বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬১
রানী আমিনা
“পিচ্চিটার অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরেছো?”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি তাকে যত দ্রুত সম্ভব খুঁজে বের করার৷ কিন্তু তাঁর অবস্থান নির্ণয় করা আমাদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ছে, ইয়োর ম্যাজেস্টি। তিনি কোনো ভাবেই ধরা দিতে চাইছেন না।”
“যদি সে আমার খুব পরিচিত কেউই হয়, বা আমার সাথে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা থাকে, তবে সে আমার থেকে লুকিয়ে, পালিয়ে কেন ফিরছে লিও? তুমি নিশ্চয় তাকে চেনো, বেশ ভালোভাবেই?”
মীরের এ প্রশ্নের উত্তরে লিও কি বলবে খুঁজে পেলোনা। বর্তমানে তারা কুরো আহমারে অবস্থান করছে। হিজ ম্যাজেস্টির খুব শখ হয়েছে তিনি ফটোগ্রাফি করবেন, খুব উৎসাহ নিয়ে তিনি আজ ক্যামেরা কিনতে চলে এসেছেন কুরো আহমারে। হয়তো পুরোনো শখ গুলো ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে তাঁকে!
ফটোগ্রাফি তার বরাবরই প্রচণ্ড পছন্দের। বহু পূর্বে শেহজাদীর ফটোগ্রাফি করা ছিলো তাঁর একমাত্র শখ। ছোট্ট শেহজাদীর প্রতিটা ছোট্ট ছোট্ট পদক্ষেপ, বেড়ে ওঠার প্রতিটা মুহুর্ত ক্যামেরা বন্দি করে রাখতেন তিনি। শেহজাদী বড় হওয়ার সাথে সাথে বাড়লো তার শখও!
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
লিও দেখতো, যখন ওরা সকলে প্রাসাদের রয়্যাল জ্যু তে খুব আনন্দে দিনাতিপাত করতো তখন রোজ রাতে শেহজাদীকে পাওয়া যেতো অপ্সরার সাজে। হিজ ম্যাজেস্টি নিজের হাতে সাজাতেন তাকে। কোন পোশাকটি পরবে, চুলটা কিভাবে বাধবে, ঠোঁটটা কিভাবে সাজাবে, চোখের কাজলের পরিমাণ ঠিক কতটুকু হলে তৃষ্ণা মিটবে তার!
শেহজাদী ছিলো তার ব্যাক্তিগত মডেল, যাকে নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়ে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ফটোশুট করতেন তিনি। সেই ফটোগুলো হতো অত্যন্ত গোপনীয় যার অস্তিত্বের খোঁজ স্বয়ং শেহজাদীও পেতেন না। হিজ ম্যাজেস্টির এই অদ্ভুত শখে ক্ষণে ক্ষণে শোনা যেত শেহজাদীর ঝর্ণার মতোন ছটফটে, নির্মল হাসির ঝঙ্কার।
হিজ ম্যাজেস্টির কামরা সাউন্ড প্রুফ হওয়ার পূর্বে বহুত ফ্যাসাদে পড়তে হতো ওদের৷ কোকো ভাইয়ের সোজা অর্ডার ছিলো রাতের বারো বাজার পূর্বেই যেভাবেই হোক ঘুমিয়ে যেতে হবে। কারণ জেগে থাকলে ওদের সকলের জন্য ব্যাপারটা মোটেও স্বস্তির হবে না। কোকো ভাইজান তো কানের ওপর বালিশ উঠিয়ে ঘুমোতেন।
কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে যেরাতেই ওদের দুচোখের পাতা এক হতে বিলম্ব হতো সেরাত গুলোতে ওরা বুঝতে পারতো ফটোগ্রাফি গুলো ঠিক কোন মুহুর্তের নিবিড়তায়, কোন গোপন ভালোবাসার ক্ষণে তোলা হতো!
