Home বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৬

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৬

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৬
রানী আমিনা

মেডিক্যাল জোনের রয়্যাল এরিয়াতে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে মীর। স্বাস্থ্য কমেছে সামান্য, তাতে চোয়ালের দৃঢ়তা স্পষ্ট হয়েছে আরও। লিও দাঁড়িয়ে তার পেছনে। অপেক্ষায় ওরা কারো। কিছু সময় পেরোতেই হাতে রিপোর্ট নিয়ে ভেতরে এলো ইয়াসির হেকিম। মীরের সামনে দাঁড়িয়ে লিওর দিকে তাকালো একবার। মীর চোখ না মেলেই বলে উঠলো,
“বলো, ইয়াসির।”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি….. আপনার পুরোনো অসুস্থতাটি আবার ফিরে এসেছে! আপনার মস্তিষ্কে আবারও পূর্বের সেই জালের মতো বস্তুটির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে৷ আপনার অত্যাধিক মাথা যন্ত্রণার এটাই কারণ। কিন্তু…এর কোনো চিকিৎসা আমার জানা নেই! আমি সর্বোচ্চ হয়তো সাময়িক ব্যাথা প্রশমনের জন্য মেডিসিন দিতে পারব, তার বেশি কিছু……!
অপরাধি গলায় বলল ইয়াসির, নত চোখে চেয়ে রইলো মেঝের দিকে৷ মীর উঠে দাঁড়ালো, কেবিন ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পা বাড়িয়ে বলে উঠলো,

“এ কথা যেন এই চার দেয়ালের বাইরে না যায়।”
পরক্ষণেই বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে। ইয়াসির লিওর নিকট এসে ইতস্তত, নিচু স্বরে বলল,
“লিও ভাইজান, হিজ ম্যাজেস্টির মস্তিষ্কের অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। স্পষ্টতই উনি মারাত্মক ডিপ্রেশনে আছেন, গতবারও অতিরিক্ত ডিপ্রেসড হওয়ার পরই তার এ রোগের সূচনা হয়েছিলো৷ আপনি যেকোনো ভাবে তাকে হাসি খুশি রাখার চেষ্টা করুন! নইলে কি হবে আমি নিজেও জানিনা।”
“আমাদের হাতে কিছুই নেই, ইয়াসির হেকিম। উনি কিসে খুশি থাকেন সেটা এই পঞ্চদ্বীপের কারো অজানা নয়৷ শেহজাদী লাপাত্তা আজ ছ’মাস হতে চলল, তার কোনো খোঁজ আমরা জানিনা! শেহজাদী ছাড়া অন্য কেউ তাঁকে খুশি রাখতে পারে কিনা আমার জানা নেই, ইয়াসির হেকিম! আপনি যথাসম্ভব চেষ্টা করুন এর কোনো রেমেডি খুজে বের করার, নইলে আমরা অনেক বিপদে পড়ে যাব!”
লিও বেরিয়ে গেলো তৎক্ষনাৎ। ইয়াসির হেকিম কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন সেখানেই৷
মীর ফিরে এলো কামরায়। টেবিলের ওপর হাতের স্পর্শ দিতেই সেখানে ভেসে উঠলো একটা স্বচ্ছ পর্দা৷ না, মীর কথা রাখেনি। সে আনাবিয়ার ওপর নজর রেখেছে, তাকে চোখের আড়াল করেনি। পর্দায় প্রতি মুহুর্তে আপডেট হচ্ছে আনাবিয়ার প্রতিটি পালস, প্রতিটি শ্বাস, প্রতিটি পদক্ষেপ, তার ব্লাড প্রেশার, তার এনজাইটি লেভেল, তার বলা সমস্ত কথা, তার যাওয়া সমস্ত জায়গা।

