প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫৩
রোজ ও রুশা
শেষ রাতের দিকে হেরার চোখ লেগে আসে। নাভান তখন হেরাকে সুন্দর করে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে নিজের রুমে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায়। ঘরের আবছা নিয়ন আলোতে হেরা একটা সাধারণ টিশার্ট পরে আছে, কাঁধে কোনো ওড়না নেই। তার অবিন্যস্ত চুল আর নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের দিকে নাভান এমন এক মোহগ্রস্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যা যদি ঘুণাক্ষরেও হেরা জানতো, তবে তার চিরচেনা রাগী মুখটা মুহূর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে যেত।
নাভান আলতো পায়ে হেরার দিকে ঝুঁকে আসে। হেরার উষ্ণ নিশ্বাস নিজের চোখে-মুখে মেখে নেয়। মেয়েটার গায়ের তীব্র মিষ্টি সুবাস জোরে টেনে নেয় নিজের ফুসফুসে। ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসির রেখা ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলে—
” কবে এই লুকানো ফিলিংসগুলো ছেড়ে, এই রাগি রাগি ভাবটা ভুলে, আমার ছোঁয়াকে ভয় না পেয়ে লজ্জায় নতজানু হবি অক্সিজেন? কবে তোর ওই লজ্জা মাখা মুখটা প্রাণভরে দেখবো? এক জীবনের এই একটাই তো আফসোস আমার বেড়েই যাচ্ছে !” বড্ড লোভ হচ্ছে।
সকাল সকাল সূর্য দেখার লোভে রোজ আর রুশা ঘুম থেকে উঠেছে। সাথে আছে ঝিনুক, তুষার আর অধীর। অধীর আর রুশা মিলে বাদর দেখছে আর তাদের কলা খাওয়াচ্ছে। ঝিনুক আর তুষার তাদের পেছনে একই কাজে ব্যস্ত।
এদিকে রোজ একা একা দূর পাহাড়ের মেঘের দিকে তাকিয়ে আছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, জীবনটা ঠিক ওই মেঘের মতোই ধোঁয়াশা। মানুষ মেঘ পছন্দ তো করে, কিন্তু মেঘকে কখনো ধরে রাখতে জানে না। সৃজন এর মধ্যে বেশ কয়েকবার রোজের সাথে কথা বলতে এসেছে, কিন্তু রোজ বরাবরই তাকে এড়িয়ে গেছে। সৃজনের রাগ সাধারণত কম থাকে, কিন্তু যখন সে রাগে, তখন চারপাশ তছনছ করে ফেলে। অধীর দূর থেকে বিষয়টা লক্ষ্য করছে এবং বুঝতে পারছে রোজ আর সৃজনের মধ্যে বড় কোনো ঝামেলা চলছে।
আজ অবশ্য অধীরের লুকটা পুরাই কুল আর ডিজে টাইপ। সে একটা বেগি হাতার গেঞ্জি পরেছে, কানে হেডফোন ঝুলানো। পায়ে দামি স্নিকার্স আর সাদা প্যান্ট—সব মিলিয়ে পুরাই কিউট লাগছে। রুশা তো তার ওপর থেকে চোখ সরাতেই পারছে না। রুশাকেও আজ ভীষণ সুন্দর লাগছে। ওদের বন্ডিংটা চমৎকার, কোনো ভুল বোঝাবুঝি নেই। যা হয় তা কেবলই মিষ্টি দুষ্টুমি। বড়জোড় এক ঘণ্টার ব্রেকআপ! কেউ কাউকে ছাড়া থাকতে পারে না, কবুতরের জোড়ার মতো সারাক্ষণ পাশাপাশি লেগে থাকে।
দূর থেকে অ্যাডভোকেট কাজল খান রুশা আর অধীরকে দেখে মুচকি হাসছেন। যুবক বয়সে জাওয়াদ খানও যে ঠিক এমন ছিলেন—রাগ করতেই পারতেন না, আর কাজলকে না দেখে এক মুহূর্তও থাকতে পারতেন না।
হঠাৎ এক ঝটকায় রোজের হাত ধরে টেনে একপাশে নিয়ে আসে সৃজন। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।
“হাউ ডেয়ার ইউ ! তোমার সাহস হয় কী করে আমায় ইগনোর করার? তুমি জানো না তোমার সাথে কথা না বলতে পারলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে? বার বার কেন ইগনোর করছো আমায় ?”
হাতে তীব্র ব্যথা পেয়ে রোজের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ে যায়। কিন্তু সে নিজের কান্না লুকিয়ে শান্ত গলায় বলে—
“আমার মতো একটা অনাথ, এতিম মেয়ের কি সাধ্য আছে সরকার বাড়ির রাজপুত্রকে ইগনোর করার?”
রোজের চোখের পানি দেখে সৃজন বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করে নেয়। নিজেকে কিছুটা শান্ত করে নরম গলায় বলে—
“কী হয়েছে ফুল? আমার জানটা বলো না, আমায় এভাবে কেন অবহেলা করছো?”
রোজ মুখটা ঘুরিয়ে নিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে—
“কিছুই হয়নি। এতিমদের জীবনে কিছু হলেই বা কী, আর না হলেই বা কী? আমাদের অনুভূতির কোনো দাম নেই।”
“ফুল!” সৃজন ধমকের সুরে ডেকে ওঠে।
“চিৎকার করছেন কেন সৃজন সরকার?”
রোজ রক্তচক্ষু নিয়ে সৃজনের দিকে তাকায়।
সৃজনের ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে যায়। দুই দিন ধরে রোজ তার সাথে একটা কথাও বলেনি। যেদিন রওনা দিয়েছে সারাদিন-সারারাত, তারপর বান্দরবান আসার পরদিন আর আজ সকাল—হিসেব করে সৃজন চেঁচিয়ে ওঠে—
“তোর হয়েছেটা কী বলবি? একটানা ২৪ ঘণ্টার বেশি তুই আমার সাথে কথা বলছিস না! জানিস আমার কেমন লাগছে? ভেতরে ভেতরে মরে যাচ্ছি আমি!”
রোজ এবার শক্ত গলায় বলে—
“কয়েকদিন কথা না বললে এই খারাপ লাগা কেটে যাবে। অভ্যাস বদলে যাবে।”
“মানে?”
“মানে সহজ। পুরোনো মানুষকে ভুলে থাকার অভ্যাস যদি করতে পারেন, তবে এই কয়েকদিনের নতুন অভ্যাস ভুলতেও আপনার সময় লাগবে না।”
“রোজ!” সৃজন গর্জে ওঠে—
“কী বলতে চাচ্ছো ক্লিয়ার করো!”
রোজ সৃজনের চোখের দিকে তাকিয়ে বুক ভাঙা কষ্ট চেপে বলে—
“সহজ কথা সৃজন সরকার, আপনি আপনার মতো থাকুন আর আমি আমার মতো। আপনার আভিজাত্যের সাথে আমার ঠিক যায় না। আপনি অনেক উঁচুর মানুষ, সরকার বাড়ির ছেলে।”যদি কখনো আপনার লেভেলের হতে পারি তখন কথা বলবো! কিন্তু এর আগে নয়।
রোজের মুখে এই দূরত্বের কথা শুনে সৃজন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। রিসোর্টের ওই খোলা জায়গায় সবার সামনে সিনক্রিয়েট করতে চাইল না সে। সৃজন চায় না তার ভালোবাসার মানুষের সাথে তার এই রাগারাগি কেউ দেখে মজা নিক। তাই এক প্রকার জোর করেই রোজকে টেনে রিসোর্টের ভেতরের রুমে নিয়ে আসে। তবে আড়াল থেকে নুড়ি তাদের এই টানাপোড়েন ঠিকই লক্ষ্য করেছে।
রুমের ভেতর এনে রোজকে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে সৃজন। রাগে দাঁতে দাঁত পিষে বলে—
” আমি আমার মতো থাকবো’ মানে কী? কী বোঝাতে চাস তুই, হ্যাঁ!
সামান্য থেমে, রোজের চোখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে বললো — —–
” নিজেকে আমার লেভেলে নিয়ে আসার চেষ্টা করছিস? কিন্তু আমি তো তা চাই না! তুই এখন যেমন আছিস, আমি সৃজন তোকে ঠিক এই অবস্থাতেই সারাজীবন পাশে চাই। আমি তোকে আমার সমস্ত ভালোবাসা দিয়ে বুকের ভেতর আগলে রাখতে চাই। কিন্তু তার জন্য তোকে আমার গুরুত্বটা বুঝতে হবে! নিজেকে আমার সমান বানিয়ে আমার সাথেই প্রতিটা পদে কম্পেয়ার করবি—আমি এটা বরদাস্ত করব না।
তুই জানিস আমি তোকে কেন এত ভালোবাসি? কারণ এই পুরো দুনিয়াতে তোর আপন বলতে আর কেউ নেই! কেউ না! আমি চাই তোর পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা শুধু আর শুধু আমার জন্যই থাকবে। আমি তোকে ঠিক এভাবেই চাই, বুঝলি?”
রোজ এবার সৃজনের এই ভয়ংকর রাগকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দিল না। সৃজনের মা যে তাকে একা পেয়ে ‘ছোটলোক’, ‘লোভী’, ‘এতিম’ বলে অপমান করেছে এবং সৃজনের নামে আজেবাজে অপবাদ দিয়েছে, সেই ভেতরের সব বিষাক্ত কষ্ট আর ক্ষোভ সে সৃজনের ওপর উগরে দিল। রোজের একটা কথাই মাথায় আসছে কোনো মা ছেলের চরিত্র নিতে মিথ্যা কথা বলতে পারে না।
রোজ চিৎকার করে বলল—
“বলেছি তো, আপনার সাথে আমার যায় না! আমি আপনাকে আর চাচ্ছি না! মুক্তি দিন আমাকে!”
কথাটা শেষ হতে পারল না। একটা তীব্র থাপ্পড় এসে পড়ল রোজের উজ্জ্বল শ্যামলা গালে। সৃজন যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না যে তার নিজের তৈরি করা ‘ নরম, কোমল স্নিগ্ধ ফুল’ আজ তাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছে!