পরদিন কেউ আর ভুল করেও হিজ ম্যাজেস্টি বা শেহজাদীর সামনে পড়তো না৷
পুরোনো স্মৃতি রোমন্থন করে লিওর কান লাল হয়ে উঠলো। গলা খাকারি দিয়ে বলল,
“পজিটিভ, ইয়োর ম্যাজেস্টি। আমি তাঁকে চিনি। কিন্তু তিনি কেন আপনার মুখোমুখি হতে চাইছেন না সেটা আমার জানা নেই। হয়তো উনি কোনো ব্যাক্তিগত কারণে আপনাকে এড়িয়ে চলছেন, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর মনোযোগী চোখে ক্যামেরার বিবরণী দেখতে দেখতে বলল,
“আমাকে জরুরী ভিত্তিতে জানতে হবে কেন সে আমাকে এড়িয়ে চলছে।”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে আবার যোগ করলো,
“কোকোকে সংবাদ পাঠাও, সেখানের কাজ শেষ হলেই যেন সে শিরো মিদোরিতে ফিরে আসে। তার সাথে আমার কিছু বিষয়ে অ্যাসাপ ডিসকাস করা প্রয়োজন।”
“আপনার যেমন আদেশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“আর জায়ান সাদিকে বলে দিও সে যেন পিচ্চিকে তার মাসিক বেতন দ্বিগুণ করে বুঝিয়ে দেয়। যতদিন না আমি তাকে প্রাসাদে ফিরিয়ে নিয়ে আসছি, ততদিন সে যেখানে যেভাবেই থাকুক, যেন ভালো থাকে।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, কিন্তু জায়ান সাদি শেহজাদীকে…. মানে কিভাবে….. তিনি তো জানেন না শেহজাদী কোথায়!”
ইতস্তত গলায় বলল লিও। মীর চোখের ওপর ক্যামেরা ধরে শপিংমলের উপর তলার কোনো বস্তুর ওপর ফোকাস করার চেষ্টা করছিলো। লিওর কথা শুনে নির্বিকার গলায় বলল,
“আমার সাথে কথা বলার সময়ে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়ার পূর্বে তোমাদের মনে রাখা উচিত আমি একজন বাদশাহ, সিংহাসনে আমি হাওয়াতে উড়ে এসে বসিনি লিও।”
লিও লজ্জা পেলো। অপরাধবোধে মাথা নিচু করে ফেললো সঙ্গে সঙ্গে। মীর বলল,
“পিচ্চিটার যখন যা প্রয়োজন হবে জায়ান সাদিকে প্রোভাইড করতে বলবে। তার সেইফটি এবং সুন্দর জীবন যাপনে কোনো ধরণের কোনো কম্পলিকেশন্স এলে তার কৈফিয়ত জায়ানকে দিতে হবে, তাকে ওয়ার্ন করে দিও।”
“অ্যাজ ইয়োর উইশ, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
কুরো আহমারের সমুদ্র পাড়ে নিজের কালো রঙা গাড়িটির গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মীর, হাতে সদ্য খরিদকৃত ক্যামেরা। পাশেই দাঁড়িয়ে আরমান৷ আজ তার খাতায় বেশ কিছু নতুন আইন যোগ হয়েছে, সেগুলো খতিয়ে দেখা শেষ করে সে একটা দূরবীন হাতে নিলো।