আনাবিয়ার প্রসব পরবর্তী অসুস্থতার সুযোগে খুবই সুক্ষ্মভাবে আনাবিয়ার শরীরে এক ট্র‍্যাকার লাগিয়েছিলো সে, যে সংবাদ সে ব্যাতিত আর কেউ জানেনা৷ কারো জানার প্রয়োজনও নেই৷
মীর অধীর আগ্রহভরে দেখে চলল স্বচ্ছ পর্দাটিকে। আনাবিয়ার তাকে প্রয়োজন হয়নি, আনাবিয়ার প্রাত্যহিক জীবন বিগত মাস গুলোতে বেশ স্বাভাবিকই চলেছে, কোথাও কোনো অসুবিধা পরিলক্ষিত হয়নি। সে অনেক ভালো আছে, সে মীরকে ছাড়াই ভালো আছে! মীর আজকের তারিখ দেখলো, ছ’মাস হতে মাত্র বাকি ৩ দিন! চোখ জ্বলে উঠলো মীরের, মানতে চাইলোনা তার মন, তার মস্তিষ্ক। তার শিনজো কিভাবে তাকে ছাড়া থাকতে পারে এবং এত স্বাভাবিক থাকতে পারে সে ঠাহর করতে পেলোনা! হতাশা গ্রাস করলো মুহুর্তেই, অবিশ্বাস ছাপানো চোখে ধীর পায়ে পিছিয়ে এলো সে, পরমুহূর্তেই ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলো বাইরে৷

আনাবিয়া দাঁড়িয়ে রয়্যাল ফ্লোরের প্রবেশ দ্বারের সামনে। বিগত ছ’মাসে সে একটি বারের জন্যও আসেনি প্রাসাদে, বাচ্চাদের সাথেও দেখা করেনি। যেখানে ইচ্ছে গেছে, নিজের মত থেকেছে, এবং ভালো ভাবেই থেকেছে৷ মীরের দেওয়া শর্ত পূরণ করে ফেলেছে, এবার মীরের প্রতিশ্রুতি রাখার পালা!
বুক ভরে শ্বাস নিয়ে, বিরাট দরজা ঠেলে রয়্যাল ফ্লোরে প্রবেশ করলো সে৷ রয়্যাল মেম্বার ইন্ডিকেটরে ধ্বনিত হলো তার নাম। বাচ্চারা মায়ের নাম শোনা মাত্রই সজোরে দরজা খুলে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এলো ওর কাছে। ফিরাস সবার আগে ছুটে এসে জাপটে ধরলো ওর উরুদ্বয়। ওর ওপরেই হুড়মুড়িয়ে এসে জড়িয়ে ধরলো তার অন্য ছেলে গুলো। এলোনা শুধু আরসালান। দরজায় দাঁড়িয়ে আনাবিয়াকে দেখলো সে একবার। আনাবিয়া মাথা তুলে তাকাতেই পেছন ফিরে আবার ঢুকে গেলো কামরায়৷ আনাবিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো একটা৷ বাচ্চাদের আদর করে, কিছুক্ষণ কথা বলে এলো মীরের কামরার সামনে৷ মহসিন দাঁড়িয়ে ছিলো দরজার নিকট, ওকে দেখে আনুগত্য জানিয়ে বলে উঠলো,

