তৌসিফ, কথা শোন আমার৷ তোর কি খুব খারাপ লাগছে।”
“ঢ..ঢোক গিলতে পারছি না।”

তুরাগ দেখলো হা করে শ্বাস টানছে তৌসিফ। মানুষিক ধাক্কাটা খুব জোড়ালো তার। তুহিনের মুখটা বিকট ভাবে ফুলে উঠেছে। চোখ দুটো বেরিয়ে আসতে চাইছে। এত ফুলে ওঠা মুখ কোনদিন দেখে নি কেউ। এটা তুহিন, যার জান মাত্রই উপরওয়ালা ভিক্ষা দিয়েছেন তাদের দুই ভাই, তিন বোনকে। তুরাগ তৌসিফকে ওখান থেকে নিতে চাইলো কিন্তু পারলো না৷ তৌসিফ ভাইকে ছুঁয়ে নিশ্চিত হলো আগে। মাথাটায় হাত বুলিয়ে আস্তে করে বললো,
“মেঝ ভাইয়া এই কঠিন দুনিয়ায় তোকে আর একা ছাড়বে না তুহিন।”
দরজার বাইরে ইশারায় ডাকা হয় তুরাগকে। রনির চিন্তিত মুখ দেখে তুরাগ বেরিয়ে আসে। তখনই জানতে পারে, পৌষের অবস্থা খারাপ। হেমন্ত ফোন করেছে। তুরাগ তৌসিফকে আস্তে করে জানালো বিষয়টা। তৌসিফের কাছে এসে পিঠে হাত রেখে বললো,

“তৌসিফ, বাড়ী যা এবার। আমি আছি।”
“ওকে এভাবে রেখে চলে যাব?”
“মীরা যাবে সাথে। যা বাসায়।”
“উঁহু।”
সত্যি বলতে এবারে বাধ্য হলো তুরাগ,
“পৌষের অবস্থা ভালো না। হেমন্ত ফোন করেছে। ডাক্তার যাচ্ছে। তুই যা৷ আমি আছি। বাকি সবাই আছে।”
তৌসিফের হঠাৎ মনে পড়লো পৌষের কথা। আসার আগে অসহায় দৃষ্টিতে একবার ভীষণ অনিশ্চয়তা নিয়ে পৌষের চোখে চোখ রেখেছিলো সে। মেয়েটা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো। তার পৌষ, তার সন্তানেরা। তৌসিফ তুহিনের দিকে এক পলক তাকিয়ে রওনা হলো বাড়ীর পথে।
বর্তমানে,
তৌসিফের কোলের উপর মাথা দিয়ে পড়ে আছে পৌষ। ডাক্তার চেক করছেন ওকে। তৌসিফের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে জানালেন,
“প্রেশার তো হাই তৌসিফ।”

তৌসিফ পৌষের কপালে হাত রাখলো। ডাক্তার ঘটনা জানেন। ঠোঁট চেপে রাখলেন। তৌসিফ কথা বলতে পারলো না। ভীষণ অশান্তি লাগছে তার। তাকে সামলাতে পৌষ প্রয়োজন যে আপাতত তৌসিফেরই কোলে জ্ঞানহারা।
“চাইলেই বেশি ডোজের কিছু দেওয়া যাবে না তৌসিফ। আমি এই মূহুর্তে স্বান্তনা বাদে কিছু দিতে পারছি না৷ ইনজেকশন দিয়েছি। তুমি চিন্তা করো না। ওকে প্রেশার নিতে দিও না। তুহিনকে দেখতে চাইছে, নিয়ে যাও। দেখলে শান্তি পাবে। আটকে রেখো না। জোর করো না কিন্তু খাওয়াবে ওকে আর হ্যাঁ, দীর্ঘদিনের পরিচয় আমাদের তৌসিফ। তোমাদের ডায়াগনস্টিকের অনেক বছর পুরাতন ডক্টর আমি। সেই পরিচয় থেকে বলছি, তুহিন সুস্থ হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। তুমি নিজে কিছু খাওয়া দাওয়া করো। মন চাইবে না তবুও করো। তোমার চেহারা দেখে সুবিধার লাগছে না আমার।”

“আমি.. আমি ঢোক গিলতে পারছি না৷”
ডক্টর কিছু বলার আগেই পৌষ নড়লো। পরপর দূর্বলভাবে চোখ মেললো। প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না এখনও। হয়তো বুঝতে পারছে না। ডক্টর ওকে ডাকলেন,
“পৌষ? পৌষ তাকাও তো এদিকে।”
পৌষ তাকালো। তাকে দেখেই প্রথম প্রশ্ন করলো,
“তুহিন ভাইয়া কি এখানে?”
“আমরা তোমাদের বেডরুমে পৌষ, এটা হসপিটাল না।”
পৌষ তড়িঘড়ি করে উঠতে চায় কিন্তু পেট নিয়ে ওঠা কষ্টকর তার নিকট। তৌসিফের সাহায্যে উঠে বসতেই মনে পড়লো তৌসিফের কথা। অবাক হয়ে তাকালো ওর দিকে। তৌসিফের মুখটা দেখে ওর বুক হাহাকার করে উঠলো। তৌসিফ ওর দৃষ্টি বুঝলো। নিজের বুকে জড়িয়ে নিয়ে ক্ষুদ্র শ্বাস ফেলে বললো,

“আছে। বেঁচে আছে।”
“আপনি…”
“আমি ওখান থেকেই এলাম পৌষরাত।”
“আমি যাব।”
“হ্যাঁ, যাবে।”
“পানি।”

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৩

শ্রেয়া পানি এগিয়ে দিলো। পৌষ তৌসিফের গালে হাত রাখলো। ফ্যাচফ্যাচে কণ্ঠে শুধালো,
“কষ্ট হচ্ছে? ভাইয়ার কাছে যাব৷ মুখটা এমন কেন দেখাচ্ছে? পানি নিন।”
তৌসিফকে খুব যত্ন করে পানি খাওয়ালো পৌষ। তৌসিফ ঢোক গিললো। কে বলবে, কিছুক্ষণ আগেই নিজে দমবন্ধ হয়ে যাওয়া পৌষরাত এখন তৌসিফকে পানি খাওয়াচ্ছে।

প্রেমসুধা সিজন ২ পর্ব ৯৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here