Home বাঁধন রূপের অধিকারী বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৩

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৩

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৩
সুমি চৌধুরী

বাঁধন একটি চেয়ার টেনে ধপ করে বসে পড়ল। কাজীর দিকে তাকিয়ে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,
—-“আমি কি অন্য কারো বিয়ে পড়াতে এসেছি এখানে? আমার বিয়ে। এখন কথা না বাড়িয়ে কুইকলি কাজ শুরু করুন।”
রূপা হতবিহ্বল হয়ে বলে উঠল,
—-“মানে? কী বলছেন আপনি? বিয়ে করবেন মানে? কাকে বিয়ে করবেন?”
রূপার দিকে তাকিয়ে বাঁধন বাঁকা হাসল। শান্ত স্বরে বলল,
—-” রূপাকে চিনিস । রূপাকে বিয়ে করব।”
কথাটা যেন রূপার ওপর একশো ভোল্টের শক দিল। বাঁধন তাকে বিয়ে করবে! লোকটার মাথা কি পুরো খারাপ হয়ে গেছে? রূপা চিৎকার করে বলল,

—-“আপনি এসব কী আবল-তাবল বলছেন? আমাকে বিয়ে করবেন মানে? আর ইউ ক্রেজি? আপনার মাথা কি ঠিক আছে?”
সকাল থেকে রাগ কন্ট্রোল করতে করতে বাঁধনের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে আসছিল। রূপার এই তর্কাতর্কি তার মাথা গরম করে দিল। এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে রূপার দুগাল শক্ত করে চেপে ধরে বাঁধন দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিসিয়ে বলল,
—-“হ্যাঁ, আমার মাথা পাগল হয়ে গেছে। আই অ্যাম ম্যাড! এই মাথা যতক্ষণ না তোকে বিয়ে করছে, ততক্ষণ শান্ত হবে না। সো, কথা না বাড়িয়ে জাস্ট চুপচাপ থাক। আমি যা বলছি, সেটাই করবি।”
ঠিক এই মুহূর্তে অখিল তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে নিয়ে কাজী অফিসে ঢুকে পড়ল। বাঁধনের হাতে রূপার দুগাল শক্ত করে চেপে ধরা অবস্থা দেখে অখিল আঁতকে উঠল।
—-“বাঁধন, কী করছিস? ছাড় ওকে!”
আকাশও দ্রুত এগিয়ে এল। তার কণ্ঠস্বরে শঙ্কা আর বিরক্তি স্পষ্ট। সে বলে উঠল,
—-“বাঁধন, তুই কি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছিস? রূপা তোর বোন লাগে! এই কথাটা মুখে আনলি কী করে? তোর মাথা কি আস্ত আছে?”

বাঁধন কোনো কথা বলল না। শুধু দুজনের দিকে এমন এক শীতল চাহনি ছুড়ে দিল যে, তাদের দুজনেরই আত্মা কেঁপে উঠল। আর কথা বলার মতো সাহস তাদের কারোরই রইল না।এতক্ষণ রূপা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু বাঁধনের আচরণ যখন সব সীমা ছাড়িয়ে গেল, সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। সর্বশক্তি দিয়ে সে বাঁধনের বুকে এক সজোরে ধাক্কা মারল। ধাক্কা সামলাতে না পেরে বাঁধন কিছুটা দূরে ছিটকে গেল। রূপা চিৎকার করে কেঁদে উঠল,
—-“আপনি নিজেকে কী ভাবেন, হ্যাঁ? যখন-তখন আমার ওপর অধিকার ফলাচ্ছেন, যেভাবে ইচ্ছা আমাকে ব্যবহার করছেন! আমি কি আপনার হাতের পুতুল? আমার কোনো জীবন নেই? আমি করব না বিয়ে আপনাকে। আপনি নির্লজ্জ হতে পারেন, কিন্তু আমি না। আমার সমাজের লোকলজ্জার ভয় আছে। আপনার কি মাথা পুরোপুরি খারাপ হয়ে গেছে? আপনি কী বলছেন জানেন? সমাজ বা মানুষজন জানলে ছি ছি করবে, সেটার কোনো ধারণা আছে আপনার?”

বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক ক্রুর, বাঁকা হাসি। চোখের নিমেষে রূপার সরু কোমরটা নিজের বাঁ হাতে পেঁচিয়ে ধরে হ্যাঁচকা টানে তাকে একেবারে নিজের বুকের খাঁজে পিষে ফেলল সে। বাঁধনের শক্ত শরীরের উত্তাপ আর তার ওপর ভেসে আসা কড়া পারফিউমের গন্ধে রূপা মুহূর্তেই শিউরে উঠল, তার প্রতিটি স্নায়ু যেন ভয়ে কেঁপে উঠল। বাঁধন তার তপ্ত নিঃশ্বাস রূপার কানের কাছে ছেড়ে একদম নিচু স্বরে, প্রতিটি শব্দে যেন বিষ ঢেলে দিয়ে বলল,
—-” তোর এই সমাজের মাইরে বাপ! তুই ভুলে যাচ্ছিস তুই আমার সৎ বোন না? আর এই কথাটা আমি খুব তাড়াতাড়ি সবার সামনে প্রুভ করে ছাড়ব। সো, বেশি কথা বলে আমাকে আর জাস্ট টিজ করিস না। যা বলছি তা কর, নাহলে আমি তোর সাথে কি করবো আই এম নট রেসপন্সিবল ফর দ্যাট, সেটা আমি নিজেও জানি না।”
বলেই বাঁধন রূপাকে হ্যাঁচকা টানে নিয়ে এসে চেয়ারে বসিয়ে দিল। এরপর কাজী সাহেবের দিকে আগুনের মতো চোখ নিয়ে তাকিয়ে দরাজ গলায় গর্জে উঠল,

—-“আপনি কি তামাশা দেখছেন? তামাশা পরে উপভোগ করবেন, এখন কুইকলি কাজ শুরু করুন।”
বাঁধনের তর্জনী গর্জনে কাজী সাহেবের হাত-পা কাঁপতে শুরু করল। তিনি তড়িঘড়ি করে নথিপত্র গুছিয়ে বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু করলেন। রূপা তখনো আতঙ্কিত চোখে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
—-“দেখুন, আমি আপনাকে বিয়ে করব না। এভাবে জোর করে আমাকে বাঁধার কোনো রাইট আপনার নেই।”
বাঁধন তার ওপর ঝুকে এসে শীতল আর নিষ্ঠুর গলায় ফিসফিস করে বলল,
—-“তোর কাছে কি আমি পারমিশন চেয়েছি? বেশি বাড়াবাড়ি করলে ঠোঁট দুটো কেটে সেলাই করে দেব, একটা কথাও আর উচ্চারণ করবি না তুই।”
ভীতসন্ত্রস্ত কাজী সাহেব কোনোমতে সাহস সঞ্চয় করে বাঁধনের দিকে তাকালেন, কাঁপা গলায় প্রশ্ন করলেন,
—-“কাবিন নামা কাবিন নামার অংকটা কত লিখব, স্যার?”
বাঁধন কাজী সাহেবের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে, নিজের জেদ আর রূপার ওপর তার নিরঙ্কুশ অধিকারের ঘোষণা দিয়ে শান্ত স্বরে বলল,

