Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫ (২)

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫ (২)
রানী আমিনা

স্যালুনের দরজায় গিয়ে দাঁড়াতেই দুজনে দেখতে পেলো, দুহাতে রক্তাক্ত মাথা আঁকড়ে ধরে প্রচন্ড যন্ত্রণায় আর্তনাদ করে চলেছে সাইয়্যিদ, ওর পাশেই হাতে একটা রক্তমাখা ভাঙা কাঁচের বোতল নিয়ে কিংকর্তব্যবিমুঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ফিরাস! গর্জে উঠল মীর,
“ফিরাস!”
ফিরাস তৎক্ষণাৎ হাত থেকে ফেলে দিলো বোতলটা। ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে অপরাধী চোখে তাকালো একবার বাবার দিকে। কিন্তু বাবার বিধ্বংসী দৃষ্টি চোখে পড়া মাত্রই ডুকরে কেঁদে ফেললো সে৷
আনাবিয়া ছুটে গিয়ে ধরলো সাইয়্যিদকে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে জখম থেকে! শিউরে উঠলো ও, এক হাতে রক্তাক্ত মাথা চেপে ধরে দ্রুত পায়ে নিয়ে এলো বাইরে, আলোতে ধরে দেখলো কোনো কাঁচের টুকরো ক্ষতস্থানে ঢুকে আছে কিনা। পরক্ষণেই ওকে বুকে চেপে ধরে বিপর্যস্ত স্বরে বলে উঠলো,

“কাঁদে না বাবা, এখুনি সব ঠিক হয়ে যাবে!”
সাইয়্যিদ প্রচন্ড ব্যাথায় কুকড়ে গিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে রইলো ওর বুক পরে, দুহাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রইলো আনাবিয়াকে। আনাবিয়া নিজের পূর্বের স্থানে বসে সাইয়্যিদের ক্ষতস্থানে হাত চেপে ধরে শুরু করলো ওর হ্যিলিং সং। মীর ক্রোধ চেপে রাখার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে অস্থির ভঙ্গিতে পায়চারি শুরু করলো ডেকের ওপর।
বাচ্চাগুলো চুপসে গেছে ভয়ে, স্যালুনের ভেতর গুটিসুটি মেরে বসে আছে সবাই। ফিরাস বাবার ভয়ে দৌড়ে কোথায় গিয়ে লুকিয়ে পড়েছে, তাকে খুঁজে পাচ্ছেনা ওরা৷
আনাবিয়ার কন্ঠস্বরের জাদুতে ক্ষণিক পরেই সুস্থ হয়ে উঠলো সাইয়্যিদ, তবুও যন্ত্রণার রেশ রয়ে গেলো তার শরীরে। আনাবিয়াকে জড়িয়ে ধরে ফোঁপাতে রইলো সে৷ আনাবিয়া মীরের দিকে দেখলো একবার, ক্রোধ দমাতে চেয়ারে এসে বসেছে সে, চোয়াল শক্ত করে চেয়ে আছে সমুদ্রের দিকে।
উঠলো আনাবিয়া, সাইয়্যিদকে নিয়ে দাঁড়ালো মীরের সামনে। মীর চোখ তুলে তাকালে নিমিষেই দূরীভূত হলো ক্রোধ, স্বাভাবিক হয়ে এলো চোয়াল, পরক্ষণেই হতাশ দেখালো ওকে।
সাইয়্যিদকে মীরের কোলে রেখে আনাবিয়া স্যালুনের দিকে এগোলো। ভেতরে গিয়ে গুটিয়ে বসে থাকা বাচ্চাদের উদ্দ্যেশ্যে নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“কোথায় সে?”
মিশআল হাতের ইশারায় দেখিয়ে দিলো, আনাবিয়া এগুলো ওর দেখানো স্থানে। ছোট খাটো শোকেসটার পেছনের অন্ধকারে চুপসে দাঁড়িয়ে ফিরাস, চোখে মুখে ভয়৷ আনাবিয়া উঁকি দিলো, ফিরাস চুপসে গেলো আরও৷ ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে আনাবিয়া হাটু গেড়ে বসলো ওর সামনে৷ ডাকলো,
“ফিরাস!”
ফিরাস গুটিয়ে গেলো৷ আনাবিয়া এক হাতে নিজের কাছে টেনে নিলো ওকে, আগলে নিয়ে বলে উঠলো,
“কাজ টা কি ঠিক হয়েছে?”
“আমার ভুল হয়ে গেছে আম্মা! আমি সত্যিই বুঝতে পারিনি এত জোরে লেগে যাবে!”
ভীতসন্ত্রস্ত স্বরে বলল ফিরাস। আনাবিয়া মোলায়েম স্বরে বলল,
“সাইয়্যিদ তোমাদের ভাই, বাবা! আর কখনো ওকে আঘাত করবে না। আমি কি বলেছি তোমাদের, সবাই মিলেমিশে থাকবে। তবে কেন তুমি এমন করলে বলো তো! তোমার বাবা অনেক রেগে আছেন।”
“আমি আর কখনো এমন করবো না আম্মা!”
কান্না রোধ করা স্বরে বলে উঠলো ফিরাস৷ আনাবিয়া বুকে টেনে নিলো ওকে। ফিরাস মা কে আঁকড়ে ধরে নিচু স্বরে বলল,

