Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৮

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৮
রানী আমিনা

সমুদ্রের বালুকাময় তীরে এসে দাঁড়ালো আনাবিয়া, ঝলসানো দ্যুতি পূর্ণ দৃষ্টি তার সূদুর কিমালেবের দিকে। সেদিকে চেয়ে থেকেই আচমকা ঝড়ো বেগে শূন্যে ভেসে উঠলো সে, কিন্তু পরক্ষণেই নিজের অতিকায় গর্ভের ভারে আছড়ে পড়লো আবার মাটিতে।
ঝলসানো দুচোখে স্ফিত গর্ভটিকে একবার অবলোকন করলো সে, পরক্ষণেই ডানহাত খানা মুষ্টিবদ্ধ করে আঘাত করলো নিজের বক্ষে, তৎক্ষনাৎ বক্ষ ভেদ করে বেরিয়ে এলো একটি শুভ্র, ক্ষুদ্র ধাতব বল সদৃশ বস্ত। পরমুহূর্তেই ক্ষুদ্র গোলকটি ক্রমশ প্রসারিত হয়ে ধাতব দেহত্রাণে মুড়ে দিয়ে রইলো তার সম্পুর্ন শরীর। কিন্তু আচমকা সেটি এসে বাঁধা প্রাপ্ত হলো তার বিশাল জঠরের নিকট! দেহত্রাণটি আবরণ দিতে ব্যর্থ হলো তার গর্ভকে।
বাধাপ্রাপ্ত হয়ে সেটি আবারও ফিরে চলল নিজের পূর্বের স্থানে! পুনরায় একটি ক্ষুদ্র গোলকে পরিপূর্ণ হয়ে অদৃশ্য হয়ে গেলো আনাবিয়ার বক্ষের নিকট৷ সবদিকে ব্যর্থ হয়ে বিদ্যুৎ ঝলকের ন্যায় সুতীব্র আলোকে আচ্ছাদিত দু’নয়নে আনাবিয়া চেয়ে রইল সমুদ্রের বিশাল নীল জলরাশির দিকে। সেদিকে চেয়ে থেকেই অকস্মাৎ তার কন্ঠ চিরে বেরিয়ে এলো এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণ, করুণ সুর!

সুরটি যেন বাতাস চিরে বিদ্যুৎ বেগে পৌছে গেলো শিরো মিদোরির আনাচে কানাচে, সমুদ্রের বিশাল জলরাশির প্রতিটা কণায়! ঢেউয়ে মিশে পৌঁছে গেলো সমুদ্রের অতল গভীরে। সেই করুণ লহরীর আকস্মিক আহবান অনুসরণ করে সমুদ্রের অতল হতে আচমকা ধেয়ে আসতে রইলো দানবাকার নীল তিমির ঝাঁক! তাদের সাঁতারের সজোর, দ্রুত বেগের কারণে অকস্মাৎ সমুদ্রের বুকে তৈরি হলো এক বিরাট ঢেউ! জলোচ্ছাসের ন্যায় ভয়াল রূপ নিয়ে বিরাট, সুউচ্চ ঢেউটি ছুটে আসতে রইলো শিরো মিদোরির দিকে!
তীব্র বেগে সাঁতরে এসে, বিরাট ঢেউ টিকে শিরো মিদোরির তীরে আছড়ে ফেলে, সেইফ জোনের অর্ধেকাংশ ভাসিয়ে নিয়ে তিমি গুলো এসে থামলো তীরের অদূরে, ভেসে উঠলো তাদের মাথা, গলা থেকে বেরিয়ে এলো সেই একই সুতীব্র, করুণ স্বর! মাথার ওপর থাকা নাসারন্ধ্রের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো পানির সজোর ঝাপটা।
আনাবিয়া নেমে পড়ল পানিতে, কিন্তু জলস্পর্শ করলনা তার মোলায়েম পা দুখানা, এক অদৃশ্য পরতের ওপর দিয়ে হেটে এগুলো সে তিমি গুলোর দিকে। দলের সর্ব প্রথমে থাকা দলপতির নিকট গিয়ে থামল সে, পরক্ষণেই উঠে পড়ল তার পিঠের ওপর। বসলনা, দাঁড়িয়ে রইল সে। তিমিটি তখুনি দলবল নিয়ে সজোরে সাঁতরে এগুলো সম্মুখে, কিমালেবের তীরে বহিরাগত মালবাহী জাহাজটির ধ্বংসাবশেষের উদ্দ্যেশ্যে!

