বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৪
সুমি চৌধুরী
রূপাকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ির গ্যারেজে এসে থামে বাঁধন। একটুও সময় নষ্ট না করে নিজের টাকায় কেনা বিএমডব্লিউ বাইকটা বের করে আনে। ঠিক তখনই আকাশ আর বৃষ্টি বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে।আকাশ বাঁধনের সামনে এসে কপাল কুঁচকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—-“এত রাতে কোথায় যাবি?”
বাঁধন বাইকের হ্যান্ডেলে হাত রেখে নির্বিকার দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
—-“শহরে থাকার জায়গার অভাব নেই।”
রূপা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়িয়ে কাঁপা কণ্ঠে বলে,
—-“আমি যাব না। আপনি কি কানে শুনতে পান না? আমি কোথাও যাব না!”
বাঁধন ধীর পায়ে এগিয়ে এসে রূপার ঠিক সামনে দাঁড়ায়। দু’জনের মাঝখানের দূরত্বটুকুও মিলিয়ে যায়। তারপর চোয়াল শক্ত করে, ভয় ধরানো কণ্ঠে বলে,
—-“আর একটা শব্দ যদি তোর মুখ থেকে বের হয় তাহলে মুখে টেপ লাগিয়ে নিয়ে যাব। ডোন্ট টেস্ট মাই পেশেন্স।”
কথা শেষ করেই কোনো সুযোগ না দিয়ে রূপার হাত ধরে জোর করে তাকে বাইকের পেছনের সিটে বসিয়ে দেয়।
আকাশ এগিয়ে এসে ক্যান্ডিটাকে আলতো করে রূপার কোলে তুলে দেয়। তারপর নিজের বাইকের কাছে গিয়ে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলে,
—-“ওঠো তোমাকে বাসায় নামিয়ে দিয়ে আসি।”
বৃষ্টি চুপচাপ মাথা নাড়ে। সারাদিনের ধাক্কায় তার শরীর এখনও কাঁপছে। ধীর পায়ে এগিয়ে এসে সে বাইকে উঠে বসে।এদিকে বাঁধন বাইক স্টার্ট দিতেই ইঞ্জিনের গর্জনে চারপাশ কেঁপে ওঠে। বাইক সামান্য এগোতেই ভারসাম্য হারানোর ভয়ে রূপা চমকে উঠে বাঁধনের কাঁধ শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।ওদিকে আকাশও নিজের বাইক স্টার্ট দিয়ে ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে বলে,
—-“আমি কিন্তু আস্তে বাইক চালাতে পারি না। ভালো করে ধরে বসো নইলে পড়ে যাবে।”
কাঁপা কাঁপা হাতে খুব আলতো করে আকাশের কাঁধে হাত রাখে বৃষ্টি। স্পর্শটা এতটাই হালকা, যেন জোরে ধরলেই অপরাধ হবে। আকাশ একবার শুধু পাশ ফিরে তাকায়, তারপর আর কিছু না বলে বাইকটা স্টার্ট দেয়। মুহূর্তের মধ্যেই দুইটা বাইক রাতের ফাঁকা শহরের রাস্তায় ছুটে চলে।
বাঁধনের বাইকের পেছনে নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে রূপা। এক’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে আছে বাঁধনের কাঁধ। বাতাসে তার কপালের সামনের চুলগুলো বারবার উড়ে এসে মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। অজান্তেই আড়চোখে বারবার হেলমেট পরা বাঁধনের দিকে তাকাচ্ছে সে।কেন জানি বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অনুভূতি কাজ করছে। ভয়, অস্বস্তি, বিস্ময় সবকিছুর মাঝেও অচেনা এক ভালো লাগা এসে নিঃশব্দে মনটাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে। নিজেরই অনুভূতিকে বিশ্বাস করতে পারছে না রূপা। এখনো যেন তার কাছে সবকিছু স্বপ্নের মতো লাগছে। সত্যিই কি তার বিয়ে হয়ে গেছে? তাও আবার বাঁধনের সঙ্গে! ভাবলেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠছে।কিছুদূর যাওয়ার পর আকাশ নিজের বাইকটা বাঁধনের সমান্তরালে এনে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকায়। স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
—-“সারাদিন তো ঠিকমতো কিছুই খাওয়া হয়নি। চল, আগে একটা রেস্টুরেন্টে যাই। কিছু খেয়ে তারপর যেখানে যাওয়ার যাবি।”
বাঁধন কোনো উত্তর দেয় না। শুধু সামান্য মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে বাইকের গতি ঘুরিয়ে শহরের একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থামে। তার পেছনেই আকাশও বাইক থামায়।চারজনই ভেতরে ঢুকে নীরবে যার যার মতো হালকা কিছু খেয়ে নেয়। পুরো সময়টাতেই রূপা প্রায় মাথা নিচু করেই বসে থাকে। মাঝে মাঝে শুধু চোখ তুলে বাঁধনের দিকে তাকায়, আবার দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে।খাওয়া শেষ করে সবাই রেস্টুরেন্টের বাইরে বেরিয়ে আসে। চারপাশে তখন রাত আরও গভীর হয়েছে। রূপা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর ধীর পায়ে বাঁধনের কাছে এসে দ্বিধাভরা কণ্ঠে বলে,
—-“এত রাতে আমি আপনার সঙ্গে কোথায় যাব?”
বাঁধন কোনো উত্তর না দিয়ে পকেট থেকে ফোনটা বের করে। স্ক্রিনে কয়েকবার আঙুল চালিয়ে কী যেন দেখে। তারপর নির্বিকার মুখে, একেবারে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
—-“জাহান্নামে যাবি আমার সঙ্গে।”
বাঁধনের রুক্ষ উত্তরে অপ্রস্তুত হয়ে যায় রূপা। ভ্রু কুঁচকে লোকটার দিকে তাকায়। মনে মনে বিরক্তি জমে ওঠে।লোকটা এমন কেন? একটু ভালো করে কথা বললে কি খুব ক্ষতি হয়ে যাবে?আকাশ কয়েক পা এগিয়ে এসে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,
—-“কী ভাবলি? এখন কোথায় যাবি?”
বাঁধন এক মুহূর্তও সময় নেয় না। সংক্ষিপ্ত, নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
—-“রিসোর্টে।”
কথাটা কানে যেতেই রূপার চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। সে প্রায় লাফিয়ে ওঠার মতো করে বলে,
—-“কী! রিসোর্টে? না আমি মরে গেলেও আপনার সঙ্গে রিসোর্টে যাব না!”
বাঁধন ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে রূপার দিকে তাকায়। চোখদুটো অস্বাভাবিক রকম শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির আড়ালেই লুকিয়ে আছে কঠিন সতর্কতা। চাপা কণ্ঠে বলে,
—-“চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকবি নাকি তুলে আছাড় মারবো”
বাঁধনের কণ্ঠের কঠোরতায় রূপা থমকে যায়। ঠোঁট কামড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে।বৃষ্টি আস্তে করে রূপার কাছে এগিয়ে আসে। চারপাশে একবার তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে তার কানের কাছে ফিসফিস করে বলে,
—-“চুপ থাক। ভাইয়ার মুড একদম অফ। দেখছিস না, মুখটা কেমন সিরিয়াস হয়ে আছে?”