“শেহজাদী, হিজ ম্যাজেস্টি অপেক্ষা করছেন আপনার জন্য।”
দরজা খুলে দিলো সে, আনাবিয়া ঢুকলো ভেতরে। মীর বসে আছে ওর সিংহাসনে৷ টেবিলের ওপর ফাইলের ছড়াছড়ি, কোনো এক ফাইলে মনোযোগ আটকানো তার৷ আনাবিয়ার দিকে চোখ তুলে তাকাল না পর্যন্ত।
আনাবিয়া এগিয়ে গেলে বসতে বলল চেয়ারে৷ নজর গেলো তার মীরের ডান হাতের মুষ্টিতে, ব্যান্ডেজ জড়ানো৷ আড় চোখে ঘরের চতুর্দিক দেখলো সে, ফুলভিউ মিররটা পরিবর্তিত হয়েছে, নিচে এখনো ছড়িয়ে আছে ভাঙা কাঁচের কয়েকটি সুক্ষ্ম টুকরো। আনাবিয়া বসলে মীর দৃষ্টি না তুলে, কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলে উঠলো,
“তোমার চাহিদা বলো।”
আনাবিয়া বড় শ্বাস নিলো, গলা পরিষ্কার করে বলল,
“আমি আজ থেকে আমার পছন্দমত জীবন যাপন করবো, আমার যেখানে ভালো লাগবে সেখানে যাব, যার সাথে ভালো লাগবে বন্ধুত্ব করবো, যা খেতে ইচ্ছে করবে খাব, যা পরতে ইচ্ছে করবে পরবো৷ এগুলো নিয়ে তুমি কখনো কোনো অভিযোগ করতে পারবে না, এবং আমার ওপর তোমার কোনো ধরণের কর্তৃত্ব থাকবেনা। তোমার আর আমার সম্পর্ক কেবল কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আমি তোমার কোনো শারীরিক বা মানসিক চাহিদা মেটাতে পারবনা৷”
মীর শুনে গেলো, জিজ্ঞেস করলো,

“এনিথিং এলস্‌?”
“হ্যাঁ, আমি দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করতে চাই।”
মীরের দৃষ্টি থেমে গেলো, চোখ তুলে তাকালো সে এবার আনাবিয়ার দিকে৷ ওর জ্বলন্ত, শকুনি চোখ জোড়া আচমকাই এক অজানা, দুর্বার ভীতির উদ্রেক করলো আনাবিয়ার মনে। একটা শুকনো ঢোক গিলে সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করতে রইলো।
অকস্মাৎ উঠে দাঁড়ালো মীর, তারপরেই প্রায় ঝড়ের ন্যায় বেরিয়ে গেলো কামরা ছেড়ে। ফিরলো প্রায় ঘন্টা বাদে, হাতে এক গাদা ফাইল, সেগুলো সজোরে আছড়ে ফেললো টেবিলের ওপর!
কেঁপে উঠলো আনাবিয়া, মীরের অগোচরে চেয়ারের হাতল চেপে ধরলো শক্ত করে। ঢোক গিলতে রইলো বারবার। মীর হিমশীতল চোখে তাকালো ওর দিকে, আনাবিয়ার ভীতি এবার ফুটে উঠলো চোখে মুখে, সুক্ষ্ম কাঁপুনি ছড়িয়ে পড়লো সারা শরীরে৷ সেগুলোকে গোপন করার প্রাণপণ চেষ্টা করে চলল ও, কিন্তু ব্যর্থ হতে রইলো বার বার৷

“শিনজো।”
মীরের শীতল, গুরুগম্ভীর ডাকে চমকালো আনাবিয়া, ঢোক গিলে বলল,
“বলো।”
“তুমি সত্যিই আমাকে ছেড়ে যেতে চাও?”
“কাগজে কলমে তো আমি এখনো তোমার স্ত্রী, সারাজীবন তোমার স্ত্রীই থাকবো।”
“তোমাকে অনুরোধ করছি, এগুলো কোরো না। তোমাকে আমি কষ্ট দিয়েছি, তার বিপরীতে হাজার বার ক্ষমাও চেয়েছি। কিন্তু তুমি আমাকে ক্ষমা করোনি, বিপরীতে ঘৃণা করেছো, আর এখন দেমিয়ান পদবী পর্যন্ত ত্যাগ করতে চাইছো! এসব আমার প্রাপ্য নয় শিনজো। তুমি আর একটিবার আমার কথা ভাবো, বাচ্চাদের কথা ভাবো। আমরা কেউ তোমাকে ছেড়ে থাকতে পারবনা, সম্ভব নয়!”
“আমি আমার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।”
সাহস সঞ্চয় করে, কন্ঠ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল আনাবিয়া। সাথে যোগ করলো,
“তুমি বলেছিলে তুমি আমার সব সিদ্ধান্ত মেনে নেবে, কোনো অভিযোগ ছাড়াই।”
“তবে তোমার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত?”
“হ্যাঁ।”