ডার্ক ফরেস্টের কোনো এক রেড উড গাছের মধ্যভাগের ডালপালা জড়িয়ে তৈরি বেতের এক বিরাট বাসার ভেতর চেয়ারে বসে ছিল ফ্যালকন, সম্মুখে তার খুলে রাখা ল্যাপটপ। কানে ইয়ারপিস গুজে ল্যাপটপের স্ক্রিনে সে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে পঞ্চদ্বীপের সীমানা প্রাচীর৷
দলছুট সে এই মুহুর্তে, দলছুট আজ সকলেই, যে যার ব্যাক্তিগত জীবন নিয়ে ব্যাস্ত। গুছিয়ে উঠেছে সকলে, শুধু গুছিয়ে উঠতে পারেনি সে-ই। তার পরম শ্রদ্ধার, আদরের শেহজাদী, তার স্বঘোষিত আম্মা বর্তমানে নিজের ব্যাক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন নিয়ে ব্যাস্ত। ভাইয়েরা সকলে তাদের জীবনসঙ্গিনীর সাথে সংসার গড়তে ব্যাস্ত, তার একলা জীবনে এই খড়কুটোর বাসাটিই ভরসা৷
চাকরি ছাড়া সত্ত্বেও পুরোনো দিন গুলোকে এখনো পিছু ছাড়তে পারেনি সে, পঞ্চদ্বীপের সীমানা প্রাচিরে তাই এখনো সে খুঁজে চলে স্মৃতি, যেন মিষ্টি শৈশবটিকে এখনো টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা। সকাল থেকেই অভুক্ত, মন চাইলে খায়, না চাইলে না খায়। কেউ খবরদারি করতে আসেনা, কেউ ভাগ বসাতে আসেনা খাবারে, কেউ জোর করে খাওয়াতে আসেনা, আর না কেউ তাকেই খেয়ে ফেলার হুমকি দেয়!

নিরবতার ভেতর তার বুক চিরে বের হয়ে আসা দীর্ঘশ্বাস দূর সমুদ্রের তীরে আছড়ে পড়া ঢেউ এর মতন শোনালো৷ সেই মুহুর্তেই আচমকা সজোরে দুলে উঠলো মাটি! ফ্যালকন টাল সামলাতে না পেরে চেয়ার নিয়েই আছড়ে পড়লো কার্পেট বিছানো বেতের মেঝের ওপর! দ্রুতই নিজেকে সামলে নিয়ে টেবিলের পায়া ধরে বসে রইল কিছুক্ষণ।
কাঁপুনি থামতে উঠে দাঁড়াল সে তৎক্ষনাৎ, দ্রুত পায়ে বাইরে গিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে আসলো কোথাও কোনো ক্ষয় ক্ষতি হয়েছে কিনা, কারো আওয়াজ শোনা যাচ্ছে কিনা৷ কিন্তু কিছুই নজরে বাঁধলো না তার। বাধার কথাও নয়, সে এখন অনেক অনেক দূরে, এদিকে অন্যান্য প্রাণীরা আসেনা বললেই চলে।
কিছুক্ষণ বাহিরে দাঁড়িয়ে থেকে ফ্যালকন ঢুকলো আবার বাসার ভেতর, সেই মুহুর্তেই তার নজর পড়লো স্ক্রিনের ওপর। সমুদ্রের এক বিশাল ঢেউ ধেয়ে আসছে শিরো মিদোরির দিকে!
প্রমাদ গুণলো সে, সাইরেনের শব্দ শুনছেনা এখনো, তবে কি কেউ এখনো টের পায়নি? না পাওয়ারই কথা, সবাই হয়তো এই ভূমিকম্পের ব্যাপারটা নিয়েই ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, তাকে বের হতে হবে এখুনি!
অবিলম্বে বাসা ছাড়লো ফ্যালকন, বাইরে বেরিয়েই নিজের পেরিগ্রিণ রূপে পরিবর্তিত হয়ে তীব্র বেগে উড়াল দিল আকাশে, সুতীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে উঠে সতর্ক করে চলল রেড জোনের সকল প্রাণীকে।
তার তীক্ষ্ণ ডাকে বের হয়ে এলো তার স্বজাতীরা, তার দেখাদেখি অন্যেরাও ছুটে চলল রেড জোনের আকাশ জুড়ে, সতর্ক করে চলল সকলকে।