“কিন্তু ও আপনাকে কেন আম্মা ডাকবে? আপনি তো আমাদের আম্মা! ও কেন ডাকবে আপনাকে?”
আনাবিয়া হাসলো, বলল,
“তোমার কি এখন ভয় হচ্ছে ফিরাস? বাবার বকার ভয়?”
“হু!”
“তুমি বাবার বকা খাওয়ার ভয় কমাতে আমাকে জড়িয়ে ধরে আছো, সাইয়্যিদের কি এমন কেউ আছে বলো? তুমি সে বার জ্বরে পড়লে সারারাত আমার কোলের ভেতর ঘুমিয়েছিলে, যেতে চাওনি, মনে আছে?”
“হু।”
“সাইয়্যিদের জ্বরের সময় সে কি কারো কোলের ভেতর ঘুমোতে পেরেছিলো?”
“না।”
মায়ের বুকের ভেতর আরও চেপে গিয়ে বলল ফিরাস। আনাবিয়া আঙুল চালালো ওর চুলের ভেতর, মোলায়েম স্বরে বলল,
“আমি তো সারাজীবন তোমাদের আম্মাই থাকবো। সাইয়্যিদ আমাকে আম্মা ডাকলে কি আমি ওর সত্যিকারের আম্মা হয়ে যাবো বলো?”
“উহু!”

“তবে এভাবে মন খারাপ কোরো না, বাবা। সাইয়্যিদের তোমাদের মত আম্মা নেই, ওর অনেক খারাপ লাগে। আমাকে আম্মা ডাকলে যদি ওর ভালো লাগে তবে আমরা ডাকতে দিবো, দিবো না?”
“হু, কিন্তু কম।”
আনাবিয়া হেসে উঠলো। সশব্দে চুমু খেলো ফিরাসের মাথায়। বলল,
“বাবার মতো হিংসুটে হয়েছো৷ এখন চলো, সাইয়্যিদকে সরি বলবে।”
ফিরাস গুটিয়ে গেলো, ভীত গলায় বলে উঠলো,
“বাবা যদি আমাকে বকা দেন!”
“কিচ্ছু বলবেনা বাবা৷ তুমি সাইয়্যিদকে গিয়ে সরি বলবে, আর বলবে এমনটা আর কখনো করবে না। ঠিক আছে?”
“হু।”
আনাবিয়া মিষ্টি হেসে ওকে নিয়ে বাইরে এলো৷ বাবার গম্ভীর মুখ দেখা মাত্রই ফিরাস মায়ের পেছনে লুকিয়ে পড়লো, মায়ের গাউনের অংশ মুঠিতে ধরে গুটি গুটি পায়ে এগোলো পেছন পেছন। আনাবিয়া দাঁড়াতেই ফিরাস একটু একটু করে আড়াল থেকে সামনে এলো। বাবার দিকে তাকানোর সাহস হলোনা, সাইয়্যিদের দিকে এক পলক তাকিয়ে আবার নামিয়ে নিলো চোখ, একটা শুকনো ঢোক গিলে বলে উঠলো,
“সরি, সাইয়্যিদ, এমনটা আর কখনো হবে না।”
সাইয়্যিদ বাবার দিকে তাকালো, মীরের ইশারা পেতেই কোল থেকে নেমে এলো সে, ঝরঝরে স্বরে বলল,
“ঠিক আছে, আমি একদম রাগ করে নেই।”
উজ্জ্বল হলো ফিরাসের মুখমণ্ডল, আনাবিয়া পাশ থেকে বলে উঠলো,
“ভাইকে জড়িয়ে ধরো ফিরাস।”

