ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪১
শানজানা আলম
আমার মনে হয় না অথৈ কে জিজ্ঞেস করার কিছু আছে- অথৈ এর বাবা বললেন।
এহসান বলল, তবুও আমার মনের শান্তির জন্য আপনি ওকে জিজ্ঞেস করুন। আমি কথা দিচ্ছি, অথৈ না বললে, আমি আর একটা কথাও বলব না। এখানেই সব কথা শেষ করে ফিরে যাব।
ফিরোজ ভাই এহসানের বাহুতে হাত রাখলেন।
এহসান এবার শেষ অস্ত্রটা প্রয়োগ করল। তবে এটা শেষ নয়, এই একমাত্র অস্ত্রের ভরসায় সে যুদ্ধক্ষেত্রে এসেছিল। এতক্ষণ অথৈ একটা টু শব্দও করে নি। এত এত নেগেটিভ কথা শুনে, ওর মন কি ঘুরে যেতে পারে! গেলে এহসান কি করবে, আবারও একটা ধাক্কা খাবে!
তবে কোথায় যেন একটা বিশ্বাস আছে, অথৈ না বলবে না।
-ঠিক আছে, অথৈ, শুনলে তো সবটাই, এহসান তোমাকে বিয়ে করতে চাচ্ছে, এমন প্রস্তাব নিয়ে এসেছে, এতে আমার বা তোমার মায়ের মত নেই, এহসানের পরিবারের মত নেই, সামাজিক একটা চাপ আসবে চারপাশ থেকে। তুমি বলে দাও, তোমার মত নেই।
এহসান কৌতুহল নিয়ে অথৈ এর দিকে তাকালো, অথৈয়ের দৃষ্টি শূন্য অস্ফুট স্বরে সে কি বলল, নিজেই শুনতে পেল না।
এহসান বলল, অথৈ, যা বলতে চাও, স্পষ্ট করে বলো, প্লিজ। তোমার কথার উপর সব নির্ভর করছে।
অথৈ এবার স্পষ্ট করে বলল, আমি এই সম্পর্কে রাজী আছি! আমি বিয়েটা করতে চাই।
সমস্ত ঘরে পিন পতন নিস্তব্ধতা।
তাহিরা বেগম অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে অথৈ এর দিকে তাকালেন। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছেন না, তার এক মেয়ে অন্য মেয়ের তালাক হওয়া জামাইকে বিয়ে করতে রাজী! তাও অথৈ এর মতন শান্ত সংসারী মেয়ে! এজন্যই কি তবে ঐশির তালাক হলো! কারনটা অথৈ!
অথৈ এর বাবা কিছু সময় চুপ করে থেকে বললেন, আমার বুঝতে ভুল হয়েছিল। অথৈ এর সমর্থন ছাড়া এহসান সবাইকে অগ্রাহ্য করে এত বড় সিদ্ধান্ত নিতে পারত না। এখানে এসে অথৈকে বিয়ের প্রস্তাব দিতে পারতো না। অবশ্যই অথৈ ওকে সাপোর্ট করেছে, এহসান সেটা জানে, জেনে বুঝেই এসেছে। আমার তো এখন মনে হচ্ছে, ঐশির সংসার ভাঙার পিছনে তুমি দায়ী অথৈ!
