Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (৩)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (৩)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (৩)
রানী আমিনা

ব্যান্ডেজে মোড়া আনাবিয়া শ্বাস নিচ্ছে ধীরে। প্রতি শ্বাসে অক্সিজেনের নল থেকে ভেসে আসছে এক অদ্ভুত শব্দ। পাশেই স্ক্রিনে এঁকেবেঁকে বয়ে চলেছে তার হার্টরেট। শরীর থেকে আপাতত চিকিৎসা সরঞ্জাম গুলো খুলে নেওয়া হয়েছে, একটু আগেই একজন নার্স এসে সেগুলো নিয়ে গেছে।
বিছানার পাশে সাদা অ্যাপ্রোনে দাঁড়িয়ে আছে এক সত্তরোর্ধ্ব ভদ্রলোক। মাথার পেছনে কয়েক গোছা সাদা চুল, চোখে মোটা পাওয়ারের চশমা। ঘোলা চোখে সে চেয়ে আছে আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়ার নিঃসাড় মুখখানার দিকে চেয়ে থাকতে থাকিতে কুচকানো কপাল আরও কুচকে গেলো তার। এই অপরূপা সুন্দরীটি দুর্ঘটনায় ঠিক কতটা যন্ত্রণা পেয়েছে ভেবেই শিউরে উঠলো সে!
নার্স এলো এমন সময়, ডাকলো,

“মিস্টার উইলসন, হিজ ম্যাজেস্টি আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন৷”
“এখনি আসছি।”
বলল ব্রায়ান। নার্সটা মাথা নেড়ে বেরিয়ে গেলো। বার্ধক্যে জর্জরিত ঝাপসা চোখে সে আবার তাকালো আনাবিয়ার দিকে; নিষ্প্রাণ, মোলায়েম হাত খানা নিজের হাতের মুঠিতে নিয়ে মৃদু চাপ দিয়ে স্বগতোক্তি করলো,
“ইউ উইল অলওয়েজ বি মাই সুইট সিক্সটিন, অ্যানা! দ্যা মোস্ট বিউটিফুল অ্যান্ড মোস্ট গর্জিয়াস ক্রিয়েশন অব গড!”
আনাবিয়ার হাতখানা তুলে আলতো করে ঠোঁট ছোয়ালো সে। পরক্ষণেই বেরিয়ে এলো কামরা ছেড়ে।
মীর অস্থির চিত্তে পায়চারি করে চলেছে করিডোর জুড়ে। লিও কাঞ্জি বার বার শান্ত হয়ে বসতে বলছে তাকে, কিন্তু সে বসতে নারাজ। কিছুক্ষণ সবেগে পায়চারি করে অবশেষে লিওর সামনে এসে ভ্রুতে ভাজ ফেলে সে জিজ্ঞেস করলো,

“ব্রায়ান ছাড়া আর কোনো নিউরোসার্জন কি কুরো আহমারে ছিলো না?”
“ই-ইয়োর ম্যাজেস্টি! এখানে বর্তমানে নিউরোসার্জন বিভাগে সেই সবচেয়ে সিনিয়র সার্জন। তার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা সবই বেশি। শেহজাদীর জন্য এখন তো এমন কাউকেই আমাদের প্রয়োজন৷ প্রাসাদের নিউরোসার্জন যে সে বছর দশ হলো এই পেশায় আছে, কিন্তু ব্রায়ান আজ প্রায় বিশ পঁচিশ বছর ধরে এই পেশাতেই নিয়োজিত৷”
মীর লিওর দিকে চেয়ে থেকে ঠোঁট ভাজ করে কামড়াতে শুরু করলো। তারপর আবারও পায়চারি শুরু হলো তার৷ কাঞ্জি লিওর দিকে একবার চেয়ে গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি চিন্তা করবেন না। ব্রায়ানের মাথায় চুল নেই, আর যেটুকু আছে সব সাদা৷”
মীর পায়চারি থামালো, কাঞ্জির দিকে এগিয়ে এসে কপালে ক্রোধের ভাজ ফেলে বলে উঠলো,