ফিরাস এগোনোর আগেই এগিয়ে এলো সাইয়্যিদ, বুকে বুক মিলিয়ে কোলাকুলি করলো দুজন৷ আনাবিয়া ঠোঁট চেপে হেসে তাকালো মীরের দিকে, মীর চেয়ে আছে ছেলেদের দিকে, চোখে সন্তুষ্টি। বলে উঠলো,
“যাও, ভাইদের সাথে খেলো এবার। আর কোনো দুর্ঘটনা ঘটাবেনা। এবার কিছু হলে কিন্তু পাঁচজনকেই আর্মি চিফের কাছে রেখে আসবো৷”
দানবাকৃতির আর্মি চিফের কথা স্বরণে আসতেই নিভে গেলো দুজনেই৷ গুটিগুটি পায়ে হাত ধরাধরি করে ছুটে গেলো স্যালুনের ভেতর৷ ওরা চোখের আড়াল হতেই মীর বলে উঠলো,
“ফিরাস তোমার মত হয়েছে। ছোট বেলায় তুমিও মেজাজ ধরে রাখতে পারতে না, যাকে তাকে মেরে দিতে৷”
“আগেই ভালো ছিলাম। এখন আমি শান্ত হয়ে গেছি বলে সবাই সুযোগ নেয়৷”
বলল আনাবিয়া, চেয়ে রইলো দূর সমুদ্র থেকে ভেসে আসা উঁচু ঢেউটির দিকে৷ মীর দেখলো ওকে কিছুক্ষণ, অষ্টাদশী আনাবিয়া আর শতবর্ষী আনাবিয়ার ভেতর অনেক তফাৎ। অষ্টাদশী আনাবিয়ার ভ্রু জোড়া সর্বক্ষণ কুচকে থাকতো ক্রোধে, বিরক্তিতে৷ সকলকেই তুচ্ছ মনে হতো তার নিকট, কাউকে নিজের কামরা পর্যন্ত আসতে দিত না, এমনই শুচিবায়ু ছিলো তার! এখন সে শান্ত, স্নিগ্ধ, নির্মল; ঠিক আকাশের রূপোলী চাঁদটির মতো। মাতৃত্ব তাকে আরও শান্ত করে দিয়েছে৷ হয়তো তার শান্ত হওয়ার পেছনে মীরের ভূমিকাও চোখে পড়ার মতো।
মীর আচমকা আঁকড়ে ধরলো ওর হাত, টেনে এনে বসালো নিজের পাশে৷ আনাবিয়া বসেই বলে উঠলো,

“আমাকে ফিরতে হবে, ওরা আড়ালে থাকতেই আমি বেরিয়ে যাব। আর আগামীকাল থেকে পরবর্তী ছ’মাস আমার কারো সাথে যোগাযোগ থাকবে না, তুমি ওদের বুঝিয়ে বলবে আশা করি।”
“তুমি সত্যিই চলে যাবে?”
“আমি কি এতক্ষণ মজা করেছি বলে মনে হচ্ছে?
মীরের হাতের মুঠি থেকে হাত ছাড়িয়ে নিলো আনাবিয়া, মীর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে উঠলো,
“বাচ্চাদের কথা দিয়েছিলাম তুমি আজ রাতে আমাদের সাথেই থাকবে, আজকের রাতটা আমাদেরকে দাও শিনজো!”
“আমি পারবনা।”
“কেন?”
“তোমাকে চলে যেতে হবে।”
“আমি চলে গেলে ব্যাপারটা ভালো দেখাবে না, ওরা মন খারাপ করবে।”
“তবে দুঃখিত।”
“প্লিজ শিনজো! তুমি তো আগামী ছ’মাস ওদেরকে দেখবে না, আজকে রাতটা অন্তত ওদেরকে দাও, আমাকে দাও!”
“জোর কোরো না, মীর।”
“প্লিজ শিনজো! শুধু আজকের রাতটা থেকে যাও! প্লিজ!”
আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা, বলল,
“ঠিক আছে, তবে বাচ্চারা আমাদের মাঝখানে থাকবে, এর ব্যাতিক্রম হলেই আমি চলে যাব৷”
“ঠিক আছে, তুমি যা বলবে৷”