রূপা মুখ ফুলিয়ে খুব আস্তে স্বরে জবাব দেয়,
—-“আমি তো সবসময়ই ওনাকে এমন গম্ভীর দেখি। মনে হয়, লোকটা হাসতেই জানে না।”
বৃষ্টি হালকা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ফিসফিস করেই বলে,
—-“জানে কিন্তু খুব কম। তাই প্লিজ, এখন আর কিছু বলিস না। না হলে আবার ধমক খাবি।”
তারপর আর কোনো কথা হয় না। রূপা আর বৃষ্টি চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকে। এদিকে বাঁধন আর আকাশ একটু দূরে সরে গিয়ে নিচু স্বরে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলে। কথাবার্তা শেষ হতেই দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ে।আকাশ নিজের বাইকের কাছে গিয়ে হেলমেট পরে বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
—-“আসো।”
বৃষ্টি একবার রূপার দিকে তাকায়। চোখেমুখে উদ্বেগ স্পষ্ট। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে তার দুই হাত ধরে মৃদু স্বরে বলে,
—-“ভয় পাস না, রূপা। কিছু হবে না, ইনশাআল্লাহ। আমি যাই। কলেজে দেখা হবে। আর প্লিজ একদম ভয় পাবি না, ঠিক আছে?”
রূপা কিছু বলতে পারে না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ে পরক্ষণেই বৃষ্টি রূপাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। রূপাও তাকে আঁকড়ে ধরে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। দুজনের চোখেই অদ্ভুত এক বিষণ্নতা।অবশেষে বৃষ্টি ধীরে ধীরে সরে আসে। আকাশের বাইকে উঠে বসতেই বাইকটা রাতের অন্ধকার চিরে সামনে এগিয়ে যায়।চারপাশ আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
বাঁধনও নিজের হেলমেটটা পরে বাইকের ওপর উঠে বসে। তারপর একবার রূপার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত, গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—-“ওঠ।”
রূপা অসহায়ের মতো মুখ করে কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর আর কোনো উপায় না দেখে ধীর পায়ে এগিয়ে এসে বাইকের পেছনে উঠে বসে।পরক্ষণেই বাঁধন ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। গর্জন তুলে বাইকটা রাতের নির্জন রাস্তা ধরে ছুটতে শুরু করে।কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ রাস্তার পাশে আলো ঝলমলে একটা পপকর্নের ভ্যান চোখে পড়ে রূপার। মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। সব ভয় যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য উধাও হয়ে যায়।সে তাড়াতাড়ি বাঁধনের কাঁধে হাত রেখে উৎসুক কণ্ঠে বলে,
—-“এই, এই, গাড়ি থামান! আমি পপকর্ন খাব!”
বাঁধন বাইকটা রাস্তার পাশে থামিয়ে হেলমেটের ভেতর থেকেই বিরক্ত গলায় বলে,
—-“এই রাতে আবার পপকর্ন খেতে হবে?”
রূপা একটুও দমে না। ঠোঁট ফুলিয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
—-“হ্যাঁ, খাব। এনে দিন না হলে এখনই বাইক থেকে নেমে দৌড় দেব।”
কথাটা শুনে বাঁধন ধীরে ধীরে বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়। কোনো তাড়াহুড়ো নেই তার ভঙ্গিতে। হেলমেট খুলে কয়েক সেকেন্ড রূপার দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর নিজের হেলমেটটা আলতো করে রূপার মাথায় পরিয়ে দেয় হেলমেটের স্ট্র্যাপ ঠিক করতে করতেই নিচু, স্থির কণ্ঠে বলে,
—-“পালানোর থ্রেট দিচ্ছিস?”
রূপা চোখ ফিরিয়ে নেয়।বাঁধন মৃদু হেসে মাথা নেড়ে বলে,
—-“একটা কথা ভালো করে শুনে রাখো, মিসেস। পৃথিবীর সবার কাছ থেকে পালাতে পারলেও এই জাওয়াদ অধীর বাঁধনের কাছ থেকে পালাতে পারবে না।”
একটু থামে সে। তারপর ধীরে ধীরে ঝুঁকে রূপার কানের কাছে মুখ নিয়ে যায়। কণ্ঠস্বর আরও নিচু হয়ে আসে।
—-“তোকে আমি লোহার খাঁচায় বন্দি করব না,এবং কি সোনার খাঁচাতেও না।”
রূপার বুকের ভেতরটা অকারণেই ধক করে ওঠে।বাঁধন ফিসফিস করে বলে,
—-“তোকে আমি ভালোবাসার খাঁচায় বন্দি করব। এতটা গভীর ভালোবাসা দেব যে তুই সেই ভালোবাসাতে ডুবে যাবি। আর তখন সেই ভালোবাসা ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারবি না। মার্ক মাই ওয়ার্ড।”
কথাগুলো বলেই আর একবারও পেছনে না তাকিয়ে বাঁধন পপকর্নের ভ্যানের দিকে হাঁটতে শুরু করে।রূপা স্থির হয়ে বসে থাকে।মনে হয়, কথাগুলো যেন কানের ভেতর নয় সোজা বুকের গভীরে গিয়ে আঘাত করেছে। অজানা এক শিহরণ সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দটা অস্বাভাবিক দ্রুত হয়ে ওঠে।কেন এমন হচ্ছে?
প্রশ্নটার উত্তর রূপার নিজের কাছেও নেই।কয়েক মিনিট পর বাঁধন এক প্যাকেট গরম গরম পপকর্ন কিনে এনে রূপার হাতে ধরিয়ে দেয়।পপকর্নটা হাতে নিয়ে রূপা মুখ বাঁকিয়ে বলে,
—-“চলন্ত বাইকে বসে আমি পপকর্ন খেতে পারব না। তার চেয়ে একটু দূরে কোথাও দাঁড়ান।”
বাঁধন বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে একবার গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে কোনো কথা না বলেই আবার বাইক স্টার্ট দেয়।কিছুদূর গিয়ে নির্জন, ফাঁকা একটা রাস্তার পাশে বাইক থামায় সে।বাইক থামতেই রূপা মাথা থেকে হেলমেট খুলে ক্যান্ডিটাকে আলতো করে বাঁধনের কোলে বসিয়ে দেয়। তারপর নিজেও বাইকের সিটে দুই পা একপাশে ঝুলিয়ে বেশ আয়েশ করে বসে পপকর্ন খেতে শুরু করে।বাঁধন অসহায়ের মতো একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তারপর বাইকের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়ায়। এক হাত পকেটে, অন্য হাতে ক্যান্ডিটাকে সামলে রাখে।ক্যান্ডি নিশ্চুপ হয়ে তার কোলেই বসে আছে। আর ঠিক পাশেই বসে থাকা অষ্টাদশী মেয়েটা যেন নিজের আলাদা এক জগতে ডুবে আছে। একমনে পপকর্ন খাচ্ছে সে।খয়েরি লিপস্টিক ছোঁয়া ছোট্ট ওষ্ঠজোড়া কখনো গোল হয়ে উঠছে, কখনো আবার আলতো করে নড়ে উঠছে। মাঝে মাঝে খেতে খেতে অজান্তেই গাল দুটো হালকা ফুলিয়ে ফেলছে।রাতের আবছা আলো, ফাঁকা রাস্তার নিস্তব্ধতা আর গাঢ় নীল বেনারসি শাড়ির আভায় রূপাকে আজ অদ্ভুত রকমের মোহময় লাগছে।বাঁধনের দৃষ্টি ধীরে ধীরে স্থির হয়ে যায় তার মুখে।কী এক অদৃশ্য ঘোর যেন তাকে আটকে রাখে।চোখ সরাতে চেয়েও সরাতে পারে না সে।রাত তখন প্রায় বারোটা ছুঁইছুঁই। ব্যস্ত শহরটাও ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। দূরের স্ট্রিটলাইটগুলোর হলদে আলো কালো পিচঢালা রাস্তাজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এক অদ্ভুত শান্ত পরিবেশ তৈরি করেছে।পপকর্নের শেষ দানাটাও মুখে দিয়ে রূপা বড় করে একটা হাই তুলে বাঁধনের দিকে তাকিয়ে বলল,
—-“চলুন না একটু হাঁটি।”
বাঁধন ভ্রু কুঁচকে বিরক্ত কণ্ঠে বলে,
—-“ইউ, রূপ ফাজলামি করছিস? অনেক রাত হয়েছে। চুপচাপ বাইকে ওঠ।”
রূপা কোনো উত্তর না দিয়ে ধপ করে বাইক থেকে নেমে পড়ে।
—-“যাব না আমি। আপনার লজ্জা করে না? একটা মেয়েকে নিয়ে মাঝরাতে রিসোর্টে যাচ্ছেন!”
