Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৩

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৩

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৩
রানী আমিনা

গত কয়েক মাস যেন স্বপ্নের মতন বেঘোরে কেটেছে আনাবিয়ার৷ মনে হত যেন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন সে, কোনো দানবে ঘেরা স্বপ্নালোকে আটকা, আপ্রাণ চেষ্টাতেও মুক্তি পাওয়া দূরুহ!
মীর ওর কাছাকাছি থেকেছে পুরোটা সময়। রোজ ঘুম থেকে উঠেই মীরের পৌরুষে মোড়া তৃপ্ত মুখখানা দেখেছে, রাতে চোখের পাতায় ঘুম ভর করার পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত দেখে গেছে মীরের স্বর্ণাভ দৃষ্টি জোড়া তার শুভ্র চেহারাতেই নিবদ্ধ। অথচ সে এসব চায়না!

কোনো এক জাদুবলে যেন মীর কেড়ে নিয়েছে ওর সমস্ত অভিযোগ, প্রতিরোধের ক্ষমতা। যন্ত্রের মতন চলে সে, রুটিন মাফিক খাওয়া ঘুম হয় তার। সন্ধ্যা নামলে মীর বুকে আগলে নিয়ে বসে থাকে বিরাট বারান্দার কার্নিশ ঘেঁষে। বর্তমানে পারিষদে সময় দেয়না বললেই চলে।
আনাবিয়ার ভয় হয়। অভিযোগ, অনুযোগ, প্রতিরোধ করতে গিয়েও পারেনা। আঁটকে যায় কণ্ঠনালীতে, কিসে যেন বাধা দেয় তাকে। বার বার মনে পড়ে যায় ইয়াসির হেকিমের সাবধান বাণী— যদি আবার যন্ত্রণা বাড়ে মীরের! আবার যদি প্রবল কষ্টে চুপসে যেতে শুরু করে মীরের সৌম্য মুখখানা!
কিছুই বলেনি সে, বলবেনা। মীর যেভাবে চায় সেভাবে হোক সব। হাজার প্রতিরোধেও মীর তার পিছু ছাড়বেনা, উপরন্তু কুক্ষিগত করতে চাইবে আনাবিয়ার সমস্ত সত্তাকে। তার আড়াল হতে গিয়ে শুধু শুধু শক্তিক্ষয় হবে আনাবিয়ার! সব চুপচাপ মেনে নেওয়াই শ্রেয়। মীর যদি তাকে মালিকানাধীন করে ভালো থাকে তবে তাই হোক, সে ছেড়ে দিবে সব
প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, বিদ্রোহ।

মীর বুঝতো বোধ হয়; আনাবিয়ার নিষ্প্রভ, অনুভূতিহীন মুখখানার দিকে চেয়ে থাকতো অপলক। বুঝতে চেষ্টা করতো এই নিশ্চুপ আনাবিয়াকে, যাকে শত সহস্র ঝড়তোলা আদরেও আন্দোলিত করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না৷ এক সতর্ক, সাবধানী চাহনি ঘুরে ফিরত তার চোখের তারায়।
ইয়াসির হেকিম আজকাল আনাবিয়ার সাথে কথা বলতে আসে। তাকে উদ্ভট প্রশ্ন করে চলে। সেদিন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল আনাবিয়ার রঙ ভালো লাগে কিনা! আনাবিয়া বারান্দায় বসে তাকিয়ে ছিলো দূর পাহাড়ের দিকে, অপলক। এই বারান্দা, এক কোণের ছোট্ট ফুল ভর্তি বাগান আর দূরের পাহাড়ই আজকাল মৌন সঙ্গী তার।
ইয়াসিরের প্রশ্নে কি উত্তর দিবে সে জানতনা, কিছুক্ষণ ইয়াসির হেকিমের দিকে তাকিয়ে থেকে সে ছোট্ট করে জবাব দিল,

