প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৫৮
Afnan Lara
ঠিক আছে আমি সেই উদ্ভট সাজের অর্নামেন্টস রেডি করছি,তুমি তারপর ভাবো কি এমন করবা যে নওশাদের আম্মু এত সহজে রুপাকে পছন্দ করে ফেলবেন,বিয়েতে মত দিয়ে দেবেন
ওসব নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না,আমি যা করার করবো,হিসেব আছে আমার
শান্ত তাহসিনকে ফোন করে বললো মার্কেট থেকে একটা মেয়েদের ফতুয়া আর জর্জেটের শাড়ী কিনে আনতে সাথে সিলভার অর্নামেন্টস,এসব কালেক্ট করে জলদি আহানাদের বাসায় নিয়ে আসতে,যদি কিনতে সমস্যা হয় তাহলে যেন সে রিপাকে সাথে নিয়ে যায়
ওদিকে রুপা যখন শুনেছে নওশাদের মা ওকে পছন্দ করে না তখন সে আবারও মরাকান্না জুড়ে দিয়েছে
শান্ত নওশাদকে নিয়ে সোফায় বসে বুঝাচ্ছে ও যেন ওর মাকে বুঝায়
আর আহানা তার রুমে রুপাকে বুঝাচ্ছে সাথে আশা ভরসা দিচ্ছে যে সে সব ঠিক করে দেবে
১ঘন্টার মধ্যে তাহসিন সেইসব নিয়ে হাজির যেগুলো শান্ত ওকে কিনে আনতে বলেছিলো
শান্ত ওর থেকে প্যাকেটগুলো নিয়ে আহানার হাতে দিতে দিতে বললো”শর্তের কথা মনে থাকে যেন ম্যাডাম”
জি মনে থাকবে
নওশাদ টিভিতে একটা ফুটবল ম্যাচ দেখছে,কারোর আসার শব্দ পেয়ে সে সিঁড়ির দিকে তাকালো
আহানা সিঁড়ি বেয়ে নিচে আসছে,পরনে পেস্ট কালারের একটি ফতুয়ার উপর কমলা আর কালো রঙের মিশ্রন রঙের একটা জর্জেটোর শাড়ী,চুলগুলো খোঁপা করে রাখা,আর ইয়া বড় ফ্রেমের একটা মোটা চশমা,কেউ দেখে বলবে না যে এটা আহানা
নওশাদ হা করে চেয়ে বললো”শান্ত রে,রেক্সিনা আন্টি আল্ট্রা প্রো ম্যাক্স এসে গেছে,চাহিয়া দেখ”
শান্ত এক গ্লাস পানি নিয়ে খাচ্ছিলো নওশাদের কথা মতন সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে আহানাকে এমন বেশে দেখে পুরুত করে সব পানি ফেলে দিলো সে মুখ থেকে
আহানা একটা ভাব নিয়ে ওদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বললো”শান্ত!!দ্যা হ্যান্ডসাম বয়!!!কাজ কতদূর তোমার??তোমার স্কিন সুন্দর বলে কি আর যত্ন নিবা না??প্রতিদিন আনপাকা টারমারিক দিয়ে মিল্ক খাবা,ভেতর থেকে ফর্সা হইয়া যাবে,তুমি এমনিতেও ফর্সা আরও ফর্সা হয়ে যাবা,লোকে বলবে “শ্বেত রোগী”হাহা!!আই এম জোকিং,নেভার মাইন্ড!
নওশাদ আহানার ডায়ালগ শুনে শান্তর কানে ফিসফিস করে বললো”সব তো বুঝলাম,আনপাকা কি জিনিস আবার সেটা বুঝলাম না”
কাঁচা হলুদরে রেক্সিনা আন্টি আনপাকা টারমারিক বলে
ওহ!হোয়াট!!কি বিচ্ছিরি ভাষা
আমি জানি না আহানা তোর আম্মুর মাথায় কি কি ঢুকায়,শুধু জানি এই সাজ দিয়ে কিছু একটা তুলকালাম লাগাবে সিউর
আহানা কোমড় দুলিয়ে হেঁটে গিয়ে কারে বসলো তারপর জানালা দিয়ে মাথা বের করে বললো”অন্তত ওদের বাসায় তো পৌঁছে দিবেন নাকি?