বাঁধনের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। সংযত কঠিন কণ্ঠে বলে,
—-“তর্ক করার মুডে আমি নেই। গুড গার্লের মতো বাইকে ওঠ।”
রূপা এবারও কথা শোনে না। মুখ ঘুরিয়ে কয়েক কদম হেঁটে যায়। বাঁধনও তার পিছু নেয়।রাস্তা একেবারে ফাঁকা দেখে রূপা আচমকাই রাস্তার মাঝেই ধপ করে বসে পড়ে।
বাঁধন কপালে হাত ঠেকিয়ে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকায়।
—-“এখানে বসলি কেন?”
রূপা কোনো জবাব না দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বাঁধনের কোল থেকে ক্যান্ডিকে নিয়ে আবার আগের জায়গাতেই বসে পড়ে। গাল দুটো ফুলিয়ে গম্ভীর মুখে বলে,
—-“আমি আপনার সঙ্গে এক রিসোর্টেও যাব না।”
বলেই ক্যান্ডিকে কোলে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকে।
বাঁধন ভেতরে ভেতরে বিরক্ত হলেও সেটা প্রকাশ করে না। ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে রূপার পাশেই ধপ করে বসে পড়ে।
একবার আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকিয়েই আবার মুখ ফিরিয়ে নেয় রূপা।বাঁধনের চোখে এবার অদ্ভুত এক কোমলতা নেমে আসে। গাল ফুলিয়ে বসে থাকা মেয়েটাকে দেখে হাসি চেপে রাখতে পারে না।হালকা মজা করে বলে,
—-“কী ব্যাপার? রুটির মতো গাল ফুলিয়ে বসে আছিস কেন?”
রূপা একই ভঙ্গিতে গম্ভীর গলায় বলে,
—-“বলেছি তো আমি আপনার সঙ্গে রিসোর্টে যাব না।”
বলেই রূপা ঠোঁট ফুলিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইল। কোলে থাকা তুলতুলে ক্যান্ডির মাথায় আলতো করে হাত বুলাতে বুলাতে গম্ভীর মুখে সামনের নির্জন রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখেমুখে এমন এক অভিমান, যেন বাঁধনের বিরুদ্ধে নীরব আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে সে।বাঁধন একবার রূপার মুখের দিকে, আরেকবার চারপাশে তাকাল। রাতের আধুনিক শহরের প্রশস্ত রাস্তাটা একেবারেই ফাঁকা। দূরের স্ট্রিটলাইটগুলোর আলো কালো পিচঢালা রাস্তার ওপর ছড়িয়ে পড়ে অপূর্ব এক পরিবেশ তৈরি করেছে।রূপার রাগী মুখ দেখে বাঁধনের ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। সে ধীরে ধীরে আরও একটু গা ঘেঁষে রূপার পাশে বসে পড়ল। তারপর কাঁধ সামান্য ঝুঁকিয়ে মুচকি হেসে বলল,
—-“তাহলে চল, রিসোর্টে না যাই। এই রাস্তাতেই শুয়ে পড়ি। দেখ, আশেপাশে কেউ নেই ।”
কথাটা বলেই বাঁধন একটু থামল। তারপর নিচু গলায়, চোখ টিপে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে বলল,
—-“তুই যদি অনুমতি দিস তাহলে দুজন থেকে তিনজন হওয়ার মিশনটা এখান থেকেই শুরু করি, কেমন?”
কথাটা শুনে রূপা ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকাল। কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে অবশেষে বিড়বিড় করে বলল,
—-“আপনার দ্বারা এইসব বলাই সম্ভব। কী পরিমাণ নির্লজ্জ হলে একজন মানুষ নিজের বাবাকেও শ্বশুর বলে ডাকে।”
রূপার বিড়বিড় করে বলা কথাগুলো স্পষ্টই শুনতে পেল বাঁধন। কিন্তু রাগ না করে উল্টো দুষ্টু একটা হাসি দিল। তারপর রূপার ফুলে থাকা গালের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে হালকা সুরে গেয়ে উঠল।
” আমি ফুল ছিঁড়ে ভুল করেছি”
“কাটার আঘাত পেয়েছি”
“সেই ব্যথা ভুলেছি তোমার”
“খুশি যখন দেখেছি”
“ও আমি একটা গানও লিখেছি”
“সেই গানের সুর বেঁধেছি”
“সেই সুরে ভাসিয়ে তোমার”
“মনের দখল নিয়েছি”
“ও প্রেমে প্রেম হয়ে গেল রে”
“আর বাঁধা দিবে কে এসে”
“ও প্রেমে প্রেম হয়ে গেল রে”
“আর বাঁধা দিবে কে এসে”
রূপা থমকে যায়।বাঁধনের গুনগুন করে গাওয়া সুরটা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য চারপাশের সমস্ত নীরবতাকে ছাপিয়ে যায়। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে ওঠে।লোকটা গানও গাইতে পারে?বিশ্বাসই হতে চায় না তার। অজান্তেই বারবার আড়চোখে বাঁধনের দিকে তাকায় সে। কিছুক্ষণ আগেও যে মানুষটা আগুনের মতো রাগে ফুঁসছিল, সেই মানুষটার কণ্ঠে এখন অদ্ভুত এক কোমলতা।রূপা নিজের ভাবনায় ডুবে থাকতেই বাঁধন ধীরে ধীরে তার দিকে আরো ঘেষে আসে। কোনো কথা না বলে আলতো করে মাথাটা রূপার কাঁধে রেখে দেয়।ঘুমজড়ানো, ক্লান্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলে,
—-“রূপ আর জেদ করিস না, প্লিজ চল। আমি ভীষণ ক্লান্ত মাথাটা ফেটে যাচ্ছে।”
একটু থেমে গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে আবার বলে,
—-“আই প্রমিস তোকে আমি কিচ্ছু করব না। তিরিশ বছর নিজেকে কন্ট্রোল করতে পেরেছি, দরকার হলে আরও তিরিশ বছরও পারব। আই ক্যান ওয়েট। সো প্লিজ, চল।”
বাঁধনের কণ্ঠে আজ প্রথমবার কোনো জেদ নেই, কোনো হুকুম নেই আছে শুধু ক্লান্তি আর একরাশ আন্তরিকতা।
রূপার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে।সে ধীরে ধীরে বাঁধনের দিকে তাকায়। লোকটার চোখেমুখে সত্যিই ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। চোখের নিচে হালকা অবসাদ, কণ্ঠেও শক্তি নেই আগের মতো।অকারণেই বুকের ভেতর একফোঁটা মায়া জন্ম নেয় রূপার।কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুব আস্তে বলে,
—-“আচ্ছা চলুন।”
তারপর রূপাকে নিয়ে বাঁধন বাইকটা শহরের একটি নামকরা রিসোর্টের সামনে এসে থামায়। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা। দূরের আলোয় রিসোর্টের বিশাল ভবনটা আরও অভিজাত দেখাচ্ছে।বাঁধন বাইক থেকে নেমে রূপার দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে বলে,
—-“চল।”
রূপা চুপচাপ ক্যান্ডিকে কোলে নিয়ে তার পেছন পেছন হাঁটতে থাকে।দু’জনে রিসেপশনে ঢুকতেই ডেস্কে বসে থাকা তরুণ কর্মচারী ভদ্র হাসি দিয়ে দাঁড়িয়ে যায়।
—-“জি স্যার, বলুন। কীভাবে আপনাকে সাহায্য করতে পারি?”