লিও কাঞ্জি মীরের জন্য নাস্তার ব্যাবস্থা করতে গিয়েছে। আর আরমানের কাঁধে দায়িত্ব পড়েছে মীরের ফটোশুটের জন্য সুন্দর কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্য নির্বাচন করার। সে দূরবীন টা চোখে ঠেকিয়ে এদিক ওদিক দেখতে রইলো।
মীর ক্যামেরাতে একটা টেলিফটো লেন্স লাগিয়ে তাক করলো কিমালেবের দূর পাহাড়ের দিকে৷ এই পাহাড় সারির সাথে তার কত শত স্মৃতি! সে আর সালিম সময় পেলেই বেরিয়ে পড়িতো ওই পাহাড়ের চূড়ায় ওঠার দুঃসাহসিক অভিযানে। কতবার আছড়ে পড়েছে, কতবার ছড়ে গিয়েছে ওর কর্কশ হাতের থাবা, কতবার আঘাত পেয়েছে পায়ে; কিন্তু কোনো কিছুই তাদেরকে ওই পাহাড় সারি হতে দূরে রাখতে পারেনি।
মীর হাসলো মৃদু৷ পুরোনো স্মৃতি গুলো বেদনাবিধুর হওয়া সত্ত্বেও কতইনা আনন্দ দেয়! পাহাড়ের সারিতে ফোকাস করতে গিয়ে আচমকা হাত ফসকে ক্যামেরা পড়ে যেতে নিতেই মীর ধরে ফেললো তৎক্ষনাৎ। চোখের সামনে নিয়ে আবার ফোকাস করতেই চোখে বাধলো পাহাড়ের পাদদেশের সমুদ্র।
ফোকাস সরিয়ে পাহাড়ের দিকে ক্যামেরা তোলার ঠিক আগ মুহুর্তে নীলচে লোনা পানিতে একটি ঢেউ লক্ষ্য করলো মীর৷ কৌতুহল বসত ক্যামেরা সামান্য বা দিকে ঘোরাতেই শ্বাস আঁটকে এলো মীরের!
সমুদ্রের নীল পানিতে হাটু অব্দি ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে সফেদ চুলের মেয়েটি। শরীরের আবরণ অত্যন্ত স্বল্প! স্বল্প বসনের ভেতর দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তার অসাধারণ শরীরি সৌন্দর্যের ভয়াবহ উত্তাপ! সূর্যের নরম কিরণ আছড়ে পড়ছে তার সারা শরীরে, ঝিকিমিকি করছে তার নিতম্ব ছাড়ানো সফেদ চুল, শুভ্র শরীর।
সুডৌল বক্ষ বিভাজিকায় কয়েক ফোটা পানি সবুজ ঘাসের ওপর জমা ভোরের শিশির বিন্দুর ন্যায় উদ্বেলিত হয়ে আছে। হীরক খণ্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখ জোড়াতে আত্মতৃপ্তির মিষ্টি ঝলক। একটু একটু করে নামছে সে স্বচ্ছ পানির ভেতর, নীল পানি ক্রমশ দখল করে নিচ্ছে তার মোলায়েম, মাংসল ঊরু; মেদহীন পাতলা কোমর!
মীর ঢোক গিললো একটা, পরক্ষণেই ক্ষিপ্র বেগে ক্যামেরা সরিয়ে নিলো চোখের ওপর থেকে। চোখ বন্ধ করে কয়েকবার জোরে শ্বাস ছেড়ে নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়ে বিড়বিড়িয়ে বলল,
“ছিঃছিঃ…! এ আমি কি করছিলাম!”