মীর চেয়ে রইলো আনাবিয়ার দিকে। আনাবিয়া দৃষ্টি মেলাতে পারলোনা; ভীতি, অস্বস্তি ঘিরে ধরলো তাকে। মীর সদ্য নিয়ে আসা ফাইলগুলো নিজের সামনে টেনে নিয়ে খসখস শব্দে স্বাক্ষর করতে শুরু করলো। সব পেপার্স সাক্ষর শেষে আনাবিয়ার দিকে সেটা এগিয়ে দিয়ে বলল,
“ফ্রম নাও অন, ইউ আর জাস্ট আ কমোনার৷ কংগ্রাচুলেশনস।”
আনাবিয়ার ক্ষণিকের জন্য বিশ্বাস হলোনা ব্যাপারটা৷ ফাইলটির দিকে চেয়ে রইলো সে৷ মীর এরপর আরও কয়েকটি ফাইল তার দিকে ছুড়ে দিয়ে বলল,
“এখানে তোমার যাবতীয় সম্পদ এবং সম্পত্তির দলিল পত্র আছে। তিন দিন সময় দেওয়া হলো, রাজকোষাগারে তোমার যত অর্থ জমা আছে উইদড্র করে নিবে৷ নতুবা চতুর্থ দিনে তোমার নামে থাকা সমস্ত অর্থ রাজকোষাগারের নিজস্ব অর্থ হিসেবে বিবেচিত হবে৷”
আনাবিয়া হাত বাড়িয়ে সেগুলো টেনে নিতেই মীর বলে উঠলো,
“ইন দ্যা ফার্স্ট ফাইল ইউ হ্যাভ সাম রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন্স, সময় করে পড়ে নিবে আশা করি।”
“রুলস….? কিসের রুলস?”

“যেহেতু তুমি আমার সন্তানদের মা, তাই প্রতি ছ’মাসে একবার বাচ্চাদের সাথে দেখা করতে পারবে, বাট অনলি উইদ মাই পারমিশন৷ এ ছাড়া কোনো অবস্থাতেই তুমি তাদের সাথে দেখা করতে পারবেনা৷ অ্যান্ড অফকোর্স, অ্যাজ আ কমোনার, তুমি রয়্যাল ফ্লোরে প্রবেশ করতে পারবেনা৷ এবং প্রাসাদে প্রবেশ করতে হলে তোমাকে অবশ্যই প্রধান গার্ডের নিকট আবেদন করতে হবে৷ প্রাসাদে থাকা তোমার সমস্ত বিলংগিংস নিয়ে অবিলম্বে প্রাসাদ ত্যাগ করবে। ইউ হ্যাভ টু ডেইজ অনলি। এখন তুমি যেতে পারো। ইউ হ্যাভ গট ইয়্যোর লং চেরিসড ফ্রিডম।”
কথা শেষ করে মীর অন্য ফাইল গুলো টেনে নিলো নিজের সামনে। আনাবিয়া ক্ষণিক চেয়ে রইলো তার দিকে৷ তার সন্তানদের সাথে দেখা করতে অনুমতি নিতে হবে, সেটাও প্রতি ছ’মাসে ব্যাপারটা হজম হলোনা তার। রুক্ষ স্বরে বলে উঠলো,
“মীর—”
“ইয়োর ম্যাজেস্টি!”
ওকে থামিয়ে দিয়ে কঠিন স্বরে বলে উঠলো মীর৷ আনাবিয়া চমকালো তাতে। মীর আবারও শক্ত কন্ঠে বলল,
“কল মি ‘ইয়োর ম্যাজেস্টি’।”