—“আমার পুরো লাইফটাই ওর নামে লিখে দিন।”
কাজী সাহেব আমতা আমতা করে বললেন,
—- “স্যার, নিয়ম তো এটা বলে না। কাবিনের অংকটা কাগজে নির্দিষ্ট থাকতে হয়।”
বাঁধন বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে, তার ওপর কোনো নিয়ম যে খাটে না—সেই দাপুটে ভঙ্গিতে বলল,
—- “আপনার আন্দাজমতো যা ভালো বোঝেন লিখে দিন। আমার এসব নিয়ম-টনিম জানার দরকার নেই, ও জাস্ট আমার বউ হলেই হলো। দ্যাটস ইট।”
কাজী সাহেব আর দ্বিমত করার সাহস পেলেন না, তড়িঘড়ি করে একটা বড় অংক বসিয়ে কাবিননামা তৈরি করে নিলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি বিস্ময়ে হা করে সব দেখছিল; কী ঘটছে তার বোধবুদ্ধির বাইরে। কাজী সাহেব বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কাবিননামার কাগজটা রূপার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন,

—- “মা, এখানে সইটা করে দিন।”
রূপার হাত-পা ভয়ে কাঁপছে, কিন্তু তার ভেতরের জেদটুকু এখনো মরেনি। সে মাথা নাড়ল।
—- “সই আমি করব না।”
বাঁধন এতক্ষণকার সেই উদ্ধত রূপ ঝেড়ে ফেলে যেন এক অদ্ভুত শীতল শান্ত কণ্ঠে বলল,
—- “কুকিল সোনা, জেদ করে না। গুড গার্লের মতো সইটা করে দে।”
রূপা চিৎকার করে উঠল,
—- “কোনোভাবেই না! আমি আপনাকে বিয়ে করব না!”
এই শেষ বাক্যটা বাঁধনের ভেতরের সমস্ত সংযম চুরমার করে দিল। রাগে তার চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। বাঁধন এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে চোখের পলকে অখিলের কোমরের বেল্ট থেকে রিভলবারটা কেড়ে নিল। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে ঝড়ের গতিতে রূপার কাছে এগিয়ে গিয়ে তার মাথার সাথে পিস্তলটা চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে, প্রতিটি শব্দে যেন মৃত্যুর হুমকি নিয়ে সে ফিসফিসিয়ে বলল,
—- “ভালো কথায় কাজ হয় না, তাই না? আমাকে রাগিয়ে না দিলে তোর শান্তি হয় না। লাস্ট ওয়ার্নিং এই মুহূর্তে যদি কাগজে সই না করিস, তবে এখান থেকে একটা বুলেট সোজা তোর মাথার খুলি ফুঁড়ে বেরিয়ে যাবে। ডু ইট রাইট নাও!”

এতক্ষণ জেদ ধরে থাকলেও, রিভলভারের শীতল স্পর্শে রূপার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেল। ভয়ে তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপতে থাকল। এক মুহূর্তের জন্য সে ডুকরে কেঁদে ফেলল। তার কান্নার রোল কানে আসতেই বাঁধনের ভ্রুযুগল কুঁচকে উঠল, চরম বিরক্তির স্বরে সে গর্জে উঠল,
—-“এই ঘ্যানঘ্যানানি থামা! ফাকিং ঘ্যানঘ্যানানি একদম পছন্দ না আমার। কথায় কথায় তোর এই প্যাংপ্যাঙে স্বভাবটা বদলাবি।”
রূপা চোখের জলে ভাসতে ভাসতে অস্ফুট স্বরে বলল,
—-“কেন এমন করছেন আমার সাথে? আমি কী করেছি আপনার?”
বাঁধন রিভলভারের নলটা রূপার কপালে আরও চেপে ধরে হিংস্র চোখে তাকিয়ে বলল,
—-“তোর এই বা’লের ফালতু প্রশ্ন করা বন্ধ কর! খালি কথা আর কথা। দুই মিনিটের ডেডলাইন দিচ্ছি, এর মধ্যে যদি সই না করিস, তবে খোদার কসম খেয়ে বলছি এই কাজী অফিস থেকে তোর লাশ বের হবে, আর আমি সেটা নিজেই করব।”

এই কথা বলেই বাঁধন নিজের ঘড়ির দিকে তাকাল, সেকেন্ডের কাঁটাটার দিকে তাকিয়ে সময় গুনতে শুরু করলযেন ঘড়ির প্রতিটি টিক টিক শব্দ রূপার জীবনের শেষ মুহূর্তের সংকেত দিচ্ছে। বৃষ্টি কাঁপা কাঁপা পায়ে রূপার পাশে এসে দাঁড়াল। করুণ স্বরে ফিসফিস করে বলল,
—-“রূপা, আমার কথা শোন, প্লিজ! তুই সইটা করে দে। পরে যা হওয়ার হবে, এই মুহূর্তে অন্তত নিজের প্রাণটা বাঁচা। প্লিজ বোন আমার, সইটা করে দে!”
রূপা মাথা নিচু করে ডুকরে কাঁদছে। বাঁধন কেন এমন উন্মাদ হয়ে উঠেছে, তা সে কোনোভাবেই বুঝে উঠতে পারছে না। তবে এটুকুই সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল যে, বাঁধন তাকে বিয়ে না করে ছাড়বে না, আর না মানলে হয়তো মেরেই ফেলবে। হঠাৎ রূপার মস্তিষ্কে একটা বুদ্ধি খেলে গেল তাকে পালাতে হবে। যে করেই হোক, এইখান থেকে তাকে বের হতেই হবে। সে এক গভীর শ্বাস নিয়ে চোখের পানি মুছে বাঁধনের দিকে তাকাল। স্থির নিচু গলায় বলল,
—-“শুনুন, আমি বিয়ে করব।”
রূপার হঠাৎ এমন দ্রুত নমনীয়তায় বাঁধনের মনে সন্দেহের কাঁটা ফুটল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রূপার দিকে তাকিয়ে বলল,

