বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৭ (২)
রানী আমিনা
দরজাটা আলগা হলো সামান্য। মীর তৃষ্ণার্ত চাতকের মতন ওই একফালি আলো-ছায়ার বুক চিরে তাকানোর চেষ্টা করলো ভেতরে, কিন্তু ব্যর্থ হল সে; আনাবিয়ার অবয়ব এতটুকুও ধরা দিলনা তার চোখে! সেই সামান্য ফাঁক গলিয়ে তখন ভেসে এলো আনাবিয়ার ধীর রিনরিনে কন্ঠস্বর,
“বলো।”
অদ্ভুত শীতল, শুষ্ক শোনাল তার কন্ঠ। মীরের বক্ষ পিঞ্জরে আচমকা এসে বাড়ি খেলো হিম শব্দটি, এক অদ্ভুত অন্যরকম অনুভূতি দখল করে নিল তার সমস্ত বক্ষ! যেন আনাবিয়ার মুখনিঃসৃত একটি মাত্র শব্দ কোনো ক্ষমতাধর অশরীরির ন্যায় অদৃশ্য হুমকি দিয়ে এক হিমস্রোত বইয়ে নিয়ে গেলো তার শিরদাঁড়া বেয়ে! আশ্চর্যজনক ভাবে আচমকা কেঁপে উঠলো মীর!
নিজ শরীরের এমন আকস্মিক, অদ্ভুত প্রতিক্রিয়ায় বিস্মিত হল সে, মন ডেকে বলল কোথাও কোনো জট পাকিয়েছে সে, কোথাও সে ভুল করেছে। কিন্তু আত্ম অহমিকায় মোড়ানো তার অতি উর্বর মস্তিষ্ক নারাজ হল মানতে; সে ভুল করতে পারেনা, তার হিসাব নিখুঁত!
দরজার ওই সামান্য আলগাটুকুকে ভরসা করে আচমকা সে কোনো বার্তা ছাড়াই সমুদ্রের বুকে দাপিয়ে বেড়ানো জেদি জলদস্যুটির ন্যায় ঢুকে যেতে চাইল কামরার ভেতর। আনাবিয়া দ্রুত হাতে দরজা ঠেলে আটকাল তাকে; দৃঢ়, ব্যাস্ত গলায় বলল,
“যা বলার বাইরে থেকেই বলো!”
“ভেতরে আসতে দিবেনা আমাকে?”
অস্থির, আকুতি পূর্ণ প্রশ্ন! আনাবিয়া আচমকা চুপ হয়ে গেল, এ প্রশ্নের উত্তর হঠাৎ খুঁজে পেলোনা। মীরের এক হাতের বজ্রমুষ্ঠি দিয়ে দরজার একাংশ ধরে রাখা, যেন আনাবিয়ার উত্তর শোনা মাত্রই এ দরজার অস্তিত্ব সে আর রাখবেনা! আনাবিয়া জোরে শ্বাস নিয়ে জোর বাড়ালো হাতের, কোনোভাবেই মীরকে সে ঢুকতে দিবেনা ভেতরে, জানতে দিবেনা তার মৃত্যুসম বিষাদে পরিণত হওয়া পরম আনন্দের, পরিতৃপ্তির সংবাদ! কিন্তু মীরের শক্তির সাথে পেরে ওঠা এ মুহুর্তে তার জন্য প্রচন্ড কষ্টকর। মীর দরজাটা আরেকটু আলগা করার চেষ্টায় শুধোলো,
“আমাকে দেখতে দিবেনা তোমাকে?”
আনাবিয়ার উত্তর দিতে ইচ্ছে হলনা এ প্রশ্নের। এই মুহুর্তে দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও যেন বেরিয়ে যেতে চাইছে শরীর থেকে! দেহে তার বিশ্রামের তীব্র চাহিদা, দুচোখ চাইছে ঘুম! হাঁফিয়ে ওঠার ভঙ্গিতে এক তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো আনাবিয়া। ওপাশ হতে উত্তর না পেয়ে মীর যেন এবার মরিয়া হয়ে উঠল! এত কাছে থেকেও শুধুমাত্র একটি কাষ্ঠনির্মিত দরজার ব্যবধানে আনাবিয়ার স্নিগ্ধ, মোলায়েম মুখশ্রী দেখতে না পাওয়ার, ছুঁতে না পারার তীব্র আক্রোশে উন্মত্তের মত অস্থির হয়ে উঠল সে! অশান্ত স্বরে বলল,
“শিনজো, আমি জানি তুমি রেগে আছো আমার ওপর। তোমাকে উপেক্ষা করে ওভাবে শিরো মিদোরি ছেড়ে যাওয়া আমার একদমই উচিত হয়নি, বাট আই ক্যান এক্সপ্লেইন! আমাকে একবার ভেতরে আসতে দাও, আমার অনেক কথা বলার আছে তোমাকে। প্লিজ!”