পরক্ষণেই তার চোখ গেলো আরমানের দিকে। দূরবীন চোখে সে সমুদ্রের দিকে মাত্র ঝুঁকেছে। মীর তৎক্ষনাৎ ঝড়ো বেগে ছো মেরে ওর হাত থেকে দূরবীন টা ছিনিয়ে এক আছাড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললো মুহুর্তেই৷ আরমান আতঙ্কে সিঁটিয়ে গিয়ে এক কোণে অবুঝের মতোন দাঁড়িয়ে রইলো। সেই মুহুর্তেই লিও কাঞ্জি নাস্তা নিয়ে এসে পৌছোলো সেখানে।
মীর ক্যামেরাটা গাড়ির ভেতর রেখে গমগমে স্বরে লিওকে বলল,
“এই মুহুর্তে এই সম্পুর্ন এরিয়া সিল করে সাধারণের প্রবেশাধিকার টোটালি ফরবিড করে দিবে। যে কোনো পর্যটকের জন্য কিমালেবের পাহাড় বা সমুদ্র উপকূলের ফটোগ্রাফি সম্পুর্নরূপে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনবে এবং ডিক্লেয়ার করে দিবে, বিধি লঙ্ঘনকারীকে বিনা প্রশ্নে তৎক্ষনাৎ মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।”
বলেই ঢুকে পড়লো গাড়ির ভেতর৷ কাঞ্জি লিও দুজনেই হতবাক হয়ে আরমানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কি হয়েছে জানার জন্য। আরমান রোবটের মতোন দ্রুত বেগে মাথা নাড়িয়ে বুঝিয়ে দিলো সে এই ব্যাপারে কিছুই জানে না।
বাচ্চা মেয়েটির নাম লুসি। সেদিনের পর কেউ আর তার খোঁজ নিতে আসেনি। আনাবিয়া কয়েকবার ফ্যালকনকে দিয়ে খোঁজ করিয়েছে কোনো পরিবার কোনো বাচ্চা মেয়ের মিসিং রিপোর্ট করিয়েছে কিনা, কিন্তু প্রতিবারই হতাশ হয়েছে। আনাবিয়া ওকে রেস্টুরেন্টেরই এক কর্মচারীর দায়িত্বে দিয়েছে। যতদিন মেয়েটির পরিবার তার খোঁজ না করছে ততদিন মেয়েটির সকল ভরণপোষণ আনাবিয়াই বহন করবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
বর্তমানে মেয়েটি বসে রেস্টুরেন্টের এক কোণে, পরণে তার একটা ফুলদার ফ্রক। আনাবিয়ার দেওয়া এক বাটি স্যুপ চেটেপুটে শেষ করে সে এখন বসে আছে চুপটি করে। রেস্টুরেন্ট ওপেন হবে কিছুক্ষণ পরেই। এরই ভেতর সবগুলো টেবিল বুক হয়ে গেছে। শহরের বড় বড় লোকগুলো কিভাবে এই দুর্গম, পাহাড়ি অঞ্চলের রেস্টুরেন্টের খোঁজ পেয়েছে জানেনা আনাবিয়া। অল্প দিনেই তার রেস্টুরেন্টের নাম ছড়িয়েছে দূর দূরান্তে! খাবারের স্বাদের থেকে বেশি নজর কেড়েছে রেস্টুরেন্টের খরিদ্দার দের সংখ্যার সীমা। রোজকার ওই বিশখানা আসন দখল করতে তাই শুরু হয়েছে প্রতিযোগিতা!
কিচেনে রান্না চলছে পুরোদমে। ফ্যালকন আর ইলহান মিলে ওয়েটার নিয়োগ দিয়েছে এক ঝাঁক। ফারিশ তার দুই মেয়ে নিয়ে কুরো আহমার থেকে যখন তখন চলে আসে এখানে। সাথে যোগ হয় জাভেদ, জেসার আর জুনায়েদ। খরিদ্দারদের পালা শেষ হলে রেস্টুরেন্ট দখলে চলে যায় তাদের কজনের। মারামারি ফাটাফাটি করে রেস্টুরেন্টের বারোটা বাজিয়ে আনাবিয়ার হাতের খাবার খেয়ে তবেই তারা বাড়িতে ফিরে।
বাচ্চারা সকলে মাঝে মাঝেই চলে আসে আনাবিয়ার রেস্টুরেন্টে। এটা এখন পরিণত হয়েছে ওদের মসভেইলে। কোকো ওদিকে রেস্টুরেন্টের খবর পাওয়ার পর থেকে রাগে ফুসছে। তাকে রেখে সকলে কতই না মজা করছে অথচ কাজের চাপে সে একটু তার আম্মা কে দেখতে পর্যন্ত আসতে পারছে না!