সৃজন রোজের দুই কাঁধ খামচে ধরে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। তার চোখ দুটো এখন টকটকে লাল, সেখান দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। রোজের চোখের দিকে তাকিয়ে সৃজন এমন এক টোনে কথা বলে, যা রোজের কলিজা কাঁপিয়ে দেয়—
“শোন , এই বুকে হাত দিয়ে আজ শেষবারের মতো শুনে রাখ—তোর এই সৃজনকে ছাড়ার বা না চাওয়ার কোনো অধিকার এই দুনিয়া তোকে দেয় নাই! তুই এই সৃজন সরকারের ‘ফুল’ ছিলি, আছিস আর থাকবি। যদি কখনো মরতেও হয়, তবে তোকে এই বুকে জড়িয়ে নিয়েই মরবো, তাও তোকে হাতছাড়া হতে দেবো না।”
সৃজন রোজের ভেজা গালে নিজের হাত রেখে ভাঙা কিন্তু তীব্র জেদি গলায় বলে—
“আমায় ইগনোর করার শাস্তি তুই পাবি, কিন্তু আমার থেকে মুক্তি তুই মরে গেলেও পাবি না। যদি কখনো পরিস্থিতি আমাদের আলাদা করতে চায়, তবে দরকার হলে জীবন্ত এক কবর খুঁড়ে দুজনে একসাথে ঢুকে যাবো, তাও তোকে আমার থেকে আলাদা হতে দেবো না। এটা এই সৃজন সরকারের এক জবান! তুই শুধু আমার, আর কারও না!”
রোজ সৃজনের চোখের সেই তীব্র পাগলামি আর ভালোবাসার গভীরতা দেখে থমকে যায়। গালের চড়ের ব্যথার চেয়েও সৃজনের এই মরিয়া ভালোবাসার টান তার বুকটাকে এক অদ্ভুত যন্ত্রণায় ও অপার্থিব শান্তিতে ভরিয়ে দেয়। মনে হাজার ভয় নিয়ে চুপ হয়ে যায় রোজ।
সকাল আটটা গড়িয়ে সাড়ে আটটা ছুঁইছুঁই। পাহাড়ি রিসোর্টের সকালটা এমনিতে বেশ শান্ত আর মনোরম হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু যেখানে অধীর নামের এক পিস উপস্থিত আছে, সেখানে শান্তি শব্দটা অভিধান থেকেই বাদ দিয়ে দিতে হয়।
বড়রা সবাই সকালে বেরিয়েছেন এলাকার মন্ত্রী এসেছে শুনে জাওয়াদ খানের সাথে দেখা করতে ভিড় জমিয়েছে , অনেক কষ্টে সবাইকে রিসোর্ট থেকে বের করেছে, এখন মূলত তারা গ্রামবাসীদের খোঁজখবর নিতে গেছেন নিজেরাই।ভির জমিয়ে রিসোর্ট এর পরিবেশ নষ্ট করেন নি । এদিকে পুরো রিসোর্ট এখন খাঁ খাঁ করছে। রোজকে একটু আগে রাগে ফুসতে ফুসতে একা ফেলে সৃজন চলে এসেছিল। কেউ খেয়াল না করলেও অধীরের তীক্ষ্ণ চোখ ঠিকই সেটা ধরে ফেলেছিল। আর তখনই তার মাথায় শয়তানি বুদ্ধিটা কিলবিল করতে শুরু করে।
অনেকদিন ধরে সৃজন আর নাভান—এই দুই বন্ধু রুপি ভাই দের সাইজ করা হচ্ছে না। অধীরের হাত নিশপিশ করছিল। যেই ভাবা সেই কাজ! সে তার ফোনের ব্লুটুথ স্পিকারের ভলিউম একদম ফুল করে দিল। পাহাড়ি শান্ত পরিবেশ কাঁপিয়ে ডিজেদের মতো নাচতে নাচতে সে এসে দাঁড়াল সৃজনের সামনে। সৃজনকে দেখেই সে চট করে ফোনের প্লে-লিস্ট বদলে বাপ্পারাজের একটা চরম বিরহের গান প্লে করে নিল। অধীরের যুক্তি পরিষ্কার—নিজেকে সেড ফিল করতে গেলে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকটা কষ্টের হওয়া দরকার ! গান চেঞ্জ করে কাদো কাদো মুখ করে নেয় অধীর।
সৃজন তখন মগে চুমুক দিয়ে আয়েশ করে কফি খাচ্ছিল, আর নুড়ি এক পাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কার সাথে যেন কথা বলছিল। সৃজনের সামনে এসে অধীর এমনভাবে হাঁপাতে শুরু করল যেন সে অলিম্পিকে দশ কিলোমিটার দৌড়ে এসেছে। কপালে কাল্পনিক ঘাম মুছে সে বলে উঠল—
” আরে সালা থুক্কু দুলাভাই, তুই এখানে বসে বসে কফির শ্রাদ্ধ করছিস? আর ওইদিকে যে রোজ…”
‘রোজ’ নামটা শোনামাত্র সৃজনের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল। কফির মগটা কাঁপতে কাঁপতে টেবিল ছুলো। চেহারায় রাজ্যের টেনশন ফুটিয়ে সে লাফিয়ে উঠে বলল —
” কী… কী হয়েছে ফুলের?
অধীর বুক চেপে ধরে এমন অভিনয় করল যেন সে এখনই হার্ট অ্যাটাক করবে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল—
“রোজ বনু … ওই যে ওইদিকের একটা খাড়া তেড়া, পাহাড় আছে না? ওইটার একদম কিনারায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে রে! মনে হচ্ছে একটু পরেই নিচে লাফ দেবে!
“হোয়াট!”
সৃজনের হাত লেগে কফির মগটা টেবিলের ওপর পড়ে গিয়ে সশব্দে ভেঙে গেল।
কোনো কথা না বাড়িয়ে, অধীরকে জিজ্ঞেস করারও সুযোগ না দিয়ে সৃজন সোজা দিল ছুট! অধীরকে যে বলবে—’তুই ওকে ডাক দিলি না কেন? বা নিজে কেন বাঁচাতে গেলি না?’—সেই সাধারণ জ্ঞানটুকুও তার মাথা থেকে উধাও হয়ে গেছে। রোজের টেনশনে সৃজন তখন পুরোপুরি অন্ধ।
আসলে সত্যি বলতে, রোজ পাহাড়ের দিকে গেছে ঠিকই, কিন্তু লাফ দেওয়ার মতো কোনো পাগলামি সে করেনি। ওটা অধীরের উর্বর মস্তিষ্কের একশো ভাগ বানানো গল্প। কিন্তু অধীর জানে, রোজের নাম শুনলে সৃজনের হিতাহিত জ্ঞান বলতে কিছু থাকে না। আর ঘুরতে এসে সবাই যদি মুখ গোমরা করে বসে থাকে, তবে অধীরের পেটের ভাত হজম হয় না।
ছুটে যাওয়া সৃজনের পিঠের দিকে তাকিয়ে অধীর নিজের কলারটা একটু তুলে মনে মনে বলল–
“যেখানে এই অধীর আছে, সেখানে মুড অফ নট এলাউড! শুধু মজা আর মাস্তি!”
পাশে দাঁড়িয়ে রুশা মুখ চেপে হাসছিল। সেও তো প্রিয় এই মহানিষ্ক্রমণ প্ল্যানের সমান অংশীদার! দুজনে মিলেই তো এই নিখুঁত স্ক্রিপ্ট লিখেছে। রুশা কনুই দিয়ে অধীরকে খোঁচা মেরে বলল—-
“এবার নেক্সট প্ল্যান! চলো, আমার হিরো ক্রাসের বারোটা বাজাই।”
দুজনে পা টিপে টিপে নাভান আর হেরার রুমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। দরজায় দুই-তিনবার নক করল অধীর। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ নেই। নাভান আর হেরা দুজনেই যেন কুম্ভকর্ণের বংশধর, ঘুমে কাদা হয়ে আছে।
অধীর এবার তার পকেট থেকে সেই কুখ্যাত ছোট্ট হ্যান্ড-মাইকটা বের করল। সাইরেন বাজানোর মতো কিচিরমিচির বিকট শব্দ করে সে দরজা বরাবর সোজা হয়ে শুয়ে পড়ল। তারপর মাইকটা মুখের সামনে নিয়ে একদম লাইভ ধারাভাষ্য দেওয়ার মতো করে চেঁচিয়ে উঠল—
“ভাই! সব শেষ ভাই! সবাই চলে গেছে! জলদি ওঠ! এত সুন্দর একটা ছেলে এসে কিউটিপাই বনুকে হাঁটু গেড়ে প্রপোজ করছে, তুই চোখের সামনে এই রোমান্টিক সিন মিস করে যাবি? এই অধীর থাকতে কখনো হবে না। জলদি উঠ ভাই জলদি!”
ঘুমের ঘোরে মাইকের কর্কশ ভাঙা আওয়াজ আর ‘প্রপোজ’ কিউটিপাই শব্দটা শুনে নাভান ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—হেরা? হেরা কি কাউকে প্রপোজ করে ফেলল? নাকি হেরাকে কেউ প্রপোজ করছে? এই দুর্গম পাহাড়ে আবার প্রপোজ করার মতো কে জুটে গেল!
রিসোর্টের বাইরের স্নিগ্ধ সকালটা তখন কেবল ডানা মেলছে। রুশা বেশ জোর করেই হেরা-কে ঘুম থেকে টেনে তুলে, ফ্রেশ করিয়ে বাইরে নিয়ে এসেছে। পাহাড়ের এক কোণায় দাঁড়িয়ে একটা পিচ্চি ছেলের সাথে কথা বলছিল হেরা। ঠিক তখনই সৃজন পাহাড়ে উঠে হেরা-কে দেখতে পায়। বুকে এক অদ্ভুত স্বস্তির সুরাসুর নিয়ে, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে রোজের দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু হেরা আর বাচ্চার খুনসুটি দেখে সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
এদিকে হেরা চোখ ডলতে ডলতে রুশাকে একটু বিরক্ত হয়েই বলল–
“এমন করে ভরসকালে ঘুম থেকে তোলার মানে কী রসুন রানী আরেকটু ঘুমালে কী ক্ষতি হতো শুনি?”