প্রতিটা শব্দোচ্চারণের সাথে সাথে দরজায় চাপ বাড়ালো সে, আনাবিয়ার পক্ষে এক পর্যায়ে কঠিন হয়ে পড়লো দরজা ঠেকিয়ে রাখা। আচমকা শক্তির ব্যাবহারে নিদারুণ পরাজয় স্বীকার করে দরজা ছেড়ে দিয়ে ঝড়ো বেগে ছুটে পালালো সে ক্লজেটের ভেতরে, ঢুকেই সশব্দে বন্ধ করে দিল দরজা! মীরের তৃষ্ণার্ত দৃষ্টি অনুসরণ করলো তার গতিপথ, দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে গেলো সে। ক্লজেটের বন্ধ দরজায় সজোরে করাঘাত করে সে কর্কশ স্বরে বলল,
“শিনজো, দরজা খোলো!
লিসেন, আমি তোমাকে না জানিয়ে গিয়েছি কারণ জানালে তুমি আমাকে যেতে দিতে চাইতেনা, বাট ইট ওয়াজ রিয়্যেলি রিয়্যেলি ইম্প’ট্যান্ট! আমি তোমাকে বলেছিলাম আমার সাথে যেতে, তুমি যেতে চাওনি। উল্টো জেদ ধরে বসে ছিলে। আ’ম সর্যি ফ’ হোয়াট আই ডিড, বাট কিছু কাজ আছে যেগুলো আমাকে ছাড়া হওয়া সম্ভব নয়, এগুলো তোমার বোঝা উচিত নয়কি শিনু?”
মীরের শ্বাস পড়তে রইলো ঘন, কিয়ৎক্ষণ দরজায় কান পেতে সে অনুমান করতে রইলো আনাবিয়ার গতিবিধি। সাড়াশব্দ না পেয়ে সে ক্ষণিক চুপ থেকে বন্ধ চোখে এক সুদীর্ঘ শ্বাস ফেলে নরম গলায় বলে উঠলো,
“আমাকে শুধু একটাবার সবটা এক্সপ্লেইন করতে দাও শিনু! সব শোনার পর তোমার আমাকে যে শাস্তি দিতে ইচ্ছে হয় দিও, আমি মাথা পেতে নিব। তবুও তুমি দরজাটা অন্তত খুলো, একটাবার দেখতে দাও তোমাকে! প্লিজ, শিনজো!”
“আমি তোমার সাথে এই মুহুর্তে দেখা করতে চাইনা, দেখা করার সময় হলে আমি নিজেই দেখা করব। আপাতত আমাকে একা ছেড়ে দিলে আমি খুশি হব।”
ভেতর হতে শান্ত, কাঁপা গলায় বলে উঠলো আনাবিয়া। মীর ক্লজেটের নব ধরে সজোরে ঝাঁকি দিয়ে রুক্ষ স্বরে বলে উঠল,
“শিনজো! তুমি বিগত দুমাসে আমার সাথে একটা শব্দ বলোনি। ফোনটা আছড়ে ভেঙেছ! ফিলোমেলা আর মহসিনকে দিয়ে কতবার আমি তোমাকে চেয়েছি তুমি সাড়া দাওনি শিনজো! একটা কথাও বলতে চাওনি তুমি আমার সাথে! মানছি আমি না বলে চলে গেছি, তুমি অভিমান করেছো আমার ওপর, সব ঠিক আছে। কিন্তু অভিমান ভাঙানোর সুযোগটুকু অন্তত রাখো! সব নিয়ে নিলে আমি কোথায় যাব বলো! দরজা একটু খুলো শিনজো, প্লিজ!”