—-“গুড গার্ল।”
রূপা কিছুটা সময় নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার ভান করে বলল,
—-“কিন্তু এইভাবে বিয়ে করব? বিয়ে তো জীবনে একবারই হয়। এখন যেভাবে আছি, এভাবে বউ না সেজে বিয়ে করতে আমার একদম ইচ্ছে করছে না। আমার খুব শখ বউ সেজে বিয়ের পিঁড়িতে বসার। তার চেয়ে বরং আমাকে বউ সাজান, তারপর বিয়েটা হোক।”
রূপার প্রস্তাবটি বাঁধনের কাছে বিন্দুমাত্র সুবিধার মনে হলো না। সন্দেহের আতিশয্যে ভ্রু কুঁচকে বলল,
—-“পালানোর পথ খুঁজছিস?”
রূপা আতঙ্কিত হওয়ার ভান করে বলল,
—-“না না! মোটেও সেটা না। আসলে আমার খুব ইচ্ছে বউ সাজার…”
রূপার কথা শেষ হওয়ার আগেই বাঁধন তাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুর হাসল। পিস্তলটা নামিয়ে সে বলল,
—-“ওকে ফাইন, চল। আগে তোর শখই পূরণ করি।”

এরপর বাঁধন রূপাকে শহরের একটি অভিজাত পার্লারে নিয়ে এল। রূপা আর বৃষ্টিকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে দরজায় কড়া নিরাপত্তার জন্য নিজস্ব পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করল, যেন পিঁপড়েও গলতে না পারে। এরপর বাঁধন আকাশ ও অখিলকে সঙ্গে নিয়ে বিয়ের কেনাকাটায় বের হলো।
মার্কেটের শাড়ির দোকানে গিয়ে সে একের পর এক লাল শাড়ি দেখতে লাগল, কিন্তু তার মনের কোণে কোথাও যেন এক অশান্তি কাজ করছিল। লাল রঙটা তার তীরন্দাজিনীর জন্য বড্ড সাধারণ, বড্ড প্রচলিত মনে হলো। হঠাৎ তার মাথায় এল নীল রঙের কথা। মুহূর্তেই তার নজর কাড়ল জড়ি আর কারুকাজ করা একটি গাঢ় নীল বেনারসি শাড়ি। যেন আকাশের গভীরতাকে টেনে আনা হয়েছে ওই বুননে। কোনো দ্বিধা না করে সে সেটা কিনে ফেলল, সঙ্গে মানানসই সোনালি কাজ করা ব্লাউজ এবং বিয়ের লম্বা ঘোমটা। নিজের জন্য রূপার শাড়ির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সে বেছে নিল একটি নীল রঙের পাঞ্জাবি।কেনাকাটা শেষে পার্লারে ফিরে এসে সে একজন দক্ষ মেকআপ আর্টিস্টকে ডেকে সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। আকাশ আর অখিল আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকাচ্ছে, কিন্তু কারোরই সাহস হচ্ছে না একটি শব্দ করা বাঁধনের এখনকার মেজাজটাই যেকোনো বিস্ফোরকের চেয়ে বেশি ভয়ংকর।দীর্ঘ দুই ঘণ্টা পর পার্লারের দরজা খুলল, রূপা বেরিয়ে এল যেন কোনো মর্ত্যের মানবী নয়, বরং আসমান থেকে নেমে আসা এক নীল পরী।

নীল বেনারসির ভাঁজে ভাঁজে সোনালি জরির কাজগুলো যেন রূপার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে আলোর খেলা তৈরি করছে। তার ঘন কালো চুলগুলো সুনিপুণ হাতে এক খোঁপা করা হয়েছে, যাতে গোঁজা হয়েছে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ গোলাপের স্নিগ্ধতা আর নীল শাড়ির গভীরতা মিলেমিশে এক মায়াবী আবেশ তৈরি করেছে। চুলের ওপর নিঁখুতভাবে আলগোছে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে সোনালি পাড়ের সেই বিশাল ঘোমটা, যার আড়াল থেকে রূপার কাজল কালো চোখ দুটো যেন আগুনের শিখার মতো জ্বলছে।মেকআপ আর্টিস্টকে বাঁধনের কড়া নির্দেশ ছিল গর্জিয়াস কিছু নয়, রূপাকে যেন স্নিগ্ধ আর সিম্পল রাখা হয়। সেই নির্দেশ মেনেই ঠোঁটে হালকা লাল খয়েরী আভা আর চোখে গাঢ় কাজলের টানে রূপার রূপ যেন আরো প্রখর হয়ে উঠেছে। গলার ঝকঝকে সোনালি হার আর কানের ভারী দুল দুটো তার সরু ঘাড়ের সাথে দারুণ মানিয়ে গেছে। আর দুই হাতের কবজিতে নীল রেশমি চুড়ির শব্দ যেন রূপার প্রতিটি কম্পনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাজছে।
রূপা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন ভয় আর অনিশ্চয়তার দোলাচল। সে মরিয়া হয়ে পালানোর কোনো সুযোগ খুঁজছিল, কিন্তু বাঁধন তাকে সেই ছিটেফোঁটা সুযোগটুকুও দিচ্ছে না। লোকটা কেন হঠাৎ এমন আদিম জেদি হয়ে উঠল, সেই ধাঁধার কোনো উত্তর খুঁজে পাচ্ছে না সে।

পার্লারের দরজা খুলে রূপা বেরিয়ে আসতেই বাঁধনের চোখের পলক যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চারপাশে থাকা জগতটা যেন এক লহমায় ফিকে হয়ে গেল, শুধু সামনে দাঁড়িয়ে থাকা নীল অপ্সরাটিই তার অস্তিত্বের সবটুকু দখল করে নিল। ঘোর লাগা দৃষ্টিতে বাঁধন অপলক চেয়ে রইল সামনে থাকা অষ্টাদশীর দিকে। এই প্রথম রূপাকে শাড়িতে দেখছে সে। আগে কখনো কোনো মেয়ের দিকে এমন মুগ্ধতা নিয়ে তাকাতে শেখেনি সে, কিন্তু এখন রূপার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো, শাড়ির ভাঁজে মেয়েদের সত্যিই মোহনীয় আর মায়াবী লাগে। ঠিক সেই মুহূর্তে রূপাও বাঁধনের দিকে তাকাল। পুরুষটিকে দেখামাত্রই তার বুকের ভেতরটা আবারো কেঁপে উঠল। তবে এবার ভয়ের চেয়েও বেশি ছিল বিস্ময়। বাঁধনের দিকে তাকিয়ে রূপা যেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো হা হয়ে গেল।বাঁধনের পরনে গাঢ় নীল পাঞ্জাবি, যার হাতা নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গোটানো হাতের পেশি আর শিরাগুলো যেন তার কাঠিন্যের পরিচয় দিচ্ছে। পরনে সাদা জিন্স, পায়ে স্টাইলিশ স্নিকার্স; বাম হাতের কবজিতে কালো ব্যান্ডের চকচকে স্মার্টওয়াচটি তার ব্যক্তিত্বকে আরও ধারালো করে তুলেছে। কপালে ঝুলে থাকা কয়েকটা এলোমেলো চুল তার রগচটা চেহারায় এক ধরনের বুনো আকর্ষণ তৈরি করেছে। রূপার মনে হলো, কোনো পুরুষ পাঞ্জাবি পরলে যে এতটা হ্যান্ডসাম আর পুরুষালি লাগতে পারে, তা বাঁধনকে না দেখলে সে কোনোদিন জানতেই পারত না।দুই জনের দৃষ্টি একে অপরের ওপর আছড়ে পড়ল। রূপার চোখে স্তব্ধতা, আর বাঁধনের চোখে এক তীব্র দখলদারি। চারপাশটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল।