“না।”
সত্যিই তার আর রঙ ভালো লাগেনা, কিছুই ভালো লাগেনা। চারদিকে আবদ্ধ, দমবন্ধকর এক আবহাওয়া! এত চাকচিক্য, এত আভিজাত্য তাকে যেন আর স্পর্শই করতে চাইছেনা।
ইয়াসির হেকিম সেদিন আরও কিছু উদ্ভট প্রশ্ন করে আনাবিয়াকে অত্যন্ত বিরক্ত করে ফেলল। অবশেষে আনাবিয়া আচমকা রেগে গিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে কিছুক্ষণ। ইয়াসির হেকিম বেশ ভয় পেয়েছিলেন তাতে, তাড়াহুড়োয় উঠে গেছিলেন আনাবিয়ার সামনে থেকে।
সেদিন মীরের সাথে ইয়াসির হেকিমের দীর্ঘ আলাপ চলেছিলো, আনাবিয়ার শ্রবণ সীমার বাইরে তবে দৃষ্টি সীমার নয়। আনাবিয়া নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দেখে গেছিলো দুজনকে। ইয়াসিরের ক্রমাগত বকবকানি আর মীরের কপালে চিন্তার ভাজ দুটোই নজরে এসেছিলো তার। কিন্তু কেন যেন সবই নিরর্থক ভেবে নিয়ে নিরুদ্দীপ হয়ে সে আবারও দৃষ্টি ফিরিয়েছিলো পাহাড় সারির দিকে।
ইয়াসির হেকিম আজ আবারও এসেছেন, সাথে একজন অশীতিপর বৃদ্ধ। ছানি পড়া চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা। বার্ধক্য তাকে চেপে বাকা করে ফেললেও হাতে নেই কোনো অবলম্বন, এত পর্যন্ত তিনি তৃতীয় পক্ষের সাহায্য ছাড়াই হেটে এসেছেন।

বৃদ্ধ লোকটি বসলেন বেশ দূরে, মীর তাদের সাথেই বসেছে। আনাবিয়া এদিকের বারান্দায়, সকালের নাস্তা শেষ হয়েছে তার মাত্র। শরীরটা ভালো লাগেনা আজকাল তার, এক রহস্যময় ক্লান্তি এসে ভর করেছে তার শরীর-মন পরে।
বৃদ্ধলোকটি দূর হতে কপালে ভাজ ফেলে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলেন আনাবিয়াকে। মনযোগী চোখে হিসেব করলেন তার প্রতিটা ছোট ছোট ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া, চোখের চাহনি, ঠোঁটের ক্ষীণ নড়চড়। পর্যবেক্ষণ শেষে কাগজে খসখস করে লিখলেন কিছু। তারপরেই চলে গেলেন রয়্যাল ফ্লোর ছেড়ে।
মীর কাগজখানা হাতে নিয়ে এগিয়ে এল আনাবিয়ার নিকট, বসলো মুখোমুখি। মনোযোগী চোখে দেখল আনাবিয়ার অত্যন্ত শুভ্র মুখখানা। বিগত মাসগুলোতে আনাবিয়া কামরা ছাড়েনি বললেই চলে, সর্বক্ষণ চার দেয়ালে বন্দি থেকে গায়ের শুভ্র রঙ প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে আরও। চোখের ঝিকিমিকিতে ভাটা পড়েছে সামান্য। স্বাস্থ্যজ্জল শুভ্র চুলগুলো কিঞ্চিৎ লম্বা হয়ে বর্তমানে ছুয়েছে পিঠের মধ্যিখান।
মীরের অবয়বে পাহাড়ের দৃশ্য বিঘ্নিত হতেই আনাবিয়া তাকাল মীরের চোখ পানে৷ মীর হাতের কাগজের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে ধীর গলায় জিজ্ঞেস করল,

“আমি তোমার কাছাকাছি থাকলে তোমার ভালো লাগে, শিনজো? মানে…. আমি যখন তোমার অনেক কাছে থাকি, কেমন লাগে তোমার?”
আনাবিয়ার ভ্রু কুচকে এল, কপালে সামান্য ভাজ ফেলে সে শুধোল,
“এমন অদ্ভুত প্রশ্ন করছ কেন?”
“জানা প্রয়োজন, বলো।”
আনাবিয়া দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল, ক্ষণিক বিরতি নিয়ে শান্ত স্বরে উত্তর করল,
“যেমন লাগা উচিত তেমন।”