এহসান বলল,,দেখুন, একটা বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।অথৈ এর সাথে আমার কথা হয়নি সেটা বলব না। তবে ওকে ব্লেম করার মতন কিছুই অথৈ বা আমি করি নি। আর একটা বিষয় স্পষ্ট করেই বলি, অথৈ এর সাথে আমার কোনো প্রেমের সম্পর্ক কখনোই ছিল না, এখনো নেই। অথৈ না ও বলতে পারতো, আমি সেই সম্ভবনা জেনেই এসেছিলাম।
আমার জীবনে অথৈকে প্রয়োজন, আপনার কাছ থেকে ওকে নিতে এসেছি, আমাকে আপনি অথৈকে দিন, সারাজীবন আপনার দান আমি মাথায় তুলে রাখব।
অথৈ এর বাবা বললেন, সেটা তো আগেরবারও হতে পারত এহসান, হয় নি তো! আমার এক মেয়ে তোমার কাছে থাকতে পারেনি, সেখানে তারই সহোদরা বোনকে আমি পাঠাতে ভরসা পাচ্ছি না। অথৈ হয়তো আবেগে বলে ফেলেছে, সেটা কোনো বিষয় না।
এহসান বলল, অথৈ যখন রাজী,তখন, আমি একা ফিরব না, অথৈকে নিয়ে ফিরব।
অথৈর বাবা বললেন, প্রেম নেই এটা যেমন বড় গলায় বলতে পারছ, তেমনি কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে, যেটা তোমাকে এতটা ডেস্পারেট হওয়ার মত ইন্ধন দিয়েছে। প্রেমের সম্পর্কের বাইরের কোনো বোঝাপড়া হয়তো নিশ্চয়ই আছে। তুমি এখন আসতে পারো। আমার মত নেই এই বিয়েতে। অথৈ যদি রাজী থাকেও, আমি বিয়েটা দেব না।
ঐশি অথৈ এর বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, অথৈ, তোমাকে একটা কথা বলি, তুমি বাচ্চা মেয়ে না, বিষয়টি জানাজানি হলে তোমার কলংক রটে যাবে, সবাই বলবে তুমি দুলাভাইয়ের সাথে প্রেম করে ভেগে গেছ, বোনের সংসার ভেঙেছ, এইগুলো মেনে নেওয়া এত সহজ না। কথার আঘাত রুহ নাড়িয়ে দেয়। তোমার জীবন মানুষ অতিষ্ট করে ফেলবে। বোনের সাথে সম্পর্ক খারাপ হয়ে যাবে। স্বামী যতই আপন হোক, একটা স্বাক্ষরের সম্পর্ক, যে কোনো মুহুর্তে সেটা ভেঙে যেতে পারে, সেটা তো দেখেছই। আজ এহসান ভালো, কাল যদি খারাপ মনে হয় তোমার কাছে, বোনকে অগ্রাহ্য করো না, রক্তের বাধন আলগা হয় না।
অথৈ বলল নিচু স্বরে বলল, আমি রাজী এই বিয়েতে।
তাহিরা বেগম অথৈকে একটা থাপ্পড় মেরে বসলেন। অথৈ ছিটকে পড়ে গেল। এহসান দ্রুত উঠে গিয়ে অথৈ কে তুললো। ঠোঁটের পাশটা কেটে গেছে, এহসান পকেট থেকে রুমাল বের করে ঠোঁটটা মুছিয়ে দিলো।
অথৈ এর চোখ ছল ছল করছে। মনে হচ্ছে এখনি জল গড়িয়ে গালে পড়বে।
এহসান বলল, এসব কইরেন না প্লিজ, আমাকে এত অপছন্দ আপনাদের, আমি চলে যাচ্ছি না হয়। অথৈ এর কখনো মনে হলে ও আসবে। অথৈ তো ছোট না, এভাবে মারামারি করার কিছু হয় নি।
তাহিরা বেগম বললেন, একটা চড়ে তোমার দাঁত ফেলে দেওয়া উচিৎ বেয়াদব অসভ্য মেয়ে, লজ্জা শরম সব গেছে নাকি! তোমার আর কোনো কথা শুনব না, যাও ঘরে যাও।
অথৈ এর বাবা বললেন, ভুল হতে পারে সেটা দীর্ঘায়িত করা বুদ্ধিমানের কাজ না, সব ভুলে যাও। ঐশিকে এসব কিছু জানতে দিও না, এহসান, তুমি এখন এসো।
এহসান বলল, অথৈ এত বাঁধা ডিঙিয়ে আসতে পারলে এসো, আমি অপেক্ষা করব তোমার জন্য।
বলে এহসান বের হয়ে যেতে উদ্যত হলো,
অথৈ বলল, আপনি দাঁড়ান, আমি।আসছি!