ফোরডেকের ওপর লম্বা বিছানা পাতানো হয়েছে। বাচ্চারা হৈচৈয়ের সাথে কাজে ব্যাস্ত। যে যার বালিশ নিয়ে হাজির হয়েছে, কে কোনটায় ঘুমোবে সেটা নিয়ে এক দফা ঝগড়াও হয়েছে ইতোমধ্যে। আনাবিয়া ওদের থামিয়ে পারেনা৷
মীর পাঞ্জাবি খুলে দিচ্ছে ওদের, ভারী পাঞ্জাবীতে অস্বস্তি হতে শুরু করেছে৷ ফিরাস আনাবিয়ার হাত ধরে টেনে এনে দেখিয়ে দিলো ওর বিছানা, বলল,
“আম্মা, আমি কিন্তু আপনার কাছে ঘুমোবো!”
“ঠিক আছে, ঘুমোবে। এখন শান্ত হয়ে শুয়ে পড়ো, আমি আসছি এখনি৷”
ওকে স্যালুনের দিকে এগোতে দেখে আরসালানের গা থেকে পাঞ্জাবি খুলতে থাকা মীর মাঝপথেই পাঞ্জাবি খোলা থামিয়ে এগোলো সেদিকে। আরসালান দুইহাত উঁচু করে আধা খোলা পাঞ্জাবি নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ, উপায়ন্তর না পেয়ে অবশেষে মিশআলের দারস্থ হলো। মিশআল আর কাসওয়ার মিলে টানা হ্যাচড়া করে খুলতে লেগে গেলো ওর পাঞ্জাবি।
আনাবিয়া ওয়ারড্রবে খুঁজে দেখতে রইলো রাতে ঘুমোনোর মতো আরামদায়ক পোশাক পাওয়া যায় কিনা। এদিক ওদিক খুঁজে মীরের একটা ফুল হাতা পাতলা সাদা শার্ট পেলো সে৷ বছর দশ আগেও মীরের গায়ের পোশাকগুলো শোভা পেতো ওর শরীরে। কতদিন সেগুলো ছুয়ে দেখেনি মনে পড়েনা ওর৷ শার্টটা কিছুক্ষণ হাতে ধরে রেখে দিলো আবার৷

“কি খুঁজছো?”
“তোমার জানতে হবে কেন?”
“জানতে পারিনা?”
“না।”
“কেন?”
“প্রাইভেসি।”
“এটা কবে থেকে আমদানি হলো?”
“অনেক আগে থেকেই, তুমি খেয়াল করার মতো ফুরসত পাওনি তাই চোখে পড়েনি।”
“তোমার জন্য ফুরসত পাইনি কথাটা বিশ্বাস যোগ্য নয়।”
“তোমার ফুরসত গুলো কাজে লাগানোর অনেক স্থান বর্তমান৷ সেগুলো আমার পেছনে খরচ না হোক।”
“বেশি বুঝছো আজকাল।”
“কম বুঝে সুবিধা কি হয়েছে?”
“কোনো কথাই মাটিতে পড়ছে না!”
“যেখানে আমিই মাটিতে পড়ে আছি সেখানে আমার কথা মাটিতে পড়লো কি পড়লোনা দেখার অবকাশ নেই।”
আনাবিয়া পরিধানের মত পেলোনা আর কিছুই, হতাশ হয়ে ওয়ারড্রবের শেষ স্লট টাও বন্ধ করলো। মীর বলে উঠলো,

