Home ফিরে গেছে কত আলো ফিরে গেছে কত আলো শেষ পর্ব 

ফিরে গেছে কত আলো শেষ পর্ব 

ফিরে গেছে কত আলো শেষ পর্ব 
শানজানা আলম

আভাকে ডিভোর্স করতে চাই-
নাসির মিসেস নওফেলের কাছে কথাটা তুললো।
মিসেস নওফেল বললেন, কেন? আভা তো আবুধাবিতে সেটল হয়ে গেছে। ডিভোর্স করার কি দরকার?
নাসির বলল, আভাকে তুমি চিনতে পারো নি মা। ওকে যত সহজ সরল মনে করেছিলে, ও মোটেই সেরকম নয়।
-আভা যেমনই হোক, ডিভোর্স করা মানে একশটা কথা ছড়ানো। , দূরে আছে দূরেই থাক, তোমার লাইফে তো আভা ঝামেলা তৈরি করছে না!
তাছাড়া ও কি করেছে?

-ঐশি যে মিডিয়ায় লাইভটা করেছিল, সেটা আভার ড্রাইভারের শালার বন্ধুর ইউটিউব চ্যানেল।
-যদি আভা এর পেছনে থাকে, সেটা বের করে ফেলা তো কোনো ঘটনা না, তুমি তো জেনে ফেলেছ, ও কেন এমন করবে?
-বিষয়টা মোটেই এত সহজ ছিল না বের করা, কিন্তু আভা বাইরে যাওয়ার সাথে সাথে ওর ড্রাইভার চাকরি ছেড়ে দেয়। আর সে মালয়শিয়া চলে গিয়েছে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে। আভাকে সাহায্য করে সে বড় অংকের টাকা পেয়েছে।
মিসেস নওফেল বললেন, নাসির, বিষয়টা তো ক্লোজ হয়ে গেছে।
নাসির বলল, আমার মনে হয় আভা আমার লাইফে থাকলে আরো জটিলতা বাড়বে।
মিসেস নওফেল বললেন, তুমি কি আবার সংসার করতে চাও? মেয়ে দেখি তোমার জন্য?
নাসির বলল, বিয়ে করা তো কোনো বিষয় না, আভার একটা ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। আভাকে জানাও, আমি ডিভোর্স করতে চাই, আর ছেলেকে কানাডায় নিয়ে যেতে চাই।
মিসেস নওফেল বললেন, এতে কি ওর শাস্তি পুরোপুরি হবে? ওকে টাকা দেওয়া বন্ধ করে দাও। যেন বাধ্য হয় দেশে ফিরে আসতে। সবকিছু দিয়ে ডিভোর্স করার আগে ওকে একটা শিক্ষা দিতে হবে, ঘরে বসে ও ষড়যন্ত্র করেছে! এর জন্য ওকে এত সহজে ক্ষমা করা যায় না।
নাসির বলল, ভেবে দেখি কি করা যায়!
নাসির শেষ পর্যন্ত ডিভোর্স দিলো না আভাকে
নাসির ছেলের কথা ভেবে জটিলতায় গেল না।
যে বিষয়টা শেষ হয়ে গিয়েছে, সেটা নিয়ে টানাহেঁচড়ার কোনো মানে হয় না। অপরিচিত শত্রুর চাইতে চোখের সামনে থাকা চেনা শত্রু ভালো, তার গতিবিধি নখদর্পনে রাখা সম্ভব।

আগষ্ট ২০২৪,
দেশের রাজনৈতিক ব্যাপক রদবদলের সম্ভবনা তৈরি হওয়ায় নওফেল সাহেব কিছুদিন দেশের বাইরে থাকবেন সিদ্ধান্ত নিলেন। দেশের ব্যবসা বানিজ্য নাসির সামলে নিতে পারবে। মিসেস নওফেল দেশেই থাকবেন। তবে কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়া চলে গেলে রটে যাবে তিনি পালিয়ে গেছেন। এর চাইতে সুবিধাজনক মিডল ইস্টে চলে যাওয়া, কাতার কিংবা দুবাই –
নওফেল সাহেবের পিএ পরামর্শ দিলো, স্যার সৌদি সব চাইতে সুবিধাজনক জায়গা। ওখানে আপনি কিছুদিন থেকে আসুন। ওমরাহ করার জন্য গেলেন,ওখান থেকে সুবিধাজনক জায়গায় শিফট করে যাবেন।
নওফেল সাহেবের এই পরামর্শ পছন্দ হলো। সৌদিতে তিনি কয়েকমাস থাকবেন, এটা মনস্থির করলেন।
নির্দিষ্ট দিনে তিনি সেফ এক্সিট নিলেন।