মীর আবারও কিছুক্ষণ মনোযোগী চোখে দেখল ওকে। হাত বাড়িয়ে আচমকা স্পর্শ করল আনাবিয়ার চোয়াল, ঝলমলে চোখ জোড়ায় স্বর্ণাভ দৃষ্টি ফেলে কিছু খুঁজল যেন। হাতখানা চোয়াল ছেড়ে ধীরে ধীরে নামাল আনাবিয়ার বক্ষমঞ্জরির নিকট। অনামিকা আর মধ্যমার উলটো পিঠ দিয়ে আলতো আদুরে স্পর্শ করে মীর শুধোলো,
“আমার স্পর্শ ভালো লাগে তোমার শিনজো? ইউ ফিল এনি সেনসেশন?”
আনাবিয়া উত্তর দিলনা কোনো, মীরের হাত খানা অলস ভঙ্গিতে সরিয়ে দিয়ে তাকিয়ে রইল আবারও পাহাড়সারির পানে। মীর কিছুক্ষণ ওর অমনোযোগী চেহারায় চেয়ে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলল গোপনে, তারপর উঠে চলে গেলো রয়্যাল ফ্লোরের বাইরে৷ ইয়াসির হেকিম বৃদ্ধ লোকটিকে নিয়ে এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন সেখানেই। মীরকে দেখে তটস্থ হয়ে দাঁড়াল দুজনে, মীর বৃদ্ধের লিখে দেওয়া প্রশ্ন গুলোর উত্তর বলতেই দুজন চোখাচোখি করল, বৃদ্ধলোকটি গলা খাকারি দিয়ে বললেন,

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, শেহজাদী খুব সম্ভবত ইমোশনাল নাম্বনেসে ভুগছেন। ডিপ্রেশন বা কোনো ট্রমার কারণে তাঁর লিবিডো সম্পুর্ন লো হয়ে গেছে, যে কারণে তিনি কিছু অনুভব করছেন না। আপনার এই মুহুর্তে উচিত হবে তার সাথে খোলাখুলি কথা বলা, কোন কথায় কোন কাজে তিনি কষ্ট পেয়েছেন সেগুলো সর্ট আউট করা। তার চাইতেও বেশি প্রয়োজন তাকে হ্যাপি রাখা। অন্তত তিনি কষ্ট পাবেন, বা পেতে পারেন এমন কিছু থেকে যথাসম্ভব তাকে দূরে রাখা। উনি পছন্দ করেন বা খুশি হন এমন কাজ গুলো তাকে করতে দিবেন৷ সর্বপরি তাকে কোনোভাবেই স্টেসে রাখা যাবেনা, এতে তার সমস্যা আরও বাড়বে, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর স্থীর দাঁড়িয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ, বৃদ্ধলোকটি আবার বললেন,
“অনুমতি দিলে একটা উপদেশ দিতে পারি, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
“বলুন হেকিমসাহেব।”

“ইয়োর ম্যাজেস্টি, আমার এত বছরের ডাক্তারি জীবনে আমি ফিমেইল সাইকোলজি নিয়ে যত স্টাডি করেছি, অন্য কোনোকিছুতে এত পরিশ্রম দিয়েছি বলে মনে হয়না। যদিও তাদের মনের ভাব বোঝা একপ্রকার অসম্ভব, হয়তো সৃষ্টিকর্তা ব্যাতিত অন্য কেউ নারীজাতিকে সম্পুর্ন রূপে বুঝতে পারেনা৷ তবে এতগুলো বছরে আমি যেটুকু বুঝতে পেরেছি তা হলো, নারীমন ব্যাস্ত থাকতে পছন্দ করে। শিশুবয়সে তারা পুতুল নিয়ে ব্যাস্ত থাকে, কৈশরে প্রেমিক, যৌবনে স্বামী, প্রৌড়ে সন্তান এবং বৃদ্ধবয়সে সমস্তকিছু। তাদের যাবতীয় মনোযোগ তাদের আশেপাশের সবচেয়ে প্রিয় জিনিসটির ওপর পতিত থাকে। প্রিয়জিনিসের মনমতো যত্ন নিতে না পারলে নারীমন অনুভূতি হারায়। তাই বলবো শেহজাদীকে তার প্রিয়জিনিস গুলোর প্রতি ব্যাস্ততা বাড়িয়ে দিন। তিনি খুশি থাকবেন। অলস বসে থেকে অতিরিক্ত চিন্তা করে মন ভারাক্রান্ত ব্যাতিত আর কিছুই হবেনা, ইয়োর ম্যাজেস্টি।”
মীর মনোযোগ দিয়ে শুনলো বৃদ্ধ হেকিমের কথাগুলো, অতঃপর দুজনকেই বিদায় জানিয়ে দ্রুত পায়ে ফিরে এলো রয়্যাল ফ্লোরে। আনাবিয়া তখনো বসে পূর্বের ভঙ্গিতে, মুখখানা নির্লিপ্ত। মীর তার নিকট এসেই আচমকা বলল,

