ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৭
শানজানা আলম
সকাল হয়েছে, জানালা দিয়ে আলো ঢুকে পড়েছে।
-এ্যই অথৈ- এহসান ডাকল।
অথৈ অন্যদিকে ফিরে ঘুমাচ্ছে। এহসান ঝুঁকে নিজের কাছে টেনে নিলো। নাকে নাক ঘষে, ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁইয়ে ডাকল, এই, উঠবে না?
-হুম!
– ওঠো।
অথৈ এহসানকে আকড়ে ধরে বলল, আরেকটু ঘুমাই-
এহসান বলতে পারল না, আমার অফিস আছে। কলিগকে টেক্সট করে দিলো, একটু লেট হচ্ছে আসতে।তবে আসবে।
অথৈ অবশ্য বেশি সময় ঘুমালো না, উঠে পড়ল।
এহসান বলল, কোথায় যাচ্ছ?
কিচেনে।
কেন?
ব্রেকফাস্ট তৈরি করে দিই, বাইরে খেতে হবে না।
দরকার নেই। উঠতে হবে না। আমি ব্রেকফাস্ট তৈরি করব আজ তোমার জন্য। এহসান টেনে নিলো অথৈকে ৷ আষ্টেপৃষ্টে ধরে রাখল।
আদুরে সকালের রোদ.. আলতো করে ছুঁয়ে গেল।
এহসান অথৈকে চুমু খেল অনবরত।
অথৈ বলল, অফিসে যাবে না?
হুম, একটু পরে। কাজের কথা শোনো, লিস্ট করে ফেলবে, শুক্রবার শপিং করে ফেলব।
অথৈ বলল, কি লিস্ট করব?
টোটাল বিয়ের শপিং, তোমার জন্য। তাছাড়া প্রয়োজনীয় যা কিছু লাগবে।
অথৈ বলল, এখন এসব থাকুক, তোমার জন্য তো কিছু হচ্ছে না৷
পরে যদি ঠিক হয় সব, তখন না হয়….
অথৈকে থামিয়ে দিলো এহসান চুমু খেয়ে। ওকে বুকে টেনে বলল,
আমার কিছু দরকার নেই অথৈ, আমার যাকে প্রয়োজন ছিল, আমি তাকে পেয়ে গেছি। তোমার বরং সবকিছু সুন্দর হতে পারত, সুন্দর একটা বিয়ে প্রোগ্রাম, আত্মীয় স্বজনদের দোয়া, হলো না, আমাকে বেছে নেওয়ার জন্য।
অথৈ বলল, আচ্ছা আন্টিরও তো মত নেই, তাই না? আমাদের বিয়েতে?
-আমার আম্মা? আছে, তবে সামাজিক কটুকথার ভয়ে সাহস পাননি কিছু বলার। ভাইয়াও তো রাজী না। ভাবীর বোনের সাথে বিয়েতে রাজী হই নি!
-তোমারও ভালো হতো সেটা, তাই না? – অথৈ জিজ্ঞেস করল।
-আসলেই, তোমার আমার এত ভালো আমার দূরে সরিয়ে দিলাম! কিভাবে পেরেছি বলো তো!
অথৈ এহসানের বুকে মুখ লুকিয়ে বলল, জানি না।
জানার দরকারও নেই। তুমি শুধু আমার। দিনে একশ বার মনে করবে এহসান, এহসান, এহসান!
-না, আরেকজনকে ভাবতে হবে!
-ঠ্যাং ভেঙে দিব তাহলে ওই আরেকজনের।
-মন্ত্রীর ছেলের ভয়ে রাতারাতি বিয়ে করে নিয়ে এসেছে, ভীতু পুরুষ!
-ভালোই হয়েছে জানো, কারন আমাদের বিয়ে কেউই দিয়ে দিতো না। তুমিও বলতে না আমাকে কিছুই।
-কি বলতাম না?
– ভালোবাসি বলতে পারতে না।
-এখনো তো বলি নি!