“এ কথা বলে তুমি কি বোঝাতে চাইছো, কাঞ্জি?”
কাঞ্জি ঢোক গিললো, ভীত গলায় আমতা আমতা করে উত্তর দিলো,
“ন্‌-না ম্‌-মানে বলতে চ্‌-চাইছি যে…… ম্‌-মানে….. ম্‌-মানে…”
লিওর এত কষ্টের ভেতরেও হাসি পেলো। ঠোঁট ভাজ করে হাসি আঁটকানোর চেষ্টা করলো সে। মীর শকুনি চোখে তাকালো ওর দিকে, বাঁজখাই গলায় জিজ্ঞেস করলো,
“তোমার কিসে এত পুলক লাগছে লিও?”
“খ্‌-ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি৷”
লিও গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে মাথা নিচু করে রইলো। তবুও ঠোঁটের কোণ বাঁকতে রইলো তার, প্রাণপণে চেষ্টা করতে রইলো যেন মীরের চোখে না পড়ে, নইলে এবার আর জানটা ধড়ে থাকবেনা।
ব্রায়ান এলো এমন সময়, মাথা নত করে আনুগত্য জানালো মীরকে। বার্ধক্য জড়ানো বিনম্র স্বরে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমাকে ডেকেছিলেন?”
মীর দেখলো ওকে, পূর্বের ব্রায়ানের সাথে এই ব্রায়ানের কোনো মিল নেই। সুদীর্ঘ শরীর বয়সের ভারে প্রায় কুজো হয়ে গেছে। এত মোটা পাওয়ারের চশমার পরেও কিছু দেখতে ভ্রুতে ভাজ ফেলতে হচ্ছে। মাথার টাক তেল চকচকে, পেছন দিকে কয়েক গোছা চুল, তুষার শুভ্র।
মীর সকলের অগোচরে স্বস্তির শ্বাস ফেললো যেন। এগিয়ে এলো সে ব্রায়ানের দিকে, গমগমে স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“শিনজোর সংবাদ বলো।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদীর পাজরের দুটো হাড় ভেঙেছে। হাড় দুটো নিজেদের জায়গা থেকে ভেতরে দেবে গেছে সামান্য লিভারের গায়ে ক্ষত হয়েছে তাতে, ইন্টার্নাল ব্লিডিং হচ্ছে। ইমিডিয়েট অপারেশন প্রয়োজন। মাথার আঘাতটা অনেক হলেও সৌভাগ্য যে ভেতরের দিকে পৌছায়নি, শুধু স্কাল ক্র‍্যাক হয়েছে৷ কিন্তু ক্র‍্যাকের পরিমাণ হিউজ, ক্ষত গুলো থেকে প্রচুর ব্লাড গেছে। শেহজাদা ইলহানের থেকে ব্লাড নেওয়া হয়েছে, ইতোমধ্যে ব্লাড ট্রান্সফিউশানও শুরু করা হয়েছে। এটা শেষ হলেই আমরা অপারেশন শুরু করবো, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

“ওকে মুভ করতে পারবো কখন? অপারেশনের পরেই সম্ভব?”
“ক্ষমা করবেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি। অপারেশনের পর অন্তত এক সপ্তাহ তাকে অবজারভেশনে রাখতে হবে এবং কোনো প্রকার মুভমেন্টের ভেতর রাখা যাবে না। পুরোপুরি বেড রেস্টে থাকতে হবে৷ এক সপ্তাহ পেরোলে, টেস্ট রেজাল্ট গুলো পজিটিভ আসলে, শেহজাদী ইম্প্রুভ করতে শুরু করলে রিলিজ দেওয়া সম্ভব হবে, ইয়োর ম্যাজেস্টি। কিন্তু..!”
“কিন্তু?”
“শেহজাদীকে পুরোটা সময় সিডেটিভে রাখতে হতে পারে। নইলে উনি মারাত্মক মাথা যন্ত্রণায় ভুগবেন, শুধু ব্যাথানাশকে তেমন উপকার পাওয়া যাবে বলে আমরা মনে করছিনা। সিডেটিভ দেওয়ার সময়সীমা আমরা রেখেছি অন্তত ছয় থেকে আট সপ্তাহ। তারপরেই শেহজাদীর ব্যাথার তীব্রতা কমে আসবে আশা করা যায়।”
মীর বোঝার ভঙ্গিতে মাথা নাড়ালো। পরক্ষণেই অন্যদিকে ফিরে বলে উঠলো,