“আমরা বাইরে যাবো, চলো।”
“কোথায়?”
“ঘুরতে যাবো, গন্তব্য অনির্দিষ্ট। তৈরি হবে চলো।”
“আমি কোথাও যাবোনা, এখানেই ঠিক আছি।”
“হুম, দেখতে পাচ্ছি।”
বলেই আনাবিয়াকে সোফা থেকে দুহাতে উঠিয়ে বুকের ওপর নিয়ে কামরায় ঢুকে পড়লো সে৷

কুরো আহমারের ব্যাস্ত সড়কগুলোর একটির ফুটপাত ধরে হেটে চলেছে মীর, ওর সম্মুখে আনাবিয়া। দুহাতে ওকে প্রায় জড়িয়ে নিয়ে জনবহুল ফুটপাতের ভিড় থেকে বাঁচিয়ে রাখছে সে। স্কুল গুলো ছুটি হয়েছে মাত্র, ছোট ছোট বাচ্চারা ছোটাছুটি করে এগিয়ে চলেছে ফুটপাত ধরে। তাদের উচ্ছসিত কলকাকলীতে মুখরিত হয়ে আছে সমগ্র রাস্তা। আনাবিয়ার দিকে হুট হাট অবাক চোখে তাকাচ্ছে কেউ কেউ, ক্ষণিক মুগ্ধ চোখে চেয়ে থেকে আবার ছুটছে নিজ গন্তব্যে।
আনাবিয়া এগোতে এগোতে নিরুদ্দীপ কন্ঠে প্রশ্ন করলো,
“আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছো?”
“তোমার প্রাসাদে বসে থাকতে ভালো লাগছেনা তাই।”
“এ কথা আমি কখন বলেছি?”
“শাটাপ।”
মৃদু ধমক দিয়ে মীর ওকে ঠেলে নিয়ে চলল কোনো একদিকে। আনাবিয়া নাকের পাটা ফুলিয়ে এগিয়ে চলল মীরের দেখানো পথে। সামনেই প্রধান সড়কের সীমানা ঘেঁষে বিরাট এরিয়া জুড়ে গ্রীষ্মকালীন মেলা বসেছে। মীর আনাবিয়াকে নিয়ে সেদিকে যেতে যেতে বলে উঠলো,

“শিনজো, আজ তুমি যা ইচ্ছে খেতে পারো। আমি কিছু বলবোনা।”
আনাবিয়া বিস্মিত হলো, ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক চোখে দেখলো ওকে, মীর তৎক্ষনাৎ বলে উঠলো,
“তবে কমিয়ে খেয়ো।”
“তাহলে খাবো না।”
“আচ্ছা, পেটে সয় এমন খেয়ো।”
যা ইচ্ছে খেতে পারার খুশিতে আনাবিয়ার মুখখানা আচানক দীপ্ত হয়ে উঠলো। ফুরফুরে মনে সে নিজ উদ্যোগে এগিয়ে গেলো ভিড় ঠেলে। অদূরেই একটি সামুদ্রিক খাবারের ফুড স্টল দেখে প্রায় ছুটে গেলো, মীর এগোলো ওর পেছন পেছন। জীবন্ত অক্টোপাস গুলো পানির ভেতর কিলবিল করে ঘুরছে, সাধারণ হতে দানবীয় সব ধরণের কাকড়াতে ভর্তি হয়ে আছে সামনেটা। এক পাশে বিরাট বিরাট বাক্স ভর্তি সামুদ্রিক ঝিনুক, অন্য পাশে নানা জাতের চিংড়ী, টুনা, স্যামন ইত্যাদি।
আনাবিয়া মীরের দিকে ফিরে উচ্ছসিত স্বরে বলে উঠলো,