আকাশে উড়াল দিতে দিতে ফ্যালকনের চোখে পড়লো দূর সমুদ্রে সাপের মতন ফণা তুলে ধেয়ে আসতে থাকা ঢেউটিকে, সমুদ্র পৃষ্ঠ হতে প্রায় ত্রিশ ফুট উচ্চতার ঢেউটি ছুটে আসছে সবেগে। ফ্যালকন দেরি করলনা আর, আকাশ ছেড়ে সে নেমে এলো নিচে, গাছপালার ভেতর দিয়ে উড়ে চলল মসভেইলের দিকে। তার জানামতে লিও লিন্ডা অন্যদের সাথে এদিকেই আছে।
সুতীক্ষ্ণ স্বরে ডেকে সে এসে দাঁড়ালো মসভেইলের সামনে, মাটি স্পর্শ করতেই ফিরে এলো আবার পূর্বের রূপে। দেখলো লিও চিন্তিত মুখে পর্যবেক্ষণ করে চলেছে চতুর্দিকের পরিবেশ, হঠাৎই নিরিব হয়ে গেছে সব। লিন্ডা নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে লিওর পিঠ ঘেঁষে।
ফ্যালকন নেমেই ওদের দিকে এক প্রকার ছুটে এসে শঙ্কিত স্বরে বলে উঠলো,
“লিও ভাইজান, খুব সম্ভবত সুনামি আসতে চলেছে, সমুদ্রে বিশাল ঢেউ উঠতে দেখে এসেছি মাত্রই, আমাদের এদিকের সবাইকে ডার্ক ফরেস্টের দিকে নিয়ে যাওয়া জরুরি৷”

লিও সুনামির কথা শুনে আতঙ্কিত হলো, চকিতে একবার দেখে নিল লিন্ডার স্বল্প স্ফিত তলপেটটিকে। লিন্ডা আরও গা ঘেঁষে দাঁড়াল তার। লিও তাকে আগলে নিয়ে ফ্যালকনের উদ্দ্যেশ্যে বলল,
“দেমিয়ান প্রাসাদ আমাদেরকে যথেষ্ট সেইফটি দিবে ফ্যালকন, তাছাড়া রেড জোনের ইনভিজিবল লেয়ার ভেদ করে সুনামি এ পর্যন্ত আসতে পারবে বলে মনে হয়না। ”
ক্ষণিক বিরতি দিয়ে লিও আবার বলল,
“তবুও…. আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরি৷ তুই সবাইকে জানিয়ে দিয়ে আবার ফিরে আয় এখুনি, কাঞ্জি জোভি আর ওকামি জঙ্গলের পশ্চিম দিকে গেছে, ওদেরকে এখুনি এখানে এসে পৌছতে বলবি। কোকো ভাই এখন আর জঙ্গলে নেই, শেহজাদী কোথায় আছেন জানিনা, প্রাসাদে থাকলে এতক্ষণে তিনি রেড জোনে চলে আসতেন। তাই আমাদের নিরাপত্তার ব্যাবস্থা আমাদেরকেই করতে হবে৷ আলফাদ আর হাইনা অ্যানিম্যাল টাউনে আছে, ওদেরকে সেখানেই থাকতে বলবি, সবাইকে নিয়ে। আমরা এগিয়ে দেখি কোথায় কি হচ্ছে৷”
লিও তখুনি তার প্রানীরূপে পরিবর্তিত হয়ে ছুটে এগুলো সেইফ জোনের দিকে, লিন্ডা ওর পেছন পেছন ছুটে লাফিয়ে উঠে পড়ল ওর পিঠের ওপর, লিন্ডাকে নিয়েই সবেগে ছুটে চলল সে রেড জোন ত্যাগের উদ্দ্যেশ্যে।