নাকি এখান থেকে রেক্সিনা আন্টির মত স্কুটি চালিয়ে যেতে হবে আমাকে”
শান্ত টাই ঠিক করে আসতে আসতে বললো”আরে না না,আমার বউকে এত কষ্ট করতে হবে না
আহানা বললো”তার কাজ সারতে ১/২ঘন্টা লাগতে পারে,আর পথে যেন কোনো মার্কেটের সামনে শান্ত কার থামায়
কেন?মার্কেটে কি করবা আবার?
বাহ রে,রেক্সিনা আন্টি হাতে কিছু না কিছু নিয়ে আসে সবসময়,তো আমাকেও তো কিছু নিয়ে যেতে হবে
আরে নওশাদের আম্মু রেক্সিনা আন্টিকে চেনে না
তো?না চিনলে আমার কি,বাট কারো বাসায় গেলে খালি হাতে যদি যাই তাহলে সবাই সব রেখে এই খুঁতটাই ধরবে,আর এটা একটা ব্যাড ম্যানার,বুঝছেন?
ফাইন!তা কি কিনবে?ফ্রুটস?
ডায়মন্ড নেকলেস
কিহহ!
আগে জানতাম মানুষ কারও বাসায় গেলে ফল বা ফুল নিয়ে যায়,ডায়মন্ড নেকলেস নিয়ে যায় সেটা তো জানতাম না
আরে টেনসন নিয়েন না,নেকলেসটা আবার ফেরত এসে আমাদের বাসাই ঢুকবে,জাস্ট কাজটা সারলে চেয়ে নেবো,ইম্প্রেস আগে জরুরি
ওকে,নওশাদের আম্মু ওটা রেখে দিলেও সমস্যা নেই,গিফট তো গিফটই
ঠিক আছে
একটা হালকা পাতলা ডায়মন্ডের নেকলেস কিনলো শান্ত আর আহানা মিলে,তারপর সোজা নওশাদদের বাসায় গেলো
উত্তরার একটা ১৫তলা বিল্ডিংয়ের ৭ম তম তলায় নওশাদের ফ্ল্যাট
কলিংবেল বাজতেছে,নওশাদের আম্মু টিভিতে “সাথ নিভানা সাথিয়া দেখছেন”কলিংবেল বাজতেই বাসার গৃহকর্মী এসে দরজা খুললো
গৃহকর্মী তো আহানাকে দেখে অবাক,এরকম স্টাইলের মানুষকে দেখলে অবাক হওয়ারই কথা
আহানা একটু ভিতরে ঢুকে এদিক ওদিক চেয়ে বললো”মিসেস রাহেলা কোথায়?আই হ্যাভ সাম টকস উইথ হার”
ইংরেজী শুনে রাহেলা হক মাথা উঁচু করে দরজার দিকে তাকালেন,আহানার সাজগোজ দেখে উনার চোখ কপালে
হুরমুর করে ঠিকঠাক হয়ে বসে বললেন”আমি এখানে,আপনি কে,,চিনলাম না!”
আহানা হেলেদুলে এগিয়ে এসে উনার পাশে বসে পড়লো তারপর সমস্যা হলো কি বলবে সেটাই ভুলে গেছে সে রাহেলা হকের চোখ দেখে
কি বড়বড় চোখ তার উপর কাজল এমন ঘাড়ো করে দিয়েছে পুরো সিরিয়ালের মহিলাদের মতন লাগে
উনি দাঁত কেলিয়ে বললেন”আপনি কে?যদি পরিচয়টা দিতেন!”
ওহ!আমি আসলে পাশের ফ্ল্যাটে নতুন এসেছি,আমি রেক্সিনা উমেদ,আমার হাসবেন্ড ম্যারাইনে জব করে,আর আমার একটা ছেলে আছে সদ্য বিয়ে করেছে,সেও ম্যারাইনে জব করেরে
ওয়াও!বাহ!
কথাটা বলে রাহেলা হক আহানার হাতের গয়নার বক্সটার দিকে তাকালেন
আহানা বুঝতে পেরে এগিয়ে ধরে বললো”এটা আপনার জন্য আনলাম,আমি আবার কাউকে ছোটখাটো গিফট দিই না”
রাহেলা হক বক্সটা খুলে হা করে চেয়ে বললেন”এটা কি ডায়মন্ডের?”
আমি ডায়মন্ড ছাড়া আর কোনো ব্র্যান্ড চিনি না,গলার সেট আবার অন্য কিছুর ও হয় নাকি?