সৌদি আরবের আকাশে তখন ভোরের আলো ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশাল কাঁচঘেরা টার্মিনালের ভেতরে যাত্রীদের পদচারণা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় ভেসে আসা ঘোষণার শব্দ, আর লাগেজ ট্রলির চাকার মৃদু আওয়াজ মিলেমিশে এক ব্যস্ত অথচ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করেছে।
বিমান থেকে নেমে ধীর পায়ে ইমিগ্রেশন পার হয়ে আগমনী লাউঞ্জে এলেন নওফেল সাহেব। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তাঁর চোখে স্পষ্ট, হাতে ছোট একটি ট্রলি ব্যাগ, মুখে মাস্ক পরে নিয়েছেন। তাকে রিসিভ করতে আসবে হাম্মাদ শেখ।
স্বয়ংক্রিয় কাঁচের দরজা পেরিয়ে বাইরে আসতেই তিনি দেখলেন, সাদা পরিচ্ছন্ন থোব ও লাল-সাদা চেকের গুতরা পরিহিত এক ভদ্রলোক হাতে একটি নামফলক ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তাতে আরবি ও ইংরেজি অক্ষরে লেখা—”Mr. Nofel”।
নওফেল সাহেব এগিয়ে যেতেই ভদ্রলোক উষ্ণ হাসি দিয়ে আরবীয় রীতিতে সম্ভাষণ জানালেন।

— আসসালামু আলাইকুম, মিস্টার নওফেল। আমি শেখ হাম্মাদ। আপনাকে স্বাগত।
নওফেল সাহেবও হাসিমুখে সালামের উত্তর দিলেন। দুজন করমর্দন করলেন। শেখ হাম্মাদ আন্তরিকতা ও বিনয়ের সঙ্গে নওফেল সাহেবের ট্রলি ব্যাগটি নিজের হাতে নিয়ে বললেন,
— দীর্ঘ ভ্রমণের পর নিশ্চয়ই আপনি ক্লান্ত। গাড়ি বাইরে প্রস্তুত আছে। আগে বিশ্রাম নেবেন, তারপর প্রয়োজনীয় কাজগুলো ধীরে ধীরে সম্পন্ন হবে।
বিমানবন্দরের প্রশস্ত সড়ক ধরে তারা পার্কিং এলাকার দিকে এগিয়ে গেলেন। সারিবদ্ধ খেজুরগাছ, চকচকে রাস্তা এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ যানবাহনের দৃশ্য নওফেল সাহেব মনোযোগ দিয়ে দেখছিলেন। আগেও এসেছিলেন, তবে এবারে বেশ কিছুদিন থাকতে হবে। সবকিছুই তাঁর কাছে চেনা, তবে এই পরিবেশে শেখ হাম্মাদের উপস্থিতি তাকে নিশ্চিন্ত করে দিলো। হাম্মাদ শেখ সব ব্যবস্থা করবে তার থাকা খাওয়া বা অন্যান্য বিলাসিতার।
কালো রঙের বিলাসবহুল এসইউভির দরজা খুলে শেখ হাম্মাদ সম্মানের সঙ্গে নওফেল সাহেবকে বসতে বললেন। গাড়ি ধীরে ধীরে বিমানবন্দর ছেড়ে শহরের দিকে এগিয়ে চলল। জানালার বাইরে একের পর এক আধুনিক অট্টালিকা, সুউচ্চ মিনারওয়ালা মসজিদ আর বিস্তীর্ণ মরুভূমির প্রান্তর চোখে পড়ছিল।
নওফেল সাহেব জানালার পাশে বসলেন, সামনে কী অপেক্ষা করছে, তা তিনি জানেন না। তবে প্রথম সাক্ষাতেই শেখ হাম্মাদের আন্তরিক অভ্যর্থনা তাঁর মনে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে।

