তাকদীর পর্ব ১৭
নিরুর কল্পনারাজ্য
— অরিন..অরিন..! তুই বুঝছিস না কেনো? ইয়ার, জুনায়েদ অলরেডি বিয়ে করে নিয়েছে আর দেখছিস না? ও কেমন নিজেকে পাল্টে নিচ্ছে? তবু তুই ওর জন্য কেনো নিজেকে কষ্ট দিচ্ছিস?
রেইসিং ফিল্ডের উল্টোপথে দ্রুতবেগে হাঁটতে থাকা সৌন্দর্যে ভরপুর রমণীর পিছু পিছু যেতে যেতে রুদ্র অরিনকে বোঝানোর চেষ্টা করলো। তবে তার গভীর স্বরের উক্ত সকল বাণীকে সম্পূর্ণরূপে ময়লা ডাস্টবিনে ছুঁড়ে ফেলার ন্যায় অগ্রাহ্য করে সামনে এগিয়ে যেতে লাগলো রমণী। উপয়ান্তর না পেয়ে রুদ্র নিজের পুরুষ্টু হাতের বাধনে বেধে রাখা হেলমেটখানা ছুঁড়ে ফেলে অদূরে আছাড় মারলো। বিলাসবহুল হেলমেটটি পড়ে গিয়ে শব্দ করলো; ভেঙে গুড়িয়ে গেলো। রুদ্র খানিকটা দৌড়ে গিয়েই অরিনের নরম নারী কায়ার পেঁজা তুলোর ন্যায় ফর্সা হাতটি নিজের আয়ত্তে নিয়ে এক ঝটকায় অরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিলো। ঘটনাপ্রবাহ এতোটাই দ্রুত হলো যে, অরিন কিছু আঁচ করতেও পারলোনা। রুদ্রের ফর্সা বদনখানি মলিন হয়ে রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। কপালে বিস্তর ভাঁজ। অরিনের অঙ্কিত ভ্রু’দুটি কুঞ্চিত হয়ে গেলো। নিজের তুলতুলে হাতখান ছাড়াতে চায়লো সেই কঠোর পুরুষের হস্তের পিষ্টন হতে। অথচ পরিবর্তে সে কেবল পেলো রুদ্রের একাগ্র চিত্তের তিক্ত কিছু বাণী,
— অরিন, আর ইয়্যু ম্যাড অর হোয়াট? তোকে কতবার বলেছি হি ইজ ম্যারিড নাও। তবু তুই ওর পিছু কেনো ছাড়ছিস না? জুনায়েদের এখন বিয়ে হয়ে গিয়েছে অরিন। ও এখন আর তোর কখনোই হতে পারবেনা।
পুরুষটির এহেন নিষ্ঠুর অথচ ধরণীর ধ্রুবসত্য কথাটিতে মুহূর্তেই রমণীর ছটফট করতে থাকা হাতখানা সেইমুহূর্তে ওখানেই স্তব্ধ হয়ে গেলো বরফের ন্যায়। মুখমণ্ডল হয়ে গেলো পাথরের ন্যায় কঠোর। রমণীর মুখ ফুঁটে আর কোনো বুলি বেরোলোনা। না-তো অন্য কোনো পদক্ষেপ সে গ্রহণ করলো। রুদ্র নিজেকে সামলালো। নিজের সকল চাপা অনুভূতিগুলোকে মাটি চাপা দিয়ে সে নরম হয়ে উঠলো। বোঝানোর সুরে তার গম্ভীর স্বরের মাঝেও একটু নরমনীয়তা বজায় রেখে আওড়ালো,
— অরিন..অরিন, বোঝ! ও…জুনায়েদ নামক পুরুষটি তোর জন্য নিষিদ্ধ।
এতটুকু বলতে গিয়ে রুদ্রের বুক ভেঙে এলো। চোখদুটো ঘোলাটে হয়ে উঠলো। অথচ নির্দ্বয়া রমণী কী বোঝে তার চোখের ভাষা? বোধহয় না!