“আমি কিন্তু সবকিছু থেকে একটু একটু করে খাবো।”
পরক্ষণেই সেলসম্যানকে নিজের পছন্দসই খাবার তৈরির প্রক্রিয়া বর্ণনা দিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়লো সে৷ মীর স্নিগ্ধ চোখে দেখলো ওকে, আস্বস্ত দেখালো তাকে। সেলসম্যান অর্ডার নিয়ে লেগে পড়লো খাবার তৈরিতে। আনাবিয়া মীরের দিকে ফিরে জিজ্ঞেস করলো,
“তুমি কিছু খাবে না?”
মীর ওপর নিচে মাথা নেড়ে অক্টোপাসের টাব থেকে একটা অক্টোপাস উঠিয়ে নিয়ে পাশে চিরে রাখা লেবু থেকে এক টুকরো লেবু চিপে অক্টোপাসের কিলবিল করতে থাকা চটচটে পায়ে মাখিয়ে আচমকা এক কামরে ছিড়ে চিবোতে শুরু করলো। আনাবিয়া তা দেখে নাক মুখ বিকৃত করে বলে উঠলো,
“ইয়্যুউউউ, ছিঃ মীরিইইই! ইয়াক, ফেলো ওগুলো মুখ থেকে!”
দ্রুত ভঙ্গিতে দুহাতে মীরের মুখগহ্বর থেকে অক্টোপাসের জীবন্ত পা গুলোকে বের করার উদ্দ্যেশ্যে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু করলো সে। কিন্তু মীর সশব্দে হেসে আনাবিয়ার আক্রমণ থেকে বাঁচার উদ্দ্যেশ্যে এঁকেবেঁকে এদিক ওদিক সরে গিয়ে বলল,

“আমি এগুলোই খাবো, এর কত স্বাদ তুমি জানো? জানতে চাইলে এদিকে আসো।”
মীর আচমকা মুখ বাড়িয়ে নিয়ে এলো আনাবিয়াকে কাঁচা অক্টোপাসের স্বাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে। আনাবিয়া লাফিয়ে সরে গেলো পেছন দিকে, বিকৃত মুখে বলে উঠলো,
“ইয়াক! কাছে আসবেনা আমার! বমি করে দিবো তোমার গায়ে আমি।”
মীর হাসলো শব্দ করে। আনাবিয়া গাল ফুলিয়ে মীরের থেকে দূরে সরে অপেক্ষা করতে রইলো তার খাবার তৈরি হওয়ার। মীর ফিচেল হেসে ওর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে আর একবার অক্টোপাসে কামড় দিয়ে কচকচ শব্দে খেতে শুরু করলো। গা গুলিয়ে উঠলো আনাবিয়ার, মীর ঝুঁকে এসে বলল,
“এবার তোমাকে একটা অক্টোপাসিও চুমু খাবো।”
মীরের কথা কর্ণগোচর হওয়া মাত্রই নিজ পাকস্থলীর মুহুর্মুহু বিদ্রোহে আনাবিয়া মুখচেপে ধরলো তৎক্ষনাৎ। সকালের সব খাবার বুঝি এখনি বেরিয়ে আসবে! মীর দ্রুতস্বরে বলে উঠলো,