অথৈয়ের বাবা বললেন, যেতে পারো, সেক্ষেত্রে তোমার সাথে আমরা আর কোনো সম্পর্ক রাখব না। এমন কুলাঙ্গার আমার সন্তান ছিল, আমি ভুলে যাব।
এহসান বলল, আব্বু , একটা শেষ অনুরোধ, আপনি অথৈ কে আমার সাথে বিয়ে দিয়ে দিন। আমি ওকে সসম্মানে নিয়ে যাই।
অথৈ এর বাবা চুপ করে কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তাকে কৌশল করতে হবে। এখনকার ছেলে মেয়েরা অন্যরকম। জোর জবরদস্তি করে হয় না। এহসানকে একবার বের করে দিতে পারলে, তারপর অথৈয়ের বিষয়টা দেখা যাবে।
তারপরে এহসানকে বললেন, অথৈ এখানে আছে, থাকুক,তুমি তোমার পরিবারকে ম্যানেজ করে এসো, তারপর দেখা যাবে।
এহসান বলল, না, আমি সময় নষ্ট করতে চাই না। নিজের দায়িত্বে অথৈ কে নিয়ে যেতে এসেছি। আজই বিয়ে হবে। আপনি শুধু আমাদের বিয়েটা দিয়ে দিন।
আমি চাই না কাজী অফিসে গিয়ে অথৈ এর বিয়ে হোক। অন্তত আপনারা আমার হাতে অথৈ কে তুলে দিন। অথৈ এর মনে স্বান্তনা থাকবে, যে ও লুকিয়ে, পালিয়ে, ভেগে গিয়ে বিয়ে করে নি।
ফিরোজ ভাই, আপনি ব্যবস্থা করেন তো! কাজী সাহেবকে ডেকে আনেন।
আর অথৈ, ব্যাগ গুছিয়ে নাও, বিয়ে পড়ানো হয়ে গেলেই আমরা রাতের বাসে ঢাকায় ফিরে যাব।
অথৈ দ্রুত রুমে চলে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলল। নিজের টুকাটুকি জিনিসপত্র আর জামাকাপড় একটা ব্যাগে গুছিয়ে নিলো। এত কথাবার্তার মধ্যে সকাল থেকে খাওয়া হয় নি, টেনশনে মুখ থেকে তেতো উঠছে।
তাহিরা বেগম চুপ করে বসে রইলেন ডাইনিংয়ে, কি হচ্ছে এসব! পরবর্তী পরিস্থিতি কিভাবে সামলানো যাবে!
অথৈ রুম থেকে বের হয়ে ঐশির গয়নার রিসিটটা মায়ের হাতে দিলো।
তাহিরা বেগম বললেন,এটা কি?
আপুর চুরি যাওয়া গয়নার রিসিট। এগুলো বদলে একটা সীতাহার নেওয়া হয়েছে চুরির পরপরই।
চোর আর কেউ না, আপু নিজেই গয়না সরিয়েছিল, মা আমাকে হয়তো এখন দোষী মনে হচ্ছে, কিন্তু আপু এমন অনেক কিছু করেছে, যেটা কল্পনার বাইরে ছিল।
এহসানের জীবনটা ছাড়খাড় করে দিয়েছে।
তাহিরা বেগম বললেন, নিজের দোষ ঢাকতে এখন বোনকে চোর সাজাচ্ছ! কুলাঙ্গার মেয়ে একটা!
মানুষ ঠিকই বলে, ভ্যাদা মাছ জাল ছেড়ার যম হয়,
চুপচাপ ভদ্র মেয়ের মুখোশ পড়ে তুমি সবাইকে ঠকিয়েছ। অথৈ আর কথা বাড়লো না। এখন পরিস্থিতি অন্যরকম।
তাহিরা বেগম ফিসফিস করে বললেন, এত বড় বিশ্বাসঘাতকতা অথৈ করতে পারল আমার সাথে, অবিশ্বাস্য!
ঘন্টাখানেকের মধ্যে, কাজী অফিস থেকে কাজী সাহেবকে নিয়ে এসে অথৈ আর এহসানের বিয়ে পড়ানো হল। কাউকে ডাকা হলো না, কোনো সাড়াশব্দ হলো না। ভীষণ নিস্তরঙ্গ ভাবে অথৈয়ের নতুন জীবন শুরু হলো।
বাসা থেকে বের হওয়ার সময় অথৈয়ের বাবা অথৈকে বললেন, আর কখনো যেন তোমার মুখ আমাকে না দেখতে হয়।
অথৈ কেঁদে ফেলল।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪০
এহসান অথৈ এর হাত ধরে বলল, অথৈ, এসো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি তোমার পাশে আছি, কোথাও একমুহূর্তও তোমাকে আমি একা হতে দেব না।
অথৈ এর হাত ধরে এহসান বের হয়ে গেল অথৈদের বাসা থেকে।