রুশা রহস্যময় হেসে বলল, “তোর জন্য একটা ধামাকা সারপ্রাইজ আছে দোস্ত!”
“কী?!” হেরার চোখ গোল গোল।
রুশা পেছন থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা, ঘন লাচ্ছি বের করে হেরার সামনে ধরল। লাচ্ছি বরাবরই হেরার ভীষণ প্রিয়, এক প্রকার দুর্বলতাই বলা চলে। গ্লাসটা দেখেই হেরা খুশিতে চিৎকার করে উঠল—-
“ওয়াও! তুই আসলেই গ্রেট! থ্যাংক ইউ দোস্ত।”
লাচ্ছিতে চুমুক দিতে দিতে হেরা হঠাৎ এদিক-ওদিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
“আচ্ছা, লাল গোলাপটা কই রে? লাল গোলাপি?”
রুশা অমনি নাক কুঁচকে, মুখ ভ্যাংচিয়ে বলে উঠল—-
“এই! একদম আমায় ওই নামে ডাকবি না বলে দিলাম! আমি শুধু লাইভ টেলিকাস্টের লাল গোলাপি, হুম!”
ঠিক তখনই রুশা দেখল, দূর থেকে নাভান নিজের শার্টের হাতা ফোল্ড করতে করতে অত্যন্ত রাগী ভঙ্গিতে এই দিকেই এগিয়ে আসছে। নাভানের ওই রূপ দেখে রুশার পিলে চমকে গেল। সে তড়িঘড়ি করে বলল—-
“তুই খেতে থাক পাখি—-
আ… আমি একটু ওয়াশরুম থেকে আসছি।”
বলেই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অধীরকে, যে কিনা কানে হেডফোন গুঁজে মগ্ন হয়ে গান শুনছিল, টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
হেরা অবাক হয়ে চেঁচিয়ে বলল—-
“আরে! তুই ভাইয়াকে টেনে হিঁচড়ে কই নিয়ে যাচ্ছিস?”
“ওই যে , ওয়াশরুমে!” রুশার তাড়াহুড়ো উত্তর।
“মানে? ভাইয়া কি তোর সাথে ওয়াশরুমে ঢুকবে নাকি?” হেরা হেসেই খুন।
“আরে না না! আমার একা যেতে ভয় করে তো, তাই ও বাইরে দাঁড়িয়ে পাহারা দেবে, আর কী!”
রুশা আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে অধীরকে টেনে উধাও হয়ে গেল।
আসলে রিসোর্ট জুড়ে হেরা-কে কোথাও না পেয়ে নাভান তখন রাগে ফুঁসছিল। আর রুশা দূর থেকে নাভানের এই রুদ্রমূর্তি দেখেই হেরা আর নাভানকে একা ছেড়ে কেটে পড়েছে। কারণ, নাভানের রাগের মুখোমুখি হওয়ার সাহস এই মুহূর্তে কারো নেই। রুশা হয়তো মনে মনে বলছিল—
লম্পটের মতো ঝম্পট মেরে নাভান এখন হেরা-কে ধরবে!
হেরা যখন আপনমনে লাচ্ছির স্বাদ নিচ্ছিল, ঠিক তখনই নাভান এক ঝটকায় হেরার সামনে এসে দাঁড়াল। তার চোয়াল শক্ত, হাত মুঠো করা। তীব্র গলায় সে বলে উঠল—
“কার এত বড় সাহস! তোমাকে প্রপোজ করে?!”
হেরা তো পুরো বোকা বনে গেল। সে লাচ্ছির গ্লাস মুখে নিয়ে অবাক হয়ে বলল—-
“প্রপোজ? কীসের প্রপোজ? কে প্রপোজ করেছে? আর কী-ই বা করেছে?”
নাভান আরও রেগে গিয়ে বলল—-
“এই নাটকবাজ মহিলা, একদম নাটক করবে না আমার সামনে! সকালবেলা তোমাকে কেউ প্রপোজ করেনি?”
হেরা গ্লাসটা নামিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল—
মাথাটা কি পুরোই গেছে আপনার? রাতে ভালো ঘুম হয়নি বুঝি? তার জন্য উল্টোপাল্টা বকছেন। আমি তো এই মাত্র ঘুম থেকে উঠে আসলাম, আমাকে আবার কে প্রপোজ করতে যাবে?”
“তুমি মিথ্যা বলছ!”
নাভানের চোখে অবিশ্বাস।
“তা,,,,, যা কিছু ঘটেনি তা- আপনি বানিয়ে চালাচ্ছেন। আর আমি সত্যিটা বললেই দোষ? এখন আমি সত্তিটা বলে মিথ্যাবাদী হয়ে গেলাম? কোন নিউজে দেখেছেন যে আমায় কে প্রপোজ করছে ?”
হেরা মুখে মুখে তর্ক জুড়ে দিল।
নাভান গর্জে উঠল—
“আবার মুখে মুখে তর্ক করছ? তুমি বলছ কেউ তোমাকে প্রপোজ করেনি?”
“এই মিস্টার, শুনুন!” হেরা এবার উঠে দাঁড়িয়ে বলল—
“আমাকে প্রপোজ করলেই বা কী, আর না করলেই বা কী? আপনার তাতে কী?”
নাভান এক পা এগিয়ে এসে হেরার চোখের দিকে তাকিয়ে নিচু কিন্তু দৃঢ় গলায় বলল—
“তুমি যে আমার বিবাহিত স্ত্রী, সেটা ভুলে গেছ?”
“না, ভুলিনি!” হেরার চোখেও আগুন—-
“আর এটাও ভুলিনি যে আপনি একটা আস্ত প্রতারক, বেইমান, মিথ্যাবাদী!”
“বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু মিসাইল গার্ল !” নাভানের চড়া গলা।
“বেশি না, কমই হচ্ছে! আপনি আসলেই একটা রাক্ষস, একটা খবিশ! একটা মুলা,শালগম,আলু,ডিম,আপনি মিথ্যা কথা বলেন, নিজের সম্পর্ক আড়ালে রাখেন।” মিথ্যাবাদী,প্রতারক,ঠকবাজ,অসভ্য,আর আর কি! আর কি গালি দেয়া যায় , দেত গালিও পারি না। দাড়ান গালি শিখে আপনাকে বলবো!
হেরা নিজের ক্ষোভ উগরে দিল।
নাভান আর সহ্য করতে পারল না। সে হেরার একদম কাছে এসে দাঁড়াল—–
“তোমাকে বলেছি না ওই পুরোনো কথা বারবার টানবে না? তোমার ওই সো-কল্ড অতীত নিয়ে একটা কথাও বলবে না। বর্তমানটাকে মেনে নাও। আর এই বর্তমানে আমিই তোমার সব, আমাকেই মেনে নাও।
হেরার সাথে তর্কে পেরে না উঠে নাভান ভীষণ বিরক্ত হলো। এই মেয়েকে সোজা কথায় বোঝানো অসম্ভব, শুধু রাগ বাড়িয়ে দেয়। নাভান আর কথা না বাড়িয়ে ধপ করে হেরার সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ল। তার চোখ গেল টেবিলের ওপর রাখা আধখাওয়া লাচ্ছির গ্লাসে। কোনো কিছু না ভেবেই নাভান গ্লাসটা তুলে নিয়ে এক চুমুকে লাচ্ছি খাওয়া শুরু করল।
হেরা হাঁ করে তাকিয়ে রইল। তার প্রিয় লাচ্ছি, তাও এই লোকটা এভাবে আয়েশ করে খেয়ে ফেলছে! নিজের খাবারের ওপর এই হানা হেরা মেনে নিতে পারল না। সে চিৎকার করে ওঠার আগেই নাভান গ্লাসের বাকিটুকুও শেষ করার উপক্রম করল।
“এই অসভ্য গিটার ওয়ালা গিরগিটি ! আমার লাচ্ছি দিন! এটা আমার লাচ্ছি! আপনি আমার এত্ত সাধের খাওয়াটা খেয়ে নিলেন? আপনি খুব খারাপ! জলদি আমার লাচ্ছি ফেরত দিন!”
হেরা রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল।
নাভান গ্লাসটা নামিয়ে হেরার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর এক মুহূর্তও না ভেবে, নিজের মুখটা হেরার মুখের খুব কাছে এনে ধরল। হেরা পুরো বোকা বনে গেল, কী করবে বুঝতে পারল না।
নাভান মুচকি হেসে বলল—
“নাও, খাও এবার।”
হেরার গা ঘিনঘিন করে উঠল, সে দুই পা পিছিয়ে গিয়ে বলল—-
” ছি ছি! আপনার খাওয়া জিনিস আমি খাব?”
নাভান বিরক্ত হওয়ার ভান করে বলল—-
“তো কী হয়েছে? আমি তোমার খাওয়া লাচ্ছি খেতে পারলে, তুমি আমারটা কেন খেতে পারবে না?”
“আমার ইচ্ছা! আমি কখনো কারো খাওয়া উচ্ছিষ্ট জিনিস খাই না।”
হেরার সাফ জবাব।
নাভান একটু ঝুঁকে এসে ফিসফিস করে বলল—-
“কারো খাওয়া জিনিস খেলে যে ভালোবাসা বাড়ে, তা বুঝি জানো না?”
“আমার লাগবে না ও রকম মিথ্যা ভালোবাসা!”
হেরা মুখ ফিরিয়ে নিল।
“বাট আমার লাগবে। আর তুমি এটাই খাবে!