অন্যদিকে বৃষ্টিও যেন ঘোর লাগা দৃষ্টিতে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে ছিল। বাঁধনকে এই প্রথম সে পাঞ্জাবিতে দেখল। একটা পুরুষ এতটা সুদর্শন হতে পারে, তা বৃষ্টি আগে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি। বাঁধনের ব্যক্তিত্ব আর গাম্ভীর্য যেন তাকে সম্মোহিতের মতো আটকে রেখেছে। ঠিক তখনই আকাশের নজর পড়ল বৃষ্টির ওপর। দেখল, বৃষ্টি হা করে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তে আকাশের দুই হাত রাগে ও হিংসায় মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠল। এভাবে তাকিয়ে থাকার কী আছে? মানছে বাঁধন সুন্দর, তাই বলে বৃষ্টি এভাবে ওর দিকে তাকিয়ে থাকবে কেন? এই চিন্তা আসতেই আকাশ বৃষ্টির পাশে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টির কানের কাছে মুখটা ঝুঁকিয়ে অত্যন্ত নিচু ও তীক্ষ্ণ স্বরে ফিসফিস করে বলল,

—- “জীবনে কি কোনো পুরুষ দেখোনি? এভাবে নির্লজ্জের মতো তাকিয়ে আছো কেন বাঁধনের দিকে? চোখ নামাও!”
আকাশের সেই তপ্ত ফিসফিসানি কানে আসতেই বৃষ্টি চমকে উঠল। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে আকাশকে দেখল, থরথর কাঁপতে থাকা গলায় বলল,
—-“স্যার এসব আপনি কী বলছেন?”
আকাশের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, গম্ভীর কণ্ঠে সে বলল,
—- “বাঁধনের দিকে আর কখনো তাকাবে না তুমি। শুধু বাঁধন কেন, কোনো পুরুষের দিকেই তুমি আর চোখ তুলে তাকাবে না।”
বৃষ্টি অবাক চোখে আকাশের দিকে চেয়ে রইল, আমতা আমতা করে বলল,
—-“কেন স্যার? তাকালে কী হবে?”
আকাশ রাগে দাঁতে দাঁত চেপে, হিসহিস করে বলল,

—- “আবার প্রশ্ন করছো? কেন, তোমাকে ছেলেদের দিকে তাকাতেই হবে? ছেলেদের দিকে না তাকালে কি তোমার চলবে না? ভদ্র মেয়েরা কখনো কোনো পুরুষের দিকে এভাবে হা করে তাকিয়ে থাকে না।”
বৃষ্টির আত্মসম্মানে লাগল, সে প্রতিবাদ করে বলল,
—-“তার মানে কী? আমি অভদ্র?”
আকাশের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। সে গর্জে উঠে বলল,
—-“এত কথা কেন বলো তুমি? তোমাকে তাকাতে নিষেধ করেছি মানে তাকাবে না!”
বৃষ্টি আবার কিছু বলতে যাবে, ঠিক তার আগেই আকাশ বৃষ্টির চোখের দিকে ভয়াবহ এক দৃষ্টি হেনে হনহনিয়ে সামনের দিকে হাঁটতে শুরু করল। যাওয়ার সময় নিচু স্বরে হুমকি দিয়ে গেল,
—-“নেক্সট টাইম যদি দেখি আবার বাঁধনের দিকে তাকিয়েছো, তাহলে তোমার চোখের মণিটা আমি উপড়ে হাতে নিয়ে আসব। মনে থাকে যেন।”
বৃষ্টি স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আকাশের এই অদ্ভুত আর আক্রমণাত্মক আচরণের মানে সে কিছুতেই মেলাতে পারছে না। কেন এমন করল আকাশ? এই প্রশ্নটা বৃষ্টির মাথায় বারবার ঘুরপাক খেতে থাকল।
এদিকে বাঁধন রূপাকে নিয়ে কাজী অফিসে এসে পৌঁছাল। অফিসের ভেতরে ঢুকেই কাবিননামায় সই করার মুহূর্তে আবারও নতুন ঝামেলা শুরু হলো। রূপা জেদ ধরে বসে আছে, সে কোনোভাবেই সই করবে না। রূপা স্পষ্ট গলায় বলল,

—-“আমি ক্যান্ডিকে ছাড়া বিয়ে করব না! ও আমার একমাত্র বন্ধু, আর আমার বিয়ের মতো এত বড় দিনে ও থাকবে না এটা কিছুতেই হতে পারে না!”
বাঁধন খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, রূপা স্রেফ সময় নষ্ট করার জন্য এই বাহানা করছে। তার ধৈর্য ফুরিয়ে আসছে। সে রূপার চিবুকটা শক্ত হাতে চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে আনল। তার চোখে আদিম জেদ আর উন্মাদনা। বাঁধন নিচু স্বরে ধমক দিয়ে বলল,
—-“প্রথমত, তুই যত বাহানাই করিস, এই বিয়ে তোকে করতেই হবে, সেটা তাও আজকের দিনেই। আর যদি কোনোভাবে এই বিয়ে না হয়, তবে আমাদের দুজনের গন্তব্য হবে কবর। আগে তোকে মারব, তারপর আমি নিজেও মরব। তোর জন্য জান আমি দিতেও পারি, আবার নিতেও পারি কথাটা ভালো করে তোর মাথায় গেঁথে রাখিস।”

বাঁধনের গলার স্বর এতটাই ভয়ংকর আর শীতল যে, রূপা ভয়ে কুঁকড়ে গেল। বাঁধন মুহূর্তের দেরি না করে অখিলকে আদেশ দিল বাসা থেকে রূপার ক্যান্ডিকে নিয়ে আসার জন্য। অখিল তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল এবং পনেরো মিনিটের মধ্যেই ক্যান্ডিকে নিয়ে ফিরে এল।
বাঁধন অখিলের হাত থেকে ক্যান্ডিকে ছিনিয়ে নিয়ে রূপার কোলে ছুঁড়ে দিল। তারপর রূপার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—-“নে, তোর বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেছে। এখন আর আমার রাগ না বাড়িয়ে চুপচাপ কাগজে সইটা কর। এরপরও যদি সই করতে গড়িমসি করিস, তবে এই কাজী অফিসের মেঝেতেই তোর গলা টিপে আমি তোকে শেষ করে দেব। ডু ইট রাইট নাও।”