“আমার শার্টে কি সমস্যা?”
“অনেক সমস্যা।”
“পূর্বে তো আমার শার্ট ছাড়া ঘুম আসতো না।”
“তখন তোমার শার্ট কলুষিত ছিলো না।”
“হুম, হয়েছে। এসো ঘুমোবে৷”
মীর বেরিয়ে এলো, আনাবিয়া ধীর পায়ে এলো ওর পেছনে। বাচ্চারা শুয়ে পড়েছে যে যার মতো। আনাবিয়ার ডানে ফিরাস, বামে কাসওয়ার আর মিশআল। একটু আগেই লটারি হয়েছে, দুজনের ভেতর কে মায়ের পাশে ঘুমোবে। মিশআল হেরেছে তাতে, মাকে দেখে মনটা আরও খারাপ হলো তার।
মায়ের পাশে ঘুমোনোর খুশিতে কাসওয়ার আটখানা হয়ে আছে। আনাবিয়া এসে ওদের মাঝে শুয়ে পড়তেই দুপাশ থেকে দুজনে জড়িয়ে নিলো তাকে। মিশআল চুপচাপ শুয়ে রইলো অন্যদিকে ফিরে। আনাবিয়া ডাকলো ওকে,

“মিশআল!”
“জ্বি আম্মা!”
নিদারুণ শোনালো তার স্বর। আনাবিয়া ভ্রু তুললো, বলল,
“আমার বুকের ওপর ঘুমোবে এসো।”
লাফিয়ে উঠলো মিশআল, কাসওয়ারকে ভেঙচি কেটে বুঝিয়ে দিলো লটারিতে হেরেও সে অনেক জিতে গেছে। প্রায় লাফিয়ে সে মায়ের বুকের ওপর এলো, অতি উচ্ছ্বাসে আঁকড়ে ধরলো দুহাতে। ফিরাসের নাকের পাটা ফুলে উঠলো রাগে, মিশআল কেন মায়ের বুকে ঘুমোতে পেলো সে কেন পেলোনা এই শোকে যেন সে এবার মূর্ছা যাবে!
নিজের পাশ থেকে মিশআলের হাত পা সরিয়ে দিয়ে তেজি স্বরে বলে উঠলো,
“এপাশে আসবেনা, এপাশ আমার!”
মিশআল ওর ক্রোধ সম্পর্কে ভালোভাবেই অবগত, একটু একটু করে সরে এসে ফিরাসের জায়গা খালি করে দিলো সে।
মীরের বুকের ওপর শুয়ে আরসালান, তার দুপাশে সাইয়্যিদ আর জিবরান। সাইয়্যিদের চোখ লেগে আসছে, বাবার বলিষ্ঠ বাহু জড়িয়ে ধরে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সে। জিবরান ফিরাস পাশাপাশি, ফিরাসের গায়ের ওপর পা তুলে দিচ্ছে সে। ফিরাস বিরক্ত হয়ে বার বার পা নামিয়ে দিচ্ছে ওর, কিন্তু জিবরান নাছোড়বান্দার মতো একই কাজ করে চলেছে। ফিরাস আনাবিয়ার কাছে আরও সরে গিয়ে নালিশের সুরে বলল,

“আম্মা! জিবরান আমার গায়ে পা তুলে দিচ্ছে। আমি ওর বড় ভাই, ও বেয়াদবি করছে না আম্মা বলুন?”
আনাবিয়া হাসলো, বলল,
“হু, তা তো অবশ্যই।”
ফিরাস মায়ের সমর্থন পেয়েই জিবরানের দিকে ফিরে চোখ পাকিয়ে বলল,
“অ্যাই আমার পা ধরে ক্ষমা চাও!”
সাথে নিজের একটা পা উচিঁয়ে ধরলো জিবরানের মুখের ওপর। জিবরান ভ্রুতে ভাজ ফেলে বলল,
“দইু মিনিটে তোমার কোনটা বেশি বড় হয়ে গেছে দেখাও দেখি! দেখাতে পারলে ক্ষমা চাইবো।”
“আমার মুখের সামনের একটা দাঁত তোমার দাঁতের থেকে বড়।”
“বিশ্বাস করিনা।”
“মেপে দেখো!”
দাঁত কিভাবে মাপে জিবরানের জানা নেই, তাই সে হার মেনে নিলো। ফিরাসের পায়ের আঙুলে নিজের তর্জনী ছুইয়ে বলে উঠলো,