নাভানের কণ্ঠে ফুটে ওঠে এক অদম্য ও জেদি সুর। তার এই একগুঁয়েমির অন্তরালে যেন লুকিয়ে আছে হেরাকে একচ্ছত্রভাবে আপন করে নেওয়ার আর ভালোবাসা বাড়িয়ে তোলার এক গভীর ব্যাকুলতা। মেয়েটার অবাধ্যতা আর জেদ তো কম নয়, কিন্তু নাভানও হাল ছাড়বার পাত্র নয়—হেরার সেই একগুঁয়ে জেদ ভাঙাতেই যেন সে প্রতিনিয়ত মরিয়া।
প্রতিটি মুহূর্তে তার মনে হয়, হেরা শুধুই তার একান্ত নিজের অধিকার, ভালোবাসার এক অনন্য সমর্পণ। আর সেই অধিকারের পরম টানেই সে এই রমনীর মন জয় করতে চায় নিজের মতো করে, তার সবটুকু ভালোবাসা আর দাবি উজাড় করে দিয়ে।
“না, আমি খাব না, খাব না, খাব না!”
হেরা হাত-পা ছুড়ল।
নাভান এবার এক বাঁকা হাসি হেসে বলল—
“লাচ্ছি খাচ্ছ না, ভালো কথা। কিন্তু আমার ঠোঁটের ভিটামিন তো ঠিকই খেয়েছো। ওকে, এটা আমিই খেয়ে নিই, তুমি বরং আমার…থেকে ভিটামিন,,,,,,,
কথাটা শেষ করার আগেই হেরা চরম লজ্জায় আর রাগে নাভানের হাত থেকে লাচ্ছির গ্লাসটা কাড়াকাড়ি করতে শুরু করল। আর তখনই ঘটলো অঘটন। আচমকা কাড়াকাড়ির চোটে গ্লাসের বাকি লাচ্ছি ছিটকে হেরা আর নাভান—দুজনের শরীরেই পড়ে গেল।
নাভান রেগে যাওয়ার বদলে মুচকি হাসল। তার চোখের কোণে এক অদ্ভুত চকমকি ইতিহাসের যেন পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ঠিক এমন একটা ঘটনা আগেও ঘটেছিল, যা আজ আবার ফিরে এলো।
লাচ্ছি হেরার ঠোঁটের কোণে, গালে আর গলায় ছিটকে গিয়ে পড়েছে। ধবধবে ফর্সা ত্বকে সেই সাদা লাচ্ছির দাগ দেখে নাভানের চোখে এক তীব্র মোহ নেমে এলো। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হেরার অতি নিকটে চলে গেল। নাভানের চোখের সেই অচেনা, তীব্র চাউনি দেখে হেরা ভয় পেয়ে পিছাতে গেল, কিন্তু তার আগেই নাভান শক্ত হাতে হেরার কোমর জড়িয়ে ধরে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে ফেলল। হেরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই, নাভান পরম আবেশে নিজের জিভ দিয়ে হেরার গাল থেকে সেই লাচ্ছি শুষে নিল।
এই আকস্মিক ও তীব্র স্পর্শে হেরা স্তব্ধ হয়ে গেল, পরক্ষণেই রাগে ও অপমানে অন্ধ হয়ে সে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে নাভানের চওড়া বুকে এক কামড় বসিয়ে দিল।
কামড় খেয়ে নাভান একটু পিছিয়ে গেল, কিন্তু তার ঠোঁটের কোণের রহস্যময় হাসিটা ম্লান হলো না। হেরা হাঁপাতে হাঁপাতে ধপ করে পাশের চেয়ারটায় বসে পড়ল। তার বুক দুলছে। হঠাৎ সে একদৃষ্টিতে নাভানের দিকে তাকিয়ে, তীব্র এক ঘোর লাগা গলায় প্রশ্ন করল—
“কে আপনি…?”
নাভান হেরার এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিল না। সে এক মুহূর্তও দেরি না করে, এক পলক হেরাকে দেখে নিয়ে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে প্রস্থান করল।
নাভান চলে যাওয়ার পর হেরার মাথায় যেন এক প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হতে লাগল। তার চারপাশটা দুলতে লাগল। কেন মনে হচ্ছে এই ঘটনাটা, এই তীব্র স্পর্শটা তার সাথে আগেও ঘটেছে? খুব চেনা, খুব পরিচিত অনুভূতি। সে আগেও কাউকে এভাবে কামড়ে দিয়েছিল, কিন্তু কাকে? সে কিছুই মনে করতে পারছে না। অতীতের আবছা কিছু স্মৃতি যেন মাথার ভেতর হাতুড়ি পেটা করছে। মাথায় প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করতে করতে হেরা চেয়ারের পেছনে মাথা ঠেকিয়ে, চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল।
দূর থেকে নাভান আড়াল হয়ে হেরার এই অবস্থা দেখছিল। হেরার মাথায় যে স্মৃতির ঝড় উঠেছে, তা সে বেশ বুঝতে পারছে। নাভানের ঠোঁটে ফুটল এক বিজয়ের মুচকি হাসি। সে পকেট থেকে ফোনটা বের করে একটুও সময় নষ্ট না করে হেরাকে যে ট্রিটমেন্ট করছে এতো বছর সেই পারিবারিক ডাক্তারকে কল দিল। হেরার আগের স্মৃতি ফিরে আসার খেলাটা যে এবার শুরু হতে চলেছে, নাভান তা খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে। নাভান চায় হয় জানুক নাভান হেরার কি ছিলো অতীতে। আর যদি নাই জানতে পারে তাহলে এই বর্তমান নাভানকে মেনে নিক। কোনো অতীতের পাতা যাতে না আসে,যে অতীত মনে করলে হেরার ক্ষতি হবে।
সবাই মিলে কংলাক পাহাড়ের শেষ বাঁকটা পেরোতেই যেন দৃশ্যপট বদলে গেল।
সামনের বিস্তীর্ণ আকাশের নিচে মেঘের সাদা সমুদ্র। সেই সমুদ্রের বুক চিরে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে অসংখ্য সবুজ পাহাড়। হালকা বাতাস এসে হেরার এলোমেলো চুলগুলো উড়িয়ে দিল। এক মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল। নিজের মাতৃভূমির সৌন্দর্য এভাবে কখনো একসঙ্গে দেখা হয়নি।
“সুবাহান_আল্লাহ…!” হেরা ফিসফিস করে বলল, “এটা সত্যি নাকি স্বপ্ন?”
তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল নাভান। ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল। হেরার বিস্ময়ে ভরা চোখের দিকেই যেন তার সমস্ত মনোযোগ। হেরা নাভানকে উপেক্ষা করে নিজের মনেই বিড়বিড় করল—
“স্বপ্ন হলে আমিও চাই এই স্বপ্নটা কখনো না ভাঙুক।”
নাভানের সামনে এসে তিতির একগাল মুচকি হাসি দিল। চোখ-মুখের সেই ধারালো হাসি দেখে তাকে এখন অনেকটাই সুস্থ আর স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। অথচ কিছুক্ষণ আগেই যখন নাভান ওকে হেরার সম্পর্কের কথা বোঝাচ্ছিল, তখন তিতির একদম চুপচাপ ছিল। পুরোটা শুনে শুধু একটাই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছিল—
“দায়িত্ব আর বন্ধুর দাবি নিয়ে সামনে দাঁড়ালে ফিরিয়ে দেবে না তো, জি-ম্যান? ভালোবাসার খেলায় না হোক, পুরনো বন্ধুত্বের খাতিরে এতটুকু সম্মান কি আমায় দেওয়া যায় না?”
তিতিরের মলিন, অসহায় মুখটার দিকে তাকিয়ে নাভানের বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠেছিল। হালকা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতিরের মাথায় হাত রাখল সে। চোখের কোণে অপার সরলতা ফুটিয়ে শান্ত গলায় বলল—–
“তিহান জায়িন আমার বুকের এক-একটা অংশ ছিল তিতির। সেই ভাইয়ের মতো মানুষটার আমানতকে আমি সামান্য বন্ধুত্বের খাতিরে এটুকু সম্মান দিতে পারব না? তোমার দিকে আমি সবসময় বোন আর এক পরম বন্ধুর দায়িত্ব নিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকব। এতটুকু ভরসা আর আশা তুমি এই নাভানের ওপর চোখ বন্ধ করে রাখতে পারো ।
মনে মনে তিতির তখন নিজেরই কপালে চাপড় মারছিল—–
” বোন মাই ফুট! আমি এসেছি তোমার বউ হতে, আর তুমি আমাকে বানাচ্ছেন বোন! সমস্যা নেই সামনে কি হয় তা সম্পর্কের আবার নতুন মোড় নিবে। তখন কে বোন আর কে বউ হয় তা বুঝতে পারবে শেহেতাজ খান নাভান। উরফে আমার জি ম্যান।
কথাটা মনে মনে তেজ নিয়ে বললেও, মুখে এক ফোটা বিরক্তিও ফুটতে দিল না সে। ভেতরে ভেতরে ছক কষে নিজেকেই শোনালো—
‘তুমি যতই দূরে ঠেলো না কেন জি-ম্যান, তোমার এই কাঠখোট্টা সরলতা আর দায়িত্ববোধকেই হাতিয়ার করে আমি তোমার জীবনে জাঁকিয়ে বসব। একজনকে হারিয়েছি, তোমায় তো আর হারাতে দিচ্ছি না! তোমার এই কেয়ারিং অ্যাটিটিউড, স্টাইল, দায়িত্ব—সব এখন থেকে শুধু আমার।’
অতীতের সেই নাটকীয় স্মৃতিটা মনে পড়তেই তিতিরের ঠোঁটে আবার সেই দুষ্টু মিষ্টি হাসিটা খেলে গেল। খুব আদুরে আর ঠান্ডা গলায় নাভানকে গিয়ে বলল সে—-
“জি-ম্যান, চলো না একটু দোলনায় গিয়ে বসি?”
নাভান পকেটে হাত গুঁজে গম্ভীর গলায় জবাব দিল,ল—
“তুমি গিয়ে বসো তিতির, আমি এখানেই আছি।”
“আহা, প্লিজ! এত ‘না না’ করো না তো! বন্ধুত্ব আর বোন-মার্কা এই গুরুদায়িত্বের খাতিরে অন্তত একটু সময় কাটাও আমার সাথে, প্লিজ!”