কোকো দাঁড়িয়ে ভেঙে যাওয়া কন্টেইনার হতে কয়েক মাইল দূরে, সাথে তার সেনাবাহিনীর একাংশ। বাকি সবাইকেই সে বিশেষ এসকর্টের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছে চিকিৎসা নিতে। কোনোভাবে শরীরে রেডিয়েশন রয়ে গেলে তার প্রভাব খুবই খারাপ ভাবে পড়বে!
তারাও ভুলবসত রেডিয়েশনের সংস্পর্শে চলে এসেছে, কিন্তু এমন জটিল সময়ে শুধুমাত্র নিজের স্বার্থ ভেবে সব ছেড়ে চলে যাওয়া তাকে কোনোভাবেই শোভা পায়না। এক্সপোজার এরিয়াতে তার অধস্তন কর্মকর্তা কর্মচারীদের অনেকেই পড়ে আছে, জ্ঞানহারা। তার সাধ্য নেই লোকগুলোকে উদ্ধারের। প্রয়োজনীয় ইকুইপমেন্ট গুলোও এক্সপোজার এরিয়ার ভেতরেই রয়ে গেছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিষ্পাপ লোকগুলোকে মরণ যন্ত্রণা সহ্য করতে দেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই তার কাছে।

সেই মুহুর্তেই আকাশ ফুড়ে বিদ্যুৎ বেগে এসে মাটিতে আছড়ে পড়লো মীর, সরাসরি এক্সপোজার জোনেই নেমে পড়লো সে৷ চতুরদিকে এক ক্ষীণ বেগুনি আভা দৃষ্টি গোচর হলো তার, গামারশ্মি বেশ মারাত্মক ভাবেই ছড়িয়েছে এদিকে। মীর একবার কোকোদের অবস্থানের দিকে দৃষ্টি দিয়ে পরক্ষণেই এগিয়ে গেলো মাটিতে অজ্ঞানে, অর্ধজ্ঞানে পড়ে থাকা লোকগুলোর দিকে। দুহাতে তাদের সবাইকে তুলে টেনে নিয়ে এক্সপোজার এরিয়ার বাইরে রেখে এলো সে। কোকোকে ইশারায় বলে দিলো এক্সপার্ট টিম খবর দিয়ে এখুনি এদের চিকিৎসার ব্যাবস্থা করতে৷
কোকো কাজে লেগে পড়লো তখুনি, তার কাছে রেডিয়েশন প্রতিরোধী পোশাক নেই, সবই এক্সপোজার এরিয়াতে পড়ে আছে, ভেতরে ঢোকা অসম্ভব! কাজেই অপেক্ষা করতে হবে এক্সপার্ট টিমের আগমনের।

মীর জানেনা এই রেডিয়েশন তার শরীরে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা, তার ইমিয়্যুন সিস্টেম এই গামারশ্মি কে প্রতিহত করার সক্ষমতা রাখে কিনা। কিন্তু এই মুহুর্তে কিছুই করার নেই তার! দ্রুত হাতে ক্রেনের নিচে মাটিতে পড়ে থাকা বিরাট ভাঙাচোরা কন্টেইনারটাকে তুলে নিয়ে সে ফেলে দিল পাহাড়ের নিচে খোঁড়া বিরাট খাদে।
হঠাৎই আকাশ থেকে ধুপ ধাপ শব্দে পড়তে শুরু করলো কিছু। মীর কন্টেইনার গুলো মাটিচাপা দিতে ব্যাস্ত হয়ে পড়েছিল, শব্দ শুনে পেছনে তাকাতেই দেখল কয়েকটি পাখি পড়ে আছে সেখানে, অসাঁড়! ক্ষণে ক্ষণে কেঁপে উঠছে তাদের ডানা, পা। ক্ষণিক পরেই থেমে গেলো অবশিষ্ট কম্পন টুকু, নিভে গেলো প্রাণের শেষ স্পন্দন!
মীর বিস্মিত হয়ে তাকাল আকাশ পানে! রেডিয়েশন যে ওপরেও পৌঁছে যাবে সেটা তার ঘূর্ণাক্ষরেও স্মরণে আসেনি। চোখের সামনেই আরও কয়েকটি ছোট পাখি এসে আছড়ে পড়লো মাটিতে! মীর শঙ্কিত হল, এই এরিয়া আকাশ পথসহ সিলগালা করবে কিভাবে ভেবে পেলোনা।