“তুমি এখন যেতে পারো।”
ব্রায়ান আনুগত্য জানিয়ে চলে গেলো করিডোর ছেড়ে৷ ও যেতেই লিও বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আপনি অনুমতি দিলে একটা কথা বলতে চাই।”
“বলো, লিও।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ইয়াসির হেকিমের সাথে ব্রায়ানের কথা বলিয়ে দিলে বা তার দায়িত্বটা ব্রায়ানকে দিলে-”
“ওখানেই থেমে যাও।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, কিন্তু ওকে বল্‌-”
“তোমাকে থামতে বলেছি লিও!”
বাঁজখাই কন্ঠে বলে উঠলো মীর৷ লিও মাথা নুইয়ে নিলো, মীর করিডোর ছেড়ে ছেলেদের বসার স্থানের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“অপারেশনের প্রস্তুতি শেষ হলে আমাকে সংবাদ দিবে।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”

ভোর হতে দেরি নেই বেশি। প্রায় চার ঘন্টার জরুরি অপারেশন শেষে আনাবিয়াকে কেবিনে দেওয়া হয়েছে মাত্র৷ হসপিটাল থেকে ফিরে যায়নি কেউ, করিডোর জুড়ে নিরবে বসে আছে সকলে। মীর ওটির সামনে থেকে সরেনি, চার ঘন্টা ধরে ওভাবেই দাঁড়িয়ে থেকেছে, কখনো পায়চারি করেছে অস্থির হয়ে!
ওয়েটিং রুমে চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে ছেলেরা। ফিরাস আর আরসালান জেগে থেকেছে সারাক্ষণ। মিশআল আর কাসওয়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে পড়েছে। একজন ফিরাসের কাঁধে অন্যজন আরসালানের কোলের ওপর। সাইয়্যিদ আর জিবরান বাবার কাছাকাছি থাকছে, চেষ্টা করছে তাকে শান্ত রাখার। কখনো বা এসে ঝিমুচ্ছে কিছুক্ষণ, তারপর আবার লেগে পড়ছে কাজে৷

কোকোরা অন্যদিকে। লিও কাঞ্জি জেগে এখনো, ঘুমোনোর বা বিশ্রামের সুযোগ নেই ওদের৷ লিওর কোলের ভেতর অ্যানিম্যাল ফর্মে লেপ্টে ঘুমিয়ে আছে মেয়ে নোরা, বিড়ালের থেকে আকারে বড়, অথচ সিংহের চেয়ে বেশ ছোট। ঠিক যেন বন্য, হিংস্র অথচ ভয়ানক সুন্দর কোনো জংলী বিড়াল। লিন্ডা এলিয়ে আছে লিওর কাঁধে৷
কোকোর দুই পাশে ওর দুই তরুণ ছেলে, বাবার কাধে মাথা রেখে ঘুমোচ্ছে। চুল প্রায় সাদা হয়ে এসেছে তার সব, অথচ এখনো সেই বিশাল শরীরের এতটুকু কমেনি। শক্তিশালী রয়ে গেছে পূর্বের মতোই, ছেলে দুটো যেন হুবহু বাবার শরীরই পেয়েছে৷ কোকো কখনো জাগছে কখনো আবার ঝিমাচ্ছে। রেক্সা মেয়ের সাথে বাড়িতেই আছে, তার কাছে কখনো কখনো ফোনে যোগাযোগ করছে৷
আলফাদ, হাইনা, জোভি, ওকামি— চারজনে মিলে এক স্থানে বসে থাকতে থাকতে ঘুমিয়ে গেছে৷ সবগুলোর মাথা প্রায় একই স্থানে৷ ফ্যালকনের কোলে কাঞ্জি আর লায়রার ছোট মেয়ে, ছোট্ট শাবকটা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে গ্রুম গ্রুম শব্দ করে চলেছে। ফ্যালকন ঝিমুনির মাঝেই গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে ওর, লায়রা বসে ওর পাশেই৷ কাঞ্জি নেই এদিকে, ঘন্টা খানেক হলো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেরিয়ে গেছে সে৷
নিরবতার মাঝেই হঠাৎ ধুপ ধাপ পায়ে সেখানে ছুটে এলো কাঞ্জি, ওর পায়ের শব্দেই ঘুম উড়লো সকলের৷ কাঞ্জি এসেই জোরালো স্বরে বলে উঠলো,