অরিন মেঝেতে নিবদ্ধ করে রাখা নিজের চক্ষুদ্বয় ওপর করলো। তীক্ষ্ণ লোচনে নজর রাখলো সম্মুখে তাকে আটকে রাখা পুরুষটির ওপর! আচমকা সজোরে নিজের রুক্ষ হাতের আঘাতে জর্জরিত করলো রুদ্রের বা’গাল। রুদ্রের ঘাড় কাত হয়ে গেলো। হাতদুটো হলো মুষ্টিবদ্ধ। নীলরঙা রগ ভাসমান হলো সেথায়। আলগা হয়ে গেলো তার অপর হাতে থাকা অরিনের হাতের বন্ধন। আজকের আবহাওয়া বড্ড উত্থাল! উত্থাল তাদের মনের অবস্থাও। রুদ্র তবু মেনে নেয়…চুপ রয়! একটি লাফজও তার ওষ্ঠ ফুঁড়ে বেরোয় না। অরিন কেবল থাপ্পড় মেরেই ক্ষান্ত হয়নি। সে সজোরে পুরুষটির বুকে তীব্র বেগে আঘাত করলো। অরিনের অতর্তিক আঘাতে পিছিয়ে গেলো রুদ্র। অরিন নিজের কার্যকলাপ অব্যাহত রাখলো। অগ্নিগিরির ফুটন্ত লাভার ন্যায় রক্তিম আভা সম্পূর্ণ আদলজুড়ে। রুদ্র একপলক দৃষৃটি তুলে চায়লো সেই উন্মাদ রমণীর পানে। হিংস্র এক বাঘিনীর চেয়ে কম কিছু লাগছেনা তাকে। অরিন ভাঙা স্বরে নিজের সকল ক্ষোভ উগড়ে দিলো পুরুষটির ওপর,
— তোর সাহস হয় কী করে এসব বলার? কত বার বললে তুই বুঝবি রুদ্র? আর ঠিক কতবার? আমি জুনায়েদকে ভালোবাসি! সেটা আজ থেকে নয়। সেই ছোটবেলা থেকে। কিশোরী বয়সের প্রেম ও আমার। এ’কথাটা তুই জানিস। তবুও তুই কেনো আমাকে এসব বলছিস?
নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে জেদে গর্জে উঠলো মেয়েটা তৎক্ষনাৎ। রুদ্র হার মানলোনা মোটেই। হার মানবে কী? এতো মুখঝামটার পরও শেষ এতবছর যাবৎ যে সহ্য করে এলো এক তরফা ভালোবাসার অঘোষিত যন্ত্রণা, সেসব এসবের কাছে বেশি নয়! পুরুষটি নিজেকে সামলে নিলো। পরনে দুজনার-ই রেইসিং স্যুট। রুদ্র কেমন ভগ্ন স্বরে ফের বলে উঠলো,
— কেবল জুনায়েদই কেনো?
অরিন ক্ষীপ্র সিংহের ন্যায় আরও একবার পুরুষটির বুকে আঘাত করে বসলো। অরিনের ধাক্কায় খানিকটা পিছিয়ে পড়লো রুদ্র। অরিন নিজের হাতদুটো রেশমকালো মোলায়েম কুন্তলবৃন্দের মাঝে খামচে ধরলো। চোখদুটো তখন রক্তাভ; অশ্রুজলে টলটমল। সে অস্থির কন্ঠে পাগলের ন্যায় বললো,
— বিকজ আই লাভ হিম। আমি ওকে ভালোবাসি। ও বিবাহিত হওয়ার পরও ওকে আমি ভালোবাসি। তুই কী বুঝবি রে? কাওকে ভালোবেসেছিস কখনো? বুঝিস, এক তরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা? কিচ্ছু চাইনি আমি, শুধু চেয়েছি ওই ছেলেটা আমার দিকেও একটু তাকাক! কি-না সহ্য করেছি আমি হ্যাঁ? ওর গার্লফ্রেন্ডস, লেইট নাইট পার্টিস, মেয়েদের সাথে ওর ঘনিষ্ঠতা…তুই বুঝবিনা রুদ্র, তুই বুঝবিনা!