বাঁধন একদম সরাসরি উত্তর দেয়,
—-“এক রাতের জন্য একটা রুম চাই।”
ছেলেটা পেশাদার ভঙ্গিতেই মাথা নাড়ে।
—-“শিওর, স্যার। তবে রেজিস্ট্রেশনের জন্য আপনাদের বিবাহের কাগজ আর আপনার পরিচয়পত্রটা লাগবে।”
বাঁধনের মুখে হালকা বিরক্তির ছাপ ফুটে ওঠে। কোনো কথা না বলে পকেট থেকে সদ্য করা কাবিননামার কাগজ বের করে কাউন্টারের ওপর রাখে। তারপর নিজের পরিচয়পত্রটাও এগিয়ে দেয়।ছেলেটা প্রথমে কাবিননামার ওপর চোখ বুলিয়ে নেয়। তারপর পরিচয়পত্রটা হাতে নিয়েই হঠাৎ থমকে যায়।
মুহূর্তের মধ্যে তার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে ওঠে। হাত দুটোও কেঁপে ওঠে।এই শহরের এসপি!সে তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
—-“স-সরি, স্যার! আমি আমি আপনাকে চিনতে পারিনি। ভুল হয়ে গেছে, স্যার।”
বাঁধন নির্বিকার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে শান্ত অথচ গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—-“এতবার ‘সরি’ বলার দরকার নেই। আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করেছেন, ব্যস। সো রিল্যাক্স। এখন রুমের ব্যবস্থা করুন।”
বাঁধনের কথায় ছেলেটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তারপর দ্রুত কম্পিউটারে প্রয়োজনীয় তথ্য এন্ট্রি করতে শুরু করে।অতঃপর রিসেপশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে দুজনকে একটি রুম বুঝিয়ে দেওয়া হলো।রুমে ঢুকেই বাঁধন কোনো কথা না বলে সোজা ওয়াশরুমে চলে গেল।আর রূপা ধীরে ধীরে চারপাশে চোখ বুলাতে লাগল। এমন বিলাসবহুল রুমে সে আগে কখনো আসেনি। ধবধবে সাদা দেয়াল, নরম হলদে আলোর ছটা, দেয়ালজুড়ে নান্দনিক পেইন্টিং, পরিপাটি আসবাবপত্র সব মিলিয়ে যেন ছবির মতো সুন্দর পরিবেশ। বিস্ময়ে তার চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। মুগ্ধ দৃষ্টিতে চারপাশটা দেখতেই থাকে সে।কয়েক মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে আসে বাঁধন। ফ্রেশ হয়ে এলেও চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ এখনো স্পষ্ট।রূপার দিকে তাকাতেই তার দৃষ্টি আটকে যায়।ভারী বেনারসি, গয়না আর বউসাজে এখনও একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটা।বাঁধন মনে মনে বুঝতে পারে, এই ভারী পোশাকে সারারাত থাকা তো দূরের কথা, কয়েক ঘণ্টা থাকাও কষ্টকর হবে।ঠিক তখনই দরজায় মৃদু টোকা পড়ে।বাঁধন এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই রিসোর্টের এক নারী কর্মচারী ভেতরে প্রবেশ করেন। তার হাতে একটি ট্রে, সেখানে কিছু শুকনো খাবার আর পানির বোতল রাখা।
ট্রেটা টেবিলের ওপর রেখে ভদ্রভাবে বলেন,
—-“স্যার, এগুলো আপনাদের জন্য। আর একটা কথা ওয়ার্ডরোবের ভেতরে কিছু নতুন শাড়ি রাখা আছে। ম্যাডামের প্রয়োজন হলে ব্যবহার করতে পারবেন।”
বাঁধন মাথা নেড়ে ধন্যবাদ জানায়।
—-“ওকে, থ্যাংক ইউ।”
নারী কর্মচারী বিনীত হাসি দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যান।
বাঁধন ওয়ার্ডরোব খুলে দেখে, সেখানে বিভিন্ন রঙের হালকা, আরামদায়ক কয়েকটি নতুন শাড়ি সুন্দর করে ভাঁজ করে রাখা।সেখান থেকে হালকা নীল রঙের একটি জর্জেট শাড়ি বের করে রূপার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে শান্ত কণ্ঠে বলে,
—-“এই নে। এত ভারী বেনারসি পরে থাকা কষ্ট হবে। ফ্রেশ হয়ে এটা পরে আয়। এতে আরাম লাগবে।”
রূপা মাথা নিচু করে আঙুল মুচড়াতে মুচড়াতে লাজুক, অসহায় কণ্ঠে বলল,
—-“আমি আমি তো শাড়ি পরতে জানি না। এটা কীভাবে পরব?”