সেই মুহুর্তেই তার দৃষ্টি গেলো সমুদ্রের দিকে। অদূরেই সাদা ফেনা ওয়ালা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। ছুটে গেলো সে সেদিকে। পানিতে কয়েক কদম এগোনোর পরই দেখলো পানির ওপর ভেসে উঠেছে মৃত মাছের ঝাক! জলজ প্রাণী গুলো অসাড়, মৃতুপ্রায় হয়ে কোনোরকমে নিজেদের শেষ শ্বাস টুকু ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে!
প্রমাদ গুণলো মীর! এগুলো সে কিভাবে কি করবে? এই অপূরণীয় ক্ষতি সে কিভাবে সমাধান করবে! লাইফট্রি তবে একারণেই উন্মাদ প্রায় হয়ে গেছে! একারণেই সে উঠে আসতে চাইছে মাটি ছেড়ে! মানুষের জন্য এই এরিয়াতে প্রবেশ নিশেধ করলেও অবলা প্রানী গুলোকে সে কিভাবে বোঝাবে? কিভাবে আটকাবে?
কপাল চুলকালো মীর, চতুর্দিকে অসহায়ের মতন তাকাতে রইলো কোনো সমাধান পাওয়ার আশায়! শিনজোকে জানাবে? কিন্তু কিভাবে জানাবে? মেয়েটা নিজেই ভালো নেই, এসব সে কখন করবে? এই রেডিয়েশনে তার যে কোনো ক্ষতি হবেনা তার কি নিশ্চয়তা? যা যায় তার ওপর দিয়েই যাক, তার শিনজোর ওপর দিয়ে না যাক! কোনোভাবেই না!

কিন্তু এখন সে কি করবে? কিভাবে এই সমস্যার সমাধান করবে? রেডিয়েশন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে, আরও বিস্তার ঘটবে এর, তখন তো সমস্যা ভয়াবহ আকারে দেখা দিবে! তখন কি করবে সে?
বিস্তৃত সমুদ্র পাড়ে একা দাঁড়িয়ে রইলো মীর, ক্ষণিক পর বালুকাময় তীরে বসে পড়লো ধীরে ধীরে। বসে বসেই চিন্তা করতে রইলো কি করবে সে! কিভাবে আঁটকাবে রেডিয়েশনের এই সবেগ বিস্তৃতি! কিভাবে সুরক্ষা দিবে তার সকল প্রজাদের, হোক তা একটি ছোট্ট পিপড়া!
কোকো দূর থেকে চেয়ে ছিল তার দিকে, দাঁড়ান থেকে বসে যেতে দেখে সে চিৎকার করে বলে উঠল,
“ইয়োর ম্যাজেস্টি, দয়া করে ওখান থেকে বেরিয়ে আসুন! আপনার শরীরের ক্ষতি হবে, ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
মীর যেন শুনতে পেলনা তার কথা, দৃষ্টি তার আঁটকে রইল সমুদ্রের বুকে ভেসে ওঠা মাছেদের সাদা পেটের দিকে। চোখে মুখে তার লেগে রইলো নিদারুণ শঙ্কার ছাপ!