আনাবিয়া বের হলো কিচেন থেকে। শীত শেষ হতে চলেছে, ভেতরের গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে সে। আনাবিয়া বের হতেই লুসি ছুটে গিয়ে এসির রিমোট নিয়ে কমিয়ে দিলো তাপমাত্রা। তা দেখে আনাবিয়া মিষ্টি হেসে কাছে ডাকলো তাকে। লুসি গুটিগুটি পায়ে আসতেই আনাবিয়া জিজ্ঞেস করলো,
“কে শিখিয়েছে তোমাকে?”
“এলান তাত্তু। বলেতে গলম লাগগে ইকানে তাপ দিতে, আর সিত লাগগে ইকানে।”
আনাবিয়া রিনরিনে শব্দে হাসলো। বাইরে যেতে নিলেই লুসি ওর পোশাক আঁকড়ে ধরে মুখ উঁচু করে, বড় বড় চোখ মেলে আধো গলায় বলল,
“আমিও কাত কলব, তালা বাতন দুয়ে দিবো। তুমি আমাকে বিতন দিবা।”
আনাবিয়া শব্দ করে হেসে উঠলো, বলল,
“বিতন দিয়ে কি করবা তুমি শুনি?”
“তুমাকে দামা কিনে দিবো, তুমি আমাকে দিয়েতো না? আমিও দিবো। এলান তাত্তু বলেতে বিতন পেলে আমি চব কিনতে পালবো, অনেক অনেক কাবাল, অনেক পুতুল, অনেক কেলনা। আমি তালা বাতন দুয়ে দিলে তুমি আমাকে অনেক অনেক বিতন দিবা, কেমন?”
আনাবিয়া লুসির ফোলা গাল টিপে দিয়ে বলল,
“তোমাকে আমি এমনিতেই বেতন দিবো লুসি, তোমার থালা ধুতে হবে না। তোমার কিউটনেসের জন্য প্রতি মাসে বেতন পাবে তুমি, ঠিক আছে?”
“কুতনেস….. কুতনেস কি?”
“সেটা আমি তোমাকে পরে বলি? আমার যে অনেক কাজ!”
“এলান তাত্তু কে জিগেস কলবো?”
“হু, যাও। তার এমনিতেই কোনো কাজ নেই, আজকাল সে কাজের থেকে অকাজ করছে বেশি।”
লুসি ঘাড় নাড়িয়ে কোমর দুলিয়ে নাচতে নাচতে ছুটলো ইলহানকে খুঁজতে, খুব ভাব হয়েছে দুজনের৷ আনাবিয়া ওর যাওয়ার দিকে চেয়ে মিষ্টি করে হাসলো। তখুনি রেস্টুরেন্টে ঢুকলো জাভেদ৷ ক্লান্ত দেখালো তাকে বেশ। আনাবিয়ার সামনের একটি চেয়ার টেনে তাতে ধপ করে বসে পড়ে আনাবিয়ার দিকে একটি ইনভিটেশন কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“নিন, আপনার চাচাজানের আমার সিঙ্গেল জীবনের সুখ আর সহ্য হচ্ছে না, আমার ঘাড়ে একটা সুন্দরী রমণী উঠিয়েই তবে ছাড়ছেন৷”
আনাবিয়া ইনভিটেশন কার্ড টি খুলতে খুলতে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“বাবাহ্! তাই নাকি? জাভেদ সাহেব তবে অবশেষে হাড়িকাঠে গলা দিতে রাজি হয়েছেন। ব্রাভো ব্রাভো!”
“মজা নিবেন না আপা! মেয়েকে আমার একদম ভালো লাগেনি, অথচ বাকি সবার নাকি খুব ভালো লেগেছে!”