-থাক, আর বলতে হবে না। না বলেই যা দিয়েছ, এহসান ধন্য হয়ে গেছে।
অথৈ বলল, আচ্ছা, আন্টিকে নিয়ে যাব শুক্রবার?
-আম্মাকে? না, পরে আনব তাকে। আম্মার আসার ইচ্ছে ছিল বোধহয়, আমিই বলিনি। কারন তোমার আমার নিজস্ব কিছু সময় প্রয়োজন। নিজেদের বোঝাপড়ার। নতুন সম্পর্কের ধাক্কাটাও কম নয়। এই সময়ে মা এলে, খুটখাট করে কথা বলবেন, তোমার ভুল ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন। আমি মা আর বউ ব্যালান্স করতে পারব না। আমার লাইফে আমি এই মুহুর্তে ভেজাল চাই না। আমরা নিজেরা একটু গুছিয়ে মাকে নিয়ে আসব। এই সময়টা আমাদের নিজেদের দেওয়া প্রয়োজন, একান্ত আমাদের সময়।
– এহসান একটানে বলে গেল।
অথৈ বলল, কি কথার অবস্থা, ভেজালের কি হলো!
-আছে, অনেক সমস্যা হয়৷ বুঝবে আস্তে আস্তে।
এহসানের কথা একদম ঠিক আছে, বঙ্গদেশীয় পুরুষের জীবনের একটা বড় সময় চলে যায়, মা আর বউ ব্যালান্স করতে। মা মায়ের জায়গায়, তবে বর্তমান জীবনটায় স্ত্রীর গুরুত্ব বেশি। ওয়াইফ পারে জীবনটা সাজিয়ে সুন্দর করতে। তাকে স্পেস দেওয়া প্রয়োজন। জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে বউ ছাড়া কেউ থাকে না পুরুষের পাশে,।সুখের সময় যাও থাকেশ বিপদে কাউকে পাওয়া যায় না। অবশ্য ঐশির মতন বউ হলে আলাদা কথা!
একটা পর্যায়ে বাবা মা আর পরিবারের প্রতি সম্পর্ক দায়িত্বে গিয়ে ঠেকে, এই দায়িত্ব হয় প্রয়োজনীয় কেনাকাটা,ওষুধ, ডাক্তার পথ্য।এসব। যার অনেকটাই নির্ভর করে আর্থিক স্বচ্ছলতার উপর।
বাবা মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন ঠিকঠাক করলে বিষয়টা নিয়ে ঝামেলা হয় না। তবে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে অন্য কোনো গার্ডিয়ানকে হস্তক্ষেপ করতে না দেওয়াই ভালো।
এহসান যেন দ্বিতীয় সম্পর্কে প্রতিটি বিষয় সূক্ষ্ণ ভাবে ভেবে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, কারো মন রাখতে হয়, সমাজকে দেখাতেও নয়। স্রেফ নিজের ভালো থাকার বাইরে একটা কদম পা ফেলতেও এহসান রাজী নয়।
ঐশি সকাল সাড়ে আটটার দিকে তাহিরা বেগমকে ফোন করেছে।
মা, কি খবর তোমাদের? একদম মনে হয় হারিয়ে গেলে, বাবা অথৈ কই সবাই!
তাহিরা বেগম ঠান্ডা স্বরে বললেন, তোমারও তো সময় হয় নি কথা বলার!
ওহ, মা একটু ট্রিপে ছিলাম, একটা রিসোর্টে গিয়েছিলাম ফটো শ্যুট করতে। মডেল নিয়েছি, ডিজাইনার আবার পরে আমাকেও দাঁড় করিয়ে দিলো।
তাহিরা বেগম জানতে চাইলেন, এই বিজনেসের টাকা কোথায় পেয়েছ তুমি?
মা, জোগাড় করেছি। অথৈ কোথায়?
অথৈ বাসায় নেই।
ওহ, ওকে ফোন করছি।
না দরকার নেই।
কেন? কোথায় গেছে?
তাহিরা বেগম বলবেন না ভেবেও বলে ফেললেন, অথৈ কে এহসান পরশুদিন নিয়ে গেছে।
কে নিয়ে গেছে?