“ওরে ওরে, খাচ্ছিনা খাচ্ছিনা!”
আনাবিয়া ধারালো চোখে তাকালো ওর দিকে। মীর ঠোঁট টিপে হেসে অন্য দিকে ফিরে অক্টোপাসের বাকি অংশটুকু শেষ করতে শুরু করলো।
আনাবিয়া নিজেকে কোনোভাবে সামলে নিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,
“জন্তু জানোয়ারের স্বভাব তোমার আর কখনো যাবে না!”
কিন্তু তাতে মীরের ভাবান্তর হলোনা, সে এরপর আনাবিয়াকে দেখিয়ে দেখিয়ে কয়েকটি কাঁচা চিংড়ি আর এক ঝাঁক নড়াচড়া করতে থাকা অয়েস্টার খেলো। আর তার এই অভাবনীয় স্বাদের খাবার খাওয়ার দৃশ্যে ক্ষণিক পর পর পাকস্থলীর মোচড়ামুচড়িতে অতিষ্ঠ হয়ে অবশেষে খাবার অর্ধেক খেয়ে স্টল থেকে উঠে বেরিয়ে পড়লো আনাবিয়া।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।
দুইহাতে দুইটা আইসক্রিম ধরে মেলার জনবহুল বিরাট মাঠের ভেতর দিয়ে হেটে চলেছে আনাবিয়া, ক্ষণিক পরপর হাতে ধরা আইস্ক্রিমে লেহন করে চলেছে। পেছনে মীরের হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ, চোখে যা-ই ভালো লেগেছে সেটাই ভ্যাগে ভরেছে আনাবিয়া। ক্রমে ক্রমে উচ্ছাস প্রস্ফুটিত হচ্ছে তার মুখাবয়বে। মীর তাই বাঁধা দিচ্ছে না আজ কোনো কিছুতেই। ফুড কার্ট থেকে কতশত আবোলতাবোল খাবার যে আজ মেয়েটার পেটে গেছে ভেবেই মীরের মাথায় কাজ করছেনা, নির্ঘাত আজ পেটের ব্যামো বাঁধাবে। শুধু রাত হওয়াটাই বাকি।
“এবার ফিরতে হবে শিনু। অনেক আজেবাজে খেয়েছো, এখুনি তোমার পেটে ব্যাথা শুরু হবে। যা খেয়েছো তাতে তোমার পেটও ভরবেনা, ভালো কিছু খাবে চলো।”

“উহুম, ম্যালা পেট ভরেছে আমার। আমি আরও কিছুক্ষণ থাকবো।”
“রাত হয়ে গেছে, এখন ভিড় বাড়বে। অনেক ঘুরেছো, এবার ফিরবে চলো।”
কিন্তু আনাবিয়া মীরের কোনো কথায় পাত্তা না দিয়ে এগিয়ে চলল সামনের দিকে। মীর নিজেও এগোতে নিলো ওর পেছন দিকে, তখনি ওর চোখ পড়লো মেলার বিরাট মাঠের মধ্যিখানে অবস্থিত জায়ান্ট হুইল টার দিকে। বৌদ্যুতিক নাগরদোলাটির বিরাট চাকার মধ্যিখানের মূল স্টিলের শ্যাফটে ক্রমশ চিড় ধরতে শুরু করল একটু একটু করে।
মীর থমকাল ক্ষণিকের জন্য, উদ্বিগ্ন চোখে চকিতে একবার খুঁজল আনাবিয়াকে, ভীড়ের ভেতর মিশে গেছে সে। আবারও ফিরে তাকাল চিড় ধরা অংশটার দিকে। ফাটল ক্রমশ বাড়ছে তার। মীর আচমকা অস্থির, কর্কশ গলায় উচ্চস্বরে ডেকে উঠল

“শিনজো!”
গমগমে কোলাহলের ভেতর তার রুক্ষ, কঠিন কন্ঠ যেন বজ্রনিনাদের মতন শোনাল! ভীড়ের একাংশ চমকে উঠে তাকাল তার দীর্ঘ শরীরের পানে। মীর অশান্ত হয়ে উঠল তৎক্ষনাৎ, দুঃসহ শঙ্কার ত্রাসে তাড়িত হয়ে দৃঢ় হাতে ভিড় ঠেলে ছুটল আনাবিয়ার উদ্দ্যেশ্যে! দ্বিতীয় বার ডেকে উঠল,
“শিনজো!”
সেই মুহুর্তেই ধাতব কটকট শব্দে সচকিত হয়ে উঠল মেলায় উপস্থিত প্রতিটি প্রাণ, চমকে তাকাল তারা হুইলটির দিকে। নাগরদোলার মধ্যিখানের স্টিলের বিরাট ফাটলটি দেখা মাত্রই আচমকা ত্রাসে সকলে শুরু করল চিৎকার, সাথে এলোপাথাড়ি ছোটাছুটি! শুধু সর্বশক্তি দিয়ে ভীড় ঠেলে, স্রোতের বিপরীতে ছুটতে রইল মীর, চোখে তার প্রবল শঙ্কা, উৎকন্ঠা!