“ভালো লাগেনি তো বিয়ে কেন করছো? যেমন মেয়ে ভালো লাগে তেমন বিয়ে না করে নিজের জীবন প্লাস তার জীবন দুটোই নষ্ট করবা জাভেদ ভাই।”
“কি করবো বলুন, বাপে ছাড়ছে না। আমি চেয়েছিলাম একটা সাধারণ পরিবারের সাধারণ মেয়ে বিয়ে করবো। কিন্তু আমার বাপের তাতে হবে না, তার নাকি উচ্চ বংশ লাগবে। উচ্চ বংশের ওই নচ্ছার মেয়েটিকে দিয়ে আমার লাভ কি হবে সেটাই বুঝতেছি না।”
“ফটো আছে?”
“হু।”
বলে জাভেদ নিজের ফোন বের করে আনাবিয়ার নিকট দিলো। আনাবিয়া মেয়েটাকে মনোযোগ দিয়ে দেখলো কিছুক্ষণ, বলল,
“মেয়েটা তো অনেক সুন্দর, কথা হয়েছে তোমাদের ভেতর?”
“না আপা, ওকে আমি এমনিতেই চিনি। ল্যাংটা কাল থেকে দেখছি, মনে হচ্ছে সেদিন হয়েছে, বয়স সবে কুড়ি। আর আমার কিনা একশো চার! এই টুকু পিচ্চি মেয়ে নিয়ে আমি কি করবো?
আর তাছাড়া…..”
“তাছাড়া?”
“মেয়ের চালচলন আমার ভালো লাগে না আপা, এরকম রিভিলিং পোশাক পরা মেয়ে আমার কখনো পছন্দ না। আমি ডিসেন্ট মেয়ে পছন্দ করি, এটা আমার বাপে বুঝতে চাইছে না৷
সে আধুনিকা হোক, আ’ ডোন্ট হ্যাভ এনি প্রবলেম উইদ দ্যাট, কিন্তু হোয়াট দ্যা হেক ইজ দিস? সব ফটোতে ওর ক্লিভেজ দেখা যায়!”
জাভেদ অন্য দিকে ফিরে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। আনাবিয়া মেয়েটিকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলো। তারপর বলল,
“মনে না টানলে বিয়ে করা ঠিক হবে না জাভেদ ভাই। তুমি যদি মনে করো এই মেয়েকে তুমি বিয়ের পর বকে ঝকে নিজের মতো করে নিবে তবে তুমি ভুল করছো। তোমার তেমন মেয়েই বিয়ে করা উচিত যেমনটা তুমি চাও, তোমার যেখানে মন সায় দেয়। চাচাজান তো আর সংসার করবে না, করতে হবে তোমাকে৷”
“তাহলে ক্যানসেল করে দিবো? কিন্তু দিয়ে কি করবো? আমি যাকে বিয়ে করতে চাইবো, যেমন মেয়ে বিয়ে করতে চাইবো তেমন তো আমার বাপের পছন্দ হবে না। তার তো উচ্চ বংশ লাগবে, নইলে সোসাইটিতে তিনি মুখ দেখাতে পারবেন না!”
“মেহেরিনকে তুমি পছন্দ করো, তাইনা?”
আনাবিয়ার হঠাৎ প্রশ্নে থতমত খেয়ে গেলো জাভেদ৷ আমতা আমতা করে বলল,
“ন্-না না, আমি ওকে…. মানে আমি কিভাবে ওকে…?”
অপ্রস্তুত হাসলো জাভেদ৷ মেহেরিন জেসিওন শহরের অদূরেরই এক গ্রামের কার্পাস তুলা চাষির মেয়ে। বেশ মিষ্টি দেখতে, অনেক নম্র ভদ্র। আনাবিয়া দেখেছে তাকে, ওদের ফুটবল খেলার মাঠের পাশে বাবার সাথে মাঝে মাঝেই কাজে আসতো সে। পড়াশোনা কতদূর জানা নেই আনাবিয়ার। সে বলল,
“চাচাজানকে জানিয়েছো মেহেরিনের কথা?”
“ন্-নাহ….”