হঠাৎ করেই রূপা আবারো কান্নায় ভেঙে পড়ল। ছলছল চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে সে আর্জি জানাল।
“কী হয়েছে আপনার? এমন আচরণ কেন করছেন? আমি কোনোভাবেই আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। কেন বুঝতে পারছেন না আপনি?”
রূপার এই কথায় বাঁধনের শান্ত চোখে যেন আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠল। তার দুই চোখ রক্তজবার মতো টকটকে লাল হয়ে গেল। রাগের উত্তাপে তার ধৈর্যের শেষ বাঁধটুকুও মুহূর্তেই বাষ্প হয়ে উড়ে গেল। এক ঝটকায় নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে সে হিংস্র ভঙ্গিতে রূপার কোমল গলা শক্ত হাতে চেপে ধরল। দাঁতে দাঁত চেপে কর্কশ স্বরে গর্জে উঠল সে,
—-“বা’লের বিয়ে আমি করবই না,এখন মর তুই!”
বাঁধনের সর্বাঙ্গ রাগে থরথর করে কাঁপছে। ওদিকে অক্সিজেনের অভাবে রূপার চোখ উল্টে আসছে, নিশ্বাস আটকে যাওয়ার উপক্রম। অখিল আর আকাশ হতভম্ব হয়ে মুহূর্তেই ছুটে এল বাঁধনকে ছাড়াতে। আকাশ চিৎকার করে উঠল,
—-“বাঁধন, পাগল হয়ে গিয়েছিস তুই? কী করছিস এটা? ছেড়ে দে ওকে, ওর কষ্ট হচ্ছে!”
আকাশের চিৎকারে বাঁধনের ঘোর কাটল। লাল চোখে রূপার দিকে তাকাল সে। দেখল, মেয়েটা ভয়ে চোখ বড় বড় করে ফেলেছে, আর চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে জল। পরক্ষণেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে ঠোঁট কামড়ে সে রূপাকে ছেড়ে দিল। রূপা নিজের গলা জড়িয়ে ধরে মাটিতে কুঁকড়ে বসে তীব্র কাশতে লাগল আরেকটু হলেই হয়তো সে নিথর হয়ে যেত।আকাশ আবার বলে উঠল,

—-“বাঁধন, তুই কি সত্যি পাগল হয়ে গেলি?”
বাঁধন যেন নিজের রাগ আর ক্ষোভের আগুনে নিজেই পুড়ছে। রুমের ভেতর থাকা একটা চেয়ার তুলে শূন্যে সজোরে ছুঁড়ে মারল সে। মেঝেতে বিকট শব্দে আছড়ে পড়ল সেটি। বাঁধন উন্মত্তের মতো চিৎকার করে উঠল।
—-“হ্যাঁ! আমি পাগল হয়ে গেছি। আমি জাস্ট পাগল হয়ে গিয়েছি! আকাশ, রূপকে বল ও যেন সই করে দেয়। নাহলে দ্বিতীয়বার যদি ওকে ধরি,তাহলে সত্যি সত্যি ওকে আমি মেরেই ফেলব।”
বাঁধনের এমন উন্মত্ত রূপ দেখে ঘরে উপস্থিত সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো স্তব্ধ হয়ে গেল। এই নিস্তব্ধতা ভেঙে বৃষ্টি এগিয়ে এল রূপার কাছে। রূপার দুই কাঁধ ধরে সে আলতো করে চোখের জল মুছিয়ে দিতে দিতে নরম স্বরে বলল,

—–” রূপা সোনা, প্লিজ বাঁধন ভাইয়া সত্যি খুব রেগে আছে। তুই আর জেদ করিস না, সইটা করে দে। অযথা ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ নেই, পরে যা হওয়ার হবে। তুই প্লিজ, জাস্ট সইটা করে দে।”
বলেই সে রূপার কানের কাছে মুখ নামিয়ে ফিসফিস করে যোগ করল,
—- “রূপা, তুই সৎ বোন ভেবে বিয়ে করতে চাইছিস না, কিন্তু তুই তো জানিস যে তুই বাঁধনের সৎ বোন নস। সত্য বেশিদিন লুকিয়ে থাকে না দেখিস, বাঁধন ভাইয়া তোর আসল পরিচয় ঠিকই বের করে ফেলবে। আর আমি তো জানি, বাঁধনের জন্য তোর মনেও অনুভূতি আছে আমি তোর বেস্ট ফ্রেন্ড, তুই কিছু না বললেও তোর আচরণ দেখে আমি ঠিকই বুঝি। তাই সোনা, আর জেদ করিস না। সইটা করে দে, দেখিস এই একটা সইয়ের বিনিময়েই তোর জীবনটা রঙিন হয়ে উঠবে, যা তুই নিজেই একদিন স্বীকার করবি।”
বৃষ্টির অনেক বোঝাপড়া আর সান্ত্বনার প্রলেপে রূপার জেদ কিছুটা হলেও শিথিল হয়ে এল। কোনো কথা না বলে, নিথর হাতে সে চোখের জল মুছে নিল। তারপর সামনে রাখা সেই পরিণতির দলিল কাগজটা টেনে নিল নিজের দিকে। কলমটা ধরতেই তার হাত কাঁপছে, যেন কোনো অশুভ শক্তির ভয়ে তটস্থ সে। এক অস্থিরতায়, কাঁপা কাঁপা হাতেই সে স্পষ্ট অক্ষরে নিজের নামটা লিখে দিল কাগজের গায়ে।
কাজী সাহেব স্থির দৃষ্টিতে তাকালেন বাঁধনের দিকে। শান্ত কণ্ঠে বললেন,

—-“এখন আপনার সই, স্যার।”
বাঁধন যেন বিদ্যুতের বেগে এগিয়ে এল। বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে, ঝড়ের গতিতে সে সইটা সেরে নিল। চারপাশ নিস্তব্ধতায় আচ্ছন্ন, শুধু কাজীর কণ্ঠস্বর বাতাসে ভাসছে। বিয়ে পড়ানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো। সবাই যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। কাজী সাহেব রূপাকে ‘কবুল’ বলতে নির্দেশ দিলেন; রূপা মাথা নিচু করে রইল। তার কণ্ঠ যেন গলায় আটকে আছে, কোনো শব্দই বেরোচ্ছে না। এমন মুহূর্তের চাপে রূপার কাঁধ জড়িয়ে ধরে বৃষ্টি ফিসফিস করে বলল,
—-“কবুল বলে দে রূপা। কিচ্ছু হবে না, নিজেকে শক্ত রাখ।”
বৃষ্টির কথায় রূপা চোখ বন্ধ করল। গভীর এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলে উঠল,
—-“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”