“এভ্রিওয়ান! শেহজাদীর অপারেশন সাকসেসফুল! তিনি এখন বিপদ মুক্ত, ডাক্তার তাকে কেবিনে শিফট করেছে৷ কিন্তু এখন কেউই দেখা করতে পারবেনা, কারণ তার জ্ঞান ফেরেনি, কখন ফিরবে সেটাও জানিনা। হিজ ম্যাজেস্টি সবাইকে বাসায় ফিরে যেতে বলেছেন৷”
এক নাগাড়ে কথা গুলো বলেই মিষ্টি করে হাসলো সে। বাচ্চারা তাকালো সব একে অপরের দিকে৷ পরক্ষণেই উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিতে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লো সবাই, খুশিতে বুকে জড়িয়ে নিলো একে অপরকে। নোরা বাবার কোল থেকে লাফিয়ে নিচে নেমে ছুটে গেলো করিডোরের দিকে, ফিরাসের নিকট৷ লিও সেদিকে চেয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো একটা। কোকো ওর দিকে ফিরে বলল,
“মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দে ভাই!”
“অমন নখড়া ওয়ালা মেয়ে কে বিয়ে করবে ভাই! মায়ের চাইতে বলবৎ, আমার একটা কথা শুনেনা। কিন্তু শেহজাদা ফিরাস উঠতে বললে ওঠে বসতে বললে বসে৷”
লিন্ডা ফুসে উঠলো পাশ থেকে, বাঁজখাই গলায় বলে উঠলো,
“একদম আমাকে দোষ দিবেনা, আমি তোমার কথা শুনিনা?”
“ওহ, সত্যি শুনো?”

বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করলো লিও। লিন্ডার মেজাজ বিগড়ালো তাতে আরও, তেজি গলায় বলে উঠলো,
“মেয়েকে সারাক্ষণ আদরে আদরে বাদর কে করেছে? আমি? শাসন করতে গেলেই তো মেয়েকে কলিজার ভেতর ভরে রাখতে, আর এখন এসে আমাকে বলছো মেয়ে নাকি আমার মতো হয়েছে! একদম এসব অপবাদ দেবেনা আমাকে বলে দিলাম! আর আমার মেয়ে যে অ্যাট্রাকটিভ তাতে ওর এতটুকু নখড়া থাকা আবশ্যক!”
“সুন্দরী বলে যা খুশি তাই বলবে না, মেয়েকে আমি একা কলিজায় ভরে রাখিনি, তুমিও ভরেছো। আর আমার মেয়ে যদি তোমার মত এমন চোখ ধাধানো সুন্দরী হয় তবে আমার কি করার আছে? অত বিশাল জঙ্গলে তার কাউকে ভালো লাগেনা, ভালো লাগে শুধু এক ডেঞ্জার ফ্যামিলির ছেলেকে!”
“ওর রুচি ভালো তাই। আর তুমিও তো কম হ্যান্ডসাম না, তোমার থেকেই এসব বেশি পেয়েছে! চেহারা না হয় আমার মতো হয়েছে, গায়ের রঙ, চুল তো সব তোমার মতো! একা আমার দোষ দিচ্ছো কেন? ওর সৌন্দর্যের পেছনে তুমিও সমান দায়ী!”

ফ্যালকন কাঞ্জির মেয়েকে কোলে নিয়ে এগিয়ে এসে বলে উঠলো,
“তোরা ঝগড়া করছিস নাকি একে অপরের প্রশংসা করছিস সেটা আগে ক্লিয়ার কর৷”
লিও, লিন্ডা দুজনেই কটমট করে তাকালো ওর দিকে। ফ্যালকন অবস্থা খারাপ বুঝে সালাম দিয়ে কেটে পড়লো অন্যদিকে৷
নোরা চারপায়ে নিঃশব্দে এগোতে এগোতে পৌঁছে গেলো করিডোরে। ফিরাস পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে চেয়ারে, চোখ জোড়া বন্ধ, চেহারায় স্বস্তি ছাপানো। মা সম্পুর্ন বিপদ মুক্ত শুনে এতক্ষণের জাগরণ এবার ঘুম হয়ে আছড়ে পড়ছে তার চোখে৷ মিশআল এখনো ঘুমিয়ে ওর কাঁধে। আরসালান কাসওয়ার দুজনেই উঠে গেছে।
নোরা লাফিয়ে উঠে পড়লো ফিরাসের কোলের ওপর। গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়লো কোলে। ফিরাস ঘুম ঘুম চোখে দেখলো ওকে একবার৷ এক হাতে দলাই মলাই করে দিলো ওর ঘন পশমে আবৃত পিঠ। নোরা শরীর এলিয়ে দিলো তাতে ওর কোলের ভেতর, ভালো লাগায় ছেয়ে গেলো ওর সারা দেহ৷