মাথা নিচু করে বলল জাভেদ। আনাবিয়া ওর পাশে বসে বলল,
“না বললে তিনি কিভাবে বুঝবেন যে তার ছেলে এক মেঘবরণ কেশের অধিকারিণী সোনার কন্যার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে গেছেন?”
জাভেদ মেঝের দিকে চেয়ে দমে যাওয়া গলায় বলল,
“উনি যদি মেনে নিতে না চান? উনি যদি মেহেরিন বা তার পরিবারের কোনো ক্ষতি করে বসেন সেই ভয়ে বলিনি। জানোই তো ওর পরিবারের অবস্থা কেমন, তাছাড়া ওর বাবার একটু চরিত্রে সমস্যা আছে। বাবা এ কথা শুনলে কখনোই রাজি হবেন না।
কিন্তু মেহেরিন….. ও তো অনেক ভালো তাই না! আপনি তো ওকে দেখেছেন আপা!”
“ঠিক আছে, আমি কথা বলবো চাচাজানের সাথে। আমি বললে তিনি অবশ্যই বিবেচনা করবেন। এভাবে মাথা নত করে হাত গুটিয়ে বসে থাকলে জীবন এখানেই থমকে যাবে জাভেদ সাদী। অপূর্ণ বাসনা আর কখনো পূর্ণ হবে না, অপ্রাপ্তি কে পাওয়া হবে না।
অব্যক্ত কথা গুলো ব্যক্ত না করে বুকেই পুষে রেখে দিলে ক্ষতটা বুকের মালিকেরই হবে, অন্য কারো না জাভেদ ভাই। তাই প্রকাশ করটা জরুরী!
সৃষ্টিকর্তা আমাদেরকে বুলি দিয়েছেন কেন জানো? শুধু ভাবের আদান প্রদানের জন্য নয়; আমরা যেন মনের যন্ত্রণার ভারে পিষ্ট হয়ে তিলে তিলে শেষ না হয়ে যাই! সৃষ্টিকর্তার সকল নেয়ামতের যথার্থ ব্যাবহার করতে শিখো জাভেদ ভাই।”
জাভেদ মাথা তুললো, চোখ জোড়া চিকচিক করে উঠলো তার। ভয় পেতো সে! বাবা যে নিচু ঘরের মেয়েকে পছন্দ করবেন না!, কোনো ভাবেই মেনে নিতে চাইবেন না, এই ভয়ে মেহেরিনকে কোনোদিন বলা হয়নি মনের কথা!
বলা হয়নি মেহেরিন হাসলে তার গালের টোলটি জাভেদের ছুয়ে দেখতে ইচ্ছা করে! বলা হয়নি মেহেরিনের কালো, লম্বা, রেশমসম চুল গুলো তার ভীষণ পছন্দ! বলা হয়নি মেহেরিনের চোখ জোড়াতে সে পৃথিবীর সমস্ত মায়া দেখতে পায়!
জাভেদ উঠে দাঁড়ালো হঠাৎ, আনাবিয়া শুধোলো,
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৬০
“নতুন বর এখন কোথায় চলেছে শুনি?”
জাভেদ সলজ্জ হেসে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল,
“মেহেরিনের বাবার কাছে, তার মেয়েকে নিজের জীবনসঙ্গী করার প্রস্তাব নিয়ে।”
আনাবিয়া সন্তুষ্টির হাসি হাসলো, জাভেদের বাহু চাপড়ে দিয়ে বলল,
“অল দ্যা বেস্ট উইশেস ফ’ ইয়্যু, বউ নিয়ে বাসায় ফিরো। চাচাজান বাসায় ঢুকতে না দিলে এখানে এসো, আমি বাসরের ব্যাবস্থা করবো।”
জাভেদ শিশুদের মতোন হাসলো, খেদহীন। পরমুহূর্তেই বেরিয়ে গেলো রেস্টুরেন্ট থেকে।