আনাবিয়া খুললোনা দরজা, মীরের হাজার মিনতিতেও গললো না তার মন। অবশেষে নিরুপায় হয়ে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় ভারাক্রান্ত মনন মস্তকে বেরিয়ে এলো মীর৷ অতঃপর কোনোদিকে না চেয়ে বেরিয়ে পড়লো রেড জোনের উদ্দ্যেশ্যে।
“তোমার আম্মা এখন ভয়ানক রেগে আছে আমার ওপর, তার অভিমানের তোপে প্রাসাদে টেকা মুশকিল। আমার সাথে দেখা তো দূর, সামনেই আসতে চায়না! কি করা যায় বলোতো?”
সাদা রঙা বন্য অর্কিডের বাগানের এক কোণে থাকা ছোট্ট, প্রায় অদৃশ্যমান ঢিবিটির পাশে থাকা রেইনট্রির গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে বসে, ঢিবির অতলে শয্যাশায়ী ছোট্ট, অপরিপূর্ণ দেহটির উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলো মীর। অনামিকা আর মধ্যমার মিলনস্থলে ধরা একটি জ্বলন্ত সিগার।
নিরুত্তর, নিঃশব্দ রইলো ঢিবিটি। তাকে স্বল্পদিনের আশ্রয় দেওয়া মা কেন রাগ করেছে, আর কিভাবেই বা তার ক্রোধ প্রশমিত করা সম্ভব, এ বিষয়ে তার যে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই, কৌতুহলও নেই। এ জগৎ সংসার নিয়ে কোনো মাথাব্যথা নেই তার।
মীর ঠোঁট গোল করে উষ্ণ ধোঁয়া ছাড়লো প্রকৃতির শীতল বাতাসের মধ্যিখানে। সিগারেটের জ্বলন্ত অংশের দিকে একবার তাকিয়ে বলে উঠলো,
“বাবা তোমার কাছে বসে এসব ছাইপাঁশ খাচ্ছে ভেবে কষ্ট পেওনা, তোমার বাবার তুমি ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। তোমার বাবাকে সহজে কেউ গ্রহণ করেনা, তাকে অন্যদের অ্যাপ্রুভাল পেতে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। সেখানে তোমার আম্মার মতন সাগরের অতলে পাওয়া অমূল্য মুক্তের মন পেতে হলে একটু কষ্ট তো পেতেই হয়! নইলে তোমার আম্মার দাম থাকলো কই?”
রেড জোনে মৃদুমন্দ বাতাস বইতে শুরু করলো, হাতের সিগারেটটি পুড়তে পুড়তে নিভে গেলো একসময়। মীরের বাষ্পজমা দৃষ্টি আঁটকে রইলো পড়ন্ত বিকেলের রক্তিম আকাশে। দুচোখে বাষ্প ঘনীভূত হতে হতে আচমকা টুপ করে গড়িয়ে পড়লো এক ফোটা নোনা জল, বিদ্যুৎ বেগে সেটি মুছে ফেললো মীর। যেন নিজেকেও টের পেতে দিলনা তার বুক ফাটার সংবাদ।
ক্ষণিক পেরোনোর পরেই আচমকা ক্ষীণ দুলে উঠল শিরো মিদোরির মাটি। আকাশের দিকে চেয়ে থাকা মীর চমকালো তৎক্ষনাৎ! সতর্ক হয়ে চাইলো একবার চতুর্দিকে। এটা কি তার ভ্রম? নাকি শরীরের দুর্বলতার বার্তা?
কিন্তু তৎক্ষনাৎ তাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে এবার দ্বিগুণ বেগে দুলে উঠল মাটি! ঝটিতি উঠে দাঁড়াল মীর! না, এটা কোনোভাবেই ভূমিকম্প নয়! অন্য কোনো কিছু!
অকস্মাৎ পূর্ব দিক হতে ভেসে এলো এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণ আঁচড়ের শব্দ, যেন ধাতব শিকের আঙুলে ভর দিয়ে শক্ত মাটির বক্ষ ভেদ করে উঠে আসতে চাইছে কেউ! মীর হতবিহ্বলের ন্যায় ক্ষণিক প্রকৃতির এহেন কর্মকাণ্ড বোঝার চেষ্টা করে পরক্ষণেই তীব্র উৎকন্ঠা নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতন ঝড়ো বেগে ছুটে গেলো সেদিকে!