মীর ঢুকলো কেবিনে৷ বিছানায় নিঃসাড় শুয়ে আনাবিয়া, মুখে অক্সিজেন মাস্ক। শ্বাস নিচ্ছে ধীরে ধীরে৷ শরীরের ক্ষতগুলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না, সেগুলো প্রাসাদ থেকে নিয়ে আসা অয়েন্টমেন্টে সেরে উঠেছে পুরোপুরি।
মীর বসলো ওর পাশে, স্নিগ্ধ চোখে আনাবিয়ার নির্জীব মুখখানা দেখে গেলো অপলক৷ হাত বাড়িয়ে আলতো করে ছুয়ে দিলো ওর নরম, সফেদ চোয়াল৷ ওর অসাঁড়, বলহীন হাতখানা শক্ত করে চেপে ধরলো নিজের মুঠির ভেতর, দুহাতে মুষ্টিবদ্ধ করে নিয়ে এলো মুখের সামনে, ঠোঁট ছোয়াতে যেতেই থেমে গেলো অকস্মাৎ!
ঈগলের ন্যায় তীক্ষ্ণ, মনোযোগী চোখে সে পূঙ্খানুপুঙ্খ রূপে দেখতে রইলো আনাবিয়ার হাতের ওপরটা। ক্ষণিক পর্যবেক্ষণের পরেই চোয়াল শক্ত হয়ে এলো তার, চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো যেন৷ পরক্ষণেই উঠে সবেগে বেরিয়ে এলো সে কামরা ছেড়ে। জোর গলায় ডাকলো,
“লিও! লিও!”
লিও অদূরেই ছিলো, মীরের ক্রুদ্ধ কন্ঠে নিজের নাম শুনে ছুটে এলো সে। ওকে দেখা মাত্রই মীর ক্ষুব্ধ স্বরে বলে উঠলো,

“ভেতরে কে কে ঢুকেছে?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, ডাক্তার নার্সরা ব্যাতিত আর কেউই তো ভেতরে যায়নি। কোনো সমস্যা হয়েছে?”
“শিনজোর হাতের ওপর আমি ঠোঁটের ছাপ পেয়েছি! ব্রায়ান কোথায়, ওকে এই মুহুর্তে আমার সামনে হাজির করবে! ওকে আমি আজ কুকুর দিয়ে খাওয়াবো!”
দাঁতে দাঁত পিষে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল মীর। চোখে মুখে ফুটে উঠলো ভয়ানক হিংস্রতা, হাত জোড়া মুষ্টিবদ্ধ হয়ে উঠলো তার! ক্ষ্যাপা ষাড়ের মতো সশব্দে শ্বাস পড়তে রইলো ওর, বিধ্বংসী ক্রোধ দমনে ভারী পায়ে এদিক ওদিক পায়চারি শুরু করলো তৎক্ষনাৎ! লিও অবস্থা সুবিধার না দেখে দ্রুত কাঞ্জির কাছে গেলো, দুজনে মিলে ব্রায়ানকে খুঁজতে খুঁজতে পেয়েও গেলো চেম্বারে। কাঞ্জি ওর সামনে গিয়েই টেবিলে একটা চাপড় মেরে ক্ষুব্ধ স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“ব্রায়ান! শেহজাদীর সাথে তুমি কি করেছো?”
ব্রায়ান কুচকানো চোখে তাকালো ওদের দিকে, একটা শুকনো ঢোক গিলে বলল,
“আমি কিছুই করিনি, আমি… আমি শুধু…শেহজাদীর হাতে একটা চুমু খেয়েছি।”
“এত স্পর্ধা কে দিয়েছে তোমাকে? তোমার দায়িত্বে থাকা পেশেন্ট দের তবে তুমি এভাবে ট্রিট করো? তাদের অসুস্থতার সুযোগ নাও?”
বিক্ষুব্ধ, জোরালো স্বরে বলে উঠলো কাঞ্জি। ব্রায়ান সবেগে মাথা নাড়লো দুদিকে, সশ্রদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
“তোমরা ভুল ভাবছো, কাঞ্জি ভাইজান। আমার খারাপ কোনো ইন্টেনশন ছিলনা। আমি শুধু স্নেহ থেক্‌—”
“শাট আপ ব্রায়ান! হিজ ম্যাজেস্টি জেনে গেছেন তোমার কুকীর্তির কথা! একটু আগে আমরাই তোমার হয়ে ওকালতি করে এসেছি তার কাছে, আর এখন তুমি যে কাজ করেছো এর পর আমরা তার সামনে কোন মুখে দাঁড়াবো, বলো তুমি! তার চাইতে বড় কথা তুমি এইবার কিভাবে বাঁচবে?”
তীব্র স্বরে বলল কাঞ্জি৷ লিও বলে উঠলো,