মরিচা ধরা পুরোনো লোহাগুলো আর সইতে পারলনা ভার! মুহূর্তের মধ্যে বিশাল চাকাটি এক অদ্ভুত ধাতব গোঙানি দিয়ে কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হয়ে হেলে পড়তে শুরু করল একদিকে। কাঁচের কেবিন গুলো থেকে তৎক্ষনাৎ ভেসে আসলো আর্তচিৎকার! আতঙ্কিত হয়ে কেবিনের ভেতরেই এক প্রকার ছোটাছুটি শুরু করল তারা!
প্রবল চাপে লোহার বিমগুলো একে অপরের সাথে ঘষা খেয়ে ছড়াতে শুরু করল আগুনের ফুলকি। লোকজন ভয়ে আতঙ্কে চিৎকার করে দৌড়াতে শুরু করল দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে! মীর কিছুদূর ছুটে যেতেই দেখতে পেল আনাবিয়া স্থীর দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে হুইলের একটি কেবিন ভর্তি কিন্ডারগার্টেনের বাচ্চাদের দিকে, ভয়ে আতঙ্কে অশান্ত হয়ে চিৎকার করে কাঁদছে তারা!
“শিনজো! সরে এসো ওখান থেকে!”

চিৎকার করে বলল মীর। কিন্তু মীরের কন্ঠ কান অবধি পৌছোলনা তার, পা জোড়া নড়লোনা এতটুকু। সেই মুহুর্তেই বিকট শব্দে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লো সম্পুর্ন চাকাটি! আঁতকে উঠলো মীর, তৎক্ষনাৎ ঝড়োবেগে ছুটে গিয়ে নিজের বুকের মাঝে সজোরে আগলে নিল আনাবিয়াকে, পরমুহূর্তেই হুইলটি সম্পুর্ন আছড়ে পড়ল মীরের ওপর!
আনাবিয়া আচমকা নিজেকে মীরের বুকে আবিষ্কার করে হুশ ফিরে পেল, বিরাট চাকাটিকে নিজেদের ওপর পড়তে দেখা মাত্রই চোখ খিচে বন্ধ করে নিল সে! প্রচন্ড শঙ্কায় হৃৎপিণ্ড লাফালাফি শুরু করল দ্রুতগতিতে! দুহাতে শক্ত করে আকড়ে ধরল সে মীরের বলিষ্ঠ শরীরখানা।
পেরোলো কয়েক সেকেন্ড….

এখনো শরীরে কোনো আঘাতের চাপ অনুভূতি না পেয়ে ঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে ধীরলয়ে চোখ মেলল সে, মীরের প্রচন্ড চাপে শক্ত হওয়া যাওয়া চোয়াল, লাল হয়ে যাওয়া মুখমন্ডল চোখে পড়লো তার। তীক্ষ্ণ, স্বর্ণাভ চোখ জোড়া এখনো আনাবিয়াতেই নিবদ্ধ। এক হাতে সে অবিচল ভাবে ঠেকিয়ে আছে হুইলটি, পড়তে দেয়নি মাটিতে! দানবীয় শক্তির প্রয়োগে হুইল ধরে রাখা হাতটি কেঁপে চলেছে থরথরিয়ে, শিরা উপশিরা গুলো যেন ফেটে যাওয়ার উপক্রম!
হুইলের কেবিন গুলো অক্ষত, বাচ্চাগুলো সব উলটে পড়েছে কেবিনের নিচের দিকে। ভয়ে তারস্বরে চিৎকার করে কেঁদে চলেছে তারা। মাঠে দাঁড়ান মানুষগুলোর কেউ কেউ ছুটে আসছে হুইলের দিকে, বাকিরা অবাক বিস্ময়ে চেয়ে আছে হুইল আকঁড়ে ধরে রাখা ব্যাক্তিটির দিকে।