আচমকা বৈরি হয়ে উঠলো আবহাওয়া, আঁধারে ছেয়ে গেলো আকাশ, শো শো শব্দে ভীষণ ঝড়ো বাতাস ভেঙেচুরে বেরিয়ে যেতে রইলো রেড জোনের বিশাল গাছপালাকে দুমড়ে মুচড়ে! মটমট শব্দে শক্ত ডালপালা গুলো ভাঙতে রইলো প্রতিনিয়ত, মীর ভেঙে পড়া ডালগুলো থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে নিয়ে বিদ্যুৎ বেগে ছুটে এগুলো সামনে।
কিছু দূর যাওয়ার পরেই তার চোখে পড়লো ঘন আঁধারির ভেতর ছটফটিয়ে উঠে আগ্নেয়গিরির ন্যায় জ্বালাময়ী দ্যুতি ছড়িয়ে চলেছে লাইফট্রি! উন্মত্ত, অস্থির হয়ে যেন উঠে আসতে চাইছে শেকড় ছিড়ে! উদ্দাম বাতাসের শো শো শব্দ, বিরাট রেড উড গাছ গুলোর শুকনো ডালের মটমট শব্দের সাথে মিলে যেন জানান দিচ্ছে আসন্ন অশনির সংবাদ!
মীর প্রমাদ গুণলো! হতভম্ব চোখে লাইফট্রির এই সম্পুর্ন নতুন রূপ পর্যবেক্ষণ করতে সে হিসেব করতে রইলো গণ্ডগোলটা ঠিক কোথায় হয়েছে!
সেই মুহুর্তেই প্যান্টের পকেটে থাকা যান্ত্রিক বস্তুটা কেঁপে উঠলো সশব্দে। মীর সেটা বের করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো কোকোর ত্রাসে পরিপূর্ণ উদ্ভ্রান্ত কন্ঠস্বর,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি… ইয়োর ম্যাজেস্টি… কন্টেইনার গুলো খাদে রাখার সময় অ্যাক্সিডেন্টালি একটা কন্টেইনার ক্রেনের গ্রিপ থেকে মাটিতে পড়ে ভেঙে গেছে ইয়োর ম্যাজেস্টি! আশেপাশে থাকা লোকগুলো হঠাৎ মারাত্মক বমি করতে শুরু করেছে ইয়োর ম্যাজেস্টি! এক্সপার্টরা সবাই সেই এরিয়াতেই ছিল, তাদের কোনো রেসপন্স পাচ্ছিনা ইয়োর ম্যাজেস্টি! এখন আমরা কীভাবে কি করব, কিভাবে সামাল দিব বুঝতে পারছিনা ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
কোকোর কথাগুলো শোনা মাত্রই মীরের বুঝতে বাকি রইলো লাইফট্রির এমন অস্থির, অশান্ত হওয়ার কারণ! সেই মুহুর্তেই বিদ্যুৎ বেগে রেড জোন ছেড়ে বের হতে হতে সে কোকোর উদ্দ্যেশ্যে দৃঢ় স্বরে বলে উঠলো,
“কোকো, এখনি ওই এরিয়া ছেড়ে চলে যাও! আক্রান্তদের কাউকেই উদ্ধারের প্রয়োজন নেই, যারাই তোমার সাথে আছে তাদেরকে নিয়ে এই মুহুর্তেই নিরাপদ দুরত্বে চলে যাও, রেডিয়েশন এক্সপোজারের কাছাকাছি যারা ছিল তাদেরকে অবশ্যই আলাদা রাখো। আমি এখনি আসছি!”
কল রেখেই মীর ছুটতে ছুটতে আচমকা দুদিকে সজোরে ছড়িয়ে দিলো নিজের হাত দুখানা, তৎক্ষনাৎ কুচকুচে কালো রঙা আর্মরে মুড়ে গেলো তার সম্পুর্ন শরীর, তারপরেই হঠাৎ ঝড়ো গতিতে উড়াল দিল সে আকাশে, বিদ্যুৎ বেগে ছুটে চলল কিমালেবের উদ্দ্যেশ্যে!