“হিজ ম্যাজেস্টি এখনো জানেন না যে তুমি আনম্যারিড, উনি যদি জানতে পারেন তুমি শুধু শেহজাদীর প্রেমে পাগল হয়ে এখনো বিয়ে করোনি তবে তোমার কপালে অনেক দুঃখ আছে। উনি তোমাকে তাঁর সামনে হাজির করতে বলেছেন৷ প্রাণে বাঁচতে চাইলে গিয়েই তার পায়ে পড়ে ক্ষমা চাইবে, মনে থাকে যেন! নইলে একপা তো অলরেডি কবরে গিয়েছেই, বাকি টুকু উনি নিজ দায়িত্বে ভরে দিয়ে আসবেন!”
লিওর কথা শেষ হতে না হতেই হুড়মুড়িয়ে চেম্বারে ঢুকে পড়লো মীর। ব্রায়ানের সম্মুখের টেবিলটা এক হাতে সজোরে ছুড়ে দিলো কোনো এক দিকে, সেটা তীব্র বেগে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে দু টুকরো হয়ে আছড়ে পড়লো মেঝেতে। ব্রায়ানের গলা ধরে হ্যাচকা টানে উঠিয়ে নিয়ে এলো চেয়ার থেকে, মেঝে থেকে উপরে উঠিয়ে তীব্র ক্রোধে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,

“তোমার এত বড় স্পর্ধা! তোমার সাহস কি করে হয় শিনজোকে স্পর্শ করার! তোমার ঠোঁট ছিড়ে ফেলবো আমি!”
ব্রায়ানের শ্বাস আঁটকে গেলো মুহুর্তেই, চোখ উলটে গেলো তৎক্ষনাৎ! মীরের মুঠি শক্ত হলো আরও! লিও মীরের কাছে এসে সশ্রদ্ধ, আনুগত্যের সাথে বলে উঠলো,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, দয়া করে শান্ত হোন। শেহজাদীর এমন ক্রিটিক্যাল মুহুর্তে ব্রায়ান উইলসনের মতো কাউকে হারানো আমাদের ঠিক হবে না৷ সে-ই যেহেতু শেহজাদীকে ট্রিটমেন্ট দিচ্ছে, তাকে শেহজাদী সুস্থ হওয়া পর্যন্ত ক্ষমা করে দিন, ইয়োর ম্যাজেস্টি! একবার ব্যাপারটা বিবেচনা করে দেখুন। অনুরোধ করছি!”
মীর ভাবলো ক্ষণিক, পরক্ষণেই ছুড়ে ফেললো ওকে মেঝেতে। ছাড়া পেয়েই সজোরে দম নিতে শুরু করলো ব্রায়ান, কাশতে কাশতে দম বেরিয়ে যাবার জোগাড় হলো তার। মীর ওর দিকে নর্দমার নোংরা কীটের মতোন ঘৃণার চোখে চেয়ে লিওর উদ্দেশ্যে দাঁতে দাঁত পিষে বলে উঠলো,
“ওকে আর এক মুহুর্তও একা ছাড়বেনা৷ ওর হায়াত শিনজো সুস্থ হওয়া পর্যন্তই!”
পরক্ষণেই ভারী পায়ে সবেগে বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে। লিও দ্রুত হাতে উঠালো ব্রায়ানকে, ভর্ৎসনার কন্ঠে বলে উঠলো,