মীরকে অক্ষত দেখে আনাবিয়া স্বস্তির শ্বাস ফেলল, চোখ জোড়া বন্ধ করে প্রশান্ত ভঙ্গিতে মীরের কপালে কপাল ঠেকাল সে, পরক্ষণেই হাত বাড়িয়ে দিল মাটির দিকে। মুহুর্তেই তার হাতের ইশারা অনুসরণে মাটি ফুড়ে বেরিয়ে এল কাঁটাযুক্ত বিশালাকার একঝাঁক লতানো ডালপালা। হুইলটিকে তৎক্ষনাৎ লতানো ডালগুলোর সাহায্যে সোজা করল সে। ডালগুলো মাটিতে ঠেকিয়ে রাখল হুইলটিকে।
হাত থেকে ভার সরতেই প্রচন্ড পরিশ্রমে বিধ্বস্ত মীর আনাবিয়ার ওপর সম্পুর্ন ছেড়ে দিল তার শরীরের ভার। আনাবিয়ার হঠাৎ ভালো লাগল প্রচন্ড, দুহাতে সে অতি আদরে আগলে নিল মীরকে। হঠাৎ কি মনে হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সে মাঠের পানে৷

একদল ছোটাছুটি করছে হুইলের কেবিনে থাকা লোকজনকে উদ্ধারে। অন্যরা এখনো তাকিয়ে ওদের দুজনের দিকে। বিস্ময়, কৌতুহল, ভয় সব মিলিয়ে তাদের নাজেহাল চাহনিতে আনাবিয়ার বড়ই লজ্জা লাগল। মীরের বলিষ্ঠ পিঠে কয়েকটা চাপড় দিয়ে সে বলে উঠলো,
“এই উঠো, সরো, দেখছে সবাই৷ তাড়াতাড়ি উঠো!”
মীর সরলোনা, আরও যেন জেঁকে ধরল৷ আনাবিয়া বিপদে পড়ল, দ্রুতস্বরে বলে উঠল,
“দেখি, তোমার হাত দেখি!”
হুইল ধরা হাতটিকে টেনে স্পর্শ করতেই অস্ফুটস্বরে আর্তনাদ করে উঠল মীর। দ্রুত মীরকে নিজের ওপর থেকে জোরজবরদস্তি ঠেলে সরিয়ে দিয়ে কোলে টেনে নিল ওর হাত। মীরের মুখে বেদনা স্পষ্ট হলো তাতে।
মনোযোগী চোখে হাতখানা পরখ করে আনাবিয়া শঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“নিশ্চিত ফ্রাকচার হয়েছে, হাড়ও ভাঙতে পারে! দেখ এ জায়গাটা কেমন উঁচু হয়ে আছে। আমাদের এখুনি হেকিমের কাছে যেতে হবে! জলদি উঠো।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮২

আনাবিয়া উঠে দাঁড়িয়ে টানাটানি শুরু করল ওর বাহু ধরে। মীর আলস্যের ভঙ্গিমায় উঠে দাঁড়াল ধীরে ধীরে, হুইলের আঘাত পিঠে এসে লেগেছে তার, টনটন করছে ব্যাথায়। পায়েও বাড়ি খেয়েছে সামান্য। আনাবিয়া মীরের শারীরিক অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে অবলম্বন দিতে এক হাতে জড়িয়ে নিলো তার কোমর। মীর ওর কাঁধে ভর দিয়ে আলগোছে নিজেকে মিশিয়ে নিলো ওর শরীরে সাথে। অতঃপর কদম বাড়িয়ে দুজনে সম্মুখে তাকাতেই চোখে পড়লো মেলায় উপস্থিত সকল মানুষের ভিড়ে। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র জনতা! পঞ্চদ্বীপের একচ্ছত্র অধিপতি আর তার একমাত্র বেগমের প্রতি কৃতজ্ঞতা, আনুগত্য, শ্রদ্ধায় নুয়ে আছে তাদের দৃষ্টি…..

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৪