অকস্মাৎ নিজের ডান দিক থেকে এক অদ্ভুত শব্দ ভেসে আসতে শুনলো সে। কৌতুহল নিয়ে তাকাতেই চোখে পড়লো এক সুউচ্চ ঢেউ, সবেগে ধেয়ে আসছে এদিকেই!
বিস্ময় নিয়ে উঠে দাঁড়ালো মীর, এগিয়ে গেলো সেদিকে তৎক্ষনাৎ। কিছুদূর যেতেই আচমকা তার দৃষ্টি আটকালো ঢেউয়ের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা আনাবিয়ার ওপর! পরমুহূর্তেই তার নজর পড়লো আনাবিয়ার পেটে!
হতভম্ব, অবিশ্বাস্য চোখে সে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার ফাঁপা জঠরের দিকে, চরম বিস্ময়ে ঠোঁট জোড়া আলগা হয়ে এলো তার সামান্য! স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো সে ক্ষণিক, সম্মুখের দৃশ্যটা প্রক্রিয়াকরণ করতে সময় নিল তার মস্তিষ্ক!

ঢেউটি এসে স্তিমিত হল তীরে, আনাবিয়া ধীর পায়ে নেমে এলো তিমির মাথার ওপর থেকে, অতঃপর এগিয়ে চলল সামনে! চিকচিকে বালুতে টেনে চলল তার রাজকীয় মোলায়েম গাউনের নিম্নাংশ। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো সে মীরের দিকে। মীরের বিস্ফোরিত দৃষ্টি তখনো আটকে আনাবিয়ার স্ফিত গর্ভের ওপর! এই অকল্পনীয়, অসম্ভব দৃশ্যটি অবলোকন করে ক্ষণিকের জন্য যেন বাকহারা হল সে!
আনাবিয়া এগিয়ে এলো তার দিকে আরও, কাছাকাছি এলো তার, একদমই নিকটে, আর তারপরেই পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। তাকিয়ে দেখলনা পর্যন্ত তাকে!
মীর হুশে ফিরলো এতক্ষণে! তাকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া আনাবিয়ার পেছনে ছুটলো সে, পেছন থেকে দুহাতে আটকে নিয়ে অস্থির, ব্যাস্ত স্বরে বলে উঠলো,
“এখুনি এখান থেকে বেরোবে চলো, তোমাকে কোনোভাবেই আর সামনে যেতে দেবনা আমি! আমাকে কেন বলোনি? আমাকে কেন জানাওনি শিনজো? কেন আমাকে এমন এক সংবাদ থেকে বঞ্চিত করেছ? জবাব চাই আমার! ফিরে চলো, সামনে যেওনা!”
আনাবিয়াকে টেনে আনতে চাইলো সে পেছনে। কিন্তু একচুল নড়লোনা সে, উপরন্তু মীরকে নিয়েই এগিয়ে চলল সে সামনে। নিজের জায়গা থেকে ক্রমশ সামনের দিকে সরে যেতে থাকা মীর বিস্মিত হলো, পরক্ষণেই সে জোরালো করলো নিজের আলিঙ্গন। শঙ্কিত, বিপর্যস্ত স্বরে বলে উঠলো,

“প্লিজ ফিরে চলো শিনু, এগোতে দেবনা তোমাকে আমি। এদিকে তাকাও, আমার দিকে তাকাও! এর কোনো সমাধান বের করব আমরা দুজনে মিলে, কোনো ভাবে ঠিক করে ফেলবো সব! দয়া করে ওদিকে যেওনা তুমি, কথা শুনো আমার!”
যন্ত্রের ন্যায় আনাবিয়া বারংবার বাধাপ্রাপ্ত হয়ে আচমকা ক্ষিপ্ত হয়ে হিংস্র বাঘিনীর ন্যায় ফিরে তাকালো পেছনে! তৎক্ষনাৎ মীরের চোখ পড়লো আনাবিয়ার ঝলসানো চোখের ওপর! হতচকিত হয়ে বিস্মিত, উদ্বিগ্ন চোখে সে দেখতে রইল আনাবিয়ার সুতপ্ত তারকার ন্যায় উজ্জ্বল চোখজোড়া।
কিন্তু সেই মুহুর্তেই আনাবিয়া আচমকা গর্জে উঠে এক হাতে ক্ষিপ্র বেগে চেপে ধরলো মীরের বলিষ্ঠ গলা! দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সমস্ত ক্রোধটুকু সে ঢেলে দিতে রইলো নিজের বজ্রমুষ্ঠিতে! অচিরেই মীর টের পেলো শ্বাস আঁটকে আসছে তার, ক্রমশ ভূমি হতে উপরে উঠে যাচ্ছে সে! মাটি নেই তার পায়ের তলায়!