নাভান আর না করতে পারল না। সরল মনে হেরার দিকে একবার তাকাতেই হেরা তাকে চোখের ইশারায় সিগন্যাল দিল যেন মনে হলো —
‘যান আপ্নি , দেখে নিচ্ছি আমি! নাভান এর চোখে দুষ্ট হাসি,তার পরি বউটা যে জেলাসি হচ্ছে তা তার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে! সে কিছু না বলে পকেটে দু হাত গুজে সামনে হাটে!
‘ নাভান তিতিরের সাথে একটু সামনের দিকে হেঁটে গেল।
কিন্তু যাওয়ার পথেই আসল খেলাটা শুরু হলো। তিতির সুযোগ বুঝে একপা পিছিয়ে সোজা হেরার কানের কাছে গিয়ে ফিসফিস করে বিষ ঢালল—-
“ঘুড়ি কিন্তু এবার আমিই উড়াব মেহেরিমা তালুকদার হেরা! আর সেই ঘুড়িটা টেনে নিয়ে এই তিতির পাখি বহুদূরে ডানা মেলবে। জাস্ট ওয়াচ মি, নাভান কে এবার আমার চাই-ই চাই!”আর সে আমারি হবে!
হেরা হাত দুটো বুকের ওপর ক্রস করে দাঁড়াল। একটুও না ঘাবড়ে, একটা ভুবনভুলানো বাঁকা হাসি দিল সে। এক পা এগিয়ে তিতিরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখের তারা নাচিয়ে বলল—-
“তোমার কি সত্যিই মনে হয় তিতির পাখি, অসুস্থতার এমন চ্যাপ্টা বাহানা দিয়ে তুমি আমার ওই অসভ্য গিটারওয়ালাকে বগলদাবা করে নিয়ে যাবে? হাড়ে হাড়ে চিনি ওনাকে! ওপর থেকে বিশাল ম্যাচিউরড গ্যাংস্টার ভাব দেখালেও ভেতরে ভেতরে একদম ইমোশনাল ফিউজ উড়ে যাওয়া কেস! কিছু তেতো সত্য শুধু একটু সামনে আসতে দাও, তারপর ঘুড়ি তো দূরের কথা, পুরো লাটাই সহ গিটারওয়ালা যখন আমার একান্ত দখলে আসবে, তখন আকাশে কোনো তিতির পাখির পালকও খুঁজে পাওয়া যাবে না!”
তিতির ভুরু কুঁচকে কড়া চোখে তাকাল,ল—
“সেই সুযোগটা আমি তোমাকে দেব, তুমি ভাবলে কী করে মেহেরিমা তালুকদার হেরা!
হেরা চুল গুলো কানে পিছনে দিয়ে একদম রাজকীয় ভঙ্গিতে হাসল। তারপর কানের কাছে গলার স্বর নামিয়ে বলল—-
“আমি মেহেরিমা তালুকদার হেরা, ডার্লিং! সুযোগসন্ধানী ভিখারিদের মতো অন্যের থালায় নজর দেওয়া আমার স্বভাব না। নিজের জিনিসের ওপর আমি অন্যের ছায়া তো দূর, বাতাসটুকুও লাগতে দিই না। আর আমার গিটারওয়ালার কথা বলছ? ও তো সরলতার অবতার হয়ে তোমার বন্ধুত্বের দায়িত্ব পালন করতে গেছে। কিন্তু দিনশেষে ও কার খাঁচায় বন্দী হয়, সেটা দেখতে তোমার ওই চিল-মার্কা চোখ জোড়া খোলা রেখো!”
“ডার্লিং কাকে বলছো? কাকে কী নামে ডাকতে হয়, সেই শিক্ষাটাও কি পাওনি?”
তিতিরের গলাটা এবার যেন সোজা পঞ্চমে চড়ে গেল।
হেরা মোটেও পিছু হটলো না। সামনে আসা চুল গুলু ফু দিয়ে সরিয়ে চোখের ভ্রু দুটি নাচিয়ে বলল—-
” কী আর করব বলো? আমার অসভ্য বরটার ‘জানের জিগার’ বন্ধুর যে আবার ‘জান’ তুমি —তাই তো একটু খাতির-যত্ন করতেই হয়! ভেবে দেখলাম, এই তল্লাটে তোমাকে রোমান্টিক নামে ডাকার মতো কোনো পুরুষ মানুষ তো অবশিষ্ট নেই! তা ফাঁকা জায়গাটা না হয় আমিই একটু দয়া করে পূরণ করে দিলাম… ডার্লিং!
থেমে আবার বলে হেরা।
“আমি কিন্তু মৌমাছি! মন ভালো থাকলে টুকুস করে মধু মুখে তুলে দেব, আর ঘিলু গরম করলে টুকুস করে হুল ফুটিয়ে এমন ফোলা ফোলাব যে চিনতেই পারবে না!
তিতিরের গাল দুটো রাগে একেবারে লাল টকটকে হয়ে উঠল। ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলে বলল—
“ইউ স্টুপিড!”
হেরা হাত দুটো বাতাসে ছড়িয়ে দিয়ে গা জ্বালানো এক গাল হাসি উপহার দিল—
“সেম টু ইউ, মাই ডিয়ার ডাআয়ায়ায়ায়ার্লিং!”
তিতিরকে এভাবে রাগে এক পায়ে নাচতে দেখে হেরা মনে মনে একটা খিলখিল হাসি দিল। মুখে যতই কড়া মিষ্টির নোংরা ফ্লেভার দিক না কেন, হেরার ভেতরের মনটা কিন্তু পুরোপুরি পাষাণ নয়। আগেই রোজ,ঝিনুক,রুশা,অধীরের সৃজনের মুখে জায়িনের করুণ পরিণতি আর তিতিরের গল্পটা শুনে। হেরার নিজের চোখ থেকেও টপটপ করে জল ঝরেছিল। মেয়েটার অতীত আর তার এই মানসিক ভাঙনটার জন্য হেরার বুকের ভেতর সত্যি একটা চিনচিনে ব্যথা হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, তিতির ম্যাডাম এখন পুরো ব্যাপারটাকেই নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে ঢাল বানিয়ে ফেলেছেন! ‘অসুস্থতার নাটক’ আর নাভানের ‘অতিরিক্ত সরলতা’কে কাজে লাগিয়ে সে যে নাভানকে নিজের দখলে নিতে চাইছে—সেটা আর কেউ বুঝুক বা না বুঝুক, চালবাজিতে ওস্তাদ মেহেরিমা তালুকদার ঠিকই ধরে ফেলেছে।
মেয়েটার জন্য এক ফোঁটা সহানুভূতি তো অবশ্যই আছে, কিন্তু তাই বলে নিজের গিটারওয়ালাকে কারো থালায় সাজিয়ে উপহার দেওয়া? নেভার! হেরা যেমন তিতিরের অতীতটাকে সম্মান করে, তেমনি নিজের জিনিস কেড়ে নিতে আসলে তিতিরকে সোজা সাইজ করতেই ভালোবাসে। তাই সহানুভূতিটাকে আপাতত সাইড পকেটে লুকিয়ে রেখে, মিষ্টি মুখের বিষাক্ত বাণী দিয়ে তিতিরকে জ্বালাতন করার কাজটাই এখন হেরা খুব মজা নিয়ে উপভোগ করছে!
নিচে মেঘ ভেসে যাচ্ছে, দূরে নীল পাহাড়ের সারি আকাশের সঙ্গে মিশে গেছে। বাতাসে পাহাড়ি ফুলের গন্ধ।
ওদের একটু পেছনেই পুরো দলটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে দাঁড়িয়ে। অভিভাবকেরা—জাওয়াদ খান, এডভোকেট এম এল এ কাজল খান, জিহান তালুকদার, তৌহিদা তালুকদার—এক পাশে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন আর নিজেদের মধ্যে গল্পে মশগুল। মাঝে মাঝে কেউ মোবাইল বের করে ছবি তুলছেন, কেউ আবার পুরোনো ভ্রমণের স্মৃতিচারণ করছেন।
অন্যদিকে ইয়াং টিমের অবস্থা সম্পূর্ণ আলাদা। অধীর ইতিমধ্যেই একখানা শুকনো ডাল হাতে নিয়ে নিজেকে পাহাড়ের রাজা ঘোষণা করে ফেলেছে।
“এই পাহাড়… এই মেঘ… সব আমার রাজ্য! জনগণ, তোমাদের রাজাকে সালাম দাও!”
সঙ্গে সঙ্গে সৃজন পেছন থেকে একটা লাথি মেরে বলল—-
“মহারাজ, আগে নিজের প্যান্টের পেছনে লেগে থাকা কাদা পরিষ্কার করেন, তারপর রাজত্ব করেন।”
অধীর পেছনে তাকিয়ে সত্যি সত্যি কাদা দেখে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
“সবার কাদা থাকে জুতায়, আর আমার পিছনে!”
সবার সাথে যা ঘটে তার ঠিক উলটো ঘঠনা ঘটে আমার সাথে। হায় কপাল!!
ফেরার পথে তিতিরকে হাত ধরে নামাতে দেখে হেরা অজান্তেই তিতির ও নাভানের কাছে চলে যায়। সবাই ততক্ষণে অনেকটা সামনে চলে গেছে। পেছনে কেবল নাভান, হেরা আর তিতির। হেরা হঠাৎই তিতিরের হাত থেকে নাভানের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলে ওঠে—-
“সে আমার লাভান বর…!”
বলেই নিজের বলা বাক্যে নিজে স্তব্ধ হয়ে যায়। তোতলে উঠে রিপিট করতে থাকে
“এ… এ… এটা আমি কী বললাম! সরি! স সরি। আমার সাথে কী হচ্ছে এসব?”
তিতির বিরক্ত হয়ে বলল—-
“তুমি পাগল হয়ে গেছো হেরা! যেই নাভান আমার সাথে থাকছে এখন তোমার ফালতু কাহিনি। চলো জি ম্যান! আমরা সামনে যাই!