এহসান এসেছিল, পরশু দিন, বিয়ে করে নিয়ে গেছে অথৈকে!
হোয়াট, এহসান, মানে আমার হাজবেন্ড, সরি এক্স হাজবেন্ড?
হ্যা।
শিট! মা, ও কি তোমাদেরকে ব্লাকমেইল করে নিয়ে গেছে, কিডন্যাপ? পুলিশ ডাকোনি? মানে কি হয়েছে, কি বলছ, একটু বুঝিয়ে বলবে, আমার মাথায় ঢুকসে না।
এহসান এসেছিল, তোমার বাবার কাছে অথৈকে বিয়ে করতে চাইল। তোমার বাবা আমি রাজি হলাম না। কিন্তু অথৈ রাজী হয়ে বিয়ে করে নিয়ে চলে গেল। ব্যস। এখন ঢাকায় আছে, এহসানের বাসায়!
এহসানের বাসায়, মানে আমার ফ্ল্যাটে! শিট শিট শিট! এসব কি বলতেছ মা, তোমাদের কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে, আমাকে তিনদিন পরে এটা জানাচ্ছ, একবার কল করতে পারো নি! শিট, অথৈটা কি গাধা, এহসানের মতন হারামি টার সাথে বিয়ে করে নিলো, ও কি আমার বোন! আমি নিশ্চিত ওকে তাবিজ করেছে, ওকে জ্বিন পরী দিয়ে তুকতাক করেছে এহসান আর ওর মা বুড়িটা। এই স্বভাব আছে তো, পানি পড়া চিনি পড়া সব নিয়ে আসত বাসায়। অথৈকে কুফরি করে নিয়েছে!
তাহিরা বেগম বললেন, এসব কিছুই হয় নি, তোমার বোন সজ্ঞানে নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করে গিয়েছে। যাক বাদ দাও, ওর সাথে আমরা আর যোগাযোগ রাখি নি, তোমারও দরকার নেই কথা বলার। নিজের ভালো নিজেই বুঝে নিক৷
মা ওর জীবনটা এভাবে নষ্ট হতে দিলে কেন! কেন! কেন!
ঐশি উঠে বসল বিছানায়।
আমি এক্ষুনি যাচ্ছি, সংসার করা বের করতেছি, আমি অথৈকে নিয়ে আসতেছি। এহসানের ফাইজলামি আমি বের করতেছি।
-ঐশি, শান্ত হও, তোমার বোন কিন্তু নিজেই গেছে। সেদিন অনেক কথাবার্তা হয়েছে, আমার মনে হয়, এই মুহুর্তে ওদের ওখানে গেলে তুমি অপমানিত হবে, কোনো দরকার নেই তো, সব চুকে বুকে গেছে তোমার সাথে। থাকুক অথৈ! নিজের ভুল বুঝলে চলে আসবে।
আর অথৈ কিন্তু তোমার সম্পর্কে খুব ভালো ধারনা করে বসে নেই!
-কিভাবে থাকবে, এহসান হারামিটা মগজ ধোলাই করে দিয়েছে! দুটো থাপ্পড় মারলে সব সোজা হয়ে যাবে। আমি এক্ষুনি যাব, এক্ষন।
ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৪৬
ঐশি ড্রাইভারকে কল করে বলল, এখনি গাড়ি বের করতে। এখনি যাবে ঐশি। দেখে নিবে এহসানকে। অথৈ এর সংসার করা বের করতেছে ঐশি! বলদ গাধা মেয়ে একটা। পৃথিবীতে কি আর ছেলে পায় নি! একটা ফাউলকে বিয়ে করতে হলো, তাও নিজের বোনের এক্স হাজবেন্ড! শিট শিট শিট!
ঐশি পারলে বাতাসের সাথে উড়ে এহসানের বাসায় চলে যায়, এমন রাগ হচ্ছে। আজ একটা এসপারওসপার হয়ে যাবে। একটা বদ আরেকটা বেকুব! শিট!