অরিনের বক্ষস্থল কেমন হাসফাস করে ওঠে। বুকের এককোণে ঠেলে রাখা অনুভূতি সমূহের এহেন স্বীকারোক্তি তার মস্তিষ্কে চাপ প্রয়োগ করে। সে মানতে পারেনা একটি পুরুষ যাকে কি-না সে ভালোবেসেছে সে তার নেই। অরিনের বুক বেধে আসে। ডান হাতের সাহায্যে বুকের ব্যাথা প্রশমন করার এক ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়ে সে মুখ ঘুরিয়ে নেয়। পিছু ফিরে চলতে থাকে অত্যন্ত দূর্বল দেহে।
অপরপাশে অরিনের কথাগুলোয় বিদ্রুপের সহিত হাসে রুদ্র। সে বোঝেনা? এক তরফা ভালোবাসার যন্ত্রণা সে জানেনা? হাহ! হাস্যকর! রুদ্র নিজমনেই বিড়বিড় করে রমণীর যাওয়ার পথে একনজরে চেয়ে থেকে,
— অন্যের জন্য তোকে এতোটা ডেস্পারেট হতে দেখছি, মন্ত্রীর ছেলে হওয়ার সত্ত্বেও তোর সকল আঘাত মুখ বুঝে সহ্য করছি। আর কী চাস অরিন? কেনো তুই একটু আমার দিকে তাকাস না? কেনো চাস না আমাকে? কেনো তুই এমন একজনের পিছনে পড়ে আছিস যে-কিনা তোকে কেবলই নিজের বন্ধু ব্যতীত কিছুই ভাবেনা? কেনো?
রুদ্র যেতে পারেনা। ওভাবেই ওখানে দাঁড়িয়ে রয়।
নিজের মেয়ে ফ্যানগুলো হতে কোনোরকমে নিজের স্ত্রী এবং সন্তানকে বাঁচিয়ে বহুকষ্টে বের করে এনেছে জুনায়েদ ওই শোরগোল হতে। আদল তার তখনও গম্ভীরতার মোড়কে ঢাকা। সে তিক্ত; বিরক্ত! কেনো তার কোনো কারণ তার জানা নেই। হতে পারে তা আমিরার জ্বর। অথবা অন্য নারীর সংস্পর্শ। এমুহূর্তে যদি পূর্বের জুনায়েদ শাহরিয়ার হতো তবে কী তার ব্যবহারও এমনই হতো? উত্তর হলো–‘না।’ জুনায়েদ কখনোই এমন আচরণ করতোনা। উল্টে তাদের সাথে মজ-মস্তিতে মজে উঠতো।
জুনায়েদ তায়েব সৈয়দের চেম্বারে যেতে যেতে এসব ভাবছিলো। আমিরা আর আয়রাকে সে বসিয়ে রেখে এসেছে করিডোরের সারিপাতা চেয়ারগুলোর একটিতে। আসার সময় অবশ্য বারংবার করে বলে এসেছে যেনো কিছুর প্রয়োজন হলেই ফোন করে। তবু যেনো উঠে কোথাও না যায়। জুনায়েদ কিছুটা অন্যমনষ্ক ভঙ্গিতে তায়েব সৈয়দের রোগীদের থাকা লাইন উপেক্ষা করে সরাসরি তার চেম্বারে ঢুকে পড়লো। কিছুপল পূর্বেই তার সাথে জুনায়েদের কথা হয়েছিলো। তায়েব সৈয়দ সেসময় একজন রোগী দেখায় ব্যস্ত। হঠাৎ জুনায়েদকে দেখে তিনি হতবাক হয়ে পড়লেন। এতোটাই যে–সেখানে থাকা অন্য রোগীর মুখে ধরে রাখা টর্চলাইটও সে বন্ধ করতে ভুলে যান। ফলস্বরূপ সেই রোগী বিরক্ত হয়। মুখঝামটা মারার ন্যায় বলে,
— আশ্চর্য! আপনি এভাবে আমার মুখে টর্চ ধরে আছেন কেনো?
রোগীর কথায় হুশ ফিরলো তায়েব সৈয়দের। গলা খাঁকাড়ি দিয়ে নাকের ডগায় নেমপ থাকা কালো ফ্রেমের চশমাখানা ওপরে ঠেললো। রোগীটির উদ্দেশ্যে বললো,
— আ’ম স্যরি। আপনার ওষুধ আমি লিখে দিচ্ছি। নিচে ফার্মেসী থেকে কিনে নিবেন।
কিছুমুহূর্ত পরেই বিদায় নিলো সেই রোগী। তায়েব তখনও অস্বাভাবিক চমকে চমকিত হয়ে রয়ে। জুনায়েদ সিট খালি হতেই বসে পড়লো পেশেন্ট চেয়ারে। একবার অনুমতির তোয়াক্কা করলোনা পুরুষটি! চিরচারিত গম্ভীর আদল; ভাঁজকৃত কপাল এবং তীক্ষ্ণ চোয়ালে বুকে দু’হাত আড়াআড়িভাবে গুঁজে চেয়ে রইলো সম্মুখপানে। যে আপাতত তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টে চেয়ে। যেনো সে ভূত দেখে ফেলেছে। তার দিকে এমন ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকতে দেখে জুনায়েদ তায়েবের দিকে সুচারু দৃষ্টে তাকালো। গম্ভীর স্বরে রুক্ষতা ঢেলে শুধালো,
— কী দেখছো এভাবে?