নিয়মানুযায়ী তিনবার তাকে কবুল বলানো হলো। এরপর কাজী সাহেব বাঁধনের দিকে ফিরতেই সে যেন অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষা করছিল। ঝড়ের গতিতে সে-ও উত্তর দিল,
—-“আলহামদুলিল্লাহ কবুল।”
বাঁধনের মুখ থেকেও তিনবার উচ্চারিত হলো সেই চিরস্থায়ী বন্ধনের শব্দ। এরপর কাজী সাহেব মোনাজাতের জন্য দুহাত তুললেন। আকাশ নিঃশব্দে এসে দাঁড়াল বৃষ্টির পাশে। বাঁধনের চোখে পড়ল, রূপা মোনাজাতের জন্য হাত তুলছে না। এক মুহূর্তও দেরি করল না সে। রূপার হাত থেকে ক্যান্ডিকে সরিয়ে টেবিলের ওপর রেখে, নিজেই রূপার দুহাত আলতো করে ধরে মোনাজাতের ভঙ্গিতে তুলে ধরল। তারপর নিজেও হাত তুলল।পুলিশ সদস্য অখিল, বৃষ্টি আর আকাশ—সবাই একাত্ম হয়ে মোনাজাত ধরল। কাজী সাহেব উচ্চস্বরে দোয়া করতে লাগলেন, যাতে এই দুই অস্থির হৃদয়ের জীবনে শান্তি নেমে আসে, যেন পরম করুণাময় তাদের অনাগত দিনগুলোকে সুখের চাদরে মুড়িয়ে দেন।

তারপর বিয়ের সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে রাত প্রায় আটটার দিকে রূপাকে নিয়ে রহমান বাড়িতে ফিরে বাঁধন।
সারাদিন রহমান পরিবারের কারও মুখে একফোঁটা খাবারও ওঠেনি। বিশাল হলরুমের সোফাগুলোতে সবাই উদ্বিগ্ন মুখে বসে আছে। প্রত্যেকের চোখ বারবার সদর দরজার দিকেই ছুটে যাচ্ছে। বাঁধন হঠাৎ করে রূপাকে কোথায় নিয়ে গেল, কেন নিয়ে গেল এই প্রশ্নই যেন সবার বুকের ভেতর পাথরের মতো চেপে বসে আছে। পুরো বাড়িটা অস্বাভাবিক নীরব। সেই নীরবতার মাঝেও উৎকণ্ঠার ভারী নিঃশ্বাস যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে।ঠিক তখনই সদর দরজাটা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে বাঁধন।তার ঠিক পেছনেই ধীর পায়ে ভেতরে ঢোকে রূপা,বৃষ্টি আকাশ।মুহূর্তের মধ্যেই হলরুমের সবাই দাঁড়িয়ে পড়ে।রূপা মাথা নিচু করে বুকের সঙ্গে ক্যান্ডিকে এমন শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে, যেন ছোট্ট খরগোশটাই এখন তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। টকটকে নীল বেনারসিতে মোড়া তার ছোট্ট শরীরটা কাঁপছে। চোখ দুটো কান্নায় ফুলে লাল হয়ে আছে। এলোমেলো চুলের ফাঁক দিয়ে কয়েকটা গোছা বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে, কিন্তু সেগুলো সরানোর শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।রূপার পরনে বিয়ের সাজ দেখেই রহমান পরিবারের সবার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের জন্য যেন কারও মুখ দিয়ে কোনো শব্দই বের হয় না।রজনী রহমান প্রায় দৌড়ে এসে রূপার দুই কাঁধ ধরে ফেলেন। উৎকণ্ঠায় তার কণ্ঠ কেঁপে ওঠে।

—-” কী হয়েছে রূপা? এই বিয়ের সাজ কেন? এভাবে শাড়ি পরে আছিস কেন? কোথায় গিয়েছিলি তোরা? কথা বল মা কী হয়েছে?”
রূপা কিছুই বলতে পারে না। ঠোঁট দুটো কাঁপে, কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। মাথাটা আরও নিচু করে শুধু ক্যান্ডিকে বুকের সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।আহসান রহমান ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বাঁধনের সামনে দাঁড়ান। রাগে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। চোখে-মুখে জমাট ক্ষোভ। তিনি সরাসরি বাঁধনের চোখে চোখ রেখে গম্ভীর স্বরে বলেন,
—-” কোথায় নিয়ে গিয়েছিলি রূপাকে? আর ওর গায়ে এই বিয়ের সাজ কেন?”
বাঁধনের মুখে বিন্দুমাত্র অস্থিরতা নেই। যেন কিছুই ঘটেনি। ঠোঁটের কোণে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটিয়ে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক গলায় বলে,
—-” সহজ করে বলি? রূপাকে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়েছিলাম। তারপর সুন্দর করে তিনবার কবুল বলিয়ে বিয়ে করে নিয়ে এসেছি। এবার বুঝতে পেরেছেন, নাকি হাতে-কলমে ম্যাপ এঁকে বুঝিয়ে দিতে হবে?”
মুহূর্তের মধ্যেই মনে হলো, বাঁধনের একটা কথায় পুরো হলরুমে যেন বোমা ব্লাস্ট হয়ে গেল। চারদিকে থমথমে নীরবতা নেমে এলো। উপস্থিত প্রত্যেকের মুখে বিস্ময় আর অবিশ্বাসের ছাপ। রজনী রহমানের চোখ যেন কপাল ছুঁইছুঁই। আহসান রহমান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাঁধনের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,

—-” বাঁধন, ফাজলামিরও একটা লিমিট আছে।”
বাঁধন ঠোঁটের কোণে নির্লজ্জ, তাচ্ছিল্যভরা হাসি টেনে দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
—-” রিল্যাক্স শ্বশুর মশাই। আমি কোনো জোক করছি না। সিরিয়াসলি বলছি, আপনার মেয়েকে সত্যিই বিয়ে করেছি। সো একটু রেসপেক্ট দিয়ে কথা বলবেন। আফটার অল, আমি এখন আপনার মেয়ের হাজব্যান্ড।”
নিজের ছেলের মুখে “শ্বশুর মশাই” ডাক শুনেই আহসান রহমান বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলেন।ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃষ্টি ফিক করে হেসে ফেলতে যাচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যেই আকাশ তার মুখ চেপে ধরে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
—-” এই কী করছো? একদম হাসবে না। আগুনে আর কেরোসিন ঢেলো না, প্লিজ।”
হাজী রহমান নিজেও কয়েক মুহূর্ত থম মেরে দাঁড়িয়ে রইলেন। এ কেমন নাতি! নিজের বাবাকেই শ্বশুর বানিয়ে ফেলেছে! কপালে গভীর ভাঁজ ফেলে তিনি ধীরে ধীরে বাঁধনের সামনে এসে বললেন,
—-” দাদুভাই, তোর মাথাটা কি পুরোপুরি গেছে? কীসব বলছিস তুই? তুই রূপাকে বিয়ে করেছিস মানে? আর ইউ ম্যাড?”
বাঁধন এক পলক মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকা রূপার দিকে তাকাল। তারপর আবার দাদুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলল,