“এসব কোন ধরণের রুলস? আমার বাচ্চাদের সাথে আমি কেন আমার ইচ্ছে মত দেখা করতে পারব না?”
“কজ, ইউ আর জাস্ট আ কমোনার, আর ওরা শেহজাদা। পার্থক্যটা তোমাকে নতুন করে বোঝাতে হবে বলে মনে করিনা৷ তুমি ওদের জন্মদাত্রী ব্যাতিত কিছুই নও। যদি তুমি খুব মমতাময়ী মা হতে, বা যদি তোমার সন্তানদেরকে চোখের আড়াল করতে অপারগ হতে তবে টাইমিংটা কমানোর ব্যাপারে ভেবে দেখতাম। কিন্তু তুমি তা নও।”
“আমি ওদের মা!”
“সেটা দেমিয়ান পদবী ত্যাগ করার পূর্বে ভাবা উচিত ছিলো৷ প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে দেমিয়ান রুলস গুলোতে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিবে। এখন তুমি যেতে পারো।”
শান্ত, দৃঢ় কন্ঠে কথাগুলো বলল মীর৷ আনাবিয়া ওর দিকে স্থির চেয়ে রইলো। ক্ষণিক পরেও ওর কোনো নড়াচড়া না দেখে মাথা তুলে তাকালো মীর। সিংহাসনে শরীর এলিয়ে বসে বলল,
“অফিসিয়ালি তুমি আর দেমিয়ান নও, তাই তোমার উচিত হবে নিজ উদ্যোগে এবং এখনি রয়্যাল ফ্লোর ত্যাগ করা। নইলে তোমার হয়ে গার্ডরা দায়িত্ব পালন করবে।”

“তুমি এগুলো ইচ্ছে করে করছো, তাইনা?”
“রুলস আর রুলস। তুমি এমন বিশেষ কেউ নও যে তোমার জন্য রুলস বদলাবে বা আলাদা করে তৈরি হবে। আর অবশ্যই জেনে থাকবে, হোয়াটেভার দ্যা কিং স্যেজ ইজ দ্যা রুলস। আমার আর একটি সেকেন্ড সময়ও তুমি নষ্ট করবেনা আশা করি৷”
“আমি এখনো তোমার স্ত্রী।”
“সেটা কাগজে কলমে৷”
“তোমার জন্য এ যাবৎকাল আমি যত কিছু করেছি তার প্রতিদান তুমি এভাবে দিচ্ছো?”
“একজন স্ত্রী হিসেবে তুমি কোন দায়িত্বটা পালন করেছো, আনাবিয়া ফারহা?”
মীরের মুখে নিজের নাম শুনে চমকালো আনাবিয়া। মীর ওর স্তম্ভিত চোখে চেয়ে বলে উঠলো,

“আমাদের বিয়ের পর থেকে তোমার প্রতি একজন স্বামীর দায়িত্ব কর্তব্য পালনে আমি কখনো গাফিলতি করেছি বলে মনে পড়েনা, যদি কালে ভদ্রে করেও থাকি তবে সেটা অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু তুমি…?
আচ্ছা বলো দেখি, লাস্ট কবে তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছো আমি কেমন আছি? লাস্ট কবে জিজ্ঞেস করেছো আমার শরীর ভালো আছে কিনা? কবে জিজ্ঞেস করেছো আমি কোনো চাপে আছি কিনা? আমি খেয়েছি কিনা? আমি ঘুমিয়েছি কিনা? আমি মানসিক দিক দিয়ে ভালো আছি কিনা, খুশি আছি কিনা? আমাকে নিয়ে শেষ কবে কনসার্ন হয়েছো তুমি? আমাকে বাদ দাও, আমার বাচ্চাদের নিয়ে তুমি শেষ কবে কনসার্ন হয়েছো? আমি ওদের বাবা হয়েও তোমার থেকে বেশি কনসার্ন। তুমি বহু বছর আগে আমাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিলে, আর এ কারণে তোমার কাছে আমি চির কৃতজ্ঞ। আমি তো সারাজীবনে তোমার জন্য কম করিনি, আনাবিয়া ফারহা! কিন্তু আমার একটি ভুলের জন্য আমার সব ভালোবাসা, সব আদর, সব যত্ন ভুলে যেতে তুমি দ্বিধা করোনি— কৃতজ্ঞতা দূরের ব্যাপার। সুতরাং স্বার্থ হাসিলে নিজেকে স্ত্রী দাবি কিরা থেকে বিরত থাকো। এখন তুমি যেতে পারো। জাস্ট গেট লস্ট!”
শেষোক্ত বাক্যটা বলেই মীর ব্যাস্ত হয়ে পড়লো তার কাজে। আনাবিয়া ধীর গতিতে উঠলো চেয়ার ছেড়ে, ফাইল গুলো হাতে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কামরা থেকে। ওর বের হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে মাথা তুললো মীর, চোখ জোড়া জ্বলতে শুরু করলো তার।