তায়েব চোখ ঘোরাতে পারলোনা। সে সম্মোহিত হতবাক দৃষ্টে চেয়েই শুধালো,
— জুনায়েদ, বলো আমার ভাগ্নে হঠাৎ তোমার ওপর কোন জ্বীনের আছর পড়লো?
জুনায়েদের সুন্দর ভ্রু দু’খান কুঁচকে গেলো। গম্ভীরতায় শুধালো,
— কী বলছো এসব?
— কী বলছি বুঝতে পারছিস না? এ কি রঙে আমি তোকে দেখছি? বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে যে ছেলে কখনো গোলাপি রঙের ধারে কাছে যায়নি সে আজ গোলাপি শার্ট পরে ঘুরছে?
হেসে উঠলো তায়েব। জুনায়েদ কানে নিলোনা ওসব। সে দ্রুততায় আর্জি জানালো একই স্বরে,
— এস ছাড়ো আর দ্রুত ওষুধ দাও।
থামলো তায়েব। ঠোঁটদুটো নিচে নামিয়ে চাপা হাসলো। জুনায়েদকে চেক করতে করতে বললো,
— কী খেয়েছিলিস?
— জ্যাম?
— জ্যাম?
ভ্রু কুঁচকে গেলো তায়েবের। হতবাক হয়ে শুধালো,
— জ্যামে তোর এলার্জি তুই তো জানতিস? খেলি কোন সুখে?
তায়েবের পিঞ্চ মারা কথায় জুনায়েদ তীক্ষ্ণ চোখে তার পানে তাকায়। তার এমন বিপদজনক চাহুনিতে হেসে ফেললেন তিনি। কথা ঘুরিয়ে শুধালেন,
— তা তোর ম্যারিড লাইফ কেমন যাচ্ছে? হু?
জুনায়েদ এই প্রশ্নেরও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালোনা। তার কোনোরূপ সারা না পেয়ে তায়েব ফের নিজমনেই নিজের কথা অব্যাহত রেখে গেলো,
— তোর বউকে একদিন সময়কে দেখতে যেতে হবে বুঝলি। নতুন বউ দেখতে না…..
এহেন কথার পরিবর্তে এতক্ষণে বখাটে জুনায়েদের মুখ হতে কিছু বেরোলো। তায়েব তখন ড্রয়ার থেকে ওষুধ বের করছিলো। প্রতিবারের ন্যায় একই এলার্জি এবং একই ওষুধ যা আপাতত তার নিকট সংগ্রহে রয়েছে। তার চলতি হাত থমকে গেলো জুনাদেরের প্রশ্নে,
— কেনো? আমার বউকে দেখে তুমি কী করবে?
এই একটি প্রশ্ন ড. তায়েবকে সম্পূর্ণ নাড়িয়ে দিলো। সে তড়িতে ঘাড় ঘোরালো। চকিতে বলে উঠলো,
— আমার বউ?
কথাটির মাঝে ঠিক কতটুকু অধিকারবোধ লুকিয়ে ছিলো তা বোধহয় ড. তায়েব সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তাই তার এমন প্রতিক্রিয়ার কারণ ছিলো অত্যন্ত স্বাভাবিক। অথচ তার এমন বিস্ময়তায়ও বখাটে পুরুষ সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত। তার মনোযোগ এখনো সেই কথাটিকে ঘিরেই। সে পাল্টা প্রশ্নে তাকে শোনালো,
— তাহলে কী তোমার বউ বলবো?