কথাটা শুনে মুহূর্তেই বিপদে পড়ে যায় বাঁধন।এই মাঝরাতে এখন কাকে দিয়ে শাড়ি পরাবে!কয়েক সেকেন্ড ভেবে হঠাৎ তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়।তড়িঘড়ি করে ফোন বের করে শাড়ি পরার একটা ভিডিও চালু করল। তারপর রূপার হাত থেকে ক্যান্ডিকে নিজের কোলে নিয়ে ফোনটা তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে খানিকটা আদেশের সুরেই বলল,
—-“এই নে। ভিডিও দেখে দেখে পরে আয়। আর হ্যাঁ ফাস্ট। আমার ধৈর্য কিন্তু খুব একটা ভালো না।”
রূপা কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিল। একবার বাঁধনের দিকে তাকাল, তারপর শাড়িটা বুকে জড়িয়ে চুপচাপ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজাটা ভেতর থেকে আটকে দিল।বাঁধন ক্যান্ডিকে কোলে নিয়েই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাতের শীতল বাতাস তার এলোমেলো চুল ছুঁয়ে বয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের ক্লান্তিতে চোখদুটো ভারী হয়ে এসেছে।প্রায় বিশ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খোলার শব্দে সে ধীরে ধীরে ভেতরে এল।সামনে তাকিয়েই জায়গাতেই থমকে দাঁড়িয়ে গেল।
রূপা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে শাড়িটা যেন কোনো রকমে শরীরের সঙ্গে ঝুলিয়ে রেখেছে। কুঁচিগুলো এত লম্বা হয়ে আছে যে দু’পা হাঁটলেই পায়ে জড়িয়ে যাবে। আঁচলটাও একদিকে বেঁকে আছে।বাঁধনের দৃষ্টি নিজের ওপর স্থির দেখে রূপা অস্বস্তিতে ঠোঁট কামড়ে নিচু স্বরে বলল,
—-“ওইভাবে তাকিয়ে থাকবেন না। আমি তো আগেই বলেছিলাম শাড়ি পরতে জানি না। কোনো রকমে ভিডিও দেখে পরে নিয়েছি।”
বাঁধন কোনো উত্তর দিল না। ক্যান্ডিকে বিছানার ওপর আলতো করে বসিয়ে ধীর পায়ে রূপার সামনে এসে দাঁড়াল।
যেই না শাড়ির কুঁচিগুলো ঠিক করতে হাত বাড়িয়েছে, অমনি রূপা দু’পা পিছিয়ে গিয়ে শাড়িটা বুকের কাছে শক্ত করে চেপে ধরে চোখ বড় বড় করে বলে উঠল,
—-“এই! কী করছেন? একদম কাছে আসবেন না। আগে থেকেই বলে দিচ্ছি আমাকে ছুঁবেন না। আপনি নিজেই প্রমিস করেছিলেন,কিছু করবেন না।”
বাঁধন বিরক্তিতে চোখ বন্ধ করে একবার গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর কপালে হাত ঠেকিয়ে বলে উঠল,
—-“ইয়া আল্লাহ! আরে বেয়াদব মেয়ে রোমান্স করতে আসিনি। এভাবে শাড়ি পরে থাকলে পাঁচ মিনিট পরেই খুলে যাবে। এদিকে আয়। ভিডিও দেখে দেখে ঠিক করে পরিয়ে দিচ্ছি।”
রূপা জেদি মুখে মাথা নাড়িয়ে আরও এক কদম পিছিয়ে গেল।
—-“না মানে না। খুললে খুলবে, সেটা আমি সামলাব। আপনাকে আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে হবে না।”
বাঁধন কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে অসহায়ের মতো হেসে বলল,
—-“ওকে অ্যাজ ইউ উইশ। পরে যদি শাড়ি খুলে গিয়ে মাঝরাতে কান্নাকাটি করিস, তখন কিন্তু আমার কাছে আসবি না। আগেই ওয়ার্নিং দিয়ে রাখলাম।”
কথাটা বলেই বিরক্তিভরে নিজের গা থেকে পাঞ্জাবিটা খুলে এক ঝটকায় সোফার ওপর ছুড়ে মারল। তারপর জুতো খোলারও ধৈর্য দেখাল না। জুতো পরা অবস্থাতেই ধপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল।ছাদের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল,
—-“এই মেয়েটা আমাকে সত্যিই পাগল বানিয়ে ছাড়বে।”
হুট করে বাঁধনকে খালি গায়ে দেখে রূপা দ্রুত দুচোখ বন্ধ করে নিল। সে চোখ বন্ধ রেখেই আড়ষ্ট কণ্ঠে বলল।
—-” এই,এই আপনি এভাবে খালি গায়ে শুয়ে পড়লেন কেন?”
বালিশে মুখ গুঁজে রেখে একটা রহস্যময় হাসি দিল বাঁধন। তার কণ্ঠের স্বরে এক ধরনের চাপা রূপাকে সঙ্গে নিয়ে এক’হ ও পুরুষালি অধিকার, সে বালিশে মুখ রেখেই বলে উঠল।
—-“তোর সাথে রোমান্স করবো তাই। বিছানায় আয় খালি দেখাচ্ছি মজা।”
রূপার গলায় কান্নার সুর, কাঁদো কাঁদো মুখে সে প্রতিবাদ করে উঠল।
—-“আপনি বলেছিলেন আমাকে কিছু করবেন না! তবে এখন এসব বলছেন কেন?”
বাঁধনের মাথায় যেন আগুন জ্বলছে। ও কি রূপাকে বিয়ে করলো নাকি কোনো পাগলকে! ফোঁস ফোঁস করে জোরে শ্বাস টেনে সে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের বন্যতা, অদ্ভুত এক রোমান্স ভঙিতে সে রূপার দিকে এগোতে এগোতে নিচু স্বরে বলল।
—“মিথ্যা বলেছিলাম তোকে রুমে আনার জন্য, এখন সেই মিথ্যাই সত্যি করব। আজ তোকে আস্ত গিলে খাব, দেখি কে তোকে আমার হাত থেকে বাঁচায়।,কাছে আয় সুইটহার্ট ।”
রূপা ভয়ে কাঁপছে, পায়ের তলায় মাটি যেন সরে যাচ্ছে। সে পিছাতে পিছাতে আতঙ্কিত গলায় বলল।
—-“দেখুন, ভালো হবে না কিন্তু! আমার কাছে আসবেন না, খুব খারাপ হয়ে যাবে!”
পিছাতে পিছাতে রূপার পিঠ গিয়ে ঠেকলো শক্ত দেয়ালে। পালানোর আর কোনো পথ নেই। ঠিক সেই মুহূর্তে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এল বাঁধন। তার দুই হাতের মাঝখানে রূপাকে আবদ্ধ করে ফেলল সে। খালি গায়ে বাঁধনের বুকের উত্তাপ আর তার শরীর থেকে ভেসে আসা পুরুষালি ঘ্রাণ, ঘামের তীব্র গন্ধ সরাসরি রূপার নাকে গিয়ে ধাক্কা দিল। রূপার শরীরটা যেন মুহূর্তেই অবশ হতে শুরু করল। সে চোখ জোড়া আরও শক্ত করে বন্ধ করে ফেলল, যেন বাইরের পৃথিবীকে পুরোপুরি আড়াল করতে চায়। বাঁধন রূপার কানের কাছে মুখটা নামিয়ে আনল, তার নিশ্বাসের উষ্ণতা রূপার ঘাড় ছুঁয়ে যাচ্ছে। নেশালো কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল।
—-“কিছু করার আগেই যে অবস্থা তোর, তাহলে সত্যি সত্যিই যদি কিছু করে ফেলি তখন তোকে তো খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
রূপা দিশেহারা হয়ে নিজের হাত দিয়ে বাঁধনের বুকে ধাক্কা দিতে লাগল, চোখ বন্ধ অবস্থাতেই আর্তনাদ করে বলল।
—-“প্লিজ! দয়া করে দূরে যান! আমি বলছি দূরে সরুন!”