বারান্দায় আয়োজন করা হয়েছে রাতের খাবারের৷ মীর নিয়ম করে তিন বেলা তার ছেলেদের সাথে বসেই খায়। যেখানেই যাক খাবার সময় হলে ফিরে আসে৷ আরসালান বাবার পাশে বসে। অন্য ভাইদের সাথে লড়াই করে এই স্থান অর্জন করেছে সে, এটা তার নির্ধারিত। বাবার পাশে বসতে ভালো লাগে তার, বাবা যখন নিজের খাবার পাত্র থেকে তার পাত্রে পছন্দের খাবার গুলো তুলে দেয় তখন খুশি হয়ে যায় তার মন৷ কখনো কখনো বাবার পাত্রে সেও এটা সেটা তুলে দেয়, বাবার ঠোঁটের কোণে তখন ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ বাক। আরসালানের কাছে বাবার ওইটুকু স্মিত হাস্যও অনেক দুষ্প্রাপ্য!
কিন্তু বাবাকে আজকাল ভয় পায় ওরা। বাবার মুখাবয়বে স্নেহের স্থানে বর্তমানে হিংস্রতা, কাঠিন্যতা খুঁজে পায়। চোখের দিকে তাকানোর সাহস করেনা, কথা বলতে গেলেও গলাতে আটকে আসে৷
মীর বরাবরের মতো আজও নিজের পাত্র থেকে আরসালানের পাত্রে ওর পছন্দের খাবার তুলে দিলো। আরসালান তাকালো ওর দিকে এক পলক, চোখ জোড়া ছলছল তার। মীর কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলো,

“কি হয়েছে?”
“আম্মা আর প্রাসাদে আসবেন না?”
“না। সে এখন ব্যাস্ত অনেক, কখনো সময় পেলে তোমাদের সাথে দেখা করতে আসবে।৷”
মিশআল বাবার অন্য পাশ থেকে বলে উঠলো,
“বাবা, আরসালান আজ আম্মাকে কষ্ট দিয়েছে। ও আম্মার সাথে দেখা করেনি, আম্মাকে আদরও দেয়নি।”
মীর তাকালো আরসালানের দিকে, আরসালান নিচে তাকিয়ে গুটিসুটি হয়ে বসে রইলো। মীর কন্ঠে কিঞ্চিৎ কাঠিন্য এনে জিজ্ঞেস করলো,
“আমি যা শুনেছি তা সত্যি?”
আরসালান মাথা আরও নিচু করে নিলো। প্রায় অস্ফুটস্বরে বলল,
“আম্মা আমাদের একটুও ভালোবাসেন না, তাই আমি আম্মার সাথে দেখা করতে চাইনা।”
“আরসালান! এ পৃথিবীতে একজন সন্তানকে তার মায়ের চেয়ে কেউ বেশি ভালোবাসতে পারেনা, কখনো সম্ভব নয়। এরপর আর কখনো যেন তোমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আমি না শুনি। তোমাদের মায়ের সাথে ভুলবসতও কখনো বেয়াদবি করলে সেটা আমি বরদাস্ত করবো না, বোঝা গেছে?”
গুরুগম্ভীর স্বরে বলল মীর৷ আরসালান নুয়ে গেলো আরও। মীর গমগমে গলায় বলে উঠলো,
“এখন খাবার শেষ করো। দ্বিতীয় বার মায়ের সাথে দেখা হলেই তোমার এই বেয়াদবির জন্য তার কাছে ক্ষমা চাইবে৷”
“ঠিক আছে বাবা।”
অস্ফুট, কান্না জড়ানো স্বরে বলে উঠলো আরসালান৷ মীর ওকে দেখলো কিছুক্ষণ, অতঃপর মনোযোগ দিলো নিজের খাবারে৷