“শুধুমাত্র শেহজাদীর শরীরের কথা ভেবে তোমার জন্য সুপারিশ করেছি ব্রায়ান, এটাকে নিজের প্রিভিলেজ ভেবে নিও না। তুমি যে কাজ করেছো এর জন্য তোমার মৃত্যুদণ্ড অবধারিত, ব্যাপারটা যদি শেহজাদীতে সীমাবদ্ধ না থাকতো তবে আজ হিজ ম্যাজেস্টির হাত থেকে তোমাকে কেউ বাঁচাতে পারতো না!”
ওকে ওর চেম্বারে আধমরা ফেলে রেখেই বেরিয়ে এলো দুজন।
মীরের চোখ জোড়া জ্বলতে রইলো, জ্বলন্ত লাভার ন্যায় যেন দ্যুতি ছড়াতে রইলো সে জোড়া। ক্রোধিত পা ফেলে সে আবার ঢুকলো আনাবিয়ার কামরাতে৷ পানি আর শাওয়ার জেল নিয়ে বসলো আনাবিয়ার পাশে। লুফায় জেল মাখিয়ে আনাবিয়ার হাত জোড়া ফেনা তুলে পরিষ্কার করে ধুয়ে দিলো, অতঃপর দুহাতই নিজের মুঠিতে ভরে ঠোঁট চেপে ধরে ভরিয়ে দিলো শত শত স্নেহার্দ্র চুম্বনে।
সারা রাত নির্ঘুমে থাকায় মাথার তীব্র যন্ত্রণাটা একটু একটু করে ফিরলো আবার, ক্রমে বেড়ে চলল তার তীব্রতা৷ এত যন্ত্রণার ভিড়েও সে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার নিঃসাড়, নির্জীব মুখখানার দিকে— অপলক। এরপর অকস্মাৎ নিজেও উঠে পড়লো বিছানায়। গায়ের শার্টটা খুলে রেখে দিলো একপাশে, তারপর আনাবিয়াকে টেনে নিলো নিজের উন্মুক্ত বুকের ভেতর।

ঘুম ভেঙে চোখ পিঠ পিট করে তাকালো আনাবিয়া, প্রথমেই চোখে পড়লো কারো বলিষ্ঠ বক্ষ। তৎক্ষনাৎ মাথার ভেতর একটা তীক্ষ্ণ, চিনচিনে ব্যাথা টের পেলো ও, চোখ কুচকে নিয়ে এক হাতে মাথা চেপে ধরলো। কিছুক্ষণ চোখ জোড়াকে বিশ্রাম দিতেই কমে এলো যন্ত্রণা৷ চোখ খুললো আবারও, তাকালো বুকের মালিকের দিকে।
ঘুমাচ্ছে মীর, শ্বাস পড়ছে তার তালে তালে। আনাবিয়ার মুখে এসে বাড়ি খাচ্ছে ওর শ্বাস৷ অবুঝের মতো কিছুক্ষণ ওর দিকে চেয়ে থেকে আনাবিয়া তাকালো এদিক ওদিক, অন্ধকারের ভেতর আবছা আলোয় বোঝার চেষ্টা করলো কোথায় আছে সে৷ কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণের পরেই টের পেলো এটা ওর রাজমহলের খাসকামরা।
সে এখানে কিভাবে এলো ভাবতে নিতেই চিনচিনে ব্যাথাটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো আবার৷ চোখ কুচকে নিয়ে নিজের দিকে তাকাতেই আনাবিয়া অবাক হলো। গায়ে এতটুকু আবরণ নেই তার! চাদর উঁচিয়ে মীরকে দেখলো একবার। তারও একই অবস্থা৷

আনাবিয়া কি করবে ভেবে পেলোনা। মীর শক্ত করে জড়িয়ে রেখেছে ওকে। এই বন্ধন থেকে আজ পর্যন্ত একটিবারও ছাড়া পাওয়া সম্ভব হয়নি ওর পক্ষে, তবুও চেষ্টার কমতি রইলো না। কিন্তু দুহাতে মীরের আলিঙ্গন মুক্তির চেষ্টা করতেই বুক পাজরে ভয়াবহ ব্যাথা অনুভব করলো আচমকা, তৎক্ষনাৎ আর্তনাদ করে উঠলো সে!
মীর তড়াক করে উঠে পড়লো তৎক্ষণাৎ, দ্রুত হাতে টেবিল ল্যাম্প জ্বালিয়ে শঙ্কিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কি হয়েছে? কোথায় লেগেছে? দেখি!”
তৎক্ষনাৎ বোধোদয় হলো তার! ক্ষণিক আনাবিয়ার দিকে অবিশ্বাসের চোখে চেয়ে রইলো সে, যেন স্বপ্ন আর বাস্তবে পার্থক্য করতে অক্ষম হলো অল্পের জন্য। আনাবিয়া যে সত্যিই তার সামনে সজ্ঞানে বসে আছে সেটা টের পেতেই দুহাতে সজোরে ওকে টেনে নিলো ওকে বুকের ভেতর। বুকের সাথে নিজের সব টুকু শক্তি দিয়ে চেপে ধরলো যেন! আনাবিয়া ওর হঠাৎ আলিঙ্গনে অতিষ্ঠ হয়ে অস্ফুট আর্তনাদ করে বলে উঠলো,
“কি করছো মীর! ছেড়ে দাও, ব্যাথা লাগছে তো!”