রূপার সারা শরীর কাঁপছে, বাঁধনের শরীরের পুরুষালি গন্ধে তার মস্তিষ্ক যেন কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। বাঁধন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রমণীর দিকে। মেয়েটার এই অসহায়, কম্পমান অবস্থা দেখে বাঁধনের নিজেকেই কেমন জানি বেসামাল মনে হচ্ছে, নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাটাই এখন তার কাছে কঠিন হয়ে পড়ছে।শয়তানি হাসি দিয়ে বলল।
—-“রিলাক্স সোনা কিছু করিনি, শাড়ি খুলে যাবে, তখন কিন্তু আমার দোষ দিতে পারবি না।”
পুরুষটির ফিসফিসানি কণ্ঠস্বরে সর্বাঙ্গ নিথর হয়ে আসে অষ্টাদশীর। দুহাতে পুরুষটির উদাম বুক সরাতে চাইলেও শরীর যেন বেইমানি করে, হাতগুলো আড়ষ্ট হয়ে পড়ে থাকে। দীর্ঘ চোখের পাপড়িগুলো থরথর করে কাঁপছে। তীর তীর করে কেঁপে উঠছে ওষ্ঠাধর। এই সূক্ষ্ম কম্পনটুকুও এড়ায় না বাঁধনের। তার নেশাতুর চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে যায় অষ্টাদশীর কাঁপা ঠোঁট দুটোর ওপর। নিজেকে আর বশ মানাতে পারে না সে, ধীরে ধীরে ঝুঁকে পড়ে রমণীর ওষ্ঠজোড়ার দিকে। ঠিক যখনই ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়াবে, তখনই বাঁধনের ঠোঁটে নিজের বুড়ো আঙুল চেপে ধরে অষ্টাদশী। আলতো করে চোখ জোড়া খুলে তাকায় বাঁধনের আদিম, নেশাতুর পুরুষালি চোখের দিকে। কাঁপা কাঁপা গলায় আর্তস্বরে শুধায়।
—-“কী করছেন?”
ঠিক মুখের ওপর নিজের উত্তপ্ত নিশ্বাস ফেলে বাঁধন ফিসফিস করে বলল।
—-“রোমান্স করছি।”
শরীর জুড়ে অদ্ভুত এক শিহরণ বয়ে যায় অষ্টাদশীর, শিরদাঁড়া দিয়ে যেন কারেন্ট খেলে যায়। অসহায় কণ্ঠে আবার আওড়ায়।
—-“বলেছিলেন কিছু করবেন না।”
অষ্টাদশীর আঙুলের ওপর আলতো করে একটা মৃদু চুমু খায় বাঁধন। তার চোখের গভীর অতলে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল।
—-“বেশি কিছু করবো না, শুধু হালকা করে একটা চুমু খাবো তোর ওই ঠোঁটে। তোর ওই কাঁপা ঠোঁট দুটো যে কি পরিমান টানে আমাকে, বলে বোঝাতে পারবো না।”
নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না রূপা। শরীরের শেষ শক্তিটুকুও যেন মুহূর্তেই নিঃশেষ হয়ে যায়। চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে, আর পরের মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে ঢলে পড়ে সে।বজ্রগতিতে সরু কোমর জড়িয়ে ধরে আগলে নেয় বাঁধন। বুকের সঙ্গে শক্ত করে চেপে ধরতেই বিরক্তি আর দুশ্চিন্তায় তার চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে। রাগে ভ্রু কুঁচকে যায়। রূপাকে অনায়াসে কোলে তুলে বিছানার দিকে এগোতে এগোতে নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলে,
—- “জীবনে নিশ্চয়ই কোনো মহাপাপ করেছি, না হলে এমন চিংড়ি মাছের মতো একগুঁয়ে মেয়ের প্রেমে পড়তে হয় আমার?”
কথাগুলো যতই বিরক্তির শোনাক, তার দুই হাতের যত্নে বিন্দুমাত্র রুক্ষতা নেই।বিছানায় আলতো করে রূপাকে শুইয়ে দেয় বাঁধন। নিস্তেজ মুখটার দিকে এক পলক তাকিয়েই বুকের ভেতর অজানা এক অস্বস্তি খেলে যায়। ।মেয়েটার শরীরে তখনও ভারী গয়নাগুলো জড়িয়ে আছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে একে একে গলা থেকে ভারী হার, কানের দুল, হাতভর্তি চুড়ি খুলে পাশে রাখে। তারপর খোঁপায় গুঁজে রাখা লাল আর সাদা গোলাপের ক্লিপগুলো খুলে দিতেই মুহূর্তে ঝর্ণার মতো নেমে আসে রূপার ঘন, দীর্ঘ কালো চুল। কয়েকটি এলোমেলো গোছা এসে ছুঁয়ে যায় তার গাল।এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায় বাঁধন। গভীর, অদ্ভুত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে রূপার শান্ত মুখের দিকে। মনে হয়, এই নিশ্চুপ মুখটাও যেন হাজারটা কথা বলে ফেলছে।নিজের অস্থিরতাকে জোর করেই সরিয়ে নেয় সে। ক্যান্ডিকে আলতো করে রূপার পাশে শুইয়ে দিয়ে ধীর পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়।রাতের শীতল বাতাস মুখে এসে লাগে। দূরে শহরের অস্পষ্ট আলো জ্বলছে, অথচ তার ভেতরের অন্ধকার যেন আরও ঘন হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ আগেও শরীর ভেঙে আসা ক্লান্তি ছিল, এখন তার লেশমাত্র নেই। চোখে ঘুম নেই, মনে শান্তি নেই। প্রায় এক ঘণ্টার মতো ব্যালকনিতে কাটিয়ে নিঃশব্দে রুমে ফিরে আসে বাঁধন। ভেতরে ঢুকেই বিছানার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ থমকে যায় সে। অজান্তেই দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে বিছানায় শুয়ে থাকা রমণীর দিকে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন অষ্টাদশী। দীর্ঘ রেশমি চুলগুলো বালিশের ওপর সাপের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ছড়িয়ে আছে। সেই এলোমেলো বিন্যাসের মাঝেও যেন এক অদ্ভুত মায়া লুকিয়ে আছে। ঘুমের ঘোরে ওষ্ঠজোড়া সামান্য ফাঁক হয়ে রয়েছে, যেন কোনো অসমাপ্ত স্বপ্ন নিঃশব্দে তার ঠোঁটের কোণে এসে থেমে আছে। শান্ত মুখশ্রীর স্নিগ্ধতায় সময় যেন এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে, কোনো এক রূপকথার ঘুমন্ত পরী মর্ত্যের এই বিছানায় নেমে এসে চারপাশে অদৃশ্য এক মায়াবী আবেশ ছড়িয়ে দিয়েছে।নিথর সেই রমণীর দিকে একদৃষ্টে চেয়ে থাকে বাঁধন। তার চোখের গভীরে জমাট বাঁধে বিস্ময়, মুগ্ধতা আর দুর্বার এক আকর্ষণ। পৃথিবীর সব শব্দ যেন এই মুহূর্তে মিলিয়ে গেছে। শুধু শোনা যাচ্ছে রমণীর শান্ত নিশ্বাসের মৃদু ওঠানামা, আর নিজের বুকে ছুটে চলা হৃদস্পন্দনের শব্দ।অনেকক্ষণ পর ধীরে ধীরে এসে তার পাশেই শুয়ে পড়ে বাঁধন। কিন্তু ঘুম যেন আজ তার সঙ্গে বেইমানি করেছে। যতই চোখ বন্ধ করে, ততই অস্থিরতা বেড়ে যায়। এপাশ-ওপাশ করতে করতে শেষমেশ হাল ছেড়ে দিয়ে আলতো টানে রমণীকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নেয়। মুখটা রমণীর গলদেশে ডুবিয়ে দীর্ঘ শ্বাসে ভরে নেয় চুলে লেগে থাকা মিষ্টি শ্যাম্পুর সুবাস। সেই স্নিগ্ধ ঘ্রাণে যেন রাতের সমস্ত ক্লান্তি ধীরে ধীরে গলে যেতে থাকে।ঠোঁটের কোণে দুষ্টু এক হাসি ফুটে ওঠে তার।
—-“এমন একটা তুলতুলে কোলবালিশ পাশে রেখে আমি কিনা এতক্ষণ ছটফট করছিলাম! আজ থেকে এটা আমার কোলবালিশ, গুড নাইট রূপ।”