রাতে মীর আজ সময়ের আগেই বিছানায় এলো। মাথার সুক্ষ্ম, তীক্ষ্ণ যন্ত্রণা টা ফিরে আসছে ক্ষণে ক্ষণে, কাগজ পত্র গুলোতে মনোযোগ আনা দায়। মস্তিষ্কের যন্ত্রণাকে ছাপিয়ে বুকের যন্ত্রণা বেশি পীড়া দিচ্ছে, বুক পুড়ছে তার। আচমকাই সব ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, হঠাৎ করেই কি যেন নাই হয়ে গেছে তার জীবন থেকে। দেহ-মন, কোনোটাই আর পেরে দিচ্ছে না।
বিছানায় ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিয়ে কিছুক্ষণ জোরে জোরে দম ছাড়লো মীর। নিজেকে শান্ত করে টেবিল ল্যাম্পের দিকে হাত বাড়াতেই দরজার নিচের অংশে কড়া নাড়লো কেউ।
“এসো।”
ঘাড় উচিঁয়ে বলে উঠলো মীর। দরজাটা খুলে গেলো আস্তে আস্তে, বালিশ হাতে গুটিগুটি পায়ে ভেতরে এলো ফিরাস, কাতর স্বরে বলল,
“ঘুম আসছে না বাবা! আমি আজ একটু আপনার কাছে ঘুমাই?”
ওর ঝলমলে চোখ, সফেদ চুল মুহুর্তেই মীরকে পৌঁছে দিল শতবর্ষ অতীতে; যখন এভাবেই তার শিনজো, তার প্রাণ একটা ছোট্ট বালিশ দুহাতে জাপটে ধরে দরজায় দাঁড়িয়ে এমনই কাতর স্বরে আবদার করতো তার কাছে ঘুমোনোর৷ মীরের কান্না পেলো হঠাৎ! গলা খাকারি দিয়ে কন্ঠ স্বাভাবিক করে সে বলে উঠলো,

“হ্যাঁ, চলে এসো৷”
ফিরাস সানন্দে ছুটে এক লাফে উঠে পড়লো বিছানায়, বালিশটা বাবার বাহুর কাছে ভালোভাবে সেট করে শুয়ে পড়লো বাবার গা ঘেঁষে। মীর ওর সফেদ চুলে আঙুল চালিয়ে কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“আম্মা কে মনে পড়ছে?”
ফিরাস উত্তর দিলনা, বাবার বুকে মাথা গুজে পড়ে রইলো। মীর এক হাতে জড়িয়ে নিলো ওকে। ক্ষণিক পর দরজায় নক পড়লো আবারও, মীর ‘এসো’ বলতেই খুলে গেলো দরজা। ওপাশে বালিশ হাতে দাঁড়িয়ে তার সবগুলো ছেলে। মীর হাসলো মৃদু, বলল,
“আজ কি ঘুম না আসার প্রতিযোগিতা চলছে নাকি! ঠিক আছে, চলে এসো।”
দুমদাম পায়ে ছুটে ওরা উঠে পড়লো বিছানায়, যে যেখানে জায়গা পেলো সেখানেই শুয়ে পড়লো এলোমেলো ভঙ্গিতে৷ মীর দেখলো আরসালান আসেনি। মিশআলের মাথায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
“ছোট সাহেব কোথায়?”
“সে রাগ করে বসে আছে, কারো সাথে কথা বলছেনা। আমাকে তো দেখতেই পারছেনা, আমি নালিশ করেছি যে!
মুখ ভার করে বলল মিশআল। ছোট ভাই কথা বলছেনা দেখে বড় কষ্ট পেয়েছে সে, কিন্তু আম্মাকে অবহেলা করার ব্যাপারটা সহ্য করাও যে কঠিন! মীর মিশআলের ফোলা গালে সশব্দে চুমু খেলো একটা, বলল,
“তুমি যা করেছো ঠিক করেছো, বাবা। তুমি ওদের বিগ ব্রাদার, ওদেরকে সঠিক পথ দেখানোই তোমার দায়িত্ব।”