“আমাকে ক্ষমা করে দাও।”
“হয়নি, পা ভালো করে ধরো৷ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ক্ষমা হয় নাকি?”
জিবরান বাবার দিকে ফিরলো, জিজ্ঞেস করলো,
“বাবা, ক্ষমা চাইতে গেলে পা ভালো করে ধরতে হয়? এমন করে ছুঁয়ে দিলে হবে না?”
স্পর্শের পরিমাণটুকু মীরের গায়ে নিজের তর্জনী ছুঁয়িয়ে দেখিয়ে দিলো জিবরান। মীর হাসি আঁটকে বলে উঠলো,
“হ্যাঁ, হয়ে যাবে।”
জিবরান বিজয়ীর ভঙ্গিতে ঘুরে তাকালো ফিরাসের দিকে৷ ফিরাস মুখ বেকিয়ে আনাবিয়ার গায়ে লেপ্টে ঘুমোনোর প্রস্তুতি নিল।

মধ্যরাত, ঘুম নেই আনাবিয়ার চোখে, চোখ জোড়া বন্ধ করে শুয়ে আছে সে। মিশআলকে নামিয়ে দিয়েছে ওর বিছানায়, হাত পা ছড়িয়ে ঘুমোচ্ছে সে এই মুহুর্তে৷
নড়াচড়া করতে অপারগ আনাবিয়া। দুপাশ হতে ফিরাস আর কাসওয়ার জড়িয়ে আছে তাকে, পাশ ফিরে ঘুমোনোর অবকাশ নেই।
ক্ষণিক পরেই টের পেলো ফিরাস সরে যাচ্ছে তার পাশ থেকে। চোখ মেলে তাকাতেই মীরের বলিষ্ঠ পিঠখানা নজরে এলো তার, ফিরাসকে অন্য পাশে শুইয়ে দিতে ব্যাস্ত। ও তাকাতেই মীর ঝটিতি ফিরলো এদিকে। আনাবিয়া তিরিক্ষি স্বরে কিছু বলতে নিবে তার আগেই মীর নিজের ঠোঁটে তর্জনী ছুইয়ে বলে উঠলো,
“শ্‌শ্‌শ্‌, কোনো কথা বোলো না, বাচ্চারা জেগে যাবে৷”
“তুমি এখানে কি করছো?”
“সে কৈফিয়ত তোমাকে দিব কেন?”

ডান ভ্রু উচিঁয়ে বলল মীর৷ আনাবিয়ার নাকের পাটা ফুলে উঠলো তাতে। মীরের দিকে পেছন ফিরে সে কাসওয়ারকে জড়িয়ে ঘুমোনোর চেষ্টা করলো। ক্ষণিক পরেই টের পেলো মীরের ইস্পাত দৃঢ় হাতখানা তার বাহুর নিচ গলিয়ে পেটে হানা দিচ্ছে। দাঁতে দাঁত চেপে কিছু বলতে নিবে তার আগেই হ্যাচকা টেনে ওকে নিজের বুকের ভেতর নিয়ে নিলো মীর, মুখ ডুবোলো গলায়।
কাসওয়ার আচমকা মায়ের আলিঙ্গন ছাড়া হয়ে নড়েচড়ে উঠলো। আনাবিয়া ছেলের ঘুম ভাঙানোর ভয় স্থির হয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ! মীর ওকে ওভাবেই জড়িয়ে রইলো, বুক ভরে ঘ্রাণ নিলো আনাবিয়ার গ্রীবাদেশের! আনাবিয়া চাপা স্বরে ক্রোধ মিশিয়ে বলে উঠলো,
“এসব ধান্দাবাজি ছেড়ে ভালো হয়ে যাও মীর!”
“কিসের ধান্দাবাজি?”
“তুমি কিসের ধান্দায় এসব করছো আমি বুঝতে পারছিনা?”
“তুমি ধান্দাবাজিও বুঝো?”
“না, কিভাবে বুঝবো? আমি তো দুধের শিশু!”
“তুমি আমার কাছে দুধের শিশুই, এইতো সেদিন তুমি প্যাম্পার্স পরবে না বলে বারান্দায় ছুটে বেড়াতে, আর আমাকে তোমার পেছন পেছন ছুটতে হতো।”