—-” ইয়েস, দাদু। তোমার নাতনি আমাকে পুরোপুরি পাগল বানিয়ে ফেলেছে। তাই ভাবলাম, যখন পাগল হয়েই গেছি তখন ফুল পাগলই হই। সো তোমার নাতিকেই বিয়ে করে নিলাম। এখন আর নো রিগ্রেটস।”
আহসান রহমান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে এক পা এগিয়ে এলেন। চোখ দুটো রক্তিম, কপালের শিরাগুলো টনটন করছে। দাঁতে দাঁত চেপে গর্জে উঠলেন,
—-” নির্লজ্জ ছেলে! একটুও লজ্জা করছে না এসব মুখে আনতে?”
বাঁধন বিন্দুমাত্র বিচলিত হলো না। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হালকা হাসি ফুটিয়ে আহসান রহমানের চোখে চোখ রেখেই শান্ত, অথচ ধারালো কণ্ঠে বলল,
—-“আপনিই তো নির্লজ্জ বলেছিলেন আমাকে? তো আমি শুধু প্রমাণ করে দিলাম, আমি ঠিক কতটা নির্লজ্জ হতে পারি। আমি তো কখনো বলিনি আমি ভদ্র, আদর্শ কিংবা সাধু মানুষ।”
এক মুহূর্ত থেমে বাঁধন রূপার দিকে একবার তাকাল। তারপর আবার আহসান রহমানের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে ঠান্ডা হাসি হেসে বলল,

—-” আর একটা কথা যদি রূপের জন্য আমাকে নির্লজ্জ বলা হয়, তাহলে আই ডোন্ট কেয়ার। বাঁধন রূপের বেলায় একবার না, হাজারবার নির্লজ্জ হতে রাজি আছে।”
আহসান রহমান রাগে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে এক পা এগিয়ে এলেন। রাগে তার চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে। আঙুল তুলে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললেন,
—- “একজন এসপি হয়ে নিজের সৎ বোনকে বিয়ে করতে তোর একটুও লজ্জা করলো না?”
বাঁধন ঠোঁটের কোণে নির্লজ্জ একটা বাঁকা হাসিটা টেনে দুই হাত পকেটেই রেখে দাঁড়িয়ে রইল। চোখে-মুখে বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই। বরং সেই হাসিটা আরও গভীর হলো। কয়েক সেকেন্ড আহসান রহমানের চোখে চোখ রেখে তারপর ধীর, ঠান্ডা গলায় বলল,
—- “আরে শ্বশুর মশাই একই কথা আর কতবার বলবো আপনাকে? আমার লজ্জা-শরম বলে কিছু নাই। আই অ্যাম আ প্রাউড নির্লজ্জ বয়। তবে হ্যাঁ নির্লজ্জ হই শুধু আপনার মেয়ের বেলায়। সো প্লিজ, এই একই ডায়লগ রিপিট করবেন না।”
বাঁধনের কথায় আহসান রহমানের মুখ আরও শক্ত হয়ে উঠল।
রজনী রহমান এবার রূপার দুই কাঁধ আরো শক্ত ধরে ফেললেন। তার চোখ ভিজে গেছে। কাঁপা কণ্ঠে বললেন,

—- “রূপা বাঁধন যা বলছে, সেগুলো কি সত্যি? তোদের সত্যিই বিয়ে হয়েছে? কিছু বল মা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
রূপা মাথা আরও নিচু করে ফেলল। ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু একটা শব্দও বের হলো না। বুকের সঙ্গে সাদা খরগোশ ক্যান্ডিকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল সে।রূপার নীরবতা দেখে বাঁধন মুচকি হেসে রজনী রহমানের দিকে তাকাল।
—- “নতুন বউ তো তাই একটু লজ্জা পাচ্ছে। সব কথা কি আর মুখ ফুটে বলতে পারে? আমার কথা যদি বিলিভ না হয় তাহলে ওয়েলকাম, মিসেস রজনী রহমান, আমার রেসপেক্টেড শাশুড়ি।”
‘শাশুড়ি’ শব্দটা কানে যেতেই মুহুর্তে রজনী রহমানও বিষম খেয়ে কাশতে শুরু করলেন।অন্যদিকে বৃষ্টির অবস্থা একেবারেই করুণ। হাসিটা গলার কাছে আটকে আছে, কিন্তু আকাশ এখনো পেছন থেকে শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরে রেখেছে। হঠাৎ হঠাৎ হাসির দমক উঠলেই বৃষ্টির কাঁধ কেঁপে উঠছে, চোখ দুটো চিকচিক করে পানি ভরে যাচ্ছে। মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বেরোতে পারছে না, শুধু নাক দিয়ে “হুঁ হুঁ শব্দ বের হচ্ছে। আকাশ কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বারবার বলছে,
—- “কন্ট্রোল প্লিজ কন্ট্রোল! এখন যদি হেসে ফেলো, ভাই আজ আমাদের দুজনকেই লাইভ কবর দিয়ে দেবে।”
বৃষ্টির চোখ বড় বড় হয়ে যাচ্ছে, চোখের পাতা বার বার উল্টে যাচ্ছে।রজনী রহমান মিথ্যা অভিনয়ে কষ্টভরা চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বললেন।

—- “তুমি হয়তো আমাকে কোনোদিন মা হিসেবে মেনে নিতে পারোনি, সেটা আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু রূপা তোমার কী ক্ষতি করেছিল? একটা নিষ্পাপ মেয়ের জীবন নিয়ে এমন খেললে কীভাবে? একটা সৎ বোনকে বিয়ে করতে তোমার বুক একবারও কাঁপল না? তুমি একজন এসপি, সমাজের মানুষ তোমাকে সম্মান করে। কাল যখন সবাই জানবে একজন নামকরা এসপি নিজের ঘরের সৎ বোনকে বিয়ে করেছে তখন রহমান পরিবারের মান-সম্মান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, একবারও ভেবেছ?”
রজনী রহমানের কথাগুলো শেষ হতেই পুরো হলরুমে পিনপতন নীরবতা নেমে আসে। কয়েক মুহূর্ত কারও মুখে কোনো শব্দ ফোটে না। বাঁধন ধীরে ধীরে মাথা তুলে রজনী রহমানের দিকে তাকায়। তার চোখে না আছে অনুশোচনা, না আছে দ্বিধা। ঠান্ডা, স্থির কণ্ঠে বলে,
—-“লোকলজ্জার ভয় থাকলে কিছু জিনিস কোনোদিন নিজের করে পাওয়া যায় না। কিছু জিনিস নিজের করে নিতে হলে বুকের ভেতর সাহস রাখতে হয়, সমাজের ভয়কে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। তবেই মানুষ তার কাঙ্ক্ষিত জিনিসটা পায়। আর সমাজের ভয়ে যদি বারবার পিছু হটেন, তাহলে সারাজীবন পেছনেই পড়ে থাকতে হবে। কারণ সমাজ কানাঘুষা করতে জানে, বদনাম রটাতে জানে কিন্তু বিপদের সময় পাশে দাঁড়াতে জানে না। দ্যাটস দ্য রিয়েলিটি।”