না মানে,এমিটেশন নাকি অন কিছু সেটা জিজ্ঞেস করছিলাম
এমিটেশন কি আবার,আমি তো জন্ম থেকে ডায়মন্ড শুনে এসেছি, সব ডায়মন্ড পেয়ে এসেছি!! দিয়ে এসেছি,এমিটেশন কি আবার?নতুন শুনলাম,তার দাম কি ডায়মন্ডের চেয়েও বেশি?
রাহেলা হক দাঁত কেলিয়ে বললেন”না না,বাদ দেন ওসব
মর্জিনা যাও নাস্তা নিয়ে আসো
তা সাথে করে নতুন বউকেও নিয়ে আসতেন
আরে কি বলবো,আমার পুত্রবধূ সারাদিন কিটি পার্টি আর ফ্রেন্ডদের নিয়ে থাকে,এসবের সময় কই
জিন্স ছাড়া চলেই না,বিয়ের আগে বলেছিলো শাড়ী জিন্স দুটোই পরতে পারবে,এখন দেখি রাতে ঘুমাতে যেয়েও জিন্স পরে,মেহমানদের সামনে আমার মাথা কাটা যায়
কথায় আছে না,বিয়ের জন্য বেশি বাছা বাছি করলে কপালে ছাই জোটে
আমার ও হয়েছে তাই,আমি সবসময় স্মার্ট মেয়ে চাইতাম আমার ছেলের জন্য,আর জুটেছেও ওভারস্মার্ট
এখন তো ভাবি কেন এটা চাইলাম,এর চেয়ে তো গ্রামের ক্ষ্যাত মেয়ে অনেক ভালো,অন্তত আমার কথা তো শুনবে!
রাহেলা হক চুপ করে কিসব ভাবলেন,তারপর বললেন”আপনার কোনো কোথাই শোনে না?”
শোনে তো,যখন ডাইনিংয়ে নাস্তা রেডি করে বলি বউমা খেতে আসো তখন সাথে সাথে এসে হাজির হয়
হায় হায় বলেন কি,আপনার বাসার কি কোনো কাজই সে করে না?চা ও বানায় না?
কাজ করে না কে বলে??সারাদিন কত কাজ করে
নখে নেইলপলিশ লাগায়,ফেসিয়াল করে,আবার আমাকেও নেইলপলিশ লাগিয়ে দেয়,এই ভালো দিক আর কি
আমি তো আরও এমন বউ চাইছিলাম এতদিন,না বাবা আর চাইবো না,ঘাঁট হইছে আমার,আমার ছেলে যে মেয়েটাকে পছন্দ করে ওরেই বিয়ে করে আনাবো,তা একটা কথা আপনার এমন সুন্দর বডি মেইনটেইন করার টিপসটা বলুন আমি লিখে নিই
কিরকম টিপস?
আপনাকে দেখে একদমই মনে হয় না আপনার একটা ছেলে আছে আবার তারে বিয়েও করিয়েছেন
মনে হয় আপনি নিজেই নতুন বিয়ে করেছেন
কথাটা শুনে আহানার কাশি উঠে গেলো,কাশতে কাশতে বললো”আজ আসি কেমন??”
আরে আরেকটু থাকুন না
না না,পরে আসব,কাজ হয়ে গেছে আর থেকে কি হবে
কাজ হয়ে গেছে মানে?
না মানে,আপনাকে ডায়মন্ড দেওয়া হয়ে গেছে,সেটা বললাম আর কি,হেহে,বাই বাই,নাইস টু মিট উইথ ইউর ১৪গুষ্টি,আবারও কাম কেমন?
আবারও কাম?,ওহ আচ্ছা আবারও আসবেন,হুম আসিয়েন
আহানা হাঁপাতে হাঁপাতে বিল্ডিংয়ের নিচে চলে আসলো,শান্ত কার নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষন,আহানাকে দেখে এগিয়ে এসে বললো”কাজ হয়েছে কিনা?”