মিশআল প্রশংসা পেয়ে সন্তুষ্ট চিত্তে বাবার গলা জড়িয়ে ধরলো। ক্ষণিক পরেই সশব্দে খুলে গেলো দরজা, গটগটিয়ে ভেতরে এলো আরসালান৷ বিছানায় বাবার পাশে সবাইকে দেখলো সে একবার। তাকে না ডেকেই চলে এসেছে, আয়েস করে বাবার পাশে ঘুমোচ্ছে এখন! ভাইদের এমন বিশ্বাসঘাতকতা তার সহ্য হলোনা! ভ্রুতে চরম অসন্তোষের ভাজ ফেলে চেয়ে রইলো সে ওদের দিকে৷
মীর ঘাড় উচিঁয়ে দেখলো ওকে একবার। হাতে বালিশ নেই ওর, চোখে মুখে তেজ৷ বিছানায় এক বিন্দু জায়গা আর অবশিষ্ট নেই, সবই দখল করে নিয়েছে অন্যরা। নাকের পাটা ফুলে উঠলো ওর, মীর তা দেখে হাসলো মৃদু। মায়ের স্বভাব পেয়েছে, তেজ হলে নাকের পাটা ফুলে ওঠে!
কোনো ভূমিকা ছাড়াই আরসালান উঠে এলো বিছানায়, অন্যদেরকে পায়ের গুতো মেরে সরিয়ে দিয়ে পৌঁছে গেলো মীরের কাছে। একবার মীরের দিকে গাল ফুলিয়ে তাকিয়ে পরক্ষণেই ঝাপিয়ে শুয়ে পড়লো মীরের বুকের ওপর। মীর সহাস্যে বলল,

“ছোট সাহেবের তেজ শেষ?”
“হু।”
“ঘুমোও এখন, সকালে অবশ্যই ওস্তাদজীর কাছে পড়তে যেতে হবে, কোনো মাফ নেই৷”
“ঠিক আছে, বাবা।”
আরসালান বাবার চওড়া, বলিষ্ঠ বক্ষ দুহাতে আঁকড়ে ধরলো, বাবার বুকে মুখ গুজে দিয়ে ডেকে উঠলো,
“বাবা!”
“জ্বি বাবা।”
“আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি, বাবা।”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৫ (২)

আরসালান তৃপ্ত মুখে চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর প্রস্তুতি নিলো। ওর এমন নিষ্পাপ স্বীকারোক্তিতে মীরের চোখের কোণা বেয়ে গড়িয়ে পড়লো দুফোটা লোনা জল, ধরা গলায় বলে উঠলো,
“ধন্যবাদ বাবা৷”
পরক্ষণে নিজের মনে স্বগতোক্তি করলো,
“এই ছোট্ট কথাটির যে তোমার বাবার কাছে কত মূল্য সেটা তুমি কখনো জানবেনা বাবা!”

বাদশাহ নামা তৃতীয় পরিচ্ছেদ পর্ব ৯৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here