আহসান রহমান আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না। রাগে তাঁর কণ্ঠ গর্জে ওঠে।
—-“ব্যাস! অনেক হয়েছে। সবকিছুর একটা লিমিট থাকে, আর তুই সেই লিমিট ক্রস করে ফেলেছিস। আমার মান-সম্মান সব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিস। তুই আমার ছেলে না। আজ থেকে আমার ছেলে মরে গেছে। বেরিয়ে যা আমার বাড়ি থেকে। তোর মুখও আমি আর কোনোদিন দেখতে চাই না!”
বাঁধন যেন এই কথাটারই অপেক্ষায় ছিল। এক চিলতে তিক্ত হাসি ঠোঁট ছুঁয়ে মিলিয়ে যায়। আহসান রহমানের চোখে চোখ রেখে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
—-“ওকে ফাইন। আপনার সিদ্ধান্ত, আমি মেনে নিলাম। আজকের পর এই মুখ নিয়ে আর কোনোদিন আপনার সামনে দাঁড়াব না।”
কথা শেষ করেই বাঁধন রূপার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। কোনো সুযোগ না দিয়েই তার কব্জিটা ধরে ফেলে। আদেশের সুরে বলে,

—-“চল।”
রূপার বুকটা ধক করে ওঠে। ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে,
—-“কো, কোথায়?”
বাঁধন একটুও নরম না হয়ে শীতল, কর্তৃত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলে,
—-“তোর হাজব্যান্ড যেখানে যাবে সেখানেই যাবি।”
রূপা মাথা নাড়তে নাড়তে হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করে। প্রায় কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে,
—-“না আমি আমার বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাব না। প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন।”
বাঁধন রূপার কব্জিটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে। চোখের দৃষ্টি একটুও নরম হয় না। কর্তৃত্বে ভরা কণ্ঠে বলে,
—-“কিসের বাড়ি? এটা এখন আর তোর বাড়ি না আর আমারও না। ফ্রম নাও অন, তোর বাড়ি একটাই যেখানে আমি থাকব। কারণ ইউ আর মাই ওয়াইফ।”
রজনী রহমান আর নিজেকে সামলাতে পারেন না। এক পা এগিয়ে এসে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে বলেন,
—-“বাঁধন, ওকে ছেড়ে দাও। তুমি ওকে এভাবে নিয়ে যেতে পারো না।”
বাঁধন ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে রজনী রহমানের দিকে তাকায়। চোখেমুখে কঠিন একরোখা ভাব। ঠান্ডা, দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

—-“উইথ ডিউ রেসপেক্ট, মিসেস রজনী রহমান এটা বলার অধিকার এখন আর কারও নেই। রূপা শি ইজ মাই ওয়াইফ। সো, আমি যেখানে যাব, আমার ওয়াইফও সেখানেই যাবে।”
রূপা মরিয়া হয়ে নিজের হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে,
—-“আমি যাব না আপনার সঙ্গে কোথাও যাব না। আমি এই বাড়ি ছেড়ে যাব না।”
আহসান রহমান আর সহ্য করতে না পেরে কঠোর কণ্ঠে বলে ওঠেন,
—-“বাঁধন! রূপাকে ছেড়ে দে, বলছি!”
বাঁধন এবার ধীরে ধীরে তাঁর দিকে তাকায়। চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। হিসহিসে, রাগে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
—-“আই ডোন্ট থিংক, আমি কি বিয়ে করেছি বউকে রেখে একা থাকার জন্য। বিয়ে করেছি মানে ফ্রম টুডে, টোয়েন্টি ফোর সেভেন আমার ওয়াইফ আমার সাথেই থাকবে। অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল।”
কথাটা শেষ করেই বাঁধন এক ঝটকায় রূপাকে কাঁধে তুলে নেয়।হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ক্যান্ডি রূপার কোল থেকে নিচে পড়ে যেতে নেয়। ঠিক তখনই আকাশ বৃষ্টির মুখ থেকে হাত সরিয়ে দ্রুত দৌড়ে গিয়ে ক্যান্ডিটাকে লুফে নেয়।কাঁধে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকা অবস্থাতেই রূপা দুমদাম করে বাঁধনের চওড়া পিঠে কিল-ঘুষি মারতে থাকে। চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। ছটফট করতে করতে চিৎকার করে বলে,

—-“ছাড়ুন! আমি আপনার সঙ্গে যাব না! আমাকে নামান প্লিজ, নামান।”
রূপাকে কাঁধে নিয়েই দরজার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল বাঁধন। ঠিক তখনই আহসান রহমানের বজ্রকণ্ঠে পা থামিয়ে দেয় পুরো হলরুম।আহসান রহমান তীব্র রাগে বলেন,
—-“তুই ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস? তোর কি নিজের কোনো বাড়ি আছে, যেখানে ওকে নিয়ে রাখবি?”
বাঁধন ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে আহসান রহমানের দিকে তাকায়। কাঁধে ছটফট করতে থাকা রূপাকে এক হাত দিয়ে আরও শক্ত করে সামলে নিয়ে ঠান্ডা, আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বলে,
—-“আমি ওকে কোথায় রাখবো, কী খাওয়াবো, কী পরাবো সেগুলো নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আমার বউ, আমি কোথায় রাখবো,কি খাওয়াবো সেটা আমি বুঝবো। ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু ওরি অ্যাবাউট দ্যাট।”
এক মুহূর্ত থেমে চারপাশে একবার তাকায় সে। তারপর আবার আহসান রহমানের চোখে চোখ রেখে দৃঢ় কণ্ঠে বলে,

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩২

—-“আপনি আপনার সংসার নিয়ে থাকুন আমি আমার সংসার বুঝে নিয়েছি। এই বাড়িতে আমার বলতে আর কেউ নেই। যা আমার ছিল সেটা আমি সঙ্গে নিয়েই যাচ্ছি।”
শেষ কথাটা বলেই বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ, তিক্ত এক হাসি ফুটে ওঠে। দরজার দিকে ঘুরে হাঁটতে হাঁটতে উচ্চ সুরে ছুঁড়ে দেয়।
—-“সো গুডবাই, মিস্টার আহসান রহমান।”

বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here