ক্লান্ত আনাবিয়ার চোখ লেগে এসেছিল, ঘুমিয়ে ছিল সে নিজের বিছানায়। আচমকাই এক অদৃশ্য, শক্তিশালী সত্তা এসে যেন সজোরে ধাক্কা দিল তাকে! তৎক্ষনাৎ চোখ খুলে গেলো তার! হীরকখণ্ডের ন্যায় ঝলমলে চোখ জোড়া আজ পরিপূর্ণ হয়ে রইলো তীব্র উজ্জ্বল আলোকে! মুহুর্তেই যন্ত্রের ন্যায় উঠে পড়লো সে বিছানা থেকে, যেন দূর হতে কেউ অদৃশ্য সুতোয় নিয়ন্ত্রণ করছে তাকে! বিছানা থেকে নামালো সে তার ফোলা ফোলা মোলায়েম পা জোড়া, ভারী শরীর, ঢাউস পেট!
বা হাত খানা স্বাভাবিক নিয়মেই গিয়ে অবলম্বন দিল অতিকায় জঠরের নিচে। তারপরেই থপ থপ শব্দে পা ফেলে এগুলো দরজার দিকে। দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়েই নির্বিকার সত্তার ন্যায় এগিয়ে চলল সে বারান্দার মধ্যভাগ দিয়ে!
মহসিন আর ফিলোমেলা বাইরেই ছিল, পড়ন্ত বিকেলে অলস সময় পার করছিল দুজন। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল তাদের শেহজাদী আর হিজ ম্যাজেস্টির মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি, দুপুরের অনাকাঙ্ক্ষিত বাকবিতণ্ডা বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের উদ্বেগ! চাপা স্বরে আলোচনার মধ্যেই আচমকা আনাবিয়াকে প্রবল ভঙ্গিতে বাইরে বের হতে দেখেই থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে গেলো দুজনেই, পরক্ষণেই তাদের দৃষ্টি পড়লো আনাবিয়ার অত্যাধিক গর্ভবর্ধিত উদরের ওপর!
ভীষণ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চেয়ে রইলো দুজন! এমন অসম্ভব দৃশ্য যেন বিশ্বাস করতে চাইলনা তাদের দৃষ্টি। ভেবে পেলোনা কিভাবে কখন কি হল! কিভাবে এমন অমোঘ দৃশ্যমান সত্য তাদের থেকে এত সহজে লুকিয়ে ফেললেন শেহজাদী, বুঝতে পর্যন্ত দিলেননা!
বিস্ময় কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল ওদের, একে অপরের দিকে একবার চোখাচোখি করে মহসিনের ইশারা পেয়েই ফিলোমেলা তড়িঘড়ি পায়ে এগিয়ে গেলো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়ার চোখের অদ্ভুত দ্যুতি খেয়াল করে হঠাৎ ভড়কাল সে, প্রথমটায় কোনো কথাই বের হতে চাইলনা তার মুখ থেকে! ভয়, দ্বিধাভরে মহসিনের দিকে পিছু ফিরে তাকাল একবার, মহসিন অভয় দিতেই এগুলো সে,
“শেহ্-শেহজাদী, আ-আপনার কিছু প্র..”
বাক্যটা শেষ করতে পারলনা সে, তার আগেই যন্ত্রের ন্যায় আনাবিয়া সরিয়ে দিল তার পথের বাধা! তার মোলায়েম হাত আজ হয়ে উঠলো ইস্পাত কঠিন! এক ধাক্কায় ফিলোমেলা ছিটকে গিয়ে বাড়ি খেলো বারান্দার কিনার ঘেঁষে থাকা মার্বেল পাথরের বিশাল শুভ্র স্তম্ভে! তার শক্ত নখরের আঘাতে গভীর ক্ষত তৈরি করে ছড়ে গেলো ফিলোমেলার মোলায়েম মুখ, বক্ষ!
বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৭
মহসিন ভীষণ ভয়ে জড়বৎ দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ! আনাবিয়ার মনোযোগ আকর্ষণ করলোনা কোনো কিছুই, আর না কোনো আবেগ অনুভূতি ঠাঁই পেল তার বক্ষমাঝে! ইস্পাত কঠিন এক যান্ত্রিক সত্তার ন্যায় ভারী, শক্তিশালী পা ফেলে, রয়্যাল ফ্লোরের বন্ধ দরজা দৃড় হাতের এক শক্তিশালী আঘাতে ভেঙে সে বেরিয়ে গেলো বাইরে!