হেরাকে ওইভাবে রেখেই নাভান আর তিতির কিছুটা এগিয়ে যায়। তিতিরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে রেখে নাভান পেছনে ফিরে হেরাকে খুঁজতে যায়। হেরা পাহাড় ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে রিসোর্টের এক পাশে দোলনায় দুলছিল আর গভীর ভাবনায় ডুবে ছিল—
“কী হচ্ছে আমার সাথে আজকাল? আমি কেন এমন অদ্ভুত কথা বলছি? কিন্তু এই অদ্ভুত কথাগুলো ওই অসভ্য গিটারওয়ালার জন্য হচ্ছে কেন?”
নাভান এসে দপ করে হেরার পাশে বসতেই দোলনাটা দোলে ওঠে। হেরা পাশে ফিরেই নাভানকে দেখে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ফেলে। নাভান মুচকি হেসে বলল—–
“কী ব্যাপার? নিজের সাথে কথা বলছিলে, তাও আমাকে নিয়ে?”
হেরার কাঠ কাঠ জবাব –
“বয়েই গেছে আপনাকে নিয়ে কথা বলতে !”
“তুমি যতই বলো, তুমি আমাকে নিয়েই ভাবছ।”
হেরা এবার খানিকটা অন্যমনস্ক হয়ে যায়। এই লোকের সাথে সত্যি পেরে ওঠা যায় না। সে কিছুটা নরম সুরে বলে ওঠে—–
“আপনার সাথে আমার অতীতের কী এমন সম্পর্ক রয়েছে, বলবেন? আমি জানি, অতীতে আমার একটা গোপন প্রেমিক ছিল…”
নাভান মাথার চুলগুলো ব্যাক-ব্রাশ করে গভীর কণ্ঠে বলে ওঠে,
“অতীত-বর্তমান যা-ই বলো না কেন, তুমি সবখানে কেবল আমাকেই পাবে।”
“আপনি কি পরিষ্কার করে বলবেন?”
“আমি পরিষ্কারই আছি, জট তো তোমার মাথায়।”
“দেখুন, ভালো লাগছে না! আপনি মুখে বলবেন, আপনিই আমার সেই গোপন প্রেমিক। লুকাচ্ছে কেনো? আর অতীতে আপনার সাথে আমার কি সম্পর্ক আছে, বললে?
” কোনো সম্পর্ক নেই, অই একটা আছে তা হলো তোমার সুন্দরী মা আর পিপিমনির বাচ্চামো করে বিয়ে পরিয়েছিলো হুজুর ডেকে।
” আমার কেনো মনে নেই।
” এমনিতেও তুমি ছাত্রি ভালো না তাই ভুলে গেছো?
” আচ্ছা মানলাম আমার ভুলার স্বভাব আছে কিন্তু আপনি কেনো মিথ্যা প্রমান করছেন, আপনি আমার সেই গোপন প্রেমিক নন?
“সত্যি তো! আমি কারও গোপন প্রেমিক নই, আমি তো , প্রকাশ্য প্রেমিক!”
নাভান শার্টের হাতা গুটোতে গুটোতে অত্যন্ত নির্ভার ভঙ্গিতে বলল।
হেরা নাভানের দিকে ফিরে ।চোখের দৃষ্টিতে প্রখর জেদ ফুটিয়ে কড়া গলায় বলল—-
“আপনি বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলছেন! আপনিই যে সেই রহস্যময় ‘জি-ম্যান’, সেটা এখন নিজের মুখে স্বীকার করবেন!”
নাভান হাত দুটো বুকের ওপর আড়াআড়ি করে বাঁকা হাসল—
“আর আমি যদি না বলি?”
“বলবেন! আপনাকে বলতেই হবে।”
“না, বলব না!
নাভান ঠোঁট উল্টে একেবারে বাচ্চা ছেলেদের মতো জেদ ধরে বসল—-
“এই শেহতাজ খান নাভানের মুখ থেকে তুমি কেন, স্বয়ং আল্লহ ছাড়া কেউ জোর করে একটা শব্দও বের করতে পারবে না!”
“বলবেন না তো আপনি?” হেরার চোখের ভ্রু দুটো বিপজ্জনকভাবে কুঁচকে গেল।
“একদম না!”
“আপনি অবশ্যই বলবেন!”
“বললাম তো, না!”
হেরা এবার রাগে ফোঁস করে এক পা পিছিয়ে গেল। গলার স্বর কিছুটা নিচু কিন্তু বরফের মতো ঠান্ডা ও ধারালো করে বলল—-
“ওকে! আমিও দেখব আপনি না বলে কীভাবে থাকেন। আপনার সময় ঠিক ২৪ ঘণ্টা! এই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে যদি নিজের মুখে সত্যটা না স্বীকার করেন, তবে মেহেরিমা তালুকদার এমন এক জায়গায় হারিয়ে যাবে, যেখান থেকে তাকে খুঁজে বের করার সাধ্য আপনারও থাকবে না! আর কোনোদিন আপনার কাছে এই লুকোচুরির সত্য জানতেও চাইব না।”
হেরা দোলনা থেকে উঠে দাঁড়াতেই নাভানের মুখের তড়িঘড়ি হাসির ভাবটা মুহূর্তে উবে গেল। মেয়েটার গলার আওয়াজে এমন এক প্রচ্ছন্ন হুমকি আর জেদ ছিল, যা নাভানের বুকে অচেনা এক কাঁপন ধরিয়ে দিল।
নাভান ভেতরে ভেতরে কেঁপে ওঠে। রাগ আর অস্থিরতায় সে উঠে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে চলে যায়। এই কথাটার জন্য হেরার একটা না চারটা জোড়া থাপ্পড় থাপ্পড় খাওয়া উচিত ছিল, কিন্তু নাভান নিজের ওপর রাগ নিয়ন্ত্রণ রাখে। হেরাকে গোলকধাঁধায় ফেলে স্মৃতি ফেরানোই এখন নাভানের কাজ, কিন্তু হুট করে কিছু চাপিয়ে দেওয়া যাবে না—ডাক্তারের কড়া নিষেধ আছে, মানসিক চাপ নিলে হেরার বড় ক্ষতি হতে পারে। ধিরে ধিরে তার অতীতের কাহিনি সামনে আনতে হবে।
এদিকে হেরা আজ সব রহস্যের জট খুলতে চাচ্ছে । ঘুম এর ভিতর দেখা উদ্ভট ছায়া, মুখ ফসকে কথা বলে ফেলা। বিরক্ত হয়ে সে সোজা জাওয়াদ খানের কাছে চলে যায়।
জাওয়াদ খান, কাজল খান, তৌহিদা আর জিহান তালুকদার সবাই এক জায়গায় বসে কফি খাচ্ছিলেন। সাইডেই টিমের অন্য সদস্যরা বসা, শুধু নাভান ছাড়া। হেরা জাওয়াদ খানের সামনে গিয়ে সোজাসুজি প্রশ্ন করে—
“বাবা, তোমার ছেলের সাথে আমার অতীতে কী হয়েছিল? আমি কেন কিছু মনে করতে পারছি না?”
সবাই হেরার কথা শুনে থমকে যান, পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। জাওয়াদ খান দাঁড়িয়ে হেরার মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনার সুরে বলেন,
“এত হাইপার হচ্ছিস কেন মা? তুই তখন অনেক ছোট ছিলি, তাই মনে নেই।”
হেরা চটে গিয়ে বলে—-
“তাহলে ক্লাস থ্রি-ফোরের কথা মনে থাকতে না পারে, কিন্তু ৫, ৬, ৭, ৮ এই ক্লাসগুলোর কথা কিছু মনে নেই কেন?” আবার নাইন থেকে সব মনে আছে?
জাওয়াদ খান ঘাবড়ে যান। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে বলেন–
“তোর এমনিতেই একটু মানসিক সমস্যা আছে, তুই ভুলে যাস। তাই হয়তো মনে নেই।”
“মানসিক সমস্যা?!”
হেরা অবাক হয়! জাওয়াদ খান কথা কাটিয়ে বলে —-
“হ্যাঁ, তার জন্যই হয়তো মনে পড়ছে না।” অনেকেরে হয় এটা, ও তেমন কিছু নয় মা।
হেরা থমকে যায়। সে ক্লাসের একজন টপার স্টুডেন্ট, যেকোনো বিষয় একবার মাথায় ঢুকলে সহজে ভোলে না। বাবা কীভাবে এমন একটা কথা বলে দিলেন? সে কিছুতেই এটা মেনে নিতে পারছিল না।
সবাই একে একে সেখান থেকে সরে যান। হেরা চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে থাকে।
সেদিন পুরোটা সময় হেরা ভীষণ চুপচাপ ছিল। তিতির নাভানের পাশাপাশি ঘুরছিল। নাভানও রাগে আর হেরার কাছে যায়নি—হেরার মুখ থেকে “হারিয়ে যাব” কথা শুনে তার মন খারাপ ও রাগ দুটোই হয়েছিল। টিমের বড়রাও চিন্তিত ছিলেন, তাই সেদিন আর রাতের আড্ডা জমেনি। রাতে হেরা মন খারাপ নিয়ে রোজকে নিয়ে একই রুমে ঘুমাতে চলে যায়। সে ইচ্ছা করেই এটা করেছিল যাতে নাভান রাতে কোনোভাবেই ঘরে আসতে না পারে।
এদিকে সাজেকের অন্য এক নিজস্ব রিসোর্টের ভেতরে আধশোয়া অবস্থায় পড়ে আছে নিলয়। খালি গায়ে, আকর্ষণীয় উন্মুক্ত বডি, পরনে কেবল শর্টস। প্রচুর মদ খেয়েছে সে, সিগারেটের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন তার চারপাশ।
অতীতে এই রিসোর্টে আসলে নিলয়ের জন্য মেয়েদের পাঠানো হতো। তবে হেরাকে ভালোবেসে ফেলার পর থেকে সে নারীসঙ্গ থেকে দশ হাত দূরে থাকা শুরু করে। আজ প্রায় এক বছর পর এখানে এসে সে কোনো নারীর কথা বলেনি। কিন্তু রিসোর্টের ম্যানেজার পুরোনো অভ্যাসবশত না বুঝে নিলয়ের রুমে একটি অল্পবয়সি মেয়েকে পাঠিয়ে দেয়।
মেয়েটি গত তিন মাস ধরে নিখোঁজ। দেশ ভ্রমণে এসে এক ভয়াবহ পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছে সে। নিলয় কখনো নারী পাচার করেনি, তার কুৎসিত শখ ছিল মেয়েদের ভোগ করা । ইতিপূর্বে ১৮ টি মেয়ের সাথে সে একই কাজ করেছে। কিন্তু তা আজ অব্দি কেও জানে না। মেয়ে এনে দেয় রাতের অন্ধকারে, আর সেই মেয়েকে চোখ বেধে নিলয়ের রুমে পাঠায়। নিলয় নিজের পুরুষত্ব ফলিয়ে মেয়েটিকে বের করে দেয়। আর তার লোকেরা যেখান থেকে এনেছে সেখানে কোথাও রেখে আসে।
আজকের মেয়েটিকে রুমে ঢুকিয়ে ম্যানেজার বাইরে থেকে লক করে দেয়। নিলয় আধো চোখে হেরার নাম বিড়বিড় করছিল। কিন্তু মেয়েটিকে ঘরে দেখে তার পুরো শরীর জুড়ে তীব্র রাগ চেপে বসে। ধমকে উঠে বলে–.