হতচকিত, অবিশ্বাস্য নয়নে সে চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে! আনাবিয়ার তারা বিহীন ঝলসানো চোখে খুঁজে পেলোনা সে কোনো অনুভূতি, না পেলো সেই চির পরিচিত সুশীতল, স্নিগ্ধ দৃষ্টি! বদ্ধ কন্ঠে হিংস্র সিংহীর ন্যায় চাপা সুরে গর্জে উঠে অকস্মাৎ মীরকে ছুড়ে ফেলে দিল সে, মীর সজোরে ছিটকে পড়লো মাটিতে!
আবারও এগোলো সে সামনের দিকে, যেদিকে ভেঙে পড়েছিলো কন্টেইনারটি। মীর উঠে পড়লো তৎক্ষনাৎ, ছুটে গিয়ে সজোরে টেনে ধরলো সে আনাবিয়াকে, গায়ের সর্বোচ্চ জোর দিয়ে সে ফিরিয়ে আনতে চাইলো আনাবিয়াকে; ব্যাকুল, বিপর্যস্ত স্বরে বলে উঠলো,

“শিনজো ফিরে চলো, আমি জানি তুমি এ মুহুর্তে নিজের ভেতরে নেই! প্লিজ ফিরে আসো আবার শিনজো, ফিরে চলো আমার সাথে! আমি কোনোভাবেই যেতে দেবোনা তোমাকে ওদিকে! ফিরে চলো আমার সাথে, আমরা কোনো সমাধান বের করবো শিনু! যা করার আমি করব, তোমাকে এ অবস্থায় আমি কোনোভাবেই সামনে যেতে দিবোনা!”
আনাবিয়ার পা চলতে রইলো, কিন্তু পেছনের কৃষ্ণকায় ব্যাক্তিটির সজোর বাধায় একই স্থানে বারংবার পা ফেলে চলল সে, এগোতে সক্ষম হলনা কোনো ভাবেই! মীর শক্তিতে পেরে উঠতে হিমসিম খেতে রইলো, কোনোভাবেই আনাবিয়াকে সরিয়ে নিতে পারলো না তার স্থান থেকে! অতিকায় স্ফিত গর্ভে যেন সামান্য আঘাতও না পায়, ভুলবসত এতটুকু চাপও যেন না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে ভালো ভাবে আনাবিয়াকে জড়িয়ে রাখতে বারংবার ব্যর্থ হল সে! তবুও চেষ্টা করে গেলো সর্বোচ্চ!
আনাবিয়া থেমে গেলো আচমকা! মীর তবুও সজোরে চেপে ধরে রইলো ওকে নিজের সাথে, যেন ধোঁকা দিয়ে শিনজো তার আলিঙ্গন ভেদ করে এগিয়ে না চলে যায়!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৭ (২)

আনাবিয়া এগিয়ে গেলোনা, কিন্তু ঘুরে তাকালো পেছনে, মীরের ঠিক মুখোমুখি! আর তারপরেই হঠাৎ তীব্র আক্রোশে গর্জে উঠে নিজের বজ্রমুষ্ঠি দিয়ে মীরের চোয়াল বরাবর ক্ষিপ্র বেগে এক শক্ত আঘাত বসিয়ে দিল সে! মীরের মুখখানা সবেগে ঘুরে গেলো বা দিকে! ঠোঁট কেঁটে মুহুর্তেই বেরিয়ে এলো মেরুণ রঙা তরল।
এরপর মীর কিছু বুঝে ওঠার আগেই মীরের ঘাড় বাবরি ঝাকড়া চুলগুলোকে নিজের মুঠোবন্দি করে টানতে টানতে নিয়ে চলল সে এক্সপোজার এরিয়ার বাইরে!

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৮৯

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here