কথাটা বলেই রমণীকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বাঁধন। বুকের ভেতর তার উষ্ণ নিঃশ্বাসের মৃদু ছন্দ, চুলে মিশে থাকা কোমল সুবাস আর নিস্তব্ধ রাত সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে তার ভেতরে। কিছুক্ষণ আগেও যে চোখে ঘুমের কোনো চিহ্ন ছিল না, সেই চোখই কখন ধীরে ধীরে ভারী হয়ে আসে, তা সে নিজেও বুঝতে পারে না। রমণীর মায়াময় উপস্থিতিকে বুকের মাঝে আগলে রেখেই একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় বাঁধন।
পরদিন সকালে ধীরে ধীরে ঘুম ভাঙে রূপার। চেতনা ফিরতেই নাকে ভেসে আসে এক মৃদু পুরুষালি ঘ্রাণ। সেই ঘ্রাণের সঙ্গে মিশে আছে অদ্ভুত এক উষ্ণতা। একই সঙ্গে অনুভব করে, যেন কোনো শক্তপোক্ত বৃক্ষ তাকে নিজের শিকড়ে নিঃশব্দে আগলে রেখেছে।আস্তে আস্তে চোখ খুলতেই মুহূর্তে থমকে যায় সে।চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক পুরুষের ঘুমন্ত মুখ।মুখ বললে যেন কম বলা হয়। মনে হচ্ছে, কোনো রূপকথার রাজপুত্র নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। নিষ্পাপ শিশুর মতো চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ। নিয়মিত ছন্দে ওঠানামা করছে তার বুক। কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকা ঘন কালো চুলগুলো তাকে আরও দুর্বার আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তীক্ষ্ণ নাক, দৃঢ় চোয়াল, ঘন ভ্রু আর শান্ত মুখাবয়ব সব মিলিয়ে যেন সৃষ্টিকর্তা বড় যত্ন করে এঁকেছেন এই মানুষটিকে। ঘুমের মধ্যেও মুখে ফুটে আছে এক অদ্ভুত ব্যক্তিত্ব, যা থেকে সহজে চোখ ফেরানো যায় না।রূপা হা করে তাকিয়ে থাকে।একজন পুরুষ এতটা সুদর্শন হতে পারে! এতদিন সে শুধু মানুষের মুখে শুনেছে কিছু মানুষকে একবার দেখলে বারবার দেখতে ইচ্ছে করে। আজ সেই কথার সত্যতা নিজের চোখে দেখছে সে। বাঁধনকে না দেখলে হয়তো কোনো দিন বিশ্বাসই করত না, একজন পুরুষও এতটা সুন্দর, এতটা মায়াবী আর একই সঙ্গে এতটা ব্যক্তিত্বময় হতে পারে।মুগ্ধতা কাটতে না কাটতেই হঠাৎ নিজের অবস্থানটা টের পায় রূপা। সে বাঁধনের উন্মুক্ত বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। আর বাঁধন যেন এক অবুঝ শিশুর মতো দু’হাত দিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে।মুহূর্তেই রূপার বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। সারা শরীরে অদ্ভুত এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়ে। এ জীবনে এই প্রথম কোনো পুরুষের এতটা কাছে সে। বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন যেন নিজের নিয়ম ভুলে যায়। নিশ্বাসও ভারী হয়ে আসে।
খুব সাবধানে বাঁধনের হাত সরানোর চেষ্টা করে রূপা। কিন্তু ঘুমের মধ্যেও তার আলিঙ্গন এতটাই দৃঢ় যে একচুলও নড়াতে পারে না।একবার মনে হয়, মানুষটার ঘুম ভেঙে দিক। পরক্ষণেই সেই ভাবনা উধাও হয়ে যায়। এত নিষ্পাপ, এত নিশ্চিন্ত একটা ঘুম ভাঙাতে মন সায় দেয় না। শেষমেশ নিচের ঠোঁটটা দাঁতে চেপে চুপচাপ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ঘুমন্ত পুরুষটির মুখের দিকে।বেশ কিছুক্ষণ পর বাঁধন হালকা নড়েচড়ে ওঠে।মুহূর্তের মধ্যেই রূপা তড়িঘড়ি করে চোখ বন্ধ করে ফেলে। যেন তার ঘুম এখনো ভাঙেনি।ধীরে ধীরে চোখ খুলে বাঁধন। সতর্কভাবে রূপাকে ছেড়ে উঠে বসে। ফোনের স্ক্রিনে সময় দেখতেই যেন চমকে ওঠে। দ্রুত তোয়ালেটা হাতে নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে।ওয়াশরুমের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেতেই রূপা আবার চোখ খুলে ধীরে ধীরে উঠে বসে। ঘুমের কারণে তার কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা দীর্ঘ চুলগুলো সম্পূর্ণ এলোমেলো হয়ে গেছে। কালো রেশমের ঢেউ যেন চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে।পাশে তাকিয়ে দেখে ক্যান্ডি এখনো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। মৃদু হাসি ফুটে ওঠে তার ঠোঁটে।
কিন্তু বিছানা থেকে নামতে গিয়েই সেই হাসি মিলিয়ে যায়।শাড়ির কুঁচিগুলো পুরো এলোমেলো হয়ে মেঝের ওপর লম্বা হয়ে ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে, আর এক পা এগোলেই শাড়িটা খুলে যাবে। অসহায় মুখে চারপাশে একবার তাকিয়ে আবার নিজের শাড়ির দিকে তাকায় রূপা। উপায়ান্তর না পেয়ে মুখ ভার করে সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।বেশ কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে বাঁধন। কাঁধে ঝুলছে তোয়ালে। রুমে পা রাখতেই তার চোখ পড়ে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকা রূপার ওপর।এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় বাঁধন।মেয়েটাকে দেখে তার মনে হয়, এ যেন রূপা নয়, ঘুম ভাঙা কোনো অদ্ভুত মায়াবিনী দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে। শাড়ির কুঁচিগুলো আগের চেয়েও লম্বা হয়ে মেঝেতে ছড়িয়ে পড়েছে। কোমর ছাপিয়ে নেমে আসা লম্বা কালো চুলগুলো একেবারে এলোমেলো হয়ে পিঠ, কাঁধ আর মুখের চারপাশে ছড়িয়ে আছে। কিছু চুল এসে হাঁটু পর্যন্ত গড়িয়ে পড়েছে। ঘুম ভাঙা এই অগোছালো অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, কোনো শেওড়া গাছের পেতনি হঠাৎ মানুষের রূপ ধরে সামনে দাঁড়িয়ে আছে।দৃশ্যটা দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসি আটকে রাখার চেষ্টা করে বাঁধন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হালকা হেসেই ফেলে সে।বাঁধনের হাসির শব্দ কানে যেতেই অস্বস্তিতে পড়ে যায় রূপা। আড়চোখে একবার তাকাতেই চোখ আটকে যায় বাঁধনের দিকে।ফ্রেশ হয়ে আসা বাঁধনের উন্মুক্ত শরীর, প্রশস্ত কাঁধ আর দৃঢ় পুরুষালি ব্যক্তিত্বে মুহূর্তেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে রূপা। এক ঝলক তাকিয়েই তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নেয় সে। লজ্জায় গাল দুটো উষ্ণ হয়ে ওঠে। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে রূপা।বাঁধন ধীরে ধীরে তার সামনে এসে দুই হাত পকেটে ঢুকিয়ে দাঁড়ায়। কিছুক্ষণ নীরবে তাকিয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—- “কি হয়েছে? এভাবে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন?”