“এই! দেখ তো, আমি সুন্দর না?”
মেয়েটি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে মাথা নিচু করে বলে, “হ্যাঁ…”
ভয়ে ভয়ে মেয়েটি উত্তর দেয় —
“হ্যাঁ কী? আমার বডি সুন্দর না?”
মেয়েটি নিলয় এর উন্মাদনা দেখে কেদে দেয় কাদো কাদো গলায় বলে —-
“আমায়… আমায় যেতে দিন! আমি বাসায় যাব, প্লিজ!
নিলয় মেয়েটিকে মাতাল অবস্থায় বলে উঠে —
“আমায় ভালো লাগেনি?”
“আমি বাসায় যাব…”
নিলয় রাগে অন্ধ হয়ে মেয়েটির গলা চেপে ধরে গর্জে ওঠে–
“তুইও আমার হেরা ফুলের মতো পালাতে চাস? তোরও আমায় পছন্দ হয়নি?”
মেয়েটি হাঁসফাঁস করতে করতে কান্নাকাটি করে বলে,
“ছ..ছে . ছেড়ে দিন আমায়! আমার ক্ষতি করবেন না… আমার ভালোবাসার মানুষটা মরে যাবে, আমি এনগেজড!”
‘ভালোবাসার মানুষ’ শব্দটা শুনতেই নিলয়ের ভেতরের হিংস্র সত্তা জেগে ওঠে। সে এক টানে মেয়েটির জামা ছিঁড়ে ফেলে, হাত-পা বেঁধে পাশবিক শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার শুরু করে। অতিরিক্ত মদের নেশায় নিলয়ের কোনো হুশ ছিল না যে সে কী করছে। মেয়েটির উপর শক্তি প্রয়োগ করতে থাকে,মেয়েটিকে দম ফেলার সুযোগ অব্দি দেয় নি নিলয়।
মেয়েটি বারবার আকুতি করছিল, কিন্তু নিলয় আজ কোনো কথা শুনল না। ভোর রাতে আজানের শব্দ যখন পাহাড়ে ভেসে আসছিল, ঠিক তখনই মেয়েটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। নেশার ঘোরে নিলয় লাথি মেরে দেহটি বিছানা থেকে নিচে ফেলে দেয় এবং রক্তাক্ত চাদরটা দিয়ে ঢেকে রেখে ঘুমিয়ে পড়ে।
——
সকালে ফোনের রিংটোন বাজতেই নিলয়ের ঘুম ভাঙে। চোখ মেলেই নিচে চোখ যেতেই সে শিউরে ওঠে। বিছানার চাদর সরাতেই ভেসে ওঠে একটা নিষ্পাপ, রক্তশূন্য নিষ্প্রাণ মুখ!
মুহূর্তের মধ্যে কাল রাতের সব দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নিলয় মাথায় হাত দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়ে। নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে সে নিজেকেই ধিক্কার দিতে থাকে—
“এ… এ আমি কী করলাম! হেরা ফুল… তোমার নিলয় তো এটা করতে চায়নি! আমি তো সব খারাপ কাজ ছেড়ে দিয়েছিলাম! সত্যিই ছেড়ে দিয়েছিলাম! তবে কেন আবার এই পাপ? উফ্ শিট! এ কী করলাম আমি!”
ছুটে ওয়াশরুমে গিয়ে শাওয়ার ছেড়ে দেয় সে, কিন্তু নিজের কলঙ্কিত শরীর যেন কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছিল না। সে তো হেরার ভালোবাসায় নিজেকে বদলে ফেলতে চেয়েছিল, কিন্তু মদের ঘোর আর অতীতের পাপাচার তাকে আবার টেনে নিচে নামাল।
ফ্রেশ হয়েই ম্যানেজারকে ফোন দেয় নিলয়। ম্যানেজার রুমে আসতেই নিলয়ের কড়া একটা ঘুসি তার মুখে গিয়ে পড়ে।
“এই জানোয়ারের বাচ্চা! তোকে বলেছিলাম মেয়ে পাঠাতে?!”
ম্যানেজার মুখ চেপে কাঁপতে কাঁপতে বলে, “স্যার… আগে তো আসলে আপনিই—”
“কুত্তার বাচ্চা! আগে আমার লাইফে কোনো পবিত্র ভালোবাসা ছিল না! কিন্তু এখন আমার বুকে একটা পবিত্র অস্তিত্ব রয়েছে! তুই সেটা নষ্ট করে দিলি, বাসটার্ড!”
নিলয়ের একের পর এক ঘুসি দিতে লাগে। ম্যানেজার ভয়ে বলে উঠে —
“স্যার, আমার ভুল হয়ে গেছে…”
হিংস্র চোখে নিলয় বলে উঠে —
“রাখ তোর ভুল! আমার পবিত্র আত্মাকে কলঙ্কিত করেছিস! এখন সব দায়ভার তোর! এই লাশ গুম করার দায়িত্বও তোর!”—
বলে আরও কয়েকটি লাথি-ঘুসি মেরে রিসোর্ট থেকে বের হয়ে যায় নিলয়।
ভিলেন হিসেবে নিলয় হয়তো সমাজের চোখে অপরাধী, কিন্তু হেরার প্রতি তার অনুভূতিতে কোনো ভেজাল ছিল না। আজ নিজের অসচেতন ভুলের কারণে সেই পবিত্র ভালোবাসার সামনে নিজেকে অপরাধী মনে করে অনুশোচনার আগুনে পুড়তে থাকে সে।
নিলয় সামনে একটা মসজিদ দেখতে পায় এই প্রথম নিলয় পা বাড়ায় মসজিদে, কেনো যেনো তার শান্তি লাগছে না কিছুতেই। অজু করে মসজিদে যায় সে।
যে মানুষটা জীবনে কখনো খোদার দরবারে মাথা নত করেনি, আজ সে এই সকাল বেলায় জায়নামাজে হাঁটু গেড়ে বসেছে।
“হে আল্লাহ… তুমি তো জানো আমি কেন এসেছি। আমার মুখে কিছু না বললেও তোমার অজানা থাকার কথা নয়।
এতদিন অগণিত পাপ করেছি, হাজারো ভুল পথে হেঁটেছি—কিন্তু কখনো একবারের জন্যও মনে হয়নি আমি ভুল করছি। আমার বিবেক কোনোদিন আমায় বাধা দেয়নি। কিন্তু আজ… আজ আমার মনে হচ্ছে, আমি সত্যিই অপরাধী। আমার জীবনের সেই অন্ধকার ধুলোবালির মাঝে তুমি এমন এক পবিত্র ফুলকে এনে দাঁড় করালে, যার আলোয় আমার সমস্ত অন্ধকার প্রকাশ পেয়ে গেছে। আমার এই অপবিত্র, পাপিষ্ঠ হাত দিয়ে আমি আমার সেই পবিত্র ফুলকে ছুঁতে ভয় পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, আমার স্পর্শেই বুঝি তার পবিত্রতা মলিন হয়ে যাবে! কী বলবো তোমায়, কীভাবে ক্ষমা চাইবো—আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না। কোনোদিন তো তোমার কাছে হাত পাতা শিখিনি! কিন্তু আজ আমার সমস্ত অহংকার চূর্ণ করে তোমার কাছে মিনতি করছি—তুমি আমার অতীত, আমার সমস্ত পাপ মুছে দাও। আমায় একদম খাঁটি আর পবিত্র করে দাও, যাতে আমি বুক ফুলিয়ে আমার সেই পবিত্র ফুলের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারি। আমি আজ কথা দিচ্ছি, জীবনের সব অপরাধ, সব অন্ধকার পথ আমি চিরতরে ছেড়ে দেবো। শুধু আমার ‘ফুলটাকে আমার করে দাও। তুমি আমায় মাফ করে দাও, প্লিজ…গড!