“আমাকে ছাড়ো।”
“উহুম।”
“মীর! তুমি কিন্তু কাজটা একদমই ভালো করছো না। বাচ্চারা আছে এখানে সরে যাও!”
“চুপ করে ঘুমোও।”
“আমি কখনোই তোমার বুকে ঘুমোবো না মীর! ছেড়ে দাও, ভালোয় ভালোয় বলছি। বাচ্চাদের ঘুম ভাঙাতে বাধ্য কোরো না।”
মীর উত্তরে বললনা কিছু, আনাবিয়ার গলায় মুখ গুজে পড়ে রইলো। আনাবিয়া নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো ওর আলিঙ্গন থেকে, কিন্তু মীরের শক্ত, পুরুষালি হাতের বাঁধন ছাড়ানো দুষ্কর হলো। তবুও হাল ছাড়লোনা সে। মীর অবশেষে বলে উঠলো,
“আমি তোমাকে ছাড়ছিনা, শুধু শুধু শক্তি ক্ষয় কোরো না।”
“তুমি কথা দিয়েছিলে তুমি আমার কাছে ঘুমোবেনা৷”
“এ কথা আমি একবারও দেইনি।”
“মীর!”
“বলো।”
“তুমি আসলেই একটা ধোঁকাবাজ।”
“কিছু করার নেই।”
আনাবিয়া তীব্র আক্রোশে নিশ্চুপ হয়ে গেলো। মীর নিরবে জড়িয়ে রইলো আনাবিয়াকে। ক্ষণিক পর নিরবতা ভেঙে মীর ডেকে উঠলো,

“শিনজো!”
“ডাকবেনা আমাকে ওই নামে!”
“তুমি আমাকে এভাবে একা ফেলে যেওনা। আমি থাকতে পারবনা তোমাকে ছাড়া৷”
“তুমি আমাকে ছাড়া অনেক ভালোই থাকো, গত দুবছর তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।”
“গত দু’বছরে এমন কোনো রাত যায়নি যে রাতে আমি শুধু তোমাকে দেখতে জঙ্গলে হানা দেইনি। রেড জোনের যে কোনো প্রানীকে তুমি জিজ্ঞেস করতে পারো, ওরা সাক্ষ্য দিবে। শুধু…. শুধু তুমি জানতে পারোনি!”
আনাবিয়া প্রতিউত্তরে বললনা কিছুই। সে জানে সব! মীরের আসা-যাওয়া, ওর ঘুমন্ত মুখের দিকে এক নাগাড়ে অপলক চেয়ে থাকা, শীতের দিনে গায়ের চাদর গুজে দেওয়া, প্রস্থানের পূর্বে ওর কপালে দেওয়া ছোট্ট, সতর্ক চুমু। মীরের উপস্থিতি টের পাওয়া মাত্রই ঘুমের ভান ধরে পড়ে থাকতো সে, যেন মীরের মুখোমুখি হওয়ার প্রয়োজন না হয়, যেন মীর তাকে প্রাসাদে ফেরার অনুরোধ করার সুযোগ না পায়!
মীরের ডাকে সম্বিত ফিরে পেলো সে,

“শিনজো!”
“বলো।”
কন্ঠস্বর পূর্বের চেয়ে কোমল শোনালো এবার। মীরের ঠোঁটের কোণে স্নিগ্ধ হাসি খেলে গেলো, আনাবিয়ার গলায় ঠোঁট স্পর্শ করে সে বলল,
“আমি অনেক অনেক ভালোবাসি তোমাকে, অনেক অনেক! তুমি কল্পনাও করতে পারবেনা আমি ঠিক কতটা ভালোবাসি তোমাকে! তুমি আমার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছো শিনজো, আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ্যের মতো! আমি তোমাকে ছাড়া একটা দিন কল্পনাও করতে পারিনা! তুমি আমার থেকে দূরে থাকবে এটা ভাবলেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে শিনজো!”
“চুপ থাকো।”