এই পর্যায়ে ড. তায়েব হেসে ফেললো শব্দ করে। তিনি এর বেশি আর কিছু জানতে চায়লেন না। না-তো আর কিছু শুধালেন।তিনি কেবল নিঃশব্দে ড্রয়ার থেকে মেডিসিন নিয়ে জুনায়েদের হাতে স্থানান্তরিত করতে করতে বললো,
— যা, লাগিয়ে আয়!
জুনায়েদের কপালের ভাঁজ তখনও স্থির। সে মলমখানা গম্ভীর আদলেই হাতের মাঝে তুলে ধরলো। একবার তার নীল সায়রের ন্যায় আঁখিদ্বয় দ্বারা পরখ করে নিতে নিতে উঠে দাঁড়ালো। একপাশে থাকা একটি ছোট আয়নার দ্বারা সে সেখানে দাঁড়িয়েই তার এলার্জি আক্রমনিত স্থানগুলোয় বেশ বিরক্তিসহকারে ওষুধটুকু লাগালো। শেষে বেসিনে হাত ধুঁইয়ে ফের তায়েবের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তা তাকে ফেরত দিতে দিতে বললো,
— ধরো!
ড. তায়েব বললো,
— রাখ এটা, পরে লাগতেও পারে।
জুনায়েদ কাধ ঝাঁকালো। মলমখানা পকেটে পুরতে পুরতে জবানে বললো,
— ওকে দ্যান। সি ইয়্যু!
তায়েব কেবল বখাটে পুরুষটিকেই দেখে গেলেন। জবাবে কোনো উত্তর দিলেন না। সে তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে রইলো তার পানে। নিঃশব্দে হাসলো কেবল। সেইদিন বোধহয় অতি দূরে নেই যেই দিনের জন্য গোটা শাহরিয়ার পরিবার অপেক্ষা করছে!
ড. তায়েবের চেম্বার হতে বেরোতেই অপরপ্রান্তে আয়রা এবং আমিরার দৃশ্যচিত্র ভেসে উঠলো জুনায়েদের চক্ষুমাঝে। মুহূর্তেই শীতল হলো তার চাহুনি। অদ্ভুতভাবেই মুছে গেলো তার কপালের ভাঁজগুলো। স্বাভাবিক হয়ে গেলো তার কন্ঠস্বর। সে গিয়ে দ্রুত আয়রার সম্মুখে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়রা স্বীয় স্বামীর উপস্থিতি টের পেয়য়ে লোচন উঠিয়ে চায়লো। জুনায়েদ তার পানেই তাকিয়ে। জুনায়েদকে এখানে দেখে আয়রা শুধালো,
— শেষ?
জুনায়েদ আমিরাকে নিজের কোলে নিতে নিতে জবাবে বলে,
— হু। সে আমার মামা ছিলো।
আয়রা হতবাক হলো। তার এসব জানা ছিলোনা। জুনায়েদ তাকে এসব বলেনি। জুনায়েদ পা চালিয়ে এগিয়ে যেতে যেতে বললো,
— চলো, লেইট হয়ে যাচ্ছে। ডক্টরের এপয়েন্টমেন্ট নিতে হবে।
আয়রা পা চালিয়ে যেতে যেতে জুনায়েদকে শুধালো,
— ওই মেয়েগুলোর সাথে যে বাজে বিহেইভ করলেন? কেও রেকর্ড করে নিলে তো ফ্যাসাদে পড়বেন।
জুনায়েদ একপেশে হাসলো। রমণীর এহেন বোকা বোকা প্রশ্নে তার হাসিই পেলো। ঢাকা শহর কাঁপানো জুনায়েদ কি-না এসব তুচ্ছ জিনিসে ভয় পাবে? সে তার স্বভাবসুলভ নির্লিপ্ততায় উত্তর দিলো,
— সো হোয়াট? আই ডোন্ট কেয়ার এবাউট দ্যাট।
আর তাছাড়া…আমার নাম হারহামেশাই নিউজপেপারে আসতেই থাকে!
জুনায়েদ শেষের কথাটি কিছুটা গর্বের স্বরে বললো সে। আয়রার চোখদুটো ছোটো ছোটো হয়ে এলো। সে আর কিছু প্রশ্ন করার পূর্বেই তারা রিসিপশনে এসে পৌঁছালো। আয়রা আর কিছুই শুধোতে পারলোনা। রিসিপশনে গিয়েই জুনায়েদ বললো,
— ড. সিদ্দিকীর এপয়েন্টমেন্ট প্রয়োজন!