রূপা মাথা নিচু রেখেই আস্তে করে বলে,
—- “আমি বাড়ি যাবো।”
বাঁধন এক মুহূর্তও দেরি না করে শান্ত গলায় বলে,
—- “ইম্পসিবল।”
রূপা এবার মাথা তুলে অবাক চোখে তাকায়।
—- “কেন?”
বাঁধনের চোখে গম্ভীর দৃঢ়তা। ধীর কণ্ঠে বলে,
—- “আমার বউকে আমি আর ওই বাড়িতে পা রাখতে দেবো না।”
রূপা কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রশ্ন করে,
—- “জোর করছেন?”
বাঁধনের ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে সেই পরিচিত বাঁকা হাসি।
—- “আমি জোর করতেই পছন্দ করি, আই লাইক ইট।”
আবারও মাথা নিচু করে ফেলে রূপা। কিছুক্ষণ ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থেকে সাহস সঞ্চয় করে বলে,
—- “দেখুন আমাকে বাড়ি যেতেই হবে। আমার কোনো জামা-কাপড় সঙ্গে নেই, বই-খাতাও সব ওই বাড়িতে। আমি এখন না গেলে পড়াশোনাটা করবো কীভাবে? আর প্লিজ, আপনি একটু বাইরে যান। আপনাকে এভাবে খালি গায়ে দেখে আমার খুব লজ্জা লাগছে।”
কথাটা শুনে ধীরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাঁধন। টেবিলের ওপর রাখা ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে স্ক্রিনে চোখ রাখে। কয়েক সেকেন্ড নীরব থেকে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলে,
—- “বই-খাতা টাইম মতো চলে আসবে।”
আরেকটু থেমে, একই স্বাভাবিক ভঙ্গিতে যোগ করে,
—- “ড্রেস নিয়ে টেনশন করিস না। ওইটা আমি কিনে দেবো।”
ফোনটা লক করে এবার সরাসরি রূপার দিকে তাকায় বাঁধন। চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই কঠিন হয়ে ওঠে।
—- “আর একটা কথা ওই বাড়ির একটা জিনিসের ছোঁয়াও আমি আমার বউয়ের গায়ে লাগতে দেবো না। দ্যাটস ফাইনাল।”
কথাগুলো শুনে আর কিছু বলার সাহস পায় না রূপা। শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।আড়চোখে একবার তাকিয়ে আবার ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেলে বাঁধন।
—- “দাঁড়িয়ে থেকে টাইম ওয়েস্ট করিস না। ফ্রেশ হয়ে আয়, বের হবো।”
রূপা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে। তারপর শাড়ির কুঁচির দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলে,
—- “শাড়ি খুলে যাবে।”
ভ্রু কুঁচকে তাকায় বাঁধন।
—- “হোয়াট?”
লজ্জায় কান পর্যন্ত লাল হয়ে যায় রূপার। শাড়ির আঁচলটা মুঠোয় চেপে ধরে নিচু স্বরে বলে,
—- “এই শাড়ি পরে হাঁটতে পারছি না। মনে হচ্ছে একটু হাঁটলেই খুলে যাবে। এক পা এগোতেও ভয় লাগছে।”
কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ তাকিয়ে থাকে বাঁধন। তারপর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে দুষ্টু এক হাসি।
—- “সিরিয়াসলি? তাহলে একটু হাঁট। দেখি শাড়ির কনফিডেন্স বেশি, নাকি তোর।”
লজ্জায় কান পর্যন্ত লাল হয়ে যায় রূপা। দাঁতে ঠোঁট চেপে ক্ষীণ রাগে বলে,
—- “আপনি এমন অসভ্য কেন? কথায় কথায় শুধু অসভ্যতাই করেন।”
রূপার দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে বাঁধন। ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি ফুটে ওঠে। নিচু, নির্লিপ্ত স্বরে বলে,
—- “নো আমি এখনো অসভ্য হইনি। যা দেখছিস, এটা ট্রেইলার। ফুল ভার্সন দেখলে তোর মতো চিংড়ি মাছকে খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
একটু ঝুঁকে রূপার চোখের দিকে তাকিয়ে আবার বলে,
—- “এই বয়সে নিজের বউকে হারাতে চাই না। তাই নিজের সেফটির জন্যই কন্ট্রোল করে চলছি।”
কথা শেষ হতেই আর এক সেকেন্ডও সময় দেয় না বাঁধন। এক ঝটকায় রূপাকে পাঁজাকোলা করে তুলে নেয়।হঠাৎ ভারসাম্য হারিয়ে ছোট্ট একটা চিৎকার বেরিয়ে আসে রূপার মুখ থেকে। ভয়ে আর অপ্রস্তুত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে দু’হাত তুলে জড়িয়ে ধরে বাঁধনের উন্মুক্ত ঘাড়। চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে তড়িঘড়ি করে বলে,
বাঁধন রূপের অধিকারী পর্ব ৩৩
—- “এই, এই! কী করছেন? আমাকে কোলে নিলেন কেন?”
রূপাকে নিয়েই ওয়াশরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে নির্বিকার ভঙ্গিতে জবাব দেয় বাঁধন,
—- “তোকে ছাদ থেকে ফেলে দেবো তাই।”