থেমে আবার আকুতি করে বলে —-
”হে আল্লাহ… আমার সমস্ত পাপ মুছে আমায় খাঁটি করে দাও, যাতে আমি আমার পবিত্র ফুলটার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারি…”
নিলয়ের চোখের পানি তখন জায়নামাজের কাপড়ে গড়িয়ে পড়ছে। একজন , নির্মম মানুষের ভেতরে যে এতটা আকুলতা, এতটা নিষ্পাপ ভালোবাসা লুকিয়ে থাকতে পারে—তা হয়তো এই আল্লাহর ঘর ছাড়া আর কেউ কোনোদিন দেখেনি। ভালোবাসা মানুষকে কীভাবে বদলে দেয়, আর একটা পবিত্র প্রেমে পড়ে একজন ভিলেন কীভাবে নিজের সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে নতুন হওয়ার ব্যাকুলতায় ছটফট করে—নিলয় আজ তার জীবন্ত প্রমাণ দিয়ে যাচ্ছে —-প্রায় ঘন্টা খানিক সিজদাহ্তে লুটিয়ে থাকে নিলয় —
সকাল সকাল
আকাশ যেন নিজেই কাঁদছিল। নিলয়ের জন্য। মানুষ অপরাধ করে, একটা আল্লাহ সুযোগ দেয় দুই বার কিন্তু একই ভুল মানুষ বার বার করলে শাস্তি তো পেতেই হবে। নিলয়ের মনে এখন সেই ছটফট এর আগুন জ্বলছে। গতকাল রাত থেকে শুরু হওয়া ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামতে নামতে রূপ নিয়েছিল ভারী বর্ষণে। পাহাড়ি রিসোর্টের টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এমনভাবে পড়ছিল যেন কেউ অবিরাম ঢোল বাজাচ্ছে। গতরাতেই রিসোর্টের কেয়ারটেকার লোকটা এসে সবাইকে সাবধান করে গিয়েছিল নাভানদের সবাইকে —
“আপা, পাহাড় রিস্কে আছে। প্রশাসন থেকে লাল পতাকা টাঙানো হয়েছে। কেউ যেন রাতে বা ভোরে একা বাইরে না যায়।”
কথাটা কানে গিয়েছিল সবার, কিন্তু মনে গেঁথেছিল কজনের—তা বলা মুশকিল।
সেই বৃষ্টিভেজা রাস্তা দিয়ে, পাহাড়ের উঁচু-নিচু বাঁকে বাঁকে, একটা চকচকে দামি গাড়ি এগিয়ে যাচ্ছিল ধীরে, সন্তর্পণে। গাড়ির চাকা মাঝেমধ্যে পিছলে যাচ্ছিল কাদায়, আর প্রতিবার সেই পিছলে যাওয়ার শব্দে নিলয়ের বুকের ভেতরটাও যেন একবার করে কেঁপে উঠছিল। কিছুক্ষন আগের কথা —
হঠাৎ ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠল। ড্যাশবোর্ডের আলোয় স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা নাম। নিলয় মসজিদ থেকে বের হয়েছিলো কিন্তু পাহাড়ি অবস্থা ভালোনা দেখে রিসোর্ট থেকে খানিক দূরে কারের ভিতর বসে ছিলো। সিটের উপর থেকে এক হাত দিয়ে ফোন রিসিভ করল। ওপাশ থেকে একটা মেয়েলি কণ্ঠ, চাপা কিন্তু তীক্ষ্ণ, ভেসে এল—
“নিলয়, কাম ফাস্ট। এখন সবাই ঘুমে। আর তোমার হেরা—বাইরে গেছে।”
নিলয়ের হাত মুহূর্তের জন্য কেঁপে উঠল স্টিয়ারিংয়ের উপর।
“এই… রিস্কি অবস্থায় বাইরে?”
গলার স্বর ভেঙে এল যেনো।
“টাইগার টিলা নাকি কি পাহাড় এর কথা বলেছিলো। রোজ নাকি অই দিকে গিয়েছে!
নাম শোনামাত্র নিলয়ের সারা শরীর হিম হয়ে গেল। হাত-পা কাঁপতে লাগল। ওটাই তো সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, সবচেয়ে অস্থির পাহাড়—যেটার কথা কাল রাতে কেয়ারটেকার নিজে মুখে বলে গেছে।
“হোয়াট!” নিলয় প্রায় চিৎকার করে উঠল, গাড়ির ভেতর তার গলা প্রতিধ্বনিত হলো।
“ওই পাহাড় তো সবচেয়ে রিস্কি! তিতির, আমার হেরার যদি কিছু হয়… আই সোয়ার, আমি খুন করে ফেলব তোকে —”
“আর ইউ ম্যাড, নিলয়?”
তিতিরের গলায় বিরক্তি, কিন্তু তার নিচে লুকিয়ে থাকা একটা ঠান্ডা হাসি নিলয় ধরতে পারল না।
”
” আমি কি জানতাম নাকি ও এমন জায়গায় যাবে? রোজ-কে খুঁজতে বেরিয়েছে, আমি তো কিছু বলিনি। কথা না বাড়িয়ে জলদি যাও । আর… তোমার সাথে হাত মেলানোটাই বোধহয় আমার ভুল ছিল।”
লাইনটা কেটে গেল। নিলয় স্টিয়ারিংয়ের উপর কপাল ঠেকিয়ে এক মুহূর্ত চোখ বুজল, তারপর অ্যাক্সিলারেটরে চাপ দিল আরও জোরে। গাড়িটি বৃষ্টির পর্দা চিরে এগিয়ে চলল পাহাড়ি পথে।
–
তিতির আর নিলয়ের মধ্যে একটা নিঃশব্দ চুক্তি হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে। পরিকল্পনাটা সহজ ছিল দেখতে—হেরাকে কোনোভাবে একা করে ফেলা, যাতে একটা সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগ তৈরির দায়িত্ব ছিল তিতিরের।
কিন্তু তিতির যে গভীর জলের মাছ, সেটা নিলয় বোঝেনি। এক ঢিলে সে দুই পাখি মারার ছক কষে ফেলেছিল আরও আগেই।
ভোরবেলা রোজ সবার আগে ঘুম থেকে উঠে রিসোর্টের পেছন দিকে চলে গিয়েছিল, একা, নিজের মনখারাপ নিয়ে। হেরা ঘুম ভেঙে রোজকে না পেয়ে খুঁজতে শুরু করে। ঠিক তখনই তিতির যেন আকস্মিক আতঙ্কে অস্থির হয়ে ছুটে আসে হেরার কাছে।
“হেরা! রোজ নাকি পাহাড় দেখতে একাই বেরিয়ে গেছে! জানো তো, আজ বাইরে যাওয়া নিষেধ—আমার ভীষণ ভয় করছে ওর জন্য।”
হেরার বুক ধক করে উঠল। “মানে কী বলছো তুমি, তিতির?”
“হ্যাঁ … সম্ভবত সৃজনের সাথে ওর কিছু একটা হয়েছে কাল রাতে। আমার ভয় লাগছে খুব।”
তিতিরের চোখেমুখে এমন নিখুঁত উদ্বেগ ফুটে উঠেছিল যে কারও পক্ষে সন্দেহ করার উপায় ছিল না।
“কোন দিকে গেছে, বলতে পারো?”
“হ্যাঁ… কী যেন একটা নাম বলছিল… টা… টাইগার…”
“টাইগার টিলা?” হেরা তাড়াতাড়ি বলে উঠল।
“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওটাই শুনেছিলাম মনে হয়!”
হেরা আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। রোজের নাম শুনেই তার ভেতরটা এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল। ছুট লাগাল সে, রিসোর্ট থেকে পাঁচ-সাত মিনিটের দূরত্বে থাকা সেই পাহাড়ি পথের দিকে।
হেরা চোখের আড়াল হতেই তিতির হাততালি দিয়ে ফিসফিস করে বলে উঠল, নিজের মনে, বৃষ্টির শব্দে চাপা পড়া গলায়—
“”দশ মিনিটের মধ্যে পুরো পাহাড় ধসে পড়বে। গুড বাই, মেহেরিমা তালুকদার হেরা। তুমি যে রাস্তায় যাচ্ছ, ওটাই তোমার কবর হতে চলেছে।”
তার ঠোঁটের কোণে একটা শীতল হাসি খেলে গেল, বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার মুখের উপর দিয়ে গড়িয়ে পড়তে লাগল, যেন প্রকৃতিও নিজেই কেঁদে দিচ্ছে তার হয়ে।
হেরা রাস্তায় ওঠামাত্র দেখল, সামনের দিকে কাদা গড়িয়ে পড়ছে অনবরত, মাটি নরম হয়ে ধসে যাচ্ছে জায়গায় জায়গায়। বুক কাঁপল তার, তবু পিছিয়ে গেল না। ছুটে গেল আরও ভেতরে, চিৎকার করে ডাকতে লাগল—
“রোজ! গোলাপ ফুল , কই তুই?”
গতকাল থেকেই রোজের মনখারাপটা হেরার চোখ এড়ায়নি। রাতে যখন হেরা শুয়ে পড়েছিল, তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রোজ যে নিজের মৃত্যু কামনা করছিল—সেই ফিসফিসানি হেরার কানে গিয়েছিল। তাই বন্ধুর জন্য তার ভেতরের ভয়টা আরও বেশি তীব্র হয়ে উঠেছিল। নিজের জীবনের তোয়াক্কা না করে সে কাদার উপর দিয়েই এগিয়ে যেতে লাগল, চিৎকার করতে করতে।
পাহাড়ি রাস্তায় ওঠার সাথে সাথে বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেল আরও কয়েকগুণ। চারদিক ঘোলাটে হয়ে এল। হেরা এখন না পারছে পেছনে ফিরতে, না পারছে সামনে এগোতে। প্রবল বাতাসের ঝাপটায় তার ওড়নাটা উড়ে গিয়ে কাদায় পড়ে গেল। তবু সে দমল না। রোজের কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে কাদামাটি ভেঙে ভেঙে এগোতে লাগল।
আর ঠিক দুই মিনিটের মাথায়—
প্রেমের বাজিমাত পর্ব ৫২ (৪)
একটা বিকট গর্জনের সাথে বিশাল পাহাড়টা ধসে পড়ল। হেরার ঠিক উপর দিয়ে।
মাটির নিচে চাপা পড়ে গেল হেরার নরম, কোমল দেহ। চারপাশে শুধু কাদামাটি, ভাঙা গাছের ডাল, আর বৃষ্টির অবিরাম ধারা। ধ্বংসস্তূপের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আছে শুধু একটা হাত—নিথর, নিস্পন্দ, বৃষ্টির জলে ধুয়ে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
দূরে , রিসোর্টের বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিতির তখনও আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল, ঠোঁটে সেই একই ঠান্ডা হাসি নিয়ে।