“আমি তোমাকে জেনে-না জেনে অনেক কষ্ট দিয়েছি, তোমার সাথে অনেক অন্যায় করেছি, অনেক অপরাধ করেছি, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় তোমাকে না জানিয়ে অনেক সিদ্ধান্ত একা নিয়েছি, এসবের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী শিনজো। আমি আসলে কখনো নিজের মনকে বিশ্বাস করাতে পারিনি যে তুমি এখন অনেক বড় হয়েছো, আমার মন এখনো তোমাকে সেই ছোট্ট শিনজো হিসেবেই দেখে যার আমার বুক ছাড়া ঘুম আসেনা, যে আমার হাতে ছাড়া খেতে পারেনা, যে আমাকে এক পলক না দেখলে অস্থির হয়ে পড়ে, যে আমি ব্যাতিত কারো পরোয়া করেনা, যার আমি ছাড়া অন্য কেউ নেই! এই আমি যে কারো একমাত্র অবলম্বন এ ব্যাপারটা আমার কাছে অনেক সুখকর শিনজো, অনেক অনেক তৃপ্তির। তুমি আমাকে ছাড়া অন্য কারো সাথে ভালো থাকবে, অন্য কারো জন্য চিন্তা করবে, অন্য কারো হাসির কারণ হবে এটা আমি কখনো ভাবতেই পারিনা শিনজো! তুমি আমাকে ছাড়াই ভালো থাকবে এটা আমার জন্য প্রচন্ড কষ্টদায়ক!”
“এ কারণেই তবে আমাকে যেতে দিচ্ছনা? আমি তোমাকে ছাড়াই ভালো থাকবো তাই?”
“কেন আমাকে ছাড়াই তুমি ভালো থাকবে? তুমি আমাকে ছাড়াই বা কেন থাকবে, বলো!”
“না জানার ভান কোরো না৷”
মীরের আলিঙ্গন দৃঢ় হলো, কন্ঠ ক্রমশ ভিজে এলো তার। আনাবিয়ার গ্রীবায় নিজের মুখখানা আরও গুজে দিয়ে সে বলল,

“এতটা নিষ্ঠুর হয়োনা শিনজো! প্লিজ থেকে যাও আমাদের কাছে, আমার কাছে! বাচ্চাদের দিকে দেখো একবার, ওরা তোমাকে কতটা ভালোবাসে! ওরা থাকতে চায়না তোমার থেকে দূরে, আমিও থাকতে চাইনা তোমার থেকে দূরে। কষ্ট হয় আমার, আমি ঘুমোতে পারিনা। দয়া করো শিনজো, এমন কঠিন হয়োনা।”
“চুপ থাকো মীর। আর একটাও কথা বলবে না।”
“আমাদের জীবনে এখন আর কোনো বাঁধা নেই শিনজো, আমরা অনেক ভালো আছি। আমাদের আর কোনো অপূর্ণতা নেই, এখন প্লিজ আমাকে ছেড়ে দূরে যেও না! আমি থাকতে পারবনা শিনজো!”
আনাবিয়া বললনা কিছুই। মীর ওর নিশ্চুপতা সহ্য করতে পারলোনা, সজোরে চেপে ধরলো ওকে নিজের বুকের সাথে, অধৈর্য, অস্থির, কাঁপা স্বরে বলে উঠলো,
“কথা বলো শিনজো! এমন কোরো না আমার সাথে, আমার ভুল ত্রুটি গুলো ক্ষমা করে আমার সাথে থেকে যাও! প্লিজ শিনু!”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫

আনাবিয়ার চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোটা লোনা পানি। বলে উঠলো,
“যে অনুরোধ রাখতে পারবনা সে অনুরোধ কোরো না।”
মীর দুহাতে সজোরে আঁকড়ে ধরে রইলো ওকে, শরীর কেঁপে উঠতে রইলো ওর ক্ষণে ক্ষণে। আনাবিয়া স্থির হয়ে লেপ্টে রইলো ওর বুকে।

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here