ব্যাথা শব্দটা কানে যেতেই মীর ছেড়ে দিলো ওকে। চোখে মুখে এক অবর্ণনীয় খুশি ঝিলিক দিয়ে উঠতে রইলো তার। তখনও অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে আনাবিয়ার দিকে চেয়ে রইলো সে, যেন বিশ্বাস হতে চাইলোনা তার শিনজো সত্যিই উঠে বসে আছে, ওরই সামনে! কাছে সরে গিয়ে দুহাতে ওর মুখখানা ধরে জিজ্ঞেস করলো,
“কোথায় ব্যাথা পাচ্ছো? মাথায় ব্যাথা করছে? নাকি পাজরে?”
“পাজরে!”
“দাঁড়াও, এখনি আসছি আমি!”

বলেই বিছানা ছেড়ে গায়ে কোনো রকমে একটা রোব জড়িয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলো মীর৷ আনাবিয়া সেদিকে অবুঝের মতো চেয়ে রইলো। কিভাবে কি হয়েছে মনে করতে পারলোনা৷ নিজের দিকে তাকাতেই দ্রুত চাদরে ঢেকে নিলো উন্মুক্ত দেহ। ধীর গতিতে বিছানা ছেড়ে নেমে ঢুকলো ক্লজেটের ভেতর। একটা পাতলা ট্রাউজার আর টি শার্ট অতি কষ্টে চড়িয়ে নিলো গায়ে, হাত নাড়ালেও পাজরের ভেতর টনটন করছে।
মীর ফিরে এলো তখুনি৷ আনাবিয়াকে ক্লজেট থেকে বের হতে দেখে প্রায় ছুটে গিয়ে ওকে জড়িয়ে নিলো আবার বুকে। আনাবিয়া বিরক্তিতে ভ্রু কুচকে বলে উঠলো,
“কি ঢং শুরু করেছো, ছাড়ো আমাকে। আমার সারা গায়ে ব্যাথা!”
মীর ছাড়লোনা, কোলে তুলে নিয়ে এলো বিছানায়৷ নিজের কোলের ভেতর বসিয়ে জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। ঘাড়ে মুখ ডুবোতেই আনাবিয়া ছাড়া পাওয়ার জন্য কিছু বলতে নিবে তখনই মীর বলে উঠলো,
“একদম কোনো বিদ্রোহ করবেনা আজ, একদম জানে মেরে ফেলবো! চুপচাপ বসে থাকো৷ একটু পর হেকিম আসবে, ততক্ষণ শান্ত হয়ে বসো।”

মীর ওর সব ভর যেন আনাবিয়ার কাঁধেই ছেড়ে দিলো। ক্রমে আলিঙ্গনের জোর বাড়লো তার। আনাবিয়া জোরে দম নিয়ে বলে উঠলো,
“কি করছো তুমি? দম আঁটকে আসছে আমার! আর তোমার সাথে আমার কি কথা ছিলো? তুমি আমার সাথে এসব করছো কেন?”
“শাট আপ।”
“কিসের শাট আপ? ছাড়ো বলছি আমাকে। তার আগে বলো আমার গায়ে পোশাক ছিলো না কেন? কি করেছো তুমি আমার সাথে?”

“কিছুইনা, তুমি আমার বউ, তোমাকে আমি ওভাবে জড়িয়ে ঘুমোতেই পারি।”
“সত্যি কথা বলো! তোমাকে আমি একদম বিশ্বাস করিনা।”
“সেটা আমিও জানি৷ আমি তো তোমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট প্রানী! কিন্তু এখন একটু চুপ করে বসো, তোমাকে জড়িয়ে থাকতে দাও। আর একটাও কথা বলবে তো তোমার….”
“কি করবে? মেরে ফেলবে?”
“বলেই দেখো।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭ (২)

“কথা তো বললাম, কিছুই তো করতে পারল্‌-”
বাকি কথা আনাবিয়ার মুখেই রয়ে গেলো, তার আগেই ওর টেরাকোটা রঙা ঠোঁট জোড়া বর্গীর ন্যায় হামলে দখল করে নিলো মীর, লুটে নিলো ওর ঠোঁটের সমস্ত মিষ্টত্ব!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৮