রিসিপশনিস্ট ছিলো একজন নারী। তা বুঝতে পেরে জুনায়েদ ভুলেও মেয়েটির পানে তাকালোনা। সে নিজের চোখদুটো অত্যন্ত কাবিলতির সাহায্যে সংযত রেখেছে। অপরপ্রান্তের রিসেপশনিস্টটি শুধালো,
— হাই স্যার এবং ম্যাডাম। কাইন্ডলি আপনাদের ইনফো দিয়ে সাহায্য করবেন।
অতঃপর ফের আরও একবার শুধালো সে
— বাচ্চার নাম?
রিসিপশনিস্টের কাঠিন্যতার সহিত প্রশ্ন। প্রত্যুত্তরে আয়রার অতি নিম্ন স্বর,
— আমিরা।
— ফুল নেইম বলুন!
আয়রা চুপ রইলো কিছুসময়। জুনায়েদ এখনো আমিরাকে নিজের পদবী দেয়নি। সুতরাং, শাহরিয়ার বলাটা বেমানান। সে দীর্ঘ নিঃশ্বাসে জবাব দিতে গেলো,
— আমিরা জোয়া….
আয়রার বাক্যকে অসম্পূর্ণ রেখে পার্শ্বে সটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জুনায়েদ নামক গম্ভীর পুরুষটি মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে নিজের পৌরুষদীপ্ত স্বরে উত্তর করলো রিসেপশনিস্টের,
— শাহরিয়ার, ওর ফুল নেইম যায়নাব আমিরা শাহরিয়ার!
সাধারণের নিকট বাক্যটি সহজলভ্য শোনালেও আয়রার কাছে তা দূর্লভ কোনো বস্তু অথবা অষ্টম আশ্চর্য্যের চেয়ে কম কিছু শোনালো না। সে বিস্মিত নয়নে তড়াক গতিতে ঘাড় ঘোরালো। অথচ এতো বড় বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরুষটির কোনো ভিন্ন ভাবাবেগ নেই আদলে। এলার্জির রেশ এখনো কিছুটা রয়ে গিয়েছে। ফর্সা মুখটার দু’গাল পড়ন্ত বিকেলের সূর্যাস্তের ন্যায় লালচে রঙের আস্তরণে ঢাকা। সাথে শার্টের খোলা দু’একটি বাটনের ফাঁক গলে ধবধবে দুধে-আলতা গলার কলার বোনেও লালচে দাগ। হাতেও বুঝি কম নয়। সেদিকে ভাবাবেগ নেই মোটেই। আয়রার কানে এলো রিসেপশনিস্ট আবারও কিছু বলছে,
— বাচ্চার বাবার নাম?
বখাটে পুরুষটির অকপটে জবাব,
— যায়নাব জুনায়েদ শাহরিয়ার!
— আর মায়ের নাম?
পুরোটা প্রশ্নোত্তরের সময়ের এইলগ্নে এসে প্রথমবারের ন্যায় বেখেয়ালি পুরুষটলি বড্ড খেয়ালে লোচন রাখলো পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তার কাধ ছুঁইছুঁই উঁচিয়ে রাখা রমণীটির মুখপানে। নেকাবে ঢাকা ওই চোখজোড়া–যা বরাবর-ই জুনায়েদের নেশাক্ত স্থান। বখাটে পুরুষ জুনায়েদ এবারে স্বীয় স্ত্রীর পানে নিজের নীল সায়রের ন্যায় আঁখিদ্বয় উন্মুক্ত রেখে জবাব দেয় মোহিত, গভীর স্বরে,
তাকদীর পর্ব ১৬
— ফাহমিদা, যায়নাব ফাহমিদা শাহরিয়ার আয়রা!
আয়রা সঙ্গে সঙ্গেই কিছু বললো না। ইসলামে যে স্বামীর পদবী নিজের সাথে জুড়তে নেই তা বোধহয় এই বখাটে পুরুষের ধারণাতে নেই। আয়রা সিদ্ধান্ত নিলো, একটু পরে সে এই বিষয়ে জুনায়েদের সাথে কথা বলবে। এখানে বললে হয়তোবা ব্যাপারটা অসংযত দেখাতে পারে।