হয়েছে মানে!!!উনি তো এখন রুপাকেই পছন্দ করবেন শুধু,এমন ট্রিকস করছি না
আহানা জলদি করে কারে বসে চোখের চশমাটা খুলে বড় করে একটা শ্বাস নিলো সে,তারপর মুচকি হেসে বললো”কাজটা বেশি কঠিন ছিলো না আবার সহজও ছিলো না”
কি কি করলা একটু শুনি
ওভারস্মার্ট মেয়ের সুবিধা আর অসুবিধা বুঝালাম উনাকে,এই আর কি
যাক এবার তাহলে নওশাদের বিয়ে খাবো,একের পর এক আমার সব ফ্রেন্ড সার্কেল মিঙ্গেল হয়ে যাচ্ছে
হুম,আর আপনি হয়েও না হওয়ার মতন
বুঝলাম না কি বললে
মানেটা সহজ,আপনি বিয়ে করলেন তবে আমাকে কি বউ হিসেবে মানেন নাকি মানেন না সেরকম অবস্থাতে আছি দুজন
তোমাকে তো বললাম আমার প্রেমিকার….
থাক আর বলতে হবে না,আপনার প্রেমিকা কে তা জানা হয়ে গেছে আমার,শান্তি আম্মু আমাকে সব বলেছে
শান্ত কার ড্রাইভ করতে করতে হাসলো কিছুটা তারপর জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আবারও সামনে তাকালো,হালকা পাতলা জ্যাম লেগে আছে
আহানা শান্তর দিকে ঘুরে বসে বললো”তা স্বীকার করবেন না আপনি আপনার অত্যন্ত কিউট প্রেমিকা ওরপে বউকে কত ভালোবাসেন?”
শান্ত জিভ দিয়ে ঠোঁটজোড়া ভিজিয়ে বললো”সেটার সময় আসলে সে জানতে পারবে,সব কথা মুখে বললেই কি বলা হয়ে যায়?
যায় তো!
আচ্ছা তাহলে বলবো তাকে,বাসি নাকি পুরান
আহানা হেসে দিলো,মিনিট দশেক বাদেই দুজনে আহানাদের বাসায় পৌঁছালো,আহানা কিছু বলার আগেই নওশাদের ফোনে কল আসলো তার মায়ের
তার মা জানালো রুপাকে নিয়ে যেন সে তাদের বাসায় আসে
রুপা তো এ কথা শুনে আহানার হাত ধরে নাচতে নাচতে অবস্থা বেহাল করে ফেলেছে
নওশাদ আহানাকে থ্যাংকস বলে রুপাকে নিয়ে চলে গেলো তাদের বাসার দিকে
আহানা এবার শান্তর দিকে চেয়ে বললো “চলুন সাহেব,আমরা আমাদের বাসায় ফিরে যাই,এটা তো আমার বাপের বাড়ি”
চলুন যাই
দুজন মিলে বাড়ি ফিরলো তখন মনে হয় বিকাল হয়ে এসেছে
আহানা শান্তর রুমে এসে নিজের একটা শাড়ী হাতে নিলো রেক্সিনা আন্টির সাজটা বদলাবে বলে,শান্তি আন্টি দেখলে কি না কি ভাববে তার আগেই সব পাল্টে ফেলতে হবে যত জলদি পারি
শান্ত রুমে এসে দেখলো আহানা গলার আর কানের গয়না খুলছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
শান্তর হাতে এক গুচ্ছ বিদেশি অর্কিড ফুল
তাহসিনকে দিয়ে আনিয়ে রেখেছিলে শান্ত,আহানা মনে হয় রুমে ঢুকার সময় দেখতে পায়নি
শান্ত আস্তে আস্তে এগিয়ে এসে ফুলগুলো নিয়ে আহানার দিকে বাড়িয়ে ধরলো
আহানা কানের দুলটা হাত থেকে রেখে ফুলগুলোর দিকে চেয়ে থেকে তারপর ব্রু কুঁচকে তাকালো শান্তর দিকে
শান্ত নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললো”সকালে আসার সসময় পথে একটা দোকানে দেখছিলাম তাই কিনে ফেললাম,কারেই ছিলো,দিতে ভুলে গিয়েছিলাম,নাও রাখো,সুন্দর ফুলগুলো
আহানা ফুলগুলো হাতে নিয়ে বললো”আর কিছু না?
প্রেমের পাঁচফোড়ন সিজন ২ পর্ব ৫৭
আর কি?
কিছু বলার নেই?
আছে তো
তো বলেন
আগে তুমি ফ্রেশ হবা নাকি আমি?
আহানা রাগে কটমট করতে করতে শান্তর গায়ে ফুলগুলো মেরে হনহনিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেলো
যাক বাবা,আমি কি করলাম আবার!