রিয়াদের রিটজ-কার্লটন হোটেলের বিলাসবহুল ব্যক্তিগত অতিথিকক্ষে পৌঁছানোর পর নওফেল সাহেবকে কিছুক্ষণ বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হলো। বিকেলের দিকে শেখ হাম্মাদ আবার তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এলেন।
ঘরে প্রবেশ করে তিনি বললেন, “নওফেল সাহেব, আপনার জন্য একটি বাসার ব্যবস্থা ইতোমধ্যে করা হয়েছে। সেখানে প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র এবং অন্যান্য প্রস্তুতির শেষ কাজ চলছে। আর এক-দুই দিনের মধ্যেই আপনি সেখানে স্বাচ্ছন্দ্যে উঠতে পারবেন।
তাই আপাতত আপনাকে এই হোটেলেই রাখা হবে। এখানে আপনার আরাম, নিরাপত্তা এবং প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা রয়েছে। বাসাটি পুরোপুরি প্রস্তুত হলেই আমরা আপনাকে সেখানে নিয়ে যাব।
নওফেল সাহেব সম্মত হলেন।
কিছুক্ষণ সৌদি আরবের আবহাওয়া, শহর এবং সামনের কাজ নিয়ে কথা বলার পর শেখ হাম্মাদ একটু গম্ভীর স্বরে বললেন,

মিস্টার নওফেল, ভুল বুঝবেন না, আপনি এখানে কিছুদিনের জন্য নন, বেশ দীর্ঘ সময় থাকবেন। তাই আপনার দৈনন্দিন দেখাশোনা, প্রয়োজনীয় কাজে সহায়তা এবং নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে আমরা একজন বিশ্বস্ত সহকারী ঠিক করেছি। তবে আমার পরামর্শ, আপনি তাকে শাদী করে নিন। তাহলে আপনারই সুবিধা হবে। মেয়েটি কমবয়েসী, উচ্চশিক্ষিতা, ভদ্র এবং আরবি ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই দক্ষ। আপনার প্রয়োজন হলে দোভাষী হিসেবেও সাহায্য করতে পারবেন। আপনার জন্য ভালো হবে। এই বিয়ে সাময়িক, আপনার সুবিধার জন্য এবং আপনার প্রয়োজন মতো আপনি নিকাহ বিচ্ছিন্ন করতে পারবেন। সাধারণত দীর্ঘ সময়ের জন্য আমরা এই পরামর্শ দিয়ে থাকি।
নওফেল সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। এটা কি ঠিক হবে, এই মুহুর্তে তার কি করা উচিৎ! রাজনৈতিক পরিস্থিতি ঠিক হতে সময় লাগবে, আপাতত দেশে ফেরা তার জন্য নিরাপদ নয়। নাসিরের বিপদ হবে না কারন নাসির এখনো সরাসরি কোনো বিষয়ে যুক্ত হয় নি। তবে তার জন্য সমস্যা।
হাম্মাদ শেখ বললেন, আপনি সাময়িক ভাবে চিন্তা করুন, আপনার পরিবারে কোনো চাপ তৈরি হবে না। কেউ জানবেও না। আর এখানকার নিয়ম অনুযায়ীও কোনো সমস্যা তৈরি হবে না।
নওফেল সাহেব বললেন, আমি একটু ভাবি, তারপরে জানাই।
-ঠিক আছে, আমি মেয়েটিকে সন্ধ্যায় আপনার কাছে পাঠাব।
হাম্মাদ শেখ বিদায় নিলেন।

সন্ধ্যার আজান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর হোটেলের কক্ষে মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ ভেসে এল। নওফেল সাহেব দরজার দিকে তাকাতেই বাইরে থেকে ভদ্র কণ্ঠে অনুমতি চাওয়া হলো।
মাথা থেকে পা পর্যন্ত কালো আবায়ায় আবৃত তার অবয়ব, সূক্ষ্ম কারুকাজ করা আবায়া, মাথায় পরা হিজাব নিখুঁতভাবে চুল ঢেকে রেখেছে, মুখমণ্ডলটুকু ছাড়া শরীরের আর কোনো অংশ দৃশ্যমান নয়।
গভীর আর শান্ত দুই চোখে ছিল আত্মবিশ্বাস। মৃদু হাসি মুখটিকে আরও কোমল করে তুলেছিল।অত্যন্ত পরিমিত সাজে মেয়েটিকে বেশ আকর্ষণীয় লাগছিল।
মেয়েটি পরিস্কার বাংলায় বলল,

ফিরে গেছে কত আলো পর্ব ৯৫

-আসসালামু আলাইকুম, নওফেল সাহেব। আমাকে হাম্মাদ শেখ পাঠিয়েছেন।আশা করি আপনার বিশ্রাম ভালো হয়েছে।
নওফেল সাহেব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, আপনি বাংলা জানেন? কি নাম আপনার?
মেয়েটি মৃদু হেসে উত্তর দিলো, হ্যা আমি বাঙালি, জন্ম বাংলাদেশে তবে গ্রুমিং হয়েছে মুম্বাইয়ে। আমার নাম সোহানা, সোহানা শেখ!

সমাপ্ত